1 of 3

কড়ি দিয়ে কিনলাম ২.৪৮

৪৮

প্রিয়নাথ মল্লিক রোডের ঘরের মধ্যে সনাতনবাবু কেমন যেন একলা অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। বললেন—কিন্তু আমি শুনেছিলাম তুমি কোথায় চলে গেছ?

সতী বললে—আমি কোথায় যাবো, বলো? আমার কি একটা যাবার জায়গা আছে? আর কি আমার বাবা আছে যে তাঁর কাছে গিয়ে লজ্জা বাঁচাবো?

সনাতনবাবু বললেন-লজ্জার কথা বলছো কেন?

সতী বললে—লজ্জা নয়? তোমার সঙ্গে বাবা নিজে আমার ভাগ্যকে একদিন জড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন, তোমার মান সম্মান লজ্জা সম্ভ্রমের সঙ্গে আমারও মান সম্মান লজ্জা সম্ভ্রম যে জড়িয়ে গিয়েছিল! এখন কি তার আর ভাঙা যায়?

সনাতনবাবু বললেন—কিন্তু আমি তো তা ভাঙতে বলিনি—

—তুমি বলোনি; কিন্তু বাধাও তো দাওনি! আমি চলে গেলে তোমার তো কষ্টও হয়নি। তুমি তো আমার অভাবও বোধ করোনি। তুমি তো আমার মত সারা রাত জেগেও কাটাও নি! তুমি তো আমার খোঁজও করোনি একবার?

সনাতনবাবু বললেন-তোমার খোঁজ? কিন্তু দীপঙ্করবাবুকে দিয়ে আমি তো তোমার কাছে খবর পাঠিয়েছিলাম—পাওনি তুমি?

সতী বললে—সে তুমি খোঁজ নাও আর না নাও, এবার কিন্তু আমি তোমার কথা রেখেছি—হাসপাতাল থেকে তুমি আমাকে এখানে নিয়ে আসতে চেয়েছিলে, তখন আসিনি, কিন্তু এখন তো এসেছি! আমি এসেছি বলে তুমি খুশী হওনি?

সনাতনবাবু বললেন—তুমি নিচেয় বসে কেন, ওপরে উঠে বোস না—

সতী উঠে বিছানায় বসলো। বললে—বলো তুমি খুশী হওনি, আমি এসেছি বলে?

সনাতনবাবু বললেন—খুশী তো হবোই, তুমি এতদিন পরে ফিরে এলে আর আমি খুশী হবো না?

সতী এবার সনাতনবাবুর গায়ের ওপর ঝুঁকে পড়লো, বললো—ওগো, তোমরা আর আমাকে তাড়িয়ে দিও না।

—কেন, তাড়িয়ে দেবার কথা বলছো কেন?

সতী সনাতনবাবুর গায়ের ওপর আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে ঝুঁকে পড়লো। বললে-না, তাড়িয়ে দিও না, তুমি তাড়িয়ে দিলে আমার যে আর কোথাও যাবার জায়গা নেই—। তুমি ছাড়া আর কেউ নেই যে আমার সংসারে। জানো আমি ছোটবেলা থেকে শিবপুজো করে এসেছি। আমার মা ছিল না, তবু কালিঘাটে থাকতে আমাদের পাড়ার এক মাসীমা আমায় শিবপুজো করতে শিখিয়েছিল। আমি জানতুম, আমি তোমার মত স্বামী পাবো, তুমি আমার সব আশায় ছাই দিও না, তোমার দুটি পায়ে পড়ছি। আমার জীবনে কোনও আশাই মেটেনি গো।

সনাতনবাবু বললেন—কিন্তু কাঁদছো কেন তুমি? কেঁদো না—

সতী সনাতনবাবুকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলে। তারপর সনাতনবাবুর বুকের মধ্যে মুখটা গুঁজে পাগলের মত মাথা ঘষতে লাগলো। বললে—তোমার ওপরে আমি অনেক অবিচার করেছি, অনেক অন্যায় করেছি। তোমাদের কষ্ট দিতে গিয়ে আমি নিজেও কত জ্বলে পুড়ে মরেছি, সে-খবর তো তোমরা জানো না—

তারপর একটু থেমে আবার বলতে লাগলো—যখন আমার রাগ হয় তখন আমার যে মাথার ঠিক থাকে না গো। আমি যে তখন যা তা করি, যা তা ভাবি, আমার মুখে যা আসে তাই বলে গালাগালি দিই। ওগো, সেটা যে আমার মনের কথা নয়, তা তুমি বুঝতে পারো না কেন? বুঝতে না পেরে কেন আমাকে বকো না, কেন আমাকে মারো না তুমি?

সনাতনবাবু সতীর পিঠে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

সতী বলতে লাগলো—এমনি করে তুমি যদি সব সময় আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দাও তো আমি পৃথিবীর সকলকে ক্ষমা করতে পারি, সকলের সব অত্যাচার, সব গালাগালি মাথা পেতে নিতে পারি—জানো। তুমি তো আমাকে চিনলে না গো। তুমি শুধু আমার বাইরেটাই দেখলে, আমাকে বুঝতেও চেষ্টা করলে না একবার। কিন্তু তুমি যদি আমাকে না বোঝ তো আর কে আমাকে বুঝবে বলো তো? আর কে আছে আমার?

সনাতনবাবু আবার বললেন—কেঁদো না, চুপ করো—

সতী বললে—কাঁদতে যে আমার কী ভাল লাগছে তা যদি তুমি বুঝতে! তোমার বুকে মাথা রেখে কাঁদতেও পাইনি কখনও এমন করে। মানুষ বোধহয় হেসেও এত সুখ পায় নি আমার মত!—আমাকে তুমি কান্না থামাতে বোল না আজ—আমি আজ বুক ভরে কেঁদে নিই—

সনাতনবাবু বললেন—কিন্তু এখন থেকে তো তুমি এখানেই থাকবে—

সতী বললে—থাকবো বলেই তো এসেছি। তুমি থাকতে দিলে আমি আর কোথাও যাবো না গো, আমি এবার থেকে এখানেই তোমার কাছে পড়ে থাকবো। তুমি তাড়িয়ে দিলেও আর কখনও যাবো না—

—আমি তোমায় তাড়িয়ে দেব এমন কথা তুমি ভাবতে পারলে কী করে?

সতী সনাতনবাবুর মুখের কাছে মুখ এনে বললে—আমি যদি চলেও যাই তো তুমি আমায় ধরে রেখো, জানো! আমাকে তুমি হাতে-পায়ে শেকল দিয়ে বেঁধে রেখো, বুঝলে? রাখবে তো? আমি এই যেমন করে তোমাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে আছি, এইরকম করে জোরে ধরে রেখো, কিছুতেই ছেড়ো না। আমি ছেড়ে যেতে চাইলেও তুমি ছেড়ো সনা, কেমন?

সতী প্রাণপণে দু’হাতে সনাতনবাবুকে জড়িয়ে ধরে রইল।

বললে—তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়ে আমি যে কী-ভুলই করেছি, তা আমিই জানি। আমি ফ্ল্যাট ভাড়া করে বাইরে রাত কাটিয়েছি। ভেবেছি তুমি হয়ত আমাকে একদিন গিয়ে ধরে নিয়ে আসবে। আমি বেটাছেলেদের আপিসে গিয়ে চাকরি করেছি। তখনও কতদিন ভেবেছি তুমি আমাকে ধরে নিয়ে এখানে এনে তুলবে। তোমাকে রাগাবার জন্যে আমি কত কী করেছি, হিন্দু-ঘরের বউ হয়ে যা করা উচিত নয়, তাই করেছি। তবু তোমাকে আমি এতটুকু ভাবাতে পারিনি, এতটুকু রাগাতে পারিনি। তুমি পাথরের ঠাকুরের মত নিশ্চল হয়ে থেকেছ। একবার তোমার জানতেও ইচ্ছে হয়নি আমি খেতে পাচ্ছি কি না, আমি বেঁচে আছি কি না, আমি কেমন করে আছি, কোথায় আছি, কীভাবে আছি!

তারপর হঠাৎ সনাতনবাবুর মুখটা নিজের দিকে টেনে এনে জিজ্ঞেস করলে–আচ্ছা সত্যি বলো তো, আমার জন্যে তুমি একটুও ভাবতে না? বল না গো?

সনাতনবাবু বললেন—ভাবতুম।

—সত্যি বলছো ভাবতে? আমার জন্যে তোমার ভাবনা হতো? ঠিক আমি যেমন তোমার কথা ভাবতুম, তেমনি করে তুমিও ভাবতে? রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুমোবার আগে আমার কথা মনে পড়তো?

সনাতনবাবু বললেন—পড়তো।

—সত্যি মনে পড়তো?

সনাতনবাবু বলেন -হ্যাঁ —

সতী সনাতনৱারুর গলাটা আরো জোরে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো। বললে—সত্যি বলছো মনে পড়তো আমার কথা? কখন মনে পড়তো? ঘুমোবার আগে না ঘুম থেকে উঠে? না দিনের বেলা? না কি সব সময়?

সনাতনবাবু কী বলবেন বুঝতে পারলেন না।

সতী বললে-বলো না গো, আমার বড় জানতে ইচ্ছে করছে। আমি তো সব সময় তোমার কথা ভাবতুম, সকালে বিকেলে, সন্ধ্যেয়, আপিসে কাজ করতে করতে, ঘুমোবার আগে, ঘুম ভাঙার পর—সব সময়। তোমার কখন মনে পড়তো? বলো না গো?

সনাতনবাবু যেন কী একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ বাইরে যেন শম্ভুর গলার আওয়াজ হলো। শম্ভু বাইরে থেকে বললে-দাদাবাবু, মা-মণি এসেছেন—

মা-মণি! শব্দটা যেন ছ্যাৎ করে সতীর বুকে এসে বিঁধলো। সঙ্গে সঙ্গে সতীর হাত দুটো সনাতনবাবুর গলা থে েঅবশ হয়ে খসে পড়লো। এতক্ষণ সতী যেন ভুলেই গিয়েছিল কোথায় কোন্ বাড়িতে বসে কথা বলছে। এতক্ষণে যেন হঠাৎ সংবিৎ ফিরে এল তার। এতক্ষণে মনে পড়লো সে লক্ষ্মীদির গড়িয়াহাট লেভেল-ক্রসিং-এর বাড়িতে থাকে। মনে পড়লো রঘুকে নিয়ে সে এ-বাড়িতে এসেছে একজন অবাঞ্ছিতের মত। মনে পড়লো তার জন্যে রঘু বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। আরো মনে পড়লো—এ- বাড়িতে তার ঢোকবার অধিকারও সে হারিয়েছে। এ-বাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্ক চিরকালের মত ঘুচে গেছে। এক মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত পৃথিবী যেন পরিক্রমা করে এল সতী। সমস্ত জীবনটা।

আর সঙ্গে সঙ্গে সনাতনবাবুর ভেজানো দরজাটা হাট করে খুলে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *