৫
আজ সকালে বিজয়গড় কলেজের সামনে দাঁড়াতে বলেছিলেন বিজন। এ পাড়ায় এলাম প্রায় দেড় দশক পরে। স্কুল ছিল বাঘাযতীনে। আর এ পথে অলিতে গলিতে ছিল সহপাঠীদের বাড়ি। বিজয়গড় সেভাবে বদলায়নি। একটা বিরাট অঞ্চল জুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মার্কিন ছাউনি ভেঙে তৈরি পূর্ববাংলার উদ্বাস্তুদের কলোনি— যাদের অনেকেই দেশভাগের এক দেড় বছর আগে থেকেই কলকাতায় পাড়ি দিয়েছিলেন। বিজন অলিগলি পেরিয়ে আমায় নিয়ে চললেন। বড়োরাস্তা ছেড়ে ভিতরের গলিপথে নিবিড় গার্হস্থ্যের ছাপ।
এক মাছওয়ালা সাইকেলে করে মাছের জলহাঁড়ি নিয়ে বেরিয়েছেন।
“জ্যাঅঅঅন্ত মাছ” বলে ডাক ছাড়ছেন মাঝে মাঝে। দল বেঁধে কাজের মেয়েরা পথে বেরিয়েছেন। সাউথের ট্রেন ধরে ফের বিকেল নামার আগেই ফিরে যাবেন ঘরে। ওদের কারওর চলার গতি শ্লথ, কারওর খুব দ্রুত। কেউ কেউ পরিপাটি শাড়ি পরেন, কেউ আলুথালু। তবে সকলের মাথায় অনেক চুল, ভারী খোঁপায় বেঁধে ঘাড়ের কাছে ঝুলছে। কলকাতার দক্ষিণতম প্রান্তের গলিতে-গলিতে পথচলতি এই নারীবাহিনীর ছবি তুলতে কোনও রঘু রাই আসেন না। রাইবাবু বৃদ্ধ হয়েছেন, আর তাঁর মতো দৃষ্টি ক’জন ফোটোগ্রাফারের-ই বা আছে? মেয়েদের দল হাসতে হাসতে আমাদের উল্টোদিকে চলে গেল। প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের ভরে বিচ্ছিরি হর্ন বাজাতে বাজাতে ছুটে গেল একটা টাটাসুমো। এ পাড়ায় রক নেই। কিন্তু মোড়ে মোড়ে ক্লাব আর পুকুর আছে। বিশাল এক খেলার মাঠের পাশে তন্ময় সামন্তর বাড়ি।
“ফ্ল্যাট না বাড়ি?”
“বাড়ি। ওঁদের বাড়িতে দুর্গাপুজো হয়। বিজয়গড়ের প্রাচীনতম পুজোগুলোর একটা।”
বিজন একটা খিলান দরজার সামনে দাঁড়ালেন। তন্ময় সামন্ত আমায় কেন ডেকেছেন, কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। বিজনও কিছু বললেন না। ইট বের করা পুরোনো পাঁচিল দেওয়া তন্ময় সামন্তর বাড়িটা পাঁচশো মিটার দূরের সাততলা ফ্ল্যাটের পাশে নিষ্প্রভ। কিন্তু অতীতের একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। সেই গন্ধ বাড়িটাকে স্বতন্ত্র করেছে। পেয়ারা গাছ, কুয়োতলা, তারে মেলা লাল-সাদা গামছা, আর বিরাট উঠোনের একপাশে চণ্ডীমণ্ডপ, আর-একপাশে সার দেওয়া ঘর। উঠোনে যে পরিমাণ জায়গা খরচা হয়েছে, দেখলে যে-কোনও প্রোমোটার মাথায় হাত দিয়ে বসবেন। ঘরগুলো বাইরে থেকে পোড়ো মনে হলেও ভিতরে ঢুকলে আধুনিকই মনে হয়। তন্ময় সামন্ত একটা জগার পরে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
“ব্যাটা প্রোমোটার জীবন জেরবার করে দিয়েছে বুঝলি বিজন?” তন্ময় সামন্ত কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বললেন।
“একটা জগা কেস ঠুকে দাও। হেব্বি ক্রিমিনাল অফেন্স দিয়ে।”
“ধুউউস। সরষের মধ্যেই ভূত। চার শরিকের তিনজন চায় বাড়ি বিক্রি হোক পড়ে আমি একা বাঞ্ছারাম।” তন্ময় সামন্ত আমার দিকে চোখ তুলে বললেন, “বসুন ম্যাডাম। আপনাদের আজ অথেনটিক ঢাকাই ব্রেকফাস্ট খাওয়াব।”
ঘরটার চারিদিকে নজর ফেরালাম। মলাটবিহীন বইপত্রে ঠাসা। দস্তয়েভস্কি বেশি চোখে পড়ল, আর রাজ্যের পাল্প ফিকশন। তন্ময় সামন্তর পছন্দ বেশ ব্রড স্পেকট্রাম। যদিও এই সাতসকালে ওঁর বাড়িতে আমার অস্বস্তি হচ্ছিল।
তন্ময়দা প্লেটে করে, বেশ বড়োসড়ো কচুরির মতো খাবার নিয়ে ঢুকলেন। কচুরি বলছি কারণ এরকমটা আগে দেখিনি। পরতে পরতে ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা পরোটা ধরনের খাবার, কিন্তু লুচির মতো ফুলো, আবার পেটের মধ্যিখানটা ফাসানো। গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে সেখান দিয়ে। সঙ্গে একটা বাটিতে ঝাল ঝাল আলুর তরকারি। বিজন প্লেটটা প্রায় কেড়ে নিয়ে খাওয়া শুরু করলেন। আমি তন্ময়দার দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে দেখলাম। চোখ বুজে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। কী মতলব কিছু বোঝা যায় না।
“আর-একটা পরোটা নেবেন?”
আমি না করার আগেই তন্ময় সামন্ত একটা পরোটা তুলে আমার প্লেটে তুলে দিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “প্রমিতের ব্যাপারটা আমাদের কাছে চেপে যাওয়া বেশ ইন্টেলিজেন্ট পদক্ষেপ, ম্যাডাম। প্রোভাইডেড আপনি আরও কিছু লিড দ্রুত পান।”
বিজন খাবার খেতে খেতে একটা বিষম তুললেন। তারপর আমার আর তন্ময়দার সপ্রশ্ন দিকে তাকালেন।
“ম্যাডাম যে নারকোটিক্স রিং বার্স্ট করেছেন, তার অন্যতম খদ্দের প্রমিত দত্ত, বিভাবরীর দত্তদের বড়ো ছেলে। সে মাল শিলিগুড়ি থেকে ফিরলেই তাকে তোলা হবে। ছেলেটার কলেজ থেকে এনসিবি সলিড লিড পেয়েছে।” তন্ময় সামন্ত বিজনের দিকে তাকিয়ে বললেন। বিজনের চোখেমুখে অবিশ্বাসের ছাপ পড়ল।
“এনসিবি-এর ত্যাগী আমাকে ব্যাপারটা বলেছিল। এতে যদি ও আপনাদের অলিখিত কোনও চুক্তি ভেঙে থাকে, তা হলে আমি তার জন্য দায়ী। আমি লোকটা খুব একটা সুবিধার নই। দিন শেষে জোঁকের মতো খবরটরগুলো টেনে নিই।”
আমি খাবার খাওয়া বন্ধ করে লোকটার দিকে তাকালাম। ওঁর মুখে একটা চাপা হাসি। বিজন প্রবল ধাক্কা খেয়েছিলেন। আমি ধীরে ধীরে বললাম, “অলিখিত কোনও চুক্তি নেই। ত্যাগীর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। আসলে ওই অ্যাঙ্গলটা এই কেসে প্রভাব ফেলুক চাইনি। তাই…”
“আপনার কি মশাই মাথাখারাপ!” বিজন খাওয়া ফেলে উত্তেজিতভাবে বললেন, “দিন নেই, রাত নেই, নাওয়াখাওয়া ফেলে কেসের পিছনে ঘুরে বেরাচ্ছি, আর আপনি জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশনে এমন একটা তথ্য চেপে গেলেন! এর মানেটা কী?”
“বিশ্বাস করুন, এতে ইতরবিশেষ হবে না। ওই নারকোটিক্স অ্যাঙ্গলটা এখানে অপ্রাসঙ্গিক।”
বিজন গজগজ করে বললেন, “সেটা আপনি একাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন? এই তথ্যের কী কনক্লিউশন টানা যায়, আপনি বোঝেন? সাগর মণ্ডল নিশ্চিত জানত চুমকির খুনে জড়িয়ে যাওয়ায় পুলিশ ওকে তুলবে। তাই ও পালিয়েছিল। ড্রাগ কার্টেলের খুঁটিনাটি ফাঁস করে দিতে পারে, সেই ভয়েই ওকে ওরা উড়িয়েছে। চুমকির ব্যাপারটাও পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। ও সাগরের গার্লফ্রেন্ড ছিল। ওরা কোনও রিস্ক নিতে চায়নি।”
বিজনের চোখমুখ উত্তেজনায় লাল হয়ে গিয়েছিল।
“চুমকি যে সাগরের ব্যাপারটা জানতই, এমন কোনও প্রমাণ নেই।” আমি ঠান্ডা গলায় বললাম।
“থামুন তো ম্যাডাম।” বিজন মুখ বিকৃত করে বললেন।
তন্ময় সামন্ত হালকা গলায় ওকে ধমকালেন।
“আহ্, বিজন! ম্যাডাম ঠিকই বলেছেন তো।”
আমি চমকে ওঁর দিকে তাকালাম। বিজন একইরকম উত্তেজিতস্বরে বললেন, “কী ঠিক বলছেন? সাগরের খুন এজন্য হয়নি? সাগর ফাঁস করে দিত না?”
“প্যারাডক্সটা তো এখানেই। সাগর কেন ফাঁস করতে যাবে?” তন্ময় সামন্ত খুব ধীরে ধীরে বললেন।
“মানে?”
“মানে ফাঁস করলে ওর উপর বেশ বড়োসড়ো চার্জ লাগত। দশ বছর কাস্টডি মিনিমাম। ওর যা অ্যালিবাই ছিল, যে-কোনও বটতলার উকিল তুড়ি মেরে ওকে ছাড়িয়ে নিত।”
বিজন তন্ময় সামস্তর দিকে তাকালেন, যেন খুব কঠিন একটা প্রশ্নের এত সহজ উত্তর আশাই করেননি।
“ড্রাগ মাফিয়ার হাতে সাগর খুন হয়, এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু ভেবে দেখ, যদি সাগর খুন না হত, তবে ড্রাগ কার্টেলের ব্যাপারটা সামনেই আসত না। কার্টেলের কিংপিনরা এই রিস্ক নিল কেন, সেটাই ভাবার।”
বিজন দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলেন। অস্ফুটে বললেন, “ওহ!”
“চুমকির খুনের সঙ্গে সাগরের খুনের বেসিক পার্থক্যটা বোঝার চেষ্টা কর। সাগর খুন হল, মোবাইল গায়েব হল। তার মানে ফোনটা হল একটা টার্গেট। ওটা আমরা পেয়ে গেলে ওদের মুশকিল ছিল। কিন্তু চুমকির কেসে কেউ ফোন সরায়নি। এর মানেটা কী দাঁড়ায়, কী ম্যাডাম?” তন্ময়দা আমার দিকে মিটিমিটি হেসে তাকালেন।
“সম্ভবত চুমকি, ড্রাগ মাফিয়ার হাতে খুন হয়নি।” আমি ওঁর দিকে তাকিয়ে বললাম।
“আবার সম্ভবত কেন! লক করে ফেলুন। আমি আর বিজন পাশে আছি।” তন্ময় সামন্ত চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, “একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে বুঝলেন। আমারই মতো। ভেবেছিলাম আর ক’টা বছর… ডিপার্টমেন্ট উচ্ছনে যাক। আমি আর মাথা ঘামাব না। সেটা এ যাত্রায় আর হল না।”
আমি ওকে ধন্যবাদ দেব, না চুপ থাকব বুঝতে পারছিলাম না। উনি নিজেই অস্বস্তি কাটাতে বললেন, “সেই বিরানব্বুই সালে ফোর্সে ঢুকেছি। একানব্বুই সাল অবধি বাপের হোটেল খোলা ছিল। কুড়ি বছর বয়স। কী করব ঠিক নেই। বিজয়গড় জ্যোতিষ কলেজের এক ফিজিক্সের অধ্যাপক, মাদুলি কবচ তাবিজ এসব বিক্রি করার বিরাট ব্যাবসা ফেঁদেছিলেন। তাকে একদিন হাত খুলে মনের সুখ করে প্যাদালাম। বাবা বললেন, এসব এ বাড়িতে চলবে না। পেটাতে হলে লিগাল ওয়েতে পেটাও। পুলিশে ভর্তি হয়ে গেলাম, আর সারাজীবনের মতো ফেঁসে গেলাম। এখন চাইলেও মনের সুখ করে পেটাতে পারি না। চাকরি চলে যাওয়ার ভয় থাকে। যাক গে, কাল বালিগঞ্জ পিএসের সিদ্ধার্থ চাকলাদার ফোন করেছিল। সাকিব বলে কোন এক ব্লগারকে নিয়ে খোঁজখবর করছিলেন শুনলাম। নতুন লিড কোনও?”
“লিড কি না জানি না। সেক্রেটারি বললেন, এনট্রি রেজিস্টারে যে ফ্ল্যাটের নম্বর লেখা আছে, সাকিব আদৌ সেখানে যায়নি। উদ্দেশ্যহীনভাবে পুরো কম্পাউন্ডে ঘোরাঘুরি করছিল। লোকজনের সন্দেহ হওয়ায় জিজ্ঞাসাবাদ হয়। সদুত্তর দিতে পারেনি। চড় থাপ্পড় খায়। থানা থেকে একটা ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দেয়। এর পর থেকেই বিভাবরীতে নিয়ম হয়েছে, অজ্ঞাতপরিচয় কেউ এলে ফ্ল্যাটে ফোন করে জানাতে হয়।”
“কী নিয়ে ব্লগ করত ছেলেটি?”
“গত পাঁচ দশকের সাড়া ফেলে দেওয়া ট্রু ক্রাইম নিয়ে। শেষ ব্লগ দিব্যা আগরওয়ালকে নিয়ে।”
“দিব্যা আগরওয়াল!” তন্ময় সামন্ত নড়েচড়ে বসলেন, “সে তো আমাদের চাকরির প্রথমদিককার ব্যাপার।”
“সাতানব্বই সালের কেস দেখলাম।”
“আরে হ্যাঁ। সাড়া ফেলে দেওয়া কেস তো।”
“কেসটা বোধহয় এখনও আনসলভড?”
“হ্যাঁ, কপু, সিআইডি, সিবিআই সবশুদ্ধ ঝুল খেয়েছিল কেসে।”
“একটু ডিটেলে বলবেন?”
তন্ময়দার উঠোনে ক’টা চড়াই ঘুরছিল। একপাশে একটা বাটিতে গমের দানা আর জল রাখা। সেগুলো খুটে খুটে খাচ্ছিল। পাশের কোনও একটা ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে ঝনঝন শব্দে বাসন পড়ার শব্দ এল। আর এল একটা তপ্ত হাওয়া। চৈত্র মাস আসছে। তন্ময়দার মুখ চৈতি হাওয়ার মতো তপ্ত লাগছিল। চাপা নাকের উপর ঘাম জমছিল। কালো ফ্রেমের চশমার ওপার থেকে উনি আমার দিকে তাকালেন।
“আলিপুরের ভিগ্নেশ আগরওয়াল। বিখ্যাত রেন-বো চেন অফ হোটেলের মালিক। তাঁর দশ বছরের নাতনির ধর্ষণ এবং খুন হয়। আলিপুরের ফ্ল্যাট কমপ্লেক্সের পিছন দিকে ড্রাইভার্স কোয়ার্টার ছিল। তার পাশেই হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বাচ্চাটির দেহ উদ্ধার হয়। শ্বাসরোধ করে মৃত্যু। পোস্টমর্টেমে জানা যায়, ভ্যাজাইনাল আর অ্যানাল দু’রকম পেনিট্রেশন হয়েছিল। সারা শরীরে অসংখ্য ক্ষত। সবচেয়ে গভীর ক্ষত যোনিতেই। রড জাতীয় কিছু ঢুকিয়ে মেয়েটাকে … শ্বাসরোধ করে না মারলেও রক্তক্ষয় হয়ে মরে যেত।” তন্ময়দা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন।
“তারপর?”
“তারপর আর কী? লালবাজার থেকে তৎকালীন চুঁদে গোয়েন্দারা কেসটার পিছনে পড়েছিলেন। কিন্তু কোনও লিড আসেনি। ঘটনাস্থলের অদূরে একটি রুমাল উদ্ধার হয়। সিবিআই কেসটা টেকওভার করার পর সেই রুমাল থেকে সোয়াব নিয়ে ডিএনএ অ্যানালিসিস হয়। এর ঠিক আগে আগেই, দিল্লিতে সুদর্শিনী মাটুর কেসে ডিএনএ অ্যানালিসিস সফল হয়েছিল। এটাতেও তাই হবে সবাই ভেবেছিল। রুমালটায় মেয়েটির লালা ছিল, হাত- পা বেঁধে অত্যাচার করার সময় যাতে চিৎকার করতে না পারে, মুখে গুঁজে দিয়েছিল আততায়ী। কিন্তু মেয়েটির লালার সঙ্গে, রুমালে আরও একজনের ডিএনএ এভিডেন্স পাওয়া যায়।”
“সাসপেক্ট লিস্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছিল নিশ্চয়ই?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
“প্রশ্নই ওঠে না।”
“কেন!”
“রুমালে অন্য যে ডিএনএটি ছিল, সেটি ছিল আট বছরের এক বালকের। আট বছরের কেউ অমন পাশবিক অত্যাচার চালাতে পারে, এটা কারওর মাথায় আসেনি। ডিএনএ টেস্ট আবার রান করানো হয়, এবার টেস্ট রেজাল্ট আনডিটারমাইনড আসে। স্যাম্পল অ্যামাউন্ট কম ছিল।”
“ওহ!”
“কোনও চার্জশিট হয়নি?” আমি প্রশ্ন করলাম।
“নাহ্। কয়েকজনকে তোলা হয়েছিল। এতদিন পরে তো, খুব স্পষ্ট মনে নেই। তবে এক মালি, আর-এক ড্রাইভার মূল সন্দেহভাজনের তালিকায় ছিল। লালবাজারে টানা দশ দিন লাপসি খাওয়ার পরও তারা কিছু কবুল করেনি। তারপর তো ওইরকম একটা শকিং রিপোর্ট এল।”
“ওই কমপ্লেক্সে আট বছরের বাচ্চা কেউ ছিল না? মেয়েটার সঙ্গে খেলত এমন?”
“কেউ না। সবচেয়ে ছোটো এই মেয়েটিই ছিল।”
.
তন্ময়দার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় এসে গিয়েছিল। বিজন জুতো পরছিলেন। তন্ময়দা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, “প্রমিতের গার্লফ্রেন্ডের নাম কী রে? সিল্কস্মিতা? ত্যাগী বলছিল।”
“জিয়ামিতা।”
“ওই হল। সুন্দরী বলতে আমি ওই একজনকেই বুঝি। একটা ছোট্ট ইনফরমেশন আছে। প্রমিতের এই মিতা আসামের পিপলস ফ্রন্টের প্রেসিডেন্টের মেয়ে। প্রমিতের সঙ্গে মাস দেড়েকের সম্পর্ক ছিল। সেক্টর ফাইভে অল রোজেস আর ডার্ক বলে একটি হাই ফান্ডা হোটেল আছে, বড়োলোকের ওয়ো আর-কি। সেখানে বিরাট বাওয়ালের পর এদের মধ্যে ব্রেক আপ হয়।”
“বাওয়াল?”
“হুম। অল রোজেস আর ডার্কের কর্তৃপক্ষ এই নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে। তবে প্রমিত আর জিয়ামিতাকে রুম থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। এর পরপরই প্রমিত ওর আর ওর গার্লফ্রেন্ডের ভিডিয়ো, ইনস্টাতে আপলোড করে। আর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে দেয়। সোর্স বলছে, প্রমিত আসামি শ্বশুরের পোষা গুন্ডাবাহিনীর থেকে থ্রেট খেয়েছিল।”
“হোটেলটার অ্যাড্রেস দেবেন আমায়?”
“দেব। কিন্তু সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদে বিশেষ লাভ হবে না। প্রমিতের আসামি শ্বশুরের কামাখ্যাছাপ বশীকরণ আছে ওখানে। ওটা একটু অন্যভাবে চেষ্টা করতে হবে। আমার উপর ছেড়ে দে।” তন্ময়দা আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, “মেয়েদের ইন্সটিংক্ট ব্যাপারটা হেলাফেলার ব্যাপার নয় বুঝলি। আমার মা দশ কিলোমিটার দূর থেকে বুঝতেন, আমি কোনদিন মাল ইয়ে মদ খেয়ে ঢুকছি। এত শতাব্দী ধরে গ্যাসলাইটিং আর ম্যানিপুলেশনের পরেও যা টিকে থাকে, তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। কাজেই তুই চালিয়ে যা।”
তন্ময়দার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বললাম “থ্যাংকস।”
তন্ময়দা উত্তরে কিছু বললেন না। বইয়ের র্যাক থেকে একটা বই তুলে নিলেন। বাইরে বেরিয়ে এসে বিজন বললেন, “সরি। খুব উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলাম।”
“না, আমারই ভুল। আপনাকে বিশ্বাস করে বলা উচিত ছিল। আসলে তন্ময়দা গোটা ব্যাপারটায় এভাবে রিঅ্যাক্ট করবেন, সেটা বুঝিনি। ভাবছিলাম আপনারা নারকোটিক্সের অ্যাঙ্গলটা নিয়ে রিজিড হয়ে যাবেন।”
বিজন একটা অটো হাত দেখিয়ে দাঁড় করালেন।
আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “আপনি তা হলে ওই গল্পটা শোনেননি।”
“কোনটা?”
“এক জঙ্গলে এক সিংহ ছিলেন। রাজা বলে তার বিরাট খাতির ছিল। সপার্ষদ থাকতেন, শিকারটিকার করতে হত না। অন্যে খাবার জোগাড় করে দিয়ে যেত। ক্রমশ বৃদ্ধ হলেন, অশক্তও। দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে শিকার করাও ভুলে গেলেন। নিজেরও যে খুব ভালো লাগত তা নয়, মাঝে মাঝে ভাবতেন কী যেন জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। কীসের বলে এককালে রাজা হয়েছিলেন, তা এতদিন পরে আর মনে পড়ে না। একদিন ভোরে সবে ঘুম ভেঙেছে, দেখলেন সামনের জঙ্গলে হুটোপাটি লেগেছে। আড়মোড়া ভেঙে দ্যাখেন, এক বিরাট বাইসনের সঙ্গে একটি কচি সিংহ যুদ্ধে নেমেছে। সে বয়সে নবীন, পেশিতে তেমন বল নেই, শিকার করার রীতিনীতিও বিস্তর শেখা বাকি। কিন্তু যা আছে, তা হল আশ্চর্য অপরিণামদর্শী সাহস। বাইসন তেড়ে আসছে, ওকে রক্তাক্ত করছে, কিন্তু মাটিতে ফেলে ফেঁড়ে ফেলতে পারছে না। বৃদ্ধ রাজার চোখ চকচক করে উঠল। তার দিন গেছে, কিন্তু ঠিক কোন বলে তিনি এককালে রাজা হয়েছিলেন, তা তাঁর মনে পড়ে গেল।”
“নবীন সিংহকে তিনি কিছু শেখালেন না?”
“শেখালেন। মন প্রাণ ঢেলে শেখালেন। শেখাতে গিয়ে তিনি নিজেও পরিত্রাণ পেয়েছিলেন যে।”
৬
ওষুধের দোকানগুলোয় খোঁজ নিয়েছি বুঝলেন। চুমকি সত্যিই পাড়ার দোকান থেকে কন্ডোম বা কনট্রাসেপ্টিভ কেনেনি।
সাগর?
না। সে-ও না।
বিজন অটো থেকে নেমে বললেন। আকাশে একটা গুমোট ভাব করেছিল।
টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনের বাইরে সার দেওয়া দোকানের একটায় লসির গ্লাস তুলে নিলেন বিজন। আমি একটা স্প্রাইট নিলাম।
“সাগর আর চুমকির চ্যাট লিস্ট পড়ছিলাম। সেক্সুয়াল কনটেন্ট কিছু নেই। বেশিরভাগ খুব ক্যাজুয়াল কথাবার্তা।”
“যা বলেছেন। খেয়েছ, ঘুমিয়েছ, কখন বাড়ি ফিরেছ, এত দেরি হল কেন, সকালে বাড়ি ছিলে না কেন- এ কি প্রেম না শো-কজ লেটার?” বিজন মুখ বেঁকিয়ে বললেন।
“আচ্ছা, এই চন্দনটা কে? একটা ভয়েস কল আছে দেখছি। তিন মিনিট তেত্রিশ সেকেন্ড মতো।”
“সুচেতনা বলে একটা অরগানাইজেশন চালায়। লোকাল ছেলে। প্লাবন হারিয়ে গেলে কিছুদিন চুমকির সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করেছিল।”
বিজন এক নিঃশ্বাসে লসি শেষ করে ফেলেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে খিস্তি দিলেন। ওকে লালবাজার যেতে হত। আমার লালবাজারে গিয়ে চোদ্দো গন্ডা ফর্মালিটির ভিড়ে মাথা ঘামাতে ইচ্ছা হচ্ছিল না একটুও। বিজনকে বললাম, গড়িয়াহাট যাব। একবার আপনার ছেলের স্কুলে ঘুরে আসব।
মেট্রো কালীঘাট স্টেশন ছুঁল আট মিনিটের মধ্যে। কাচের জানালার ওপারে, বিজন দ্রুত চোখের নাগালের বাইরে চলে গেলেন। রাসবিহারী মেট্রোর সামনে বেরোতেই গুমোট আবার চেপে ধরল। আচার আর হজমিগুলির লোভনীয় সম্ভার থেকে শুকনো আদার হজমি পকেটে পুরলাম। বালিগঞ্জ পর্যন্ত অটো রুট তিনভাগে ভাগ এখানে। গড়িয়াহাটের অটো লেক মার্কেট অবধি ধীরে চলে, তারপর সত্যিকারের অটো পাইলট মোডে চলে গিয়ে দৌড়োতে থাকে। অটোর সামনের স্ক্রিনে ফোন-পের স্ক্যানকোড লাগানো। পৃথিবী দ্রুত ক্যাশলেস হওয়ার দিকে হাঁটছে। যে জটিল জ্যামিতিতে এ পথে অটো চলে, তাতে খুচরো গোনার মতো অকিঞ্চিৎকর বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই।
স্কুলের ঠিকানা বিজনের কাছ থেকে বুঝে নিয়েছিলাম। গোলপার্কের গোল চক্কর ছাড়িয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের উল্টো ফুটে গার্ডেন ভ্যালি স্কুল। তিন দশকের পুরোনো বয়েজ স্কুল। পাঁচতলা বিল্ডিং, কম্পাউন্ড জুড়ে তিনটে ব্লক। ভলিবল প্র্যাকটিস চলছিল স্কুলে। নীল ট্র্যাক প্যান্ট আর লাল শার্ট পরিহিত গেমস টিচার স্টাফরুম দেখিয়ে দিলেন। দোতলায় প্রাইমারি সেকশনের স্টাফ রুম। দীক্ষা আগরওয়াল ক্লাস টু এ-এর ক্লাস টিচার। তরতরে মুখের মেয়েটি গম্ভীরমুখে সবকিছু শুনল। ত্রিদীপ দারুণ মেধাবী ছাত্র নয়। তবে শান্ত এবং বাধ্য প্রকৃতির ছেলে ছিল। ক্লাস ওয়ানের অ্যানুয়ালের আগে সমস্যা তৈরি হয়। গার্জিয়ান কল করে বিশেষ লাভ হয়নি। কাউন্সেলরের পোস্ট সে-সময় শুন্যপদ হয়েছিল। টু-তে ওঠার পর দুটো সেশন করেছেন নতুন নিযুক্ত কাউন্সেলর। খুব একটা লাভ হয়নি। ভায়োলেন্সের সমস্যাটা চলতে থাকে। গত হপ্তায় একটি বাচ্চার মাথায় ফিনাইলের বোতল খুলে ঢেলে দেয়। আপাতত ওকে স্কুলে আসতে বারণ করেছেন কর্তৃপক্ষ। কাউন্সেলরের চেম্বার দেখিয়ে ক্লাসে চলে গেল দীক্ষা।
.
“দেখুন, আমার সঙ্গে ত্রিদীপের মাত্র দুটো সেশন হয়েছে।” ত্রিদীপ দত্তর ফাইলটা ক্যাবিনেট থেকে বের করে আনলেন মিসেস মৈত্র। পাতা উল্টে দেখে ইংরেজি মেশানো বাংলায় বললেন, “প্রবলেমটা শুরু হয়েছিল ক্লাসে পটি করে ফেলার পর থেকে। ও এই স্কুলে নার্সারি থেকে পড়ছে। এরকম আগে কোনওদিন করেনি। তবে এসব ব্যাপার অস্বাভাবিক কিছু নয়, তাই প্রথমে স্কুল অথরিটি প্রথমে ব্যাপারটা ইগনোর করে। কিন্ত প্রায় প্রত্যেক হপ্তাতেই বাচ্চাটা ক্লাসে প্যান্ট সয়েল করতে থাকে। ক্লাস টিচার বকাবকি করলেও টয়লেটে গিয়ে পরিষ্কার হতে চায় না। বাধ্য হয়ে গার্জিয়ান কল করা হয়। ত্রিদীপের মা আসেন। উনি কথা দেন, এরকম আর হবে না।”
“বাচ্চার প্যান্ট নোংরা করে ফেলার খবরে ত্রিদীপের মা কী বললেন?”
মিসেস মৈত্র একটু ভেবে বললেন, “আমার মনে হয়েছিল বাড়িতেও একই সমস্যা করছিল। ভদ্রমহিলাকে খুব একটা অবাক হতে দেখলাম না। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ভদ্রমহিলা স্বীকার করতে চাননি।”
“এছাড়া আর কী সমস্যা?”
“মূলত যখন তখন অ্যাগ্রেসিভ হয়ে যাওয়া। অ্যাগ্রেসনের ধরনটা একটু চিন্তাজনক।”
“কীরকম?”
মিসেস মৈত্র চোখ থেকে চশমা খুলে বললেন, “ত্রিদীপের সঙ্গে আমি কথা বলে দেখেছি। এই বয়সের বাচ্চাদের মধ্যে একধরনের প্যাসিভ অ্যাগ্রেসিভনেস কাজ করে। মানে সহপাঠীদের ব্যাপারে নেগেটিভ কথা বলা, হিংসা বা বুলিং করার টেন্ডেন্সি। ওর মধ্যে সেসব নেই। একটু গোঁজ হয়ে বসে থাকে ক্লাসে। হঠাৎই রেগে গিয়ে পাশের বাচ্চাটাকে মারতে শুরু করে।”
“কীভাবে ট্রিগার্ড হল?”
“এটা দেখুন।” মিসেস মৈত্র কম্পিউটারে একটা সিসিটিভি ফুটেজ চালিয়ে দিলেন। ক্যামেরাটা একটা ক্লাসের ফ্রন্ট ভিউ দেখায়। চারটে রো। ডানদিক থেকে দ্বিতীয় রো-তে দ্বিতীয় বেঞ্চে ত্রিদীপ বসে। পাশে অন্য একটি ছেলে। মিসেস মৈত্র ক্যামেরা জুম করলেন। ত্রিদীপের মুখটা ভালো করে বোঝা যায় না। পাশের ছেলেটি ত্রিদীপের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলল। ত্রিদীপ খাতায় লেখা ছেড়ে বাচ্চাটিকে এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করল।
“কী বলেছিল বাচ্চাটা জানা গিয়েছিল?”
মিসেস মৈত্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, “আমি জানার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু এই ছেলেটি, মানে শুভদীপের বাবা-মা এই ফিজিকাল অ্যাবিউজ নিয়ে বিরাট ঝামেলা করেন। ত্রিদীপের এগেন্সটে অনেকগুলো কমপ্লেন আসছিল। ফলে শুভদীপের বাবা-মা যখন প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করেন, তখন কেসটা পুরোপুরি ওর এগেন্সটে চলে যায়। ছেলেটি আসলে কী বলেছিল, যার জন্য ত্রিদীপ অমন ট্রিগার্ড হয়ে যায় সেটাই জানা যায়নি। আই জাস্ট কুডনট কোয়েশ্চেন হিম এনি মোর। প্রিন্সিপাল স্যারের কড়া নির্দেশ ছিল।”
“হুম। ত্রিদীপের ক্লাস কতবার সাসপেন্ড করা হয়?”
“মোট তিনবার।”
“সাসপেনশনের পরে কোনও পরিবর্তন?”
“নাহ্। রাদার ইট বিকেম ওর্স। ও নিজেকে ক্লাস থেকে পুরোপুরি উইথড্র করে নিয়েছিল। তবে, ভায়োলেন্সটা ফর সাম রিজন কমে গিয়েছিল। আবার সেদিন টয়লেটে…”
“হুম। শুনলাম।”
“ওর সঙ্গে কথা বলে ডিটেলে জানার জন্য আমার আরও দু’-চারটে রাউন্ড দরকার ছিল। কিন্তু ওকে এখন সাসপেন্ড করেছে স্কুল। বাচ্চাটাও খুব উইথড্রন এই মুহূর্তে, আর এক্ষেত্রে কাউন্সেলরকে ব্যক্তিগত ভরসার স্থল হয়ে উঠতে হয়। হি মাস্ট রিলাই অন মি, বিফোর হি ওপেনস আপ। আমি সে-সময়টা পাইনি।”
“আপনি দুটো সেশন তো পেয়েছেন। আপনার ব্যক্তিগত অবজারভেশন কী বলে?”
মিসেস মৈত্র একটু ভেবে বললেন, “দেয়ার ইজ সামথিং টেরিবলি ডিস্টার্বিং ইন হিম। কী সেটা আমি জানি না। কিন্তু আমি শিওর, বাচ্চাটা একটা ট্রমার মধ্যে আছে।”
“আপনি ওর পেরেন্টসদের ইনফর্ম করেছিলেন?”
“অফকোর্স। ইনফ্যাক্ট আমি মিসেস দত্তকে প্রোফেশনাল মেডিকেল হেল্প নিতে বলি। নিয়েছেন কি না আমি জানি না।”
“ওর সঙ্গে সবসময় থাকত এক মেড, রিসেন্টলি মেয়েটি মার্ডারড হয়েছে। এই ধরনের ডিস্টার্বেন্স বা ট্রমা, কি নিকটজনের মৃত্যু থেকে হতে পারে?”
“হতে পারে। কিন্তু আপনি তো বলছেন ঘটনাটা রিসেন্ট। আর ত্রিদীপের সমস্যাটা চলছে এই বছরের শুরু থেকে।”
.
বাইরের আকাশ একটু ঘোলাটে হয়েছিল। বৃষ্টি নামবে কি না বুঝছি না। দীক্ষা আগরওয়াল এখনও ক্লাস থেকে ফেরেননি। গার্ডেন ভ্যালির বিরাট বড়ো মাঠে এখনও খেলা চলছে। দু’-একটি বাচ্চা মাঠের বাইরে বেঞ্চে বসে ডাকের অপেক্ষা করছে। ত্রিদীপের সহপাঠী শুভদীপের সঙ্গে কথা বলা দরকার। ত্রিদীপের ট্রমার কারণ যাই হোক না কেন, চুমকির মৃত্যুতে সেটা বেড়েছে বলে আমি নিশ্চিত। গৌরকিশোরবাবু সব জেনেও এমন ভাব করছেন যেন স্কুলে এবং বাড়িতে সব ঠিক আছে। আর মিসেস দত্ত, উনিও কি ব্যাপারটাকে ক্যাজুয়ালি নিচ্ছেন? “সমস্যা একটাই ম্যাডাম, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এরকম কোনও ট্রমা দেখলে একমাত্র উপায় গার্জিয়ানদের ইনফর্ম করা, এছাড়া কোনও গাইডলাইন, কোনও আইন বা কোনও সোশ্যাল সার্ভিস নেটওয়ার্ক নেই যার সাহায্য নেওয়া যায়।” মিসেস মৈত্রের কথাগুলো কানে বাজছিল। গৌরকিশোরবাবু বাবা হিসেবে একেবারেই সংবেদনশীল নন। ত্রিদীপের মা কতটা ছেলের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন? কাউন্সেলর এবং স্কুল ওকে জানিয়েছে। ত্রিদীপ কী ধরনের কষ্টে আছে, মৌলি দত্ত কি জানেন?
দীক্ষা আগরওয়ালের হাত ধরে গোলগাল চেহারার শুভদীপ, করিডরে এসে দাঁড়াল। বাচ্চাটা ভয় পাচ্ছিল। দীক্ষা জানালেন, শুভদীপকে যা প্রশ্ন করার ওঁর সামনেই করতে। কোনওরকম অস্বস্তি তৈরি যেন না হয়। প্রিন্সিপাল স্যারের কড়া নির্দেশ।
“ত্রিদীপ তোমার বন্ধু?”
শুভদীপ গুলি গুলি চোখে আমার দিকে তাকাল। উত্তর দিল না।
“ও তোমায় মেরেছিল?”
এবার মাথা উপরে-নীচে নড়ল।
“কেন মেরেছিল জানো?”
শুভদীপ আমার চোখ এড়িয়ে বাইরে মাঠের দিকে তাকাল। ওর হাতের মুঠোয় দীক্ষার হাত শক্ত করে ধরা।
“ও কি তোমায় সবসময় মারত?” আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম। শুভদীপ ঘাড় নাড়িয়ে ‘না’ উত্তর দিল।
“তবে?”
“আমি একটা জিনিস চেয়েছিলাম।”
“কী জিনিস?”
“একটা স্পাইডারম্যানের মুখোশ। সত্যি মুখোশ।” শুভদীপ মুখ নিচু করে বলল।
“সত্যি মুখোশ মানে?”
“একটা মুখোশ যেটা পরলে সত্যি স্পাইডারম্যান হওয়া যায়।”
“ত্রিদীপের কাছে ছিল!”
“আছে তো। ওর যখন কিছু ভালো লাগে না, তখন মুখোশটা পরলে সব ঠিক হয়ে যায়।”
“এ কথা তোমাকে কে বলল?”
“ও নিজেই বলেছিল। আমি ক’দিন ধরেই চাইছিলাম ওর কাছে। দিচ্ছিল না। সেদিন চাইতে…” শুভদীপ থেমে গেল।
“তুমি মুখোশটা দেখেছ?”
“না। গল্প শুনেছি। লাল রঙের মুখোশ, চোখের কাছে নীল।”
গার্ডেন ভ্যালির গার্ডেন ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। মর্নিং স্কুল শেষের পথে। দীক্ষা আগরওয়াল ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে গেলেন। আমার পেটে ঢাকাই পরোটা হজম হয়ে গেছে বহুক্ষণ। কিন্তু খিদের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় আমার মাথা ধরে, সেটা আজ ধরেনি। মানবজাতির সমস্যায় পিটার পার্কার আশ্চর্যজনকভাবে ছাদ, জানালা এমনকি আকাশ ভেঙে ঢুকে পড়েছেন বহুবার। অথচ কলকাতা শহরের বুকে দু’হাজার পঁচিশ সালে দাঁড়িয়ে সাত বছরের একটি বাচ্চা, তার কোন কষ্ট ভুলতে পার্কারকে আঁকড়ে ধরেছে, সেই খবর কি স্বয়ং স্পাইডারম্যান রাখেন?
৭
অপরাজিতা ওর ফ্ল্যাটের বারান্দায় একটা বার্ড ফিডার লাগিয়েছিল। তাতে রোজ দানাপানি দিয়ে রাখত। আশা এই যে, পাখিরা এসে মাঝেমধ্যে খাবার-দাবারের বিনিময়ে গান শোনাবে। কিন্তু সে-গুড়ে বালি। মাঝখান থেকে ক’টা পায়রা এসে গমের দানা খেয়ে বারান্দা নোংরা করে রাখত। বার্ড ফিডারটা এখনও বারান্দায় ঝোলে। শুধু দানাপানি থাকে না। আজ অদ্ভুতভাবে একটা নীলচে গলার পায়রা সেই বার্ড ফিডারে বসে দোল খাচ্ছিল। ফাঁকা বারান্দায় বহুদিন পরে মানুষের পা পড়ছে। পায়রা বোধহয় উষ্ণতা বোঝে। পাখিরা সবথেকে সংবেদনশীল প্রাণী।
বেলা দুটো বাজছিল। আজ বহুদিন পরে দুপুরে বাড়িতে রান্না করেছিলাম। রান্না বলতে ভাত, ডাল, শুক্তো আর মাছভাজা। ল্যাপটপটা খোলাই ছিল। আজ টুম্পার সঙ্গে দেখা করার কথা সন্ধেয়। ওকে একটা রিমাইন্ডার মেসেজ ছাড়লাম। ল্যাপটপ স্ক্রল করতে করতে বারান্দার দিকে চোখ গেল। পাখিটা এখনও ফিডারেই বসে। এখন যদি ওকে বাবা বাছা, আয় খেয়ে নে বলে খাবার বেড়ে ডাকি, ও উড়ে যাবে। মানবরক্তের তঞ্চকতাকে পক্ষীকুল ভয় পায়। পাখিটা গাল ফুলিয়ে গলা ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক দেখছিল। ঘরের ভিতর অবধি ওর চোখ পৌঁছোয় না নিশ্চিত। শুনেছিলাম, রয়টার্সের ভুবন কাঁপানো নিউজ নেটওয়ার্কের গোড়াতে আছেন একটি বার্তাবাহী পায়রা। তারই বংশধর আমার বারান্দায় বসে দোল খাচ্ছেন, ভেবে হাসব না কাঁদব বুঝলাম না।
ল্যাপটপে সাকিবের ইউটিউব চ্যানেল খোলা ছিল। ইউটিউব ব্লগারদের লোকে যতই আড়েআড়ে দেখুক, ওদের নিয়ে আমার মত ভিন্ন। ইউটিউব চ্যানেলের অ্যাবাউট থেকে সাকিবের চ্যানেলের ইমেল আইডি পেলাম। সৌভাগ্যবশত সাকিব তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলের লিংক দিয়ে রেখেছেন। লিংকে ক্লিক করলে সাকিবের প্রোফাইল পিকচার খোলে। অতি সাধারণ চেহারার ছেলে। ‘ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম’ শব্দটার সঙ্গে একধরনের গ্ল্যামার জড়িয়ে আছে, সাকিবের চেহারায় সেটা নেই। সেটা এক দিক থেকে ভালো, আমায় যদি সোনাক্ষী সিনহা বা দীপিকা পাড়ুকোনের মতো দেখতে হত, তা হলে প্রোটোটাইপ মহিলা পুলিশ অফিসারের সঙ্গে একটুও ফারাক থাকত না। তাতে সুবিধে কম, অসুবিধে বেশি। পাত চেটে শুক্তো খাওয়া ছাড়তে পারব না। সারাদিন ভাঁজবিহীন ইউনিফর্মে ঘুরে বেড়ানোও আমার পক্ষে অসম্ভব। সানগ্লাস অধিকাংশ সময় খুঁজে পাই না, আর সিগারেট খাওয়াকে মোটেই ফ্যাশনেবল ভাবি না। মাথা ধরা বা পেট পরিষ্কারের ওষুধ ভাবি বড়োজোর।
সাকিবের প্রোফাইলটা স্ক্রল করলে খানিকটা ওর কাজের বিবরণ পাওয়া যায়। কী নিয়ে কাজ করছেন সেটা সম্পর্কে ছোট্ট সামারি লিখে কমেন্ট বক্সে ইউটিউবের লিংক দেওয়া। পোস্টে লাইক কমেন্ট বেশ ভালো। আড়াইশোটি রিঅ্যাকশন। সাকিবের মতো ব্লগাররা দেশের মধ্যে একটা বিকল্প নিউজ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছেন। যে খবরগুলো, যে তথ্যগুলো অকিঞ্চিকর বা অপ্রয়োজনীয় বলে ছেড়ে দেয় প্রথম সারির মিডিয়া, ব্লগগুলো যত ছোটো মাপেই হোক— সেগুলোকে তুলে আনার চেষ্টা করছে। অনেকটা রয়টার্সের পায়রার মতো।
সাকিবের ফেসবুক অ্যাবাউট মি-তে বাড়ির ঠিকানায় বারুইপুরের নাম লেখা। আরও কিছু ব্যক্তিগত তথ্য থাকলেও, ফোন নম্বর প্রাইভেট করা।
মেসেঞ্জারে একটা মেসেজ করে রাখাই যায়। নিশ্চয়ই যোগাযোগ করবেন। মেসেজ লিখে পাঠালাম ঠিকই, কিন্তু সেটা আনডেলিভারড হল। আশ্চর্য! এই লোক তথ্য আদানপ্রদান করে কী ভাবে! মূল প্রোফাইল খুলে কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করতে গিয়ে সমস্যাটা বুঝতে পারলাম। সাবিরের শেষ ফেসবুক পোস্ট নভেম্বরে, শেষ ইউটিউব পোস্টের মতোই। কোনও বিকল্প চ্যানেল বা বিকল্প প্রোফাইলের লিংক দিয়েছেন কি সাকিব! গোটা প্রোফাইল হাতড়ে সেরকম কিছু পেলাম না। বারান্দার দিকে তাকালাম। রয়টার্সের পায়রা উড়ে গেছে ততক্ষণে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছিল। টুম্পার সঙ্গে যা কথা হয়েছে, পৌনে পাঁচটায় বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের পেট্রোল পাম্পে দাঁড়াবে। ফ্ল্যাটে চাবি দিয়ে নামতে
নামতে পকেটে ফোনটা বাজল। তোলার আগে কেটে গেল। ফোন বের করে ঘুরিয়ে ফোন করতে বিজন উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, “আপনি কোথায় দর্শনা?”
“বেরোচ্ছি। কী হয়েছে?”
“এনসিবির ত্যাগীর সঙ্গে কথা হল একটু আগে। ওরা প্রমিতের বিরুদ্ধে সব এভিডেন্স, আর উইটনেস রেডি করে ফেলেছে। ওকে কালই শিলিগুড়ি থেকে তুলবে। একইসঙ্গে কলকাতার ফ্ল্যাটে রেইড করবে।”
“তন্ময়দা জানেন?”
“ফোন করেছিলাম। সব শুনল।” বিজন বিরস গলায় বললেন। “কিছু বললেন না?”
“সোজা কথা উনি বলেন কোনওদিন? কোথায় একটা যাচ্ছিলেন। বললেন, দর্শনাকে বলিস ওই গানটা শুনতে।”
“কোন গান?”
“আরে ওই তো, গুরু দক্ষিণার গান। ফুল কেন লাল হয়, সে কি জানা যায়?”
“আচ্ছা সে না-হয় শুনব। কিন্তু আপনি একটা কাজ করবেন। সাকিবের ফোন নম্বরটা পাঠাচ্ছি, বারুইপুরের ছেলে। ডেটাবেস ঘেঁটে ওর অ্যাড্রেসটা বের করে দিন।”
“বেশ। এ তো দু’মিনিটের কাজ।”
“আসল কাজটা তার পরে করবেন। আমার সঙ্গে বারুইপুর যাবেন।”
“হঠাৎ সাকিবকে নিয়ে পড়লেন কেন বলুন তো?”
“’টেক দ্য রোড হুইচ কামস ফার্স্ট টু ইউ’- অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ। শোনেননি?”
বিজন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন ছাড়লেন, পরিষ্কার বুঝতে পারলাম। প্রমিতের গ্রেফতারির খবরে একটা উল্লাস হচ্ছিল, সে-কথা লুকিয়ে লাভ নেই। এনসিবি র লিডটা আমার দেওয়া, এই নিয়ে ডিপার্টমেন্ট থেকে পিঠ চাপড়ানির প্রত্যাশা নেই অবশ্য। তবু সাফল্য মানে সাফল্যই। সাগর মণ্ডল যে কারণেই খুন হয়ে থাকুক না কেন, তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কারণ প্রমিত। ঝুমা এখনও রোজ মেসেজ করে দাদার কেসের প্রগতি জানতে ভোলে না। পুলিশের কাছে প্রগতি যা, পাবলিকের কাছে তা নয়। উই ওয়ান্ট রেজাল্ট— কমিশনার সাহেবের মতো সজোরে তারা বলতে না পারলেও, মেসেজে বা কলে, আকারে ইঙ্গিতে সেটাই বলে যায়। প্রতি বার। বার বার। ঘুম, খিদে, আর নিশ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রশ্নগুলো আমার মাথায় বাজতে থাকে। কোনও কোনও ধাঁধার, চটজলদি উত্তর পাওয়া যায়। আর কোনও কোনওটার সমাধান এসচেরিয়ান সিঁড়ির মডেলের মতো। মনে হচ্ছে উপরে উঠছি, আসলে দাঁড়িয়ে আছি একই জায়গায়। বিজন বুঝতে না পারলেও, আমি গুরু দক্ষিণার গানের মানে বুঝতে পারছিলাম। তন্ময়দা সেক্টর ফাইভ গিয়েছেন। সেখানে অবশ্য ফুলের রং লাল নয়, প্রতিটা গোলাপই কালো।
.
টুম্পা একটা উজ্জ্বল হলদে-লাল সালোয়ার-কামিজ পরে দাঁড়িয়েছিল। ওকে সামনাসামনি দেখলাম এই প্রথম। কোথায় ভালো লসি-টস্সি পাওয়া যায়, প্ৰশ্ন করতে গলির মধ্যে একটা ছোট্ট জয়েন্ট দেখাল। দুটো লসির অর্ডার দিয়ে টুম্পাকে বললাম, “দাঁড়িয়ে কেন, বসো।”
টুম্পা ওড়না দিয়ে ওর মুখের ঘাম মুছল। মেয়েটার মুখশ্রী সুন্দর। ভয়ডর নেই। একটু জড়োসড়ো হয়ে ছিল, লসি আসাতে সেটুকু কেটে গেল। পাশের টেবিলগুলোয় লোক নেই। একটা পনিটেল বাঁধা ছেলে আর আইব্রো পিয়ার্স করা কোঁকড়া চুলের মেয়ে দু’কাপ কফি নিয়ে বসে গুলতানি করছিল। মেন রোডের থেকে সামান্য ভিতরে বলেই এখানে ট্র্যাফিকের শব্দ পৌঁছোয় না। টুম্পা লসিতে চুমুক দিয়ে এদিক ওদিক দেখছিল। বিশেষ করে উল্টো টেবিলের জোড়ার দিকে ওর চোখ চলে যাচ্ছিল বার বার।
“তোমার মেয়েকে কার কাছে রেখে এলে?”
টুম্পা লসির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, “আমার বর আজ বাড়ি আছে।” মেয়েটার গলার স্বরে একটু দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার টান আছে। কথা বলার সময় নাকছাবিতে হাত দেয় বার বার। ওকে থানার ফরমাল পরিবেশে জিজ্ঞাসাবাদ করব না ঠিক করেছিলাম। বিশেষত যা জানতে চাইছি, তা ঠিক কেজো পরিবেশে হয় না। টুম্পা আমার দিকে বারে বারে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিচ্ছিল। ওকে বললাম, “সাগর আর চুমকির মধ্যে তো ভালোবাসাবাসির সম্পর্ক ছিল, জানো তো?”
“হ্যাঁ।” টুম্পার আমার প্রশ্নে একটু সংশয় হল যেন।
“তুমি তো ওর কাছের বন্ধু ছিলে, কতটা কাছের সম্পর্ক ছিল দু’জনের?”
টুম্পা একটু ভেবে বলল, “কাছের বলতে, কাছেরই ম্যাডাম। বিয়ে করত তো ওরা দু’জন।”
“ঝগড়াঝাটি হত না?”
“ঝগড়াঝাটি আর কোথায় হয় না ম্যাডাম? আমার বর তো আমায় বিয়ের আগে মেরে কপাল ফাটিয়ে দিয়েছিল। তাই বলে কি ভালোবাসে না?”
আমি টুম্পার কথার উত্তর দিলাম না। হিন্দি সিনেমার পরিচালকদের খিস্তি দিয়ে লাভ নেই, মেয়েদের অনেকেই ভালোবাসার সঙ্গে মারধোরটাকে বাই ওয়ান গেট ওয়ানে পেয়েছে ভেবে নেয়।
“দু’জনের মধ্যে টাকাপয়সা নিয়ে কথা হত?”
“কথা বলতে?”
“মানে হয় না, এ কিছু রাখতে দিল, ও জমাল, যেরকম তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হয়।”
টুম্পা হেসে ফেলল।
“বিয়ের আগে কোন বয়ফ্রেন্ড বিশ্বাস করে গার্লফ্রেন্ডের হাতে টাকা দেয় ম্যাডাম? আমার চেনাশোনার মধ্যে তো শুনিনি। বিয়ের এত বছর হয়ে গেল, আমার বর সংসার খরচের টাকাটুকু মাস গেলে হাতে তুলে দেয়, কত রোজগার করে এখনও জানি না।”
“সাগর চুমকিকে বিশ্বাস করত না বলছ?”
“ও ছেলেটার একটু সন্দেহবাতিক ছিল। সে ছেলেদের অমন থাকে। চুমকিকে একবার ফাঁড়ির কাছে দেখতে পেয়ে খুব হল্লা করেছিল। চুমকি যেখানে যাবে, ওকে বলে যেতে হত।”
“চুমকি এগুলো মেনে নিত?”
“না। ও ও ঝগড়া করত। আবার ক’দিন পর মিটমাট হয়ে যেত।”
“সন্দেহ করার কোনও কারণ ছিল? মানে অন্য কোনও সম্পর্কটম্পর্ক?”
টুম্পা জিভ কেটে বলল, “কী যে বলেন! চুমকি অমন মেয়ে ছিল না। তা হলে অত ঝগড়া করেও সাগরের সঙ্গে টিকে থাকত?”
“আমাদের কিন্তু মনে হয়, চুমকির জীবনে অন্য কেউ ছিল।”
টুম্পা চমকে তাকাল।
আমি সামনের দিকে ঝুঁকে বললাম, “তুমি ওর গলায় দাগ দেখেছিলে, সে দাগটা সাগরের করা নয়। সাগর তখন কলকাতায় ছিল না।”
চুমকি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বলল, “কিন্তু চুমকি এমন করবে কেন? আপনি ঠিক জানেন, সাগর ছিল না তখন?”
“হ্যাঁ। কিন্তু তুমি শিওর হতে পারছ না। কেন?”
টুম্পা এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “আসলে সেদিন চুমকি আরও একটা কথা বলেছিল। ব্যাটাছেলে অফিসারের সামনে বলতে পারিনি।”
“কী কথা?”
“চুমকি আগেরবার বলেছিল, ওদের মধ্যে অনেকদিন শোয়াশুয়ি হয়নি। মানে, সাগর চাইত, চুমকির সময় হত না। কাটিয়ে দিত। এই নিয়ে ওদের মধ্যে মন কষাকষি চলছিল।”
“তারপর?”
“সেদিনের অমন দাগ দেখে আমি যখন জিজ্ঞাসা করলাম বলল, সাগর করেছে। গলার দাগটা চাপ চাপ হয়ে বসেছিল, আমি বললাম, তোর ব্যথা লাগেনি? বলল, অনেক ভালোর জন্য একটু খারাপ সহ্য করতে হয়।”
টুম্পা লসির গ্লাস শেষ করে মুখ মুছল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে ম্যাডাম। প্লাবন চলে যাওয়ার পর, চুমকির মানসিক অবস্থা ঠিক ছিল না। আর-একটা ছেলের সঙ্গে লাইন মারবে, এ হতে পারে না। এমনিতেই সারাদিন টাকার চিন্তায় ঘুরত, বলত প্লাবনকে খুঁজতে অনেক টাকা লাগবে।”
আমি টুম্পার দিকে তাকালাম।
“টাকা লাগবে কেন?”
“নানা লোক নানা কথা ওকে বলত ম্যাডাম। অত ডিটেলে জানি না। একবার তো শুনেছিলাম, কে একজন বলেছে, প্লাবন কোথায় জানে। একটা ছবিও পাঠিয়েছিল।”
“ছবি?”
“হ্যাঁ। চারটে দামড়া বিদেশির সঙ্গে। আমায় চুমকি দেখিয়েওছিল ছবিটা।” আমার মনে পড়ে গেল, চুমকির ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া জিনিসে, প্লাবনের একটা গ্রুপ ছবি ছিল। টুম্পা কি সেটার কথাই বলছে!
“কে একজন বলতে কে? চেনা কেউ? কাকে পাঠিয়েছিল ছবি?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
টুম্পা ঘাড় নাড়িয়ে বলল, “জানি না। চুমকি এ ব্যাপারে বেশি কথা বলতে চাইত না। প্লাবনকে নিয়ে চন্দনদার সঙ্গে একটু আধটু আলোচনা করত। ওর কথা শুনত। চন্দনদা পড়াশুনা জানে, বোঝে কোথায় গিয়ে তদ্বির করতে হয়। আমাদের মতো বাচাল নয়।”
“চন্দনদা মানে সুচেতনা নামের সংস্থা যে চালায়?”
“হ্যাঁ।”
“প্লাবনের খোঁজে থানায় যায়নি?”
টুম্পা হেসে ফেলল।
“প্রথম প্রথম সবাই থানায় যায় ম্যাডাম। তারপর বুঝে যায়, গিয়ে লাভ নেই।”
টুম্পার কথায় চাপা একটা অস্বস্তি হল। সাগরের খুনি ধরা না পড়লে, হয়তো ঝুমা, ক’দিন পরে একই কথা বলবে।
“প্লাবন পালিয়েছিল কেন? মারধোর করেছিল?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
“হ্যাঁ, ওই আর-কি।” টুম্পা নাকছাবিতে হাত দিয়ে বলল, “প্লাবন যেদিন হারায়, তার আগের দিন রাতে একটা স্মার্টওয়াচ নিয়ে আসে। তখন আমরা কেউ জানতাম না জিনিসটা কী। চুমকি রাগারাগি করে জানতে চায় কোত্থেকে পেল। চুরি করেছে সন্দেহে মারধোর করে। পরের দিন ভোর থেকেই প্লাবনকে আর পাওয়া যায়নি।”
“হুম।”
“প্লাবন খুব জেদি হয়ে গিয়েছিল ম্যাডাম। চুমকির কোনও কথাই শুনত না। ভয় দেখালে বলত আমার স্পাইডারম্যান আছে, তোর মাথা ভেঙে উড়িয়ে দেবে।”
“স্পাইডারম্যান!”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ ওই লালমুখো মাকড়সা। হাত দিলে স্যাটস্যাট করে ঝুল বেরোয়।”
আমার বুকের মধ্যে একটা ধুকপুকানি শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। একটা অদৃশ্য সুতো, বহু দূর থেকে ক্রমশ নেমে আসছে যেন। যত কাছে এগোচ্ছে, তত শত শত টুকরোয় ছড়িয়ে যাচ্ছে। অবিকল মাকড়সার জাল। পরের প্রশ্নটা যেন কেউ করিয়ে নিল, “প্লাবন কি কোনও মুখোশের কথা বলত?”
টুম্পা একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কী করে জানলেন?”
ওর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না। এক একটা মুহূর্তকে অস্বাভাবিক শান্ত, আর নিথর মনে হয়। যেন ঝড় আসছে জানি, অথচ কীভাবে বাঁচব, কোথায় মাথা গুঁজব জানি না।
“একটা লাল রঙের মুখোশ। চোখের কাছটা নীল। ওটা পকেটে নিয়েই ঘুরত।” ও বলে উঠল। ওকে এবার ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, “থ্যাংক ইউ টুম্পা। দরকারে আবার কথা বলব।”
“চুমকি কি খুব কষ্ট পেয়েছিল?” টুম্পা আচমকা জিজ্ঞাসা করে বসল।
এই প্রথমবার কেউ এই প্রশ্নটা করল। প্রোটোকল বলে, এক্ষেত্রে পিএম রিপোর্টের উল্লেখ করে একটা খাঁজা দাপ্তরিক উত্তর দেওয়াই দস্তুর। কিন্তু আমি সে পথে হাঁটলাম না। ওর হাতের উপর আলতো চাপ দিয়ে বললাম, “মৃত্যু কখনও যন্ত্রণাহীন হয় না টুম্পা। তবে আমরা খুব শিগগিরই ওর খুনিকে ধরে ফেলব।” শেষের কথাগুলো বলার সময় নিজের গলার স্বর কেঁপে গেল।
৮
ইম্যানুয়েল কান্ট খুব দামি একটা কথা লিখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, মানুষের জৈবিক কাঠামো তৈরি হয়েছে যে কাষ্ঠখণ্ডটি দিয়ে, সেটি নিজেই এমন বাঁকাচোরা, যে সম্পূর্ণ সোজাসাপটা কোনও কিছু নির্মাণ করা যাবে, এমন আশা না করাই ভালো। পুলিশে চাকরি করতে ঢুকে, এই বাঁকাচোরা অহংবিশিষ্ট মনুষ্যপ্রজাতিটিকে খুব কাছ থেকে লক্ষ করার সুযোগ আসে। আশ্চর্যের ব্যাপার, কার কতটুকু অংশ বাঁকাচোরা থাকবে বা থাকলেও সে কতটা ব্যবহার করবে, তার উপর গোটা সমাজের ভারসাম্য দাঁড়িয়ে আছে।
ফেরার পথে বালিগঞ্জ থানা থেকে প্লাবনের ছবিটার একটা ছবি তুলে নিয়ে এসেছিলাম। একটা স্টেশনের ছবি। চারজন দীর্ঘদেহী ফরেনারের সঙ্গে প্লাবন দাঁড়িয়ে আছে। সাত-আট বছরের বালক। তার হাত মুঠো করে ধরে রেখেছে এক ব্লন্ডচুল স্ফীতোদর গোরা। প্লাবনের পকেটের মুখোশটা বড়ো ভাবাচ্ছিল। স্থানকালের বোধ ছিল না। থানার যে অচেনা কনস্টেবল ছবিটা বের করে দিয়েছিলেন, তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “স্পাইডারম্যান দেখেন?”
সে অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। অন্যমনস্কভাবে বলেছিলাম, “স্পাইডারম্যান কেন মুখোশ পরেন, জানেন?”
অল্পবয়স্ক কনস্টেবল বোধহয় ভেবেছিল আমার ছানাপোনা আছে। হেসে বলেছিল, “ম্যাডামের কি মুখোশ লাগবে? বাচ্চারা আসলে মুখোশ ব্যাপারটা পছন্দ করে। বেশ লুকিয়ে লুকিয়ে যা খুশি করা যায়, কেউ চিনতে পারে না।”
আমার পিটার পার্কারের শেষ সিনেমা মনে পড়ছিল।
নো ওয়ে হোম। সিনেমাটার শেষের দিকে একটা দৃশ্য ছিল। পিটার পার্কারকে এমন একটা জাদুতে রাজি হতে হবে, যার প্রভাবে যাকে যাকে ও ভালোবাসে, তারা সবাই ওকে ভুলে যাবে। এমনকি এম জেও।
আমি ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। সারাদিনের গুমোট কেটে ঝিরঝির বৃষ্টি নেমেছে। মাথার মধ্যে নানা প্রশ্ন ঠেলা মারছিল। চুমকির কাঠামোটিকে যেভাবে চিনছিলাম, তাতে নতুন নতুন রং এসে লাগছিল। অ্যাকাডেমিতে থাকাকালীন প্রধান স্যার ডেইমনিক প্যারাডক্স পড়িয়েছিলেন। বানান করে করে বোর্ডে লিখেছিলেন, ডি এ আই এম ও এন আই সি। বলেছিলেন, কান্ট যাই বলে যান, মনে রেখো মানুষের মধ্যে ধ্বংস আর সৃষ্টির খেলা একই সঙ্গে চলতে থাকে। তা না হলে পৃথিবী কবেই নিঃশেষ হয়ে যেত। আজ এই মুহূর্তে চুমকির প্রোফাইল গড়তে গড়তে ডেইমনিক প্যারাডক্সের কথা মনে পড়ছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, বিভাবরীর মূল রহস্যটা বিভাবরীর বাইরে নয়, ভিতরে। গোড়া থেকে কেসটায় তিনটে গিঁট। এক নম্বর, সাগরের সঙ্গে দেখা করার পর চুমকি অচৈতন্য অবস্থায় ঘণ্টা তিনেক বেঁচে ছিল। এ সময়টা ও ছিল কোথায়? দুই নম্বর, সাগর ওকে ডাকল কেন? নারকোটিক্সের সঙ্গে চুমকির যোগাযোগ ছিল না, তবে? অন্য কোনও ব্যক্তিগত কারণ? কী এমন হল চুমকির ফোন সুইচড অফ হয়ে গেল?
জানালার পাল্লা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। বাইরের উজ্জ্বল দৃশ্যরেখা জানালা বেয়ে নেমে আসা জলধারায় ধুয়ে যাচ্ছে। ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। পিটার পার্কার আমাকে ভাবাচ্ছিল। ওর মুখোশ কি শুধু চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার ঢাল? নাকি এই গোটা অসংবেদনশীল পৃথিবী, যে আসল পিটার পার্কারকে কোনওদিন বোঝেইনি, তার থেকে দূরে সরে যাওয়ার, তার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার একটা উপায়? পৃথিবীর কাছে ও যতটা দূরের, যতটা রহস্যময়, যতটা প্ৰচ্ছন্ন, পৃথিবীও কি পিটারের কাছে ততটাই চোরা, ছদ্ম আর গুপ্ত?
তিন নম্বর, আর সবথেকে প্যাঁচানো গিঁটটি হল চুমকির টাকা রোজগারের উৎস কী? বারো হাজার মাস মাইনের মেয়ের অ্যাকাউন্টে গোটা বছর ধরে প্রায় লাখ দেড়েক টাকা জমা পড়েছে। কোথা থেকে এল?
প্রধানস্যার বলতেন, আয় দু’রকমের হয়। একধরনের যার উৎস এবং উদ্দেশ্য দুটোই স্পষ্ট থাকে। যেমন, চাকুরিজীবীদের মাইনে। যা আয় করছে, নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় হচ্ছে। দ্বিতীয় ধরনটিতে কোনওটাই স্পষ্ট থাকে না। চুমকির বেলায় উৎস বুঝতে না পারলেও উদ্দেশ্য বুঝতে পারছিলাম। চুমকি বলত, ভাইকে খুঁজতে অনেক টাকার প্রয়োজন। চুমকির পাসবইও সেই দিকে ইঙ্গিত করছে। দেড় বছর হল প্লাবন নিখোঁজ হয়েছে, আর চুমকির হাতে টাকা ঢুকছে এক বছর ধরে। স্বচ্ছ পথের রোজগার নয়। তা হলে উৎস এতদিনে বোঝা যেত। অথচ উদ্দেশ্য অস্বচ্ছ তা বলা যায় না। পারফেক্ট এগ্জাম্পল অফ ডেইমনিক প্যারাডক্স। কিন্তু, টাকা শুধু আসেনি, চিন্তার ব্যাপার হচ্ছে টাকা খরচ হয়েছে। কে বা কারা চুমকির থেকে টাকা নিয়েছে সেটা জানা প্রয়োজন। বুঝতে পারছিলাম, যা করার আমাকে একাই করতে হবে।
প্লাবনের ছবিটা মোবাইলে খুললাম। কোন স্টেশনের ছবি তা বোঝা যায় না। পিছনের প্রেক্ষাপট ঢেকে দিয়েছে ছবির চরিত্ররা। শুধু বাঁ দিকে একটা টি- স্টল চোখে পড়ে। তাতে সাজানো পসরা খানিকটা দেখা যাচ্ছে ছবিতে। ছবিটা বন্ধ করতে গিয়েও কোণের একটা কমলা স্পটে চোখ আটকে গেল। চায়ের দোকানের দেওয়ালে গোল্ড স্পটের বিজ্ঞাপন। ছবিটা জুম করে দেখলাম, নাহ, ঠিকই দেখেছি। উজ্জ্বল কমলা রঙের কোল্ড ড্রিংক ভরা বোতল। গোল্ডস্পট আমাদের ছোটোবেলার স্মৃতি। সেটা যে আবার নতুন করে বিক্রি শুরু হয়েছে, জানতামই না!
নেটে কোনও ইনফরমেশন নেই। লাস্ট প্রোডাকশন দেখাচ্ছে দু’হাজার সাল। মনটা খুঁতখুঁত করতে লাগল।
বিজনের আসার সময় হয়ে গিয়েছিল। বাচ্চাটা চুমকি প্রামাণিকের ভাই, দ্যাখো একবার— লিখে ছবিটা গ্যাড়াকে মেসেজ করতে না করতেই বিজন ফোন করলেন। একটা ইন-ড্রাইভে অপেক্ষা করছেন বাইরে। বারুইপুর যাওয়ার জন্য কপুর গাড়ি আজ পাওয়া যায়নি।
“আপনাকে খুব ডিস্টার্বড লাগছে।” আমি গাড়িতে উঠতেই বিজন বললেন। একটা কালো টি-শার্ট আর নেভি ক্লু জিন্স পরে এসেছেন।
ক্যাবের ছেলেটি হালকা গান চালিয়েছিল, আমি আপত্তি করায় সেটা বন্ধ করেছে।
আমি বিজনের কথার উত্তর দিলাম না। গ্যাঁড়ার ফোনে ছবিটা এখনও আনডেলিভারড দেখাচ্ছে। ফোন বোধহয় বন্ধ। মনের মধ্যে একটা সন্দেহ বাড়ছিল। ছবিটা দিব্যকে ফরোয়ার্ড করে লিখলাম, “একবার দেখিস তো।”
“দর্শনা?” বিজন পাশ থেকে আবার ডাকলেন।
আমি অন্যমনস্কভাবে বললাম, “চুমকির ভাই প্লাবন আর দত্তদের ছোটো ছেলে ত্রিদীপ, এই দু’জনের মধ্যে একটা মিল আছে। দু’জনেই একটা স্পাইডারম্যানের লাল মুখোশের কথা বলত।”
“একইরকম মুখোশ কিন্তু অনেক বাচ্চাদের কাছে থাকে ম্যাডাম! এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।” বিজন অবাক হয়ে বললেন।
আমার অদ্ভুত একটা ক্ষোভ হচ্ছিল। আসলে ইনস্টিংক্ট ব্যাপারটা প্রমাণসাপেক্ষ নয়। অনেকটা খাবারের গন্ধ বা রং দেখে আন্দাজ করার মতো। খাবার ভালো হবে না মন্দ হবে, মুখে পোরা অবধি বোঝা যায় না। মুখের গরাস তোলার মতো ঝুঁকি নিতেই হয়। বিজনকে আমার ইনস্টিংক্ট বোঝানো কঠিন। ওকে বললাম, “সেটা ঠিকই। তবে প্লাবন আর ত্রিদীপ দু’জনেই বেশ সমস্যার মধ্যে ছিল। এটা তো মানবেন?”
“হতে পারে। কিন্তু কানেকশনটা কোথায়?”
“কানেকশনটা চুমকি। একটা কথা বলুন, ওর ভাই যে মুম্বই পাচার হয়ে যেতে পারে, এটা ওকে কে বুঝিয়েছিল? মানে অফিশিয়ালি কিছু তদন্ত হয়েছিল?”
“বালিগঞ্জ থানায় খোঁজ নেব।” বিজন সংক্ষেপে বললেন। ওঁর গলায় একটা নৈর্ব্যক্তিক ভাব ছিল। বাইরে বৃষ্টিটা আরও বেড়েছিল। ক্যাব ড্রাইভার এসি অন করে দিয়েছিলেন। বিজন বাইরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। আমি খানিকক্ষণ চুপচাপ থেকে বললাম, “এই গোটা কেসের একটা টাইমলাইন তৈরি করা যাক?”
বিজন নিরুৎসুকভাবে তাকালেন।
“একেবারে শুরু থেকে শুরু করি। তা হলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে, কে জানে হয়তো নতুন কিছুও জুড়তে পারে।” আমি প্রস্তাব দিলাম।
“বেশ। টাইমলাইন ধরে এগোই চলুন।”
“হুম। টাইমলাইনের প্রথম বিন্দু— চুমকির ভাই প্লাবনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। এর দেড় বছর পর, এইবছর চব্বিশে ফেব্রুয়ারি রাতে চুমকি প্ৰামাণিক খুন হয়। বড়ি অন্য কোথাও থেকে এনে ফেলা দেওয়া হয়েছিল। সিদ্ধান্ত টানা যায়, মৃত্যুর আগের তিন ঘণ্টা সে অচৈতন্য অবস্থায় অন্য কোথাও পড়ে ছিল। সাগর প্রামাণিক, চুমকির বয়ফ্রেন্ড রবিবার সকালে কলকাতা থেকে ব্যাগভর্তি স্ট্যাশ নিয়ে পালায়। মাথায় রাখতে হবে, সে সঙ্গে সঙ্গে পালায়নি। পুরুলিয়া আসার পর, সোমবার সাগর খুন হয়ে যায়। এই সূত্রে খোঁজাখুঁজি করতে করতে প্রমিত দত্তের নাম আমাদের হাতে আসে। প্রমিত যে কিনা চুমকির কাজের বাড়ির বড়োছেলে। প্রতিষ্ঠিত বাপ-মায়ের সন্তান, বখাটে, ড্রাগ পেডলিংয়ের কাজ করে, ফলে হাতে কাঁচা টাকা। জিয়ামিতা নামের একটি অসমিয়া মেয়ের সঙ্গে তার ব্রেকআপ হয় গত বছরের শেষাশেষি। ব্রেকআপটা কেন হয়েছিল জানা নেই।”
বিজন মন দিয়ে শুনছিলেন। হেসে বললেন, “এটা সোজা ম্যাডাম। পলিটিকাল শ্বশুরের ড্রাগ ডিলার জামাই পছন্দ না।”
“প্রমিতকে যেদিন জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলাম, ওর কপালে আর ঠোঁটের কোনায় দুটো ক্ষত দেখেছিলাম। বলেছিল পড়ে গিয়ে হয়েছে।”
“দেখুন গিয়ে, আবার ওই মিতার পিছনে লাগতে গিয়েছিল। শ্বশুরের ক্যালিবার বুঝতে পারেনি। গুন্ডা লেলিয়ে পিটিয়ে দিয়েছে।”
“তা হলে সব গোলাপই কালোতে কী হয়েছিল? কোনও ফরমাল পুলিশ কমপ্লেন হয়নি কেন?” আমি বললাম।
“সিম্পল, ওখানেও ড্রাগ খেয়ে হুজ্জোতি করেছিল কিছু একটা। মেয়ে নারকোটিক্সের চার্জে ফেঁসে যাবে বলে পয়সা দিয়ে মুখ বন্ধ করিয়েছে জিয়ামিতার বাবা। ব্রেকআপও জোর করে করিয়েছেন।”
“মানে ব্রেকআপের চাপটা সোশ্যাল স্টেটাসজনিত?”
“তাই তো মনে হয়।”
“মনে হলে হবে না। প্রমাণ চাই।”
“লেহ!” বিজন হতাশ গলায় বললেন।
“নেক্সট,”
“ আমি না থেমে বলতে থাকলাম, “গত বছর পুজোর আগে বিভাবরীতে আসে সাকিব নামের এক ইউটিউব ব্লগার, যার ওখানে যাওয়ার কোনও কারণ সে দেখাতে পারেনি।
“এবং থানাতে ধমকি খাওয়ার পরও সে কোনও কারণ বলেনি। আমি আজই সিদ্ধার্থ চাকলাদারের কাছ থেকে কনফার্ম করেছি।”
“হুম। তা হলে কি সাকিব নতুন কোনও ইনভেস্টিগেটিভ ব্লগ মেটিরিয়ালের জন্য বিভাবরী গিয়েছিল?”
“হতেই পারে।” বিজন প্রায় লাফিয়ে উঠে বললেন, “এমনটাও তো হতে পারে দর্শনা, ও হয়তো আপনার মতোই প্রমিতের ড্রাগ অ্যাবিউজের ব্যাপারটা সন্দেহ করেছিল?”
“কোয়ায়েট পসিবল। সেটা ওর কাছ থেকেই কনফার্ম করা যেতে পারে।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, গত নভেম্বরের পর থেকে আর ভিডিয়ো আপলোড হয়নি।”
“আশ্চর্য কেন?” বিজন বললেন, “যে গ্যাং সাগরকে ওড়াতে পারে, তারা সাকিবকে থামাতে পারে না?”
“আলবাত পারে। কিন্তু তাতে অন্য টপিকে ব্লগ করা আটকাচ্ছে কেন? আগেরটা-ই বা শেষ করল না কেন?”
বিজন কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। আমি জানতাম, এই মুহূর্তে আমি যা ভাবছি, বিজনও একই কথা ভাবছেন। কিন্তু বারুইপুর না পৌঁছোনো অবধি এ ব্যাপারে কথা মুলতুবি রাখাই ভালো। গাড়ি রাজপুর সোনারপর ছাড়িয়েছিল। বাইরের আকাশ এদিকে পরিষ্কার। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। এসি বন্ধ করে গাড়ির কাচ নামালেন ড্রাইভার। সামনেই কোদালিয়া, তারপর বারুইপুর। পথের দু’ধারে মফস্সলি আলো। মাঝে মাঝে নতুন গজিয়ে ওঠা বিরাট বড়ো বড়ো অ্যাপার্টমেন্ট দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার দু’ধারে, আবার নাছোড়বান্দা পুরোনো গন্ধ মেখে পথপ্রান্তেই রয়ে গেছে মাঝারি আকারের পুকুর, তাতে নুয়ে থাকা খেজুর গাছ— আলো আঁধারিতে মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক কোনও দৈত্য তার কাঁটা-ভরা দেহ নিয়ে এক্ষুনি জলের মধ্যে আছাড়ি পিছাড়ি ঝাঁপ দেবে।
বৃষ্টি এদিকে আরও তুমুল হয়েছে। ল্যাম্পপোস্টে এদিকে এখনও হ্যালোজেন জ্বলে। হলদে আলোর বৃত্তে দেখা যায়, পিচবাঁধানো রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে অল্প ক’টা অটো। রাত হয়েছে। ফাঁকা মাঠের পাশে পুরোনো শিবমন্দিরে কে যেন মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। চায়ের দোকানগুলোর সামনে খুচরো ভিড়। বাইক সারাইয়ের দোকানে চড়া আলো ফেলে কাজ হচ্ছে। সে-সব পেরিয়ে একটু এগোলে ফণীমনসা গাছের মাথায় জোনাকি জ্বলতে দেখা যায়। দেখা যায়, মাঠ পেরিয়ে অনেক দূরের বাড়ির তেতলার ছাদে কে যেন অসময়ে আকাশপ্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে। বিজন ঝিমোচ্ছিলেন। ওকে যেটা বলিনি, সেটা ওই অসময়ের আকাশপ্রদীপের মতো। কার্যকারণ নেই, অথচ আছে।
বিভাবরীর ভিতরে বাইরে ঘটে চলা সমস্ত সময়রেখার সঙ্গে সমান্তরালে চলেছে টিটো ওরফে ত্রিদীপের অসুস্থতা। ও কি অসুস্থ নাকি অস্বাভাবিক? জানি না। অথচ মন বলছে, ওর চাপা গোঙানি অর্থহীন নয়।
“ত্রিদীপের বাবা, গৌরকিশোর দত্ত, এই লোকটা কেমন? খবরাখবর নিয়েছিলেন?” আমি বিজনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। বিজন নাক ডাকছিলেন। কনুই দিয়ে গুঁতোতে ধড়মড় করে উঠে বসলেন। আমি আবার প্রশ্ন করলাম।
“নাহ্। দরকার বোধ হয়নি। কেন বলুন তো?” বিজন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন।
“লোকটা অদ্ভুত রকমের ইনসেনসিটিভ। ছেলের সমস্যা নিয়ে বেশ ভালোই জানেন, কিন্তু এড়াতে চান।”
অ্যাপ ক্যাব ড্রাইভার ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে দিল। আমরা একটা চারমাথার মোড়ে এসে পৌঁছেছিলাম। বিজন বললেন, “নামুন। এটা যোগিবটতলা। এর ভিতরে গাড়ি আর যাবে না।”
যোগিবটতলা মুসলিমপ্রধান এলাকা। প্রধান সড়ক নেতাজি সুভাষ রোডের উপর পরপর গাড়ির শোরুম। বাইক মূলত। এছাড়াও সেকেন্ড হ্যান্ড চারচাকা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ধার ঘেঁষে। প্রধান সড়কের ডান দিকে মসজিদ। বাঁ হাতে চওড়া রাস্তা ঢুকে গেছে পাড়ার ভিতরে। খুব একটা আলোকিত পাড়া নয়। ছড়ানোছিটোনো ঘরবাড়ি, স্টেশনারি আর মুদির দোকান, আড়ম্বরহীন দোতলা আর একতলা বাড়ি— এই নিয়ে পাড়া।
একটা গম ভাঙানোর দোকানে গিয়ে বিজন আর আমি দাঁড়ালাম।
গম-পেষাই কল এখন বন্ধ। এক বৃদ্ধ খাটো আলোয়, শিরাময় হাতে হিসেবের নথি লিখছেন। দাড়িতে লালচে ছোপ। পরনে সাদা পাঞ্জাবি আর নীল লুঙ্গি, মাথায় ফেজ টুপি। বৃদ্ধ আমরা সামনে গিয়ে দাঁড়াতেও মুখ তুললেন না। সাকিবের ফেসবুক প্রোফাইল খুলে আমি ভদ্রলোকের চোখের সামনে ধরলাম। বললাম, “চাচা, একে চেনেন?”
৯
ক্যাটকেটে সবুজ একটা দেওয়ালের উপর বড়ো একটা পোস্টারে মক্কার কাবার ছবি শোভা পাচ্ছে। একটাই বড়ো ঘর। ঘরে ৩২ ইঞ্চির এলইডি টিভি, একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার, মাইক্রোফোন, একটা ট্রাইপড ক্যামেরা স্টেবিলাইজার আর তার উপর বসানো এলইডি ভিডিয়ো লাইট চোখে পড়ে। এটাও বোঝা যায়, জিনিসগুলো অনেকদিন ব্যবহার হয়নি। পাতলা ফিনফিনে কাপড় দিয়ে ঢাকা রয়েছে। ব্যবহার না হলেও, জিনিসগুলোর উপর ধুলো জমেনি।
বৃদ্ধ আনসারুল্লাহ গাজি আমাদের খাটের উপর বসতে বলে নিজে সামনে একটা চেয়ারে বসেছিলেন। হিসাব লেখার খাতা তড়িঘড়ি বন্ধ করে, দোকানে তালা দিয়ে উনি আমাদের ঘরে নিয়ে এসেছেন। ঘটনাচক্রে উনি সাকিবের বাবা। আমরা বিব্রতমুখে বসেছিলাম। আনসারুল্লাহ নির্জীবভাবে আমাদের দিকে তাকালেন। আমরা কিছু বলছি না দেখে বললেন, “কী জিজ্ঞাসা করবেন আপনারা, বলুন।”
বিজন তুমুল অস্বস্তি নিয়ে আমার দিকে তাকালেন। ভাবটা এই, শুরুটা আপনি করুন। আমি গলা খাঁকরে বৃদ্ধকে বললাম, “এসব কবে হল? কীভাবে?”
আনসারুল্লাহ উঠে একটা টেবিলের কাছে গেলেন। অনেকগুলো বই খাতা ডায়েরির নীচ থেকে একটা পুরোনো খবরের কাগজ বের করে নিয়ে এলেন। আনন্দবাজার পত্রিকা। তারিখ ২০ নভেম্বর, ২০২৪।
খবরে প্রকাশিত হয়েছিল-
‘মিটার ঘর, পাম্প ঘরের নামে চারিদিকে তারের জটলা। সেই জটলার একটি তার থেকেই বিদ্যুৎ টেনে নিয়ে গিয়ে বেআইনি হুকিংয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল। অভিযোগ, প্রবল বৃষ্টিতে জমা জলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ে সেই বোর্ডের বিদ্যুতে তড়িদাহিত হয়ে মৃত্যু হয় এক তরুণের। শুক্রবার বিকেলে বারুইপুরের যোগিবটতলার এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, বৃষ্টি হলেই যদি জমা জলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে, তা হলে পুরসভা এলাকায় রাস্তাঘাটে জীবনের নিশ্চয়তা কোথায়?
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত তরুণের নাম সাকিব গাজি। যোগিবটতলায় ছেলেটির পরিবারের একটি দোকান আছে। ২৫ বছরের সাকিব, শুক্রবার সন্ধেবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে দোকানের দিকে আসছিলেন। দু’দিনের বৃষ্টিতে বাড়ির সামনের রাস্তায় জল দাঁড়িয়ে ছিল। সেই সময়ও টানা বৃষ্টি হচ্ছিল। বাড়ির ঠিক সামনেই জমা জলের মধ্যে টাল সামলাতে না পেরে সাকিব ধারে রাখা একটা ঠেলাগাড়ি ধরে হাঁটতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ওই ঠেলাগাড়িতে হাত দেওয়া মাত্র সাকিব ছিটকে পড়েন। ছটফট করতে করতে চিৎকার শুরু করেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মাটিতে জলের মধ্যে সম্পূর্ণ শুয়ে পড়েন সাকিব। আরও কিছুক্ষণ পরে বাঁশ নিয়ে গিয়ে সাকিবকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। নিকটবর্তী স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে সাকিবকে মৃত ঘোষণা করা হয়। জমা জলের মধ্যে দাঁড়ানো ঠেলাগাড়ি বিদ্যুদয়িত হয়ে ছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ইতিমধ্যে এই ঘটনায় পুরসভা আর স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ড-এর মধ্যে দায় ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে গেছে। পুরসভা দাবি করেছে, ওই বাড়ির সামনে তাদের কোনও বাতিস্তম্ভ নেই। স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ড দাবি করেছে, ওই এলাকায় বিদ্যুতের সমস্ত লাইন মাটির তলা দিয়ে গেছে। বেআইনিভাবে ছকিং করে বিদ্যুৎ টেনে নিতে গিয়ে এই ঘটনা ঘটেছে। শনিবার সকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখা যায় হুকিংয়ের তারটি তখনও মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে তারটির। কিন্তু হুকিং করে বিদ্যুৎ কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তা নিয়ে ধন্দে প্রশাসন।’
খবরটা পড়ে আনসারুল্লাহর দিকে তাকালাম। লোকটা আমাদের দিকে তাকিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দৃষ্টি অন্য কোথাও নিবদ্ধ ছিল। বিড়বিড় করে বললেন, “আল্লার হেদায়তকে অস্বীকার করার গুস্তাকি আমার নেই জনাব। না হলে সেদিনই কেন ঘরের ঠিক বাইরে পাথরের টুকরো থাকবে, তাতে পা বেঁধে সাকিব গিয়ে ঠেলাগাড়ি ছোঁবে! খুব নেক ছেলে ছিল আমার। সাহসী, স্পষ্ট কথা বলত। কাবিল ছিল। আমার বাকি জীবনটা কী নিয়ে কাটবে, বলতে পারেন আপনারা?”
বৃদ্ধ পাঞ্জাবির খুঁট দিয়ে চোখের জল মুছলেন। ওঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা ছিল না।
“সাকিব ইউটিউবের ব্লগ করত, জানেন আপনি?” বিজন প্রশ্ন করলেন।
বৃদ্ধ উপরে-নীচে মাথা নাড়ালেন। বললেন, “জানতাম। স্বপ্ন দেখত, একদিন এক লাখ সাবস্ক্রাইবার হবে। ডলারে রোজগার করবে। সারাদিন প্রচুর পরিশ্রম
করত, দোকানের পরে খবর জোগাড় করতে করতে কোথায় কোথায় না যেত।”
“কলকাতায় বিভাবরী নামের কোনও অ্যাপার্টমেন্টে কোনও ঝামেলার কথা শুনেছেন?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়িয়ে বললেন, “না। কাজ নিয়ে আলোচনা করত না। ওর আম্মি মারা গেছে অনেক বছর হল। মেয়ের বিয়ে দিয়েছি মল্লিকপুরে। ঝামেলাঝাটিতে জড়াতে আমি বারণ করতাম। কিন্তু গরম রক্ত, কথা সবসময় শুনত না মনে হয়।”
“শেষ কী বিষয় নিয়ে কাজ করছিল জানেন?”
বৃদ্ধ এদিক-ওদিক তাকিয়ে কী যেন ভাবার চেষ্টা করলেন। উঠে টেবিলের উপর থেকে একটা ফাইল নিয়ে এলেন। ক্রিমরঙা সাধারণ রিবন দেওয়া ফাইল। ডকুমেন্টে ঠাসা।
“যা আছে সব এতেই আছে বোধহয়। এই ফাইলটায় কাউকে হাত দিতে দিত না।”
“ওর সঙ্গে আর কেউ কাজ করত, এই ব্লগ শুটিংয়ের ব্যাপারে? জানেন?”
“না। আর কেউ ছিল না।”
বিজন ফাইলের গিঁটটা খুলছিলেন। উপর উপর চোখ বুলালে দেখা যায়, তাড়া তাড়া খবরের কাগজের কাটিং, কিছু প্রিন্ট-আউট, কিছু হাতে লেখা কাগজ।
“ফাইলটা আমরা নিয়ে যাব চাচা। ক’দিন পরে কাগজপত্রের কপি করে আপনাকে ফেরত দিয়ে যাব।” আমি আনসারুল্লাহ গাজিকে বললাম।
বৃদ্ধের ঘন ভুরুর নীচে আলোড়ন হল যেন। বললেন, “সামনেই প্রিন্ট জেরক্সের দোকান আছে। আপনি কপি করে নিন। কিন্তু ফাইলটা আমাকে ফেরত দিয়ে যান। গুস্তাকি মাফ করবেন। কিন্তু আপনারা অফিসার লোক আছেন। নানা কাজে ফাইলটার কথা ভুলে যাবেন।”
“আপনি চিন্তা করবেন না, চাচা। আমরা ঠিক দিয়ে যাব।” বিজন বললেন।
বৃদ্ধ এবার হাতজোড় করলেন। আধাবোজা গলায় বললেন, “ফাইলের উপর ধুলো জমে যাবে জনাব। দেখছেন না সাকিবের জিনিস আমি কীরকম যত্নে রাখি।”
আনসারুল্লাহ গাজি গলিপথের মুখে দাঁড়িয়ে বিদায় জানালেন। গলিপথের শেষে ওঁর বাড়ি। দু’ধারে রংচটা দেওয়াল। এক মানুষ গলে যাওয়ার মতো চওড়া। গলিপথ থেকে বেরিয়ে মেঠো অপ্রশস্ত জমি পেরিয়ে রাস্তায় উঠতে হয়। পাথরটা ওইখানে পড়ে ছিল, আর ডানধারে ঠেলাগাড়ি— আনসারুল্লাহ দেখালেন। জমিটার শেষ প্রান্তে একটা বহু পুরোনো বাড়ি। চারতলা। তার একতলার মিটার বোর্ড থেকেই তার টেনে হুক করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
.
যোগিবটতলা মোড় থেকে পদ্মপুকুরের দিকে দশ পা হাঁটলে একাধিক জেরক্সের দোকান পড়ে। সাকিবের ফাইল জেরক্স করতে সময় লাগবে কিছুটা। নয় নয় করে এক শতাধিক ডকুমেন্ট। এর কোনটা কাজের, কোনটা অকাজের জানি না। বিজন একটা সিগারেট ধরিয়েছিলেন। বাইরের দিকে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “সাকিবের মৃত্যুটা অ্যাক্সিডেন্ট বলে মনে হয় আপনার?”
আমার প্রবল তেষ্টা লেগেছিল। একটা কোল্ড ড্রিংকের বোতল গলায় প্রায় উপুড় করে ঢেলে বললাম, “প্ল্যানড অ্যাক্সিডেন্ট বলছেন?”
“হ্যাঁ। বাড়ির বাইরে কোথাও কোনও পাথর রাখা থাকত না। সেদিনই রাখা ছিল, যাতে পা বাঁধলে লোকে ভার সামলাতে না পেরে সামনের ঠেলাগাড়ি ধরবে। আবার বিদ্যুতের বোর্ড থেকে তার খুলে এনে ঠেলাগাড়িতেই সেদিন জড়িয়ে গেল। ব্যাপারটা একটু বেশিই কাকতালীয় লাগছে।”
.
“হুম। আর-একটা জিনিস খেয়াল করেছেন? হুকিং করে কারেন্ট নিয়ে যাচ্ছিল কোথায়? গলির মধ্যে নিতে হলে বিরাট জমা জল পেরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এত রিস্ক নেবে কে?”
“ঠিক। আমার কিন্তু সন্দেহ পোক্ত হচ্ছে দর্শনা। প্রমিতের ড্রাগ ডিলিংয়ের ব্যাপারটা সন্দেহ করেছিল সাকিব। গোটা গ্যাংকে এক্সপোজ করার কথা ভেবেছিল। সাকিব যেটা জানত না, উল্টোদিকের লোকেও একইভাবে জল মাপে। জানলে, হয়তো একটু সাবধান হত।”
“না বিজন।” আমি কোল্ড ড্রিংকের বোতল শেষ বিন্দু অবধি চুমুক দিয়ে বললাম, “সাকিবের মৃত্যুটা যদি সত্যি খুন হয়ে থাকে, তবে তার সঙ্গে পাউডার মাফিয়ার সম্পর্ক নেই। এই খুনটার মোডাস অপারেন্ডি আলাদা। একটা শাস্ত, শিক্ষিত, পরিকল্পনা পটু মাথা আছে এই খুনের পিছনে।”
.
“ম্যাডাম, এটাও কি জেরক্স করব?”
ভিতর থেকে দোকানের ছেলেটা চেঁচাল। হাতে একটা লিফলেট নিয়ে বেরিয়ে এল। একটা নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাটের বিজ্ঞাপন।
“এটা কী?” বিজন ভুরু কুঁচকে তাকালেন।
ছেলেটা কাগজটা উল্টেপাল্টে বলল, “এটা তো এই সামনে। আমাদের ১০/১ পদ্মপুকুর রোড, ওদের চোদ্দো। পুরোনো বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট হচ্ছে। শেষ হয়ে এসেছে প্রায়।”
আমি আর বিজন বেরিয়ে চারকদম হাঁটতেই ফ্ল্যাটটা পড়ল। দোকানের ছেলেটা ঠিকই বলেছে। কাজ প্রায় শেষ। বাইরে রং হচ্ছে। প্রাইমার লাগানো হয়েছে। গ্রিলের গেট, আর অ্যালুমিনিয়াম স্লাইডিং জানালা সার দিয়ে রাখা। এক রক্ষী প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে ছিল। আমরা কেউই ইউনিফর্মে ছিলাম না। লোকটা আমাদের দেখতেই পাচ্ছে না এমন একটা ভাব করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “তিনতলা অবধি সব ফ্ল্যাট বিক্রি হয়ে গেছে। চারতলাতে একটাই বাকি। তিন হাজার সাতশো পার স্কোয়ারফিট।”
“কাদের প্রপার্টি এটা?”
“শ্রীদীপ রিয়েলটর। ফোন নম্বর নেবেন?”
“দিয়ে রাখুন। সব ফ্ল্যটে পোজেসন হয়ে গেছে?”
“চাবি দেওয়া হয়ে গেছে। কাজ শেষ হলেই সব একে একে আসবেন।”
বিজন আমার দিকে তাকালেন। আপাতদৃষ্টিতে এই কনস্ট্রাকশনে কোনও সমস্যা আছে নাকি, বোঝা সম্ভব নয়। সাকিব কেন লিফলেটটা যত্ন করে রেখেছিলেন, তাও জানি না।
“ফ্ল্যাটের এনওসি, ট্যাক্স সব কমপ্লিট আছে?”
নিরাপত্তারক্ষী ভুরু কুঁচকে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কাগজপত্র ঠিক না থাকলে, এত বড়ো বিল্ডিং দাঁড়িয়ে আছে এখনও? শ্রীদীপ রিয়েলটর খারাপ কাজ করে না। না হলে মালিক জমি বাড়ি এত সহজে তুলে দিত না হাতে।”
“জমির মালিক কে? কোথায় থাকেন?”
“মালিক তো আর এখানে থাকে না। কাগজপত্র সইসাবুদ করে জমিবাড়ি বিক্রি করে চলে গেছে।”
.
রাত প্রায় দশটা। বারুইপুর থেকে শিয়ালদহগামী ট্রেনে ভিড় কম। জানালার কাচ সব অর্ধেক নামানো। তা সত্ত্বেও হু হু করে হাওয়া আসছিল। বিজনের ফোনে ওঁর ছেলেদের কথা শোনা যাচ্ছিল। “আর আধঘণ্টায় বাড়ি পৌঁছে যাব, একসঙ্গে খাব” বলে বিজন বুঝিয়েবাঝিয়ে ফোন ছাড়লেন। ওঁর ক্লান্ত মুখে একটা তৃপ্তির ছাপ পড়ল। দিন শেষে ঘরে ফেরার আনন্দে, মানুষের যেমন পড়ে। আমার ফোনে দিব্যর মেসেজ ঢুকল টুং করে— খুব পাকা হাতের কাজ ম্যাডাম। বাউন্ডারি ব্লারিং প্রায় নেই বললেই চলে। আমি প্রথমে ভেবেছি সব তো ঠিকই আছে। তারপর টুপিকে ফেলে দেখি, দুটো ছবি মার্জ করেছে। অরিজিনাল ছবিটা গুগল থেকে তোলা। সেটা আপনাকে পাঠিয়েছি।
দিব্যর পাঠানো ছবিটা ডাউনলোড হল। একই ছবি, চায়ের দোকান, গোল্ড স্পট, চার বিদেশি। শুধু তাদের হাতে অন্য একটি বাচ্চার হাত ধরা। একই পৃথিবীর, একই স্থানের অন্য টাইমলাইনের ছবিতে, প্লাবনের মুখটিকে মর্ফ করে কে যেন বসিয়ে দিয়েছে।
বারুইপুর লোকালের ঘষে যাওয়া শার্সিতে আমারও মুখের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছিল। তাতে নিরাশা, ঘুমের অভাব, আর খিদে ছাড়াও একটা অদ্ভুত জেদের ছাপ পড়েছিল। কাচের ওই মেয়েটার জানা নেই, এই একরোখা জেদ তাকে কতটা ক্লান্ত করেছে। সে নিজেকে আয়নায় দেখতে পায় না। শুধু, দেখতে পায়, একটা অন্ধকার আবর্ত, তাতে চুমকি আর প্লাবন তলিয়ে গেছে।
