5 of 8

জাহান্নাম

জাহান্নাম

ইংরেজিতে কথাটা হল, ‘Go to hell’। সাদা বাংলায় মেজাজি ব্যক্তিরা কোনও কিছু না-পসন্দ হলেই বলেন, ‘জাহান্নামে যাও’। কেউ কেউ বেশি জোর দেওয়ার জন্যে সামনে একটা চন্দ্রবিন্দু যোগ করে বলেন, জাঁহান্নামে। চন্দ্রবিন্দু যোগ করাটা অবশ্যই অহেতুক, আসল ফারসি শব্দটি হল জহান্নাম, সেখানে চন্দ্রবিন্দুর কোনও সুযোগ নেই।

সে যা হোক জাহান্নামে যাও মানে হল গোল্লায় যাও। নিপাত যাও। তফাত যাও।

শ্রীযুক্ত নরনারায়ণ চক্রবর্তী জাঁদরেল সরকারি আমলা ছিলেন। কোনও উলটোপালটা কিছু বরদাস্ত করতে পারতেন না। কেউ কোনও কাজের জন্যে এসেছে, কেউ কোনও দরখাস্ত দিয়েছে— সরাসরি মুখের ওপর বলে দিয়েছেন, ‘জাহান্নামে যাও।’ শেষের দিকে এটা তাঁর মুখের বুলি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যাকে মুদ্রাদোষ বলা হয়, প্রায় তাই।

নরনারায়ণবাবুকে এর জন্যে দু’-একবার বেশ বিপদেও পড়তে হয়েছে। একদা এক ধর্মপ্রাণ, আধা মৌলবাদী পঞ্চায়েত প্রধানকে, ‘জাহান্নামে যান’, বলায় গুরুতর বিপদে পড়েছিলেন। পরের দিন উক্ত প্রধান তাঁর গ্রামের লোকদের সঙ্গে নিয়ে অফিস প্রাঙ্গণে এসে হল্লা বাধায়। স্থানীয় এক মন্ত্রীর সহায়তায় সেবার তিনি রক্ষা পান।

তাতেও অবশ্য নরনারায়ণবাবুর চরিত্র খুব একটা বদলায়নি। মুদ্রাদোষটি তিনি সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করতে পারেননি। তবে পরবর্তীকালে সাবধান হয়েছিলেন।

আজ কয়েক বছর হল নরনারায়ণবাবু সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি পূর্ব কলকাতার লবণহ্রদ এলাকায় একটি বাড়ি তৈরি করে সম্প্রতি মূল কলকাতা থেকে চলে এসেছেন।

লবণহ্রদ এমনিতে শান্তিপূর্ণ এলাকা। বারোয়ারির চাঁদার অত্যাচার নেই, মাস্তান নেই, বোমাবাজি নেই, শব্দদূষণ নেই। প্রতিবেশীরা সকলেই নরনারায়ণবাবুর মতোই অবসরপ্রাপ্ত ভদ্রলোক।

পানীয় জলের একটু কষ্ট আছে। মশার উৎপাত আছে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম কলকাতার থেকে তুলনামূলকভাবে একটু বেশি।

নরনারায়ণবাবু এসব মেনে নিয়েছেন। কিন্তু একটা জিনিস মেনে নিতে পারেননি সেটা হল লবণহ্রদের ক্যানভাসার।

লবণহ্রদের ক্যানভাসারের অত্যাচার নিয়ে আমি এর আগেও লিখেছি। এখন আর বিস্তারিত বলার কিছু নেই। সেই শেষ রাত থেকে শুরু হয়। পুরনো কাগজ, শিশিবোতলওয়ালা, ধূপওয়ালা, হরিনামওয়ালা, মাছওয়ালা, তরকারিওয়ালা, ফলওয়ালা, সে এক বিশাল ফিরিস্তি।

তবু এরা তো পুরনো যুগের চেনা ফেরিওয়ালা। এদের চেয়ে অনেক বেশি মারাত্মক হল নতুন যুগের কোট-প্যান্ট-টাই পরা, সুটেড-বুটেড ফেরিওয়ালা। এরা সব মালটিন্যাশনালের ক্যানভাসার। কেউ পেস্ট-কন্ট্রোল, ইঁদুর-আরশোলা নির্মূল করতে চায়। কেউ পানীয় জল বিশুদ্ধ করতে চায়। কেউ বা মাইক্রোওভেন বা সাবানকাচার মেশিন বেচতে চায়।

সময় নেই, অসময় নেই। কলিংবেল বাজছে। নরনারায়ণবাবু দরজা খুলে টাই-পরা মুখশ্রী দেখেই পুরনো অভ্যাসমতো খেঁকিয়ে উঠছেন, ‘জাহান্নামে যাও।’ নরনারায়ণবাবুর মুখ খেঁকানিতে অবশ্য একটু কাজ হয়েছে, যারা একবার এসেছে তারা আর দ্বিতীয়বার তাঁর বাড়িতে আসছে না। সেই একজন জল ফিলটার করার মেশিন বেচে, পাঁচ-সাত দিন পর পর আসে, এসে বেল দেয়, নরনারায়ণবাবু দরজা খুলে তাকে দেখেই সেই ‘জাহান্নামে যাও’ বলে ভাগিয়ে দেন।

অবশ্য আজ কয়েক সপ্তাহ হল সেই ক্যানভাসারটি আসছে না। বাইপাসে গাড়ি চাপা পড়ে সে মারা গেছে। এদিকে নরনারায়ণবাবুও এ ঘটনার কয়েকদিন আগে মারা গেছেন এবং প্রাক্তন সরকারি কর্মচারী হেতু যথারীতি নরকে গেছেন। অর্থাৎ জাহান্নামবাসী হয়েছেন।

একদিন নরকের বাইরের ঘরে বসে আছেন, এমন সময় নরনারায়ণবাবুর সামনে সেই ক্যানভাসারটি উদয় হল। নরনারায়ণবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তুমি এখানেও এসেছ?’ ক্যানভাসারটি হেসে বলল, ‘আপনিই তো বলেছিলেন থাকতে। আপনি বলতেন না, জাহান্নামে যাও।’

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *