আমার মনের মরীচিকা

আমার মনের মরীচিকা

অনেক দূরে চলে এসেছি মৃগাঙ্ক, কিছুদিন আমার কোনও খবর পাবে না। বন্ধুভাগ্য আমার ভালো বলেই তোমার মতো বন্ধু পেয়েছি, কবিতাবৌদির মতো বন্ধু স্ত্রী পেয়েছি। আমার এই নিঃসঙ্গ জীবনটাকে তোমরা দুজনে স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে তুলেছ। ভালোবাসো বলেই আমার এত দিনের আনন্দ এই পেশাবদ্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে কত গল্পই না লিখেছ। সেদিন ভবিষ্যৎ বঙ্গ সাহিত্য সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের মন্তব্য পড়ছিলাম। যেদিন আনন্দের ভেতর দিয়ে লিখতে পারা যাবে, সেই দিন আবার সাহিত্য সৃষ্টির দিন ফিরে আসবে। ওঁর মনে হয়েছিল, বড় সাহিত্যিক আমাদের দেশে এখন আর জন্মাবে না। মৃগাঙ্গ, তুমি বড় সাহিত্যিক নও। নিজেকে সাহিত্যিক বলে কখনো দাবিও করোনি। কিন্তু তুমি যা লিখেছ, তা আনন্দের ভেতর দিয়েই লিখেছ। সে আনন্দ আমার ক্ষুদ্র কীর্তিকে পাঁচজনের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে থেকেই পেয়েছ। আনন্দ আমিও পেয়েছি। নইলে আর পাঁচটা বঙ্গসন্তানের মতো চাকরিবাকরি না করে অপরাধী-শিকারে মত্ত হলাম কেন। বহু বছর ধরে এই মৃগয়ায় আনন্দ পেয়েছি মৃগাঙ্ক, এখন আমি ক্লান্ত। বিষাদ কাটিয়ে ওঠার জন্যে বিষয়ান্তরে মনোনিবেশ করার প্রেসক্রিপশন করেন ডাক্তাররা–আমি বোধ হয় নিজে থেকেই তাই এই সৃষ্টিছাড়া পেশায় তন্ময় হয়েছিলাম এতগুলি বছর। মৃগয়া-মত্ত হয়েছিলাম ইচ্ছে করেই। ভুলে থাকার জন্যে। মনের ভেতরে চাপা পড়ে থাকা বেদনাকে এড়িয়ে থাকার জন্যে। কিন্তু মনের সঙ্গে ছলনা দীর্ঘদিন করা যায় না। মরীচিৎকার স্বরূপ একদিন না একদিন ধরা পড়েই। আমার এই আত্মবঞ্চনা আজ আমাকে পীড়া দিচ্ছে। আনন্দের অন্বেষণে এই পেশায় এসে আমার মনে হচ্ছে, অনেকের নিরানন্দের কারণ আমি হয়েছি। এতদিন আত্মশ্লাঘা অনুভব করেছিলাম দেশ আর দশের মঙ্গল করছি। ভুল, ভুল, এই অহঙ্কারই আমাকে অন্ধ করে রেখেছিল এতদিন। দেশ আর দশের সেবা করতে হয় কী করে, তা আটপৌরে মানুষদের কাছেই জেনে নেওয়া উচিত ছিল। সরাসরি তাদের মুখের মধ্যিখানে তাকিয়ে তাদের মনের মানদণ্ডে বুঝে নেওয়া উচিত ছিল তারা কী চায়। তাদের জীবনধারার মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে গিয়ে তাদের ছোট ছোট মঙ্গলের পথগুলিকেই আবিষ্কার করতে পারলেই শ্রীবাস্তব কল্পস্বর্গ এই মর্তেই হয়তো রচনা করা যায়। কিন্তু আমরা কেউ তা করি না। তাই চুরাশিতে অরওয়েলের বিভীষিকাবর্ষের মতো আমিও আমার বিভীষিকাবর্ষ যাপন করেছি। মরীচিৎকার পেছনে ছুটে ছুটে ক্লান্ত হয়ে পালিয়ে এসেছি অনেক দূরে…নিরালায় নির্জনে আত্মসমীক্ষা করে চলেছি। কি পেয়েছি বলতে পারো, এতগুলো বছর ধরে এত অপরাধী শিকার করে? কটা মানুষের প্রাণে আনন্দ দিতে পেরেছি? কজনকে সুখী করতে পেরেছি? কটা জীবনে আশার প্রদীপ জ্বালতে পেরেছি? কটা সংসারে শান্তিসমীরণ বওয়াতে পেরেছি? বরং ঠিক তার উল্টোটাই ঘটিয়েছি। আমার মনের এই মরীচিকা আর অস্পষ্ট নয় আমার কাছে।

ভাষার স্থপতি তুমি নও। গল্প-উপন্যাসের যে বিষয়বস্তু তুমি নির্বাচন করেছ, সেখানে এই স্থাপত্য দেখানোর সুযোগও নেই। ভাষার স্পন্দমায়া তাই তোমার লেখায় কখনো ফুটে ওঠেনি। ভাষাশিল্পের সুরম্য শিবিরে আবদ্ধ হয়ে থাকাটাও তোমার লক্ষ্যমাত্রা নয়। সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়াটাই আমার নেশা, অঘটনের মধ্যে মিশে যাওয়াটাই আমার আনন্দ। তুমি তোমার সরল ভাষার দীপাধার নিয়ে আমার এই নেশা আর আনন্দকেই উদ্ভাসিত করেছ দশজনের সামনে। তোমার গল্পে আমি কখনো হয়েছি রঙমহলের রাজা, কখনো দেখিয়েছ আমার হিরণ হাসির কিরণ। কিন্তু কখনো ভাবোনি, আমার কুটিল হাসিও ঘটিয়ে তোলে জটিল সর্বনাশ। তুমি রুদ্রের ডম্বরধ্বনি শুনিয়েছ তোমার পাঠকপাঠিকাদের, কিন্তু তার জীবনের স্কুল মিথ্যার খেলাকে কখনো ধরতেও পারো নি। তুমি লিখেছ তার শান দেওয়া খর খঙ্গসম ললাটে বুদ্ধি দিচ্ছে পাহারা, কিন্তু শান দেওয়া প্রতারণার ছুরিটা তোমার নজর এড়িয়ে গেছে। তুমি দেখেছ তার তীক্ষ্ণ সজাগ আঁখি, দেখেছ কটাক্ষে তার ধরা পড়ে কোথায় কার ফাঁকি–কিন্তু দেখোনি তার নেশাভ্রান্ত চরিত্রের ঝড়ের কলোগ্লাস, বিদ্যুতের অট্টহাস। তুমি দেখছে। তার উড়োপাখির ডানার মতো যুগল কালো ভুরু, কিন্তু কখনো কি খেয়াল করেছ, কি তীব্র তার হাস্য?

মৃগাঙ্ক, আমিই সেই ইন্দ্রনাথ রুদ্র। তোমার কপট প্রতারক প্রবঞ্চক বন্ধু ইন্দ্রনাথ রুদ্র। আমাকে তুমিও ধরতে পারোনি। ঘরে ঘরে সর্বনাশের বহ্নিশিখা জ্বালিয়ে আজ আমি ক্লান্ত, অনুতপ্ত, বিমর্ষ। আমার চোখ খুলে দিয়েছে একটি মেয়ে। ছোট্ট একটি মেয়ে।

অহল্যা যেমন মুনির শাপে পাষাণ হয়ে গিয়েছিল, মাঝে মাঝে মনে হত, আমিও বুঝি কারো শাপে পাষাণ হয়ে পড়ে আছি জীবনের সুবিস্তীর্ণ প্রান্তর বক্ষের ওপর দিয়ে। আমার শাপান্ত ঘটিয়েছে বোধহয় এই মেয়েটিই। আমার মনের কঠিন শুষ্ক শয্যার ওপর একটি মাত্র কচি স্নিগ্ধ শ্যামল ঘাস বলা যায় এই মেয়েটিকে। নামটিও তার মিষ্টি–শ্রাবণী। নীলবর্ণের বনফুল সেন।

শ্রাবণীকে কিছুদিন হল অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছিলাম আমার ঘরদোর মোছা আর বাসন মাজার কাজে। স্বপাকে আহার এখনো করি–বরাবরের অভ্যেস। ওই কাজটি কারও হাতে তুলে দিতে মন চায় না। প্রেশারকুকারে বেশিক্ষণ সময়ও লাগে না। কিন্তু ঘরদোর বাসনপত্র পরিষ্কার রাখতে ইদানীং বড়ই আলস্যবোধ করছিলাম।

মাসান্তে মাত্র পনেরো টাকা বেতনের বিনিময়ে শ্রাবণী আমাকে এই ঝাট থেকে মুক্তি দিয়েছে। খুবই গরিব। মাথার চুলে কোনওদিন তেলের ছোঁয়া লাগে বলে মনে হয় না। রুখু লালচে চুল চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে রাখে। একটাই লাল ফ্রক রোজ পরে। রোজ ভোর পাঁচটায় আসে। আমি ঘুম থেকে উঠি কাক ডাকবারও আগে–বেড়িয়ে ফিরি কাক ডাকবার সময়ে। শ্রাবণী আসে তারপর। রোজ শিউলিতলা থেকে ফুল কুড়িয়ে আনে। প্লেটে করে সাজিয়ে রাখে টেবিলে। ডালশুদ্ধ ফুল এনে রাখে ফুলদানিতে। জল পাল্টে দেয় নিজেই। আমাকে কিছু বলতে হয় না।

একদিন সে যাবার সময়ে বলে গেল, কাকু, আজ বিকেলে আসতে একটু দেরি হবে।

রোজ বিকেলে শ্রাবণী আসত চারটে বাজলেই–সেদিন এল ছটায়। ঘর মুছতে মুছতে হাসি হাসি মুখে নিজেই বললে, দাদার কাছে গেছিলুম, কাকু। দাদা বললে, আজকে থেকে যা। তোমার কষ্ট হবে বলে চলে এলুম।

আমি বললাম, বেশ করেছিস। দাদার কাছে গেছিলিস কেন? বেড়াতে?

না। টাকা আনতে।

টাকা আনতে কেন?

পাঁচ-ছদিন খাওয়া হয়নি যে।

সে কী! পাঁচ-ছদিন খাসনি?

না।

টাকা পেয়েছিস?

না।

আজ তাহলে খাবি কী?

হাসল শ্রাবণী। ঘর মুছতে লাগল মাথা নীচু করে।

আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম, আমাকে বলিসনি কেন? না খেয়ে থাকতে কষ্ট হয় না?

শ্রাবণী কথা বলল না।

আমি মানিব্যাগ খুলে দশটা টাকা দিয়ে বললাম, আবার দরকার হলে বলবি।

শ্রাবণী আর বলে নি। দাদার কাছ থেকেই নাকি টাকা এনেছিল। চার-পাঁচটা ছোট ভাইবোন আর মাকে নিয়ে কখনো একবেলা কখনো দু-বেলাই না খেয়ে থেকেছে। দাদা সেই কারণেই একা থাকে। বাবা নেই। শ্রাবণীর বয়স বড়জোর বারো।

এর দিন কয়েক পরেই ট্যাক্সি ড্রাইভার বলবন্ত সিং খুন হল আমাদের পাড়াতেই। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসের ধারে–নোংরা জলের নালার একটু দূরে।

বেলেঘাটা সি-আই-টি বিল্ডিংস তুমি দেখছ। বাইপাসটা গেছে তার গা ঘেঁষে। কিছুদিন আগেও এই বিল্ডিং ছিল কলকাতার পুব অঞ্চলের শেষপ্রান্ত–তারপরেই চব্বিশ পরগনা। ধু-ধু মাঠ আর ভেড়ি। এখন সেখানে সল্ট লেক স্টেডিয়াম তৈরি হচ্ছে, ফ্ল্যাটবাড়ির পর ফ্ল্যাটবাড়ি উঠছে। চিরনিদ্রিত সুদীর্ঘ অজগর সাপের মতো ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস এই দুইয়ের মাঝ দিয়ে যেন জড়শয়নে শুয়ে রয়েছে। স্থির, অবিচল, ধুলোয় লুণ্ঠিত। রাত্রিদিন তার ওপর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ছুটে যাচ্ছে। চাকা, হেঁটে যাচ্ছে চরণ। অহর্নিশ দুঃস্বপ্নের মতো বিচিত্র শব্দ আবর্তিত হয়েই চলেছে। চরণের আর চাকার স্পর্শে হৃদয় পাঠ করার বিদ্যে যদি এই মহাপথের জানা থাকত, তাহলে বলতে পারত কে বাড়ি যাচ্ছে, কে এয়ারপোর্টে যাচ্ছে, কে দক্ষিণের বালিগঞ্জ-পার্কসার্কাসে যাচ্ছে, কে জিরোতে যাচ্ছে, কে শ্মশানে যাচ্ছে। জানে না বলেই ধরতে পারেনি গভীর রাতে বলবন্ত সিং ট্যাক্সি চালিয়ে এসেছিল তার বুকের ওপর দিয়ে নিয়তির নির্দেশে দেহপিঞ্জর ত্যাগের লিখনকে সত্য করে তুলতে।

মৃগাঙ্ক, গল্প লিখতে বসে তুমি অনুপুঙ্খ বর্ণনা দাও সারস্বত উদ্দেশ্যে। আমি দেব কেবল প্রতিবেদন। সি-আই-টি বিল্ডিংয়ের শেষপ্রান্তে যেখানে খাল বুজিয়ে ওপর দিয়ে সড়ক নির্মিত হয়েছে, সেই জায়গাটা ছাড়িয়ে ধাপা লক পাম্পিং স্টেশনের পাশ দিয়ে দক্ষিণে একটু গেছিলে মনে আছে? দুর্গন্ধে প্রাণ আইঢাই করে উঠেছিল, নাকে রুমাল চাপা দিয়েছিলে? এখান থেকেই সড়কটা সোজা গিয়ে একটু বাঁয়ে বেঁকে চলে গেছে ধাপা-বানতলার আবর্জনা স্থূপের দিকে। সি-এম-ডি-এর স্বপ্ন একদিন এই রাস্তা আড়াইশো ফুট চওড়া হবে, মাঝখানে সবুজ মধ্যপটি থাকবে, ছটি ছরকমের পথ থাকবে এই আড়াইশো ফুটের ওপর, সুভাষ সরোবরের ধারে কাদাপাড়া টিলার মতো টিলা উদ্যানও গড়ে উঠবে, পুরো সড়কটাই আলো ঝলমলে থাকবে।

আপাতত, এ রাস্তায় হাঁটলে অথবা গাড়ি চালালে পদে পদে গরু মোষের সঙ্গে ধাক্কা লাগে, পায়ের তলায় সাপ কিলবিল করে উঠে নেমে যায় দু-পাশের ভেড়ির জলে, রাত্রে গাড়ি চালাতে গিয়ে বুক ঢিপ ঢিপ করে অন্ধকারে। হেঁটে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। উঁহু-হুঁহু দীর্ঘশ্বাস। সুখ দুঃখ, জরা-যৌবন, হাসি-কান্না, জন্ম-মৃত্যু, ধনী-দরিদ্র সমস্তই ওই নিশ্বাস ধুলোর স্রোতের মতো উড়ে যায় সুদীর্ঘ নিস্তব্ধ এই সড়কের ওপর দিয়ে।

কলকাতা পুলিশের সজাগ দৃষ্টি থাকে এই দিকে। এই সেদিন পর্যন্ত পুলিশ-চৌকি ছিল বিল্ডিংয়ের মোড়ে। তখন পার্টিতে পার্টিতে বোমাবাজি হত, দিবালোকে মানুষ খুন হত–পুলিশ প্রহরীর তর্জনি শাসনে তা কমে আসে। পুলিশ চৌকিও উঠে যায়। কিন্তু রাতের আঁধারে কালো জিপ টহল দিয়ে যায় জোরালো হেডলাইট জ্বালিয়ে। কেননা, পুরোনো বিল্ডিংয়ের এককোণে গড়ে ওঠা নতুন বিল্ডিংয়ে গভীর রাতে নাকি ট্যাক্সি ঢোকে কলকাতার দিক থেকে কিছুক্ষণ পরে সড়ক বেয়ে চলে যায় সল্ট লেক বা গড়িয়ার দিকে। পুরো সড়কটাই এখন বেআইনি কারবারের সড়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নোংরা জলের খালের পাশে কালো জিপটার হেডলাইটে হঠাৎ দেখা গেছিল দুমড়ে মুচড়ে পড়ে থাকা একটা দেহ। কালো পিচের রাস্তা থেকে একটু দুরে–ঘাস জমির ওপর। ঘাড়টা অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে রয়েছে পেছনে।

দাঁড়িয়েছিল কালো জিপ। রাতের প্রহরীরা নেমে গিয়ে পেয়েছিল বলবন্ত সিংকে। পকেট থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স উদ্ধার করতেই পাওয়া গিয়েছিল তার পরিচয়। ট্যাক্সিটা কিন্তু দেখা যায়নি। ঘাস-জমির ওপর চাকার দাগ ছিল।

হেডলাইট আর অনেকগুলো টর্চবাতির আলোয় দেখা গেছিল চোখ ঠেলে বেরিয়ে এসেছে বলবন্ত সিংয়ের। লড়েছে প্রাণপণে–টেরিন শার্ট ছিঁড়ে ঝুলছে দুপাশে। রঙিন সুতির মাফলারটা মুখ আর নাকের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে টেনে তিনটে গিঁট দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে পেছনে। গলার ওপর আঙুলের ছাপ। নিষ্ঠুরভাবে শ্বাসরোধ করা হয়েছে সব দিক দিয়েই।

বেলেঘাটা থানার বড়বাবুর সঙ্গে আমার হৃদয়ের সম্পর্ক আছে। কি জানি কেন ভদ্রলোক আমাকে ভালোবাসেন। কারণে অকারণে বাড়ি আসেন, পকেটভর্তি চুরুট বের করে আমাকে খেতে দেন, নস্যির ডিবেও বাড়িয়ে দেন। শীর্ণকায় এবং দীর্ঘকায় এই ভদ্রলোকই বলতে গেলে আমাকে চুরুট আর নস্যিতে রপ্ত করে ছেড়েছেন। অট্টহেসে বলেন, দিনে অন্তত একবার…চার্চিল… চার্চিল…ক্যালকাটার চার্চিল মশায়…চুরুট আর নস্যি দুটোতেই মজা পেতেন–দুটো দিয়েই ব্রেন সাফ রাখতেন।

এঁর নাম ধরণী ঘোষাল। কৃষ্ণকায় হাস্যমুখ সদাশয় আড্ডাবাজ পুরুষ। উনিই আমাকে দেখালেন বলবন্ত সিংয়ের লাশটা। শুনলাম, পকেটে গোটা পঞ্চাশ টাকা ছিল–দিনের শেষে ওই রকম রোজগারই হত রোজ। টাকা নেই। ট্যাক্সিও নেই। ওয়েস্টার্ন কান্ট্রির মতো ট্যাক্সি ছিনতাই আরম্ভ হয়েছে দিল্লির পর কলকাতাতেও। কিন্তু ট্যাক্সি ড্রাইভারকে খুন করতে গেল কেন? ফেলে পালালেই তো হত।

অটোপ্সি রিপোর্ট দেখলাম। ডেথ বাই স্ট্রাংগুলেশন। শ্বাসতন্ত্র এক্কেবারেই জখম। নাক আর মুখের পেছনে সাড়ে চার ইঞ্চি লম্বা দলসদৃশ ফ্যারিংক্স বা ভয়েস বক্সের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়েছে। কঠিন কার্টিলেজ দিয়ে গড়া ফ্যারিংক্স গাত্র সব সময়ে ভোলা থাকে–কিন্তু প্রচণ্ড চাপ দিয়ে তা থেঁতলে দেওয়া হয়েছে।

বলবন্ত সিংয়ের অনামিকায় আংটি পরার কোনও দাগ দেখলাম না। কিন্তু ঘড়ি পরার দাগ আছে বাম মণিবন্ধে। ঘড়ি পাওয়া যায়নি।

ধরণীবাবু জানালেন, ট্যাক্সি ড্রাইভারদের অ্যাসোসিয়েশন ওয়ান ডে স্ট্রাইক করতে চলেছে। হত্যাকারীকে ধরতে না পারলে আরো জল গড়াবে। অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাবান ব্যক্তি–মেম্বার অফ পার্লামেন্ট। চাকরি নিয়ে না টানাটানি করে। কলকাতা নামক মনুষ্য অরণ্যে গাড়ি চাপা পড়ে আর অনাহারেই রোজ কতজন অক্কা পাচ্ছে–কেউ মাথা ঘামায় না। একটা ট্যাক্সি ড্রাইভার

হয় জীবনসংগ্রাম থেকে ছাড়ান পেল–তা নিয়ে এত হই-চই করার কি আছে?

শুনতে-শুনতে শ্রাবণীর মুখটা মনে পড়ে গেছিল। সত্যিই তো, চার-পাঁচদিন না খেয়ে হাসিমুখে আমার খিদমৎ খেটে গেছে বাচ্চা মেয়েটা–কেউ তো খবর রাখেনি।

নিন, নিন, খান, হাতে একটা চুরুট গুঁজে দিয়ে বলেছিলেন ধরণী ঘোষাল, ব্রেনটাকে একটু ঝাঁকুনি দিয়ে দেখুন না হোমিওসাইড স্কোয়াডকে হেলপ করতে পারেন কিনা। লাখ লাখ লোকের মধ্যে থেকে কিলার খুঁজে বার করতে গিয়ে শালা নিজেই না কিলড হয়ে যাই।

বলতে বলতেই এসেছিল টেলিফোন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমিই ধরণী ঘোষাল… তরণী এবার ডুবল বলে…পাওয়া গেছে ট্যাক্সিটা?…অ্যাবাচ্ছ?…আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার সামনে?…ফুয়েল মিটারের ইন্ডিকেটর E-য়ের দাগে?…নো ক্লু?..গুড।

ঠকাস করে রিসিভার নামিয়ে রেখে ধরণী ঘোষাল জানালেন, বড় জবর পরিহাস করে গেছে হত্যাকারী। খালি ট্যাক্সি রেখে গেছে থানার সামনেই–বুকের পাটা তো কম নয়। পুলিশকে চ্যালেঞ্জ।

আমি বলেছিলাম, তা নয়। চ্যালেঞ্জের ব্যাপারই নয়। থানার সামনে ট্যাক্সি ফেলে যাওয়ার দরকার হলে কাছাকাছি থানাগুলো ছেড়ে গিয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিট থানা পর্যন্ত যাওয়া কেন? আসলে তেল ফুরিয়ে গেছিল। জিগ্যেস করেছিলাম, গাড়ির মুখটা কোন দিকে ছিল বলেছে? ধরণীবাবু বললেন, উত্তর দিকে। রাজা রামমোহন রায়ের বাড়ির দিকে। কিন্তু ইন্দ্রনাথবাবু, সন অভ সোয়াইনটাকে এখন কোথায় পাই বলুন তো?

সন নয়, বলুন সন্স। একজন হত্যাকারী নয়–একাধিক। দুজন তো বটেই, তিনজন হওয়াও বিচিত্র নয়। বলবন্ত সিং শক্তিশালী যুবক। লড়েওছে প্রাণপণে। কিন্তু পারেনি অতজনের সঙ্গে।

তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ধরণীবাবু বলেন, অবভিয়াসলি।

আমি বললাম, বলবন্ত সিংয়ের ডেরায় হানা দিয়েছেন?

এই যাব বলেই তো আপনাকে পাকড়াও করে নিয়ে এলাম। চলুন।

ভবানীপুরে বলবন্ত সিংয়ের আস্তানায় উল্লেখযোগ্য কিছুই পাওয়া যায়নি। ব্যাচেলার। একা থাকত একটা ছোট্ট ঘরে। মদের খালি এবং ভর্তি বোতল আর ফিল্মস্টারদের ছবিতে বোঝাই ঘর। দেওয়ালে সাঁটা বিশেষ একটা নায়িকার বুকের ওপর কলম দিয়ে আঁকা হরতন-তিরবিদ্ধ।

স্যাডিস্ট, একদৃষ্টে সেদিকে চেয়ে আছি দেখে, নাক কুঁচকে বলেছিলেন ধরণী ঘোষাল, আপনি নন–বলন্ত সিং।

আমি ওঁকে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পাশেই টায়ারের দোকানে ঢুকেছিলাম। টেলিফোন যন্ত্রটা দেখিয়ে জানতে বলেছিলাম, বলবন্ত সিংয়ের নামে টেলিফোন আসত কিনা। শিখ দোকানদার খালিস্তানি মেজাজ দেখিয়ে বলেছিল, আসত বইকি–এখনো আসে। দিল চৌচির করার মতো সব টেলিফোন।

দিল চৌচির করার মতো টেলিফোনই আশা করছিলাম। খুঁটিয়ে জিগ্যেস করতেই খবরটা পেয়ে গেলাম। একটি নারীকণ্ঠ প্রায় ডেকে দিতে বলত বলবন্ত সিংকে। বলবন্তও তাকে ফোন করত। তার ঠিকানা? আবার উগ্র হয়ে উঠেছিল খালিস্তানি টেম্পার। আমি ধীরে-সুস্থেই ঠিকানা উদ্ধারের পথ বাতলে দিয়েছিলাম। উল্টোপাল্টা টেলিফোনের বিল আসার জন্যে অনেকেই আজকাল খাতায় লিখে রাখে রোজ কোন নম্বরে টেলিফোন করা হল। সেরকম খাতা নেই কি দোকানে? সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিল খাতাখানা। উগ্র শিখ আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল, তিনদিন আগে বলবন্ত সিংয়ের ফোন করা নাম্বারটা। একই নাম্বার দেখলাম আগেও লেখা রয়েছে খাতায়।

ওইখান দাঁড়িয়েই ফোন করলাম ওয়ান নাইন সেভেনে। ডাইরেক্টরী এনকোয়ারি। পেয়ে গেলাম আলিপুরের একটা ঠিকানা।

গিয়েছিলাম সেখানে। বাড়িটা এক বিলেত ফেরত ব্যারিস্টারের। এখন অবশ্য ব্যারিস্টার সম্মান আর কাউকে দেওয়া হয় না–সবাই অ্যাডভোকেট। তাহির আমেদ কিন্তু মার্বেল প্রস্তর ফলকে এখনো সেই ঘোষণাই করে চলেছেন।

ভদ্রলোক মাঝবয়সি৷ পুলিশ দেখেই পাইপ নামিয়ে বললেন, খবরটা পেলেন কী করে?

আকাশ থেকে পড়লেন ধরণী ঘোষাল, কীসের খবর?

সাকিনা দুদিন হল পালিয়েছে–পুলিশকে জানাইনি কেলেঙ্কারির ভয়ে, বাট হাউ…

সাকিনা তার একমাত্র মেয়ে। পঞ্চদশী। স্কুলগার্ল। ঘর তার দোতলায়। পেছনের বারান্দা থেকে নেমে যাওয়া যায় একতলার বাগানে-সেখানে থেকে দরজা খুলে দুদিন আগে রাত্রে পালিয়েছে সাকিনা। মায়ের হিরে-জহরতও নিয়ে গেছে। প্রায় লাখ টাকার জুয়েল। বলা বাহুল্য, বেশির ভাগই কালো টাকায় কেনা। তাই চেপে গেছিলেন তাহির আমেদ।

সাকিনার পড়ার টেবিলে নিজের একটা ছবি ছিল কাঁচের তলায়। এককোণে ছোট করে একটা টেলিফোন নাম্বার লেখা–খালিস্তানী শিখের টায়ারের দোকানের টেলিফোন নাম্বার।

সাকিনা দেখতেও বিশেষ সেই নায়িকার মতো–যার ছবির বুকের হরতন আঁকা দেখে এসেছি বলবন্ত সিংয়ের ঘরে।

প্রেমের সম্পর্ক ছিল দুজনের মধ্যে। সাকিনা জহরত নিয়ে পালিয়ে গেছে তাহলে বলবন্ত সিংয়ের কাছেই।

তক্ষুনি গেলাম টায়ারের দোকানে। বলবন্ত সিং কি সাদি-টাদি করব বলেছিল ইদানীং? বলছিল বইকি। টাকার পাহাড়ে নাকি বসবে শিগগিরই–ট্যাক্সি চালাতে আর হবে না–টায়ারের দোকান দেবে। ক্যাপিটাল? কুছপরোয়া নেহি–ওভি হো জায়গা।

কিন্তু বলবন্ত সিংয়ের একখানা মাত্র ঘরে তালা ঝোলে না কেন? আমরা তো ভেজানো দরজা খুলেই ভেতরে ঢুকেছিলাম। তালা কোথায়?

আশপাশের ঘরের বাসিন্দাদের জিগ্যেস করে জানা গেল, ব্যাচেলার বলবন্ত ওই রকমই কাছাখোলা। এই তো দিন কয়েক আগেই ভোররাতে বন্ধুবান্ধব নিয়ে এসেছিল। কেউ উঠে অবশ্য দেখেনি, বলবন্ত তাদের মধ্যে ছিল কিনা। ভোরবেলা দেখা গেল দরজা দু-হাট করে খোলা–বলবন্ত নেই, বন্ধু-টন্ধুও নেই। নিশ্চয় চাবি দিতে ভুলে গেছে।

তালাটা পাওয়া গেল ঘরের মধ্যে। যা খুঁজছিলাম, সেটা কিন্তু পাওয়া গেল না–জহরতের বাক্সটা। যে রাতে বন্ধুদের নিয়ে বলবন্ত এসেছিল বলে প্রতিবেশীদের বিশ্বাস, সে রাতেই খুন হয়েছিল বলবন্ত। পকেট থেকে চাবি নিয়ে বন্ধুরা এখানেই এসেছিল জহরতের বাক্স সরাতে।

হত্যাকারীরা তাহলে বলবন্তের বন্ধু। বাড়ির ঠিকানা জানত। কিন্তু ট্যাক্সি নিয়ে উত্তর কলকাতার দিকে যাচ্ছিল কেন? সটান ভবানীপুরে এল না কেন?

খুনটার মোটিভ তাহলে ট্যাক্সি ছিনতাই নয়–জহরত লুঠ। শুনে নিশ্চিন্ত হলেন ধরণী ঘোষাল–ট্যাক্সি ড্রাইভারদের হামলা এবার রোখা যাবে।

আমার মনটা কিন্তু খচখচ করতে লাগল। বলবন্তর বন্ধুরা অত রাতে বেলেঘাটাতেই বা এল কেন, খুন-টুন করে ভবানীপুরের দিকে না গিয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার সামনেই বা গেল কেন?

ধরণী ঘোষালকে নিয়ে এলাম আমহার্স্ট স্ট্রিট থানায়। দেখলাম ট্যাক্সিখানা। পেছনের ট্রাঙ্ক খুলে দেখলাম, থরে থরে সাজানো টায়ার। অনেকগুলো মোটর সাইকেলের টিউবও রয়েছে ভেতরে। টায়ার আর টিউব, দুটো থেকেই বেরোচ্ছে দিশি মদের গন্ধ। চোলাই মদ। টিউবে ভরে টায়ারের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে যাওয়া হত। সবকটা টিউবই খালি। অর্থাৎ ট্যাক্সি করে মাল পাচার করে ফিরছিল বলবন্ত সিং। কোথায় ফিরছিল?

ধরণী ঘোষালকে নিয়ে চলে এলাম বেলেঘাটায়। চোলাই মদের ডিপো এখানে একটা নয়–একাধিক। ডোবায় পোঁতা থাকে বোতল, জালা। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসের ধারে ধারে ধাপা-বানতলা পর্যন্ত চলছে এই ব্যবসা। দিনদুপুরেও দূর থেকে দেখা যায় ঝোঁপের মধ্যে জলা-জায়গায় ধোঁয়া উঠছে। ধরণী ঘোষাল দেখলাম আমার চাইতেও বেশি খবর রাখেন। মার্কামারা কয়েকটি আড়তে হানা দিলেন সবার আগে। অভয় দিতে এক জায়গায় বললে, বলবন্ত সিং খুন হয় যে রাতে, সেইদিন একগাড়ি মাল নিয়ে গেছিল। সঙ্গে ছিল তিনজন পাঞ্জাবি দোস্ত। শিখ।

ধরণী ঘোষাল উল্লসিত হলেও আমি হইনি। এত বড় শহরে তিনজন শিখ খুনেকে খুঁজে বার করা সম্ভব নয় কোনওমতেই। কিন্তু তাই বলে তো হাল ছেড়ে দেওয়াও যায় না। একগাড়ি মাল ডেলিভারী দিয়ে বলবন্ত বন্ধুদের নিয়ে আবার আসছিল নিশ্চয় আর একগাড়ি মাল নিতে–অন্তত বন্ধুরা তাই বুঝিয়েছিল বলবন্তকে। তারপর বচসা হয়েছে–খুন হয়েছে বলবন্ত। কিন্তু কলহটা কি নিয়ে? সাকিনাকে নিয়ে নয়তো? উপপত্নীর ভাগ তো দোস্তরাই চায়। সাকিনা তাহলে কোথায়? ট্যাক্সি পাওয়া গেছে উত্তরমুখো অবস্থায়। বলবন্তকে সরিয়ে দোস্তরা প্রথমেই সাকিনা সন্ধানেই যাচ্ছিল নিশ্চয়–ভেবেছিল রূপ আর রূপো এক জায়গাতেই পাওয়া যাবে। তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় ফিরে এসেছে বলবন্তের ঘরে। জহরত পেয়েছে কিনা জানা যাচ্ছে না–কিন্তু সাকিনাকে পেয়েছে কি?

বলবন্তর যা চরিত্র, তা থেকে বোঝা যায় উত্তর কলকাতার একটা নিষিদ্ধ পল্লীতে তার যাতায়াত থাকা স্বাভাবিক। সোনাগাছিতে। চোরাই মদের কারবারটাও সেখানে চলে ভালো। ট্যাক্সি নিশ্চয় যাচ্ছিল সেই দিকেই। বলবন্ত নিজের ঘরে তোলেনি সাকিনাকে হয়তো রেখে এসেছে নিষিদ্ধ পল্লীরই কোনও নিশ্চিন্ত ডেরায়।

গেলাম সোনাগাছিতে। হেদিয়ে পড়েছিলেন ধরণী ঘোষাল। কিন্তু ঘনঘন নস্যি নিচ্ছিলেন আর দিচ্ছিলেন আমাকে। চার্চিল…চার্চিল স্বগতোক্তি শুনে যাচ্ছিলাম সমানে। মৃগাঙ্ক, তুমি সোনাগাছি কখনো যাওনি আমি জানি। কিন্তু আমার লাইনটাই খারাপ। সব খবরই রাখতে হয়। বারবনিতাদেরও ক্যাটেগরি আছে। রূপ আর পশার অনুযায়ী এক-এক বাড়িতে এক-এক দলের নিবাস। নতুনদের তোলা হয় আবার বিশেষ বিশেষ জায়গায়। বাঙালি, হিন্দুস্থানী, মুসলিম, চাইনিজদের এলাকা আলাদা আলাদা। নিয়মিত খদ্দেররা মোটামুটি খবর রাখে দালালদের দৌলতে–দালালরাও সব খবর ভাঙে না। পুলিশের ভয়ে। কিন্তু রামকেষ্ট আমার হাতের লোক। কোনওকালে তার একটা উপকার করে ফেলেছিলাম–আজও সেই উপকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে সে এক পায়ে খাড়া। ধরণী ঘোষালকে জিপে বসিয়ে এই রামকেষ্টকেই খুঁজে বার করলাম। কথা ফুরোনোর আগেই সে শুধু সাকিনার ডেসক্রিপশন শুনে বলে দিলে, মালটা কদিন আগেই এসেছে বটে কিন্তু বাজারে নামেনি এখনো। প্রাইভেট মাল। প্রাইভেটদের এলাকায় আছে বহাল তবিয়তে। সোনাগাছির অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী সেখানে কাউকে নিয়ে যাওয়া যাবে না।

কিন্তু রামকেষ্ট তো আমাকে চেনে। সোনাগাছির সততা সম্বন্ধে আমাকে সমঝে দেওয়ার পর নিয়ে গেল সাকিনার ঘরে। পঞ্চদশী মেয়েটা যেন আগুন দিয়ে গড়া। হেলেনের জন্য ট্রয়, পদ্মিনীর জন্যে চিতোর ধ্বংসের পর সাকিনার জন্যেও কলকাতা ধ্বংস হয়ে গেলে আশ্চর্য হব না। বলবন্ত তো গেলই–এবার যাবে তার হত্যাকারীরা।

আমাকে দেখেই ভুরু কুঁচকেছিল সাকিনা। রামকেষ্ট অভয় দেওয়ার পর ভুরু সরল হয়েছিল। বলবন্ত যে আর নেই, প্রথমে তা ভাঙি না। শুধু দুটো প্রশ্ন করেছিলাম–জহরতের বাক্সটা কোথায়?

বলবন্তর কাছে, বলেছিল সাকিনা। অত দামি বাক্স এ অঞ্চলে রাখতে চায়নি। কিন্তু আজ এলেই বলবে বাক্স ফিরিয়ে আনতে।

দ্বিতীয় প্রশ্নটা করতেই বললে, হা, হা, চিনব না কেন? আমারই দেওয়া তো।

দ্বিতীয় প্রশ্নটা কি যদি আঁচ করতে পারো, মৃগাঙ্ক, তাহলে বুঝব তুমি বড় গোয়েন্দা-লেখক। আর যদি না পারো, ধৈর্য ধরো।

তখন সন্ধে হয়েছে। সোনাগাছির মদের আড্ডায় ভিড় শুরু হয়েছে। রামকেষ্টকে দিয়ে দোকানদারকে ম্যানেজ করিয়ে কাউন্টারের পেছনে সাকিনাকে বসিয়ে রাখলাম বোরখা পরিয়ে। সাকিনা এসেছিল–বলবন্ত আর ফিরবে না শুনে রাগে ফুঁসতে ফুসতে এসেছিল। মদ খেতে আসবে শুনে এক কথাতেই রাজি হয়ে গেছিল।

ভেবেছিলাম একত্রে হবে না–অনেক রাত অপেক্ষা করতে হবে। সোনাগাছিতে মদের কারবারে এবং মেয়েদের কারবারে যাদের যাতায়াত নিয়মিত, কিছুক্ষণের জন্যেও এখানে তাদের আসতেই হয় গলা ভিজিয়ে নেওয়ার জন্যে। জহরতের বাক্স পেয়েও যারা জহরতের মালকিনকে পায়নি, সাকিনার সন্ধানে তারা আসবেই আসবে। সাকিনার সন্ধানে না হলেও টাকা ওড়াতে, ফুর্তি করতে আসবেই। এখানে বসে মদ যারা খায় না, বোতল বগলে করে নিয়ে যায় তারা। মোট কথা, আসতেই হবে। অপরাধীদের চরিত্রের এদিকটা আমার ভালোভাবেই জানা।

মৃগাঙ্ক, ভাগ্য সহায় হয় উদ্যোগীদের। বরাবর তাই দেখেছি। সেই সন্ধ্যাতেও তাই দেখলাম। তিনজন শিখ পাঞ্জাবি ঢুকল ঘরে। চনমনে চোখ। বেপরোয়া ভাবভঙ্গি।

চোখের ইশারা করল সাকিনা। বোরখার আড়ালে দেখলাম চোখ জ্বলছে তার।

ধরণী ঘোষাল তৈরি ছিলেন। তিনজনকেই তুললেন আগে থেকে এনে রাখা ভ্যানে।

তিনজনেই কবুল করেছিল বলবন্ত হত্যার অপরাধ। ওরা ছিল চারবন্ধু। মদ সাপ্লাই ওদের মেন বিজনেস। ট্যাক্সি রেখেছিল বলবন্ত সেই কারণেই। কিন্তু একদিন সাকিনাকে প্যাসেঞ্জার তুলে তাকে গেঁথে ফেলেছিল ছিপে। বাড়ি থেকে বার করে জহরতের বাক্সও তুলেছিল বাড়িতে। মতলব ছিল বোম্বেতে পিঠটান দেওয়ার–সাকিনাকে নিয়েই। ফিল্ম হিরোইন বানাতে। কিন্তু তিন দোস্ত বাগড়া দিয়েছিল মদের কারবার লাটে উঠবে দেখে। দেখতে চেয়েছিল সাকিনাকে। দেখায়নি বলবন্ত। বেলেঘাটায় ওই জন্যেই ওকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হয় সাকিনা আর জহরতের ভাগ দাও নইলে জানে মরো। লড়ে গেছিল বলবন্ত–কিন্তু…

তিনজনের একজনের দিকে আমি একদৃষ্টে চেয়েছিলাম। অনেকক্ষণ থেকেই। মাথায় সে ছোটখাটো, শিখদের মতো লম্বা চওড়া নয়। কথাও বলছে না। চুপচাপ।

ধরণী ঘোষালকে আড়ালে ডেকে বলতেই তাকে ছাড়া বাকি দুজনকে সরিয়ে নিয়ে গেছিলেন তিনি ঘর থেকে।

ঘরে তখন সে আর আমি।

আমি চোখে চোখে চেয়ে বলেছিলাম, তুমি বাঙালি?

চমকে উঠেছিল সে।

এ পথে এলে কেন?

কর্কশ গলায় বলেছিল সে, পেটের জ্বালায়।

কিন্তু এখন তো ইন্ডিয়ান পিনাল কোডের ৩০২ ধারা অনুযায়ী, ফাঁসি হবে তোমাদের। ৩৯০ ও ৪০২ ধারা অনুযায়ী রবারি আর ডেকয়টি চার্জেও ফেঁসে যাবে।

নীরবে চেয়ে রইল সে। ভয় পেয়েছে।

দাড়ি গোঁফ রেখেছ কেউ যাতে চিনতে না পারে–কেন? আরও খারাপ কাজ করেছ? কথা নেই।

বিয়ে করেছ?

হ্যাঁ।

বউ আছে?

হ্যাঁ।

ছেলেমেয়ে?

আছে।

এদের ভাসিয়ে দিয়ে যেতে তো হবে এবার।

ভাসিয়ে দিয়েছি অনেকদিন।

বাড়ি ছাড়া? হ্যাঁ।

কেন?

খেতে দিতে পারি না।

এখন তারা খেতে পাচ্ছে?

মাঝে মাঝে টাকা পাঠাই–মুখ আর দেখাই না।

কোথায় থাকে তারা?

জবাব নেই।

তাদের জন্য মন কাঁদে না? দেখতে ইচ্ছে যায় না?

পকেট থেকে একটা ফটো বার করল সে। কোণ দুমড়ানো মলিন। বললে, এইটাই দেখি রোজ।

দেখি।

ইতস্তত করে বাড়িয়ে দিল সে।

আমি দেখলাম এবং চমকে উঠলাম। ছজনের পরিবারের একজনকে আমি চিনি। শ্রাবণী।

মৃগাঙ্ক, তাই আমি পালিয়ে এসেছি। খেতে না পাওয়া মেয়েটাকে এবার আমি বাপহারাও করলাম জন্মের মতো। তাকে টাকা দিয়েছি, খাবারের বন্দোবস্ত করে এসেছি–কিন্তু শুধু আমিই জানি–ইহজীবনে সে আর বাবাকে ফিরে পাবে না।

সাকিনাকে ফিরিয়ে দিয়েছি তার বাবার কাছে। সে ঘড়িটা চিনিয়ে না দিলে, বলবন্ত সিংয়ের হত্যাকারীকে ধরতে পারতাম না। ধরণী ঘোষালরা একদম মাথা খাটান না–এইটাই ওঁদের বড় দোষ। বলবন্ত সিংয়ের কব্জিতে ঘড়ি পরার দাগ ছিল। কিন্তু ঘড়িটা নিয়ে একদম মাথা ঘামাননি। টাকা পয়সাসমেত হত্যাকারীরা সেই ঘড়িটাও তো খুলে নিয়ে গেছিল। একজন না একজন হাতেও নিশ্চয় পরেছিল–নিশ্চয় দামি বলেই নিয়ে যাওয়ার লোভ হয়েছিল। সাকিনাই চিনিয়ে দেয় ঘড়িটা। ক্যাসিয়ে কোয়ার্জ ঘড়ি-মাস, তারিখ, বার, অ্যালার্ম–সব আছে সেই ঘড়িতে। এই একটিমাত্র সূত্র সন্ধানেই সাকিনার সঙ্গে দেখা করেছিলাম এবং দ্বিতীয় প্রশ্নটা করেছিলাম।

যাক সেকথা, শ্রাবণীকে পিতৃহীন করার অপরাধ বুকে নিয়ে পালিয়ে এসেছি এই পাহাড়-বনের নির্জনতায়। বিবেককে জিগ্যেস করছি বারবার, সমাজের ভালো করতে গিয়ে নির্দোষদের সর্বনাশ করার কোনও অধিকার কি আছে আমার? শ্রাবণী তো নিষ্পপ–কেন তার এত বড় ক্ষতি আমি করলাম? খ্যাতি? যশ? কৃতিত্বের অহঙ্কার? মরীচিৎকার পেছনে আর কতদিন ছুটে চলব, মৃগাঙ্ক, বলতে পারো?

* রোমাঞ্চ পত্রিকায় প্রকাশিত।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *