যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল – সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল – সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

নেভাদা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র— ইউএস আর্মির গোপন এক বায়োকেমিকেল ল্যাব—

আজ অফিসে ঢুকতে কিছুটা দেরিই হয়ে গেল ডঃ ভি–এর। কিন্তু অফিসের মুখে এসেই শুনলেন দুঃসংবাদ!

“স্যার— খবরটা শুনেছেন?” সারাহ জিজ্ঞেস করল।

“না তো— কী হয়েছে? আর তুমি এখানে কেন?”, ডক্টর জিজ্ঞেস করলেন।

“স্যার, আজ সকালে ডঃ শিন মারা গেছেন। ল্যাবের L2B456V ভাইরাসের কালচারটা মনে হয় কোনও ভাবে খোলা ছিল। উনি সকালে ঢুকে ডিফ্রস্টার খুলতেই…”

ডক্টর মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। L2B456V হচ্ছে ডঃ ভি-এর আবিষ্কৃত ভাইরাসের মধ্যে অন্যতম ভয়ঙ্কর ভাইরাস। এটি কোনওভাবে রক্তে প্রবেশ করলে মৃত্যু অবধারিত। অবশ্য এই অত্যাধুনিক ল্যাবের সিস্টেমই এমন যে, কোনও ভাইরাস দুর্ঘটনাক্রমে ল্যাবে একবার ছড়িয়ে গেলে, নিমেষের মধ্যে ল্যাব বাইরে থেকে এয়ারটাইট হয়ে কোয়ারেণ্টাইনের সিগন্যাল দিতে শুরু করে— যাতে বাইরের খোলা বাতাসে বা নিদেন পক্ষে অন্য ঘরেও যেন সেই ভাইরাসের প্রবেশ না ঘটে!

“ডঃ শিন প্রিকশন নেননি?” ডঃ ভি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হাউ কুড এ পারসন বি সো ইরেসপনসেবল? পইপই করে আমি বলে দিয়েছি— তবুও এই হাল!”

সারাহ মাথা নাড়ল। ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, কালরাতে ডঃ শিন একবার ল্যাবে ঢুকেছিলেন। আধঘণ্টার মধ্যেই বেরিয়ে যান। এবং আজ সকালে এসেছিলেন আবার। তখনই এই দুর্ঘটনা!

ডঃ ভি-কে কেমন একটা অসহায় দেখাল! এই সময় হার্বাটও পাশে নেই। ছেলেটা কাছে থাকলে একটু নিশ্চিন্ত হওয়া যেত।

ডঃ ভি হার্বাটকে ফোন লাগালেন, “বিটল, খবর পেয়েছ? ডঃ শিন মারা গেছেন।”

ওপাশ থেকে ফ্লাইটে অ্যানাউন্সমেন্টের আওয়াজের সঙ্গে ভেসে এল ডঃ হার্বাটের উৎকণ্ঠা, “কী হল?”

পুরো ঘটনা বলে ডঃ ভি জিজ্ঞেস করলেন, “ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না হার্বাট। তুমি পাশে থাকলে নিশ্চিন্ত হতুম।”

“আমিও প্রফেসর। কিন্তু আমার আন্ট-এর এখন-তখন অবস্থা। আমি নেমে ফোন করছি।” হার্বাটের গলা শোনা গেল।

ফোনটা ছাড়ার পর হার্বাট কিছুক্ষণ দাঁত চেপে রইল। তারপর অন্য একটা ফোন বের করে একটা স্পেশাল নাম্বারে ফোন লাগাল।

“প্যাকেজেস আর অন দ্য ওয়ে। পুরো ব্যাপারটা ছকে ফেলেছি। একটা ব্রিফিং লাগবে। অ্যারাইভিং টুমরো।”

ইমিগ্রেশনে নিজের নাম সই করল— “ডঃ হার্বাট ওয়েস্ট”- ডেসটিনেশন – কলকাতা, ইন্ডিয়া।”

***

জ্বর আর সর্দিটা কিছুতেই কমছিল না রুক্মিনীর।

বেশ ক’দিন ধরেই ভোগাচ্ছে জ্বরটা। নভেম্বরের মুখে ওয়েদার চেঞ্জের জন্য এমন বিচ্ছিরি মুশকিল পড়ে যাবে সেটা কে জানত। পরশুই অফিসে প্রেজেন্টেশন্টা আছে, এদিকে কিচ্ছু করতে ইচ্ছে করছে না তার! জ্বালা হল দেখি!

মা পইপই করে বলেছিল বৃষ্টিতে ভিজিস না। কিন্তু বৃষ্টি হলেই যেন রুক্মিনী কীরকম একটা হয়ে যায়। ছোটবেলায় তার বাবা এই অভ্যেসটা তাকে ধরিয়েছিল। এখন বাবা তো নেই— কিন্তু অভ্যেসটা রয়ে গেছে। সেদিন অসময়ের বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ইচ্ছে করছিল তার। কিন্তু অফিসে কনফারেন্স ছিল— শাড়ি পরে বেরিয়ে তো ভেজা যায় না, তাই বাড়িতে এসে কোনওমতে ব্যাগটা রেখেই ছুটে গিয়েছিল ছাদে— মনের সুখে গায়ে লেপ্টে নিয়েছিল ঠান্ডা জলের চাদর!

জ্বরটা আসার পর দু-চারটে বাজার চলতি ওষুধ খেয়ে দেখেছে রুক্মিনী। কিন্তু কিছুতেই কমছে না জ্বরটা। মা বলে ভাল্লুকে জ্বর— ভাল্লুক যেমন মধু খাবার জন্য একই জায়গায় বারবার ফিরে ফিরে আসে, সেরকমই নাকি এই জ্বরটাও ঘুরে ফিরে আসছে। যেন প্রেমে পড়ে গেছে রুক্মিনীর।

দশ দিনেও যখন ব্যাপারটার নিস্পত্তি হল না, তখন ডাক্তার দেখানোই ঠিক করল রুক্মিনী। পারতপক্ষে সে ডাক্তারদের এড়িয়েই চলে, কিন্তু এখন কিছু করার নেই। ডাঃ মিত্র ওকে ভালো করে দেখে সামান্য কিছু ওষুধ দিলেন, বললেন হপ্তাখানেকের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা না করতে, আর বেশি করে ফল-মূল খেতে।

রবিবার সকাল থেকে ফলেরই শ্রাদ্ধ করছে রুক্মিনী। পেয়ারা, কমলা, কলা সবই এক এক করে শেষ করছে। কিন্তু তা-ও মাথাটা বড্ড ভার লাগছে তার। ল্যাপটপ খুলে দুনিয়ার এক্সেল শিটে মন বসাতে পারছিল না সে আর কিছুতেই। বিরক্তিকর! অফিসে এত কাজ দেয় কেন? এদিকে এইচআর সারাজীবন ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্সের বুলি শুনিয়ে গেল— মাই ফুট! শালা রবিবারেও নিস্তার নেই! নিজের মনে গজগজ করতে করতে কাজ করে যাচ্ছিল রুক্মিনী।

মাথাটা যেন আরও ভার হয়ে আসছে— গলাটাও কেমন ব্যথা ব্যথা করছে! সে তো ছোটবেলা থেকে বৃষ্টিতে ভিজে আসছে, এরকম তো কখনও হয়নি! আশ্চর্য! শরীরে যে কখন কী হয়!

শাম্বটাও যে এই সময়ে কোথায় চলে গেল তার ঠিক নেই। শরীরে কষ্ট হলে, 
মন ভীষণ ভাবে নিজের মানুষদের কাছে থাকতে চাইতে থাকে। আর ছাগলটা এই সময়েই ট্রেকিং করতে গেল, তা-ও সান্দাকফু-তে। ফোনে পাওয়া যায় না, ইন্টারনেট তো দুরস্ত! মনটা খারাপ হয়ে গেল রুক্মিনীর।

ফেসবুক ঘাঁটতে ঘাঁটতে নিজের পেন্ডিং ফ্রেন্ডলিস্টটা চেক করছিল সে। হঠাৎ দেখতে পেল, একটা অদ্ভুত আইডি থেকে রিকোয়েস্ট এসেছে। কুইক রেমেডি বলে কেউ একজন তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। মাথাটা বেশ যন্ত্রণা করছে তার, তিন-চারবার বিকট শব্দ করে হেঁচেছে একটু আগেও। মা এসে ধাতানি দিয়ে গেছে এই শরীরে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকার জন্য। কী মনে করে রুক্মিনী অ্যাকসেপ্ট করে নিল রিকোয়েস্টটা।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পিং শব্দ হল ম্যাসেঞ্জারে।

“ফিলিং ডাউন অ্যান্ড আউট?”

কী করে বুঝল? রুক্মিনী জিজ্ঞেস করল “কে তুমি?”

প্রশ্নটা উপেক্ষা করে পাল্টা প্রশ্ন এল,

“শরীর খারাপ লাগছে?”

ঠোঁটটা কামড়ে রুক্মিনী লিখল, “হ্যাঁ, জ্বর হয়েছে। কিন্তু কে তুমি? তুমি কেমন করে জানলে শরীর খারাপ?”

উত্তর এল, “আমরা কুইক রেমেডি। জ্বর-সর্দির জন্য আমাদের কোম্পানি একটা অব্যর্থ ওষুধ বের করেছে। ট্রাই করতে চাও?”

পিত্তি জ্বলে গেল রুক্মিনীর— যত্তসব! কেউ অ্যাডের জন্য প্রোফাইল বানিয়ে রেখেছে। ভালো লাগে না— ফেসবুকটা দিনকে দিন অসহ্য হয়ে উঠছে। মোবাইলটা হাতে থেকে রেখে দিতে যাবে, আবার পিং…

“যদি চাও তো তোমাকে স্যাম্পেল পাঠিয়ে দেখতে পারি। তোমার ঠিকানা জানাও— একদিনে রেমেডি।”

কিছুক্ষণ চুপ করে রইল রুক্মিনী। দোলাচলে দুলতে থাকল কিছুক্ষণ। ক’দিন আগে ডাঃ মিত্রকে দেখিয়েছে— কিন্তু তাঁর ওষুধে শারীরিক অবস্থার বিশেষ কোনও উন্নতি হয়নি। ডঃ মিত্র ডায়াগনোজ করে সাধারণ জ্বরের থেকে বেশি কিছুই বলেননি। জ্বরও যে খুব বেশি আছে তা নয়— সাধারণ ঘুষঘুষে জ্বর কিন্তু সর্দি এবং শারীরিক অস্বস্তি প্রবল।

রুক্মিনী সরাসরি নিজের ঠিকানা দিতে চাইল না। অনেক বদলোক আছে, যারা এইসব করে মেয়েদের ঠিকানা বাগাবার চেষ্টায় থাকে। তারপর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত স্টক করবে। এ অভিজ্ঞতা রুক্মিনীর এই সাতাশ বছরের জীবনে কম হল না। তাকে দেখতে সুশ্রী, শান্ত স্বভাব। পাড়ার দিক দিয়ে সেরকম কোনও অসভ্যতা না হলেও, কিছু উড়োলোকের টার্গেট সে বহু দিন ধরেই ছিল। তারা অফিস থেকে তাকে মাঝে মাঝে ফলো করত। অনেক কষ্টে সে এসব পশুগুলোর খপ্পর থেকে বাঁচতে পেরেছে। এ হয়তো এরকমই কেউ। বেশ ক’দিন ধরে তাকে ফলো করেছে। বুঝতে পেরেছে তার শরীর খারাপ। তাই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে কায়দা করে তার বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইছে। হুঁ হুঁ, রুক্মিনীও কম ধড়িবাজ নয় হে চাঁদু। ভাবতে ভাবতে চট করে তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। মামার ঠিকানাটা দিলে কেমন হয়? মামা অর্থাৎ মিঃ অমর সরকার, বালিগঞ্জ থানার ইন্সপেক্টর। এরা যদি কিছু ডেলিভারি দেয়, তাহলে তার মামার বাড়িতেই দিক। কেউ বেগড়বাঁই করলে মামা তাকে সোজা লক আপে চালান করে দেবে— উফফ, হেব্বি মজা হবে। যদি সত্যি কিছু ডেলিভারি হয়, তাহলে কাল অফিস থেকে ফেরার সময় মামির থেকে ওষুধটা নিলেই চলবে।

যেমন ভাবা তেমনি কাজ— চটপট মামার বাড়ির অ্যাড্রেসটা দিয়ে কুইক রেমেডিকে পাঠিয়ে দিল সে। নীল একটা ডট হয়ে রয়ে গেল সেটা— অর্থাৎ ম্যাসেজ চলে গেছে, কিন্তু প্রাপক পড়েনি। যাগ গে যাক, তার এখন অনেক কাজ আছে। আপাতত দুপুরে চান খাওয়া করে একটু গড়িয়ে নিলে যদি বিকেলের দিকে অস্বস্তিটা একটু কমে, সে চেষ্টাই করতে হবে রুক্মিনীকে।

রাতের দিকে সে খেয়াল করল, ম্যাসেজটা রিড হয়েছে, কিন্তু আর কোনও জবাব আসেনি।

***

দিন পনেরো আগেঃ- কলকাতা

“ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া- সিকিওরড লাইনেরও পাশ থেকে উচ্ছ্বাস ভেসে এল। কিন্তু আমার দু-চারটে প্রশ্ন আছে।” মিঃ আলি বলে উঠলেন, “আমি জানি আপনি কী জিজ্ঞেস করতে পারেন। তবুও, বলে যান। একে একে উত্তর দিচ্ছি।”

“যা বললে তা তো অবিশ্বাস্য— কিন্তু তাই যদি হয়, তাহলে এত ঝামেলা করার দরকার কী? ভাইরাসটা বাতাসে ছেড়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যেত।”

“নাঃ— আপনি হয়তো জানেন না— রোগটা মহামারীর আকার নিলে, ভাইরাসের অ্যান্টিডোট বের করতে বেশি সময় লাগবে না। সরকার সতর্ক হয়ে যাবে— আমাদের প্ল্যান ভেস্তে যাবে। তাই ধীরে চলাই শ্রেয়। তা ছাড়া এটা একটা

স্পেশাল টাইপ— বাতাসে ছেড়ে দিয়ে হয় না।”

“আর এলিক্সির! সেটা কী করে খাওয়াবে?”

“সেটা আমার আলাদা প্ল্যান আছে— লোকে যেচে খাবে। আপনি কেবল ড্রোনটার ব্যবস্থা করুন। বাকিটা আমার ওপর ছেড়ে দিন।” মিঃ আলি বললেন।

“ওকে, বাট হোয়াই কলকাতা? উই হ্যাভ ফার রিচ প্লেসেস টু অ্যাটাক!”

“এটা পার্সোনাল অ্যাজেন্ডা স্যার। ধরে নিন এটা একটা পাইলট প্রজেক্ট। সফল হলে নেক্সট টার্গেট আপনার চয়েস হিসেবেই হবে।” ফোনের ও প্রান্তের গলাটা কঠিন হয়ে এল, “বিধর্মী, কাফেরগুলোকে শিক্ষা দিতে হবে। ইসলামের জয় চাই! মিসির— তুমি ব্যবস্থা করো।”

আলি মুচকি হাসলেন, “চিন্তা করবেন না। এ একেবারে ফুলপ্রুফ প্ল্যান।”

***

অফিসে আজ খুব একটা ভালো দিন যায়নি রুক্মিনীর। শরীরটা বেশ খারাপ লাগছে। চাপা একটা বিচ্ছিরি অস্বস্তি তাকে কিছুতেই কাজে মন বসাতে দিচ্ছে না। সহেলীকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল, “ওসব ছাইপাঁশ অ্যালোপাথি গিলিস কেন? হোমিওপ্যাথি খা। দেখবি চট করে সেরে যাবে। নির্মূল হয়ে যাবে জিনিসটা।” হোমিওপ্যাথের ওপর বিন্দুমাত্র ভরসা নেই রুক্মিনীর। ও নিজে পড়েছে, ওটা সিউডো-মেডিসিন। মানে মেডিসিনের মতো দেখতে, কিন্তু কিছুতেই ওষুধ নয়। কিন্তু ঠেলায় পড়লে বাঘেও ঘাস খায়। অফিসে বসে ধ্যাতানি খেয়ে তার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। আরে মশাই, শরীর খারাপ হলে সে কী করবে?

“মিস সেন, আপনার কি শরীর খারাপ? তাহলে অফিস এসেছেন কেন? রেস্ট নিন।”

“স্যার তাই নিতাম, কিন্তু পরশুর প্রেজেন্টেশনটার জন্য কিছু কাজ ছিল।” রুক্মিনী ধাতস্থ হবার চেষ্টা করে।

“ওসব দেখা যাবে, কাল ছুটি নিন। না হলে যা অবস্থা দেখছি, পরশু পাক্কা ধ্যাড়াবেন। ডাক্তার দেখিয়েছেন?”

রুক্মিনীকে তার শরীর খারাপের কাহিনি বিশদে বলতে হয়। বস শুনে চুকচুক করে মাথা নাড়েন, “শরীরের প্রতি যত্ন নিন, বুঝলেন? খালি সারা দিন ফোন আর ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকলে চলবে কেন? এই দেখুন আমি রোজ সকালে এক ঘণ্টা জগিং করি, বাড়ি ফিরে ঘণ্টাখানেক সুইমিং করি। আমার শরীরে কখনও কোনও ক্লান্তি বা কষ্ট দেখেছেন? এই শরীরকে অবহেলা করবেন না। বুঝতে পারছি, আপনার ইমিউনিটি কমে গেছে।…”

উপদেশামৃত পান করে ধ্বস্ত রুক্মিনী অফিস থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরল।

“কোথায় যাবেন দিদিভাই?”

“শোভাবাজার, পাওয়ারহাউসের দিকে।”

“পঞ্চাশ টাকা বেশি লাগবে।”

কটমট করে ট্যাক্সিওয়ালাটার দিকে একবার তাকিয়ে রুক্মিনী ট্যাক্সিতে উঠে

পড়ল। “তোমাদেরই বাজার, চলো।”

ট্যাক্সিতে উঠে শাম্বকে দু’বার ফোন করতে চেষ্টা করল রুক্মিনী— ফোন নট রিচেবেল। শালা, অদ্ভুত ছেলে তো! কাল থেকে একটাও ফোন নেই, না কোনও মেসেজ! আসুক এবার, ফোন করুক। এইসব ছেলেদের স্বভাব এক-একটু পাত্তা দাও কি মাথায় চড়ে বসবে! ক’দিন আগে কি পেছন-পেছন ঘোরা, লাঞ্চ করা, কফিশপে বসা নিয়ে কত বায়ানাক্কা! আর যখনই ছেলেটার ওপর একটু দুর্বল হতে শুরু করেছে রুক্মিনী, তখনই এমন গা-ছাড়া ভাব দেখাচ্ছে শাম্ব, যেন ওর কিছু এসে যায় না। মাথাটা দুম করে গরম হয়ে গেল রুক্মিনীর।

মা-কে একটা ফোন করার জন্য ফোনটা তুলতে যাবে রুক্মিনী, তখনি মামিমার ফোন ঢুকল।

“হ্যাঁ মামি বলো, আমি তো তোমার কাছেই যাচ্ছি।”

“আচ্ছা আয়— তোর নামে একটা পার্শেল এসেছে রে। তোর নাম লেখা। তুই কি কাউকে আমাদের বাড়ির অ্যাড্রেস দিয়েছিলি?”

ইসসস-খুব ভুল হয়ে গেছে। ব্যাপারটা মামিমাকে জানানো উচিত ছিল। “সরি মামি। কী এসেছে গো?”

“কে জানে কী এসেছে। লেটার বক্সটা খুলতে গিয়ে দেখি এটা পড়ে আছে। তুই আয়, এলে দেব।”

লেটারবক্স? এ আবার কী! আজকাল লেটারবক্সে কেউ ডেলিভারি দেয় নাকি! এ আবার কেমন ধারা কোম্পানি রে বাবা!

মা-কে ফোন করে মামার বাড়ি যাচ্ছে বলে জানিয়ে দিল রুক্মিনী। শরীরটা বড্ড ম্যাজমাজ করছে আবার!

মামি যখন তার হাতে প্যাকেটটা তুলে দিল, তখন সে অবাক হয়ে গেল। সাধারণ কাগজের প্যাকেট। প্যাকেটের উপরে তার নাম লেখা। খুব সন্তর্পণে প্যাকেটটা ছিঁড়ে নিল সে। প্যাকেটের ভেতর থেকে বেরলো একটা ছোট্ট শিশি— তাতে কুইক রেমেডির একটা লোগো আঁটা আর লেখা “এলিক্সির”— যে লোগোটা সে ম্যাসেঞ্জারের দেখেছে, ঠিক সেইরকমই। শিশির সঙ্গে একটা ফিডব্যাক শিটের মতো, ওষুধ খেয়ে কী কী উন্নতি হচ্ছে, সেগুলোতে টিক মারতে হবে।

ওষুধটা খেতে ঠিক ভরসা পেল না রুক্মিনী।

সে তো মজা করেই অ্যাড্রেস দিয়েছিল, এ যে সত্যি সত্যি চলে আসবে সেটা রুক্মিনী আশাই করেনি। ডাক্তার না দেখিয়ে দুমদাম ওষুধ খাওয়া যায় না। ডঃ মিত্র বলেছিলেন, একবার ব্লাড টেস্ট করাতে। সকালেই ঝন্টিদা এসে রক্ত নিয়ে গেছে। রাতের বেলা হয় তো রিপোর্ট দেবে। কী যে হচ্ছে তার সঙ্গে কে জানে।

ওষুধের শিশিটা ব্যাগে পুরে রাতের দিকে মামার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল সে। মামার ফিরতে রোজই রাত হয়— পুলিশের চাকরি। পুরো থানার দায়িত্ব ঘাড়ে। সবে সবে পুজো মিটেছে— তাই মামাকে এখন নাকি প্রতিদিনই ওভার টাইম করতে হচ্ছে। মামা-মামির এক ছেলে। অনিদা কর্মসূত্রে ব্যাঙ্গালোরে থাকে। রুক্মিনী আর অনির্বাণ পিঠোপিঠি মামাতো ভাই-বোন।

বাড়ি ফিরতে ন’টা বেজে গেল রুক্মিনীর। কলিং বেল বাজাতে মা এসে দরজা খুলে দিল, “দ্যাখ কে এসে বসে আছে।”

বিরক্ত রুক্মিনী জুতো খুলতে খুলতে চাপা স্বরে মা’কে বলল – “আবার কে এল এত রাতে! বিরক্তিকর। শরীর ভালো নেই সেটা তুমি তো জানো মা। ফালতু কেন যে লোকজনকে ডাকো কে জানে।”

কিন্তু ঘরে ঢুকতেই তার শরীর যেন এক লহমায় ভালো হয়ে গেল। ডাইনিং টেবলে হাতে একটা চকোলেটের প্যাকেট নিয়ে হাসি-হাসিমুখে বসে আছে শাম্ব।

***

নেভাদা, ইউএস আর্মি গোপন বায়োকেমিক্যাল ল্যাবঃ

নেভাদায় রাতের আকাশ দেখার মতো। যেন কালো ক্যানভাসের প্রেক্ষাপটে কিছু জ্বলন্ত পুঁতি সাজিয়ে রেখেছে প্রকৃতি। সেদিকে তাকিয়ে ডক্টরের রোজই অন্যরকম লাগে। সারাদিন ল্যাবে কেমিক্যাল কম্পাউন্ডস, নানা ক্যালকুলেশনসের মধ্যে থাকতে থাকতে ক্লান্ত ডক্টরের এই একমাত্র ব্রেক। কিন্তু সেদিকে তাকিয়েও ডক্টরের মাথায় হাজারো চিন্তা। হার্বাট সেদিনের পর আর ফোন করেনি। ফোন প্রতিবারই সুইচড অফ বলেছে। ছেলেটা এভাবে তো কোনওদিন গায়েব হয়ে যায়নি। হলটা কী?

এদিকে সিআইএ ডঃ শিনের বাড়িতে হানা দিয়ে কিছু চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছে। ডঃ শিন নাকি আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে ঘৃণ্য আতঙ্কবাদী দল আইএস-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অন্তত তাঁর বাড়ি থেকে পাওয়া নথি এ কথাই বলছে। ডক্টর ভেবে পান না—কীভাবে এত সিকিয়োরিটির বেড়াজাল এড়িয়ে এইসব লোক তাঁর টিমে এসে ঢুকল। ডঃ রিচার্ড শিনকে তো বেশ ভালো মানুষ মনে হতো, সে যে ভেতরে ভেতরে কিছু ষড়যন্ত্র করছে তা কে জানত!

“স্যার…” সারাহ-র গলা পেয়ে ডক্টর চমকে উঠলেন। মেয়েটা যেন খালি দুঃসংবাদই বহন করে আনছে।

“আবার কী হল?” ডক্টর জিজ্ঞেস করলেন।

“স্যার- H1N5RR678 ভাইরাসের কালচার গায়েব। আজ সব কালচারগুলো সাজাতে গিয়ে দেখতে পেলাম।”

“সে কী! ওটা আবার কে নিয়ে গেল?” ডক্টর প্রচণ্ড অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

“জানি না স্যার— আরও একটা গণ্ডগোল লাগছে। এলিক্সির-এর মূল ভায়ালটাও উধাও।” তারার আবছা আলোয় সারাহ-এর চোখে মুখের আতঙ্ক স্পষ্ট বুঝতে পারলেন ডক্টর ভি।

“হোয়াট!” প্রচণ্ড চমকে উঠে ডক্টর ছুটলেন তাঁর ল্যাবে। এটা সম্ভব নয়। ওটা তাঁর প্রাইভেট কেবিনের ভেতর স্পেশাল রেফ্রিজারেটারে ছিল। আর তার কম্বিনেশন কেবল জানেন তিনি এবং…

এবং ডঃ হার্বাট ওয়েস্ট।

***

“তুই? এত রাতে? তোর ফোন তো নট রিচেবেল।” রুক্মিনীর গলা থেকে খুশি উপচে পড়ল যেন।

“হে হে— ইচ্ছে করে রেখেছিলাম। যাতে তুই হেভি রাগ করে বাড়ি ফিরিস। তোর শালা বাড়ি ফেরার নাম নেই! সেই কখন থেকে বসে আছি জানিস? নে নে, চকোলেটটা খেয়ে ফেল। দারুণ জিনিস— সন্তুদা আমেরিকা থেকে এনেছে।” শাম্ব এক গাল হেসে বলল। সন্তু শাম্বর পিসতুতো দাদা। আইটিতে চাকরি করে, সেই সূত্রে আমেরিকাবাসী। হ্যালির ধুমকেতুর মতো ঠিক নিয়ম করে পাঁচ বছরে একবার বাড়ি ফেরে মাসখানেকের জন্য— আর তখন বাড়ির লোকেদের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসে।

রুক্মিনী গভীর চোখে শাম্বর দিকে তাকাল। ছেলেটাকে আজ খুব সুন্দর দেখতে লাগছে। রংটা আরও ফরসা হয়েছে। গালগুলো পাকা আপেলের মতো রক্তাভ হয়ে আছে। বেশ লাগছে আজ ওকে।

মা ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শাম্ব, আজ খেয়ে যেও বাবা। মাটন বানিয়েছি। তোমার তো খুব পছন্দ।”

শাম্ব এক গাল হেসে বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ কাকিমা, নিশ্চয়। খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছে।”

শাম্বর পেটে কনুই এর হালকা গুঁতো মেরে রুক্মিনী বলল, “পেটুক কোথাকার।”

শাম্ব রুক্মিনীর আগের অফিসের কলিগ। প্রথম দিন থেকেই ছেলেটাকে বেশ লাগত রুক্মিনীর। সৎ, কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান, মিতভাষী ছেলেটিরও রুক্মিনীকে ভালো লেগেছিল। রুক্মিনী অবিশ্যি চুপচাপ মেয়ে। সে শাম্বকে অফিসে সারাদিন দেখলেও কাছে যাওয়ার চেষ্টা কোনওদিন করেনি। যতদিন তারা এক অফিসে ছিল, নিপুণভাবে অফিস ডেকোরাম মেনে চলেছে। একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হলেও, কেউ কাউকে কিছু জানতে দেয়নি।

রুক্মিনী অফিস ছাড়ার পর থেকেই শাম্ব ওকে ফোন করত। ওর সঙ্গে দেখা করতে চাইত। রুক্মিনীরও ভালো লাগত না শাম্বকে না দেখে। ব্যাপারটা যেন অনেকটা অভ্যাসে পরিণত হয়েগিয়েছিল। অভ্যেস যে কখন নিঃশব্দে ভালোবাসায় পরিণতি পেল, সেটা দু’জনের কেউই বুঝতে পারেনি।

রুক্মিনির ঘরে বসে শাম্ব বলল, “তোর শরীর খারাপ নাকি রুমি? মুখটা এত শুকনো কেন?”

রুক্মিনি কিছু বলার আগেই, মা বলে উঠলেন, “দ্যাখো না বাবা, তুমি যবে থেকে গেছো, তারপর দিন থেকেই কীরকম শরীর খারাপ করে বসে আছে। খাওয়া দাওয়া শিকেয় উঠেছে। জ্বর-জারি নিয়ে বড্ড ভুগছে রুকু।”

রুক্মিনী মায়ের প্রতি দাঁত কিড়মিড় করল— উফফ, সব ব্যাপারে শাম্বর ঝোল টানার দরকার কী আছে? মা আর বদলাল না।

শাম্ব ছদ্ম-সিরিয়াসনেসে ফিসিফিসিয়ে বলল, “কীরে রুমি! আমার বিরহে জ্বর এসে গেল?”

রুক্মিনী বলল, “বিরহ না ছাই! কিন্তু ব্যাপারটা আমার ভালো ঠেকছে না। মা, আমার ব্লাড রিপোর্টটা দিয়ে গেছে ঝন্টিদা?”

“হ্যাঁ রে, দিয়ে গেছে। দ্যাখ তোর ঘরের টেবিলের ওপর রাখা আছে।”

শাম্ব ব্লাড রিপোর্টটা ছোঁ মেরে টেনে নিয়ে মন দিয়ে দেখল। “আরে, এ তো সবই নেগেটিভ। ভয়ের তো কিছুই নেই।”

রুক্মিনী থম মেরে কিছুক্ষণ বসে রইল। তার মাথায় এবার সত্যিই সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। ব্লাড রিপোর্ট কিছু বলছে না, কোথাও কিছু নেই, কিন্তু গত দশ দিন ধরে তার জ্বর সারে না কেন?

শাম্ব রুক্মিনীর হাত ধরল। রুক্মিনী বুঝতে পারল, শাম্বর হাত বেশ ঠান্ডা— তবে কি তার জ্বর আসছে? “দ্যাখ রুমি”, শাম্ব খুব ঘন হয়ে এল, “তোর কিছু হয়নি। তুই সেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলি নির্ঘাত? সেখান থেকেই ঠান্ডা লেগে হয়েছে এটা। আমারও হয়েছিল এরকমই— কিছুতেই সারছিল না। তারপর একটা অদ্ভুত ওষুধে পুরোপুরি সেরে গেল। আমি জানতাম না, তোর এই কেস হয়েছে— তা হলে আমি নিয়ে আসতাম।”

রুক্মিনী আন্দাজে ঢিল ছুড়ল, “কী ওষুধ? এলিক্সির?”

শাম্ব রুক্মিনীকে ছেড়ে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর দিকে। “তোকে কে বলল?”

রুক্মিনী শাম্বকে সব খুলে বলল। এতক্ষণ ব্যাপারটা কাউকে বলতে না পেরে তার পেট ফুলে উঠেছিল। বলে ফেলে এখন তার অনেক হালকা লাগছে।

শাম্ব চুপ করে রইল কিছুক্ষণ, “দ্যাখ রুমি— আমিও সেদিন ভিজেছিলাম

অফিস থেকে ফেরার পথে। শালা দিব্যি ফুরফুরে ওয়েদারে বৃষ্টি নামবে কি করে বুঝব বল? আর অদ্ভুতভাবে আমারও পরের দিন জ্বর এসেছিল। যাবার আগের দিন জ্বর এলে কেমন লাগে বল? যখন ক্রোসিন, কাঁড়িকাঁড়ি প্যারাসিটামলেও কোনও কাজ হল না, আমার কাছে কুইক রেমেডি যেন ভগবানের আশীর্বাদ হয়ে নেমে এল। আমার বাড়ির ঠিকানা দিলাম— বললাম আর্জেন্ট আছে। দেখি ঘণ্টাখানেক পর আমাদের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে কেউ একটা প্যাকেট রেখে গেছে— আমার নাম লেখা। খুলে দেখি ছোট একটা শিশি। তাতে বিভিন্ন ডোজ উল্লেখ করা আছে। ‘জয় মা’ বলে গলায় ঢেলে দিলাম। তারপর দ্যাখ, দিব্যি ট্রেক করে এসেছি, দুর্দান্ত ফিল করছি। তুই এত ভাবিস কেন সব ব্যাপারে? খেয়ে নে— দারুণ জিনিস। আমি তো ভাবছি সব্বাইকে রেকমেন্ড করব এবার ওষুধটা। জ্বর-সর্দির এর থেকে অব্যর্থ ওষুধ আমি জীবনে দেখিনি।”

রুক্মিনীর বুক থেকে যেন একটা ভার নেমে গেল। সে বলল, “বেশ আমিও খাব। তুই যখন বলছিস। চল, মা ডাকছে এখন খেয়ে নে।”

হঠাৎ শাম্ব উঠে দাঁড়িয়ে খুব অপ্রত্যাশিত একটা কাজ করে বসল। রুক্মিনীকে জড়িয়ে ধরল আচমকা। রুক্মিনীর গলায়, ঘাড়ে ঘষতে লাগল তার মুখ। রুক্মিনীর কাছে ব্যাপারটা এতটাই অদ্ভুত ছিল, যে সে প্রথমে শরীর টানটান করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজেকে সঁপে দিল শাম্বর বুকের ভেতর। কেমন যেন অদ্ভুত বন্যভাবে তাকে আঁকড়ে ধরেছে শাম্ব। রুক্মিনীর জীবনের এরকম অনুভূতি এই প্রথম, কিন্তু বেশ উপভোগ্য। মুখচোরা শাম্ব যে এতদূর পর্যন্ত বিনা আমন্ত্রণে এগোতে পারে, সেটা রুক্মিনী সত্যিই ভাবতে পারেনি।

মায়ের দ্বিতীয় ডাকটা কানে যেতেই রুক্মিনী এক ধাক্কায় শাম্বকে সরিয়ে দিল তার কাছ থেকে। কিন্তু ঘরের হালকা হলুদ আলোটা ওর মুখে পড়ে এক অদ্ভুত প্রতিচ্ছবি মুহূর্তের জন্য রুক্মিনীর চোখে ধরা পড়ল। আচমকা প্রত্যাখ্যাত শাম্ব’র মুখটা এত ক্রুর এবং নৃশংসভাবে কুঁচকে গেল, যে রুক্মিনী ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু সেটা এক মুহূর্তের জন্যই। যখন চোখ খুলল, তখন শাম্ব ঘর ছেড়ে চলে গেছে। রুক্মিনী বুক হালকা করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

খাবার টেবিলে বিশেষ কোনও কথা হল না। রুক্মিনীর মা একাই বকে গেলেন। রুক্মিনী কেবল তাকিয়ে রইল শাম্বর দিকে। কী পরিবর্তন এসেছে ছেলেটার মধ্যে— বাপরে! একটা ট্রেকে গিয়ে ছেলে তো পুরো লোক বনে গেছে। অন্য ধরনের একটা পার্সোনালিটি গ্রো করেছে— একটা ডমিনেটিং ব্যাপার, যেটা নিয়ে রুক্মিনী মনে মনে শাম্বকে কল্পনা করে এসেছে।

আর একটা ব্যাপার লক্ষ করল রুক্মিনী— শাম্বর খাওয়া অসম্ভব বেড়ে গেছে। নিজের মাংসের বাটি তো শেষ করলই, সঙ্গে সঙ্গে তার মাংসের বাটিটাও বেমালুম তুলে সাফ করে দিল। ছেলেটার সত্যি বেশ খিদেই পেয়েছিল বলতে হবে। অন্যদিন হলে এই নিয়ে দু’জনের মধ্যে কুরুক্ষেত্র বেধে যেত, কিন্তু আজ রুক্মিনীর শরীরটা একদম ভালো লাগছে না। তা ছাড়া শাম্বর প্রগলভ ব্যবহারও তাকে কিছুটা হতভম্ব করে দিয়েছে।

***

রাতে শোয়ার সময় ‘এলিক্সির’-এর শিশিটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখল রুক্মিনী। শিশির মাথার প্যাঁচটা বেশ অদ্ভুত। এত শিশি-বোতলের টুপি দেখেছে, এরকম ক্যাপ দেখেনি সে আগে কখনও। শিশির মধ্যেকার তরলটি স্বচ্ছ। এবং তার মধ্যে তিনটি বিভাজিকা আছে— সেগুলো কর্ক দিয়েও হতে পারে, বা অন্য কোনও বস্তু দিয়েও হতে পারে। এর অর্থ, তিনটে ডোজ যেভাবে বলা হয়েছে, সেভাবেই খেতে হবে। তার থেকে বেশি খাওয়া যাবে না। প্রথম ডোজ খাওয়ার পর হতে পারে প্রথম বিভাজিকাটি বেরিয়ে আসবে। তারপর দ্বিতীয়— একসঙ্গে পুরোটা যাতে না খাওয়া যায়, তাই এই ব্যবস্থা। বাহ্‌ কোম্পানির বুদ্ধি আছে বলতে হবে। রুক্মিনী চমৎকৃত হল।

খাওয়ার পর থেকেই তার মাথাটা ভীষণ দপদপ করছে। গলাটাও ব্যথা করছে বেশ। তবু সে একবার ল্যাপটপ খুলে বসল। টাইপ করল, ‘এলিক্সির’। প্রথমেই দেখতে পেল ‘এলিক্সির’ নামে একটা প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ আছে। তা ছাড়া, যে কোনও তরল মেডিসিন যার মধ্যে অসাধারণ কিছু নিরাময় ক্ষমতা থাকে, তাকে এলিক্সির বলে। কিন্তু মুশকিল হল, এই নামে কোনও ওষুধ মার্কেটে নেই। কুইক রেমেডি বলেও কোনও কোম্পানি সে খুঁজে পেল না। মহা মুশকিল— এ কি ভুঁইফোড় কোম্পানি নাকি! সকালে দেবাশিস দা’কে জিজ্ঞেস করতে হবে। দেবাশিসদা একটা নামী ওষুধ কোম্পানীর বেশ উঁচু পোস্টে চাকরি করেন। তাঁর পক্ষে অন্তত ওষুধের কোম্পানির খোঁজ রাখা সুবিধেজনক। মেসেঞ্জারে দেবাশিসদাকে ওষুধের শিশির ছবিসমেত একটা পুরো ইনফো দিয়ে রাখল সে।

রাতে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে রুক্মিনী বুঝতে পারল তার সাংঘাতিক জ্বর আসছে। উঠে দাঁড়ানোরও ক্ষমতা নেই। গলা থেকে আওয়াজ বেরোচ্ছে না, হাতও চলছে না। গলা শুকিয়ে কাঠ। মা’কে কোনওমতে ডাকতেই হবে যাতে ডঃ মিত্রকে খবর দেয়। এভাবে সে বাঁচবে কী করে! শরীরটা হাঁচড়-পাঁচড় করে রুক্মিনী বিছানায় উঠে বসল। জলের বোতলটা নিতে গিয়ে দেখল মাথার শিয়রে টেবিলের ওপর রাখা আছে ‘এলিক্সির’-এর শিশিটা। যা থাকে কপালে বলে প্লাস্টিকের কভারটা খুলে গলায় ঢেলে দিল প্রথম ডোজটা। তারপর শিশিটা টেবিলে রেখে কাত হয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়ে গেল সে— মাথার ওপর হালকা হলুদ আলোটা অন্ধকার হয়ে গেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

নেভাদা – আমেরিকাঃ

“সরি ডক” ইন্সপেক্টর মাথা নাড়লেন, “ডঃ শিনের ঘরে ওসব কিস্যু নেই।”

“আপনি ডবল চেক করেছেন ইন্সপেক্টর? ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুতর।” ডক্টর প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

ইন্সপেক্টর মনে মনে বেশ বিরক্ত হলেন। “দেখুন ডক, আমার কাজ আমি খুব ভালোভাবে জানি। আপনি যে ভায়াল বা কালচারের ছবি দেখিয়েছেন, সেরকম কিছুই ওঁর বাড়ি থেকে পাওয়া যায়নি। আপনি ভালো করে দেখুন— হয়তো ল্যাবেই কোথাও রেখেছেন। আমি জানি বিজ্ঞানীদের এরকম ভুলো মন থাকে।”

ডক্টর হতাশ হয়ে বসে রইলেন। একটা জিনিস কিছুতেই তিনি বুঝতে পারছেন না— ‘এলিক্সির’-এর সঙ্গে H1N5RR678 ভাইরাসের কালচার গায়েব হওয়ার কারণ কী?

ইন্সপেক্টর বেরিয়ে যাওয়ার পর তিনি অনেকক্ষণ মাথা টিপে বসে থাকলেন। রাতের খাবারও খেলেন না। সারাহ-কে বলে একটা ফ্লাস্কে ব্ল্যাক কফি দিয়ে যেতে বললেন।

সারা রাত ল্যাবে ব্ল্যাক কফি এবং নেভাদার শান্ত বাতাসে দুটো চুরুটের ঘন ধোঁয়া বাতাসে মেশানোর পর ভোর রাতে বিদ্যুচ্চমকের মতো একটা মারাত্মক সম্ভাবনা তাঁর মাথায় খেলে গেল। হ্যাঁ, এটাই, এটা ছাড়া আর কোনও কারণ হতে পারে না।

তিনি বুঝে নিয়েছেন চোরের উদ্দেশ্য, বুঝে নিয়েছেন এর পেছনে রয়েছে এক অসাধারণ শয়তানি এবং ধুরন্ধর মস্তিষ্ক। তিনিও কম যান না, কিন্তু এখন তাঁকে জানতে হবে, চোর সেটা কবে এবং কোথায় অ্যপ্লাই করেছে।

এবং চোরটা ঠিক কে!

ঘুম ভেঙে যখন উঠে বসল রুক্মিনী তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। যাকগে, আজ অফিস যাওয়ার তাড়া নেই। বিছানায় উঠে বসেই সে অনুভব করল, তার গায়ের ব্যথা, জ্বর সব গায়েব হয়ে গেছে। শরীরটা একদম নতুন লাগছে— এতটা সুস্থ সে বহু দিন ফিল করেনি। তড়াক করে লাফিয়ে নেমে সে বাথরুম সেরে নিল। তারপর ঘড়ি দেখল প্রায় দশটা বাজে। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে তার। বেশ বেশ, এই তো সুস্থ তার লক্ষণ। মাকে হাঁকডাক করে ব্রেকফাস্ট বানাতে বলল রুক্মিনী। অফিসে আজ সে যাবেই— যতই দেরি হোক। ওই সবজান্তা বসকে দেখিয়ে দেবে, সুস্থ সে-ও থাকতে পারে।

তিন-তিনটে অমলেট গলাধঃকরণ করে যখন সে প্রায় দৌড়ে বাসে গিয়ে উঠল তখন তার শরীর চনমন করছে। অফিসে সারা দিন সে প্রচুর ধকল নিল, প্রেজেন্টেশন বানাল— দু-চারটে ভেন্ডর মিট করল। অফিসের বাইরে গিয়েও চারটে মিটিং করে এল। সহেলি বলল, “তোর হল কী রে? হোমিওপ্যাথি খেয়েছিস নাকি? কাল তো দেখলাম লটকে আছিস— আজই এত চাঙ্গা?”

রুক্মিনী মুচকি হাসল, “খেয়েছি রে পাগলি, তবে হুমো পাখি না, এলিক্সির।”

“এলিক্সির? মানে অমৃত?” সহেলি হাঁ করে চেয়ে রইল।

অমৃতই বটে, রুক্মিনী ভাবল। সত্যি ওষুধটার ক্ষমতা আছে বলতে হবে।

তার খিদেও বেড়েছে বেশ। দুপুরে জমিয়ে লাঞ্চ করল অফিসের ক্যান্টিনে। তারপর বিকেলে নীচে নেমে পাঁচটা বিস্কুট সমেত দু-কাপ চা। নাহ্, এতদিনের বুভুক্ষু পাকস্থলী যেন সুদে-আসলে সব উশুল করে নিতে চাইছে তার থেকে।

বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় দেবাশিসের ফোন।

“কিরে, ওই ওষুধের ব্যাপারে কী লিখেছিলি কাল? কোথায় পেলি ওটা?” দেবাশিসের গলায় উত্তেজনা।

“কেন গো? কোনও সমস্যা?”

“আমি এখুনি তোর বাড়ি আসছি। তুই ফিরছিস কখন?” দেবাশিসের গলায় স্পষ্ট উৎকন্ঠা।

“এই একঘণ্টা পরে, কী ব্যাপার বল তো, কী হয়েছে?” রুক্মিনী এবার একটু সতর্ক হল।

“দেখা হলে বলব। আর একটা কথা, ওষুধটা এখন খাস না।” বলেই ফোনটা কেটে দিল দেবাশিস। রুক্মিনীর জবাবের তোয়াক্কা না করেই।

সারা বাসটা চিন্তামগ্ন হয়ে কাটল রুক্মিনীর। বাড়ি ফিরে দেখল দেবাশিস বসে বসে চা খাচ্ছে।

সে সামনে দাঁড়াতেই দেবাশিস তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ঘরের ভেতর। বিছানায় বসে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় পেয়েছিস ওষুধটা?”

রুক্মিনী পুরো ইতিহাস দেবাশিসকে বলল। তবে এটা চেপে গেল যে সে একটা ডোজ খেয়ে ফেলেছে। আগে শোনাই যাক না কী বলতে চায় দেবাশিস।

“তোর ওষুধের খবরটা কাল রাতেই দেখেছি। তখন কিছু বুঝিনি। তবে কিছুটা বুঝেছি আজ বিকেলে। বুঝেই তোকে তড়িঘড়ি ফোন লাগিয়েছিলাম।’’ দেবাশিসের চোখ জ্বলজ্বল করছে।

“কী হয়েছে দেবাশিসদা? একটু খুলে বলবে?”

“ব্যাপারটা আমিও খুব ডিটেইলসে জানি না। তবে, আমাকে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়। ডাক্তারদের বোঝানোর জন্য, তাদের বিভিন্ন কোয়ারিজ থাকে, সেগুলোকে অ্যাড্রেস করতে হয়। অনেক এমআর পড়ে না, তারা ফাঁকিবাজি দেয়, ডাক্তারদের ঘুষ দেবার চেষ্টা করে ওষুধের বিক্রি বাড়ানোর জন্য, কিন্তু আমি সেই দলে পড়ি না।’’

রুক্মিনী জানে, দেবাশিসদার প্রতিটি কথা নির্জলা সত্যি। ভদ্রলোক তার দাদার বয়সি এবং তাকে নিজের বোনের মতো স্নেহ করেন। কাজের ক্ষেত্রে দেবাশিসদা অসম্ভব প্রফেশনাল এবং দুর্দান্ত স্মৃতিশক্তির অধিকারী। সে শুনেছে, আড়ালে দেবাশিসদাকে অনেকে ‘পাস না দেওয়া ডাক্তার’ বলেও ডাকে। অনেক ডাক্তারও নাকি দেবাশিসদার সামনে পড়ে নাজেহাল হয়েছেন, মেডিসিনে ওঁর স্ব-অর্জিত জ্ঞানের সামনে বাধ্য হয়েছেন নতজানু হতে।

“বহুদিন আগে, মানে প্রায় বছর পাঁচেক আগে আমাকে একবার জার্মানিতে যেতে হয়েছিল। মিউনিখে একটা ডাক্তারদের অধিবেশন ছিল। সেখানে একটা মেডিকেল জার্নালে আমি ‘এলিক্সির’ নামের একটা ওষুধের ব্যাপারে কিছু একটা পড়ি। আমি কাল সারারাত জার্নালটা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পেলাম না। সারা ইন্টারনেট তন্ন তন্ন করে খুঁজেও যখন কিছু পেলাম না, তখন ভাবলাম, একবার আমার কেবিনের ফাইলগুলো চেক করে দেখি। আমার প্রতিটা অধিবেশনের মিনিটস্‌, সেখানে পাওয়া জার্নাল আমি যত্ন করে তুলে রাখি আলাদা ফাইলে। সেখান থেকেই আজ সকালে জার্নালটা পেয়ে গেলাম। আর পড়ে রীতিমতো চমকে গেছিলাম।”

দেবাশিস একটু দম নিল, তারপর বলে চলল, “জার্নালে ডঃ ভি এবং ডঃ হার্বাট ওয়েস্ট নামধারী দুই গবেষক, ভি-এর পুরো নামোল্লেখ পেলাম না, ‘এলিক্সির’ নামের একটা ওষুধের কথা লিখেছেন। সেটা নাকি তাঁরা মানুষের ওপর পরীক্ষা করে দুর্দান্ত সব ফল পেয়েছেন। কিন্তু এই ওষুধের মারাত্মক কিছু সাইড এফেক্টস আছে, যেটার জন্য তাঁরা আরও গবেষণা করতে চান। এর বেশি আর একটা শব্দও আমি সারা নেট ঘেঁটে পেলাম না। কিন্তু…” দেবাশিসদা একটু চুপ করে রইলেন, “আমার তখনই সন্দেহ হল, কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। তাই তোকে তখনি ফোন করে মানা করলাম। দ্যাখ আমি এটার সাইড-এফেক্টস বা এফেক্টস কিছুই জানি না। তবে এই নামে ওষুধ যে দোকানে বা আমাদের কোম্পানির ডেটাবেসে নেই, সেটা আমি ভেতর ভেতর খোঁজ নিয়ে জেনেছি। অন্য কোম্পানির থেকেও খবর নিয়েছি। তাই বলছিলাম ব্যাপারটা ডেঞ্জারাস হতে পারে। সাবধানে থাকিস।’’

ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে দেবাশিসদা কিন্তু কিন্তু করে একটা কথা বলে গেলেন, “আমি ওই জার্নালের পাবলিশারকে ফোন করেছিলাম। অথরদের কোনও কন্ট্যাক্ট ডিটেইলসের জন্য। ওরা আমাকে মেল আইডি দিল— তা-ও ডঃ ভি-এর। হার্বাট ওয়েস্টের কোনও আইডি ছিল না। আমি তোর মেসেঞ্জারের ফোটোটা দিয়ে একটা মেল পাঠিয়ে দিয়েছি। দেখি কী উত্তর দেয়।”

রুক্মিনীর মাথার ভেতর সব তালগোল পাকিয়ে গেছে। সে তড়িঘড়ি শাম্বকে ফোন করল, “তুই এখুনি একবার বাড়ি আয়।”

“আরে অফিসে মিটিং চলছে। মগের মুলুক নাকি! দাঁড়া রাতের দিকে যাব। এখন রাখছি।” শাম্ব ফোন ডিসকানেক্ট করে দিল।

রুক্মিনী ওষুধের ভায়ালটা ভালো করে চেক করল। প্রথম বিভাজিকাটি ক্ষয়ে

এসেছে কিছুটা। কাগজে লেখা আছে, যেদিন প্রথম বিভাজিকাটা পুরোপুরি ক্ষয়ে যাবে, সে দিনই দ্বিতীয় ডোজটা খেতে হবে। তার আগে নয়।

শাম্ব এল না সেই রাতে। ফোনও সুইচড্‌ অফ। রুক্মিনীর খুব একটা যে খারাপ লাগল তা-ও নয়।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে রুক্মিনী শুয়ে পড়ল। সেদিন রাতে সে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল।

চতুর্দিকে লাল রক্তের স্রোত বইছে। তার মধ্যে দিয়ে হাত ধরাধরি করে হেঁটে চলেছে সে আর শাম্ব। শাম্বর মুখটা যেন আপেল-রাঙা হয়ে উঠেছে। আহ্‌ ঠোঁটটা কী টকটকে লাল! রুক্মিনী শাম্বর কাছে আরও ঘন হতে চাইছে, আর তখনই তারা দেখতে পেল— রাস্তায় কয়েকটা নারী-পুরুষ উবু হয়ে বসে রয়েছে। কী যেন করছে তারা। শাম্ব এগিয়ে গেল তাদের কাছে। রুক্মিনীর বুক যেন কী একটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। সে চিৎকার করে মানা করল শাম্বকে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে, লোকগুলো ঘুরে দাঁড়িয়েছে তাদের দিকে। ওদের মুখ থেকে ঝরে পড়ছে টকটকে লাল রক্ত। যে মানবদেহটি রাস্তায় পড়ে রয়েছে— সেটি রুক্মিনীর মা-এর। সেই শরীর থেকেই এরা ছিঁড়ে নিচ্ছিল মাংসের দলা!

রুক্মিনী বিষম আতঙ্কে পাগলের মতো ছুট লাগাল। কিছু দূর গিয়ে সে যখন পিছন ফিরে চাইল, তখন দেখল শাম্বর কাটা মুন্ডুটা শুধু তার দিকে চেয়ে রয়েছে, তার ঠোঁটটা তখনও টকটকে লাল।

রুক্মিনী যখন প্রচণ্ড ভয়ে বিছানায় উঠে বসল, তখন তার শরীরটা ঘামে জবজব করছে।

***

নেভাদা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভোর সাড়ে ছটা।

হার্বাটকে ফোনটা করার জন্য সবেমাত্র ফোনটা খুলেছেন ডক্টর ভি— টুং করে একটা মেল ঢুকল তাঁর পুরানো মেল ইনবক্সে। ধ্যাত্তেরি এই অ্যাডের জন্যই তাঁর মেল খুলতে ইচ্ছে করে না। কতদিনে ভেবেছেন এই আইডিটা উড়িয়ে দেবেন বা নিদেনপক্ষে নোটিফিকেশন অব করে রাখবেন। রোজ ভুলে যান।

কিন্তু মেল বক্সটা খুলেই চমকে গেলেন তিনি। একটা মেল এসেছে— দেবাশিস বলে একজনের থেকে। ইন্ডিয়ান এবং কলকাতা বলে একটা জায়গা থেকে সে লিখছে। তাঁর আবিষ্কৃত ‘এলিক্সির’-এর ব্যাপারে বিশদে জানতে চেয়েছে। মেলটা বার বার পড়লেন ডঃ ভি। তাঁর যা বোঝার তিনি বুঝে নিয়েছেন। পুরো জিনিসটাই তাঁর কাছে এখন জলের মতো পরিষ্কার।

নিঃশব্দ কান্নায় ভেঙে পড়লেন ডক্টর। নিজের হাতে তৈরি পুত্রসম মানুষ যদি

তাঁকে এভাবে ধোঁকা দেয়, তা হলে তিনি কার কাছে যাবেন? হার্বাটকে তিনি নিজের হাতে গড়েছেন, নিজে কাজ শিখিয়েছেন। ‘এলিক্সির’ গায়েব হওয়ার পর তাঁর মনে একটা সন্দেহ এসেছিল বটে কিন্তু তা তিনি ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিলেন তৎক্ষণাৎ। কিন্তু এখন আর সন্দেহ নেই।

সারাদিন ডক্টর কারো সঙ্গে কথা বললেন না। বিকেলে সারাহ যখন কল পেয়ে ডক্টরের কেবিনে ভয়ে ভয়ে ঢুকল, তখন তাঁর চোয়াল শক্ত।

“সারাহ, কল দ্য টিম। আমাদের ভীষণ জরুরি কিছু কাজ করতে হবে। ক্যানসেল এভরিথিং ইউ আর ডুয়িং রাইট নাউ। আই ওয়ান্ট অল অব দেম হিয়ার অনলি।”

তিনি জানেন পৃথিবীর মানবসভ্যতা এখন ভয়ানক সঙ্কটে। কিন্তু তার আগে, কলকাতাকে বাঁচাতে হবে।

***

দেবাশিস দেখল সকালে তার মেলবক্সে একটা মেল এসেছে। যদিও সেটা জাঙ্কে পড়েছিল, কিন্তু জাঙ্কে মেল দেখার অভ্যেসটা সে অনেকদিন আগেই বানিয়েছে। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে, অনেক কাজের জিনিস জাঙ্কে পড়ে থাকে। কিন্তু সকালে মেলটা খুলে সে চমকে গেল। ডঃ ভি-এর থেকে এসেছে মেলটা।

কোথাও কিছু নেই, একটা নাম্বার দেওয়া আছে আর লেখা আছে— “কল মি।”

দিনের অ্যাপয়েনমেন্ট সেক্রেটারিকে ডেকে ক্যানসেল করে দিল দেবাশিস। তারপর ফোন করল ওই নাম্বারে। দু-বার রিং হতেই একটা কণ্ঠস্বর মার্কিন টোনে জিজ্ঞেস করল, “কাকে চাই?”

“ডঃ ভি আস্কড টু কল হিম। দিস ইজ দেবাশিস ফ্রম ইন্ডিয়া।”

“হি উইল কল ইউ ব্যাক।’’ এটা বলে বেশ অভদ্রভাবেই ফোনটা মুখের ওপর রেখে দিল লোকটা।

দেবাশিস কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আইএসডি ফোনটা রিং হতে শুরু করল। দেবাশিস ফোনটা তুলতেই ওপ্রান্ত থেকে একটা নরম ও মার্জিত কন্ঠস্বর বলে উঠল “অপেক্ষা করানোর জন্য দুঃখিত। লাইনটা সিকিওর করতে কিছুটা টাইম লাগল। বলুন কী জানতে চান।’’

দেবাশিস পুরো ব্যাপারটা খুলে বলল। ডক্টর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “আপনি আপনাদের পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে খবর দিন। মারাত্মক বিপদ আসতে চলেছে কলকাতার ওপর। পুলিশি সাহায্য ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারব না। আমেরিকান এমব্যাসিকে বলে পুলিশ চিফের সঙ্গে একটা মিটিং অ্যারেঞ্জ করাতে বলুন। যদি আমেরিকান এমব্যাসি পাত্তা না দিতে চায়, তাহলে বলবেন— প্রোজেক্ট আলফা-থ্রি, কোড রেড। মনে হয় এতেই কাজ হবে। পারলে কাজগুলো আজকেই করুন প্লিজ, সময় হাতে একদম নেই।”

আমেরিকান এমব্যাসিতে ফোন করে কোড বলতে চকিতে কাজ হল। ওরা তাকে বলল এক্ষুনি এসে দেখা করো। অফিস থেকে বেরিয়ে দেবাশিস সোজা চলে গেল এমব্যাসিতে। ওরা ততক্ষণে ফোন-টোন সব সেরে রেখেছে। দেবাশিস গিয়ে দেখল সবাই বেশ টেন্সড হয়ে আছে। সে বুঝল, ব্যাপার গুরুতর।

মিঃ পরিমল রুদ্র, এসিপি সবেমাত্র দ্বিতীয় বারের জন্য কমোডে বসেছেন, শুনতে পেলেন তাঁর ঘরের স্পেশাল লাইনটা বেজেই চলেছে ক্রমাগত। বেশ কদিন ধরেই মিঃ রুদ্রের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। বিচ্ছিরি ধরনের গা ম্যাজম্যাজ, মাথা এবং গলায় ব্যথা এসব হয়েই চলেছে। কাজ থেকে ফুরসত পান না ডাক্তার দেখানোর। তাই বাজার চলতি কিছু ওষুধ খেয়েই আপাতত দিন কাটাচ্ছেন তিনি। কিন্তু বড্ড কষ্ট হচ্ছে তাঁর। মেজাজটাও তিরিক্ষে হয়ে থাকে সবসময়।

প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে তিনি বাথরুম থেকেই তাঁর বউকে বললেন, “ধরো তো লাইনটা। বলে দাও বাথরুমে আছে, পরে ফোন করতে।”

বউ দরজার বাইরে থেকে খবর দিল, “কমিশনার সাহেব লাইনে আছেন।”

তড়িঘড়ি বেরিয়ে মিঃ রুদ্র ফোন ধরলেন, “বলুন স্যার… হ্যাঁ স্যার… আমেরিকান এমব্যাসি? আবার কী হল স্যার? জঙ্গি অ্যাটাক নাকি? অ্যাঁ? তার থেকেও ভয়ানক? এখুনি আসছি স্যার।”

পেটে যন্ত্রণা নিয়েই ইউনিফর্ম পড়তে থাকলেন মিঃ রুদ্র। পুলিশের চাকরিতে কোনও শান্তি নেই। বাপ-মা পইপই করে বলেছিল আইএএস পড়তে, কিন্তু পরিমলের তখন গুন্ডা ঠ্যাঙানোটা খুব মাচো লাগত! এখন ঠেলা বোঝো!

সিপির অফিসে এসে মিঃ রুদ্র দেখতে পেলেন আমেরিকান হাই-কমিশনার ঘরে জাঁকিয়ে বসে রয়েছেন। সঙ্গে আরও একটি মুশকো মতো ভদ্রলোক। এঁকে ঠিক চিনলেন না পরিমল।

সিপি গম্ভীর গলায় বললেন, “পরিমল, আমিও ব্যাপারটা ডিটেইলসে জানি না। আমরা দুজনেই শুনব। যেহেতু আমি কাল সিএম-এর একটা উদ্বোধনে যাব, তাই খুব এমার্জেন্সি কিছু হলে তুমি সামলে নিও। ব্যাপারটা যতক্ষণ না সিএম-এর গোচরে আনতে পারছি, ততক্ষণ আমার সরাসরি ইনভলভড হওয়া মুশকিল। তবে আমার ফুল সাপোর্ট থাকবে।”

সিপির টেবিলের সামনে একটা কন-কল করার মেশিন রাখা। ঘরের দরজা আঁট করে বন্ধ করা। পরিমল বুঝলেন, ব্যাপারটা টপ সিক্রেট।

কিছুক্ষণ পরে মেশিনের ভেতর থেকে একটা গলা ভেসে এল, “হ্যালো স্যার’স— আশা করি আপনারা সবাই আছেন।”

“হ্যাঁ আপনি যাদের চেয়েছিলেন তারা আছে। বলুন কী বলতে চান। তার আগে আপনার একটু পরিচয় দিলে ভালো হয়।” সিপি বলে উঠলেন।

“অফকোর্স। আমার নাম ডক্টর ভি। আসলে আমি আমেরিকান বায়ো-ওয়েপন ডিপার্টমেন্টের হেড সায়েন্টিস্ট। সে কারণেই পুরো নামটা বলতে পারলাম না বলে দুঃখিত। আপনাদের যে কথাগুলো বলতে চলেছি, সেগুলো মন দিয়ে শুনুন। এর ওপর নির্ভর করছে পুরো কলকাতা মায় ভারতের ভবিষ্যৎ।

আমি বেশ কয়েক বছর আগে একটি মলিকিউল আবিষ্কার করি, যেটা যুগান্তকারী বললেও ভুল হবে না। মলিকিউলটি মানব দেহের বেশ কিছু ভয়ঙ্কর রোগ লহমায় সারিয়ে দিতে পারে। আবিষ্কারটা খুবই চমকপ্রদ ছিল এবং সেটির ব্যাপারে আরও ডিটেইল গবেষণার জন্য আমার একজন ভালো অ্যাসিস্টেন্টের দরকার পড়ে। তখন ডঃ হার্বাট ওয়েস্ট নামে এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান আমার সঙ্গে কাজে যোগ দেয়। ভীষণ বুদ্ধিমান ছেলে ছিল হার্বাট। ওকে আমি নিজের ছেলের মতো কাজ শিখিয়েছিলাম এবং ভীষণ চটপট কাজ বুঝে নিতে পারত সে। অচিরেই সে আমার প্রধান অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে উঠল। ওকে আমি আমার সব গোপন গবেষণার কাজে রেখেছিলাম। এমনকী, যখন আমি নিজে আমেরিকান সরকারের এই গোপন কাজে জয়েন করি, তখনও সে আমার সঙ্গেই ছিল।

আমার তৈরি মলিকিউল-টার নাম রাখি ‘এলিক্সির’! কিন্তু তখনও অনেক পথ চলা বাকি ছিল। ওষুধের কার্যকারিতা হাতে-কলমে প্রমাণ করতে গিয়ে বিপদে পড়ি। দেখি ওষুধটা ব্রেনের হাইপোথ্যালামাস এবং ভেন্ট্রোমেডিকেল নিউক্লিয়াসকে মারাত্মকভাবে স্টিমুলেট করছে। সহজ ভাষায় বলি, আমাদের খাওয়া, ঘুম, তৃষ্ণা এসবই হাইপোথ্যালামাস দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। ওষুধটি সেবনের পর, সাবজেক্টের খিদে সাংঘাতিক বেড়ে যায় আর ভেন্ট্রোমেডিকেল নিউক্লিয়াস অ্যাফেক্টেড হওয়ার জন্য, সে খিদে কন্ট্রোল করতে পারে না।

পুরো ব্রেন এভাবে অ্যাফেক্টেড হওয়ার পর সাবজেক্ট একজন চলতা-ফিরতা জোম্বিতে পরিণত হয়। সে শুধু খেতে থাকে, এবং এই সর্বগ্রাসী খিদের কবলে পড়ে সে সমস্ত মানবিক অনুভূতি খুইয়ে এক কিলিং মেশিনে পরিণত হয়। এই কিলিং মেশিনের লালায় তৈরি হয় এক মারাত্মক টক্সিন। সে যাকে কামড়ায়, সে দিন পাঁচেকের মধ্যেই আরও একটা জোম্বিতে পরিণত হতে থাকে। ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝে আমি মলিকিউলটা পুরো চেপে যাই, কিন্তু পরে বুঝেছি হার্বাটের এর ওপর লোভ ছিল মারাত্মক।

ক’দিন আগে আমার ল্যাবে এক সায়েন্টিস্ট ভাইরাসের আক্রমণে মারা যান। আমার মনে হয়, ব্যাপারটা পুরো সাজানো। হার্বাটই আগের দিন রাত্রে আমার ল্যাবে ঢুকে ‘এলিক্সির’-এর ভায়ালটা সরায়, এবং ডিফ্রস্টারে একটা ভাইরাসের বুবি-ট্র্যাপ পেতে রাখে। ডঃ শিনের স্পেশাল ল্যাব-কোট সরিয়ে রেখে দেয় যাতে উনি কাজের চাপে ল্যাবকোট ছাড়াই ঘরে ঢুকতে বাধ্য হন এবং মারা যান। ডঃ শিনের সঙ্গে আইএস-এর যোগসাজশ দেখানোর জন্য কৌশলে তাঁর বাড়িতে অনেকগুলো সন্ত্রাসবাদী ডকুমেন্ট প্ল্যান্ট করে।

এবার সে মাস্টার স্ট্রোক দেয়। যে ভাইরাসটা হার্বাট সরিয়েছিল, সেটা এইচওয়ান, এনওয়ান ভাইরাসের একটা মোডিফায়েড রূপ। ওটার প্রতিষেধক পৃথিবীর মানুষের এখনও জানা নেই— জিন মডিফিকেশন করে ওটি বানানো হয়েছে। ওটা সরানোর কারণে প্রথমে আমার মারাত্মক ধোঁকা লাগে, কারণ ও দিয়ে সামান্য জ্বর, সর্দি, গলা ব্যথা ছাড়া আর কোনও রোগ হওয়ার কথা নয়। কিন্তু পরে যখন শুনি ‘এলিক্সির’ও সরানো হয়েছে, তখন পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়।

কিন্তু তখনও আমি চিন্তায় ছিলাম, কে, কীভাবে, কেন ওগুলোর ব্যবহার করতে চাইছে। কেন-র উত্তর এখনও পাইনি। তবে কে আর কীভাবের উত্তর পেয়ে যাই দেবাশিসের মেল থেকে।

হার্বাট মাসখানেকের ছুটি নিয়ে কলকাতা এসেছিল ওর আন্ট-এর শরীর খারাপের অজুহাত দেখিয়ে। তারপর থেকে ওর ফোন বন্ধ। ও জানত যে, ফোন বন্ধ থাকলে আমি নিশ্চয়ই খোঁজাখুঁজি করব। তাই বুবি-ট্রাপ পেতে রাখল যাতে একটা দুর্ঘটনা হয়ে ল্যাব বেশ কিছুদিনের জন্য কোয়ারেন্টাইন থাকে এবং কী কী চুরি গেছে সেটা কেউ চট করে ধরতে পারবে না। তাতেও অনেকটা সময় হাতে পাবে ওর শয়তানি প্ল্যান কার্যকর করতে।

আমি নিশ্চিত এই কাজে আইএস যোগ আছে। আমি ইন্টারপোল এবং সিআইএ-কে খবর দিয়েছি। তারা এতক্ষণে হার্বাটের সব খুঁটিনাটি বের করতে শুরু করে দিয়েছে। এই কল শেষ হওয়ার পরেই আশা করি ওর ব্যাপারে সমস্ত ডিটেইলস আমি আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারব।

যাই হোক হার্বাট একটা মারাত্মক প্ল্যান করল। একটা জেনোসাইডের ছক কষল অত্যন্ত নিপুণভাবে। জ্বর-সর্দির ভাইরাসটা কোনওভাবে ছড়িয়ে দিল কলকাতার বুকে। যেহেতু ওই ভাইরাসগুলোকে আমরা মহাকাশে পাঠিয়ে জিন মোডিফিকেশন করিয়েছিলাম, তাই ভাইরাসগুলোর গায়ে একটা করে ট্র্যাকার লাগানো ছিল। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এটা সত্যি। হার্বাট খুব সহজেই আইডেন্টিফাই করতে পারল কাদের কাদের ভাইরাস অ্যাফেক্ট করেছে। যেহেতু এটা অল্টারড ভাইরাস, তাই চট করে ব্লাড টেস্টে ধরা পড়বে না, কিংবা কোনও সাধারণ ওষুধে কাজ হবে না। এইভাবে রোগটা যখন অসহ্য হয়ে উঠবে তখন আপনি ওর দেওয়া এলিক্সির খেতে বাধ্য হবেন এবং কয়েকদিনের মধ্যে পরিণত হবেন এক-একটা কিলিং মেশিনে।”

একটানা বলে কন্ঠস্বরটা একটু থামল। পরিমল বেশ বুঝতে পারল, তার হাত-

পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। জ্বরটা যেন আবার ফিরে আসছে, সঙ্গে অসহ্য মাথা ব্যথা!

“কিন্তু এত কিছু থাকতে ওই জ্বরের ভাইরাসই কেন? অন্য কোনও মারণরোগের ভাইরাস ছড়ালেই তো ল্যাঠা চুকে যেত”, সিপি বলে উঠলেন। তাঁর গলাও কেমন যেন কেঁপে উঠল।

“বুঝলেন না? মহামারী ছড়িয়ে পড়লে সরকার যে কোনও মূল্যে সেগুলো দমন করার পন্থা নেয় এবং সে সব ভাইরাসের অ্যান্টিডোট বের করতে আপনারা ইউনাইটেড নেশনস অবধি ধাওয়া করবেন। কয়েকটা মানুষ মরলেও সেটা খুব একটা এফেক্টিভ হবে না। এবং কে ভাইরাস ছড়িয়েছিল তার তদন্তে হাজারো নাম উঠে আসবে।

এর থেকে সামান্য জ্বর-সর্দির প্রাদুর্ভাব ট্রপিকাল অঞ্চলে খুব স্বাভাবিক। কেউ তেমন গা করে না। তাই লোকে বুঝতেও পারবে না, অজান্তে তারা কীসের শিকার হতে চলেছে।”

“কিন্তু ভাইরাসটা ছড়াল কী দিয়ে?’’

‘‘এ প্রশ্নটা খুব ক্লিশে মনে হলেও এটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য। এই ভাইরাসের একটা স্পেশালিটি আছে। এরা বায়ু মাধ্যমে খুব এফেক্টভলি ছড়াতে পারে না, এদের জন্য চাই জল। আপনাদের ওখানে দেখলাম দিন পনেরো আগে বেশ কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল। মনে হয়, কোনওভাবে ড্রোনের মাধ্যমে ভাইরাসগুলো মেঘের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে আসা হয়েছিল এবং সুযোগ বুঝে তারা বৃষ্টির সঙ্গে নেমে এসেছে। যারা যারা ভিজেছিল তাদের সবার মধ্যে রোগটা ছড়িয়ে যাওয়া খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।”

পরিমল প্রচণ্ড জোরে হেঁচে বলল, “হ্যাঁ, স্যার আমি এসিপি পরিমিল রুদ্র। আমিও সেদিন বাড়ি ফেরার মুখে ভিজে গেছিলাম।”

ঘরের বাকি সবাই তটস্থ হয়ে পিছিয়ে গেল কিছুটা। “রোগটা কি ছোঁয়াচে?” সিপি সতর্কভাবে জিজ্ঞেস করলেন।

“একবারেই না, আর সেটাই যা আশার কথা।” ডঃ ভি বলে চললেন। “এবার আমাদের কিছু কাজ করতে হবে জেন্টেলমেন। এলিক্সিরের একটা অ্যান্টিডোট আমি বের করেছি গত কয়েকদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে। তবে যারা ডোজ বেশি নিয়ে নেবে, তাদের জন্য কাজ নাও করতে পারে। তবে এখুনি ওটাকে আমি স্পেশাল ফ্লাইটে কলকাতা পাঠাচ্ছি। যারা এলিক্সির নিয়েছে, তাদের খাইয়ে দেবেন বা ইনজেক্ট করে দেবেন। দেরি করবেন না প্লিজ। আমি জানি না কতজন ওটার ওভারডোজ খেয়ে নিয়েছেন অলরেডি। বেশি দেরি করলে, কলকাতা শ্মশান হয়ে যাবে।’’

“কিন্ত ওদের এফেক্টেড-দের ট্র্যাক করব কী করে?” মিঃ রুদ্র আসল প্রশ্নটা করে বসলেন।

“ভাইরাসগুলো যখন ট্র্যাকযোগ্য তখন তার একটা ট্র্যাকিং ডিভাইস আমার কাছে আছে। সাধারণ গাড়ি ট্র্যাক করার মতো না, একটু জটিল। আমি ডিভাইসটা সঙ্গে নিয়েই আসছি। তাতে কতজন ভাইরাস এফেক্টেড হয়েছে, সেটা বোঝা গেলেও তাদের মধ্যে কতজন এলিক্সির খেয়েছে সেটা তো বোঝা যাবে না। তবে যারা এফেক্টেড, তাদের সব্বার দিকে নজর রাখতে হবে। কাজটা কঠিন সন্দেহ নেই, কিন্তু এ ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।’’

***

রুক্মিনীর অফিস যাওয়া বন্ধ হয়েছে আজ দিন তিনেক হল। তার এখন সর্বগ্রাসী খিদে। সারাক্ষণ আকাশ খাই, পাতাল খাই অবস্থা। ভেজিটেবল আর মুখে রোচে না, তার ইন্টারেস্ট মাংসে। মায়ের রান্না করা মাংসে তার আর সেরকম রুচি নেই। সে এখন লুকিয়ে কাঁচা মাংস খায়। তাতে যেন মনে হয় তার খিদেটা একটু হলেও শান্ত হয়েছে।

শাম্বর ফোন অনেক দিন আসে না। তাতে রুক্মিনীর কিছু যায় আসে না। তার অনুভূতিগুলো যেন ভোঁতা হয়ে গেছে পুরোপুরি। সারাক্ষণ সে কিছু না কিছু খেতে থাকে। তার শরীরে লালিত্যের জায়গায় এসেছে একটা ভোঁতা ভাব, চোখে একটা চরম উদাসীনতা এবং প্রচণ্ড ক্রোধ। সেদিন খাবার দিতে দেরি করায় মায়ের দিকে একটা কুকার ছুড়ে মেরেছিল রুক্মিনী। সেদিন থেকে ওর মা প্রচণ্ড আতঙ্কে থাকে।

বাইরের জগতের সঙ্গে সমস্ত সংস্রব শেষ হয়ে গেছে তার। ওষুধটার দ্বিতীয় ডোজ খাবার পরে যেন সে আরও কীরকম হয়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো সারাদিন করমচার মতো লাল, মুখে বিড়বিড় করে কী বলছে সে নিজেও জানে না।

তারে ঘুম আসে না আর কেবল রাতের বেলা প্রচণ্ড খিদে পেলে নিঃশব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে যায় বাইরে। প্রথম প্রথম তার লোলুপদৃষ্টি তাকিয়ে দেখত জীবন্ত প্রাণীদের সমারোহ। দু-এক দিনের মধ্যে যা কিছু পেল যেমন কুকুর, বেড়াল, ইঁদুর সবই প্রচণ্ড পরিতৃপ্তির সঙ্গে ছিঁড়ে খেতে থাকে সে। তখন তার ক্ষুধা মেটার যা আরাম হয়, সে আর কিছুতেই হয় না।

আগের দিন রাতে এরকমই কিছু একটা তৃপ্তিদায়ক ডিনারের পর ঘুমিয়ে পড়েছিল রুক্মিনী। কি আরামের সে ঘুম! ঘুম থেকে উঠতেই শুনতে পেল কেউ একজন তার নাম ধরে ডাকছে। ঘরে ঢোকার পর মানুষটার মুখ দেখে মনে হল, রুক্মিনী যেন একে চেনে। কিন্তু কিছুতেই তার স্মৃতির ওপর চেপে থাকা জগদ্দল পাথরটা নাড়িয়ে মানুষটার পরিচয় মনে করতে পারল না সে।

শুধু সেই নয়, ঘরে ঢুকে এল আরও কয়েকটি মানুষ। একই রকম পোশাক পরা। এবার প্রথম মানুষটা তার হাত ধরার চেষ্টা করতেই প্রচণ্ড রাগে সে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সামনের মানুষটা এর কম আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না মোটেই। সে ছিটকে মাটিতে পড়তেই, রুক্মিনী তার ঘাড়ে উঠে বসল। তার হাত চেপে বসে আছে মানুষটার নরম গলায়। আহ্‌  আজ সকালবেলাতেই কত খাবার এসে হাজির!

অকস্মাৎ একটা বিশাল শক্ত কিছু তার চোয়ালে আছড়ে পড়ল আর সবকিছু মুছে গেল তার চোখের সামনে থেকে।

মিঃ পরিমল রুদ্র হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, “দেখুন দেবাশিসবাবু, মহিলাদের গায়ে হাত তোলা আমি একদম পছন্দ করি না। কিন্তু ব্যাপারটা যে এতদূর গড়িয়েছে এ তো ভাবতেই পারিনি। ম্যাডামকে দেখেই তো আমার হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছিল।”

দেবাশিস কোনও ক্রমে উঠে বসতে বসতে বললেন, “শিগগিরি, অ্যান্টিডোটের ভায়ালটা দিন। আর আপনাদের মধ্যে কেউ দয়া করে ‘এলিক্সির’-এর শিশিটা খুঁজে বের করুন এখুনি।”

হসপিটালের বেডে শুয়ে শুয়ে রুক্মিনী সমস্ত কিছু শুনেছে দেবাশিসের মুখ থেকে। মাঝে মাঝে ভীষণ আতঙ্কে কেঁপে কেঁপে উঠেছে সে।

শাম্বকে বাঁচানো যায়নি। তার অবস্থা ছিল সবচাইতে খারাপ। তার বাড়িতে ঢুকে সবাইকে নাকে হাত চাপা দিতে হয়েছিল। নিজের মা-বাবাকে ক’দিন আগেই হত্যা করে তাদের পচা মাংস খাচ্ছিল শাম্ব আর সেই অবস্থায় তাকে ধরতে যায় এক বিশাল পুলিশবাহিনী। অ্যান্টিডোট দেওয়াতে প্রচুর বেগ পেতে হয়েছে। তারপরেই প্রবল খিঁচুনি শুরু হয়ে গিয়েছিল ওর। সেই অসহ্য যন্ত্রণা তার হার্ট নিতে পারেনি।

রুক্মিনীর বেডের পাশ থেকে দেবাশীস উঠে যাওয়ার খানিক পরে ঢুকলেন এক দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ সাহেব। তিনি রুক্মিনীর পাশে বসে অনেকক্ষণ তার চুলে হাত দিয়ে বিলি কেটে দিলেন। তারপর খুব মৃদু স্বরে ইংরেজিতে বললেন, “ঠিক তোমারই মতো সেই মেয়েটি ছিল, যাকে আমি প্রথম জীবনে এক্সপেরিমেন্টের জন্য ধরে এনেছিলাম। মেয়েটির রোগযন্ত্রণায় ছটফট করছিল। আমি আর হার্বাট ওকে হাসপাতাল থেকে তুলে আনি। সেবা করি, আমার তৈরি ওষুধ ওকে দিই। কী আনন্দে ছিল সে, তুমি ভাবতে পারবে না সিস্টার! তখনও কি ঘুণাক্ষরেও জানি, তার এই পরিণতি হতে চলেছে।’’ সাহেবের চোখের কোল দিয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

***

মিঃ পরিমল রুদ্র এখনও হেঁচে চলেছেন দিনে প্রায় কুড়ি বার। মাথা ধরাটা কিছুতেই কমছে না।

“স্যার, আপনার ওপর আমার একটা অভিযোগ আছে।” মিঃ রুদ্র ডঃ ভি-

কে উদ্দেশ করে বললেন।

“কী শুনি।” স্মিত হেসে ওর দিকে তাকালেন ডক্টর।

“আমার এই শরীর খারাপটা কমাতে পারছেন না? আমি যে পাগল হয়ে যাব এবার।” মিঃ রুদ্র বললেন।

ডক্টর হাসতে হাসতে বললেন, “আপনারটার বা বলা ভালো আপনার মতো আরও অনেকের জন্য অ্যান্টিডোটের কাজ চলছে। আশা করি খুব শীঘ্র আমি আপনাকে সুস্থ করতে পারব। তা, আলির খোঁজ পেলেন মিঃ রুদ্র?”

“পেয়েছি, তবে সে পাখি পালিয়েছে। ডঃ হার্বাট ওয়েস্টই এখানে আলি নাম নিয়ে বেনামে ভাড়া বাড়িতে উঠেছিলেন। মনে হয় সে এখন আফগানিস্তানে।’’ মিঃ রুদ্র আবার একটা হাঁচি দিলেন।

নিজের পকেটের রুমালটা এগিয়ে দিয়ে ডক্টর বললেন, “আমি জানি সে কোথায়। একটা শেষ হিসেব বাকি আছে। আমি আসি এখন। ক’দিন পর আবার দেখা হবে। আমার নাম্বারটা লিখে রাখতে পারেন। ও, ভালো কথা। আমি বায়ো ওয়েপন ডিভিশন থেকে রিজাইন দিয়েছি। আপনাদের জন্য তৈরি ওষুধটাই হবে আমার শেষ কাজ। চলি।’’

মিঃ রুদ্র বললেন, “একটা কথা ডক্টর, আপনি গোয়েন্দা হলে ভালো করতেন। যেভাবে কেসটা সলভ করলেন একা হাতে তাতে ভবিষ্যতে আর আমাদের দরকার পড়বে বলে মনে হয় না। তবে একটা খটকা, হার্বাট ডঃ শিনকে মারল কেন? ও যখন জানত যে আপনি ওর পথের একমাত্র কাঁটা, তাহলে আপনাকেই সরিয়ে দিতে পারত।’’

ডক্টর মাথা নাড়লেন, “সরাসরি আমাকে মারতে পারত না। কারণ আমার অনেক চোরাগোপ্তা সিকিওরিটি ছিল, যেটা আমিও অনেক ক্ষেত্রে জানতে পারতাম না। তাই সে সব রিস্ক নিতে যাওয়ার থেকে অ্যাক্সিডেন্ট দেখানোটা সহজ ছিল। আসলে আমাদের ল্যাব দুর্ঘটনার আগের রাতে ডঃ শিনের ইউনিফর্মে এসে হার্বাট সিকিউরিটি ক্যামেরাকে ধোঁকা দেয়। এবং আমারই ইউনিফর্ম চুরি করে। সঙ্গে আরও অনেকেরই করে, যাতে ব্যাপারটা কাকতালীয় না মনে হয়। পরের দিন সকালে এসে আমার ইডিফ্রস্টারটা খোলার কথা ছিল। কিন্তু আমার দেরি হয়ে যাওয়ায় ডঃ শিন গিয়ে ওটা খোলে।’’

***

আফগানিস্তানের এক প্রত্যন্ত এলাকাঃ

মুখে মুচকি হাসি নিয়ে ইন্টারনেটে বাংলা খবরটা পড়ছিল আলি, “কলকাতার বুকে নৃশংস খুন। ছেলে হত্যা করল তার বাবা-মাকে।’’

“এক্সেলেন্ট” মনে মনে বলল সে, “কাজ শুরু হয়ে গেছে দেখছি।’’

আরামে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সিগারেট ধরাল সে। এখানে বড্ড গরম! বৃষ্টি বড় একটা হয় না। জলের কষ্ট খুব। তবে আল্লাহ-এর কাজে এসব ভাবতে নেই। এখানে চারদিকে সব্বাই হয় তালিবান না হয় আইএস।

হঠাৎ বাইরে একটা শোরগোল শোনা গেল, “বারান, বারান— বৃষ্টি বৃষ্টি।”

সিগারেটটা বুজিয়ে চাতকেমত আলি ছুটে গেল বারিধারা উপভোগ করতে। আহ্‌ কী আরাম!

মিনিট পনেরো ধরে ভালো করে চান করে আলি যখন ঘরে এল, তখন তার মোবাইলে একটা মেসেজ এসেছে,

“প্রিয় হার্বাট, অ্যালিয়াস, আলি,

আমি একটা দানব তৈরি করেছিলাম। আক্ষরিক অর্থেই দানব, আর সেটা তুমি। বিজ্ঞানের বই-এর বাইরে আমি তো কিছু পড়িনি বিশেষ। তাই তোমার ছদ্মনামের আড়াল থেকে তোমার স্বরূপ বুঝতে আমার একটু দেরি হয়ে গেছিল। তোমার জারিজুরি আমি জেনে গেছি শয়তান। তুমি পালাবে কোথায়? তবে তোমার জন্য রইল আমার একটা ছোট্ট উপহার— আ ভেরি পোটেন্ট ডোজ অব এলিক্সির। মাইলাস্ট অ্যান্ড ফাইনাল ক্রিয়েশন ফর ডেমনস লাইক ইউ। বাইরে বৃষ্টি হল না এইমাত্র? চান করে নাও হার্বাট। কারণ আমার এই ডোজ খেতে হয় না। স্কিনের ওপর থেকেই কাজ শুরু করে। দুনিয়ার ধ্বংস দেখতে চেয়েছিলে না? আমি দেখে যাব— তোমাদের মতো রক্তবীজের দল কীরকম নিজেদের মধ্যে কামড়া-কামড়ি করে ঝাড়েবংশে নিপাত যায়।

মনুষ্যত্ব আছে ও থাকবে। সে তোমাদের মতো দানব যতই থাকুক না কেন।

ইতি,

ডক্টর ভি, অ্যালিয়াস, ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *