প্রশ্নকর্তা আর ড্যানিল অলিভো (আইজাক আসিমভের ফাউন্ডেশন এবং রোবট সিরিজে বর্ণিত যন্ত্রমানব)
ড্যানিল: শুভ সন্ধ্যা মেরি। এই সাক্ষাৎকারের জন্য রাজি হওয়ায় আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।
মেরি: শুভ সন্ধ্যা।
ড্যানিল: যে প্রশ্নটা প্রথমেই মনে আসে সেটা হল বায়রন আর শেলি ব্যক্তিগত জীবনে কেমন ছিলেন?
মেরি: ওঁরা দুজনেই অনেকটা একই মেজাজের মানুষ। যদিও কিছু কিছু ব্যাপারে একেবারে আলাদা ছিলেন। বায়রন ছিলেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী, সফল কিন্তু কুখ্যাত। আর শেলির রচনা খুবই গভীর বলে মনে করা হত যদিও সমকালের সাহিত্যের মানদণ্ডের নিরিখে বেশ বিপজ্জনক ছিল ওঁর লেখালেখি। তখন ওঁরা দুজনেই নির্বাসিতের জীবন কাটাচ্ছিলেন। সত্যি বলতে কী, আমাদের পুরো দলটাই তখন সেভাবে ছিলাম। আমি, ক্লেয়ার ক্লেমন্ট, বায়রন আর শেলি আমরা সবাই যেন ওই সমাজের কাছে একটা আস্ত বিপদ ছিলাম সেই সময়।
ড্যানিল: সেটা কেন?
মেরি: শেলি ছিল একজন নাস্তিক, নিরামিষাশী এবং মনে প্রাণে এক বিপ্লবী। বায়রনের প্রেমপর্ব চলছিল ওঁর নিজেরই সৎ বোনের সঙ্গে, যাই হোক সেই সময় আবার তাঁর নজর গিয়ে পড়ে আমার সৎ বোন ক্লেয়ারের দিকে। আমি ক্লেয়ারকে বুঝিয়েছিলাম নিজের জীবনকে এভাবে বায়রনের জন্য সঁপে না দিতে। কিন্তু ওর তখন একজন কবিকে চাই। আসলে আমার মতো হতে চাইত ক্লেয়ার।
ড্যানিল: আপনিও কি নিজের জীবনকে এভাবেই শেলির দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন?
মেরি: একেবারেই না। বরং ওই এগিয়ে এসেছিল শুরুতে। প্রথমদিকে একজন অতিথি হয়ে আমার বাবার বইয়ের দোকানে এসেছিল শেলি। আমি জানতাম সে বিবাহিত, কিন্তু এটা বুঝিনি যে ও কতটা অসুখী জীবন কাটাচ্ছে বা হয়তো ও একই সঙ্গে দু’জন নারীকে ভালোবাসতে পারে।
ড্যানিল: সত্যি? এ যেন সেই ‘তোমার আমার এই আকর্ষণের কথা আমার বউ বুঝতে পারে না’ গোছের হয়ে গেল শুনতে!
মেরি: একদমই নয়। আমাদের কথাবার্তা প্রাথমিকভাবে সাহিত্যের প্রসঙ্গেই হত আর সেসব একেবারে নির্দোষ ছিল প্রথম দিকে।
ড্যানিল: উনি কি আপনার ব্যক্তিত্ব আর বুদ্ধিমত্তার আকর্ষণেই মজেছিলেন আর তার সঙ্গে ছিল আপনার পরিবারের সুনাম?
মেরি: ও আমার বাবার সব লেখা অবশ্যই পড়েছিল, ‘পলিটিক্যাল জাস্টিস’, ‘ক্যালেব উইলিয়ামস’ সবকিছু। আর আমার মায়ের ‘রাইটস অফ উইমেন’-এর যে কোনও জায়গা থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারত, যেমন পারত ক্লেয়ার।
ড্যানিল: আপনার বাবা ছিলেন উইলিয়াম গডউইন আর মা মেরি উলস্টনক্রাফট। একজন নারীবাদী হিসেবে তাঁর জীবন কেমন ছিল একটু বলবেন কি?
মেরি: এই শব্দটা আধুনিক। তখন এমন কোনও কিছুর ধারণা ছিল না। আমার মনে হয় তিনি মেয়েদের জীবনের মুক্তি চেয়েছিলেন বিয়ে আর শ্রেণিগত চেতনার এই বেড়াজাল থেকে। প্রকৃতপক্ষেই যে জীবন হবে স্বাধীন।
ড্যানিল: নারীবাদ নিয়ে আপনার নিজের ধারণা কী?
মেরি: মেয়েদের মর্যাদা এই যুগে বেশ কিছু দেশের সমাজ ব্যবস্থায় যতটা বেড়েছে তা হয়তো আগে কোনও দিনই ছিল না। কিন্তু তাও তারা নির্যাতিত বহু ক্ষেত্রেই।
ড্যানিল: কোনও কোনও দেশে এখনও মেয়েদের গাড়ি চালানোতে বাধা আছে। এমনকী, শিক্ষার ক্ষেত্রেও তারা ব্রাত্য!
মেরি: খুবই খারাপ লাগল আমার সময় থেকে দুশো বছর পরেও এমন অবস্থার কথা শুনে। এমনকী, তথাকথিত স্বাধীন সমাজের মেয়েদেরও প্রায়ই চিন্তাহীন শরীরসর্বস্ব করে তুলে ধরা হয়। এও এক ধরনের দাসত্ব, যাকে আমার মা ঘৃণা করতেন, আমিও করি।
ড্যানিল: শেলির সঙ্গে আপনার সম্পর্ক নিয়ে ওঁর কী প্রতিক্রিয়া হতো বলে আপনার মনে হয়?
মেরি: মনে হয় উনি ভালোভাবেই নিতেন। আমি বিশ্বাস করি, মা খুশিই হতেন এটা দেখে যে, উনি আর বাবা আদর্শগতভাবে যে জীবনের কথা ভেবেছিলেন ঠিক তেমনই জীবন কাটাচ্ছিলাম আমরা।
ড্যানিল: আপনার বাবা কি এটা ভালোভাবে মেনে নিয়েছিলেন?
মেরি: একেবারেই না। ওঁর রাজনৈতিক মত যাই হোক না কেন, একজন বিবাহিত, নাস্তিক কবির সঙ্গে পালিয়ে যাওয়াটা মেনে নিতে তাঁর খুবই সমস্যা হয়েছিল।
ড্যানিল: ক্লেয়ারও গিয়েছিলেন আপনার সঙ্গে?
মেরি: ও গিয়েছিল এটা ভেবে যে, ও ফরাসিতে কথাবার্তা চালাতে পারবে। তবে আমরা যখন বায়রনের সঙ্গে জেনিভায় ছিলাম তখন এটা বোঝাই যাচ্ছিল যে শেলি আর ক্লেয়ারের মধ্যে একটা পারস্পরিক আকর্ষণ আছে।
ড্যানিল: সেই সময় আপনার সঙ্গে শেলির বিয়ে হয়ে গেছে, সেটা জেনেও?
মেরি: আমি শেলিকে বিয়ে করেছিলাম যাতে ও ওঁর প্রথম সন্তানের অভিভাবকত্ব পেতে পারে। ওঁর প্রথম স্ত্রী হ্যারিয়েট আত্মহত্যা করেছিলেন লেক সার্পেন্টাইনের জলে ঝাঁপ দিয়ে। তবে আমাদের বিয়েটাই যথেষ্ট ছিল না এই সম্পর্কের জন্য। শেলি ছিল একজন নাস্তিক, অবিশ্বাসী। আর এটাই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা।
ড্যানিল: আপনার নিজেরও সন্তান ছিল তো?
মেরি: পার্সি ফ্লোরেন্স ছাড়া আমার সব সন্তানেরাই মারা গিয়েছিল অকালে। তার জন্য বুকফাটা কষ্ট পেয়েছিলাম আমি। আমার সবসময় ভয় হতো যে মায়ের মতোই সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মরে যাব আমি।
ড্যানিল: যাই হোক না কেন, আপনার উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ কি আসলে এমন একজনের জীবনের কথা, যিনি সন্তান পেয়েছিলেন একজন নারীর উপস্থিতি ছাড়াই।
মেরি: বেশ গভীর একটা উপলব্ধির কথা বললেন। ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন এক আধুনিক ‘প্রমিথিউস’। তিনি যেন সৃষ্টি রহস্যকে চুরি করে তৈরি করেছিলেন আস্ত একটা মানুষ। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল পরে। তাঁর সৃষ্ট ওই জীব বুঝতে পারল মানুষের মনের গূঢ় আলোছায়া। স্বার্থপরতা আর নিষ্ঠুরতা। সে শুধু চেয়েছিল সেইটুকুই যা তার সৃষ্টিকর্তার আছে। একজন স্ত্রী আর একটা পরিবার।
ড্যানিল: সবাই জানতে চায় ওই উপন্যাস অবলম্বনে করা চলচ্চিত্র দেখে দেখে আপনার কী মনে হয়?
মেরি: চলচ্চিত্রের ওই দানব কখনওই নিজের কথা বোঝাতে পারে না। কেউ যদি ছায়াছবিটা দেখার পর মূল বইটা পড়ে সে আশ্চর্য হয়ে যাবে এটা জেনে যে আসলে ওই জীব অনেক পড়াশুনা করেছিল। কতটা বুদ্ধিদীপ্ত আর সহানুভূতিশীল ছিল সে। মনে রাখতে হবে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সে তার সারা জীবন কাটিয়েছিল যার মধ্যে কোনও শৈশব ছিল না।
ড্যানিল: ঠিক যেন ‘ব্লেড রানার’ ছায়াছবির রেপ্লিক্যান্টরা। তারাও আসল মানুষকে হিংসা করত, তাদের চেয়ে দীর্ঘ জীবন কাটাতে পারার জন্য। আপনার উপন্যাস ‘দ্য লাস্টম্যান’ এমন এক মানুষকে নিয়ে যে এক অজানা ভয়ঙ্কর মহামারীর থেকে বেঁচে ফেরে। এর থেকেও কতগুলো চলচ্চিত্র প্রভাবিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে চার্লটন হেস্টন অভিনীত ‘দ্য ওমেগা ম্যান’ বা ২০০৭ সালে উইল স্মিথ অভিনীত জনপ্রিয় ছায়াছবি ‘আই অ্যাম লেজেন্ড’। যদিও আপনার বইয়ের কথা স্বীকার করা হয়নি এই ছবিগুলোতে, তবে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতোই জীবন আর মৃত্যুকে নিয়ে প্রশ্ন করে এই আখ্যান।
মেরি: হ্যাঁ। আমার উপন্যাসে মানুষের ওই শেষ প্রতিনিধি কথা বলে মূর্তির সঙ্গে। সে তাদের চুমু খায় আর পিগম্যালিয়নের মতোই প্রার্থনা করে তারা যেন জীবন্ত হয়ে যেতে পারে।
ড্যানিল: ‘আই অ্যাম লেজেন্ড’ ছায়াছবিতে উইল স্মিথের চরিত্র কথা বলে দোকানে রাখা ম্যানিক্যুইনের সঙ্গে। আর চার্লটন হেস্টন অভিনীত ছায়াছবিতে ওই চরিত্র উডস্টকের রক ফেস্টিভ্যালের ভিডিও দেখতে থাকে। যার মধ্যে সে দেখতে পায় জনসমুদ্রের জোয়ার, যা আর নেই এ পৃথিবীতে।
মেরি: এর পুরোটাই এখন স্পষ্ট আমার কাছে।
ড্যানিল: আপনি বলেছেন যে। আপনার লেখালেখি শুরু এটা ভেবে যে আপনি যেন মেঘের মধ্যে কল্পনার প্রাসাদ গড়তে চলেছেন। আপনি কি মনে করেন আধুনিক যুগেও এটা প্রযোজ্য? মানে আমোদ প্রমোদের যে নতুন রকম ধারণা তৈরি হয়েছে তাতে এই কল্পনার কি কোনও জায়গা আছে?
মেরি: আধুনিক বিনোদনের জগতে অবশ্যই কল্পনার একটা বড় ভূমিকা আছে। সেটা যে কোনও সৃষ্টিরই একটা সোপান। চলচ্চিত্রে দেখছি দুর্দান্ত সব দৃশ্যগত বিস্ময়। প্রাচীন পুরাণে পড়া অলৌকিক বিবরণগুলো আমাদের সামনে যেন জীবন্ত হয়ে রয়ে গেছে। তবে আমিও এখনও মনে করি আসল বিস্ময় রাখা আছে আমাদের মনের গহীনে যেখানে আমরা ওই সব কল্পনার দানবদের লুকিয়ে রাখি। আমরা যখন পড়ি বা লিখি ওই কল্পনার জীবদের নিয়ে, আমরা যেন তাদের দুনিয়াটা সৃষ্টি করি নতুন ভাবে।
ড্যানিল: মেরি শেলি, অসংখ্য ধন্যবাদ!
লেখকের অনুমতিক্রমে ইন্টারভিউটি অনূদিত এবং প্রকাশিত হল।
