তিথিডোর (১৯৪৯)

তিথিডোর - উপন্যাস - বুদ্ধদেব বসু

১.০১ রাজেনবাবু মানুষটি একটু শৌখিন

প্রথম শাড়ি: প্রথম শ্রাবণ ১.০১ রাজেনবাবু মানুষটি একটু শৌখিন। শৌখিন মানে বাবু নয়। হাঁটুর কাছে কাপড় তুলে, দু-হাতে দুই ঝুলি নিয়ে বাজার করে আসতে আপত্তি নেই তার, কিন্তু শোবার সময় বালিশে একটু সুগন্ধ চাই। এক জামা পরে সপ্তাহের ছদিন আপিশ করবেন, এদিকে কাচের গেলাসে ছাড়া জল খাবেন...

১.০২ শাড়িটা রপ্ত করতে

কিন্তু শাড়িটা রপ্ত করতে আরো অনেকদিন লেগে গেল স্বাতীর। শাড়ি পরে ইশকুলে সে যেতেই পারে না, বন্ধুদের সামনে বেরোতেও লজ্জা করে। তাহলে আর কতটুকু সময় বাকি রইল! কোনো ছুটির দিনে বাথরুম থেকে শাড়ি পরেই বেরিয়ে আসে গম্ভীরভাবে। কিন্তু ভাত-টাত খেয়ে মেঝেতে যখন উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে গল্পের...

১.০৩ কোথাও যাব না

কোথাও যাব না, তোমার কাছেই থাকব। কিন্তু যেতেই হয়। শাশ্বতীর পালা এল। কয়েকমাস আগে রাজেনবাবু এসেছেন নিজের বাড়িতে। টালিগঞ্জে। ব্রিজের কাছাকাছি, রসা রোড থেকে একটু পশ্চিমে ঢুকে, ছোটো একটু জমি শস্তায় কিনেছিলেন অনেকদিন আগে কোনো এক ফাঁকে। হঠাৎ স্থির করলেন বাড়ি করবেন। একেবারে...

১.০৪ কান্না এইরকম

কান্না!–কান্না এইরকম? মাকে যখন নিয়ে গেল, মাকে রেখে বাবা যখন ফিরে এলেন, তারপর বাড়িতে সেই প্রথম মা-ছাড়া রাত্রি… কেঁদে-কেঁদে মরতে বাকি ছিল তার। কিন্তু এরকম তো লাগেনি। কান্নার জোয়ারে সে ভেসে গিয়েছিল তখন, যেন অথৈ জলে ড়ুবছে, কিন্তু যতবার দম আটকে এসেছে কে যেন হাত...

১.০৫ বর্ষার কী জাঁকজমক সেবার

বর্ষার কী জাঁকজমক সেবার! যেন উড়িয়ে নেবে, যেন ভাসিয়ে দেবে। আরো কত বর্ষা তো কেটেছে স্বাতীর, আগে কখনো এমন দ্যাখেনি। সে যেন চোখে দেখতে পেল ঘাসের ঘন হওয়া, গাছপালার বেড়ে ওঠা, মাটির সুখ, শিকড়ের খুশি। লম্বা, মেঘলা-একলা দুপুর, রঙের আহ্লাদে গলে-যাওয়া বিকেল, আর রিমঝিম রাত্রি। আর...

২.০১ করুণ রঙিন পথ

দ্বিতীয় পর্ব করুণ রঙিন পথ কীভাবে স্বাতী? বৃষ্টিবিকেলে জানলাধারে বসে, ফিকে নীল শাড়িতে, পিঠে চুল ছড়িয়ে, ঠোঁটে মুখে জলছিটে নিতে নিতে কী ভাবে সতেরো বছরের স্বাতী? কী?…কী আর ভাববে, সব ভাবনা ভেবে রেখেছে অন্যেরা। যেসব ভাবনা ভাবা যায় বলেও সে ভাবেনি কোনোদিন। প্রথমে...

২.০২ শাশ্বতী কাঁদছিল না

শাশ্বতী কাঁদছিল না। সোনার দিনটির পরে কালো হয়ে আসা সন্ধ্যাটার কথা ভাবছিল শুধু। এখন গিয়ে ড্রয়িংরুম আলো করতে হবে, হাই চেপে-চেপে হাসতে হবে। আর ভয়ে-ভয়ে থাকতে হবে, পাছে ভুল জায়গায় হেসে ফেলে। যিনি আসছেন, ইকনমিক্সে তার মতো পরিষ্কার মাথা দেশে আর দ্বিতীয় নেই—মানে, হারীতের তা-ই...

২.০৩ শীত পড়ে এল

শীত পড়ে এল পৃথিবী ভরে মন-খারাপ ছড়িয়ে। কী মন-মরা রঙ-ঝরা সন্ধ্যা, আর বিকেলটা ছোট্টো একটুখানি, যেন রোগা, সরু, ভীরু, কোনওরকমে একবার ঝিলিক দিয়েই অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। এই তো সেদিনও কত রঙ ছিল বিকেলে—বেগুনি আর বাদামি আর সবুজ, হলদে আর সবুজ আর সোনালি। এক-একদিন সন্ধেবেলাটাকে মনে...

২.০৪ কী দশা হবে

কী দশা হবে? ঐ বইয়ের মতো? কিন্তু ও-বই তো বিশ্বজয়ী। ঘর ছাড়িয়ে, বারান্দা পেরিয়ে, উঠোনের সিঁড়ির দ্বিতীয় ধাপে আটকে গেছে কীটসের কবিতা। মলাটের দুই ডানা ছড়িয়ে, মুখ থুবড়ে, শিকার-করা পাখির মতো; বিকেলের বাঁকা রোদুরে চিকচিক করছে কবির নাম, সোনালি অক্ষর… সোনালি স্বাক্ষর।...

২.০৫ গাড়ির দরজা খোলার একটুখানি আওয়াজে

গাড়ির দরজা খোলার একটুখানি আওয়াজে আলো জ্বলে উঠল ভিতরের ঘরে, বাইরের ঘরে। আর দরজা খুলে রাজেনবাবু যেই দাড়ালেন, ঠিক তক্ষুনি গলির মোড়ে মিলিয়ে গেল গাড়ির পিছনের জ্বলজ্বলে লাল পাথর-চোখ। বিজু চলে গেল ভিতরে। স্বাতী বসে পড়ল বাইরের ঘরেই, পাখাটা খুলে দিল বসবার আগে। ঘরটা গরম আর বড়ো...

২.০৬ শিলঙে সুন্দর

শিলঙে সুন্দর, কিন্তু কলকাতায় সবচেয়ে বিশ্রী-গরম গ্রীষ্মদিনের একটি। আকাশে নীল নেই। পাতলা…খুব পাতলা একটা ধোঁয়ারং ছড়ানো, হঠাৎ কখনো মেঘের মতো ছায়া-ফেলা, কিন্তু মেঘ নয়। মেঘের উল্টো কেননা বৃষ্টির আশাকেই সে দুরে সরায়, আর হাওয়া বন্ধ করে দিয়ে পৃথিবীর হাঁপ ধরায়। বাইরের...

৩.০১ যবনিকা কম্পমান

যবনিকা কম্পমান তৃতীয় খণ্ড বৃষ্টি পড়ছিল বাইরে। নিঃশব্দ, প্রায়-অদৃশ্য বৃষ্টি। অচেনা, ছায়া-ছায়া, ঝাপসা আলোর রাস্তায় গাড়ি মোড় নিচ্ছে এক-একবার, আর হেডলাইটের কড়া কৌতূহলের সামনে ধরা পড়ে যাচ্ছে লম্বা, বাঁকা, সমান্তরাল বৃষ্টিরেখার এক-একটি ঝক। কিন্তু মুহূর্তের জন্য। তারপর আবার...

৩.০২ সুখী, সুশ্রী, উজ্জ্বল একটি দিন

সুখী, সুশ্রী, উজ্জ্বল একটি দিন। গ্রীষ্মের ধোঁয়ামুখে মেঘের ধোঁয়া, মেঘের ধোঁয়ারং কালো, আকাশ ভরা কালো, আকাশভাঙা বৃষ্টি, তারপর বৃষ্টি পড়ে পড়ে তাপ জুড়োল, মেঘ লুকোল, আকাশ ফেটে নীল বেরোল। সত্যি নীল… নরম অথচ জ্বলজ্বলে ঘন নীল, যে নীল—যদিও নীলের জন্যই তার খ্যাতি-বাংলার...

৩.০৩ স্বাতীর ঘুম ভাঙল অন্ধকারে

স্বাতীর ঘুম ভাঙল অন্ধকারে। কিন্তু তখনই বুঝল রাত আর নেই। কানে এল কাকের কাকা, রান্নাঘরে হরির কয়লা ভাঙার ঠকাশ-ঠকাশ, বাথরুমে জলের ছলছল। শেষের শব্দটায় বুঝল বাবা উঠে পড়েছেন। নিজেও দেরি করল না। বেরোতে গিয়ে হোঁচট খেল। দরজার ঠিক বাইরে, দুটো ঘরের মাঝখানকার ফালি গলিতে, ছড়িয়ে...

৩.০৪ আবার পুজোর ছুটি

আবার পুজোর ছুটি, আবার কলকাতার বাইরে যাওয়ার ধুম। রেলটিকিট এবার যেন অন্যবারের চেয়ে সস্তা। রাস্তায় বেরোলেই চোখে পড়ে পিছনে মাল-বাঁধা ট্যাক্সি। শাশ্বতীর শ্বশুরবাড়ির দল দেওঘর গেছে, শ্বশুরের বাড়ি আছে সেখানে। হারীত-শাশ্বতীরও যাবার কথা ছিল হারীতের ছুটি হলেই, কিন্তু আপিশের শেষ...

৩.০৫ শীতের ছোটো দিন

শীতের ছোটো দিন দেখতে দেখতে ফুরোল, সন্ধ্যা নামল। দুটি ঘরের মাঝখানকার দরজায় দাঁড়িয়ে তরুলতা বললেন–সতু, এবার তৈরি হয়ে নে। সত্যেন হাসল। আজ দিনের মধ্যে যতবার মামিমা তাকে সতু বলে ডেকেছেন, ততবার ঐ একটু হাসি ফুটেছে তার ঠোঁটে। ঠাট্টার হাসি, আবার যেন অন্য কিছুরও। ভাবতে...