অধ্যায়-৭ মিসরের রাজপ্রাসাদ থেকে সিনাই পর্বত

অধ্যায়-৭ মিসরের রাজপ্রাসাদ থেকে সিনাই পর্বত

প্রাচীন মিসর। খ্রিস্টের জন্মের ১৩৯৩ বছর আগের কথা।

পুরো মিসরে যত ইসরায়েলি ছিল, তারা তখন ফারাওয়ের দাস। ইসরায়েলিদের প্রতি ফারাওয়ের নিষ্ঠুরতা ছিল চরম পর্যায়ে, এক বছর অন্তর অন্তর সকল নবজাতক হিব্রু পুত্রশিশুকে হত্যা করার আদেশ ছিল। আসলে, প্রতি বছরই মেরে ফেলবার নির্দেশ ছিল, কিন্তু এতে দাসের সংখ্যা বেশিমাত্রায় কমে যেতে পারে ভেবে সভাসদদের পরামর্শে সেটি এক বছর বাদে বাদে করা হয়।

এরকম সময়ে ইসরায়েলের ১২ গোত্রের মাঝে লেবিয় গোত্রের ইমরানের পরিবারে জন্ম নেন মূসা (আ)। তার মায়ের নাম ইবনে কাসিরের আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থ অনুযায়ী ‘আয়ারেখা’, কিংবা ইউকাবাদ; তাওরাতের হিব্রুতে তার নাম ইয়োহেভেদ। আর বাবা ইমরানের নাম হিব্রুতে আমরাম।

মূসা (আ) এর জন্ম হয় যে বছর, সেই বছর পুত্রহত্যার আদেশ ছিল। তাঁর তিন বছরের বড় ভাই হারুন (হিব্রু আরৌন) যে বছর জন্মগ্রহণ করেন; সেই বছর পুত্রহত্যার আদেশ ছিল না। তাছাড়া সাত বছরের বড় বোন মরিয়ম বা মিরিয়ামও ছিলেন।

মূসা (আ) এর জন্ম হয়েছিল হিব্রু পঞ্জিকার দ্বাদশ মাস আদার এর ৭ তারিখ। তাঁর বাবা ইমরানকে ইহুদীদের পবিত্র গ্রন্থ তালমুদে বলা হয়েছে, সেই প্রজন্মের সেরা মানুষ। জন্মের পর তিন মাস পর্যন্ত তাঁর মা তাঁকে লুকিয়ে রাখতেন। কিন্তু একপর্যায়ে আর লুকোতে না পেরে একটি ঝুড়িতে করে তাকে ভাসিয়ে দেন নীলনদে। সেই ঝুড়ি ভাসতে ভাসতে হাজির হলো ফারাও এর ঘাটে। ওদিকে মায়ের আদেশে মরিয়ম দেখছিলেন ঝুড়ির চূড়ান্ত গন্তব্য কী দাঁড়ায়।

ফারাওয়ের স্ত্রী আসিয়া (যিনি সম্ভবত পূর্ববর্তী কোনো ফারাওয়ের কন্যা) তখন খুঁজে পেলেন সেই ঝুড়িটি। বাইবেল মতে, খুঁজে পান ফারাও-কন্যা বিথিয়া। আসিয়াই ফারাওকে বুঝিয়ে রাজি করান শিশুটিকে পালন করার ব্যাপারে। মরিয়ম তখন হাজির হয়ে বললেন, তিনি তাকে দুধ পান করাবার জন্য কাউকে খুঁজে এনে দিতে পারবেন। একজন হিব্রুকন্যা আরেকজন হিব্রু নারীকে এনেছে দুধ পান করাতে, এতে ফারাও পরিবার অবাক হয়নি, কিন্তু তারা জানত না, এই নারীই আসলে শিশুটির মা। ফারাওয়ের হুমকিস্বরূপ যে শিশুর জন্ম হবার কথা ছিল, তার মৃত্যু হয়েছে ধরে নিয়ে হয়তো ফারাও শিশুটিকে রাখতে রাজি হলেন। যার কাছে পরাভূত হবে ফারাও, তারই আবাস হলো ফারাওয়ের রাজপ্রাসাদে, বড় হতে লাগলো রাজপুত্র হিসেবে।

একবার ফারাওয়ের কোলে খেলছিলেন শিশু মূসা (আ)। ফারাওয়ের জ্বলজ্বলে মুকুট দেখে শিশুদের মতোই হাত বাড়িয়ে দিলেন মূসা (আ), এবং খুলেও ফেললেন সেটা। ফারাও এতে ভয় পেয়ে গেলেন, রেগেও গেলেন। জ্যোতিষীদের ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলেন এর মানে কী। বেশিরভাগই জানালো, এই শিশুই তাকে পরাভূত করবে। কিন্তু একজন সভাসদ ফারাওকে জানালেন, ব্যাপারটা পরীক্ষা করা হোক, আসলেই শিশুটি জ্ঞান থেকে এ কাজ করেছে, নাকি শিশুসুলভ উজ্জ্বল বস্তুর আকর্ষণ থেকে করেছে। সেই সভাসদের নাম ইহুদী বর্ণনা অনুযায়ী জেথ্রো [ইসলামে জেথ্রোর নাম শুয়াইব (আ)]।

ফারাও রাজি হলেন। মূসা (আ) এর সামনে দুটো পাত্র রাখা হলো। একটাতে সোনা-জহরত। আর অন্যটাতে কয়লার আগুন। মূসা (আ) সোনার দিকেই এগোলেন প্রথমে, কিন্তু জিব্রাইল (আ) তাকে ঘুরিয়ে দিলেন কয়লার দিকে। একটি কয়লা মুখে পুরে ফেললেন মূসা (আ)। তার হাত আর জিহ্বা পুড়ে গেল। তাই তিনি তোতলা হয়ে যান পরে। কিন্তু এতে প্রমাণ হলো, অন্যান্য শিশুর মতোই তিনি কেবল উজ্জ্বল জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। ফারাও তাকে প্রাণে বাঁচতে দিলেন।

বড় হতে হতে মূসা (আ) বুঝতে পারলেন, তিনি আসলে মিসরীয় নন, হিব্রু। যুবরাজ হলেও তার নিজের দাসজাতির করুণ দশায় কষ্ট পেতেন খুব। মিসরের যে এলাকায় হিব্রুরা থাকত তার নাম গোশেন। প্রায়ই গোশেনে গিয়ে বুড়ো হিব্রু দাসদের কাজে হাত লাগাতেন তিনি। ফারাওয়ের ওপর প্রভাব থাকার কারণে বিভিন্ন উপায়ে তিনি চেষ্টা করতেন তাদের কষ্ট কমাবার। মূসা (আ) এর চিন্তাধারা আর সিদ্ধান্তকে সম্মান করতেন ফারাও। মূসা (আ) যে কাজগুলো করেছিলেন তার মাঝে একটি ছিল, সপ্তাহে একটি দিন অন্তত তাদের পূর্ণ বিশ্রাম দেয়া।

আর মূসা (আ) এর কারণে সেই দিনটি শনিবার দিনে রাখা সম্ভব হয়। ফলে হিব্রুদের পবিত্র সাব্বাথ দিবস তারা পালন

করতে পারে। তাওরাত অনুযায়ী, সৃষ্টির সপ্তম দিবসকে সাব্বাথ বা বিশ্রাম দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

একদিন মূসা (আ) গোশেনে গেলেন। সেখানে তিনি বেশ জনপ্রিয়। সেদিন দুপুর বা সন্ধ্যার দিকে তিনি দেখলেন, ফারাওয়ের এক মিসরীয় অফিসার (তত্ত্বাবধায়ক) তার অধীনের এক হিব্রুকে মারলো। উল্লেখ্য, প্রত্যেক তত্ত্বাবধায়কের অধীনে দশজন করে হিব্রু দাসের দল থাকত, আর প্রতি দলের একজন করে হিব্রু নেতা।

মূসা (আ) যখন দেখলেন হিব্রু লোকটিকে মিসরীয় অফিসার অন্যায়ভাবে মেরেছে এবং অত্যাচারিত হিব্রুটি তাঁর কাছে সাহায্য চাইছে, তখন তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে মূসা (আ) ঘুষি মারলেন। কিন্তু মারটা এমন জোরেই হয়ে গিয়েছিল যে, লোকটি মারাই গেল।

কিন্তু প্ৰাণে মারবার কোনো পরিকল্পনাই তাঁর ছিল না। ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি তিনি লাশ বালুতে দাফন করে ফেললেন, এবং ফিরে আসলেন প্রাসাদে। তার আশা, কেউ দেখেনি যে তিনি একটা খুন করে ফেলেছেন।

পরে শীঘ্রই তিনি আবার গোশেন এলাকায় গেলেন। এবার দেখলেন, দুজন হিব্রু একে অন্যের সাথে ঝগড়া করছে। তিনি এগিয়ে গিয়ে একজনকে (ঘটনাক্রমে আগের দিনের একই ব্যক্তি সে, এবারও সে সাহায্য চাইল) বললেন স্বজাতির সাথে মারামারি না করতে। তখন লোকটি বলল, “আমাদের ওপর প্রভাব খাটাতে কে বলেছে আপনাকে? আমাদেরও খুন করতে চান, যেভাবে ঐ মিসরীয় লোকটিকে করেছিলেন?” [পবিত্র কুরআনে সুরা কাসাসে ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়।]

মূসা (আঃ) কষ্ট পেলেন, যার জন্য চুরি করি সেই বলে চোর! কিন্তু তার ভয়টা আরো বেড়ে গেল। এর মানে, তিনি যে খুন করেছেন সেটা মানুষ দেখেছে, ফারাও এর কানে পৌঁছাতে আর কত দেরি!

সত্যি সত্যি ফারাও জেনেও গেলেন। ফারাও তখন মূসা (আ) এর মৃত্যুদণ্ড দিলেন। এক লোক শহর থেকে দৌড়ে এসে জানালো, তার মৃত্যু পরোয়ানা জারি হয়েছে। ইসলামী বর্ণনাতে, মূসা (আ) তখন পালিয়ে যান।

কিন্তু, ইহুদী বর্ণনায়, মূসা (আ)-কে গ্রেফতার করা হয়, এবং যখন জল্লাদের অস্ত্র মূসা (আ) ঘাড়ে নেমে আসলো, তখন এক অলৌকিক ব্যাপার ঘটল। একদম পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল তার ঘাড়, ফিরে গেল জল্লাদের অস্ত্র। সবাই অবাক হয়ে গেল, এবং রীতিমত একটি গণ্ডগোল বেধে গেল।

ইহুদীদের মিদ্রাশ (Yalkut Shimoni, 1:168 ) বিস্তারিতভাবে আমাদের জানায়, মূসা (আ) এর বয়স তখন ১৮ বছর ছিল। সেখানে গিয়ে তিনি দেখা পান ফারাওয়ের প্রাক্তন এক সভাসদের, নাম তার বিলাম। বিলাম কুশ এলাকার রাজা কোকিনাসকে সরিয়ে অন্যায়ভাবে রাজা হয়ে যায়। প্রায় নয় বছর ধরে মূসা (আ) কোকিনাসকে সহায়তা করেন হারানো রাজ্য ফিরে পেতে। মূসা (আ) এর অসাধারণ কিছু বুদ্ধিতে শেষপর্যন্ত রাজ্য পুনরুদ্ধার হয় বটে, কিন্তু ততদিনে কোকিনাস মারা গেছেন। কিন্তু জনগণ মূসা (আ)-কে তার যোগ্য পুরস্কার আর কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করে। তারা তাঁকে রাজা বানিয়ে দেয়, আর রাজার বিধবা স্ত্রী রানী আদোনিয়াকে তাঁর স্ত্রী হিসেবে দিতে চায়। তবে মূসা (আঃ) আদোনিয়াকে গ্রহণ করেননি, কারণ তিনি পৌত্তলিক ছিলেন।

সেই গণ্ডগোলের মাঝে মূসা (আ) পালিয়ে কুশ নামের এলাকায় চলে গেলেন। কুশ এলাকা (আফ্রিকার প্রাচীন আবিসিনিয়া বা ইথিওপিয়া) আসলে নুহ (আ) এর পুত্র কুশের নামে। উল্লেখ্য, কুশের পুত্র ছিল নমরুদ।

মূসা (আ) রাজত্ব করতে লাগলেন বটে, কিন্তু রানী আদোনিয়ার মনে তখন ক্রোধের আগুন। তিনি নিজের ছেলে মুঞ্চানকে রাজা করবার জন্য জনগণকে উত্তেজিত করতে লাগলেন। তবে জনগণ রাজি হয়নি। মূসা (আ) বুঝলেন, আসলে তাঁর রাজা হওয়া এখানে ঠিক হচ্ছে না। তিনি সসম্মানে রাজত্ব ত্যাগ করলেন। প্রজারা তাকে বিদায় জানালো খুবই সম্মানের সাথে। (অন্য এক বর্ণনায় দেখা যায়, কোকিনাসের এক কন্যা মূসা (আ)-কে ভালবাসতেন, কিন্তু একই কারণে মূসা (আ) গ্রহণ করেননি। এমনকি এক উপকথায় পাওয়া যায়, মূসা (আ) এক অলৌকিক আংটি পরিয়ে দেন সেই রাজকন্যাকে, যেন তিনি মূসা (আ) এর প্রতি ভালবাসা হারিয়ে ফেলেন।)

কুশ রাজ্য ত্যাগ করে মূসা (আ) এসে পৌঁছালেন মাদইয়ান ভূমিতে। দীর্ঘ পথ তিনি শাক-লতা-পাতা ছাড়া কিছু খেতে পাননি, তার জুতোও ছিড়ে যাওয়াতে বা না থাকাতে পায়ে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল বলে বর্ণনা আছে। সেখানেএক গাছের ছায়ায় তিনি বসলেন। কাছেই একটি কুয়া থেকে পানি তোলা হতো। কিন্তু ভারি পাথর না সরিয়ে সে কুয়ার মুখ খোলা যেত না। অন্যান্যরা পানি নেয়ার পর তলানির কিছু পানি গবাদি পশুকে খাওয়ানোর জন্য দুটো মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু সেদিন তাদেরকে দেখে মূসা (আ) নিজেই এগিয়ে গিয়ে পাথর সরিয়ে দেন, আর মেয়ে দুটো উপর থেকেই পানি নিতে পারল। এতে তারা দুজন মুগ্ধ হয়ে গেল।

তাদের মাঝে একজন এসে বলল, আমাদের বাবা আপনাকে এই সাহায্যের পারিশ্রমিক দিতে চান, তাই ডাকছেন। মূসা (আ) তাদের সাথে গেলেন। তখন তার সাথে দেখা হলো তাদের পিতা শোয়াইব (আ) এর সাথে। শোয়াইব (আ) ছিলেন মাদায়েনের নবী, এবং একজন আরব। কথিত আছে, তাঁর উম্মত তাঁর কথা না শোনায় ধ্বংস হয়ে যায়। বাইবেলে তিনি জেথ্রো (হিব্রু ইয়াসরু) নামে পরিচিত। তিনি সেই ব্যক্তি যিনি কি না আগে কিছুদিন ফারাওয়ের দরবারে কাজ করেছিলেন, এবং তিনিই শিশু মূসা (আ)-কে বাঁচাতে জ্ঞান পরীক্ষার জন্য কয়লা-আগুন পরীক্ষা ব্যবস্থা করেছিলেন বলে ইহুদী বর্ণনায় আছে। পরে ফারাওয়ের বিশ্বাসের সাথে মিল না পড়ায় তিনি চলে আসেন কিংবা বহিষ্কৃত হন- এ কাহিনীগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। সাহাবী ইবনে আব্বাস (রা) এ মতে সায় দিয়েছেন। কিন্তু এই বড় অবস্থায় মূসা (আ)-কে দেখে অবশ্য ইয়াসরু কিংবা শোয়াইব (আ) চিনতে পারেননি। তাঁর আরেক নাম ছিল রাওয়েল।

এক কন্যার পরামর্শে তিনি তাঁকে তাঁর অধীনে কাজ করবার প্রস্তাব দিলেন সাথে এটাও বললেন, আট-দশ বছর কাজ করলে তার একজন কন্যার সাথে তিনি বিয়ে দেবেন মূসা (আ) এর।

এ পর্যন্ত উল্লেখিত কাহিনীটি তাওরাতের, তবে কুরআনে কিছুটা ভিন্নভাবে বর্ণিত-

“যখন তিনি মাদইয়ানের কূপের ধারে পৌঁছলেন, তখন কূপের কাছে একদল লোককে পেলেন। তারা জন্তুদেরকে পানি পান করানোর কাজে রত। এবং তাদের পশ্চাতে দুজন স্ত্রীলোককে দেখলেন। তারা তাদের জন্তুদেরকে আগলিয়ে রাখছে। তিনি বললেন, তোমাদের কী ব্যাপার? তারা বলল, আমরা আমাদের জন্তুদেরকে পানি পান করাতে পারি না, যে পর্যন্ত রাখালরা তাদের জন্তুদেরকে নিয়ে সরে না যায়। আমাদের পিতা খুবই বৃদ্ধ। অতঃপর মূসা তাদের জন্তুদেরকে পানি পান করালেন। অতঃপর তিনি ছায়ার দিকে সরে গেলেন এবং বললেন, হে আমার পালনকর্তা, তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ নাযিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী। অতঃপর বালিকাদ্বয়ের একজন লজ্জাজড়িত পদক্ষেপে তাঁর কাছে আগমন করল। বলল, আমার পিতা আপনাকে ডাকছেন, যাতে আপনি যে আমাদেরকে পানি পান করিয়েছেন, তার বিনিময়ে পুরস্কার প্রদান করেন। অতঃপর মূসা যখন তাঁর কাছে গেলেন এবং সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন, তখন তিনি বললেন, ভয় করো না, তুমি জালেম সম্প্রদায়ের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছ। বালিকাদ্বয়ের একজন বলল, পিতা, তাকে চাকর নিযুক্ত করুন। কেননা, আপনার চাকর হিসেবে সে-ই উত্তম হবে, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত। পিতা মূসাকে বললেন, আমি আমার এই কন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সাথে বিবাহে দিতে চাই এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার চাকুরি করবে, যদি তুমি দশ বছর পূর্ণ কর, তা তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। আল্লাহ চাহেন তো তুমি আমাকে সৎকর্মপরায়ণ পাবে।” (সুরা কাসাস ২৮:২৩-২৭)

হিব্রু বাইবেলে শোয়াইব (আ) এর সাত কন্যার কথা পাওয়া যায়, কিন্তু মূসা (আ) ১০ বছর কাজ করবার পর যার সাথে বিয়ে হয়েছিল তার নাম ছিল সাফুরা (হিব্রুতে সিফোরাহ 77ing)। তাওরাত মতে, উপস্থিত কন্যাদের মাঝে বড় কন্যার সাথেই বিয়ে হয়েছিল মূসা (আ) এর। কিন্তু ইবনে কাসিরের মতে, বিয়েটা হয়েছিল ছোট কন্যার সাথে।

এত কাল ধরে মিসরে তার স্বজনদের সাথে তার কোনোই যোগাযোগ নেই। মূসা (আ) এর খুব ইচ্ছে হলো গোপনে মিসরে গিয়ে দেখা করে আসতে। তার স্ত্রী আর ছোট সন্তানদের সাথে নিয়ে তিনি রওনা হলেন। সাথে ছাগলের পাল ছিল। দিগ্বিদিক শূন্য মরুর রাস্তায় একটি ছাগল ছুটে গিয়ে হারিয়ে যায় বলে ইহুদী সূত্রে পাওয়া যায়।

তখন সেটি খুঁজতে বের হন মূসা (আ)। হোরেব তথা সিনাই পর্বতের কাছে গিয়ে তিনি ছাগলটিকে খুঁজে পেলেন। তখনই এক অদ্ভুত দৃশ্য তার চোখে পড়ল। দূরের আগুন তাঁর নজরে এলো।

ইবনে কাসির অনুযায়ী, সেই রাতটি ছিল বেশ ঠাণ্ডা। মরুভূমির মাঝে দিয়ে চলতে গিয়ে তারা বারবার পথ হারিয়ে ফেলছিলেন। ঠাণ্ডা তাড়াতে চকমকি পাথর ঠুকে আগুন জ্বালাবার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কাজে লাগছিল না কিছুই। তখন চোখে পড়ল দূরে সিনাই পাহাড়ের কাছে আগুন জ্বলছে। তিনি স্ত্রী-সন্তানদের বললেন, “তোমরা এখানে অপেক্ষা কর, আমি আগুন দেখতে পাচ্ছি। সম্ভবত আমি কয়লা আনতে পারব কিংবা পথের সন্ধান পাবো।” (কুরআন, সুরা ত্বোয়াহা: ৯-১০)

তিনি পাহাড়ের সেই আগুনের উৎসের দিকে গিয়ে দেখলেন একটি ঝোপে আগুন জ্বলছে। কিন্তু সেটি পুড়ে যাচ্ছে না!

তিনি আরেকটু এগোলেন। তখন সেই অগ্নিময় ঝোপ থেকে আওয়াজ আসলো বজ্রকণ্ঠে, “মূসা, মূসা!” (তাওরাত, হিজরত, ৩:৪)

মূসা বললেন, “এই তো আমি। উপস্থিত।”

আওয়াজ এলো, “মূসা! আমিই তোমার প্রভু, তোমার প্রতিপালক।” (কুরআন ২০: ৯-১০ এবং তাওরাত, হিজরত, ৩)

বিরান মরুভূমির মাঝে অচেনা এক পাহাড়ের ওপর একাকী দাঁড়িয়ে এক সময়ের যুবরাজ আর এখন মেষপালক মূসা (আ) অবাক হয়ে আবিষ্কার করলেন, বিশ্বজগতের স্রষ্টা তাঁর সাথে কথা বলছেন!

এখন আসা যাক এই অধ্যায়ের প্রশ্নোত্তর পর্বে।

প্রশ্ন-১: মাদইয়ান কোথায়?

উত্তর: হিব্রুতে এ জায়গাকে ডাকা হতো মিদিয়ান। আরব উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিম কোণে, লোহিত সাগরের আকাবা উপসাগরের পূর্ব দিকে এর অবস্থান। এ এলাকায় যারা বসবাস করত তারা ইব্রাহিম (আ) তৃতীয় স্ত্রী কেতুরার পুত্র মিদিয়ানের বংশধর বলে ইহুদীদের তাওরাতে বর্ণনা করা আছে। জেথ্রো বা শোয়াইব (আ) এ এলাকায় বসবাস করতেন। বর্তমানে আরবিভাষী ‘দ্রুজ’/Druze ধর্মের অনুসারীরা তাঁকে তাদের প্রধান নবী বলে থাকে। উল্লেখ্য, ‘মাদায়েন’ ভিন্ন জায়গা। সাহাবীদের যুগে পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিলো মাদায়েন।

প্রশ্ন-২: সিনাই পর্বতের কথা দেখা যাচ্ছে। তাহলে তূর পর্বত কোথায়?

উত্তর: মিসরে সিনাই উপদ্বীপ বলে একটি জায়গা আছে, আফ্রিকান দেশ মিসরের কেবল সে জায়গাটাই পড়েছে এশিয়াতে। লোহিত সাগর আর ভূমধ্যসাগরের মাঝে এর অবস্থান। হিব্রুতে সিনাই বললেও, ইংরেজিতে সাইনাই (Sinai) ডাকা হয়, আরবিতে সিনা। ষাট হাজার বর্গ কিলোমিটারের এ বিশাল মরু এলাকায় রয়েছে অনেক পাহাড়। এর মাঝে একটির নাম সিনাই পর্বত। একে হোরেব পর্বতও ডাকা হয়, আবার আরবিতে জাবালে মূসা বলা হয়, অর্থাৎ মূসার পাহাড়। সিনাই পর্বতকে হিব্রুতে একে হার সিনাই ডাকা হয়, হার শব্দের অর্থ পর্বত। ঠিক একইভাবে আরবিতে একে ডাকা হয় তূর সিনা। ‘তূর’ বলতে বোঝায় ‘পর্বত/পাহাড়’। অর্থাৎ তূর পাহাড় কথাটা ভুল, কারণ তূর মানেই পাহাড়। ইহুদী, খ্রিস্টান ও মুসলিম তিন ধর্মাবলম্বীদের কাছেই খুব পবিত্র এ জায়গা। কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ তূর বা পাহাড়টি পবিত্র তুয়া উপত্যকায়।

আমরা মিসর ভ্রমণের সময় এখানে আরোহণ করেছিলাম। লোহিত সাগরের তীরে শার্ম এল শেইখ এলাকার রিসোর্ট থেকে রাত ১২টায় আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়, ৩০০ কিলোমিটার দূরত্ব পেরিয়ে রাত আড়াইটার দিকে আমরা পৌঁছাই ওপরে চূড়ায় উঠতে রাতের আঁধারে আমাদের সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। সূর্যোদয়ের সময় চূড়ায় পৌঁছি আমরা। এরপর নামতে লাগে আরও তিন ঘণ্টা, সকাল ৯টার দিকে প্রবেশ করি সেইন্ট ক্যাথারিন আশ্রমে, যা এ পাহাড়ের গোড়ায় অবস্থিত।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *