ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ২০০
সম্পাদনা
সন্তু বাগ ও সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়
কল্পবিশ্ব পাবলিকেশনস
.
উৎসর্গ
প্রথম আধুনিক কল্পবিজ্ঞানের রচয়িতা
মেরি ওলস্টোনক্রাফট শেলির
স্মৃতির উদ্দেশে
.
ভূমিকা
“Did I request thee, Maker, from my clay
To mould me man? Did I solicit thee
From darkness to promote me?”
—Paradise Lost (Book X), John Milton
রক্তমাখা ঠোঁট নিয়ে উড়ে চলেছে ঈগল। পরের দিন আবার ফিরে আসতে হবে পুনরুজ্জীবিত বিদ্রোহীর যকৃৎ খুবলে খুবলে খাওয়ার জন্য। দেবতাদের কুক্ষিগত আগুন চুরি করার শাস্তি বড়ো কম না! এই আগুনই তো ছিল স্বর্গ আর মর্ত্যের ক্ষমতার সীমানা, জ্ঞান আর অজ্ঞানের প্রান্তরেখা… সময় সরণি বেয়ে মহাকাব্যের যুগের গলি-ঘুঁজি পেরিয়ে আবার একটা আলোর যুগ। ফায়ার প্লেসে জ্বলছে সেই আদি বিদ্রোহী প্রমিথিউসের চুরি করা আগুন। এক অষ্টাদশীর চেতনায় তা জাগিয়ে তুলছে স্ফুলিঙ্গ, যেন জীবন-মৃত্যুর সীমান্ত পেরিয়ে আমাদের অস্তিত্বের আদি প্রশ্নগুলো এসে ধাক্কা মারছে ওই সদ্য সন্তানহারা মায়ের বুকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সামনের পাণ্ডুলিপিতে জেগে উঠবে একটা আকার, জেগে উঠবে সহস্রাব্দের ঘুম পেরিয়ে। যেমন হয়তো আদি মানব জেগে উঠেছিল একদিন, জেগে উঠে তাকিয়েছিল তাঁর নিয়ন্তার দিকে।
মেরি ওলস্টোনক্রাফট শেলি নামে আঠেরো বছর বয়সি রাগী যুবতীর কলম থেকে বেরিয়ে আসা একটা অবয়ব আমাদের দুঃস্বপ্নের রঙ্গমঞ্চকে শাসন করে গেছে গত দুই শতাব্দী। সাহিত্যের স্রোত থেকে বেরিয়ে তার তটরেখার বিস্তৃতি বেড়েছে শিল্পের অন্য মাধ্যমে, বিশেষত সিনেমা নামক অপেক্ষাকৃত নতুন শিল্পমাধ্যমের মধ্যে দিয়ে জনমানসে হয়তো আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তার প্রভাব। এই বছরটা ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন অর দ্য মর্ডার্ন প্রমিথিউস’ নামের সেই আশ্চর্য উপন্যাসের দ্বিশতবার্ষিকী। এই প্রাক্-মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কল্পবিশ্ব ওয়েব ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে আমাদের মনে হয়েছিল, অনেক বিশেষজ্ঞের মতে যা প্রথম আধুনিক কল্পবিজ্ঞান, সেই মহান উপন্যাসের প্রথম প্রকাশের এই ইপকটা স্মরণীয় করে রাখা উচিত। এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার যে, ১৮১৮ সালের ১ জানুয়ারি যখন লন্ডন শহরে ল্যাকিংটন, হিউজ, হার্ডিং, মেভর অ্যান্ড জোন্স নামের একটা ছোট্ট পাবলিশিং কোম্পানি থেকে তিন খণ্ডে সমাপ্ত এই উপন্যাসের প্রথম সংস্করণ ছেপে বের হচ্ছে, তখনও লেখকের নাম ছিল উহ্য। শুধুমাত্র উৎসর্গপত্রে নাম ছিল সমকালীন রাজনৈতিক দর্শনের এক অগ্রগণ্য নাম। উইলিয়াম গডউইন। বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন কবি পার্সি বিস শেলি যিনি একাধারে বিখ্যাত একজন কবি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমপরিমাণ কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন নাস্তিকতার একজন নব-উদ্গাতা হিসেবে। শেলির নাম প্রথম থেকেই জড়িত থাকার কারণে এই উপন্যাসকে ঘিরে একটা বিবাদের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল। এমনকী, বিখ্যাত স্কটিশ ঔপন্যাসিক স্যার ওয়াল্টার স্কটের মতো মানুষও ‘ব্ল্যাকউড এডিনবার্গ ম্যাগাজিন’-এ বইয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেও বেশ কয়েকটা প্রশ্নচিহ্ন রেখে গেছেন অথরশিপ নিয়ে। যাইহোক পরবর্তীকালে সন্দেহাতীত ভাবেই প্রমাণ হয়েছে যে মেরির সৃষ্টিশীল সত্তাই জন্ম দিয়েছিল ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন আর তাঁর তৈরি দানবকে। ভিলা দিওদাতির সেই ঘরে লর্ড বায়রনের প্রস্তাবিত চ্যালেঞ্জ যা মেরির মর্মের গভীর থেকে উৎসারিত করল জায়মান অক্ষরমালার স্রোত। এর সুফল পেয়েছে বিশ্বসাহিত্য। সেই মহান গ্রন্থের দুশো বছরকে স্মরণ করে ‘কল্পবিশ্ব’ ওয়েবম্যাগ এই বছরেই অর্থাৎ ২০১৮ সালের এপ্রিলে আস্ত একটা সংখ্যা বের করেছিল। এদিকে গত বছরই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সঙ্গে আমাদের আলাপচারিতায় ঠিক হয় যে, এই উপলক্ষে যুগ্মভাবে একটা আন্তর্জাতিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সারা পৃথিবী থেকে গবেষকরা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন এবং রি-অ্যানিমেশন থিমকে নিয়ে তাঁদের গবেষণাপত্র পাঠ করবেন সেই সমাবেশে। যার মধ্যে দিয়ে সাহিত্য, মনস্তত্ত্ব, সমাজবিদ্যা ইত্যাদি নানা শাখায় এই থিম্যাটিক মোটিফটা যেভাবে ছড়িয়ে আছে তার একটা বর্ণালী হয়তো বিচ্ছুরিত হবে। এই প্রসঙ্গে ধন্যবাদ জানাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক অভিজিৎ গুপ্ত এবং ওই বিভাগেরই অধ্যাপক রিমি বি চ্যাটার্জিকে। অধ্যাপক চ্যাটার্জি ইংরেজীতে একটি অত্যন্ত মূল্যবান সন্দর্ভ এই সংকলনের জন্য লিখেছেন যা ওই আগে বর্ণিত বর্ণালীরই একটা অনুরণন। তবে পণ্ডিতদের অন্বেষণের পরেও থেকে যায় আমাদের মতো সাধারণ পাঠকদের একটা অনন্ত খোঁজ। যে খোঁজ সার্থকতা পায় গল্পের শরীরে, প্লট-সাবপ্লটের বিনির্মাণে। সেই চিন্তারই ফসল এই সংকলন। আমরা খোঁজা শুরু করলাম যে বাংলা সাহিত্যে এই গল্পের চেতনা কীভাবে শাখা মেলেছে অন্য গল্পের আড়ালে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, সেভাবে খুঁজে পাওয়া গেল না এমন বিষয় বা আঙ্গিক নির্ভর বাংলা কাহিনি। এই সংকলনে বাংলা ধ্রুপদী কল্পবিজ্ঞানের ভাঁড়ার থেকে শ্রী সত্যজিৎ রায়ের ‘শঙ্কু ও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ ছাড়া আর দুটো মাত্র গল্প স্থান পেয়েছে, যার মধ্যে এই বিষয়ের অনুনাদ খুঁজে পাওয়া যায়। শঙ্কুর গল্প পুনঃপ্রকাশের অনুমতি দেওয়ার জন্য আমরা সহৃদয় কৃতজ্ঞতা জানাই শ্রী সন্দীপ রায় এবং আনন্দ পাবলিশার্স কর্তৃপক্ষকে। সেইসঙ্গে ধন্যবাদ জানাই শ্রী রণেন ঘোষকে যিনি প্রথম দিন থেকেই কল্পবিশ্বের এক আপনজন হিসেবে তাঁর মূল্যবান পরামর্শ দিয়ে এসেছেন আমাদের। আমরা আরও চেয়েছিলাম যে বিদেশি যেসব লেখালেখির মধ্যে এই থিমের শাখাপ্রশাখা ঢুকে গেছে তার কিছু প্রতিনিধি স্থানীয় লেখাকে সার্থক অনুবাদের মাধ্যমে তুলে আনার জন্য। এক্ষেত্রে কল্পবিশ্বের তরফ থেকে আমরা আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ক্রিস্টি ফার্ন, রোবার্তা ল্যানেস, র্যামসে ক্যাম্পবেল এবং ব্রায়ান মুনি’কে যাঁরা ইমেলের মাধ্যমে অনুমতি দিয়েছিলেন তাঁদের লেখার অনুবাদ এই সংকলনের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। এরপরেও যা পড়ে থাকে সেটা হল এখনকার লেখকদের চিদাকাশে যেভাবে অনুরণিত হয়ে উঠেছে সেই চেতনা যা প্রকৃতির নিয়মকে অস্বীকার করে মৃত্যু পেরিয়ে যেতে চায় সভ্যতার অমৃত কিংবা গরলের অন্বেষণে। কল্পবিশ্বের তরুণ ব্রিগেড হতাশ করেনি। আশা করব যে, পাঠকেরাও আমাদের এই ভালো লাগার অনুভূতি ভাগ করে নেবেন, লেখা ঝাড়াই বাছাই করার সময় আমাদের যেটা হয়েছিল। মৌলিক গল্প আর প্রবন্ধের একটা বিরাট ব্যান্ড উইডথের মধ্যে দিয়ে তরঙ্গায়িত হতে চলেছে এই সংকলন। আমাদের বিশ্বাস যে এই সংকলনের মধ্যে দিয়ে আবার আমাদের বোধের অলিন্দের কোণ থেকে জেগে উঠবে সেই অবয়ব যাকে সভ্যতার মদগর্বে মানুষ বারে বারে দানব হিসেবে ভুল করে। আবার হয়তো পাঠকের মনে সেই কণ্ঠস্বর ভেসে আসবে, দানবের যে সংলাপ তাঁর নিয়ন্তার দিকে ধেয়ে গেছিল … “I ought to be thy Adam, but I am rather the fallen angel …”
সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায় ও সন্তু বাগ
কলকাতা
১৫ নভেম্বর ২০১৮
.
প্রকাশকের কথা
পৃথিবীর সর্বপ্রথম আধুনিক কল্পবিজ্ঞান— মেরি শেলির ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস’-এর দুশো বছর পূর্তি উপলক্ষে সারা পৃথিবী জুড়ে চলছে সাহিত্য উৎসব। শুধু কল্পবিজ্ঞান নয়, সামগ্রিক ভাবেই বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি এই কাহিনি। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের তৈরি দানবের মধ্যেই যেন লুকিয়ে রয়েছে সভ্যতার প্রেত। যে বিপন্নতার সঙ্কেত দুশো বছর আগে এক অষ্টাদশী প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা যেন আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
কল্পবিশ্ব পত্রিকা আগেই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনকে নিয়ে একটি বিশেষ অন্তর্জাল সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। এবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সঙ্গে কল্পবিশ্ব আয়োজন করেছে এক সমাবেশের। এটি কলকাতা তথা পূর্ব ভারতের প্রথম আন্তর্জাতিক কল্পবিজ্ঞান সম্মেলন যার বিষয় ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন। সেই উপলক্ষে আমরা এবার দুই মলাটের ভিতরে নিয়ে এলাম এই চিরকালীন সাহিত্যকে নিয়ে এক অনন্য সংগ্রহ। সত্যজিৎ রায়ের শঙ্কু কাহিনির চিরচেনা ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের পাশাপাশি রয়েছে বহু তরুণ লেখকের নিজস্ব বীক্ষা।
গল্প, অনুবাদ, প্রবন্ধ ও সাক্ষাৎকার— এক কথায় ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন নিয়ে বাংলা সাহিত্যে এমন বই এই প্রথম। আমাদের নিশ্চিত বিশ্বাস, উৎসাহী পাঠক বইটিকে সমাদরে বরণ করে নেবেন।




Leave a Reply