আটটা ঝিনুকের বোতাম

আটটা ঝিনুকের বোতাম

বন্ধুবর ইন্দ্রনাথের গুণ অনেক। সে ভারত বিখ্যাত প্রাইভেট ডিটেকটিভ। মিষ্ট ভাষণে তার জুড়ি নেই। অনুভূতির সূক্ষ্মতায় তাকে শিল্পী বলা চলে। বুদ্ধির তীক্ষ্ণতায় সে ইন্ডিয়ান শার্লক হোম।

কিন্তু চাঁদেরও কলঙ্ক থাকে। ইন্দ্রনাথেরও একটা বদ্ দোষ আছে। তা হল তার অহংভাব। পাঁচজনের সামনেই এমন টিটকিরি মেরে বসে যা শুনে কান-টান ঝাঁ-আঁ করে ওঠে।

সেদিন এই নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড হয়ে গেল আমাদের মধ্যে।

রবিবারের বিকেলে ইন্দ্রনাথের মেসে গেছিলাম আমি আর গৃহিণী কবিতা। গিয়ে দেখি লঙ্কা পায়রার মতো এক ফুলবাবু জোড়হস্তে দাঁড়িয়ে।

ইন্দ্রনাথের ললাটে কুটি। এবং যেন কিছু বিব্রত।

আমাদের দেখেই বললে–এসো ভায়া এসো। বসো বউদি। তোমাদের কথাই হচ্ছিল।

কালো চোখ নাচিয়ে লাল ঠোঁট বেঁকিয়ে কবিতা বললে–কী সৌভাগ্য আমাদের।

কিন্তু উপলক্ষ্যটা কী? জিগ্যেস করলাম আমি।

এই ভদ্রলোকের নাম লম্বোদর লস্কর। আর ইনিই সেই কুখ্যাত সাহিত্যিক মৃগাঙ্ক রায়। জীবনসঙ্গিনী কবিতা রায়। যাঁদের কথা আপনাকে বলছিলাম লম্বোদরবাবু।

নমস্কার-প্ৰতিনমস্কারের পালা শেষ হলে বিনয়-গলিত হেসে লক্কাপায়রা যুবকটি বললেন– এজ্ঞে, আমি এসেছিলাম ইন্দ্রনাথবাবুর কাছে অ্যাপ্রেন্টিস হতে।

কীসের অ্যাপ্রেন্টিস?

গোয়েন্দাগিরির।

হাসি চেপে বললাম–, ইন্দ্রনাথ বলে কী?

এজ্ঞে, উনি বলেন আপনাদের দ্বারাও যখন অ্যাদ্দিনে কিছু হয়নি, তখন আমার দ্বারাও হবে না।

কী!

ফস করে দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে ইন্দ্রনাথ বললে–কথাটা কি মিথ্যে বলেছি, মৃগ? এতদিন ধরে আমার সাগরেদি করে শুধু ছাইভস্ম লেখা ছাড়া আর কিছু করতে পেরেছ আজ পর্যন্ত? বৌদির কথা বাদই দিলাম, মেয়েদের দ্বারা জগতে কোনও মহকর্ম সাধিত হয় না।

মুখ লাল করে কবিতা বললে–ঠাকুরপো তোমার বড় দেমাক হয়েছে।

রেগে গিয়ে আমি বললাম–সুযোগ এলে তোমার দর্প আমি চূর্ণ করব।

অট্টহেসে ইন্দ্রনাথ বললে–সুযোগ এসেছে।

কীরকম?

জয়ন্ত ফোন করেছিল। রাঁদেভু হোটেলে একজন খুন হয়েছে। বেরুতে যাচ্ছি এমন সময়ে এলেন লম্বোদরবাবু। তারপরেই তোমরা।

তাই নাকি? তাই নাকি? জ্বলজ্বলে চোখে বললে লম্বোদর।

চ্যালেঞ্জটা অ্যাকসেপ্ট করবে কিনা ভেবে দেখ, বলল ইন্দ্রনাথ। মুরোদ থাকে চলো আমার সঙ্গে। বউদি তুমিও এসো। লম্বোদরবাবু, যাবেন নাকি? গোয়েন্দা হওয়ার যোগ্য কার আছে আর কার নেই–তা জয়ন্তর সামনেই একটা টেস্ট কেসেই প্রমাণিত হয়ে যাক।

গল্প-টল্প লিখে ইদানীং আমারও একটু দম্ভ হয়েছিল বোধহয়, তা না হলে লম্বোদয় লস্করের সামনে ইন্দ্রনাথের টিপ্পনীতে অত অপমানিত বোধ করব কেন।

তক্ষুনি লাফিয়ে উঠে বললাম–চলো দেখা যাক কেরামতিটা কার বেশি।

পাঞ্জাবির দিকে হাত বাড়িয়ে ইন্দ্ৰনাথ শুধু বললে–চলো।

পরে অবশ্য অনুতপ্ত হয়েছিলাম এই হঠকারিতার জন্যে।

.

পার্ক স্ট্রিট। রাঁদেভু হোটেল।

লবিতে গিজগিজ করছে পুলিশ, রিপোর্টার আর হোটেল-গেস্ট। কনক্রিট দেওয়ালের মতো পথ আটকে দাঁড়িয়ে সার্জেন্ট অচল দত্তর বিপুল দেহ। পাশেই দাঁড়িয়ে খর্বকায় এক পুরুষ। উদ্বেগের কালো ছাপ চোখে-মুখে। পরনে নেভী ব্লু সার্জ সুট, সাদা শার্ট আর কালো বোটাই।

সপারিষদ ইন্দ্রনাথকে দেখে একগাল হেসে পার্শ্ববর্তী ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলে অচল দত্ত–মিঃ পিটার ড্যানিয়েল। হোটেল ম্যানেজার।

কাষ্ঠ হেসে করমর্দন করল পিটার ড্যানিয়েল। বলল–ব্যাড। ভেরী ব্যাড। আপনি পুলিশের লোক?

এমনভাবে মাথা নাড়ল ইন্দ্রনাথ যাতে হা-না দুই বোঝায়। লম্বোদরের মুখটা দেখলাম একটু শুকিয়ে গেছে পুলিশ দেখে। ফ্ল্যাশগান বাগিয়ে সাংবাদিকরা তাগ করছে, সুযোগ বুঝলেই শাটার টিপবে। একই রকম ধূসর রঙের শার্ট, প্যান্ট, টাই পরা হোটেল ক্লার্ক আর অন্যান্য কর্মচারীরা একযোগে প্যাট-প্যাট করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। সব মিলিয়ে এমন একটা থমথমে পরিবেশ যে অস্বস্তি বোধ না করে উপায় নেই।

অচল দত্ত বললে–লাশ চোখে পড়ার পর থেকে কেউ বাইরেও যায়নি, ভেতরেও আসেনি। ইন্সপেক্টর চৌধুরীর অর্ডার। এঁরা আপনার সঙ্গে যাবে তো?

হ্যাঁ। জয়ন্ত কোথায়?

তিন তলায়। রুম নং ১০৯।

পা বাড়াল ইন্দ্রনাথ। কয়েক ধাপ উঠে এসে মুচকি হেসে বললে–চলো হে গোয়েন্দারা। এখনি নার্ভাস হলে চলবে কেন?

কবিতা কিছু বলল না। তবে মুখ দেখে বুঝলাম সহজ হবার চেষ্টা করছে বেচারি।

১০৯ নাম্বার কামরার সামনেই পেছনে হাত দিয়ে পায়চারি করছিল ডিটেকটিভ জয়ন্ত চৌধুরী–আমাদের বাল্যবন্ধু।

জয়ন্তর ললাট চিন্তাকুটিল। কবিতাকে দেখে জাকুটি করে বললে–কী ব্যাপার, একেবারে সদলবলে যে। লম্বোদরকে লক্ষ্য করে–ইনি কে?

আমার অ্যাপ্রেন্টিস৷ বলল ইন্দ্রনাথ।

অ্যাপ্রেন্টিস? তার মানে?

তার মানে শিক্ষার্থী। মৃগ আর বউদিকেও তাই বলতে পারো। এইটাই হল টেস্ট-কে। বোর্ড অফ এগজামিনারের মধ্যে থাকছ তুমি আর আমি।

ললাট রেখা সরল হয়ে গেল জয়ন্তর। এত চিন্তার মধ্যেও ফিক্‌ করে হেসে বললে–বেশ তো, ভেতরে চলো।

চোখ পাকিয়ে তাকাল কবিতা। আমারও প্রবল বাসনা হল দুকথা শুনিয়ে দেওয়ার। কিন্তু স্থান-কাল-পাত্র ভেবে মুখ বুজে রইলাম।

না থেকেও উপায় ছিল না। কেননা ঘরের মধ্যে যে দৃশ্য দেখলাম, তা দেখামাত্র শিরশির করে উঠল আপাদমস্তক।

পুরু কার্পেটের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে এক ব্যক্তি। দু-হাত ছড়ানো দুপাশে–সাঁতারুর মতো। কে যেন এক বালতি লাল রং ঢেলে দিয়ে গেছে মাথার ওপর…লাল রং জমাট বেঁধেছে কালো চুলে…গড়িয়ে এসেছে ঘাড় বেয়ে।

নিষ্প্রাণ নিস্পন্দ দেহটির দিকে দেখলাম বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে লম্বোদয় লস্কর।

আর কবিতা? মৃত ব্যক্তির পাশে রক্ষিত শয্যার সাদা চাদরের চাইতেও বুঝি সাদা হয়ে গেছে তার মুখ। রক্তহীন। রংহীন।

এ হেন বীভৎস দৃশ্যের প্রতিক্রিয়া নিশ্চয় আমার মুখেও দেখা গিয়েছিল। তাই আমাদের তিনজনের মুখের ওপর দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বিলক্ষণ হৃষ্টচিত্তে বলল ইন্দ্রনাথ রুদ্র–বন্ধু জয়ন্ত, নাম-ধামগুলো এবার বলে ফেলো দিকি।

নাম, টংগু লিনচান। বয়স বিয়াল্লিশ। বার্মিজ খ্রিস্টান। বিয়ে হয়েছিল কলকাতায়। স্ত্রীর সঙ্গে ডাইভোর্স হয়েছে বছর দুই আগে। রিপ্রেজেন্টেটিভ। মালিকের চাল আর কাঠের কারবার আছে মান্দালয়ে। বছরখানেক সাউথ আফ্রিকায় ছিলেন। নেটিভদের মারধোর করায় বিতাড়িত হয়েছেন ব্রিটিশ আফ্রিকা থেকে। রাঁদেভু হোটেলে নাম লিখিয়েছেন হপ্তা খানেক আগে। দিন তিনেকের জন্যে ঢাকায় গিয়েছিলেন আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে। আজ সকালেই ফিরেছেন। সাড়ে নটার সময়ে হোটেলে ঢুকেছেন। বারোটা পাঁচে মরে পড়ে থাকতে দেখেছে পারুল।

পারুল কে? প্রশ্ন করে ইন্দ্রনাথ।

ঝি। মানে, ঘরদোর ঝটপাট দেয়।

টংগু লিনচানের আগের ইতিহাস?

খুব অল্পই পাওয়া গেছে। মিশুকে। সামাজিক। যদূর জানা গেছে, শত্রু নেই। আফ্রিকা থেকে যে জাহাজে ফিরেছেন, সে জাহাজেও শত্রু সৃষ্টির মতো কিছু করেননি। তবে হ্যাঁ, টংগু লিনচান নাম্বার ওয়ান লেডি কিলার। বউকে ডাইভোর্স করার আগে থেকেই লটঘট ছিল একটা মেয়ের সঙ্গে। কারবারের নাম করে নাকি তাকে নিয়েই পালিয়েছিলেন আফ্রিকায়। ফেরবার সময়ে ভদ্রমহিলাকে ফেলে এসেছেন। কলকাতাতেও তার এক প্রেয়সী আছে।

কাকে সন্দেহ হয়?

চিন্তাচ্ছন্ন চোখে বর্মী পর্যটকদের মৃতদেহর দিকে তাকিয়ে বলল জয়ন্ত–আজ সকালেই টংগু লিনচানের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল তার কলকাতার প্রেয়সী। নাম, ভায়োলেট অ্যালক্যাটরা। ভায়োলট চাকরি বাকরি করে না–অথচ ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে রানির হালে থাকে। টংগু যখন ঢাকায়, তখন একবার এসে খোঁজ করে গেছিল ভায়োলেট। এনকোয়ারী কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে জেনেছিল আজ সকালেই মিঃ লিনচানের ফেরার কথা। তাই ভায়োলেট এসেছিল এগোরোটা পাঁচে। রুম নাম্বার নীচ থেকে নিয়ে লিফটে করে উঠেছিল তিন তলায়। কখন বেরিয়ে গেছে কেউ জানে । দরজায় টোকা মেরে কারো সাড়া না পেয়ে চলে যায় ভায়োলেট। বাইরেও অপেক্ষা করেনি। টংগু লিনচানের সঙ্গে নাকি তার দেখাও হয়নি।

ঠিক এই সময়ে মৃতদেহের চুলের ডগা থেকে নখের ডগা পর্যন্ত তীক্ষ্ণদৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে খাটের কিনারায় বসে পড়ল কবিতা।

সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম চাপা উল্লাসের রোশনাই ওর তমালকালো দুই চোখে। তবে কি…তবে কি সূত্রের সন্ধান পেয়েছে কবিতা?

নিরীহ কণ্ঠে বলল ইন্দ্রনাথ–পা টন্ করছে বুঝি? কর্ণপাত না করে জয়ন্তকে জিগ্যেস করল কবিতা–বউ কী বলে?

বউ? টংগু যে আফ্রিকা থেকে ফিরে এসেছেন, তাই নাকি সে জানে না–দেখা হওয়া তো দূরের কথা। সকালে চৌরঙ্গিতে গেছিল সিনেমার টিকিট কিনতে।

গিন্নির তৎপরতায় আমার জড়তাও অন্তর্ধান করেছিল। জয়ন্তর কথা শুনতে শুনতে সন্ধানী চোখ বুলোচ্ছিলাম ঘরের এ-কোণ থেকে সে-কোণে–হঠাৎ পাওয়া কোনও সূত্রের আশায়।

ঘরটা আর পাঁচটা প্রথম শ্রেণির হোটেল ঘরের মতোই। বৈশিষ্ট্যহীন। সিঙ্গলবেড। ওয়ার্ডরোব। কাঁচের দেরাজ। নাইট টেবিল। চিঠি লেখার ডে। আর চেয়ার। স্রেফ ঘর সাজানোর জন্যে ডামি ফায়ারপ্লেস।–ওপরের তাকে টাইমপিস আর একারি বিভিন্ন স্বাদের ইংরেজি নভেল।

মৃতদেহের পাশে নতজানু হয়ে বসে পড়ল ইন্দ্রনাথ। ঘাড়খানা সারস পাখির মতো বাড়িয়ে ঝুঁকে পড়ল লম্বোদয়। তাই দেখে চেয়ারে বসতে বসতে ফিক করে হেসে ফেলল জয়ন্ত চৌধুরী।

মৃতদেহটাকে চিৎ করে শুইয়ে দিল ইন্দ্রনাথ। রাইগর মার্টিসে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তখন আড়ষ্ট হয়ে উঠেছে। হিমকঠিন দেহ আর পোশাকের ওপর দ্রুত হাত চালিয়ে নিয়ে বলল–বউদি, মৃগ, লম্বোদরবাবু। শুরু করা যাক এবার। বউদি, তুমিই আগে বলো। বলো কী দেখেছ?

টপ করে খাট থেকে লাফ দিয়ে নেমে এল কবি। বোঁ করে এক চক্কর ঘুরে এল লাশটাকে।

ইন্দ্রনাথ সকৌতুকে বললে–ব্যাপার কী? এখনও কিছু চোখে পড়ল না? এতদিন কি বৃথাই গপপো শোনালাম তোমাকে?

লাল ঠোঁটে টুক করে জিভ বুলিয়ে নিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বললে কবিতা–দেখছি পুরোদস্তুর বিলিতি পোশাক পরার অভ্যেস টংগু লিনচানের। পায়ে কার্পেট স্লিপার। আর হ্যাঁ–সিল্কের আন্ডারওয়্যার।

ঠিক, ঠিক। এ ছাড়াও আছে কালো সিল্কের মোজা আর গার্টার। কোট-প্যান্টে ওস্তাগরের নামও রয়েছে–ম্যাকিনসন্স, জোহানেসবার্গ। আর কী?

বাঁ-হাতে একটা রিস্টওয়াচ। আর…আর ঘড়ির কঁচটা চিড় খেয়ে গেছে। কাটা আর ঘুরছে না। দাঁড়িয়ে গেছে ১১-৫০ মিনিটের ঘরে।

চমকার! চমৎকার! জয়ন্ত, ডাক্তার কী বলে?

টংগু লিনচান মারা গেছেন এগারোটা থেকে সাড়ে এগারোটার মধ্যে। আমার মনে হয়—

জ্বলজ্বলে চোখে বলে উঠল কবিতা–তার মানে কি এই নয় যে–

ধীরে, ধীরে, বউদি। যদি কিছু মাথায় এসে থাকে, তবে তা মাথার মধ্যেই রাখো। ঝট করে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ভালো গোয়েন্দার লক্ষণ নয়। ব্যস, এবার তোমার ছুটি। লম্বোদরবাবু, আপনি কী দেখলেন?

কপাল কুঁচকে হাতঘড়ির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল লম্বোদরবাবু। চওড়া চামড়ার ব্যান্ডওলা পুরনো মডেলের হাতঘড়ি। তারপর বললে চিন্তাচ্ছন্ন কণ্ঠে–পুরুষের ঘড়ি। পড়ে গিয়ে ধাক্কা লাগার ফলেই কাঁটা আর নড়ছে না। চামড়ার ব্যান্ডের দ্বিতীয় গর্তে একটা খাঁজ দেখা যাচ্ছে–বা আঁটা রয়েছে এই গর্তেই। কিন্তু এছাড়াও দেখছি আরও একটা খাঁজ–আরও গভীর দাগ–তৃতীয় গর্তে

সাবাস! সাবাস লম্বোদরবাবু! তারপর?

বাঁ-হাতে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়েছিল–সে রক্ত এখন শুকিয়ে গেছে। বাঁ-হাতের তালুতেও রক্ত লেগেছিল–কিন্তু দাগটা অনেক আবছা, যেন রক্তমাখা তালু দিয়ে কিছু আঁকড়ে ধরেছিলেন টংগু লিনচান, তাই বেশির ভাগই মুছে গেছে তালু থেকে। একটু খুঁজলেই এই ঘরেই পাওয়া যাবে জিনিসটা–টংগু লিনচানের হাতের ছাপও রয়েছে তাতে।

লম্বোদরবাবু, আপনার মতো অ্যাপ্রেন্টিস পাওয়ায় আমি গর্বিত। ওহে, জয়ন্ত, রক্তমাখা হাতের ছাপ লাগা কিছু পেয়েছ ধারে কাছে?

জয়ন্তর মুখের হাসি মিলিয়ে গেছিল। তীক্ষ্ণচোখে বলল–এক্সেলেন্ট। কিন্তু রক্তের দাগ লাগা সে-রকম কিছু তো পাইনি। কার্পেটেও তেমন ছাপ নেই। খুব সম্ভব হত্যাকারী তা সঙ্গে করেই নিয়ে গেছে।

কপাল কুঁচকে ইন্দ্রনাথ বলল–তুমি পরীক্ষক, পরীক্ষার্থী নয়। কাজেই আর ইঙ্গিত দিও না। মৃগ, তোমার কিছু বলার আছে?

তাড়াতাড়ি বললাম–মাথার ক্ষত দেখে মনে হচ্ছে ভারী কিছু দিয়ে বেশ কয়েকবার চোট মারা হয়েছে। বিছানার চাদরের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ধস্তাধস্তিও হয়েছিল। আর মুখটা

বটে! বটে! বটে! মুখটাও লক্ষ্য করে ফেলেছ? বলো দেখি কি দেখছ?

সদ্য দাড়ি গোঁফ কামানো। গালে আর চিবুকে এখনও লেগে রয়েছে ট্যালকম পাউডার। বাথরুমটায় চোখ বুলোলে হত না?

কাচুমাচু মুখে কবিতা বললে–মুখটা আমিও লক্ষ্য করেছিলাম ঠাকুরপো। কিন্তু কথাই বলতে দিল না…পাউডারটা লাগানো হয়েছে মসৃণভাবে। কোথাও বেশি, কোথাও কম নয়।

লাফিয়ে উঠে বলল ইন্দ্রনাথ-বউদি, তোমার শার্লক হোমস্ হওয়া রোখে কে। জয়ন্ত, অস্ত্র পাওয়া গেছে?

পাথরের ভারী হাতুড়ি। এক্সপার্টের মতে, আফ্রিকান কিউরিও। বেজায় ভারী, কিন্তু এবড়ো খেবড়ো পাথর। খুব সম্ভব টংগু লিনচানের ব্যাগের মধ্যেই ছিল হাতুড়িটা–ট্রাঙ্ক তো এখনো এয়ারপোর্ট থেকে এসে পৌঁছয়নি।

ইন্দ্রনাথ আর কিছু বলল না। আনমনা চোখে তাকিয়ে রইল শয্যার দিকে। রেক্সিনের ট্র্যাভেলিং ব্যাগটা খাটের ওপরেই বসানো ছিল। পাশেই চারকোল গ্রে কালারের ইভনিং স্যুট–পরিপাটি ভাবে ভাঁজ করা কোট আর ট্রাউজার্স। সাদা শার্ট। হাতের বোতাম। সাদা সিল্কের রুমাল। খাটের তলায় দুজোড়া কালো বুট। এত জিনিস দেখেও যেন সন্তুষ্ট হতে পারল না ইন্দ্রনাথ। বার বার চোখ বুলোতে লাগল ঘরের অন্যান্য জিনিসগুলোর ওপর। অশান্ত চোখ। যেন কিছু একটা খচ খচ করছে বুকের মধ্যে। খাটের পাশেই চেয়ারে পড়ে একটা ময়লা শার্ট, একজোড়া ময়লা মোজা, ময়লা গেঞ্জি আর আন্ডারওয়্যার–কিন্তু রক্তের ছিটেফোঁটাও নেই ময়লা জামা কাপড়ে। চিন্তান্বিত ললাটে কার্পেটের দিকে তাকিয়ে রইল ইন্দ্রনাথ।

জয়ন্ত বললে–হাতুড়িটা আমরা নিয়ে গেছি। রক্তে আর চুলে মাখামাখি হয়েছিল বলেই এক্সপার্টরা..আঙুলের ছাপ কিন্তু কোথাও পাওয়া যায়নি। যেখানে খুশি হাত দিতে পারো। সব কিছুরই ছবি তোলা হয়ে গেছে, আঙুলের ছাপও খোঁজা হয়েছে।

নিরুত্তরে একটা কাচি ধরাল ইন্দ্রনাথ। আমি আর লম্বোদরবাবু হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম মৃতব্যক্তির পাশে। দুজনেরই উদ্দেশ্য রিস্টওয়াচটা আরো ভালোভাবে দেখা। কবিতা দেখলাম আঠার মতো লেগে রয়েছে ইন্দ্রনাথের পেছনে।

লম্বোদরের উৎসাহ একটু বেশি। তাই ঝটিতি কব্জি থেকে ঘড়িটা খুলে নিয়ে খুটখাট শুরু করে দিলে পেছনের ডালাটা নিয়ে এবং কি কৌশলে জানি না অচিরেই খুট করে খুলে ফেললে ডালাটা। সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল সোল্লাসে–পেয়েছি! পেয়েছি!

ডালার পেছনে খানিকটা সাদা কাগজের ছিন্ন অংশ আঠা দিয়ে সাঁটা। যেন কিছু একটা টান মেরে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে সেখান থেকে।

তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বললে লম্বোদরবাবু–একটা আইডিয়া মাথায় এসেছে। বলেই একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল টংগু লিনচানের নিষ্প্রাণ মুখের দিকে। সন্ধানী চোখে কি যেন খুঁজতে লাগল।

মৃগ তুমি? বলল ইন্দ্রনাথ।

ইন্দ্রনাথের মেস থেকে বেরুবার সময় তাক থেকে ওরই আতসকাঁচটা নিয়ে এসেছিলাম। এখন তা বার করে ঘড়িটা উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে বললাম–এখন কিছুই বলব না। তবে ঘড়িটা আমার বন্ধুর ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করার অনুমতি দিলে ভালো হয়।

ইন্দ্রনাথ জয়ন্তর দিকে তাকাতেই জয়ন্ত ঘাড় নেড়ে সায় দিলে। ইন্দ্রনাথ বললে–নিতে পারো। জয়ন্ত, ঘর, ফায়ারপ্লেস, বাথরুম–সমস্ত তন্ন তন্ন করে সার্চ করা হয়েছে কি?

আঙুল মটকাতে মটকাতে জয়ন্ত বললে–দেখছিলাম কখন তুমি প্রশ্নটা করো। ফায়ারপ্লেসে দারুণ ইন্টারেস্টিং কয়েকটা জিনিস পাওয়া গেছে।

ফায়ারপ্লেসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ইন্দ্রনাথ। ডামি ফায়ারপ্লেস। আগুন কস্মিনকালেও জ্বলে না–শুধু ইউরোপীয় পরিবেশ সৃষ্টির জন্যই তা নির্মিত। কিন্তু এ হেন চুল্লিতেই জমে খানিকটা ছাই। এবং সে ছাই অতি বিচিত্র ছাই–কেন না তা কাঠের নয়, কয়লার নয়, এমনকী কাগজেরও নয়।

যকের ধন প্রাপ্তির আশা নিয়ে ছাইয়ের গাদা খোঁচাতে শুরু করল ইন্দ্রনাথ রুদ্র এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিচিত্র ভস্মস্তূপের মধ্যে আবিষ্কৃত হল বিচিত্রতর দশটি বস্তু।

অদ্ভুত দশটি বস্তু। ছাইয়ের গাদায় থেকে তারা ভস্মাচ্ছাদিত। তবুও চিনতে অসুবিধে হল না। আটটা চ্যাপ্টা ঝিনুকের বোতাম আর দুটো অদ্ভুত-দর্শন ধাতব বস্তু। একটা তিনকোণা, অনেকটা চোখের আকারে। আরেকটা আঁকশির মতো। দুটোরই আকার খুব ছোট এবং দুটোই খাদ মিশানো কোনও সস্তা ধাতুতে তৈরি। আটটা ঝিনুকের বোতামের মধ্যে দুটো অপেক্ষাকৃত বড়। প্রতিটি বোতামের কিনারায় পল তোলা এবং কেন্দ্রে সুতো গলানোর চারটি ছিদ্র।

দশটি বস্তুই কিন্তু আগুনে ঝলসানো।

বিড়বিড় করে বলল জয়ন্ত–ইন্দ্রনাথ, এই দশটা জিনিস নিয়ে ভাবতে ভাবতেই আমার মাথা ধরে গেল, কিন্তু সুরাহা হল না।

নীরবে পোড়া বোতাম, তেকোণা ধাতু আর আঁকশি নাড়াচাড়া করতে করতে ইন্দ্রনাথ জিগ্যেস করলে–ফায়ারপ্লেস শেষবার কে সাফ করেছে খোঁজ নিয়েছ?

নিয়েছি। পারুলই সাফ করেছে।

কখন?

আজ সকালে সাতটার একটু পরেই। সাতটার সময়ে একজন বোর্ডার ঘর ছেড়ে দেয়। তাই টংগু লিনচান আসার আগেই ঘর সাফ করে দেয় পারুল।

নাইট টেবিলের ওপর বোতাম, আঁকশি আর তেকোণা ধাতুটা রেখে ট্রাভেলিং ব্যাগের ভেতরে দৃষ্টিনিক্ষেপ করল ইন্দ্রনাথ। ভেতরটা অত্যন্ত অগোছালো, যাচ্ছেতাইভাবে হাঁটকানো। চারটে লম্বা নেকটাই, দুটো ধোয়া সাদা শার্ট, মোজা, আন্ডারওয়্যার আর রুমাল ঠাসা ব্যাগের মধ্যে। প্রতিটি শার্ট আর আন্ডারওয়্যারের ওপর লেবেল আঁটা একই ওস্তাগরের–ম্যাকিনস, জোহানেসবার্গ।

দেখে শুনে বন্ধুবরের খিঁচড়ে যাওয়া মেজাজটা কিঞ্চিৎ শরিফ হল বলেই মনে হল। খুশি খুশি মুখে গিয়ে দাঁড়াল ওয়ার্ডরোবের সামনে। টুইডের ট্র্যাভেলিং স্যুট, আর বাদামি রঙের একটা কোট ছাড়া ভেতরে আর কিছুই নেই।

সশব্দে পাল্লাটা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল ইন্দ্রনাথ। সঞ্চরমান দৃষ্টি স্থির হল দেরাজের ওপরে। প্রথম তাকটা শূন্য। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ড্রয়ার খুলেও কিছু পাওয়া গেল না।

জয়ন্ত বললে–বৃথা খুঁজছ। জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখবারও সময় দেওয়া হয়নি মিঃ লিনচানকে। উঁহু, টেবিলেও কিছু নেই। যা আছে তা বাথরুমেই।

যেন এই কথাটুকুর জন্যেই অপেক্ষা করছিল কবিতা। জয়ন্তর কথা ফুরোতে না ফুরোতেই জ্যামুক্ত শায়কের মতো সাঁ করে ছুটে গেল বাথরুম লক্ষ্য করে। পেছন পেছন সমান বেগে ছিটকে গেল লম্বোদর লস্কর। অগত্যা আমিও পেছনে পড়ে থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলাম না।

চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ঠোঁটের কোণে আলগোছে একটা কাচি ঝুলিয়ে আমাদের কীর্তিকলাপ লক্ষ্য করতে লাগল ভারতের প্রথম কনসাল্টিং ডিটেকটিভ ইন্দ্রনাথ রুদ্র।

বেসিনের ওপর ভোলা রেক্সিনের টয়লেট-কিট। সাবান আর চুল লাগা আধোয়া সেফটি রেজরের পাশেই দাঁড় করানো ভিজে শেভিং বুরুশ। এক টিউব শেভিংক্রিম। ছোট্ট একটি ট্যালকম পাউডার আর এক টিউব টুথপেস্ট। কলের পাশেই গড়াগড়ি যাচ্ছে প্লাস্টিকের শেভিং বুরুশ রাখবার আধার–ঢাকনাটা পড়ে টয়লেট কিটের ওপর।

লম্বোদরবাবুর মুখটা লম্বা হয়ে গেল। নিরাশ কণ্ঠে বললে–কিসসু নেই এখানে।

আমি বললাম–সত্যিই তাই। শুধু বোঝা যাচ্ছে, দাড়ি কামানো শেষ হতে না হতেই খুন হয়ে গেছেন টংগুমশাই। সেটটা ধুয়ে রাখবারও সময় পাননি।

কবিতা কিন্তু কালো হিরের মতো ঝিকিমিকি চোখে বলল–তুমি কিগো, অন্ধ নাকি! বলেই গটগট করে বেরিয়ে গেল বাইরে। পেছনে লম্বোদর লস্কর।

বিমূঢ়ভাবে জিনিসগুলো আর একবার উল্টেপাল্টে দেখলাম। শেভিং বুরুশের ঢাকনা উল্টে দেখলাম ভেতর দিকে খাপে খাপে লাগানো এতটুকু একটা প্যাড। উল্লেখযোগ্য আর কিছুই না পেয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখলাম অপলক চোখে ঢাকনিটার দিকে তাকিয়ে ঘন ঘন সিগারেট ফুঁকছে ইন্দ্রনাথ রুদ্র।

বেডরুমে ফিরে এসে দেখি হোটেল ম্যানেজার পিটার ড্যানিয়েল হাত-মুখ নেড়ে তর্ক করছে জয়ন্তর সঙ্গে। মুখ টিপে জয়ন্ত শুনে যাচ্ছে।

পেছন পেছন ইন্দ্রনাথ এসে বললে–ব্যাপার কী? গোলমাল কীসের? চারদিকে ঢি ঢি পড়ে গেল যে। এদিকে সকাল থেকে স্টাফকে ধরে রেখেছেন আপনারা। নাইট শিফট আরম্ভ হতে চলল, বাড়ি যাওয়ার জন্য সব ছটফট করছে–আমারও সেই অবস্থা। অথচ আপনারা

মাঝপথেই ড্যানিয়েলকে থামিয়ে দিয়ে ইন্দ্রনাথ বলল–জয়ন্ত, তোমরা যা দেখবার দেখেছ। আমরাও দেখলাম। এখন আর খামোকা এঁদের হয়রান করে কোনও লাভ নেই।

অলরাইট মিঃ ড্যানিয়েল, আপনারা যেতে পারেন। বললে জয়ন্ত।

পিটার ড্যালিয়েল উধাও হতেই ইন্দ্রনাথ ফিরে দাঁড়াল আমাদের দিকে। হিরো-হিরো কায়দায় একমুখ ধোয়া ছেড়ে বললে–লম্বোদরবাবু কিছু বলবেন?

আমার একটা ঠিকানা চাই।

ফস করে কবিতা বলে উঠল–আরে, আমিও তো তা চাই।

আমি বললাম–আমি চাই এমন একটা জিনিস যা এই হোটেলেই আছে।

বেশ তো, স্মিত মুখে বলল ইন্দ্রনাথ। তোমাদের যা যা দরকার, একতলায় সার্জেন্ট অচল দত্তের কাছে চেয়ে নাও। তারপর দু-ঘণ্টা সময় দিলাম। দু-ঘণ্টা পরে সন্ধে সাড়ে ছটার সময়ে আমার মেসে এসে দেখা করো। দেখা যাক কার দৌড় কদ্দূর পর্যন্ত।

সবার আগে ঘর থেকে বেরুল কবিতা এবং সবার শেষে আমি। বেরুতে বেরুতে শুনলাম ইন্দ্রনাথ বলছে–ওহে জয়ন্ত, তোমার সঙ্গে আমার কিছু সিরিয়াস আলোচনা আছে।

দু-ঘণ্টা পর। ইন্দ্রনাথের মেস। সেই ভাঙা তক্তপোষ, নড়বড়ে চেয়ার আর টেবিল।

কলের পুতুলের মতোই এতক্ষণ চা-বিস্কুট খাচ্ছিল লম্বোদবাবু আর কবিতা। আমি মৌনীবাবা হয়ে গেছিলাম সাময়িকভাবে।

একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ইন্দ্রনাথ বললে–আর দেরি কেন? লম্বোদরবাবু, বলুন আপনার সিদ্ধান্ত।

শুধু সিদ্ধান্তই নয় ইন্দ্রনাথবাবু, তার চেয়েও এক কাঠি এগিয়েছি আমি।

যথা?

সমাধানে পৌঁছেছি।

তাই নাকি! তাই নাকি! কীভাবে পৌঁছলেন বলুন তো?

আমার একমাত্র সূত্র হল রিস্টওয়াচটা। চামড়ার ব্যান্ডে দুটো দাগ। যে দাগটা সবচাইতে কম গভীর–সেই দাগেই ঘড়ি পরে আছেন টংগু লিনচান। এই থেকেই সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে ঘড়িটা আসলে তাঁর নয়।

তবে কার?

হত্যাকারীর।

কিন্তু অকুস্থলে হত্যাকারী নিজের ঘড়ি ফেলে যাবে কেন?

পুলিশকে বিপথে চালনা করার জন্যে। ডাক্তার বলছেন, মিঃ লিনচান মারা গেছেন এগারোটা থেকে এগারোটা তিরিশ মিনিটের মধ্যে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঘড়ির কাটা দাঁড়িয়ে গেছে এগারোটা পঞ্চাশ মিনিটে। কেন?

কেন?

কারণ, হত্যাকারী খুন করার সময়টা ইচ্ছে করেই এগিয়ে দিতে চেয়েছে। অথচ নিহতর হাতে ঘড়ি নেই। তাই নিজের হাতের ঘড়ি খুলে আছড়ে মেরে কাঁচ ফাটিয়েছে, কলকজা বিগড়েচে–

তারপর কাটা ঘুরিয়ে এগারোটা পঞ্চাশ মিনিটের ঘরে এনে পরিয়ে দিয়েছে মিঃ লিনচানের কব্জিতে। কিন্তু তার কব্জি মোটা অথচ হত্যাকারীর কব্জি সরু–তাই ব্যান্ডটা লাগল অন্য ঘাঁটিতে।

ব্রিলিয়ান্ট। কিন্তু এটা তো সমাধান হল না। হত্যাকারী কে?

হত্যাকারী একজন স্ত্রীলোক। তাই তার কব্জি সরু।

বটে! বটে। কিন্তু কে সে?

টংগু লিনচানের তালাক দেওয়া বউ। খুনের মোটিভ, গায়ের জ্বালা মিটানো।

শুনে নাকের ডগাটা সামান্য কুঁচকালো কবিতা। আমিও বিশেষ উৎসাহ বোধ করলাম না। দেখে শুনে মিইয়ে গেল লম্বোদর লস্কর। মিনমিনে স্বরে বললে–আরও প্রমাণ আছে।

আছে নাকি?

ঘড়ির পেছনের ডালায় ভেতর দিকে খানিকটা ছেঁড়া কাগজ লেগে ছিল। যেন টান মেরে কিছু ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। ঘড়ির ভেতরে একটি জিনিসই রাখার রেওয়াজ ছিল এককালে-ফটোগ্রাফ। টংগু লিনচানের ঘড়িতেও ছিল একটা ফটো এবং সে ফোটোতেই সম্ভবত ছিল হত্যাকারীর চেহারা। তাই যাবার সময়ে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে ছবিটা। আমি রিপোর্টারের ছদ্মবেশে দেখা করলাম মিঃ লিনচানের আগের বউয়ের সঙ্গে। তার টেবিলেই একটা ফ্যামিলি অ্যালবাম দেখলাম। একটু নাড়াচাড়া করতেই পেলাম একটা ফটোগ্রাফ–একজন পুরুষ আর স্ত্রী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। কিন্তু তাদের মুন্ডুদুটোই নেই–গোল করে কেটে ফটো থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে–রয়েছে শুধু ধড়। আর প্রমাণের দরকার আছে?

ঈষৎ দমে গিয়ে বললে ইন্দ্রনাথ–না, আর দরকার নেই। মৃগাঙ্ক, তোমার সিদ্ধান্ত?

লম্বোদরবাবুর মতো আমারও সূত্র ওই ঘড়ি, বললাম আমি। তবে ব্যান্ড নিয়ে অযথা মাথা ঘামাইনি। ঘামিয়েছি ঘড়ির শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ে।

ঘড়ির আবার শ্বাসপ্রশ্বাস! বলো কি হে?

ঘাবড়াও মৎ। জগদীশ বোসের থিওরি আওড়াচ্ছি না। তবে ঘড়িও নিশ্বেস নেয়, নিশ্বেস ছাড়ে।

ভারি ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো। রীতিমতো গবেষণা।

ঠাট্টা করো না। হাতের চামড়ায় ঘড়ি লেগে থাকার সময়ে গায়ের উত্তাপে ঘড়ির ভেতরকার বাতাসও গরম হয়ে প্রসারিত হয়ে যায়। আয়তনে বেড়ে যায়। আয়তনে বেড়ে যাওয়ার ফলে বাতাস পেরিয়ে যায় কাঁচের ফাঁক দিয়ে, ছোটখাটো চিড় দিয়ে। সেকেলে ঘড়ির ক্ষেত্রে এ জিনিসটা আরও বেশি দেখা যায়। টংগু লিনচানের ঘড়িও আধুনিক নয়।

বেশ।

ঘড়ি যখন হাত থেকে খুলে নামিয়ে রাখা হয়, তখন ভেতরের বাতাসও আবার ঠান্ডা হয়ে সঙ্কুচিত হয়। ফলে বাইরের বাতাস ফুটো কাঁচের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে ভেতরে। সেই সঙ্গে বাতাসের ধুলোও পথ করে নেয় ভেতরে।

তারপর?

সেই কারণেই, রুটিওলার ঘড়িতে পাওয়া যায় ময়দার ধুলো, ইটের পাঁজার মালিকের ঘড়িতে জমে ইটের ধুলো। টংগু লিনচানের ঘড়িতে কি পেয়েছি জানো?

কী?

মেয়েদের ফেস-পাউডার।

বটে!

জানো তো, খুঁতখুঁতে মেয়েরা গায়ের রং মিলিয়ে ফেস পাউডার কেনে। ঘড়ির মধ্যে যে ফেস পাউডার পেলাম তা সাধারণত কালো মেয়েরাই ব্যবহার করে।

এবং সে কালো মেয়েটি কে? ইন্দ্রনাথের স্বর এবার তীক্ষ্ণ।

বুক ভরে বিশ্বাস নিয়ে সগর্বে বললাম–পারুল।

ভীষণ চমকে উঠল ইন্দ্রনাথ–পারুল কি হে?

কেন নয়? দুশ্চরিত্র টংগু লিনচান নিশ্চয় পারুলের গায়ে হাত দিতে গেছিল, তাই–

খুক খুক শব্দ শুনে দেখি মুখে শাড়ির খুঁট চাপা দিয়ে ওদিকে তাকিয়ে আছে কবিতা।

গরম হয়ে বললাম–এত হাসি কীসের?

জবাব দিলে ইন্দ্রনাথ। বলল–বউদি হাসছে পর্বতের মূষিক প্রসব দেখে। সাধে কি বলি গল্প লিখলে ঘিলু কমে যায়। আরে ব্রাদার, পারুলকে দেখে মনে হয় কি ফেস পাউডারের বিলাসিতা করার মতো সখ অথবা সাধ্য তার আছে? ঘড়ি পরা তো দূরের কথা। দূর, দূর। বউদি, তুমিই শুধু বাকি রইলে। শোনাও তোমার থিওরি।

সঙ্গে-সঙ্গে কবিতা বললে–ঘড়ির সূত্রটা কোনও সূত্রই নয়। এ নিয়ে এতটা সময় নষ্ট করা স্রেফ আহাম্মকি।

তেড়ে উঠে বললাম–বাজে কথা না বলে প্রমাণ করো এটা কোনও সূত্রই নয়।

করবই তো, সমান তেজে জবাব দিল কবিতা। পাকিস্তান সময় আর ভারতীয় সময়ের তফাতটা জানা আছে?

বিদ্রূপতরল কণ্ঠে বললাম–তার সঙ্গে খুনের সম্পর্ক কি?

কণ্ঠে ততোধিক শ্লেষ ঢেলে কবিতা বলল–সেইটাই তো একমাত্র সম্পর্ক। ঘড়িটা টংগু লিনচানেরই। ঢাকায় গিয়ে তিনি পাকিস্তানের ঘড়ির সঙ্গে সময় মিলিয়েছেন। কলকাতায় এসে এখানকার সময়ের সঙ্গে ঘড়ি মিলনোর ফুরসৎ পাননি। কে না জানে, ঢাকার সঙ্গে ইন্ডিয়ার সময়ের তফাত পুরো আধ ঘণ্টা। মানে, ঢাকায় যখন বারোটা, এখানে তখন সাড়ে এগারোটা।

মেশিনগানের মতো মোক্ষম যুক্তি বর্ষণে মুখ শুকিয়ে গেল আমার। লম্বোদরবাবুর মুখটা আবার লম্বা হয়ে গেল। আর ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ইন্দ্রনাথের চোখ।

বলল–ক্যাপিটাল বউদি, ক্যাপিটাল। শার্লক হোমস হওয়ার যোগ্যতা একমাত্র তোমারই আছে। এ পর্যন্ত ঠিকই বললে, তারপর?

খুনি কে, তা আমি জানি। না, না টংগুর তালাক দেওয়া বউ নয়, পারুলও নয়। আগে শোনোই না। সবাই দেখেছ, মিঃ লিনচানের মুখের পাউডারের প্রলেপ। খুব মসৃণ প্রলেপ। গাল আর সেভিং সেটের অবস্থা দেখে জানা গেল খুন হওয়ার ঠিক আগেই দাড়ি কামিয়েছেন তিনি। ঠাকুরপো, দাড়ি কামানোর পর তুমিও পাউডার লাগাও।

লাগাই বই কি।

কীভাবে লাগাও?

এটা আবার কি প্রশ্ন?

বলোই না, কীভাবে লাগাও?

কেন আঙুল দিয়ে লাগাই।

ঠিক। আমার কর্তাটিরও সেই অভ্যেস। আশা করি, লম্বোদরবাবুরও। আসলে পুরুষমাত্রই গালে পাফ লাগানোর ধার ধারে না। তাই তারা আঙুলে করে পাউডার নিয়ে গালে ঘষে দেয়। ফলে জ্যাবড়া হয়ে কোথাও বেশি কোথাও কম ভাবে লেগে থাকে পাউডার। কিন্তু মেয়েরা পাফ ছাড়া পাউডার লাগায় না। তাই তাদের মুখে পাউডার অমন মোলায়েম ভাবে মাখানো থাকে। যেমন আমার। পাউডার মেখেছি বলে মনে হয়?

তা হচ্ছে বই কি–

হলেও তোমাদের মতো অত বিশ্রিভাবে মনে হয় না, ঝটিতি জবাব দিল কবিতা। টংগু লিনচানের মুখে কিন্তু যেভাবে পাউডার লাগানো হয়েছে, তা পাফ ছাড়া লাগানো সম্ভব নয়। কিন্তু তার ঘরে তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাফ পাওয়া যায়নি।

এতক্ষণ রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল ইন্দ্রনাথ। এবার যেন স্বস্তির নিঃশ্বেস ফেলে বললে–তাহলে বউদি, তুমি বলতে চাও যে, টুংগু লিনচানের দাড়ি কামানো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল একজন মেয়েছেলে, কামানো শেষ হলে আদর করে নিজের ভ্যানিটিব্যাগ খুলে পাউডারও মাখিয়ে দিলে ভদ্রলোককে এবং তার পরেই দমাস করে পাথরের হাতুড়ি মেরে গুঁড়িয়ে দিল মাথা। তাও কি সম্ভব?

ডাইভোর্স করা বউয়ের পক্ষে সম্ভব না হতে পারে, কিন্তু রক্ষিতার পক্ষে সম্ভব। একমাত্র তারাই আগের মুহূর্তে দেবী, পরের মুহূর্তে দানবী হতে পারে। টংগু লিনচানের কলকাত্তাই প্রেয়সী ভায়োলেট অ্যালক্যাটরার সঙ্গে ঘন্টাখানেক আগেই দেখা করে এসেছি আমি। জ্ঞানপাপী তো, তাই কিছুতেই স্বীকার করতে চাইল না যে টংগু লিনচানকে পাউডার মাখিয়ে এসেছে আজ সকালে।

পোড়া সিগারেটটা টোকা মেরে জানলাপথে উধাও করে দিয়ে ইন্দ্রনাথ বললে–তোমরা তিনজনেই মৌলিকতার পরিচয় দিয়েছ। প্রত্যেকেই নিজের নিজের যুক্তি অনুযায়ী নিজস্ব থিওরি গড়ে নিয়েছ। সেজন্যে আরিফ করছি তিনজনকেই। তবে কি জানো

কী? সমস্বরে জিগ্যেস করি আমরা।

তোমরা তিনজনেই ভুল করেছ।

কিছুক্ষণ সব চুপ।

তারপর, শাড়ির খুঁট আঙুলে পাকাতে পাকাতে বাঁকা সুরে কবিতা বলে উঠল–তোমার মতো দেমাকি মানুষের কাছ থেকে ঠিক এই কথাটাই শোনার আশায় ছিলাম এতক্ষণ।

আরে! আরে! আবার সেই মেয়েলি অভিমান। ঠোঁট না ফুলিয়ে আমার দুটো কথা যদি দয়া করে শ্রবণ করো, তাহলেই বুঝবে কেন বললাম তিনজনেই ভুল করেছ।

ভণিতা না করে বললেই হয়।

তোমরা তিনজনেই সেই একই ভুল করেছ। অর্থাৎ, চোখ-কান খোলা রেখে নতুন নতুন সূত্রকে কাজে না লাগিয়ে আগে থেকেই গড়ে নেওয়া থিওরিকেই খাড়া করার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছ। একই সূত্র ধরে একই যুক্তির পথ বেয়ে প্রত্যেকেই চোখ-কান বুজে দৌড়েছ নিজের নিজের সিদ্ধান্তের দিকে। আশপাশে তাকাওনি। তাই ফেল করলে শোচনীয় ভাবে।

লম্বোদরবাবু, আপনার থিওরি ঝুলছে একটি মাত্র সুতোর ওপর–গোল করে কেটে নেওয়া ফটো। কিন্তু সেটা তো নেহাতই কাকতালীয় হতে পারে। এর বশে তো কোনও ভদ্রমহিলাকে খুনি সাব্যস্ত করা যায় না। যায় কি? অসম্ভব।

মৃগাঙ্ক, তুমি যে এমন আনাড়ির মতো থিওরি খাড়া করবে, আশা করিনি। রং মিলিয়ে ফেস পাউডার ব্যবহার করা অথবা হাতে রিস্টওয়াচ পরা পারুল কেন, বাংলাদেশের ঝি-শ্রেণির কোনও মেয়ের পক্ষেই সম্ভব নয়।

আশা ছিল বউদির ওপর। ঢাকার সময়ের সঙ্গে ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইমের প্রভেদটুকু পর্যন্ত তুমি দিব্বি বললে। ভয় হয়েছিল, হয়তো টেক্কা মারবে আমার ওপর। কিন্তু যে বনেদের ওপর তোমার থিওরি খাড়া করলে, গোড়ায় গদল রয়ে গেল সেইখানেই। তুমি বলছ, পাফ দিয়ে পাউডার মেখেছেন টংগু লিনচান, অথচ ঘরে পাফ নেই। কিন্তু আমি বলব আছে।

কোথায়?

শেভিং ব্রাশ রাখার প্লাস্টিক কৌটোটা দেখেছ?

দেখেছি।

তার ক্যাপটা?

দেখেছি।

দেখোনি। দেখলে পাফটা দেখতে পেতে। ভেতর দিকে ছোট্ট একটা মখমলের পাফ লাগানো ছিল আগে থেকেই–টয়লেট-কিট যারা তৈরি করেছে, তারাই লাগিয়ে দিয়েছে। সুতরাং বউদি, অতীব দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, খুনির কাছাকাছি এসেও পাশ কাটিয়ে গেলে সব চাইতে মজার ব্যাপার, তিনজনেই খুনি সাব্যস্ত করলে একজন স্ত্রীলোককে। অথচ আমার হিসেব অনুযায়ী হত্যাকারী একজন পুরুষ।

প্রমাণ? বন্দুকের বুলেটের মতো প্রশ্ন নিক্ষেপ করলাম আমি।

সামনেই ছিল। কিন্তু চোখের ব্যবহার করোনি–প্রত্যেকেই আগে থেকেই ভেবে নেওয়া সিদ্ধান্তকে কায়েমি করার মতলবে অমন চোখে আঙুল দেওয়া প্রমাণ দেখেও দেখোনি। আমি আটটা ঝিনুকের বোতাম আর ধাতুর টুকরো দুটোর কথা বলছি।

যে ফায়ারপ্লেসে কখনো আগুন জ্বলে না, সেখানে খানিকটা ছাই পড়ে। টংগু লিনচান নিশ্চয় হাত-পা ছড়িয়ে বসার আগে কিছু পোড়ানোর জন্যে ব্যস্ত হননি। তবে কাজটা কার? নিশ্চয়ই হত্যাকারীর। আগুন জ্বালিয়ে প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা। ছাইটা কাগজের নয়, কাঠের নয়, কয়লার নয়। ছাইয়ের গাদায় পড়ে আটটা পোড়া বোতাম। ছটা ছোট, দুটো বড়। পৃথিবীতে একটিমাত্র জিনিসই আছে যার মধ্যে থাকে এই আটটা বস্তু। শার্ট। ওপেন ব্রেস্ট ফুলশার্টের সামনে থাকে ছটা ছোট বোতাম আর দু-হাতায় দুটো বড় বোতাম। ছাইটা কাপড়ের। অর্থাৎ ফায়ারপ্লেসে কেউ একটা ফুলশার্ট পুড়িয়েছে–পোড়াবার সময়ে খেয়ালই ছিল না যে ঝিনুকের বোতাম আগুনকেও কদলী প্রদর্শন করতে পারে।

এবার ধাতুর জিনিস দুটো। একটা তেকোণা আর একটা আঁকশি। ওপেনব্রেস্ট ফুলশার্ট যে পরে, সে টাউজার্স পরে। আর টাউজার্স যে পরে, সাধারণত সে টাই পরে। ধাতুর জিনিস দুটোও এসেছে বো-টাই থেকে। রেডিমেড বো-টাই বাজারে কিনতে পাওয়া যায় কিনলে বোবাঁধার ঝাট পোহাতে হয় না।

লম্বোদরবাবু, আপনি বললেন বটে, টংগু লিনচান রক্তমাখা হাতে কিছু একটা আঁকড়ে ধরেছিলেন। কিন্তু সেটা যে হত্যাকারীর শার্ট হতে পারে, তা বললেন না। বিছানার চাদর দেখেই তো বোঝা যায় ধস্তাধস্তি হয়েছে। মাথায় প্রথম বাড়ি খেয়ে লড়েছেন মিঃ লিনচান, খামচে ধরেছিলেন হত্যাকারীর শার্ট আর বো-টাই। কিন্তু তবুও প্রাণে বাঁচেননি।

লুটিয়ে পড়লেন মিঃ লিনচান। এদিকে হত্যাকারী পড়ল বিপদে। রক্তমাখা শার্ট আর বো-টাই নিয়ে বেরোনো যায় কী করে? হত্যাকারী যদি হোটেলের বাইরের লোক হত অথবা হোটেলের বোর্ডার হত, তাহলে কোটের কলার তুলে বো-টাই ঢেকে বেরিয়ে গেলেই কারো সন্দেহ হত না। বে-টাই যে পরে, সে কোটও পরে। কিন্তু তা না করে হত্যাকারী রক্তমাখা শার্ট আর বো-টাই আগুনে পুড়িয়ে মিঃ লিনচানের ব্যাগ হাঁটকে সাদা শার্ট আর বো-টাই পরে বেরিয়ে গেছে। এইজন্যেই ব্যাগের মধ্যে লম্বা নেকটাই পাওয়া গেছে। কিন্তু বো-টাই পাওয়া যায়নি। ইভনিং সুটের পাশেও তা ছিল না।

হত্যাকারী তাহলে বাইরের লোক নয়, বোর্ডারও নয়। তাহলে কি হোটেলেরই কর্মচারী? নিশ্চয়ই তাই। কেননা, কর্তব্যরত অবস্থায় রাঁদেভু হোটেলের প্রত্যেকেই ফিটফাট থাকতে হয়। ডিউটি ছেড়ে কোথাও যাওয়াও সম্ভব নয়। তাই নিজের শার্ট আর বো-টাই পুড়িয়ে পরের শার্ট আর বো-টাই পরে ফিরে যেতে হয়েছে তাকে ডিউটিতে।

আমরা যখন তদন্ত করছি, হত্যাকারী তখন হোটেলেই অন ডিউটিতে রয়েছে। পরনে আছে সাদা শার্ট আর কালো অথবা সাদা বো-টাই। খুব সম্ভব কালো। কিন্তু আমরা দেখেছি রাঁদেভু হোটেলের প্রত্যেক কর্মচারীর শার্টের রং ধূসর, টাইয়ের রং ধূসর। শুধু একজনের বাদে…হোটেলে ঢুকেই তফাতটা নিশ্চয় লক্ষ করেছিলে?

করোনি? অন্ধ অন্ধ, তোমরা তিনজনেই চোখ থেকেও অন্ধ। যাকগে, তোমরা বিদেয় হতেই জয়ন্তকে নিয়ে সেই একজনকে জেরা করতেই সব ফাঁস হয়ে গেল। তারপর শার্ট পরীক্ষা করতেই পাওয়া গেল সেই একই ওস্তাগরের লেবেল–ম্যাকিনস, জোহানেসবার্গ অর্থাৎ সাউথ আফ্রিকায় তৈরি জামা যেখানে বছরখানেক থেকে এসেছেন টংগু লিনচান কিন্তু আমাদের সন্দেহভাজন ব্যক্তিটি যে দেশে জীবনে যায়নি।

তিন মিনিটের মধ্যেই সবকিছু স্বীকার করে বসল হত্যাকারী। অনেক দিন আগেই তার বউকেই ভাগিয়ে নিয়ে গেছিলেন টংগু লিনচান, তারপর প্রয়োজন ফুরোতেই ছেঁড়া ন্যাকড়ার মতো ফেলে এসেছেন। হপ্তাখানেক আগে রাঁদেভু হোটেলে নাম লিখতেই হত্যাকারী তাকে চিনেছে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার প্ল্যান এঁটেছে। আজ সকালে ঢাকা থেকে ফিরতে না ফিরতেই হাতুড়ি পেটা করে যমালয়ে পাঠিয়ে শোধ নিয়েছে স্ত্রী-হরণের।

আলোকিত চোখে বললাম–হত্যাকারী তাহলে–

হোটেল ম্যানেজার মিঃ পিটার ড্যানিয়েল, বলে কাচির প্যাকেট হাতড়াতে লাগল ইন্দ্রনাথ রুদ্র। * সিনেমা জগৎ (জুন, ১৯৬৯) পত্রিকায় প্রকাশিত।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *