১
২০২৫
পুরুলিয়াতে এখন উত্তুঙ্গ বসন্ত এবং উত্তাল পর্যটন। ফলে থানাগুলোর নাভিশ্বাস উঠছে। ফোনটা এসপি এবং বাঘমুণ্ডি থানা হয়ে আমার কাছে যখন পৌঁছোয় তখন আমি এক রিসর্টে ডিউটি করছি।
পলাশরাঙা রিসর্টের লনে বিরাট অনুষ্ঠান ছিল আগের দিন রাতে, প্রতি বছরই থাকে। খাকি উর্দিতে দু’জন কনস্টেবল সম্ভাব্য হাতাহাতি, ওয়ালেট হারানোর মতো হালকা অথবা বাচ্চা হারিয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর কোনও অপরাধ সামলাতে হাজির থাকেন। এবারের বাড়তি পাওনা টালিগঞ্জ থেকে সায়ন্তী ভট্টাচার্য, শাসকদল-ঘনিষ্ঠ অভিনেত্রী। তিনি রাতে পারফর্ম করেছেন, দুপুরে লাঞ্চের পর কলকাতা ফিরবেন। ততক্ষণ একজন এসআই এবং এএসআই পোস্টিং-এর হুকুম হয়েছে এসপি-র। বেশ কয়েক বছর আগে, এরকমই এক প্রখ্যাত টলিউড অভিনেত্রীর অনুষ্ঠানে বেশ ঝামেলা হয়েছিল। স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক কর্মীদের কটূক্তি ঠেকাতে গিয়ে মার খেয়েছিলেন একজন কনস্টেবল। তারপর থেকে ডিপার্টমেন্ট আর রিস্ক নেয় না।
দিব্যজ্যোতি মণ্ডল পাশের টুলে বসে টেলিগ্রামে প্রেম করছিল। তিরিশ বছর বয়স। গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। রোজ সকালে নিয়ম করে চার কিলোমিটার দৌড়োয়। প্রেমিকা কলেজ পড়ুয়া। তার বাপ, দিব্যজ্যোতি পুলিশ বলে বিয়ে দিতে রাজি নন। পুলিশের চাকরিটা সরকারি হলেও তেমন আশাপ্রদ নয়। দিব্যজ্যোতিকে এ-কথা বললে, সে আক্ষেপ করবে না। হেসে বলবে, “আরে চিন্তার কোনও কারণ নেই ম্যাডাম। আগে শিক্ষকরা বিয়ের বাজারে হেবি কম্পিটিশন দিত, এখন সে-সুযোগ আর পাচ্ছে না। রিসেন্টলি যারা চাকরি পেয়েছে, তারা তো হে হে, ইয়ের দয়ায় সব কোয়েশ্চেন মার্ক। অনামিকার বাবার কপালে, পুলিশ জামাই-ই নাচছে, বুঝলেন কিনা?”
দিবার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। কারওর সর্বনাশ, কারওর পৌষমাস। ওর প্রেমটা এক বছরের পুরোনো। হোয়াটসঅ্যাপে অফিশিয়াল মেসেজ আসে প্রচুর, নিরিবিলি নেই। তাছাড়া টেলিগ্রামে সিক্রেট মেসেজিং-এর ব্যাপারটা বেশ আকর্ষণীয়। অটোডিলিট টাইমার সেট করে যা খুশি লিখে পাঠানো যায়, সার্ভার সেসব স্টোর করে না। “এসব তো কিছুই নয় ম্যাডাম। আপনাকে ডার্ক ওয়েব খুলে দেখাব একদিন। সারফেসে যা দেখছেন তা মাত্র চার পার্সেন্ট। ডার্ক ওয়েবে আপনি কাকে ডেটা ট্রান্সফার করবেন, কারওর বাপের সাধ্যি নেই তা ধরে।”
“ক্লিয়ার ক্রিমিনাল ব্যাপারস্যাপার তোর।” শুনে চোখ মটকেছিল দিব্যজ্যোতি।
ভোর ছ’টা সবে। চোখ লেগে আসছিল। ক’দিন পরেই প্রবল গরম পড়বে। আকাশের দিকে তাকালাম। অলৌকিক এক জগৎ থেকে ধূসর আর কুসুমরঙা আলোর মিশেল নেমে আসছে। দোল আসতে হপ্তাদেড়েক বাকি। কিন্তু গতকাল কারা যেন আবির খেলেছে। মাটিতে গোলাপি আর হলদে গুঁড়ো ছড়ানো। গোটা পুরুলিয়া গতবার ভেষজ আবির দিয়ে খেলায় মেতেছিল। পলাশ, পালংশাক, বিট, কাঁচা হলুদ এবং সিন্দুরি বীজ দিয়ে তৈরি আবির, যার রং লাল, গোলাপি, সবুজ, গেরুয়া, হলুদ। দিব্যর বাবা সিধু-কানহো বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগে আছেন। সেই সূত্রে দু’প্যাকেট অরগ্যানিক আবির পাওনা হয়েছিল। পড়েই আছে রুমের এক কোণে। থানায় দোল খেলা হয় বাঁদুরে রং দিয়ে। তুলতে মোটামুটি তিন দিন লাগে। দোল খেলার কথা মনে পড়তে হেসে ফেললাম। স্কুলে পড়তে রঙের ভয়ে একটুও বেরোতাম না। কপালে আবিরের টিপ পরাত মা। সেই আমি গতবার বাঁদুরে রং মেখে দোল খেলেছি জব্বর।
প্রেমিকাকে পাঠানো প্রভাতী চুমুর কোটা শেষ করে শিস দিয়ে একটা গান ধরেছিল দিব্য। দেখা হ্যায় পহেলি বার, সাজন কি আখো মে পেয়ার। আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ডিম-পাউরুটি খাবেন নাকি? আর কড়া করে কফি?”
মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ বললাম। আমি আর দিব্য দু’জনেই জানি, এই নাইট শিফটের ডিউটিগুলো আমাদের ঘাড়ে এসেই পড়বে। আমরা দু’জনেই অবিবাহিত, অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সিও। নাইট শিফটে মোটামুটি সব পুলিশেরই সিংহভাগ কাজ মাতালদের নিয়ে হয়। খুনখারাপি করে যাদের মনে থাকে না, খুন করার দরকারটা কী ছিল! যে-সব কেসকামারিতে একটু চটকদার ব্যাক স্টোরি থাকে; সেগুলো রাতে হলেও, ধরা পড়ে সকালে। ফলে পোড়- খাওয়া অফিসাররা সে-সব নাড়েন-ঘাঁটেন। কপালে থাকলে দু’-একটা কেসে সাইডকিক হওয়ার সুযোগ জুটে যায়।
ফুরফুরে হাওয়া গোল গোল করে ঘুরে মিষ্টি একটা গন্ধ বয়ে আনছিল। তার সঙ্গে মিশছে রিসর্টের রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা কফির গন্ধ। এই মুহূর্তটায় আমি নাইট শিফটের ক্লান্তি আর রুটিন ডিউটির গ্লানি ঝেড়ে ফেলে ফের একবার নিজেকে প্রশ্ন করতে পারি, আজ কোথা থেকে শুরু করবে তুমি দর্শনা বোস? কোন কাজে মাথার রসদ পাবে?
অভিনন্দন রায়[১] মারা গেছেন, চার বছরের উপর হল। নিরঞ্জন[২] জেলে আছেন, কেসের নিষ্পত্তি কবে হবে কেউ জানে না। কীভাবে হবে তার একটা আন্দাজ নিরঞ্জনের আছে। আর মিথ্যা বলে লাভ নেই, আমারও আছে। ওঁর সঙ্গে দেখা হয়নি প্রায় ছ’মাস। শেষ বোধহয় কোর্টের হিয়ারিং-এ, অক্টোবরে কলকাতা গিয়ে। নিরঞ্জনের কথা মনে হতে, কফি একটু বেশি তেতো লাগল। জেলে কি হোলি খেলবেন নিরঞ্জন?
[(১) অভিনন্দন রায়: দর্শনা বোস সিরিজের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘বৃশ্চিকচক্র’-এর চরিত্র, পুরুলিয়াতে মাওবাদী দমনের সঙ্গে নিযুক্ত প্রধান পুলিশ কর্তা।
(২) নিরঞ্জন: ‘বৃশ্চিকচক্র’ উপন্যাসের চরিত্র, সাংবাদিক, আপাতত জেলবন্দি, দর্শনার বিশেষ সূত্রে পরিচিত।]
পুরুলিয়া যখন প্রথম এসেছিলাম, রিমোট পোস্টিং[৩] নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না। দিন যাচ্ছে, ধারণা পাল্টাচ্ছে। ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারি শুধুই পানিশমেন্ট ট্রান্সফার অবধি আটকে ছিল, কিন্তু সুমন্তর কেসটা জটিল, সিবিআই অধিগ্রহণ করার পর আরও জটিল হয়েছে। ফলে ছ’মাসের এনকোয়ারি গড়িয়ে আড়াই বছর হতে চলল। ফাইল কবে বন্ধ হবে, জানা নেই কারওর। চাইনিজ বাচ্চারা একধরনের খেলা খেলে। পরস্পরের কানে কানে কথা বলে একই মেসেজ চালাচালি করে। দেখা গেছে প্রথম মেসেজ আর অন্তিম মেসেজে ঢের অমিল। পুলিশ বিভাগে এই চাইনিজ হুইসপারের গুরুত্ব কম নয়। শুনেছি, সিবিআই এনকোয়ারিতে আমার নামটা আরও পাকাপোক্তভাবে স্থান পাক, এমনটা চান অনেক সিনিয়র অফিসার। তাঁদের অনেককেই আমি চিনি না, কোনওদিন মুলাকাতই হয়নি। তবু এই আশ্চর্য আক্রোশে অবাক হইনি। গণেশদা ডিপার্টমেন্টের বহু লোকের জন্য ভাত ছড়িয়েছিল। আমি গুছিয়ে ছাই ছিটিয়েছি। নিজেকে ‘না’ বলতে পারা আর অপরকে ‘হ্যাঁ’ বলতে পারার মধ্যে যে ফারাকটুকু আছে, সেটা শিখে নিয়েই চাকরিতে এসেছিলাম। মানসিক অশান্তি ভুলে থাকতে কাজে ডুবে যেতে হয়, সেটা অবশ্য শেখা কাজ করতে এসে। আর কাজটাই যদি একদিন আকর্ষণ করা বন্ধ করে দেয়? তখন কী হবে? আজকাল এমন একটা প্রশ্ন মাথায় আসে। হাতের কফি হাতেই ঠান্ডা হয়ে যায়।
[(৩) রিমোট পোস্টিং: দর্শনা বোস পশ্চিমবঙ্গ সিআইডির অধীনে সাব-ইনস্পেকটর থাকাকালীন পানিশমেন্ট ট্রান্সফারে বাঘমুণ্ডি থানায় নিযুক্ত হন। একই কেসের সূত্রে দর্শনা সাসপেন্ড হন, নিরঞ্জন জেলবন্দি। গণেশদা, দর্শনার পূর্বপরিচিত। (‘বৃশ্চিকচক্র’, দর্শনা বোস সিরিজের দ্বিতীয় উপন্যাস দ্রষ্টব্য।)]
দিব্য দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়েছিল। ছেলেটার টেকনিক্যাল নলেজ অসাধারণ। এথিক্যাল হ্যাকিং শিখেছিল এককালে পয়সা খরচ করে। কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশুনা। কী কাজে লাগাতে পেরেছে ডিপার্টমেন্ট? ম্যান পাওয়ার আছে, রিসোর্স নেই। অথচ শুনেছি, কলকাতা পুলিশ ক্রিপ্টোকারেন্সি আর ব্লকচেন নিয়ে স্পেশাল ট্রেনিং করাচ্ছে অফিসারদের। রাজ্য পুলিশের তেমন কোনও তৎপরতা দেখি না। ফান্ড বা ট্রেনিং কোনওটাই নেই। অথচ ক’দিন আগেই পুরুলিয়া টাউনে অ্যাপ বেসড গেমে লক্ষ টাকা খুইয়েছে পাবলিক। সে কেস কারা হ্যান্ডল করছে, কতদূর কী প্রোগ্রেস কিছু জানা যায়নি। একটা ম্যানপাওয়ার ডেটা বেস যদি থাকত, আমেরিকা বা ইউকের মতো, কত সুবিধা হত! দিব্যর মতো যারা কাজ করতে চায়, প্রফেশনাল কোয়ালিফিকেশন বাড়াতে চায়, তারা কোনওদিন সুযোগ পাবে না? এভাবেই হতাশ, উদ্যমহীন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে?
“পুলিশের চাকরিতে রোমাঞ্চ খুঁজতে যাঁরা এসেছেন, তাঁরা বেশিদিন টিকতে পারবেন না। এটা বাকি সরকারি দশটা-পাঁচটার চাকরির মতো নয় ঠিকই, কিন্তু সেটা রোমাঞ্চর দিক থেকে নয়। পাবলিকের গালাগালি হজম করার অভ্যেস করে নিন। কাজ করলে-ও বা কী, না করল-ও বা কী!” ট্রেনিং-এ এক সিনিয়র বলেছিলেন। দিব্য বোধহয় সেই পুরুষকার আয়ত্ত করে ফেলেছে। প্রচণ্ড কুল থাকে। আর আমাকে বলে, “আপনি তো চাকরির প্রথম পাঁচ বছরেই যা করে ফেলেছেন, এতদিনে মরণোত্তর প্রেসিডেন্টের মেডেল-ফেডেল পেয়ে যেতে হত। তা না দিব্যি বেঁচে আছেন, আর সিবিআই-এ খাতা খুলেছেন। উফ, আপনি পারেনও ম্যাডাম।” আমি ওর কথায় হাসি, কিন্তু বুকের মধ্যে কিছু একটা খচখচ করে। সে-সব প্রশ্ন দিনের মাঝে চাপা পড়ে যায়, রাতের মাঝে জেগে ওঠে। আবার অপেক্ষা নিয়ে পরের দিনের সকাল আসে।
বসন্তের বাতাস কি উত্তরহীন চিঠি পোস্ট করে? যতদূর জানি, শাস্ত্রে এমন কিছু লেখা নেই। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই থানা ফোনে জানাল, কলকাতা পুলিশের হোমিসাইড বিভাগের এসআই বিজন বসু, দু’জন কনস্টেবল সহ সকালেই থানায় আসবেন, তাঁকে রিসিভ করে কলকাতা পুলিশের কোনও একটি কেসে সাহায্য করতে হবে। ঘণ্টা দুয়েক পর, কবি কবি চেহারার কলকাতা পুলিশের এক অফিসার হ্যান্ডশেক করলেন আমার সঙ্গে। লম্বা, কোঁকড়ানো চুল, মাজা গায়ের রং, লম্বাটে একটা আঁচিলযুক্ত কপাল, ঘন ভুরু, একটু বসা চোখ, খাড়াই নাক, নোয়াপাতি বাঙালি ভুঁড়ি এবং বেশ মিষ্টি একটি হাসি। ভদ্রলোককে দেখে মনে হল, খুব চেষ্টা করে ফরমাল থাকতে হচ্ছে। দু’কাপ চা বেশ সময় নিয়ে শেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আতনা গ্রামে একজনের নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে। লোকাল থানাকে একবার ইনফর্ম করে কাজে নামতে চাইছিলাম আর-কি!”
২
“কলকাতাতে একটা মার্ডার হয়েছে— প্রাইম সাসপেক্ট আতনা গ্রামের বাসিন্দা।”
“হিস্ট্রিশিটার কেউ?”
“মনে হয় না। একটা ফুড ডেলিভারি অ্যাপে কাজ করে।”
“কী নাম?”
“সাগর মণ্ডল।”
এই নামের কারওর বিরুদ্ধে সম্প্রতি কেস উঠেছে কি না মনে পড়ল না। তবে, আতনা গ্রাম আমার মোটামুটি চেনা। একবার একটা চুরির ব্যাপারে গিয়েছিলাম। থানা থেকে সময় লাগে চল্লিশ মিনিট মতো। ওদিকটায় টুরিস্ট যায় না, ফলে রাস্তাঘাটের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। সরু তো বটেই, কিছু কিছু জায়গায় রাস্তা এখনও কাঁচা। বেলা দশটার কড়া এবং শুকনো রোদে বিজনের চোখ-মুখ কুঁচকে ছিল। মোবাইল স্ক্রল করতে করতে বললেন, “মিডিয়া একেবারে হাত ধুয়ে পিছনে পড়েছে।”
উঁকি মেরে দেখলাম, আজ-কাল-পরশুর অ্যাপে খবরের হেডলাইন, “তল্লাশি বালিগঞ্জের পেয়ারাবাগান বস্তিতে, পুলিশের ভূমিকায় প্রশ্ন।”
খবরের কাগজে পুলিশের নামে কী বেরোল, তাতে সার্ভিসের কিছু বছরের মধ্যে আমরা মোটামুটি নিস্পৃহ হয়ে যাই। বিজন দেখলাম ব্যতিক্রম। বালিগঞ্জের কেসটা খবরের কাগজের পাতায় প্রথম পাতায় উঠে আসছে গত চারদিন ধরে। ঘটনা ঘটার তিনদিন পর একটা কেস নিয়ে হঠাৎ মিডিয়ায় শোরগোলের অর্থ যে, জল বেশ ঘোলা। প্রোমোটার-রাজনৈতিক দল-অশুভ আঁতাত ইত্যাদি ঘুরে এখন কাঁটা এসে থমকেছে অবৈধ নির্মাণকর্মে। অভিযোগ উঠেছে এলাকার নিরাপত্তা নিয়েও। খুনটা হয়েছে একটা কনস্ট্রাকশন সাইটে। নাম স্বস্তিকা। প্রোমোটারের নাম কী সাম মেহতা। সেখানে সিকিউরিটি ছিল মাত্র দু’জন। জনবহুল জায়গা, আশেপাশে প্রচুর ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট, দু’-একটি বাচ্চাদের পার্ক। এদের সকলের নাকের ডগায় কাণ্ডটি ঘটেছে। স্বস্তিকার মতো কনস্ট্রাকশন সাইট যে দুষ্কৃতীদের মুক্তাঞ্চল ছিল, এবং আরও বড়ো কোনও ঘটনা যে কোনওদিন ঘটতে পারত, বলে রায় দিয়েছেন একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা। টিভি খুললেই তাদের বাইট দেখা যায়। ভিক্টিমকে কে মারল, কেন মারল তা নিয়ে নানারকমের আলোচনা। খবর শুনে বোঝা যায়, মিডিয়ার কাছে তদন্ত নিয়ে ইনপুট কিছু নেই। কলকাতা পুলিশ ঠোঁট টিপে রেখেছে। এর কারণ আন্দাজ করতে পারছিলাম। বিজনের কথায় নিশ্চিত হলাম।
“কেসটায় মেহতার প্রোমোটিং-এর লাইসেন্স প্রায় যায় যায়। না হলে, এত চাপ আসত না। কেসটার পিছনে ক’দিন ধরে নাওয়াখাওয়া ভুলে ঘুরেছি।” বিজন নিজের মনেই বললেন।
আমি হাসলাম। খবরের কাগজে রোজ দস্তা খানেক খুন জখমের খবর বেরোয়, সেগুলো আর উপরতলার মনে থাকে না।
“উপরতলা থেকে এক হপ্তা টাইম দিয়েছিল। আসামি নিজেই জালে এসে না ফাসলে চাকরি টেকানো মুশকিল হত।”
“ফেঁসেছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“আরে হ্যাঁ মশাই। গতকালই অ্যারেস্ট হয়ে যেত। রবিবার হওয়ায় ওয়ারেন্ট পেতে দেরি হল। মালটা ঘাঁঘু, সেই সুযোগে ভাগলবা। এখন একে দায়রাসোপর্দ করতে পারলে একটু নিশ্বাস নিই।” বিজন ঘাম মুছতে মুছতে বললেন।
ওঁর কথায় একটু হাসি পেল, অবাকও হলাম। সাধারণত কলকাতা পুলিশ আর রাজ্য পুলিশের সম্পর্কটা মাখোমাখো নয়। কপুর বেশিরভাগ অফিসারই যে-কোনও যৌথ কাজে রাজ্য পুলিশকে দুধভাত করে রাখেন। বিজনের তেমন কোনও ইগো নেই।
“আপনাদের কাজের চাপ কেমন?” বিজন জিজ্ঞাসা করলেন।
“আপাতত বসন্ত উৎসবের জন্য নিশ্বাস ফেলার সময় নেই। তা আপনি একাই এই কেসে?”
“ওই আর কি।” বিজন সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন।
“কেসটায় কি আতনার ছেলেটা একাই সাসপেক্ট? না আরও কেউ আছে?”
“বস্তির লোকেদের মতে প্রোমোটার। আমাদের মতে বয়ফ্রেন্ড।”
“সাগর কি বয়ফ্রেন্ড নাকি?”
“সেরকমই খবর পেয়েছি।”
“মোটিভ?”
“সেটা জানতেই তো তুলতে এসেছি। আপাতত সিসিটিভি ফুটেজ দেখে…”
বিজন কথা শেষ করার আগে বিপ্লব ঘ্যাঁস করে গাড়ির ব্রেক কষল। সামনের রাস্তাটা হঠাৎ বেঁকে গেছে। ঘোরার সময় বোঝা যায়নি, রাস্তাটার মুখের কাছে বেজায় ভিড়। জিপ থেকেই দেখা গেল, ভিড়টার মুখ আসলে রাস্তার ধারের হাইড্রেন টপকে যে কারখানাটা আছে সেদিকে ঘোরানো। বিপ্লব এক লাফে নেমে ভিড়টার কাছে পৌঁছে গেল। লোকাল লোকজন উত্তেজিত অবস্থায় ওকে কী যেন বলল। বিপ্লবের চেহারা দেখে মনে হল ব্যাপার বিশেষ সুবিধের নয়। এক্ষুনি নামাটা কর্তব্য।
আতনার এই দিকটায় একটা লেদ কারখানা আছে জানতাম। লাইসেন্সের ঝামেলায় আপাতত প্রোডাকশন বন্ধ। শ্রীসিদ্ধেশ্বরী ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের টিনের সাইনবোর্ডটা রাস্তার এপার থেকেই দেখা যায়।
“কী ব্যাপার?” এগিয়ে গিয়ে বিপ্লবকে জিজ্ঞেস করলাম। ওর উত্তর দেওয়ার আগেই হা হা করে একদল লোক বলে উঠল, “এদিকটায় আসুন ম্যাডাম। এ পাশটায়।”
একলাফে হাইড্রেন পার করে, সিদ্ধেশ্বরীর গেটের দিকে এগোলাম। কিন্তু ভিড় নির্দেশ করছে কারখানার পশ্চিম দিক। অর্থাৎ আমাকে বাঁয়ে ঘুরতে হবে। বাঁ-দিকটা কারখানার ডাম্পিং গ্রাউন্ড। বালি, মাটি, রাবিশ, পুরোনো চটের বস্তা, ফেলে দেওয়া পার্টস পড়ে আছে। কিন্তু সেই অবধি পৌঁছোনোর আগেই পরিচিত একটা গন্ধ এসে নাকে ভক করে লাগল।
বিপ্লব ফিসফিস করে বলল, “আজ সকালে একটা বডি পাওয়া গেছে।”
ডাম্পিং গ্রাউন্ডটার একধারে মাটি কেটে অগভীর একটা গর্ত তৈরি করা হয়েছে। পোড়া প্যাকিং বাক্সের অংশবিশেষ পড়ে থাকতে দেখে মনে হয় এখানে রাবিশ পুড়িয়ে দেওয়া হত। গর্তটার পাশে চিত হয়ে পড়ে থাকা বডিটার দিকে তাকালে করুণা আর ঘেন্নার একটা মিশ্র অনুভূতি হয়। অদ্ভুত ব্যাপার হল, করুণা যে ছিন্নপ্রাণ শরীরকে দেখে জেগে ওঠে, ঘেন্নাও সেই একই বিকৃত শবদেহ জাগায়।
পূর্ণবয়স্ক পুরুষ। বয়স পঁচিশ থেকে সাতাশের মধ্যে। মোটের উপর রোগাপাতলা গড়ন। কপালের ডানদিক বরাবর একটা জরুল আছে। চুল ক্রুকাট, পরনে মেরুন রঙের হাফহাতা টি-শার্ট, স্টোন ওয়াশের লো-রাইজ ডেনিম। টি-শার্টের রং মেরুন বলেই দূর থেকে বোঝা যাচ্ছিল না। কাছে যেতে পরিষ্কার হল। তলপেটের কাছে থোলোথোলো রক্ত শুকিয়ে আছে। আড়াআড়ি কাটা পেটের ক্ষত হাঁ হয়ে আছে। ক্লিন কাট। চামড়ার উপর দিয়ে, সামান্য তেরছাভাবে, পেটের ডানদিক ঘেঁষে, নাভি থেকে চার সেমি পাশে ছুরি বা ক্ষুর চালিয়েছে। প্রফেশনাল হাত। মেজর কোনও আর্টারি কেটে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে মৃত্যু। হাঁ-মুখ ক্ষতটায় মাছি ভনভন করছে। বাকি বডিতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন সেরকম নেই। সম্ভবত মৃত্যু এসেছে দ্রুত। হাত দুটো ছড়ানো, পা দুটো হাঁটু থেকে ভাঁজ হয়ে আছে। বডি সোজা নয়, সামান্য কোনাকুনি পড়ে আছে মাটিতে। হাতের তেলোতে রক্ত লেগে— বোধহয় হাত দিয়ে পেটের ক্ষত চেপে ধরার চেষ্টা করেছিল ভিকটিম। প্যান্টের হেম কোমর থেকে কয়েক ইঞ্চি নেমে এসে আন্ডারওয়ার দেখা যাচ্ছে। পায়ে একটা সস্তা মানের স্পোর্টস শু। তাতেও ফোঁটা ফোঁটা রক্তের ছাপ। দাঁড়ানো অবস্থায় ছুরিকাঘাত, আঘাতের ফলে প্রতিরোধ হারিয়ে মাটিতে বসেছে, তারপর চিত হয়ে মৃত্যু।
পকেট থেকে রুমাল বের করে, ছেলেটার পকেট হাতড়ালাম। বুক পকেটে কিছু নেই। রিগর মর্টিস শুরু হয়ে গেছে, লাশ কাত করে, প্যান্টের হিপ পকেট হাতড়াতে গিয়ে বুঝলাম। পকেট থেকে কালো পার্স বেরোল একটা।
বিপ্লব একটু দূর থেকে ডাকল। “ম্যাডামমম…”
তাকিয়ে দেখলাম ও জঞ্জালের দিকে হাত বাড়িয়ে কী একটা দেখাচ্ছে। কাছে যেতে একটা চকোলেট ব্রাউন শার্ট চোখে পড়ল। বিপ্লব সেটা রুমালে ধরে তুলে নিয়ে এল। শার্টের তলার অংশ রক্তে ভেজা। সম্ভবত খুনির জামা। পালানোর আগে ডাম্প করে গেছে।
“থানায় খবর দেননি কেউ?” পাশের লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম।
“কেন আপনি তো থানা থেকে আসছেন।” লোকটা ভুরু কুঁচকে বলল।
“হ্যাঁ তা আসছি, কিন্তু এই কেসটা আমার কাছে আসেনি।” সংক্ষেপে উত্তর দিলাম। ডিউটি অফিসার কে ছিল আজ থানায়, সেটাও জানি না। মোবাইলে বড়োবাবু রাজেশ অধিকারীকে ধরলাম। ফোন রিং হয়ে গেল। তুললেন না।
“বাঘমুণ্ডি থানায় আমরা খবর পাঠিয়েছি ঘণ্টাখানেক হল। জিপ দেখে ভাবলাম, এতক্ষণে পুলিশের সময় হল।”
খোঁচাটা গিলে নিতে হল। এই মুহূর্তে অন্তত দু’জন কনস্টেবল লাগবে। সুরতহাল করতে হবে।
“সে কার কাছে কেস গেছে আপনাদের ব্যাপার। বডিটা সকাল থেকে পড়ে আছে। আমাদেরই গ্রামের ছেলে।” লোকটা আবার বলল।
“প্রথম কে দেখেছে?”
“নাইন ক্লাসের দুটো ছেলে। টিউশনি থেকে ফেরার পথে প্রস্রাব করতে গিয়েছিল। তখন চোখে পড়ে।”
“সকাল থেকে পড়ে আছে কী করে জানলেন? রাতে আপনি এদিকে পাহারাটাহারা দ্যান নাকি?”
লোকটা মুখ খুলে কী একটা বলতে গিয়ে চেপে গেল। ফোন বাজছিল। পুরোনো একটা কেসের উকিলের ফোন। এখন কথা বলার পরিস্থিতি নয়। ‘কল ইউ লেটার’ মেসেজ ছেড়ে খেয়াল করলাম বিজনবাবু জিপ থেকে নেমে ডেডবডির দিকে এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু কাছে যাওয়ার আগেই থমকালেন। পকেট থেকে রুমাল বের করে কপাল মুছলেন। তারপর আমার দিকে তাকালেন। মুখভঙ্গিটা অস্বাভাবিক লাগছিল। আমার মাথার মধ্যে একটা সম্ভাবনা উঁকি দিল। এরকম সমাপতন হয় নাকি!
“আপনাদের এখানে আসায় কেসটা যে আরও কেঁচিয়ে গেল ম্যাডাম।” বিজন আমাকে দেখে হতাশ ভঙ্গিতে বললেন।
আমার হাতে পার্সটা প্রায় রিফ্লেক্সে খুলে ফেললাম। সি-থ্রু কভারের মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখা যাচ্ছে। কসবা এলএ থেকে ইস্যু হয়েছে, ২০২১ সালের অগস্ট মাসে। দু’চাকার লাইসেন্স। লাইসেন্স হোল্ডারের নাম সাগর মণ্ডল, স্থানীয় ঠিকানা কলকাতার, স্থায়ী ঠিকানা আতনা, জেলা পুরুলিয়া।
বিজন আর উত্তর দিলেন না। ফোন বের করে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গা খুঁজে এগিয়ে গেলেন। ওকে ওর উর্দ্ধতনকে খবর দিতে হতো। আমারও ঊর্ধ্বতন ফোন করছিলেন। আতনার খবরটা আমাকে দেওয়ার জন্যই কি!
৩
বিজনের একটা জোরদার ধাক্কা লেগেছিল। অবাক যে আমিও হইনি তা নয়। কিন্তু কেসের অগ্রপশ্চাৎ না জেনে, খুব একটা মনস্থির করে ভাবতে পারছিলাম না। বিজনকে বললাম, “ইয়ে, আপনি যদি কলকাতার কেসটা একটু ডিটেলে বলেন এবার…”
বিজন অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে সিগারেট খাচ্ছিলেন। আমার দিকে বিহ্বলদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন… “অ্যাঁ? ও হ্যাঁ। নিশ্চয়ই।”
“দেখুন বডি আইডেন্টিফাই হয়ে গিয়েছিল, থানা থেকে ডিসি, ডিডির কাছে ফোন এসে পৌঁছোনোর অনেক আগেই। ভিক্টিম পেয়ারাবাগান বস্তির বাসিন্দা, চুমকি প্রামাণিক। বস্তির লোকজন যারা ওখানে ছিল, তাদের মধ্যে অনেকেই চিনত মেয়েটাকে। বালিগঞ্জ থানার বড়োবাবু মেয়েটির বাড়ির লোককে আইডেন্টিফিকেশনের জন্য ডেকে রেখেছিলেন। বাড়ির লোক বলতে এক আধবুড়ো কাকা। মেয়েটি একাই থাকত, নাবালক ভাইয়ের সঙ্গে।”
“ভাই আসেনি?”
“ভাই দেড় বছর আগে মেয়েটির সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি ছাড়ে। আর ফেরেনি।”
“ফেরেনি মানে…”
“বস্তির ব্যাপার, বুঝতেই পারছেন। মেয়েটি ডোমেস্টিক হেল্পের কাজ করত, ভাই লোকাল একটা চায়ের দোকানে কিছুদিন কাজে লেগেছিল। সম্ভবত স্মার্ট ফোন বা ওয়াচ নিয়ে দুই ভাই-বোনে ঝামেলা বাঁধে। মেয়েটা নাকি পরে বিস্তর খোঁজখবর নিয়েছে, কিন্তু ভাইকে খুঁজে পায়নি।”
“একটু গোড়া থেকে বলুন না?”
“গোড়া থেকে আমি তো ছিলাম না। ছিলেন সৈকত।”
“সৈকত কে?”
“সৈকত মিত্র। জলাদর্শ নামের একটা এনজিও-র সদস্য।”
.
গোড়ার কথা
পঁচিশে ফেব্রুয়ারি, সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ ওরা বডিটা পেয়েছিল। গলে পচে যাওয়া চামড়ার তাল নয়, বরং পোস্টমর্টেমের ভাষায় টাটকা; রিগর মর্টিস সবে শুরু হয়েছে। জায়গাটা জোলো হওয়ায় দ্রুত পচন শুরু হতে পারত। কিন্তু সৌভাগ্যবশত বড়ি খুব বেশিক্ষণ পড়ে ছিল না।
আসলে, এই বডিটা পাওয়া যাওয়াই একটা আশ্চর্য ঘটনা। চান্স ফ্যাক্টর কোনও কোনও ক্ষেত্রে এত জোরালো হয়ে যায় যে, অ্যাকাডেমিতে ওর সম্পর্কে যা যা পড়ানো হয়, সবটাকেই ভুল প্রমাণ করে ফেলে। হ্যাপাজার্ড, র্যান্ডম, আনপ্রেডিক্টেবল। অর্থাৎ কিনা উড়ে এসে জুড়ে বসা অপরাধ। ডেডবডি তাড়াতাড়ি পাওয়া গেলে, পুলিশি তদন্তে সুবিধা হয়। যদিও, পুলিশি তদন্ত কী গতিতে এগোবে তা পারিপার্শ্বিকের উপর নির্ভর করে— পলিটিক্যাল কানেকশন, সামাজিক চাপ, ভিক্টিমের সামাজিক অবস্থা। সবই পূর্বনির্দিষ্ট। উনিশ বছরের চুমকি প্রামাণিকের বডি সেরকম কোনও নির্দেশ, প্রথমদিকে পুলিশকে দেখাতে পারেনি। তবু, শোরগোল একটা উঠেছিল। চুমকিকে নিয়ে নয়, ক্রাইম সিন নিয়ে। চুমকি মরে প্রমাণ করে দিয়েছিল, সে সস্তা জায়গায় মরেনি।
১২ নম্বর গড়চা রোড, বালিগঞ্জ। ক্রাইম সিনের ঠিকানা। পাঁচশো মিটার রেডিয়াসের ভিতর নিউজ বেঙ্গলের কলকাতা হেডকোয়ার্টার, শাস্তি শাড়ি নিকেতনের ছ’তলা মল, নতুন পুরোনো অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স, এবং পেয়ারাবাগান বস্তি। একদা এখানে খৈতানদের এক সুবিশাল জমিসহ অট্টালিকা ছিল। এতই বড়ো তার মাপ, যে বালিগঞ্জ মোড়ের চা-সিগারেটের দোকানে রাজবাড়ি বললে ব্যস্ত দোকানি বিরক্ত হতো ঠিকই, কিন্তু অবধারিতভাবে আঙুল তুলে দিকটা দেখিয়ে দিত। শোনা যায়, খৈতানদের সেই বাগানবাড়িতে মাটির তলায় একটি বহুপ্রাচীন জগন্নাথের দারুবিগ্রহ পাওয়া গিয়েছিল। দারুবিগ্রহটিকে নিয়ে নানা অলৌকিক গল্প প্রচলিত আছে। তার অন্যতম হল, খৈতানরা সেটিকে পুজো করতে শুরু করলে তাঁদের দিনে দু’গুণ রাতে চারগুণ উন্নতি হয়। এছাড়াও জমিতে একটি বারো কাঠা মাপের পুকুর ছিল। মেহতা খৈতানদের বাগানবাড়িটি কেনার পর পুকুরটি চুরি যায়। পুকুরচুরির প্রমাণটি অবশ্য স্থানীয় এক বাসিন্দা রিমা সেন, বেশ কিছু দিন আগে তাঁর ছাদ থেকে ক্যামেরাবন্দি করে রেখেছিলেন। মূল ঝামেলা বেঁধেছিল সেই নিয়েই।
২৫ ফেব্রুয়ারি, সকালে জলাদর্শ নামে এক এনজিও স্থানীয় কিছু বাসিন্দাদের নিয়ে স্বস্তিক টাওয়ারে হানা দেয়। অভিযোগ পুকুর অর্ধেকের বেশি ভরাট করে ফেলেছেন মেহতা। খৈতানদের রাজবাড়ি ভেঙে অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে জমিতে। ভরাটের কাজ শেষ হলে, অ্যাপার্টমেন্টের সংখ্যা বাড়বে বলাই বাহুল্য। প্রায় পঁয়তাল্লিশ দিন কাজ হওয়ার পর, মেটিরিয়াল কম পড়ায় কাজ স্থগিত রেখেছিল প্রোমোটার। দু’-একজন বাদে সাইটে মিস্ত্রি সেরকম ছিল না। তারাও রেঁধে বেড়ে ঘুম দিয়েছিল। পুলিশি রিপোর্টে প্রকাশ, ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালবেলায় স্বস্তিকার গেটে পাহারা দিচ্ছিল মনোজিৎ গায়েন বলে একটি সিকিউরিটি গার্ড। জলাদর্শের টিমটিকে মনোজিৎ যথাসম্ভব বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু হম্বিতম্বির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। জলাদর্শের চেয়ারম্যান নীতি মুখোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ থেকে রিটায়ার করেছেন গত বছর। ফোনে তিনি মেহতার সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁর সন্তুষ্ট হওয়ার কোনও সম্ভাবনা ছিল না।
দলে কিছু উষ্ণরক্তের নবযুবক ছিলেন। তাঁদের অনেকেই স্থানীয় পেয়ারাবাগান বস্তির। বারো কাঠার পুকুরটি স্থানীয় ছেলেদের মাছ ধরা এবং সাঁতার কাটার পীঠস্থান ছিল। জলাদর্শের সদস্যদের এর থেকে বেশি প্রকাশ্য করে বলা বস্তির ছেলেদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। গাঁজাসেবন আর জুয়ো খেলার মতো ‘ছোটোলোক’চিত কাজ উহ্য ছিল। মেহতার ফ্ল্যাটবাড়ির ধাক্কায় উহ্য আর অনুহা সব কাজেই বাধা পড়ছিল। প্রথমে ওঁরা নির্ঝঞ্ঝাটভাবে ফ্ল্যাটের কাজ শেষ করতে দেওয়ার জন্য মেহতার কাছে কিছু টাকাপয়সা দাবি করেন। মেহতা পাত্তা না দিয়ে ভাগিয়ে দেন। অগত্যা কিছু ছেলেকে ফ্ল্যাটবাড়ি কমপ্লেক্সে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ দিতে হবে, এমনটা দাবি তোলেন ওরা। মেহতা তাতেও রাজি হন না। লোকাল কাউন্সিলার সেরকম মধ্যস্থতা করছিলেন না। ওঁরাও স্বাভাবিকভাবেই ফুঁসছিলেন। পুকুর ভরাটের ব্যাপারটা প্রশাসনিক লেভেলে চলে যাওয়ায় মেহতাকে গেঁড়োয় ফেলার একটা সুযোগ এসে গিয়েছিল। নীতিদেবীর বারণ সত্ত্বেও এঁরা একরকম জোর করেই সদলবলে ভিতরে ঢোকেন। জলাদর্শ টিমের দু’জন সদস্য বাধ্য হয়ে ওদের পিছু করেন।
ওদের আবেগ সেই অর্থে অন্যায্য নয়, কিন্তু ট্রেসপাসিং বলে একটি বেনিয়ম করে ফেলেছেন, সেটা ওঁরা বুঝলেন কিছুক্ষণ পরেই; মেহতা স্থানীয় থানায় ফোন করায় ওসির নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী এসে পৌঁছোনোয়।
খৈতানদের পুরোনো বাড়িতে বটগাছ গজিয়েছিল। ভাঙা কার্নিশের কোণে এখনও তার শিকড়গুলো বাতাসে দোল খেতে দেখা যায়। বাড়িটার আগা মাথা ভেঙে ফেলেছিল সন্ত্রাস। আর সামান্যই বাকি ছিল। পুরোটা গুঁড়িয়ে মাটিতে পড়েছে ফলে সাইটের মাটি ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখার মতোই বিপজ্জনক। পেরেক, লোহার টুকরো, রাবিশে ভর্তি। ছেচল্লিশ সালের বাড়ি। ছোটো ছোটো ইট বেরিয়েছে বিস্তর। সেগুলো পাশে সরিয়ে রাখা। ইটের পাঁজা পেরিয়ে সোজা প্রায় সোয়া কিলোমিটার পথ বড়ো বড়ো গাছপালায় ঢাকা। শিরীষ, ছাতিম, আখরোট, পাম, কাঠচাপা আর আম গাছে ঢাকা ছায়াঘেরা বাড়ি। দক্ষিণ কলকাতার শেষতম মরুদ্যান বলে ভুল হতে পারে।
মার্চ মাস শুরু হবে, কলকাতায় সে-রকম গরম পড়েনি। ফুরফুরে হাওয়ায় মাঝে মাঝে একটু ছ্যাঁকছোক, বসন্তকালীন ওয়েদার এবার চালিয়ে খেলছিল। যে দলটি জোর করে বাগানবাড়িতে ঢুকে পড়েছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছায়ার আড়ালে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিল। দু’-একজন মেহতাকে খিস্তিখামারি করে বিড়ি ধরাল। পুকুর ভরাটের জন্য স্থানীয় কাউন্সিলার ক’পয়সা খেয়েছেন, সে টাকার বখেরা পেয়ারাবাগানের কে কে পেল, সেই নিয়ে টুকটাক আলোচনা হল। হতাশায় বিড়ি পুরো না টেনেই পায়ের চাপে মাড়িয়ে নেভালেন কয়েকজন। জলাদর্শের দুই সদস্য একটু এগিয়ে গিয়েছিলেন। পুলিশের দু’জন কনস্টেবল নিয়ে বালিগঞ্জ থানার ওসি সিদ্ধার্থ চাকলাদার, তখন নীতি মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলছেন স্বস্তিকার গেটে।
পুকুর ভরাটের কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছিলেন মেহতা। বিরাট আয়তাকার জমির মধ্যিখানটা সামান্য ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে। দূর থেকে জমির ঢাল দেখলে বোঝা যায়, চুরির স্থান কাছেই। কাছে এগিয়ে জলাদর্শের সৈকত দেখলেন, গত তিন দিন আগের প্রবল বৃষ্টিপাতের জল এখনও জমে আছে ঢালে। জলাজমির ধার ঘেঁষে গুচ্ছের ফার্ন আর ভিতরে হাঁটুছোয়া লম্বা ঘাস।
“ওর নীচে অন্তত দু’ফুট কাদা আছে বুঝলে?” অনিমেষকে বললেন সৈকত।
“হুঁ। মেহতা এটাকে শালীজমি বলে দেখিয়েছে শিওর। না হলে স্যাংশন পাওয়ার কথা নয়।”
“স্যাংশনের আগে ইনস্পেকশন হয় না বলছ?” সৈকত মুখ টিপে হেসে বললেন।
“হুম। তা হলে এখন কিং কর্তব্য!”
“ফোটোবাজি, আবার কী? পর্ষদ ছবি পেলে একটু নড়েচড়ে বসতে পারে।”
সৈকত পকেট থেকে মোবাইল বের করে এগোলেন। দরকারে জলাটায় নামতে হবে। বুটটা যাবে। এদিকে স্যান্ডল শু পরে আসলেও খুব একটা সুবিধা হত না। শামুক, গেঁড়ি, গুগলিতে পা কাটার চাপ আছে। অনিমেষ এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছিলেন। পশ্চিম আর দক্ষিণদিক ঘিরে ফাঁকা জমি, পূর্ব দিকে আট তলা এক বিল্ডিং। ওরই চার তলায় বাগানবাড়ি ফেসিং হল রিমা সেনের ফ্ল্যাট। মহিলা বুদ্ধি করে ছবি তুলেছিলেন বটে! অন্যমনস্ক হয়ে ভাবল অনিমেষ।
কিছু দূরে একটা শব্দ হল। গলা থেকে চাপা, অবরুদ্ধ আওয়াজ। সৈকত জলাটার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। ঠিক দাঁড়িয়ে নেই, কোমর থেকে সামান্য ঝুঁকে গেছেন সামনের দিকে। অনিমেষ উদ্বিগ্ন হয়ে ডাকলেন, “সৈকতদা?”
সৈকত হাতের ইশারায় ডাকলেন অনিমেষকে। জলার যে-দিকটা চোখে পড়ছিল না, সেদিকে উঁকি দিলেন অনিমেষ। কাদাজলে মাখামাখি জমিটায় লম্বা ঘাসগুলো নুইয়ে শুয়ে পড়েছে একজায়গায়। সবুজ ঘাসের ভাঙাচোরা বনে শীর্ণ একটি হাত প্রথমে চোখে পড়ে। কবজি জোড়া লাল কাচের চুড়ি। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা শরীরটার বাঁ হাত বড়ির তলায় চাপা পড়ে গেছে। পা দুটোর একটা সোজা। একটা হাঁটু থেকে ভাঁজ। ভাঁজ করা পায়ে হালফ্যাশনের জুতো। অন্য পা নগ্ন। হলদে রঙের সালোয়ার-কামিজ। চুল বোধহয় মৃত্যুকালে পোনি করে বাঁধা ছিল। মুখ দেখার উপায় নেই। কাদায় গেঁথে আছে…
বিজনের কথা বলার কায়দা ভালো। ক্রাইম সিন চোখের সামনে ছবির মতো ফুটে ওঠে। থানা থেকে এখনও বড়ি তোলার গাড়ি পাঠায়নি। ক্রাইম সিন কর্ডন করিয়ে আমরা ওখানেই অপেক্ষা করছিলাম।
“মোটিভ কি সেক্সুয়াল?” আমি বিজনকে প্রশ্ন করলাম।
“ইনিশিয়ালি তা-ই মনে হয়েছিল আমাদের। কিন্তু পিএম রিপোর্ট তা বলছে না।”
“কী বলছে?”
“ভিক্টিম সেক্সুয়ালি অ্যাক্টিভ ছিল। কিন্তু ঘটনার দিন কোনও পেনিট্রেশন, ফোর্সফুল বা আদারওয়াইজ, কোনওটাই হয়নি। নো ট্রেসেস অফ সিমেন বা ভ্যাজাইনাল স্পটিং।”
“হুম। টাইম অফ ডেথ?”
“২৫ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাত বারোটা থেকে দুটোর মধ্যে। স্ট্র্যাঙ্গুলেশন। সেটা অবশ্য পিএম-এর আগেই বোঝা যাচ্ছিল। মুখচোখ ফোলা, গলায় অ্যাব্রেসন, চোখে ব্লাড শট রেড স্পটস।”
“পেটেকিয়াল হেমারেজ?”
“একদম।”
“আর, ডিফেন্সিভ উন্ড?” আমি জিজ্ঞাসা করি।
“হ্যাঁ, সে-ও ছিল। হাতে বিশেষত। আর মাথায় একটা ফ্রেশ ইনজুরি ছিল, সেটা মৃত্যুর কিছু আগে। কিন্তু মৃত্যুর কারণ সেটা নয়।”
“কীরকম ইনজুরি?” আমি ভুরু কুঁচকাই।
“তিন সেমি মতো আড়াআড়ি দাগ। স্কালের লেফ্ট সাইড। ব্লান্ট-ফোর্স ট্রমা। ব্লিডিং হয় এবং ভিক্টিম ওই আঘাতে সেন্সলেস হয়ে যায়।”
“আচ্ছা।”
বিজন সামান্য হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন, “আরও আছে, মেয়েটার সারা গায়ে বেশ কিছু উন্ড ছিল।”
“ফ্রেশ!”
“না। ফ্রেশ নয়, তবে খুব পুরোনোও নয়।”
“সেগুলোও ভোঁতা কোনও অবজেক্ট দিয়ে থেঁতলে …”
বিজন ঘাড় নাড়িয়ে বলেন, “না। কাঁটার মতো পয়েন্টেড কিছু।”
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, “সেক্সুয়াল অ্যাঙ্গল তো নেই বললেন, সেল্ফ ইনজুরি নাকি?”
“এই মুহূর্তে বলা মুশকিল, বুঝলেন। পিঠে, ঘাড়ে, বুকে, তলপেটে বেশ কিছু কাটা দাগ আছে। কয়েকটা আঁচড়ের মতো, কয়েকটা ব্লেড চালানোর মতো, কয়েকটা ওই কাঁটার মতো।”
“ওহ্! আপনারা কতক্ষণ পর খবর পেয়েছিলেন?”
“আমরা যখন পৌঁছোই, তখন ঘড়িতে দুপুর বারোটা।”
৪
বিজন বসুর স্মৃতি থেকে
“পেরিমিটার মার্ক করেননি? আফটারনুন আবার কী দেখে গুড মনে হল? থানার লোড কি কিছু কম ছিল আজ?” ওসি হোমিসাইড খিঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন সিদ্ধার্থ চাকলাদারকে।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরমে, ঘামে সিদ্ধার্থ চাকলাদারের ইউনিফর্ম চুপচুপে ভিজে পিঠে সেঁটে গিয়েছিল। ওসি হোমিসাইড তন্ময় সামন্তর মেজাজ তুঙ্গে, কসবা আর ভবানীপুরের দুটো কেস এখনও কিনারা হয়নি— এই মুহূর্তে আর-একটা নতুন না হলেও চলত। সিনিয়র লোক। সিদ্ধার্থ খ্যাকানিটা হজম করে নিলেন। খুনের খবর পাওয়া মাত্র, এত লোক ভিড় করেছে যে থানার ফোর্স দিয়ে সামলানো সম্ভব নয়। সিদ্ধার্থর দিকে ভুরু কুঁচকে তন্ময়দা বললেন, “ক্রাইম সিনের পিছন মারা গেছে অনেকক্ষণ আগে। এতটা ডিপে মারতে অ্যালাউ করলেন কেন?”
আশপাশ থেকে কিছু উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল। বেশিরভাগই পেয়ারাবাগানের। মেয়েটাকে চিনতে পেরেছিল বাবু সরকার। সে-ই বোধহয় বাকিদের খবর দিয়েছে। সিদ্ধার্থ, তন্ময় সামস্তকে আপডেট দিচ্ছিলেন। কিন্তু তন্ময় সামন্তের মেজাজকে ভয় পায় না, এমন জুনিয়র কপুতে কম আছে। সিদ্ধার্থর অবস্থা অনুভব করতে পারছিলাম।
তন্ময়দা জলাজমিটায় সাবধানে পা ফেলে নামলেন। একটু ঝুঁকে, বডিটাকে আগাপাশতলা খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর আমার সাহায্য নিয়ে বডিটা চিৎ করলেন। এই সময়টা ওঁর মুখ দেখার মতো হয়। ডেডবডি ছোঁয়ার আগে অবধি কেমন একটা গ্ল্যাডিয়েটরের মতো হাবভাব করেন। তারপর বডি দেখে চুপ করে যান খানিকক্ষণ। আমি গলা খাঁকড়ালাম। এই নিস্তব্ধ দশাটা থেকে ওঁকে এভাবেই বের করে এনেছি আগে।
“এহ্! এ তো বাচ্চা মেয়ে রে!” তন্ময়দা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন।
চুমকি প্রামাণিকের মুখটা জলে-কাদায় মাখামাখি হয়ে গিয়েছিল। মেদহীন পাতলা গড়ন, শ্যামলা গায়ের রং, জোড়া ভুরু। চোখ আধবোজা, প্রায় শক্ত হয়ে আসা চোখের পাতা হাতের চাপে সরালে, সাদা আইবলের উপর ছোটো ছোটো লাল দাগ দেখা হয়। রক্তজালিকা পাংচার হয়েছে বোঝা যায়। মেয়েটার নাকটা সামান্য চাপা, মুখ হাঁ হয়ে আছে, ঠোঁটে হালকা লালচে রং লেগে, বোধহয় লিপস্টিকের। খুব খেয়াল করে দেখলে গলায় লালচে ছোপের ফিঙ্গার মার্ক দেখা যাচ্ছে। এ বাদে ভিজিবল ইনজুরি আর কিছু চোখে পড়ল না।
“ম্যানুয়াল স্ট্র্যাঙ্গুলেশন, গলা টিপে মেরে দিয়েছে। এমন জলা জায়গা, এতক্ষণ ধরে কাদায় পড়ে আছে বড়ি, ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু…” তন্ময়দা চারিদিক তাকিয়ে চুপ করে গেলেন। আরও ফোর্স এসে পৌঁছেছে। জায়গাটা কর্ডন করা হয়েছে।
“এটা কিন্তু সেকেন্ডারি ক্রাইম সিন। কী করে বুঝলাম বলত?” তন্ময়দা আমার দিকে প্রশ্ন ধরার ভঙ্গিতে বললেন।
“মেয়েটার জামায়, পিঠের দিকে ঘষে যাওয়ার দাগ আছে। সামনের দিকটায় সেরকম কিছু নেই। আর ড্রেসটাও নতুন, ফলে যেটুকু ছিঁড়েছে, ফেটেছে তা বডি টেনে নিয়ে আসার জন্য হয়েছে। পায়ে এক পাটি চটি, আর-এক পার্টি মিসিং। তার মানে সেটা প্রাইমারি ক্রাইম সিন থেকে বডি ট্রান্সফারের সময় কোথাও খুলে পড়ে গেছে। এছাড়াও কনস্টেবল পুকুরের পিছন দিকটায় লাল রঙের একটা স্লিং ব্যাগ পেয়েছে। মেয়েটার মোবাইল পাওয়া গেছে ব্যাগটায়। সেটা বোধহয় বডি ট্রান্সফারের সময় কাঁধ থেকে খুলে পড়ে গিয়েছিল।”
“ব্রাভো। তোর উন্নতি ঠেকায় কে! কিন্তু এর মানে হল চাঁদ, বডিটা যে টেনে এনেছে তার একটা ফুট প্রিন্ট ক্রাইম সিনে পাওয়া যাওয়া উচিত। তোর কি মনে হচ্ছে আর সেটা সম্ভব?”
আমি চারিদিক তাকিয়ে দেখলাম। অন্তত শ-খানেক মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ কর্ডনের পিছনে। লালবাজারের ফোর্স আসার আগে আরও পঞ্চাশ ছিল বলে আমার ধারণা। দেড়শো জনের পায়ের ছাপের থেকে আসামি খুঁজে বের করা স্বপনকুমারেরও অসাধ্য।
প্রশ্নটাকে ডজ করে বললাম, “ইয়ে, বডিটাকে টেনে আনল কোন দিক দিয়ে? সামনের গেট আর পিছনের গেট, দু’দিকেই সিকিউরিটি আছে। যখন চেয়ারে ছিল না, সেই সুযোগে ঢুকেছে?”
তন্ময়দা ঘাড় নাড়িয়ে বলল, “উঁহু। সিসিক্যাম লাগানো। ফুটেজ দেখব যদিও, কিন্তু আমি শিওর কোনও গেট দিয়ে বড়ি ঢোকেনি।”
“তবে?”
“তবেটাই তো খুঁজতে হবে বাপি। প্রথমে ট্রেস করবি কোথা দিয়ে ঢুকেছে, তারপর আশেপাশের লোকজনকে ইন্টারোগেট করবি, একটা না একটা কিছু তো বেরোবেই। গুড লাক!”
“মানে? আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
“কোথায় আবার যাব? তোর পিছনেই আছি, বিষ্ণুর পিছনে যেমন জ্যোতি থাকে। তায় তুই আবার বসু, তোর সঙ্গে জ্যোতি জুড়লে ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বুঝছিস?”
তন্ময়দা কোনও কথা শুনলেন না। ডিসি সাউথকে বলে আমার ঘাড়ে কেসটা গছালেন। রিপোর্টিং করব তন্ময়দাকেই। মানে ব্যাট আমার, ক্যাপ্টেন তন্ময়দা। ম্যাচ জিতলে ট্রফিটা ওঁর হাতেই উঠবে। ময়না তদন্ত হতে হতে পরের দিন দুপুর গড়িয়ে গেল। এই জাতীয় খুনের মামলায় ময়না তদন্তে তদন্তকারী অফিসারের থাকাটাই দস্তুর। তন্ময়দা একবার নাম কা ওয়াস্তে এসে, বুকে পিঠে হাত বুলিয়ে চলে গেলেন। অটোসি সার্জেন জানালেন, শ্বাসরোধ হয়েই মৃত্যু। মুখ আর নাক চেপে ধরা হয়েছিল বলপূর্বক। এটুকু অনুমেয়ই ছিল। ভ্যাজিনাল সোয়াব বলছে যৌন অত্যাচার হয়নি। আরও কিছু ডিটেল আছে রিপোর্টে। সেগুলো কতটা কাজের তন্ময়দার সঙ্গে একবার ডিসকাস করব। কিন্তু হাতে- পায়ে কাটাকুটির কেসটা কী! সারা শরীরে এ ধরনের ক্ষত কি বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে টক্সিক সম্পর্ক থেকে? মাথাটা কেমন একটা ঝাঁ ঝাঁ লাগছিল আমার। ঠিক করলাম জেরা করা দিয়ে শুরু করব। চাপটা কীভাবে ঘনিয়ে আসছে, সেটা তখনও বুঝিনি। বুঝলাম ক’দিন পর।”
