১
বিভাবরীর সামনে কলকাতা পুলিশের গাড়ি নেই। মিডিয়ার ওবি ভ্যান দাঁড়িয়ে, সঙ্গে গলায় আই কার্ড ঝোলানো তিন-চারজন সাংবাদিক। বিভাবরীর গেট ভিতর থেকে তালা দেওয়া। এর অর্থ, মিডিয়ার প্রবেশ নিষেধ করেছেন কর্তৃপক্ষ। একমাত্র বাসিন্দাদের গাড়ি দেখে দেখে ছাড়া হচ্ছে। আমি ইউনিফর্মে নেই, আর আমার মুখ এখানে কেউ চেনে না। মিডিয়া ভাবে আমি ফ্ল্যটের বাসিন্দা। সিকিউরিটি প্রতুল মেন গেটে ছিল। আমাকে দেখে চিনতে পারে। দরজা খুলে দেয়। নিচু গলায় বলে, “ফ্ল্যাটে রেইড হয়েছে আধঘণ্টা হল।” ডি ৩-তে এখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। “গৌরকিশোর দত্ত আছেন নাকি,” প্রশ্নের উত্তরে প্রতুল মাথা নাড়িয়ে বলে, “উনি দিল্লিতে।” “একা মৌলি দত্তকে প্রয়োজন ছিল আমার।” “উনি আছেন, কিন্তু কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই,” প্রতুল বলে ওঠে।
মিডিয়া বাইট নেবে বলে ওঁত পেতে আছে, মিসেস দত্ত কখন নামতে পারেন, প্রতুলকে বার ছয়েক জিজ্ঞেস করেছে। আমি প্রতুলের দিকে তাকাই। ও চোখ নামিয়ে নেয়। পুলিশ আর মিডিয়া এক নয় এবং কে কথা বলবে, কতটা বলবে তা পুলিশ নিজে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম, সেটা ওর মনে পড়ে যায়।
ডি-ব্লকের কাছাকাছি পৌঁছোতেই দিলীপবাবুর সঙ্গে দেখা হয় আমার। ভদ্রলোক হাতে ল্যাপটপব্যাগ নিয়ে অফিসে যাচ্ছিলেন বোধহয়। আমাকে দেখেই থমকে গেলেন।
“আপনি বেরোচ্ছেন? ক’টা কথা ছিল যে?”
ভদ্রলোক মুখে খুব একটা পরিবর্তন আনতে দেন না। কিন্তু ভুরু কুঁচকোনো দেখে বুঝি, ওঁর স্বচ্ছন্দ লাগছে না।
“বেশি সময় নেব না। জাস্ট দু’-একটি প্রশ্ন। আপনার ছাত্রকে নিয়েই।”
দিলীপবাবু নার্ভাসভাবে হাতের ঘড়ি দেখে বলেন, “আসলে রোজই তো ওয়ার্ক ফ্রম হোম করি, দুটো দিন অফিস যেতে হয়। আমার আজ নাইট আছে।”
“কোন দিকটা অফিস আপনার?”
“ওই তো ক্যামাক স্ট্রিট। কেন বলুন তো?” ভদ্রলোক ঘামতে ঘামতে জিজ্ঞাসা করলেন। বিকেলের পড়ন্ত রোদেও পিঠ চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। আমি ওঁকে বললাম, “চলুন লবিতে গিয়ে বসি।”
দিলীপবাবু লবির সোফায় গিয়ে বসেন। আর-একবার হাতের ঘড়ি দেখেন। “ত্রিদীপকে এঁর মধ্যে পড়িয়েছেন আর?”
“হ্যাঁ। কেন বলুন তো?”
“কেন বলুন তো’ বলাটা ভদ্রলোকের মুদ্রাদোষ। দু’মিনিটে দু’বার বলা হয়ে গেছে।
“এখন কেমন আছে ও?”
উনি একটু সংশয়ের ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলেন, “ভালো আছে। এখন বেটার।”
“কান্নাকাটি, জেদ এগুলো করছে?”
“আমার কাছে এসব করে না। আমায় ভালোবাসে।” দিলীপবাবুর গলায় এই প্রথমবার আত্মবিশ্বাসের ছাপ পেলাম।
“আপনিও বাসেন নিশ্চয়ই।”
“খুব।”
“আচ্ছা, ওর যে এই সমস্যাটা, এটা কীভাবে শুরু হয়েছিল জানেন?”
“বাচ্চাদের না বুঝতে পারলে, ওদের মনের কথা কারওর কাছে বলার না থাকলে এরকম হয়, হয় না কি?”
“আপনার মনে হয় ও খুব নিঃসঙ্গ ছিল? তার থেকেই এই বিহেবিয়ারাল ইস্যুজ?”
দিলীপবাবু সরাসরি উত্তর দেন না। হয়তো অন্যের ছেলের প্রসঙ্গে মুখ খুলতে স্বচ্ছন্দ হন না। ল্যাপটপ ব্যাগটার উপর আঙুল ঘযতে থাকেন। ওঁর ব্যবহারে একটা অন্তর্মুখী ব্যাপার আছে। এ ধরনের মানুষ ভালো পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
আমি ওকে জিজ্ঞাসা করি, “টিটো কখনও কোনও ভয়ের কথা বলেছে? কোনও থ্রেট?”
“না। কেন বলুন তো?”
“ও স্কুলে কিছু সমস্যা করেছিল। সেগুলো কী থেকে হচ্ছে আসলে বুঝতে চাইছি।”
“স্কুল কোনও সলিউশন দেয় না ম্যাডাম,” দিলীপবাবু এই প্রথমবার চোখে চোখ মিলিয়ে বলেন, “আরও বাড়িয়ে দেয়। আপনি পঞ্চাশটা বাচ্চা একটা ক্লাসে ভ’রে, প্রত্যেকের কাস্টমাইজড প্যাকেজ চাইবেন, সেটা কখনও হয় না। বাচ্চা তার কাছেই যাবে, যার কাছে রিলিফ পাবে।”
“ও কি বাড়িতে সেই রিলিফ পায় না?” আমি সরাসরি প্রশ্ন করলাম। দিলীপবাবু চোখ সরিয়ে নিলেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
ওঁকে ছেড়ে দিলাম। যাওয়ার আগে আমার পায়ে পা বেঁধে পড়ে যাচ্ছিলেন, নিজেই একশোবার সরি বলে গেটের দিকে এগোলেন।
ডি ৩-এর সামনে পাপোশ উল্টে পড়ে ছিল। মার্বেলের ডোরওয়ের সামনে অনেকগুলো বুটের ছাপ, জায়গাটা নোংরা আর কাদাকাদা। সাঁটিয়ে বন্ধ করা দরজায় বেল বাজালাম। মৌলি দত্ত প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুললেন। আমাকে দেখে স্বাভাবিকভাবেই চরম বিরক্ত হলেন। আধভেজানো দরজা হাতের চাপে পুরো খুলে ধরে বললাম, “ভিতরে চলুন, কিছু প্রশ্ন আছে।”
ফ্ল্যাটের ভিতরটা বিক্ষিপ্ত, সোফায় কুশন ছড়ানো, ক’টা মাটিতে পড়ে। প্রতিটা ঘরের দরজা হাট করে খোলা, বাড়ির প্রাইভেসিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে গেছে এনসিবির টিম। মৌলিদেবী ধূসর সিল্কের শাড়ি, আলুথালু চুল, আর চোখের কোণে ধেবড়ে যাওয়া কাজল নিয়ে আমার সামনে বসলেন।
“সবে একদল বেরিয়েছেন। যা বলার ওদের বলেছি। আপনার কী জিজ্ঞাস্য?”
“প্রমিত আর চুমকির ব্যাপারটা জেনেছেন নিশ্চয়ই?”
“শুনেছি। কিন্তু এটা অসম্ভব। আপনাদের ভুল হচ্ছে।” মৌলি দত্ত জোর গলায় বললেন।
“না।” আমি শান্তভাবে উত্তর দিলাম।
“এটা হতে পারে না। জাস্ট অসম্ভব। আমারই বাড়িতে, আমার কাজের
মেয়ে… এসব নোংরামো বাবাই এটা করতে পারে না… আমি আবার বলছি, আপনাদের ভুল হচ্ছে।”
“বালিগঞ্জ এলাকার ওয়োগুলোয় খোঁজ নিলেই বোঝা যাবে ম্যাডাম।”
মৌলি দত্ত গনগনে চোখে আমার দিকে তাকালেন। আঁচলটা দিয়ে মুখ মুছে অন্যদিকে তাকালেন।
“ছেলে কলেজে ড্রাগ সাপ্লাই দিচ্ছে, কবে থেকে জানতেন?”
“ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতাম না। বাবাই ছোটো থেকেই অবাধ্য, জেদি। কিন্তু ও যে এ ধরনের কাজে জড়িয়েছে, এ আমি বিশ্বাস করি না। আপনারা মিছিমিছি আমার ছেলেকে ফেব্রিকেট করছেন। আমি উকিলের সঙ্গে কথা বলেছি। উনি বলেছেন, প্রমিতকে ছাড়িয়ে আনতে চার-পাঁচ ঘণ্টাও লাগবে না।” মৌলি দত্তের গলাটা আর বিপন্ন শোনাচ্ছিল না। ভদ্রমহিলা ডিফেন্সিভ হয়ে উঠছিলেন।
“ছেলে কবে থেকে ড্রাগস নিচ্ছে?”
“বললামই তো জানি না। জানলে কি ছাড়ানোর চেষ্টা করতাম না?” মৌলি দত্ত ক্ষুব্ধ মুখে বললেন।
“প্রমিতের বিরুদ্ধে কিন্তু সাক্ষী আছে। ওর কলেজের স্টুডেন্টরা ওর কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে ড্রাগস নিত। আপনার ছেলে বেসিকালি একজন ড্রাগ পেডলার ছিল।”
“ওর ঘর সার্চ করে ওঁরা কিছু পায়নি। মাঝখান থেকে ল্যাপটপটা কেন উঠিয়ে নিয়ে গেছে বুঝলাম না। আপনারা যদি হ্যারাসমেন্টের উদ্দেশ্যে আমার ছেলেকে উঠিয়ে থাকেন, খুব ভুল করছেন।”
“ভুল আপনিও করছেন ম্যাডাম। নারকোটিক্স নিয়ে ইন্ডিয়ান পেনাল কোড বেশ স্ট্রিক্ট। তাছাড়া চুমকি খুন হয়েছে, সেটা আপনি ভুলে যাচ্ছেন।”
“ইমপসিবল। আমার ছেলে খুনের কিছুই জানে না। তাছাড়া ও সেদিন সারারাত বাড়িতে ছিল না। এই তল্লাটেই ছিল না ইনফ্যাক্ট।”
“কোথায় ছিল?”
“কসবাতে। ওর এক বন্ধুর বাড়ি।”
“কসবা থেকে বালিগঞ্জ আর কতটুকু?”
“মানে! আপনারা কি চুমকি খুনের চার্জ আমার ছেলের উপর দেবেন? চুমকির খুনের সঙ্গে ওর যোগ নেই কোনও।”
“সেটা প্রমাণসাপেক্ষ। প্রমিতকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দফায় দফায় জেরা হবে। জেরায় নিজের অপরাধ কবুল করতে ও বাধ্য।”
“বাধ্য! আপনারা কি থার্ড ডিগ্রি দেবেন নাকি লকআপে?” মৌলি আতঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
“প্রমিত আর চুমকির ব্যাপারটা সাগর কতটা জানত?” আমি ওঁর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করি।
“কী আশ্চর্য! আমি নিজেই জানতাম না, অন্য কে কী জানত কী করে জানব।”
“একটু চোখ কান খোলা রাখলেই পারতেন।”
“জাজ করার আপনি কে? সংসার, বুটিক, দুই ছেলের পড়াশুনা সব সামলেছি একা হাতে। প্রমিতের রেজাল্ট দেখুন। হি ইজ ব্রাইট। টিটো উইল অলসো মেক আস প্রাউড। এই যে হ্যারাসমেন্ট আপনারা করলেন…” মৌলি কঠিন মুখে উত্তর দিলেন।
“টিটো অসুস্থ?” আমি মৌলিকে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করি।
“ইন জেনারেল অসুস্থতা। বাচ্চাদের কত কিছু হয়।”
“টিটোর কী হয়েছে?”
মৌলির চোখেমুখে অস্বস্তির ছাপ পড়ল। আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “কী হবে?”
“ওর স্কুলে গিয়েছিলাম। ওর কাউন্সেলর অন্য কথা বলছেন।”
“আপনি কেন আমার ছেলের ব্যাপারে এরকম খোঁজখবর নিয়ে বেড়াচ্ছেন?”
“কারণ আপনাদের থেকে সহযোগিতা পাচ্ছি না। অথচ বুঝতে পারছি ওর কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে।”
“কলকাতা শহরের প্রতিটা বাড়ির প্রতিটা বাচ্চার সমস্যায় কবে থেকে পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নাক গলাচ্ছে?” মৌলি তিক্ত হেসে আমার দিকে তাকালেন।
“যে বাড়ির পরিচারিকা খুন হয়েছে, যার সঙ্গে বাচ্চাটার দাদার অ্যাবিউজিভ সম্পর্ক ছিল, সেই বাড়ির বাচ্চাদের মানসিক অবস্থা নিয়ে পুলিশ খোঁজখবর করবেই।”
“কী আশ্চর্য! আপনারা সবেতেই রহস্য খুঁজছেন নাকি? অনেক বাচ্চার চাইল্ডহুড ডিস্টার্বড থাকে, স্কুলে অ্যাডজাস্ট করতে অসুবিধা হয়, ডিসিপ্লিন ব্যাপারটা রপ্ত করতে সমস্যা হয়।”
“ওর সমস্যাটা কী ধরনের?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
“আপনি তো কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলেছেন?”
“বলেছি। কিন্তু সমস্যা কেন হচ্ছে সেটা মা হিসেবে আপনি বেশি ভালো বলতে পারবেন।”
“এ-বয়সের বাচ্চারা এমন জেদি হয়, মুড সুইং হয়।”
“আপনি সাইকায়াট্রিস্ট দেখিয়েছিলেন?”
“নাহ্।” মৌলি দত্ত দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে বললেন।
“কেন?”
উনি কোনও উত্তর দিলেন না। আমি আবার প্রশ্ন করলাম, “মিসেস দত্ত, টিটোর সমস্যাটা মানসিক। আপনি ডাক্তার দেখাননি কেন?”
“মানসিক সমস্যা নেই আমার ছেলের। হি ইজ অ্যাবসোলুটলি নর্মাল। একটু জেদ আছে। একটু ভায়োলেন্ট হয়ে যায়, তার জন্য সাইকায়াট্রিস্ট দেখাব কেন? এগুলো বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হয়ে যায়।” মৌলি দত্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, “কই আপনি তো স্কুলের বিরুদ্ধে কিছু বলছেন না? ওই বাচ্চাটা, কী যেন নাম, শুভদীপ, কন্টিনিউয়াস টিটোকে টিজ করে গেছে। স্কুল কী ব্যবস্থা নিয়েছে ওর বিরুদ্ধে?”
“স্কুলেরটা স্কুল বুঝবে। পুলিশ শুধু ক্রাইম সিনেই ইন্টারফেয়ার করে। তা আপনার হাজব্যান্ডও কি একইরকম চিন্তাভাবনা করেন?”
“অবশ্যই। আমরা দু’জন একদম স্বাভাবিক। আমাদের কারওর বংশে কোনও পাগলামির লক্ষণ নেই কারওর। খামোকা স্কুল বললেই মেনে নিতে হবে, ছেলের মানসিক সমস্যা আছে, ছেলে পাগল?” মৌলির মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল।
আমার বিচিত্র অনুভূতি হচ্ছিল। দু’হাজার পঁচিশে দাঁড়িয়ে একটি ট্রমাটাইজড ছেলের বাবা-মা ভাবছে, ট্রমার চিকিৎসা করানোটা পারিবারিক স্টেটাসের অপমান! হয়তো ট্রমার চিকিৎসা হিসেবে বকাবকি করাটাকেই স্বাভাবিক চিকিৎসা ধরে নিয়েছেন। চমৎকার ব্যাপার।
“চুমকির একটি ভাই ছিল প্লাবন, দেড় বছর আগে সে নিখোঁজ হয়ে যায়। এই ব্যাপারে জানেন কিছু?” আমি রাগ সংযত করে বললাম।
মৌলি ভুরু কুঁচকে বললেন, “কই না! তবে টিটোকে চুমকি নিজের ভাইয়ের মতো দেখত, এ কথা আমাকে অনেকবার বলেছে। আদিখ্যেতা লাগলেও, আমি তো ওকে একপ্রকার বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম। সেই মেয়েই তলে তলে এত নীচ, টাকার জন্য বাবাইকে এভাবে ফাঁসাবে কী করে জানব?”
আমি মৌলি দত্তের মুখের দিকে তাকালাম। আমার পেশা আমাকে পৃথিবীর যাবতীয় বিস্ময়ের বিপক্ষে অনাক্রম্যতা গড়ে তুলতে শেখায়। কিন্তু মানুষের নৃশংসতা, তার অসংবেদনশীলতা আমাকে কোনওদিন কি বিস্মিত করা বন্ধ করবে? মনে হয়, না। আমি মিসেস দত্তের দিকে তাকিয়ে বললাম, “টিটোর কাছে একটা স্পাইডারম্যানের মুখোশ আছে, জানেন?”
“তা আর জানব না! সেই নিয়েই তো সেদিন কত নাটক হল।”
“কীরকম নাটক!”
“চুমকি মুখোশটা টিটোর বিছানার তলা থেকে কুড়িয়ে এনেছিল। টিটোকে নাকি সারাদিন ধরে জিজ্ঞেস করেছে, এই মুখোশ কে দিয়েছে? ও বলতে চায়নি। আমি বাড়ি এলে আমাকে বলল, জিজ্ঞেস করতে। টিটো আমাকেও কিছু বলেনি। সামান্য একটা মুখোশ, হয়তো স্কুল থেকে কেউ দিয়ে থাকবে… আমি চুমকিকে বলেছিলাম, এটা নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছিস কেন… ও কোনও উত্তর দেয়নি। গোঁজ মেরে ছিল। বারবার বলছিল, টিটোকে যেন জিজ্ঞেস করি। শেষে আমার হাজব্যান্ড এসে বকাবকি করায় ক্ষান্ত দেয়।”
“এটা কতদিন আগের কথা?”
“হবে, ওর খুন হওয়ার চার-পাঁচ দিন আগের। কেন বলুন তো?”
“মুখোশটা এখন কোথায়?”
“তা জানি না।। সেদিনের পর আর দেখিনি।”
“টিটোকে একবার ডাকুন। ওর সঙ্গে কথা বলব।”
“অসম্ভব। আপনি আগের দিন ওকে আতঙ্কিত করে ফেলেছিলেন।”
“আজ করব না। কথা দিচ্ছি।”
“আপনার কথায় বিশ্বাস করব কীভাবে?”
“বিশ্বাস করতে হবে না। আপনি টিটোকে দেখা করতে না দিলে আমি বাধ্য হব অন্য ব্যবস্থা নিতে। তখন আপনিও বাধ্য হবেন।”
মৌলি দত্ত থতমত খেয়ে ভিতরে চলে গেলেন। পকেট থেকে ফোন বের করে মেসেজ চেক করলাম। বিজন লিখে পাঠিয়েছেন, স্মার্ট ওয়াচটার সব তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে, ফলে কোন ফোনের সঙ্গে পেয়ার্ড ছিল বলা সম্ভব নয়। আরও কিছু পাওয়া যায় নাকি চেষ্টা চলছে। আমার মোবাইলের ডেটা ফুরিয়েছিল। বিজন কানাইয়ের স্টেটমেন্টের একটা ট্রান্সক্রিপ্ট পাঠিয়েছেন। ডাউনলোড হচ্ছিল না। সেটা পরে দেখলেও চলত। কিন্তু রিচার্জ করা প্রয়োজন। ওয়াইফাই খুলে দেখি অ্যাভেলেবল নেটওয়ার্কে জিডি ২, শিপিশবয় ১৯৮৯, জেলিফিশ ১০১ ইত্যাদি দেখাচ্ছে। এর মধ্যে কোনওটা নিশ্চয়ই দত্তবাড়ির হবে।
মৌলি দত্ত টিটোর হাত ধরে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ওর থেকে ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড নিয়ে নেট রিচার্জ করালাম। মহিলা বিরক্ত হলেও অসম্মত হলেন না। টিটো সামনে একটা সোফার উপর বসে ছিল। আজ ওকে অপেক্ষাকৃত শান্ত লাগছিল। দিলীপবাবু ঠিক বলেছিলেন।
“তুমি কী খেতে ভালোবাসো টিটো?” আমি নরম গলায় প্রশ্ন করলাম। ও আমার প্রশ্নটা শুনল। কিছুক্ষণ পরে উত্তর এল, “বিরিয়ানি।”
“আমারও বিরিয়ানি ভালো লাগে। কোনটা বেশি পছন্দ, চিকেন না মাটন?”
“মাটন।” টিটো সোফার সুতো খুঁটতে খুঁটতে বলল।
“গুড। বিরিয়ানি খেলে আমার দারুণ ঘুম হয়। তোমারও হয় নিশ্চয়ই?”
টিটো সুতো খুঁটতে থাকল। উত্তর দিল না।
“আমাকে বোধহয় তোমার ঠিক বন্ধুর মতো লাগে না, তাই না? তাই কথা বলছ না?”
“বন্ধুরা এত প্রশ্ন করে না।” ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল।
“প্রশ্ন না করলে তোমায় জানব কী করে?”
টিটো আমার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। আমি সামনের দিকে ঝুঁকে বললাম, “বেশ। উল্টোটা করি এসো। তুমি আমায় প্রশ্ন করো।”
“তোমার বাড়ি কোথায়?” ও কিছুক্ষণ পরে আমাকে জিজ্ঞাসা করল।
“কলকাতাতেই। তবে এখন পুরুলিয়ায় থাকি।”
“কলকাতাতে ফিরে এসেছ কেন?”
“তোমার বন্ধু হতে চাই বলে।”
কেন!” ও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল।
“আমি যখন ছোটো ছিলাম, তখন আমার কথা কেউ বুঝতে চাইত না। বড়ো হয়েও কেউ বোঝে না। আমার মনে হয়, তুমি আমায় বুঝবে।”
টিটো আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “কোন কথা কেউ বোঝে না?”
“এই যেমন রাতে আমি খারাপ স্বপ্ন দেখি, ভয় লাগে। সকালে কাউকে সে-সব বললে বিশ্বাস করে না। তুমি খারাপ স্বপ্ন দ্যাখো?
টিটো ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল।
“ভয়ও পাই।”
“ভয় পেলে কী করো?”
“নিজেকে ঢেকে নিই।”
“কীরমভাবে? চাদর দিয়ে?”
“নাহ্। আমার একটা মুখোশ আছে। সেটা পরে নিলে আমি স্ট্রং হয়ে যাই।”
“স্পাইডারম্যানের মুখোশ?”
“হ্যাঁ।” টিটো উপরনীচে ঘাড় নাড়াল।
“কে দিল তোমায় মুখোশটা?”
“বলতে নেই। বললে মুখোশ মুখের উপর চেপে বসে। তুমি কষ্টে দম বন্ধ হয়ে মরেও যেতে পারো।”
“এসব তোমায় কে বলেছে টিটো?”
“স্পাইডারম্যান জানে। ও সবাইকে বলে যায়।”
“তুমি স্পাইডারম্যানকে সত্যি সত্যি দেখেছ টিটো? আমায় দেখাবে?”
“স্পাইডারম্যানকে কেউ দেখেনি।” টিটো প্রায় যান্ত্রিক স্বরে বলে, “শুধু ওর মুখোশটাই সবাই দেখেছে।”
“বেশ তো। মুখোশটাই দাও। দেখি।”
“মুখোশটা চেয়ো না। দুষ্টু লোকে ধরবে।”
“তোমায় ধরেছিল বুঝি?”
টিটো আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল। ফিসফিস করে বলল, “চুমকিদিদিকে ধরেছিল তো। আর বাড়ি ফিরতে পারেনি। দম বন্ধ হয়ে মুখের উপর চেপে বসেছিল। মুখোশের কথা কাউকে বোলো না।”
মৌলি দত্তের দরজায় বেল বাজছিল। আমার কাজ শেষ হয়েছিল। দরজায় একটি যুবক দাঁড়িয়েছিল। মৌলি দত্ত তাকে বললেন, “আজ হবে না চন্দন। পরে কল কোরো।”
যুবক আমার সঙ্গেই লিফটে নামলেন। নমস্কার করে হেসে বলল, “আমার নাম চন্দন দাশ। আপনারা বোধহয় চুমকির খুনের তদন্ত করছেন?”
প্রতিনমস্কার করে বললাম, “হ্যাঁ। আপনার কথা খুব শুনেছি। সেদিন আপনার বন্ধুর অটোতে চেপে থানা অবধি গিয়েছিলাম।”
চন্দন লজ্জা পেলেন। লোকটা সুপুরুষ, দেখে মনে হয় পেটে বিদ্যা আছে। কিন্তু চেহারার মধ্যে একটা ক্লান্ত ভাব, পরনের জামাকাপড়ে অযত্নের ছাপ। ডান হাতে নাইলনের ব্যাগটা ঝুলিয়ে উনি বললেন, “চুমকির সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। ওর ভাই কিছুদিন আমার সংস্থায় আসাযাওয়া করেছে।”
“হ্যাঁ। শুনেছি। প্লাবনকে খোঁজার সময় ওকে খুব সাহায্য করেছেন। আমি এমনিতেও যেতাম আপনার কাছে। ভালো হল দেখা হয়ে গেল।”
চন্দন আমার দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসেন। আমি ওর ব্যাগের লোগোটা দেখিয়ে বলি, “এনজিও?”
চন্দন জিভ কেটে বলেন, “না, না ম্যাডাম। কোনও অনুদান-টান পাই না। রেজিস্ট্রেশন করিয়েছি সবে গত বছর। আমিও বস্তিরই ছেলে ছিলাম। এখন একটা ট্র্যাভেল এজেন্সিতে মার্কেটিংয়ের কাজ করি। আর সঙ্গে সংস্থাটা চালাই।”
“অনুদান পান না, চলে কী করে?”
“চেয়ে-চিন্তে। দত্তবাবু যেমন ফ্রিতে ওষুধ দেন, বিভাবরীর আরও অনেকেই অনেক হেল্প করেন। আশেপাশের ফ্ল্যাটের লোকেরাও যতটা সম্ভব করেন। পুলিশ ভেহিলের স্যাররা, ঢাকুরিয়ার ব্যাংক অফিসার কলোনি, কয়েকজন স্কুল টিচার প্রতি মাসে সাহায্য করেন। চলে যায়।”
“অফিসটা কোথায় আপনার?”
“অফিস আর কী। ওই একটা পুরোনো বাড়ির একটা অংশে। তিনের এক সদানন্দ রোড। একদিন আসুন না, খুব ভালো লাগবে আমার।” চন্দন হাত জোড় করে বলেন। আমি প্লাবনের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে ওর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা
করি। ছবির ব্যাপারে জানতে চাই। চন্দন বলেন, চুমকিকে বহু বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। একটা ছবির ভিত্তিতে এত বড়ো দেশ থেকে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। চুমকি শোনেনি। প্লাবনকে নিয়ে একটা অবসেশন কাজ করছিল ওর মধ্যে।
যাওয়ার আগে চন্দন স্বগতোক্তি করেন, “এই দেশে কেউ ইচ্ছে করে হারিয়ে গেলে তাকে পাওয়া মুশকিল ম্যাডাম। অসম্ভবও।”
.
গড়িয়াহাটের মোড়ে গিয়ে দাঁড়ালে ছোটোবেলার একটা জিঙ্গল মনে পড়ে। ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলির বিজ্ঞাপনটা এই সেদিনও এফএম-এ বাজতে শুনেছি। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল। বিজন অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। ক্যাম্পারিতে দুটো রোল সাঁটিয়ে দু’জনে যখন বেরোলাম, তখন গড়িয়াহাট ফুটপাথে মানুষের ঢল নেমেছে।
“জোন্সটাউনের কেসটা জানেন?” বিজনকে জিজ্ঞাসা করলাম।
“অ্যাঁ?”
বিজন খুঁজে খুঁজে একটা শরবতের দোকান বের করেছেন। শরবত নাকি তরল ডেজার্ট। রোলের পর পান করা অবশ্যকর্তব্য। আমার হাতে একটা জলজিরা ধরিয়ে দিয়েছিলেন। নিজে জলজিরা খান না। স্প্রাইট খাচ্ছিলেন।
“জোন্সটাউন, গুইয়ানা? প্রিস্ট জিম জোন্স?” আমি আবার বললাম।
বিজন উৎফুল্ল ছিলেন। প্রমিত ধরা পড়ায় ওঁকে অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছিল। কোল্ড ড্রিংক গলায় ঢক করে ঢেলে বললেন, “উমম… কিছুটা জানি… ১৯৭৮ সালের ঘটনা, জিম জোন্স স্বঘোষিত অ্যান্টিরেসিস্ট, স্পিরিচুয়াল হিলার, পেশায় পাদরি। এক বিরাট সংখ্যক অনুগামীদের নিয়ে গুইয়ানার গভীর এক জঙ্গলে জোন্সটাউন গড়ে তোলেন। অদ্ভুত একটা সোশ্যালিস্ট ইউটোপিয়ার কথা বলতেন। নশো জন মতো অনুগামী ছিলেন। কিন্তু এর প্রায় বছর তিনেক পর, আমেরিকান কংগ্রেসের কাছে জোন্সটাউন সম্পর্কে নানা অভিযোগ এসে পৌঁছোয়। সিরিয়াস সব অভিযোগ। অনুগামীদের বন্দি করে রাখা, শারীরিক নিগ্রহ করা, শ্রমদানে রাজি না হলে পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, বাচ্চাদের উপর নিগ্রহ ইত্যাদি। তদন্ত করতে যান চারজন কংগ্রেস মেম্বার, ফেরার পথে চারজনেই খুন হন। কিন্তু পুলিশের কাছে শকটা আসে পরের দিন। ওঁকে গ্রেফতার করতে গিয়ে জোন্সটাউনে পৌঁছে দেখেন, নশো জনের লাশ গোটা টাউনশিপ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। যার মধ্যে ওয়ান-থার্ড শিশু। বীভৎস ব্যাপার।”
“হু। শিশুদের আবার তাদের বাবা-মায়েরাই ফলের রসে সায়ানাইড মিশিয়ে খাইয়েছিল। জোন্স নাকি ওর অনুগামীদের কনভিন্স করিয়েছিল যে, গোটা বিশ্ব ওদের আইডিয়োলজির বিরুদ্ধে ঘোর চক্রান্ত করছে। এবং চারজনকে হত্যার পর, ওদেরকে এই চক্রান্তকারীদের হাতে চরম নিগৃহীত হতে হবে। অপমানিত হতে হবে। আদর্শকে ভূলুণ্ঠিত হতে হবে। তার চেয়ে ভালো আত্মহত্যা করে মরে যাওয়া!’
“কী অদ্ভুত না?” বিজন গোঁফের উপর লেগে থাকা কোল্ড ড্রিংক মুছে বললেন।
“শুধু অদ্ভুত নয়, ভয়ংকর!” আমি জলজিরার গ্লাস নামিয়ে বললাম।
“কিন্তু আপনি হঠাৎ জোন্সটাউন নিয়ে পড়লেন কেন? নেটফ্লিক্সে ডকুমেন্টারি দেখলেন নাকি?”
“ধুর না। আমি ভাবছি অন্য কথা। জিম জোন্সের কতটা মাইন্ড কন্ট্রোল ক্ষমতা ছিল যে, নশো জনের নিখুঁত ব্রেনওয়াশ করতে পেরেছিল। শোনা যায়, জোন্সটাউন নাকি একটা কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের চেয়ে কোনও অংশে কম ছিল না, তাও লোকগুলো একটা প্রতিবাদও করেনি!”
“সেটা হয়, অরওয়েলের ১৯৮৪ পড়েননি? ঠিকঠাক পাসে হাত দিলে আপনি মানুষকে কাঠপুতুলের মতো ব্যবহার করতে পারেন। বাধ্য, নিশ্চুপ, আজ্ঞাবহ। সমস্ত অ্যাবিউজার, যারা দীর্ঘদিন ধরে অ্যাবিউজ করে চলে, তারা কিন্তু এই পাল্সটা নিখুঁতভাবে বোঝে। ম্যানিপুলেট করতে পারে।”
আমি বিজনের দিকে তাকালাম। ওঁর চশমার ফ্রেমের ওপারে দুটো বুদ্ধিদীপ্ত আর চিন্তাশীল চোখ আছে। সেটা পুলিশ প্রসিডিওরের পাটিগণিতের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেয়। বিজন দাঁত বের করে হেসে বললেন, “আরে এত কী
ভাবছেন বলুন তো? আপনার ব্রেনওয়াশ করার কে দুঃসাহস দেখাল?”
“আমি ভাবছি একটা বাচ্চাকে ঠিক কীভাবে বাধ্য, নিশ্চুপ, আজ্ঞাবহ, ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলা যায়? হাউ টু ম্যানিপুলেট আ কিড?”
“আপনি কি টিটোর কথা ভাবছেন?” বিজন জিজ্ঞাসা করলেন।
“হ্যাঁ।” আমি অন্যমনস্কভাবে বললাম।
“বেকার ভাবছেন। শুনুন শুনতে খারাপ লাগলেও, এটা পুরো পরের ছেলে পরমানন্দ কেস। ওই যার বাপ-মা’র কন্ডিশন, সে-বাড়িতে ম্যানিপুলেট হচ্ছে না কী করে জানলেন? একটা দমবাঁধা পরিবেশে বড়ো হচ্ছে। ওসব তো হবেই। তারপরে ধরুন, ওর দাদা, সে তো বিষমাল। বয়সে অত বড়ো। সে কী ধরনের ট্রিটমেন্ট দিত বাচ্চাটাকে, খিস্তিখামারি, ধমকটমক…”
“কিন্তু ওর কিছু শারীরিক সমস্যাও হচ্ছে। পটি করে ফেলা, ভায়োলেন্ট হয়ে যাওয়া…”
“মানসিক থেকেই তো শারীরিক হয়।”
“চুমকির মৃত্যুর সঙ্গে ওর এই আচরণের কোনও সম্পর্ক নেই বলছেন?”
বিজন একটু সংশয় নিয়ে তাকালেন। বললেন, “আমার তো মনে হয় নেই। প্রমিত, চুমকিকে নিয়ে যা করেছে সব ফ্ল্যাটের বাইরে। আলাদা করে সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স দেখার কোনও সুযোগ পেয়েছে কি বাচ্চাটা?”
“সেটাই ভাবাচ্ছে। আসলে সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ ব্যাপারটা বাচ্চারা একেবারেই নিতে পারে না। উইথড্রন হয়ে যায়। টিটো যেমন হচ্ছে।”
বিজন শরবতওয়ালাকে ইউপিআই করে বললেন, “এসব ছাড়ুন। প্রমিতকে কাল থেকে জেরা করতে হবে। সেদিন রাতে ওর একটা ঠেকের কথা জানতে পারছি।”
“হ্যাঁ। কসবায়। ওর মা বলছিলেন।”
“কসবায় গিয়েছিল রাত আটটায়। তারপর বলছে, সারারাত ওখানেই ছিল। রেভ পার্টি। সব পাড় মাতাল আর নেশাখোর। ওখান থেকে বেরিয়ে আসা কোনও ব্যাপারই না। খুন টুন করে আবার টুক করে ঢুকে গেছে, কেউ খেয়ালও করেনি।”
“টাওয়ার লোকেশন ম্যাচ করছে কি?”
“না করলেও করিয়ে নেব। ওই মালকে এমন ফাসান ফাঁসাব, যেন যাবজ্জীবন পায়।”
বিজন কসবার দিকে চলে গেলেন। পকেটে মোবাইল বাজছিল। বের করে দেখি, গ্যাড়ার ফোন। ফোন তুলতে ঘড়ঘড়ে গলায় সেলাম ঠুকল। বলল, একঘণ্টার মধ্যে বাঘাযতীন পোস্টাপিসের কাছে আসতে পারবেন? সলিড খবর আছে।” খুকখুক করে কেশে বলল, “হাজার তিনেক লাগবে কিন্তু। খাস লোকের মুখে শুনবেন।”
“তিন হাজার!”
“আরে এসব রিস্কের কাজ। বোঝেন না কেন? যে রিস্ক নেবে তাকে তো মালের খরচটা দিতে হবে।”
“লোকটা কে?”
“আরে আসুন তো আগে।”
গ্যাড়ার চেহারাটা মনে পড়ে একটা দ্বিধা হল। ফেক সোর্সের কাছে আকামের খবর নিয়ে টাকাপয়সা নষ্ট করার ইচ্ছা নেই। কিন্তু উপায়ও নেই। “জয় বাবা কৃষ্ণমোহন” বলে যাব ঠিক করলাম। বাঘাযতীন খুব একটা দূরে নয়। ঘড়িতে সন্ধে সাতটা। বিজনকে একটা মেসেজ ছেড়ে, অটোয় চেপে বসলাম।
বাঘাযতীন মোড় থেকে অনেকটা ভিতরে পোস্টাপিস। কৃষ্ণকালী মন্দিরের গলিতে। পাড়ায় ঢুকতেই বিরাট পুকুর। দরমা বেড়া ঘেরা বাড়ির পাশে রাজসাই ফ্ল্যাট। কোনও এক একতলা ঠাঁই থেকে ৯২.৭ এফএম-এ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান ভেসে আসছে— ‘এ শুধু গানের দিন, এ লগন গান শোনাবার।’ হাওয়া নেই, কৃষ্ণচূড়া গাছের পাতাও নিথর। পুকুরের জলে ক’জন সাঁতার কাটছিল। পোস্টাপিস একটা কানা গলির মধ্যে। দেওয়ালে অনেক গণ-কনভেনশনের ডাক। লাল আর কালো কালিতে ছাপানো পোস্টার মারা। বন্ধ জানালার
কপাটের কাছে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে গ্যাড়ার বেঁটেখাটো চেহারাটা অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এল।
“টাকা এনেছেন তো? টাকা ছাড়া মুখ খুলবে না।” চাপা স্বরে ও বলল।
“আরে মালটা কে? খালি টাকার কথাই বলছ!”
“কাটাপুকুর মর্গের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডোম।”
“ডোমেরও অ্যাসিস্ট্যান্ট পোস্ট আছে?”
গ্যাড়া খুকখুক হেসে বলল, “নয়তো কী? আপনি নতুন তো শহরে। কি জানেন না। এরা টাকা নেয় মুখ খোলার জন্য। হেড ডোম টাকা নেয় মুখ বন্ধ রাখার জন্য।”
গ্যাড়া একটা ইট-বাঁধানো রাস্তা ধরে পুকুরপাড় দিয়ে নিয়ে গেল। একটা বেঢপ দোতলা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। একটা ছোটো লোহার আদ্যিকালের গেট। একতলার দরজা জানালা বন্ধ। দোতলার অসমাপ্ত চিলেকোঠায় একটা বাল্ব ঝুলছে।
গ্যাড়া গেট ঠেলে ঢুকে জানালায় ঠক ঠক করল। জানালা খুলে গিয়ে একটা প্যাসেজ দৃশ্যমান হল। ভিতরে লাইট জ্বলছে। উঁকি দিয়ে একটা মুখ আমাদের দেখে দরজা খুলে দিল। কাঠের পাল্লায় আদ্যিকালের শেকল লাগানো। রংচটা দেওয়াল পেরিয়ে ঘরে ঢুকে এলইডির আলোতে লোকটার চেহারা দেখলাম।
“আমার নাম নীতিশ। কেষ্টদা বললে চিনবেন।” লোকটা সিড়িঙ্গে চেহারা
নিয়ে একটা টুলের উপর জড়োসড়ো হয়ে বসে বলল, “বিকম পাশ দিয়েছিলাম। পেটের দায়ে ডোমের কাজ করি। পার্মানেন্ট কিছু না। হেড ডোম একা যখন কেটে কুল করতে পারে না, তখন আমায় ডাকে।”
“আপনি একাই ওখানে অ্যাসিটেন্ট?”
“না। আরও দু’জন আছে।” লোকটা আলোর বিপরীতে বসেছিল। মুখের অভিব্যক্তি বোঝা যাচ্ছিল না।
“খবর বলো।” গ্যাড়া পাশ থেকে তাড়া দিল।
“চার মাস আগে একটা বডি এসেছিল। আট বছরের মেয়ে। গায়ে অনেক সিগারেটের ছ্যাঁকা। সারা গায়ে কামড়ানোর দাগ। বাঙুরে ভর্তি ছিল। অপারেশন হয়েছিল। টসকে গেলে আমাদের মর্গে পুলিশ নিয়ে আসে।”
“কোন থানা?”
নীতিশ গাড়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “মেয়েটার বাড়ি ঢাকুরিয়া স্টেশনের বস্তিতে। মর্গে অবশ্য পুলিশ নিয়ে এসেছিল। বাড়ির লোক কাউকে দেখিনি।”
“তারপর?”
“মেয়েটার যোনিটা চেরা ছিল। মেশিনের বল ভেঙে ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তিনদিন কোমায় ছিল। তারপর আর টানতে পারেনি।”
“মেশিনের বল!”
নীতিশ আমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে বলল, “হ্যাঁ, মেয়েদের শরীরের ভিতর ঢোকায়। তৃপ্তির জন্য।”
“ভাইব্রেটর!”
“হ্যাঁ। ওটার মাথাটা বলের মতো। সেটা ভেঙে যোনির মধ্যে…”
“নাহ্!” আমার গলা দিয়ে আর্তস্বর বেরিয়ে এল, নিজেই বুঝলাম।
“কে করেছে জিজ্ঞেস করবেন না ম্যাডাম, আমি সত্যিই জানি না।” নীতিশ ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, “মেয়েটার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট সব নরমাল করে দেওয়া হয়। হেড ডোম নিজে অটোপসির ডাক্তারকে দিয়ে সই করিয়েছে। আমাদের হাজার টাকা করে দিয়েছিল মুখ বন্ধ রাখার জন্য। বলেছিল, মুখ খুললে সারাজীবনের মতো আর কাজ পাব না, প্লাস থানাও পিছনে পড়ে যাবে।”
“আপনার ছবিটাও বস্তির বাচ্চার কিনা! ভাবলাম যদি লিড পান। ঢাকুরিয়া, পেয়ারাবাগান, মুকুন্দপুর, এসব বস্তিতে এরকম আকছার হচ্ছে মেডাম।” গ্যাঁড়া দার্শনিকের মতো হাসল।
নীতিশের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুকুরপাড়ের দিকে এগোলাম। গ্যাঁড়া পাশাপাশি হাঁটছিল।
“প্লাবনকে নিয়ে স্পেসিফিক ইনফরমেশন পেলে কিছু?” আমি গাড়াকে জিজ্ঞাসা করলাম। ও শুনতে পেল। উত্তর দিল না। বিড়ি ধরিয়ে বলল, “টানবেন নাকি একটা? কড়া আছে। উইসের মতো শৌখিন নয়।”
“দাও।” আমি হাত বাড়িয়ে বিড়ি চেয়ে নিলাম। গ্যাড়া দেশলাই জ্বালিয়ে ধরিয়ে দিল।
“আপনার বাচ্চাটার ছবি দেখেছি। খোঁজখবর নিচ্ছি। শুনছি বাচ্চাটার টাকাপয়সা জিনিসপত্রের দিকে হাতটান ছিল। এসব কেস জলদি পটে যায়। মাথায় হাত বুলোলেই সুরসুর করে চলে আসে।”
“মানে? কোথায় যায়?”
“বাচ্চাটার বাপ-মা ছিল?” গ্যাড়া উল্টে প্রশ্ন করল।
“না।”
“তবে তো পোয়া বারো।”
“কী বলছ পরিষ্কার করে বলো।”
“ছেলে বাচ্চাদের এসব কেসে হাই ডিমান্ড মেডাম। কচিগুলোর গাঁড় মারার আলাদাই টাকা নেয় দালাল। প্লাস, ছেলেগুলো মুখ খোলে সবচেয়ে কম, সবচেয়ে বেশি লজ্জা পায়। মর্দকো দর্দ নেহি হোতা হ্যায় না? খোঁজ নেবেন, প্ল্যাটফর্মে, ঝুপড়িতে ক’টা ছেলে-বাচ্চা ভোররাতে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঘরে ফেরে। এক-একটা কাস্টমার তো সারা রাতে দু’বার, চারবার…
আমার কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছিল। গ্যাড়াকে বললাম, “এই বাচ্চা মেয়েটার কে অমন হাল করল জানা যাবে না?”
“মুশকিল আছে মেডাম। তার নাম অ্যাদ্দিনে নিশ্চয়ই পুলিশ রেকর্ড থেকে ভ্যানিশ করেছে টাকা খাইয়ে। ভালো ছড়িয়েছে। না হলে এতগুলো লোককে চুপ করাল কীভাবে?”
“মা-বাপকেও?”
গ্যাড়া খুক খুক করে হেসে বলল, “আপনি এখনও ভদ্দরলোক আছেন মেডাম। মিলিয়ে নেবেন, মেয়েটাকে জেনেবুঝেই ওর বাপ-মা এসব লোকের কাছে পাঠিয়েছিল। বাচ্চা মরে গেছে, চোখের জলের নাটক করে, দালালের কাছে আর-এক কিস্তি টাকা নিয়েছে। দালাল আবার সেটা কাস্টমারের থেকে ঝেপে পুষিয়ে নিয়েছে।”
“নাহ্!”
“এসব বহুদিন ধরে দেখছি মেডাম,” গ্যাড়া একমুখ ধোঁয়া ছাড়ল, তারপর ধীরে ধীরে বলল, “পোথম পোথম ভাবতাম শালা, শকুনের বাচ্চাকেও শকুন এচ্চেয়ে বেশি আগলে রাখে। কিন্তু প্ল্যাটফর্মের গুমটিতে, রেললাইনের ধারে ঝুপড়িতে অনেক মানুষের বাচ্চাকে এক-দুশো টাকার জন্য মুখে ললিপপ নিতে দেখেছি। বাবা- মায়েরাই অনেকসময় লোক ঢুকিয়েছে। বাচ্চাদের দিয়ে সুবিধে। শালা অদ্দেকে বুঝতেই পারে না, কী হচ্চে। তারপর পেট বাঁধানোর রিক্স নেই। যেগুলো সহ্য কত্তে পারে না, সেগুলো ফেঁসে যায়। তাতে কী? বছর বছর বাচ্চা বিয়োচ্ছে তো। একটু সেয়ানা হয়ে গেলে বাচ্চাগুলো নিজেরাই বুঝে নেয়। দালাল ধরে নিলে তো কথাই নেই। রেট ঠিক করে। পোঁদ, গুদ মারার আলাদা টাকা। ললিপপ নেওয়ার আলাদা। ললিপপ বোঝেন তো আপনি?”
আমার শরীর খারাপ লাগছিল। গ্যাড়ার দিকে তাকিয়ে বললাম, “মেয়েটা বাঙুরেরে ভর্তি ছিল। রেজিস্টার থেকে ওর বাপ-মা’র ঠিকানা বের করা যাবে অ্যাটলিস্ট। কোনও দালাল থাকলে তার নাম পাওয়া যাবে।”
গ্যাড়ার ঠোঁটের কোণে বিড়ির লাল ফুলকি জ্বলছিল, নিভছিল। ঘাড়ে হাত বুলিয়ে ও বলল, “বলছেন যখন দেখব, কিন্তু লাভ হবে না। বাপ-মাকে বস্তিতে আর পাবেন না। তাছাড়া এত কষ্ট করে করবেন কী? ভাইবেরেটর ঢুকালে রেপ পোমাণ হওয়া টাফ। একমাত্তর ওইটা ঢুকালেই … হেঁ হেঁ বুইলেন কি না…”
“যে-বাচ্চাটাকে খুঁজছি, সে-ও এসবের মধ্যে পড়েছিল কি না, আমায় জানতে হবে গ্যাড়া। তার জন্য আরও স্পেসিফিক লিড লাগবে। হাওয়ায় তির চালালে হবে না।” আমি গাড়াকে থামিয়ে বললাম।
গ্যাড়া উদাস হয়ে বিড়িতে সুখটান দিয়ে বলল, “দেখচি অলরেডি। এখনও কিছু পাইনি। তবে ওই যা বললাম, কিসু করেই কিসু লাভ নেই মেডাম, ধরলে আপনারা দু’-একটা পিচাশ বাপ-মাকে ধরবেন, আসল পাখি চোখের সামনে দিয়ে ফুড়ুৎ। এর তো আবার বাপ-মাও নেই, দিদিও ফেঁসে গেছে। এর জন্য আইনের ফাঁক নেই কত্তা, পুরো আইনটাই ফাঁক।”
গ্যাড়া বেঁটেখাটো শরীরটা নিয়ে লেংচে লেংচে দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। এফএম-এ আবার সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান— ‘ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা।’ পুরোনো দিনের কুড়িটি অবিস্মরণীয় বাংলা গান, স্বর্ণকণ্ঠী শিল্পীদের গলায়, সঞ্চালক বলছিলেন।
আমার পেট গুলিয়ে বমি পেল। ফোন হাতড়ে নিরঞ্জনের উকিলের নম্বর ডায়াল করলাম।
“একবার নিরঞ্জনের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করিয়ে দিতে পারেন? আর্জেন্ট।”
২
অপরাজিতার ফ্ল্যাটের দেওয়ালে একটা ঘোড়ার ছবিওয়ালা ক্যানভাস আছে। হস্তশিল্প মেলা থেকে ওকে কিনে দিয়েছিলাম। ঘোড়াটা এমনিতে কালচে। জানালা দিয়ে সূর্যের প্রথম আলো পড়লে আসল রংটা বোঝা যায়। কালো নয়, ঘোড়াটা বাদামি। ওয়ালনাট ব্রাউন। একটা দুর্বিষহ রাত কেটেছে কাল। একটা শহর, একটা গোটা জনপদ, যাকে আমি ছোটো থেকে চিনি, আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে বড়ো হয়েছি, মনে হচ্ছিল এক ফুৎকারে তাকে অস্বীকার করি। যে ইউনিফর্ম নিয়ে এত গর্ব আমার, তার লিলিপুটের মতো চেহারাটা দেখে করুণা হয়। এত পাঁক, এত রক্ত, এত আঁশ, এত থেঁতলে যাওয়া শরীর চারিদিকে… অথচ কিছু করার নেই। জাস্ট কিচ্ছু না।
দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দ বসেছিলাম। একটা নিশ্চিন্ত আশ্রয়, অয়েল পেইন্টের ঘোড়ার গায়ে ঝিলিক দেওয়া বাদামি লোম, টেবিলে ঢাকা গরম খাবার, বারান্দায় দাঁড়ালে টানটান শাড়ির মতো পাতা রাস্তা, হলদেটে হ্যালোজেন আলো, আলোকসন্ধানী পতঙ্গ— সব কেমন পরাবাস্তব ঠেকছিল। নিজের অস্তিত্বের ভারটা এত পাথরের মতো লাগছিল যে, নিজেকে কোথায় রাখব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। যে-মাটিতে পা দিয়ে বসে আছি, নাকি যে- মাটি ঘেঁটে কাঁটাপুকুরের মর্গের বাচ্চাটা লাশ হয়ে গিয়েছিল। দমবন্ধ লাগছিল। অনেক রাতে ফোন বেজেছিল তারপর। ওপার থেকে খুব পরিচিত গলাটা বলেছিল, ‘কী হয়েছে দর্শনা?”
নিরঞ্জন কীভাবে ফোন করেছিলেন জিজ্ঞাসা করা হয়নি। বে-আইনি পথে নিশ্চয়ই। ওঁকে ব্যস্ত করে ফেলছি এই তাড়না কাজ করছিল না তখন। ফোন ধরে উত্তর দিতে পারিনি কিছুক্ষণ। নিরঞ্জন নৈঃশব্দ্যের অর্থ বোঝেন, এ বিশ্বাস ছিল। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিলেন। অবশেষে আমি বললাম।
“চাকরিটা আমি বোধহয় করতে পারব না জানো?”
পরবর্তী কুড়ি মিনিট যা যা বলেছি, নিরঞ্জন শোনার জন্য যেন প্রস্তুত ছিলেন। ফোন রাখার আগে বললেন, “গত পরশু পার্ক সার্কাসে এক পুলিশকর্মী ইনসাস থেকে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে পথচলতি এক মহিলাকে মেরে ফেলেছেন। বহু লোক ইনজিওরড। শেষ বুলেটটাও নিজের গলা ফুঁড়ে ঢেলে দিয়েছেন। শোনা যায়, খুব মানসিক চাপে ছিলেন। ইয়োর জব ইজ ইয়োর অবলিভিয়ন। এর সমাপ্তি সুখকর নয় দর্শনা। কিন্তু তুমি হাল ছেড়ে দিলেও পরিস্থিতি এক চুলও বদলাবে না। নৌকাডুবির আগে যে প্রাণ বাঁচাতে জলে ঝাঁপ দেয়, সে-ও যে বাঁচবে এমন কোনও নিশ্চিত্তি আছে কি?”
“নেই।” আমি অস্ফুটে বলেছিলাম।
“তোমার কেসের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক কী?” নিরঞ্জন প্রশ্ন করেছিলেন। ওঁকে বলা হয়নি, চুমকির ভাই প্লাবনও বাড়ি ফেরেনি দেড় বছর। বলা হয়নি, পিটার পার্কারের মুখোশ পরে টিটোও যেন কোন একটা যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি পেতে চায়। গ্যাড়া বস্তির বাপ-মা’র কথা বলে। আর যারা প্রাচুর্যের মধ্যে থেকে নিজের সন্তানের সমস্যা, স্রেফ ইগোর জোরে ‘ও কিছু নয়’ বলে উড়িয়ে দিতে পারেন, তারা কী তবে?
নিরঞ্জন একটা ওয়েবসাইটের নাম বলেছিলেন। ‘সেভ দ্য চাইল্ড’ ক্যাম্পেন চালাচ্ছেন ওঁরা। ওয়েবসাইটে কোনও ফোন নম্বর পেলাম না। একটা ইমেইল অ্যাড্রেস পেলাম। ইমেইলের সেন্ড বাটনে আঙুল ছুঁতে, মেলটা চলে গেল। নিরঞ্জন একটা সুপরামর্শ দিয়েছিলেন, লোকাল থানাগুলোকে এখনই কিছু জানিয়ো না। যদি কাঁটাপুকুরের কেসটা সত্যি হয়, এর পিছনের চক্র সতর্ক হয়ে যাবে। লিডগুলো থানা থেকেই লিক করে। তার চেয়ে বরং খোঁজো, আর কে? আর কারা? বুঝতে পারছিলাম, প্লাবন কোথায় গেল, তার থেকেও এই কেসে বড়ো হয়ে উঠেছে অন্য প্রশ্ন। প্লাবনের সঙ্গে কী হয়েছিল?
সেভ দ্য চাইল্ড ওয়েবসাইটে রানি নামের এক শিশুসন্তানের কথা লেখা। ওকে ওঁরা কোনও এক বস্তি থেকে উদ্ধার করে রিমান্ড হোমে পাঠিয়েছিলেন। বত্রিশটা কামড়ের দাগ ছিল শরীরে। স্তনবৃত্ত দাঁত দিয়ে কেটে ছিঁড়ে নিয়েছিল কেউ। সেই ‘কেউকে’ অবশ্য রানি চিনত। তার নিজের জন্মদাতা বাপ! তবে এর চেয়েও বড়ো আতঙ্ক অপেক্ষা করেছিল স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটির জন্য। রিমান্ড হোমের রান্নাঘরে গিয়ে ভাত খেতে চেয়েছিল রানি। খাবারের বদলে নিজের ইজের টেনে নামিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়েছিল পা ফাঁক করে। এ যে তার দীর্ঘদিনের লালিত অভ্যেস।
পড়তে পড়তে ল্যাপটপের স্ক্রিন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল বার বার। চাইল্ড প্রস্টিটিউশনের জোরালো র্যাকেট চলে কলকাতায়। চলে, ভিডিয়ো তুলে ডার্ক ওয়েবে বেচে দেওয়া। আর গ্যাড়া, যাদের কথা বলেছিল গতকাল, সেই চাইল্ড প্রস্টিটিউটদের অধিকাংশই পুরুষ বাচ্চা। বয়স ছয় থেকে চোদ্দো। পুরুষাঙ্গ ফন্ডলিংয়ের রেট কুড়ি থেকে পঞ্চাশ টাকা, কক সাকিং দুশো টাকা, অ্যানাল পেনিট্রেশন তিনশো থেকে চারশো টাকা। ল্যাপটপ বন্ধ করে রেখে দিলাম।
মিনিট দশেক পর মন সংযত হল। সেন্ড ইমেইল ফোল্ডার খুলে মেলটা আর-একবার দেখলাম। প্লাবনের ছবিটা অ্যাটাচ করে দিয়েছি। কোনও খবর যদি ওঁরা পান, আমার নম্বরে যেন যোগাযোগ করেন। ঘড়িতে চোখ পড়তে মাথায় হাত পড়ল। আজ প্রমিতের জেরা। বিজন এগারোটার মধ্যে ঢুকে যেতে বলেছিলেন।
.
লালবাজারের তিনতলায় সোজা উঠে গিয়ে ইন্টারেগাশন রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বিজনকে দেখলাম। এটা অন্য একটা জেরাঘর। হয়তো ভিতরটা একটু বড়ো। প্রমিতের উকিল বাইরে বসে অপেক্ষা করছিলেন। বিজন আর এনসিবির একজন অফিসার, কাছে গিয়ে দাঁড়াতে দু’-একটা কথা বলে ফের বসে পড়লেন। বিজনকে জানি না কেন টেন্সড লাগছিল। আমার দিকে তাকিয়ে ফিকে হাসলেন। এনসিবির অফিসার আমার দিকে এগিয়ে এসে করমর্দন করে নিজের পরিচয় দিলেন। ক্রুকাট চুল, খাড়াই নাক, পেশিবহুল চেহারার অফিসার, সোজা সিনেমার পাতা থেকে উঠে এসেছেন।
ভদ্রলোকের নাম সুকেশ ত্যাগী। আমাকে ধন্যবাদ আর শুভেচ্ছা জানিয়ে ইন্টারোগেশন রুমে ঢুকে গেলেন। বিজন হাতে একটা ফাইল খুলে পাতা উল্টে দেখছিলেন। ত্যাগী সরে যেতেই হাতের ইশারায় বাইরে যেতে বললেন।
“কী হল?” আমি উদ্বিগ্ন গলায় বললাম।
“এক্সট্রিম ব্যাড লাক।”
বিজনকে হতাশ লাগছিল। হাতের ফাইলটা একটা টেবিলের উপর ছুড়ে ফেলে বললেন, “কালকেই ভাবছিলাম কেসের নিষ্পত্তি করে ফেলেছি। আজ মনে হচ্ছে জাস্ট কিচ্ছু হয়নি। কিচ্ছু না।”
“কী হয়েছে বলবেন?”
“ত্যাগীরা একটা গাছপাকা মালকে তুলে এনেছে। সেদিনের রেভ পার্টিতে ছিল। প্রমিতের রেগুলার কাস্টমার। ছেলেটা প্রমিতের কাছে প্রথমে মাল চেয়েছিল। প্রমিত রাজি হয়নি। আগের টাকাপয়সার কীসব হিসেবনিকেশ বাকি ছিল। দু’পক্ষে তর্কাতর্কি হয়। কিন্তু মালটা পার্টি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। আবার আধঘণ্টা পরে কিছু দলবল জুটিয়ে এনে, ঝামেলা করে। প্রমিতের দলেও কম লোক ছিল না। তর্কাতর্কি থেকে কিছুটা হাতাহাতিও হয়। তবে বিরাট ভায়োলেন্স কিছু হয়নি। শুধু আমাদের পিছন মারা গেছে।”
“তার মানে প্রমিত চুমকি খুনের সময়ে ওই পার্টিতেই ছিল?”
“অজস্র সাক্ষীর সামনে।” বিজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন।
“আঘাতগুলো তার মানে সেদিনের মারামারি থেকে?”
“হুম।” বিজন ঠোঁট উল্টে বললেন, “ত্যাগীরা প্রমিতের হার্ড ডিস্ক থেকে প্রচুর ডেটা রিকভার করেছে। এই পুরো ডিলটাই ডার্ক ওয়েবে চলত। এমনকি আমি যা দেখলাম, ছেলেটার সার্চ হিস্ট্রিতে ভূরি ভূরি বিডিএসএম সাইটস দেখাচ্ছে। কাল সারাদিন ঘুরে ওয়োর ডিটেইলস জোগাড় করলাম। সাউথের পাঁচটা লোকেশনের ওয়োতে ওর আর চুমকির আধারকার্ড জমা পড়েছে। মাল্টিপল টাইমস। পুরো কেসটা জব্বর দাঁড় করানো যেত। ইশ, একটুর জন্য এমন ইমিউনিটি পেয়ে গেল ছেলেটা!”
বিজন অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন।
“হোটেলে প্রস্টিটিউশনের জন্য চার্জ দিন।” আমি সান্ত্বনার ভঙ্গিতে বললাম। “সে আর কদ্দিনের মামলা? তাছাড়া প্রমাণ করা চাপ হবে।”
“হুম।”
“দিব্যা আগরওয়ালের কেসটা মনে পড়ে যাচ্ছে। ওটার মতো এটাও কোল্ড কেস হয়ে যাবে যা দেখছি।” বিজন হতাশভঙ্গিতে বললেন।
“তন্ময়দা ফোন করেছিলেন? বাদাউনে পৌঁছেছেন?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
“জানি না। মেসেজ করেছিলাম। আনডেলিভারড দেখাচ্ছে। বোধহয় নেট অফ। আপনার কী খবর? কাল রাতে কতবার ফোন করলাম, তুললেন না!”
“একটু ব্যস্ত ছিলাম।” সংক্ষেপে উত্তর দিলাম।
“ডেট?” বিজন ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন।
“হ্যাঁ ডেটই বটে।”
“যাক। আমি তো ভাবলাম আপনি আজীবন বকাসন করবেন। লক্ষণটক্ষণ সেরমই দেখাচ্ছিল।”
আমি ওঁর রসিকতায় হাসতে পারছিলাম না। একটা পুরোনো অঙ্ক মনে পড়ে যাচ্ছিল। সহজ বীজগণিত। সমীকরণের অনেকগুলো সম্ভাব্য সমাধান থেকে নির্দিষ্টটি বেছে নেওয়া। লেফ্ট হ্যান্ড সাইড ইকুয়ালস টু রাইট হ্যান্ড সাইড। মিললে ইয়েস, নইলে নো। যেটিতে মিলল সেটিই সমীকরণের বীজ। চুমকি খুনের সমীকরণে সমস্ত সমাধান যাচাই করা হয়ে গেছে। কোনওটাই মেলেনি। বীজ কি তবে অধরা থেকে যাবে?
“পরশু বোধহয় হোলি, না?” বিজন বলে উঠলেন।
“হ্যাঁ। কেন?”
বিজন মোবাইলটা এগিয়ে দিলেন। তন্ময়দা মেসেজ পাঠিয়েছেন।
“বাদাউনে এসে প্রথমে একটা ঝুপড়িতে উঠেছিল তারক। লোকাল কোনও সোর্সকে কাজে লাগিয়ে ভাড়ায় ছিল কিছুদিন। টাকা ফুরিয়ে আসছিল। তারপর করিমপুরার দিকে চলে যায়। করিমপুরাতে শেল্টারে ছিল কিছুদিন। এখন আর নেই। স্থানীয় থানা বলছে, হোলি অবধি অপেক্ষা করে যেতে। তারক না হলে ওর লোকাল সোর্স হোলিতে গ্রামে ফিরবে। আপাতত বাদাউনে একটা ছোট্ট হোটেলে আছি। বেরোনো যথাসম্ভব কম। মুরগি আর হুইস্কি সাঁটাচ্ছি। লাইফ বিন্দাস। দর্শনাকে বলিস প্রদীপ বর্মাকে ফোন করতে। হি হ্যাজ সাম ইম্পর্ট্যান্ট নিউজ টু শেয়ার অ্যাবাউট সাকিব।”
৩
অক্সফোর্ড বুক স্টোরের কাচের দরজা ঠেলে ঢুকলে, একটা মিষ্টি গন্ধে নাক ভরে আসে। একটা উত্তরাধুনিক বইবিপণি, কলকাতা বইবাজারের এঁদো, ঘর্মাক্ত, পোকায় কাটা বাজার সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পার্ক স্ট্রিটের মধ্যমণি হয়ে বসে আছে। চোখে লাগে দুটো বিষয়, এক, বাংলা বই নেই বললেই চলে। দ্বিতীয়, বুকস্টোরের ধার ঘেঁষে যে সিঁড়িটি উপরে উঠে গেছে চা-বারের দিকে, তার উল্টো দিকের দেওয়ালে অতি স্টাইলিশ মডেলের হাতে বইয়ের পোস্টার— আর তার নীচের ক্যাপশন, রিডিং নেভার গোজ আউট অফ স্টাইল। বিজন সেদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “বইয়ের জন্য স্টাইল না স্টাইলের জন্য বই?”
পরপর পাতা টেবিল চেয়ারের একদম শেষ দিকে প্রদীপ বর্মা বসেছিলেন। সাদা শার্ট, আর ডেনিম পরনে, কাঁচাপাকা চুল, সামান্য ফোলা মুখ। গতদিন দেখেছেন আমাকে, হাত নাড়ালেন।
সাদা পলিশড ভিনাইল কোটেড টেবিলে একটা চায়ের কেটলি রাখা ছিল। সামনে কাপ, কাপের মুখে ফিট হয়ে যাওয়ার সাইজের ছাঁকনি সমেত।
“আমার ভালো চায়ের নেশা। তাই এখানেই ডাকলাম। এরা দার্জিলিং সেকেন্ড ফ্লাশটা ভালো সার্ভ করে। আপনারা কী খাবেন, শুধু চা? সঙ্গে আরও কিছু বলি?”
“না, না স্যার শুধু চা।” আমি প্রদীপ বর্মার দিকে তাকিয়ে বললাম। চায়ের কাপের ছাকনিটা আমার চায়ের থেকেও বেশি আকর্ষণীয় লাগছিল।
বিজন গলা খাঁকরে বললেন, “আমার অন্য কিছুতে আপত্তি নেই স্যার। ম্যাডাম বোধহয় খেয়ে বেরিয়েছেন, আমার লাঞ্চ হয়নি।”
দশ মিনিট পরে ধূমায়িত চা সমেত কেটলি, স্যান্ডউইচ আর কুকিজ ভর্তি প্লেট এনে হাজির করল সুবেশ পরিচারিকা। প্রদীপ বর্মা চা নিজে হাতে সার্ভ করলেন। সোনালি রঙের অতি উচ্চমানের লিকার। কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “তন্ময় উইল নেভার স্টপ বদারিং মি। পুরোনো ব্যথার জায়গায় হাত দিয়ে ফেললে কী হয়, দ্যাট বাগার নোজ ভেরি ওয়েল।”
কাপ থেকে উঠে আসা ধোঁয়ায় প্রদীপ বর্মার চশমা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।
চশমা খুলে টেবিলে রেখে বললেন, “৯৭ সালের কেস। আমার প্রথম কেস সিবিআই-এ ট্রেনি হিসেবে। ওয়ান অফ দ্য মোস্ট হিনিয়াস ক্রাইম আই হ্যাভ এভার সিন… সেটাও কোল্ড হয়ে গেল। ডাজ ক্রাইম এভার পে অফিসার্স?”
আমরা উত্তর দিচ্ছি না দেখে, নিজের মনেই বললেন, “সামনের বছর রিটায়ার করব। যদি তার আগে কেসটার একটা নিষ্পত্তি দেখে যেতে পারি…” আমি গলা খাঁকরে বললাম, “সাকিব বলে একজন ইনভেস্টিগেটিভ ব্লগার দিব্যা আগরওয়ালের কেসটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। তন্ময়দা আপনাকে বলেছেন বোধহয়।”
“ইয়েস, সে-জন্যেই ডেকে পাঠানো,” প্রদীপ বর্মা মাথা নাড়িয়ে বললেন, “ছেলেটার অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ নিয়ে শুনলাম। বেশ সন্দেহজনক ব্যাপার। সন্দেহটা আরও বাড়ছে একটা ঘটনায়। হতে পারে দুটো তথ্য রিলেটেড, আবার না-ও হতে পারে। দ্যাট’স আপটু ইয়োর ইনভেস্টিগেশন। পার্সোনালি দু’টি তথ্য রিলেটেড হলে আমি খুশি হব।”
আমি আর বিজন দু’জনে প্রদীপ বর্মার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনি কুকিজে একটা কামড় দিয়ে বললেন, “সাকিবের ব্যাপারটায় আসতে গেলে একটু ব্যাকগ্রাউন্ডটা বলতে হয়।”
আমরা দু’জনে ওর মুখের দিকে তাকালাম।
“আগরওয়ালদের বড়ো ফ্যামিলি। তিন ভাই। আলাদা আলাদা ব্যাবসা। তাদের ছেলেপুলে। তাদের নিজস্ব পেশা। আলিপুরের আবাসনের চারটে তলা জুড়ে এরা থাকতেন। পিছনে সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে থাকত রাঁধুনি, ড্রাইভার ইত্যাদি পরিচারকেরা। দিব্যার দাদু ভিগ্নেশ আগরওয়াল সেদিন অফিস যাননি, শরীর খারাপ ছিল। দিব্যাও জেদ করে দাদুর সঙ্গে বাড়িতে থাকবে। স্কুলে যাবে না। বাড়ির বাকিরা সবাই অফিসে, কারখানায়, রেস্টুরেন্টে বেরিয়ে যায়। দিব্যার মা, ঠাকুমা শপিংয়ের জন্য ক্যামাক স্ট্রিটে বর্দান মার্কেটে যান। দিব্যা তখন ভিডিয়ো গেম খেলছিল। বাড়ির চাকরবাকরের চোখ এড়িয়ে কখন ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেছে, কেউ খেয়াল করেনি। চারিদিকে খোঁজ করার পর না পেয়ে সন্ধেবেলা পুলিশের শরণাপন্ন হয়।
আলিপুর পিএস বাচ্চাটির রক্তাক্ত শরীর খুঁজে পায় আবাসনের একদম পিছনে গারবেজ ডাম্প করার জায়গা থেকে। পরিত্যক্ত জায়গা, এমনিতেও কেউ যায় না। একটা টিনের ভেঙে যাওয়া শেডের তলায় আড়াল করা ছিল। মুখে রুমাল গোঁজা, নিম্নাঙ্গ প্রায় থেঁতলে গেছে, রক্ত জমে শুকিয়ে গেছে। মৃত্যু হয়েছে অন্তত ঘণ্টা তিনেক আগে। আলিপুর পিএসের যিনি ভারপ্রাপ্ত আইসি ছিলেন, তিনি দেখেই বুঝেছিলেন ইটস আ কেস অফ ব্রুটাল রেপ, দ্যাট টু উইদ এক্সটার্নাল অবজেক্ট ইনসার্টেড ইন দ্য প্রাইভেট পার্ট। বোথ ভ্যাজাইনা অ্যান্ড অ্যানাস। একটু খোঁজাখুঁজির পর ওরা অবজেক্টটাও পান। গাড়িতে যে টাই রড থাকে সেটা রক্ত মাখা অবস্থায় জলে-কাদায় পড়ে ছিল। খুনি কিন্তু চালাক ছিল। কোনও ফিঙ্গারপ্রিন্ট ছেড়ে যায়নি। কোনও স্পার্মও না। না মেয়েটার বডিতে, না অন্য কোথাও।”
“গ্লাভস ব্যবহার করেছিল?”
“নট শিওর, তখনকার দিনে একধরনের রাবারের গ্লাভস ছিল, বড়ো মাপের। ময়লা ফেলার কাজে লাগত। সেগুলোর এক জোড়া সারভেন্ট কোয়ার্টার থেকে মিসিং ছিল।”
“তা হলে দু’জন সাসপেক্ট?” আমি প্রশ্ন করলাম।
“বলছি। টাই রডটা যে গাড়ির সেটার ড্রাইভার ছিল গোবিন্দ নস্কর। ভিগ্নেশ আগরওয়ালের ড্রাইভার। বয়স, পঁয়তাল্লিশ ছেচল্লিশ, ন্যালাক্যাবলা চেহারা। থাকত আগরওয়ালদের সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে। টাই রডের মেক দেখে গাড়িটাকে শনাক্ত করেছিলাম আমরা। কিন্তু গোবিন্দর অ্যালিবাই ছিল। ও নাকি দুপুরবেলা ভিডিয়ো পার্লারে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল। ভিডিয়ো পার্লারের ছেলেটা ভিগ্নেশের হয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছিল। তদন্ত করতে করতে জানা গেল, সেই ছেলেটা গোবিন্দর কীরকম দূরসম্পর্কের ভাই হয়।”
“আর হরিনাথ সাঁপুই?”
“হ্যাঁ। হরিনাথ ছিল মালি। তিরিশ-একতিরিশের যুবক। ভবানীপুরের দিকে বাড়ি। দুপুরবেলা কাজ সেরে বাড়ি ফিরত রোজ তিনটে নাগাদ। কিন্তু সেদিন বেরিয়েছিল পাঁচটায়। জেরায় বলেছিল গাছের চর্চা করছিল। কিন্তু কোনও সাক্ষ্য ছিল না। গোবিন্দ নস্কর আর হরিনাথ সাঁপুই দু’জনের পক্ষেই আবাসনের পিছনের গারবেজ ডাম্প অ্যাক্সেস করা অসুবিধাজনক ছিল না। আমাদের কিন্তু প্রথম থেকেই গোবিন্দ নস্করের উপর সন্দেহ বেশি ছিল। বিশেষত ওর অ্যালিবাইটা সহজে চ্যালেঞ্জ করা যেত। সাঁপুই একটা ডিসট্রাকশন বুঝতাম। জানতাম, কোর্টে কেস উঠলে ডিফেন্স সাঁপুইকে টেনে নস্করকে বাঁচাবে। সেই সময় মাটুর কেসটা খুব উথালপাথাল করেছিল দেশে। দ্য বসেস ডিসাইডেড দে উইল গো ফর ডিএনএ অ্যানালিসিস। বাচ্চাটার মুখে ছেলেদের ব্যবহার করার রুমাল গোঁজা ছিল। উই ওয়ার শিওর যে ওটা থেকে খুনির ডিএন এ পাওয়া যাবে। দ্য রেজাল্ট অল অফ আস নো। একটা আট বছরের ছেলের ডিএনএ ম্যাচ আসে।”
“হু।”
“কলকাতার মিডিয়া তখন অলরেডি পুলিশের গুষ্টির তুষ্টি করছে। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে কড়া ডিফেন্স দেওয়া হয়। গোবিন্দ নস্কর আর হরিনাথ সাঁপুই বেনিফিট অফ ডাউট পেয়ে যায়।”
“আট বছরের বাচ্চার ডিএনএ, মানে ব্যাপারটা হজম করাই তো কঠিন!” বিজন বললেন।
“না আজ হলে এতটা অবাক হতাম না।” প্রদীপ বর্মা বললেন, “এই সেদিন মহারাষ্ট্রে দেখলাম, সাত বছরের বাচ্চা, জাস্ট কীরকম লাগে দেখতে এক বছরের বোনের প্রাইভেট পার্টে বেলন-চাকির বেলন ঢুকিয়ে দিয়েছে। জুভেনাইল ক্রিমিনালস আর নো লেস রিয়েল। তবে আজ থেকে সাতাশ বছর আগে ইট ওয়াজ আ শক টু আস। উই নেভার হার্ড, নেভার থট অফ এনিথিং লাইক দ্যাট।”
“বাচ্চাটার কোনও ট্রেস পাওয়া যায়নি না?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
“নাহ। ওই কমপ্লেক্সে কোনও আট বছরের ছেলে বাচ্চা ছিল না। যদি বাইরে থেকে এসে থাকে তা হলে আলাদা কথা। তবে আমার কিন্তু ধারণা ছিল, কোথাও একটা বড়ো কিছু গন্ডগোল হচ্ছে। ডিএনএ রিপোর্ট ঠিক নয়। আনফরচুনেটলি সেকেন্ডটাও আনডিসাইডেড আসে। এদিকে গোবিন্দ নস্কর কনফেস করেনি, কিন্তু ওর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পরিষ্কার বলেছিল, হি ওয়জ দ্য ওয়ান। সাধারণত এই ধরনের ক্রিমিনালরা বারবার একই রকমের অপরাধ করে থাকে। আমি ভেবেওছিলাম, ওর সম্পর্কে খোঁজখবর রাখব, কিন্তু ইউ নো হাউ ডাজ দ্য ওয়ার্ক ফ্লো…” প্রদীপ বর্মা তিন ভাঁজ করা রুমালে মুখ মুছে বললেন, “সাকিবের ব্যাপারটা তন্ময় না তুললে, আমার খোঁজ নেওয়াও হত না।”
অক্সফোর্ড চা-বারে চা-পিয়াসীদের ভিড় বাড়ছিল। গুঞ্জন, যতই নিচু গলার হোক, মনোযোগে বাধা পড়ে। প্রদীপ বর্মা সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন, “গোবিন্দ নস্কর বিবাহিত ছিল। শুনেছি এক সন্তানও ছিল। সাতানব্বই সালে যখন ধরা পড়ে, তখন ওর ফ্যামিলি থাকত বারুইপুরে। রিসেন্টলি খবর নিয়ে জানি, ও এই সেদিনও বারুইপুরেই ছিল। ওর এগেন্সেটে দুটো মলেস্টেশনের চার্জ আছে লোকাল থানার কাছে। একজন নাবালক, অন্যজন নাবালিকা।”
বিজন আমার দিকে চকিতে তাকিয়ে বর্মাস্যারকে বললেন, “গোবিন্দ নস্কর বারুইপুরে থাকত?”
“হ্যাঁ। লোকাল থানা বলল, পদ্মপুকুর আর যোগীবটতলার মধ্যে একটা নতুন আবাসন হচ্ছে, সেটা গোবিন্দ নস্করের জমিতে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর জমি বাড়ি বিক্রি করে কোথায় চলে গিয়েছে কেউ সেটা জানে না। পাড়ার লোকের সঙ্গে একেবারেই যোগাযোগ ছিল না। সবাই অ্যাভয়েড করত।”
আমার হাত-পা চড়া এসিতেও ঘামছিল। প্রদীপ বর্মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “সাকিব এই কেসটা নিয়ে ব্লগ করছিল, ফলে ডেফিনিটলি ও লোকটাকে চিনত। আমার মনে হল এই ওপেন এন্ডেড কেসটা নিয়ে ও নেমেইছিল গোবিন্দকে চিনত বলে। ওকে চেজ করছিল, বাট গোবিন্দ ইজ আ ডেঞ্জারাস ক্রিমিনাল, ওর হাবভাব দেখে কিন্তু বুঝবে না… হি ইজ রুথলেস, সাকিব ওকে বিরক্ত করলে ও খুন করে দিতে দু’বার ভাববে না।”
প্রদীপ বর্মার তাড়া ছিল। উনি বিদায় নিলেন। বিজন হতভম্ব অবস্থায় বললেন, “তার মানে, সাকিবের কাছে যে ফ্ল্যাটটার হ্যান্ডবিল পেয়েছিলাম আমরা, সেটা গোবিন্দ নস্করের জমির উপর গড়ে উঠছে?”
“নিঃসন্দেহে।”
“কিন্তু সাকিব, বিভাবরীতে… মানে কেন!”
বিজনের কথার উত্তর দিলাম না। সেভ দ্য চিলড্রেনের ওয়েবসাইটে লেখা, চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ সবথেকে বেশি হয় পরিচিতদের কাছ থেকে। বাবা, কাকা, দাদা, পাড়াতুতো পরিচিত। বাচ্চাগুলোকে ম্যানিপুলেট করার অনেকগুলো পদ্ধতি ব্যবহার করে। প্রথমে অল্পসল্প ছোঁয়াছুঁয়ি, তারপর ফন্ডলিং, অস্বস্তি প্রকাশ করলে বোঝানো এসব আসলে আদরেরই রকমফের। অনেকসময় স্পেশাল সিক্রেট শেয়ার করার নামে বাচ্চাটাকে রাজি করিয়ে ফেলা। অ্যাবিউজ হওয়ার পর আপত্তি করলে প্রথমে সম্পর্কের দোহাই দেওয়া, অপরাধবোধটিপ দেওয়া, কথাবার্তা কমিয়ে দেওয়া। বাচ্চা ততক্ষণে মনোযোগ বা আশ্রয় হারানোর ভয়ে ট্রমায় চলে গেছে।
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম।
“কোথায় চললেন?” বিজন অবাক হয়ে বললেন।
“গোবিন্দ নস্করের খোঁজে। বারুইপুর।”
“কিন্তু সে-লোক তো আর বারুইপুর থাকে না!”
“উঠুন, বাকিটা রাস্তায় বলছি।”
৪
“বারুইপুরের ট্র্যাফিক কি আর এখন দেখছেন? সামনেই পদ্মপুকুর ছাড়ালে লেভেল ক্রসিং। ফ্লাইওভার হওয়ার আগে এখানে আধঘণ্টার জ্যাম রোজকার ব্যাপার ছিল।” লালবাজারের ড্রাইভার বলল।
যোগিবটতলার বহু আগে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে আজ। বাস খারাপ হয়ে রাস্তা বন্ধ। আমি আর বিজন গাড়ির মধ্যে বসে ঘামছিলাম। বিজন হাতের ঘড়ি দেখে বললেন, “আপনি যা বলছেন, তার মানে দাঁড়ায়, ত্রিদীপের সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ হচ্ছে, আর করছে বিভাবরীর কেউ?”
“পরিচিত কেউ।”
“কিন্তু এর সঙ্গে গোবিন্দ নস্করের সম্পর্ক কোথায়? বারুইপুর ছেড়ে লোকটা যে বিভাবরীতে গেছে, তার কোনও প্রমাণ আছে?”
“বিভাবরীতে মোট ২৪০টা ফ্ল্যাট। গোবিন্দ নস্কর নামের কেউ আছে কি না, সেটা একটু খোঁজ নিন। সেক্রেটারির নম্বর তো আছে আমাদের কাছে। স্থানীয় থানাগুলোয় খোঁজ নিন, এদের যা স্বভাব এরা সুযোগ পেলেই মলেস্ট করে। বারুইপুরে যেমন ডায়েরি হয়েছে, তেমন গড়িয়াহাট এলাকায় পকসো আইনে কোনও কেস হয়নি কী করে জানছি আমরা?’
“হু।” বিজন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললেন। আমার মাথায় ঝড় চলছিল। চোখের সামনে প্লাবনের মুখটা ভেসে উঠল। বিজনকে বললাম, “ফুটে, বস্তিতে, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে সর্বত্র সোর্স লাগান। কিছু না কিছু পাবেনই।”
চুমকি প্রামাণিক মার্ডার কেস অবশেষে তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছিল। টিটোর মুখোশ নিয়ে চুমকির উদ্বেগের কারণ বুঝতে পারছিলাম। টিটোকে আর কেউ না বুঝুক, ও বুঝেছিল। ওর সমস্যা, ভয়, রাগ, জেদ, অপরাধবোধের কারণ তলিয়ে ভেবেছিল। আর নিশ্চিতভাবে চিনেছিল টিটোর অপরাধীকে। প্লাবনের পরিণতি কল্পনা করে চুমকি কতটা অবশ হয়েছিল, বুক দিয়ে অনুভব করতে পারছিলাম। কী পদক্ষেপ নিয়েছিল চুমকি? যতদূর ওকে চিনেছি ও চুপ করে থাকার মেয়ে নয়!
শ্রীদীপ রিয়েলটরের প্রোমোটার শ্রীদীপ, গোবিন্দ নস্কর সম্পর্কে বিশেষ তথ্য দিতে পারেননি। দলিলে গোবিন্দ নস্করের অ্যাড্রেস হিসেবে বারুইপুরের অ্যাড্রেস দেওয়া। তবে, শ্রীদীপ আমাদের যোগীবটতলার নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাটের কাছে, গোবিন্দ নস্করের এক প্রতিবেশীর নাম ঠিকানা দিয়েছে, ইনি গোবিন্দ নস্করের কীরকম যেন দূরসম্পর্কের আত্মীয় হন।
“গোবিন্দ নস্করের জমি বিক্রি হয়েছে বাইশ সালে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মালটার বাহাত্তর বছর বয়স!” বিজন ফোনে দলিলের পিডিএফ দেখে বললেন।
“সাক্ষীতে কে আছে?”
“কোনও এক অমল বাঁড়ুজ্জে। তারই তো ঠিকানা দিয়েছে প্রোমোটার।”
অমল বাঁড়ুজ্জে আগে থেকে খবর পেয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সরু পার ধুতি পরনে শীর্ণ বৃদ্ধ, গামছা দিয়ে ঊর্ধ্বাঙ্গ ঢাকা, তার তলায় জীর্ণ পৈতেটি নজরে পড়ে। কালো মোটা চশমার ওপার থেকে বৃদ্ধ আমাদের ঠাওর করে বললেন, “আসুন, ভিতরে আসুন।”
একটা একতলা বাড়ির গ্রিলের গেট ঠেলে উনি আমাদের যে ঘরটায় নিয়ে গিয়ে তুললেন, সেটি এ বাড়ির বসার ঘর। পুরোনো দেরাজ, কাচ বসানো আলমারি, আর চারপায়ার সেন্টার টেবিল, সমস্ত আসবাব বৃদ্ধের নিজের মতোই প্রাচীন। রান্নাঘর থেকে ডাল ফোড়নের গন্ধ আসছিল। একটা তক্তাপোশের উপর বৃদ্ধ নিজে নড়েচড়ে উঠে বসলেন, তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “নস্করের মতো নচ্ছার লোক পৃথিবীতে দুটো হয় না। বুড়ো হয়ে চামড়া খসে যাওয়ার বয়স হয়ে গেল, তাও পুলিশ ওকে খোঁজা বন্ধ করছে না। আর আমার হয়েছে যত ফ্যাসাদ, আত্মীয়তার নামে কত বছর ধরে ঢেঁকি গিলে যাব কে জানে…”
“ইয়ে, কিছু মনে করবেন না কাকু, মানে আপনি বন্দ্যোপাধ্যায়, আর উনি নস্কর, মানে আত্মীয়তা ঠিক কী ধরনের?” বিজন পাশ থেকে বললেন।
বৃদ্ধ মুখ বেঁকিয়ে বললেন, “আমি গোবিন্দর আত্মীয় নাকি? আত্মীয় তো ওর বউ মাধুরী। আমার ভাগনি। এই পাড়াতেই বাপের বাড়ি। কপালদোষে এর বউ হয়েছে। আমি কিন্তু বারণ করেছিলাম, পই পই করে বারণ করেছিলাম। তা শুনলে তো?”
টানা কথা বলে বৃদ্ধের শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। ঢাকা দেওয়া কাঁসার গ্লাস থেকে জল খেয়ে বললেন, “মাধুরীর স্বামী কাঁচা বয়সে মারা যায়। বাপ-মা’র অবস্থা একেবারে খারাপ ছিল না। বাপ বিধবা মেয়েকে রসেবশেই রেখেছিল। ভালো খাবার, ভালো শাড়ি, ভালো ঘর। কিন্তু ওই যে কথায় আছে, যার যাতে মজে মন, কী বা হাঁড়ি কী বা ডোম! কোত্থেকে এই গোবিন্দর প্রেমে পড়ে জেদ ধরল ওকে বিয়ে করবে। তখন ওর ছেলের বয়স পাঁচ। বিয়ের তিন বছরের মাথায় গোবিন্দর ইলেকট্রিক ফিউজের কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। দুটো কাজই জানত। ইলেকট্রিক আর ড্রাইভিং। কারখানা বন্ধ হওয়াতে আলিপুরে ড্রাইভারির কাজ নিয়ে বারুইপুর ছাড়ল। হপ্তায় হপ্তায় আসত অবশ্য। এসে বউ আর ছেলে পিটিয়ে আবার ফেরত যেত। ছোটো জাত, তার বিষ যাবে কোথায়?”
আমি অমলবাবুর দিকে তাকালাম। লোকটার প্রবল জাতিগত বিদ্বেষ। ভাগনি নিজ বংশে চুন কালি মাখানোয় গোবিন্দ নস্করের উপর রাগ, নাকি তার চরিত্রের জন্য রাগ সেটা বোঝা যায় না। মোটের উপর সোর্স হিসেবে খুব একটা ভালো নয়।
“গোবিন্দ নস্করের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ আছে নিশ্চয়ই? ফোন নম্বরটা দেবেন?” আমি মোবাইল হাতে নিয়ে বললাম।
“নম্বর কাজ করে না। ক’টা টাকা পেতাম, মেরে দিল। ফোন করে করে হয়রান। এক নম্বরের জালিয়াত, চুন্নুখোর, চরিত্রহীন। শ্বশুর মরলে পরে অত বাড়ি জমি বাড়ি বিক্রি করে সব টাকা হাত করল। সে-সবও মাল খেয়ে উড়িয়েছে। বারুইপুর থেকে বিদেয় হওয়ার পর আমি বেঁচেছি। পাশের বাড়ি, তায় আত্মীয়। পচে মরে থাকলে লোকে আমায় ছি ছি করবে, তা সে যতই অমানুষ হোক।”
“আপনার ভাগনি তো মারা গেছে?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
বৃদ্ধ ফুঁসে উঠে বললেন, “মারা যাওয়া বলে নাকি ওকে? না খেতে দিয়ে মেরে ফেলেছে। এমনিতেই লজ্জায়, ঘেন্নায় আধমরা হয়ে থাকত। একটা আধবুড়ো লোক, সারাদিন কচি কচি বাচ্চাদের দেখে নাল টপকাচ্ছে! ছি ছি! ছেলেটা তো সেই যে বারো বছরে সৎ বাবার মারধোরে অতিষ্ঠ হয়ে পালিয়েছিল, ফিরল মায়ের মৃত্যুর পর। তারপর মাঝে মাঝে আসত। শুনেছিলাম, লেখাপড়া শিখে লায়েক হয়েছে। একদিন দেখি, জমিবাড়ি প্রোমোটারকে বেঁচে দিয়ে বাপকে নিয়ে চলে গেছে।”
“ইয়ে মেসোমশাই, একটা কথা, জিজ্ঞাসা করার ছিল, অন্যভাবে নেবেন না ব্যাপারটা।” বিজন বলে উঠলেন।
বৃদ্ধ ওঁর দিকে তাকালেন।
“ইয়ে মানে, যখন গোবিন্দ নস্কর বারুইপুর ছাড়ে, তখনও কি ওই রোগটা মানে বাচ্চাদের দেখে সেক্সটেক্স জাগা… এসব ছিল?”
বৃদ্ধ চশমা খুলে বড়ো বড়ো চোখ করে আমাদের দিকে তাকালেন। সিলিংয়ের দিকে হাত তুলে বললেন, “দ্যাখো বাপু, হাতির দেখানোর দাঁত আর চিবোনোর দাঁত এক নয়। তেমনি পুরুষমানুষের শুক্রযোগ সম্পর্কে সে নিজে ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না।”
“গোবিন্দ নস্করের ছেলের নাম, নম্বর?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
“ছেলেকে আমরা বাড়িতে রাজা বলে ডাকতাম। ভালো নাম কী ছিল, এতদিন পরে মনে নেই।”
“এখন এরা কোথায় থাকেন কিছু বলতে পারবেন?”
“নাহ্। বললামই তো কোনও যোগাযোগ নেই।”
.
অমল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির বাইরে ঝাঁকালো পেয়ারা গাছ ছিল। বিজন হাত বাড়িয়ে দুটো পেয়ারা পেড়ে বললেন, “আচ্ছা, এই তিন বছরে গোবিন্দ নস্কর মরেও তো যেতে পারে?”
“ডেট অফ ডেথ জানা থাকলে কেএমসির ডেথ রেকর্ড থেকে অনলাইনে নামিয়ে নিতে পারেন। সেটা তো সম্ভব নয়।”
“ভিতর থেকে খোঁজ নিয়ে দেখছি। গোবিন্দ নস্করের নামে রেজিস্টার্ড ফোন নম্বর যেটা ছিল, সেটা দিয়ে আধার কার্ডের পোর্টাল থেকে যদি কিছু পাওয়া যায়।” বিজন বললেন।
.
বিজন আমাকে গড়িয়া মোড়ে নামিয়ে দিয়ে ঢাকুরিয়া বেরিয়ে গেলেন। আজ ওঁর দুই ছেলের জন্মদিন। আমাকে কেক খাওয়ার নেমন্তন্ন করলেও সবিনয়ে এড়িয়ে যাই। এখন উদ্যাপন, উৎসব কিছু ভালো লাগছে না। যদিও পথ হোলিময়। দু’ধারে রং আর পিচকারির দোকান। গড়িয়ার আকাশের দিকে তাকালাম। ফুট ব্রিজের উপর থেকে যতটুকু দেখা যায়। ঘিঞ্জি বহুতলের গায়ে পাঁক বাঁধানো তার, তাতে বিঁধে থাকা ঘুড়ি চোখে পড়ে। আকাশের একচিলতে নীল, ইস্ত্রি করা শার্টের আস্তিনের মতো টানটান হয়ে তারের ফাঁকেফাঁকে ঝুলছে।
ভিড় কাটিয়ে আগে এগোই। বারুইপুর-বারাসতের প্রায় ফাঁকা বাসটা গড়িয়া কালী মন্দিরের উল্টো ফুটে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলে। ফেরিওয়ালারা বন্ধ মহুয়া সিনেমাহলের সামনে ফেরি করে, হাজারো খাবার, স্যান্ডো গেঞ্জি, সেকেন্ড হ্যান্ড ট্র্যাকসুট, সস্তা ইলেকট্রনিক্স। মহুয়া সিনেমাহলের পাঁচিলের রং কী ছিল বোঝা যায় না। সিনেমার পোস্টার, তাকে অর্ধেক ঢেকে ফেলেছে ম্যাসাজ পার্লারের হ্যান্ড বিল, তার পাশ ঘেঁষে টিভি-ফ্রিজ-এসি সারাই, তার ঠিক পাশে কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন। একটা দ্রুত প্রসারণশীল অথচ গন্তব্যহীন শহরের চাহিদা, ইচ্ছা আর আসক্তি। বিজন দু’ঘণ্টা পর মেসেজ করেন। বিভাবরীর ২৪০টা ফ্ল্যাটে গোবিন্দ নস্কর নামের তিনজন আছেন। তার মধ্যে একজন মারা গেছেন ছ’বছর আগে, ফ্ল্যাট বন্ধ পড়ে থাকে। অপর জনের বয়স পঁয়তাল্লিশ, আর-একজন প্রবাসী। দেশে এসেছিলেন কোভিডের আগে। এবং ওই নামের এগেন্সটে ডিসি সাউথের আন্ডারে কোনও থানাতেই কোনও পসকো কেস নেই।
একটা নিষ্ফল দিন শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামে। পরিষ্কার বুঝছি, ঠিক পথে হাঁটছি, অথচ হাতের সব গুটি চালা শেষ। কাজের ফাঁকে বিজন আজ একটা কড়া সত্যি বলে ফেলেছেন। গোবিন্দ নস্কর বেঁচে থাকলে বয়স এখন বাহাত্তর। শিশু নির্যাতনের শারীরিক বা মানসিক প্রবৃত্তি কি এখনও নিবৃত্ত হয়নি! সাকিবের বিভাবরীতে আসা, পেয়ারাবাগান সহ নানা বস্তির শিশু নির্যাতন ও মৃত্যু, চাইল্ড প্রস্টিটিউশনের এরকম রমঝমে কারবার, প্লাবনের হারিয়ে যাওয়া, এর কোথাও কি তবে গোবিন্দ নস্কর নেই! সেভ দ্য চাইল্ড থেকে ওঁরা মেল করে জানিয়েছেন, প্লাবনের কোনও হদিশ তাদের কাছে অন্তত নেই। এখন শেষ ভরসা গ্যাঁড়া। তাকে ফোন করলাম, ফোন কেটে দিল।
অপরাজিতার আয়নার কাচে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখলাম। ব্ল্যাক ট্রাউজার্স আর হালকা নীল শার্ট। চেহারা দেখে হালহকিকত বোঝা যায় না। একটা সঠিক ফোন কল, একটা নির্দিষ্ট খবর, একটা সঠিক সময় ও জায়গার মেলবন্ধন, একটা খুনের পিছনে সম্ভাব্য অপরাধীর অজস্র মুখ থেকে থিয়েটারের ভঙ্গিতে ন্যারো হয়ে আসছে আলো, ঠিক একজনের মুখে… গোটা মঞ্চে আর কেউ নেই, শুধু একখানা বিরাট মুখ, তারা গোটা অস্তিত্ব মঞ্চের চেয়ে বড়ো হয়ে উঠছে। গোবিন্দ নস্কর হয়ে উঠছেন বাইবেলের গোলিয়াথ[১১] আর দর্শনা বোস এত ছোটো যে তাকে ডায়াস থেকে দেখাই যায় না।
[(১১) গোলিয়াথ: বাইবেলে, গোলিয়াথ হলেন গাথের একজন সুপরিচিত ফিলিস্তিনি দৈত্য, যিনি তাঁর বিশাল আকার এবং শক্তির জন্য বিখ্যাত। তিনি একক যুদ্ধে তরুণ ডেভিডের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। ডেভিড তাকে হত্যা করেছিলেন মাত্র একটি গুলতি ছুড়ে। শমুয়েল ১৭-এ বর্ণিত এই গল্পটি বাইবেলের আখ্যানের ভিত্তিপ্রস্তর, যা হাজারো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বিশ্বাস এবং সাহসের বিজয়ের জয়জয়কার করে।]
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অনেক রাতে তারপর ফোন বাজল। আমি ঘুম চোখে ফোনের কলার আইডিতে দেখলাম, গ্যাড়া। ফোন তুলতে সে খেঁচিয়ে বলল, “ছ’বার ফোন করেছি। ঘুমোচ্ছিলেন নাকি?”
ঘড়িতে দেখলাম রাত প্রায় দুটো। ও যে ফোন করলে কেটে দেয় সেটা আর ওকে মনে করালাম না। বললাম, “রাতে ঘুমোনোর অভ্যেসটা খুব খারাপ।” গ্যাড়া আমার কথার শ্লেষ ধরতে পারল না। খিঁচিয়ে বলল, “তিনদিন ধরে জান কয়লা করে খবর নিয়েছি। মাল্লু লাগবে কিন্তু।”
“মাল্লু কেন মেডেলও দিতে পারি তোকে।” মনে মনে একটা খিস্তি মেরে বললাম, “কী খবর? কাজের?”
“আপনাকে আগেই বলেছিলাম ঢাকুরিয়া বস্তির বাচ্চাটার বাপ-মা তিলেখচ্চর। আগে থাকত সোনারপুরের দিকে। দু’বছর হল কলকাতায় এসেছিল। ইস্টিশানেই মেয়েটার হাতেখড়ি করিয়েছিল কি না জানি না, এই কাস্টমারের কাছে মেয়েটাকে ওরা জেনেবুঝেই পাঠিয়েছিল। ওইরকম অবস্থায় বাড়ি ফেরার পর বস্তিতে নিয়ে যায়। ঘরে রেখে চিকিচ্ছে করাচ্ছিল। দু’দিনের দিন দেখে অবস্থা খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে। ঘরে ওরকম করে মেয়ে পচে মরলে পাড়া প্রতিবেশী ছেড়ে কথা বলবে না। ভয় পেয়ে তখন হাসপাতালে যায়। ডাক্তার পুলিশ কেস দেখে থানায় খবর দেয়। থানা এসে একটা রুটিন এফআইআর করে। কিন্তু কেসটা চেপে গেছল।”
আমি হতাশ ভঙ্গিতে বললাম, “এ তো পুরোনো খবর।”
গ্যাঁড়া খ্যাঁক করে উঠে বলল, “বাসি খবর দেওয়ার জন্য আপনাকে ফোন করিনি। আমার সময়ের দাম আছে। পুলিশ কেসে জড়ানোর ভয়ে মেয়েটার বাপ-মা ঢাকুরিয়া থেকে পালায়। হাসপাতাল থেকে বাচ্চাটার বডি নেয় চন্দন দাশ বলে একজন। সুচেতনা নামের একটা অফিস চালায়।”
আমি চন্দনের নাম শুনে একটু থমকে যাই। তলিয়ে ভাবি। তারপর বলি, “হতে পারে। লোকটা বস্তির বাচ্চাদের নিয়েই কাজ করে। বিপদে-আপদে থাকতেই পারে।”
গ্যাঁড়া ফোনের ওপারে বিড়বিড় করে খিস্তি দেয়। চন্দনের খবরে যে খুশি হইনি, ও বুঝতে পারে। তারপর বলে, “আপনার ওই মেয়েটা কী যেন নাম, চুমকি?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ।” আমি রুদ্ধশ্বাসে বলি।
“ওর ওই চন্দন দাশের কাছে যাতায়াত ছিল। যেদিন মরেছে, সেদিনও গিয়েছিল কি না জানি না, পরের দিন সকালে চন্দন দাশ ফাঁড়ির কাছে একটা হার্ডওয়ারের দোকান থেকে ব্লিচিং কেনে। বৃহস্পতিবার দোকান বন্ধ থাকে, কর্মচারী আমার চেনা। চন্দন একরকম জোর করেই দোকান খোলায়। ব্লিচিং কিনেছিল চার প্যাকেট। বলে, সুচেতনার সামনের রাস্তায় নাকি কুকুর মরেছিল। ব্লিচিং ছড়াবে।”
আমার দুম করে শাহরুখের কথা মনে পড়ে যায়। কালো টাক্সেডোর তলার অংশে রং ফেড হয়ে গেছে। ব্লিচ ব্যবহার করে যে, যে-কোনও রং ফেড করে দেওয়া যায়, এমনকি রক্তের রংও, এই বেসিক কেমিস্ট্রিটা মনে পড়ে যায়। সুচেতনায় চুমকির উপস্থিতি কল্পনা করি, অটোতে চাপিয়ে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও স্পষ্ট হয়ে যায়। গন্ধ আর রক্তের ছাপছোপ ঢাকতে ব্লিচিং ব্যবহার করাই এদেশে সবথেকে সস্তা আর সহজ উপায়।
আমার কানে গ্যাঁড়ার কথা অস্পষ্ট হয়ে ঢোকে। ওর ফোনটা কেটে বিজনের নম্বর ডায়াল করি। মোট সাতবার রিং হওয়ার পর বিজন ফোন ধরেন, ঘুমজড়ানো গলায় বলেন, “এখনও গোবিন্দ ভজছি ম্যাডাম, কিন্তু সত্যি বলছি কোনও খবর নেই।”
আমি রুদ্ধ গলায় বলি, “ফোর্স লাগবে। ঢাকুরিয়া। তাড়াতাড়ি।”
