(১)
‘…কী ভাবছ সাহেব?’ গাঢ় স্বরে বললেন আদিত্যনাথ। তারপর মন্দ্র স্বরে সম্মোহনী সুরে আবৃত্তি করতে শুরু করলেন-
তন্বী শ্যামা শিখরি-দশনা পক্ববিম্বাধরোষ্ঠী
মধ্যে ক্ষামা চকিত-হরিণী-প্রেক্ষণা নিম্ন-নাভিঃ
শ্রোণীভারাদলস-গমনা স্তোক-নম্র স্তনাভ্যাং…
‘কুসুম ছিল তেমন। চোখে হরিণের দৃষ্টি, ছোট ছোট নিখুঁত দাঁত। সরু কোমর, স্তনযুগলের ভারে একটু ঝুঁকে হাঁটত। গুরু নিতম্বিনী কুসুমের চলন ছিল মদমত্ত হস্তীর মতো। আবার পারুল ছিল মরাল গামিনী। লম্বা লম্বা পা দিয়ে রতিক্রীড়ার সময়ে আমাকে এমন ভাবে আঁকড়ে ধরত, যেন নাগপাশ! হা হা হা!’
অট্টহাসির শব্দেই মনে হয় ঘুম ভেঙে কোনওরকমে উঠে বসলাম। এখনও কানে বাজছে অট্টহাসি আর চোখ বুজলেই যেন দেখতে পাচ্ছি আদিত্যনাথের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। বেলফাস্টের এই প্রবল শীতেও দরদর করে ঘামছি।
কতদিন হয়ে গেল? তা প্রায় পঞ্চাশ বছর তো হবেই। এখন আমার বয়স পঁচাত্তর। ইন্ডিয়া থেকে চলে এসেছি তা তো প্রায় দুই দশক আগে! তবু এখনও স্বপ্নে আসেন আদিত্যনাথ! মাঝে মাঝে মনে হয়, এই তো সেদিন…
বিছানা থেকে উঠে জানলার পাশে রাখা আরামকেদারায় বসলাম। আজ রাত্রে হয়তো আর ঘুম আসবে না। জানলার পর্দা সরিয়ে দিলাম। ভারি মনোরম দৃশ্য। তুষারপাত হচ্ছে। আশপাশের বাড়িগুলোর ছাদে তুষারের সাদা আস্তরণ। রাস্তাটাও ঢেকে গেছে সাদা চাদরে। চাঁদের নীলচে আলো পুরো চরাচরে ছড়িয়ে পড়েছে।
এখন একটু একটু ঠান্ডা লাগছে। মনটা শান্ত হতেই প্রকৃতিদেবীর উপস্থিতি টের পেলাম। ফায়ারপ্লেসের আগুনটা একটু উস্কে দিয়ে সেলার থেকে মল্ট হুইস্কির বোতলটা নিয়ে বসলাম। এই বৃদ্ধ বয়সে ফায়ারপ্লেসের আগুন আর হুইস্কির মধ্যে উষ্ণতা খুঁজতে খুঁজতে মনে পড়ে যায় যৌবনের দিনগুলোর কথা। সেই দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধানখেত, নীল আকাশ। নদীর পাড়ে কত নাম না জানা ফুল ফুটে আছে। আমি আর আমার দেহরক্ষী মুস্তাক খাঁ ঘোড়ায় চড়ে প্রশাসনিক কাজ করতে বেরিয়েছি। খাজনা এবং অন্যান্য কর আদায় করা, আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখা ইত্যাদি ছিল আমার কাজ। রোজকার একঘেয়ে কাজ সেরে কোনও কোনও দিন বিকেলে শহরে ইউরোপিয়ানদের জন্য নির্দিষ্ট ক্লাবে যেতাম। নেটিভদের সেইসব ক্লাবে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল।
ক্লাবের রোজনামচাও অবশ্য অল্পবিস্তর একঘেয়েই ছিল। নেটিভদের কীর্তিকলাপ, কার ডিসট্রিক্টে বিপ্লবীদের আনাগোনা বাড়ছে, কিংবা কে জীবনের বাকি ক’টা দিন এই দেশেই কাটিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন, এইসব নিয়ে আলাপ আলোচনা হত। সদ্য সদ্য যারা দেশ থেকে প্রথমবার ভারতে এসেছেন তাঁরা আবার ইন্ডিয়ান ফকিরদের জাদুবিদ্যা, দড়ির জাদু এইসব নিয়ে খোঁজখবর নিতেন।
দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান রোপ ট্রিক্স! তখন ইউরোপে খুব সাড়া ফেলেছিল। তবে আমার মনে হয় এটা শুধুই মিথ। আমি বহু গ্রামে-গঞ্জে ঘুরেছি, অনেক রকম খেলা দেখেছি। কিন্তু এই খেলা কোথাও দেখিনি। গ্রাম্য ফকির কিংবা সাধুদের অনেক রকম জাদুর খেলা দেখেছি বটে, কিন্তু অলৌকিক বলে মনে হয়নি কোনওটাকেই।
তবে একজন… একজন ঋষির দেখা পেয়েছিলাম। উচ্চমার্গের সাধক। তাঁর ক্ষমতা সামান্য জাদুবিদ্যা অতিক্রম করে প্রবেশ করেছিল এক পরাবাস্তব জগতে। বিজ্ঞানে যার ব্যাখ্যা মেলে না। আদিত্যনাথ। তাঁর কথা মনে পড়লেই আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত আজও বয়ে যায়!
আদিত্যনাথের ঘটনা কেউ জানে না। আমিই বলিনি, কারণ কেউ হয়তো আমায় বিশ্বাস করত না। কিন্তু আজ আমি এইসবের ঊর্ধ্বে চলে গেছি। বিশ্বাস-অবিশ্বাস, কী যায় আসে! আর ক’টা দিনই বা বাঁচব?
তাহলে প্রথম থেকেই শুরু করি। তখন আমার বয়স ২৩-২৪। আমার জন্ম আর বেড়ে ওঠা পুনে শহরে। বাবা ছিলেন বোম্বে হাইকোর্টের জজ। পুনে থেকে সাব-ডিসট্রিক্ট অফিসারের চাকরি নিয়ে এলাম ঢাকা শহরে। ঢাকা থেকে প্রায় দেড়শো মাইল দূরে চট্টগ্রাম নামের এক জায়গায় আমাকে পাঠানো হল। চট্টগ্রামের আনুমানিক দুই কী তিনশো বর্গমাইলের মধ্যে যত গ্রাম আছে সেই সমস্ত গ্রামের শাসনভার আমার ওপরে ন্যস্ত হল। আমার উপরওয়ালা হলেন ব্রায়ার্ন টেলর। দুই-তিন সপ্তাহ অন্তর অন্তর তিনি আমার কাজের খতিয়ান নিতেন, পরামর্শ দিতেন। মাঝে মাঝে একসঙ্গে আমরা বিভিন্ন গ্রাম পরিদর্শনেও যেতাম। তবে বেশির ভাগ সময়ই আমি একাই যেতাম, আর আমার ছায়াসঙ্গী ছিল বছর পঞ্চাশের বেলুচ্চি পাঠান মুস্তাক খান। আমার দেহরক্ষী।
ব্রায়ার্ন টেলরের সঙ্গে একদিন পরিদর্শনে বেরিয়েই আমি প্রথম ঋষি আদিত্যনাথের কথা শুনি। সারাদিনের কাজের শেষে আমরা বাংলোয় ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। ব্রায়ার্ন একটা চুরুট ধরিয়ে তাতে অগ্নিসংযোগ করে বললেন, ‘তারপর বলো রওয়ান, তোমার তো এখানে প্রায় ছয়-সাত মাস হয়ে গেল। তা তুমি কাঁটাচারি গিয়েছ একবারও?’
আমি ভ্রু কুঁচকে একটু ভাবলাম। কাঁটাচারি! নামটা একটু শোনা শোনা লাগছে বটে। আমার এই বাংলো থেকে মাইল চারেক দূরের একটা ছোট্ট গ্রাম।
‘না! কাঁটাচারি এখনও যাইনি। আমি সাধারণত একটু দূরের গ্রামগুলো আগে ভিজিট করছি! কিন্তু কাঁটাচারিতে উল্লেখযোগ্য কিছু আছে নাকি? যতদূর জানি, গ্রামটা ছোট্ট। তা ছাড়া গ্রামের আশপাশে বেশির ভাগই জঙ্গল, নীলচাষের পর্যাপ্ত জমিও নেই। তাই আর ওদিকে যাওয়া হয়নি।’
ব্রায়ার্ন আকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে কী যেন ভাবলেন। তারপর আধখাওয়া চুরুটটা ছাইদানিতে ফেলে দিয়ে বললেন, ‘তুমি একবার ঘুরেই এসো কাঁটাচারি। ওখানের জমিদার গোকুল আমার পূর্বপরিচিত। তাকে আমার কথা বোলো। তবে শুধু গোকুলের সঙ্গে দেখা করার জন্যই আমি তোমাকে যেতে বলছি না। গ্রামে এক হিন্দু সাধু বছর পাঁচেক আগে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর নাম আদিত্যনাথ। লোকে বলে তাঁর বয়স নাকি প্রায় ২৫০ বছর।’
আমি খুব অবাক হয়ে ব্রায়ারনের দিকে তাকালাম। ব্রায়ার্ন একজন অভিজ্ঞ এবং শিক্ষিত অফিসার। অন্তত ৩০ বছর তিনি এই দেশে আছেন। গ্রাম্য লোকজনের মধ্যে অনেক অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাস প্রচলিত থাকে। কিন্তু ব্রায়ার্ন তো সেইসব মেনে নেওয়ার মানুষ নন!’
ব্রায়ার্ন আমার মনের ভাব বুঝতে পারলেন। মৃদু হেসে বললেন, ‘আমি জানি তুমি কী ভাবছ! ইন্ডিয়াতে সাধু, ঋষিদের তো অভাব নেই। আর সাধারণ লোকে বিশ্বাসও করে যে, সাধুদের অলৌকিক ক্ষমতা আছে। কিন্তু, আদিত্যনাথ… আদিত্য সত্যিই আলাদা। জানি না সত্যিই ওঁর বয়স ২৫০ বছর কি না… সত্যি বলতে কী আমি সেটা বিশ্বাসও করি না… কিন্তু তবু আদিত্যের সামনে দাঁড়ালেই কীভাবে যেন ওঁকে অবিশ্বাস করার সাহসটা আমি হারিয়ে ফেলি… আদিত্য যেন সেই নদীর মতো, দূর থেকে দেখলে বোঝা যায় না কতটা গভীর— আবার গভীরতা মাপতে গিয়ে ঝাঁপও দেওয়া যায় না ডুবে যাওয়ার ভয়ে…’
ব্রায়ার্ন টেইলর আর কিছু বললেন না। আরেকটা চুরুট ধরিয়ে জিন খেতে লাগলেন। আমিও মুস্তাক খানকে ডিনার সার্ভ করতে বললাম।
(২)
অপূর্ব দৃশ্য! ঘন জঙ্গলের মধ্যে সূর্যের আলো যেন গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে বর্শার ফলার মতো এসে মাটিতে বিঁধছে। গাছে গাছে বুনো টিয়ার হুটোপাটি আর মৌমাছির একটানা গুনগুন শব্দ। ব্রায়ার্ন টেলরের সঙ্গে সেদিনের কথাবার্তার পর খুবই কৌতূহল হচ্ছিল। তাই দিন তিনেক পরে আজ রওনা দিয়েছি কাঁটাচারির দিকে। গ্রামটার আধ মাইল আগে বেশ একটা গভীর জঙ্গল মতো আছে।
‘কী হে মুস্তাক? গ্রাম আর কতদূর?’
‘প্রায় চলেই এসেছি হুজুর। এই জঙ্গলের সীমানা পেরোলেই গ্রাম।’ মুস্তাক লোকটা বড়ো ভালো। বছর পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বয়স হবে, যদিও দেখলে বোঝা যায় না! প্রায় সওয়া ছ’ফুট লম্বা। চওড়া কাঁধ, বুকটা জমিদারবাড়ির সিংহ দরজার মতোই বিশাল। আমার সঙ্গে সঙ্গে যখন আরবি ঘোড়ায় চেপে যায়, ঝকঝকে ইউনিফর্ম—কোমরে রবার্ট মোল অ্যান্ড সন্স-এর তরোয়াল আর কাঁধে মার্টিনি হেনরি রাইফেল, সাধারণ লোকজনের মনে একটা ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধার উদ্রেক হয় বইকি। অবশ্য দেখতে যেমনই হোক, লোকটা খুব সহজ-সরল আর ভীষণ ধার্মিক।
আস্তে আস্তে জঙ্গল পাতলা হয়ে গেল। আমরাও গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করলাম। শীতের সকাল, সুন্দর রোদ উঠেছে। বাচ্চারা ঘরের উঠোনের সামনে খেলছে। বাড়ি-ঘরগুলো বেশ ফাঁকা ফাঁকা, মাঝে লাল-হলুদ বুনো ফুল ফুটে আছে। দু’একটা প্রাচীন বটগাছ, বাঁশঝাড় চোখে পড়ল। একটা ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছ দেখতে পেলাম, তাতে মনে হয় শালিখ বাসা করেছে। একটু দূরে উঁচু শিমুল গাছের ডালে একটা চিল বসে আছে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা গ্রামের মাঝখানে একটা বাঁধানো জায়গায় এসে উপস্থিত হলাম। সাধারণত বাংলার প্রায় সব গ্রামেই এরকম মন্দিরসংলগ্ন জায়গা থাকে, যেখানে গণ্যমান্য লোকেরা এসে আড্ডা জমান এবং আলাপ আলোচনা করেন।
আমাদের আগমন সংবাদ ততক্ষণে চাউর হয়ে গেছে। চণ্ডীমণ্ডপে একটা ছোটখাটো জটলা। ভিড়ের মধ্যে থেকে শৌখিন দেশীয় পোশাক পরিহিত গৌরবর্ণ এক ব্যক্তি এগিয়ে এলেন।
‘নমস্কার রওয়ান সাহেব! কাঁটাচারি গ্রামে আপনাকে স্বাগত। আমি গোকুল, এখানকার জমিদার।’ ভদ্রলোক হাতজোড় করে ভারতীয় কায়দায় আপ্যায়ন করলেন। ‘আমি অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম কবে আপনার সঙ্গে আলাপ হবে! ব্রায়ার্ন সাহেব কেমন আছেন?’
‘আরে গোকুল, সাহেব এতটা পথ ঘোড়ায় চড়ে এসেছেন, ওঁকে আগে বসতে দাও।’ এক পক্ককেশ বৃদ্ধ বলে উঠলেন।
আমি সৌজন্যমূলক হাসি হাসলাম। খুব আন্তরিক এখানকার গ্রাম বাংলার মানুষরা। গোকুল আমাকে এক এক করে গ্রামের বাকি গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিচ্ছিল। শুধু কয়েকজন উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণ একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন। তাঁরা বিধর্মীদের ছায়াস্পর্শ করেন না।
‘গোকুল, উনি মনে হয় এইসব একঘেয়ে আলোচনায় বিরক্ত হচ্ছেন!’
চণ্ডীমণ্ডপের হালকা গুঞ্জন এক লহমায় থেমে গেল। শীর্ণকায় এক বৃদ্ধ ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে সাদা ধুতি। এবং এই শীতেও গায়ে একটা পাতলা চাদর। ঘাড় পর্যন্ত লম্বা লম্বা সাদা চুল। দাড়ি প্রায় বুক স্পর্শ করেছে। মোটা এবং জোড়া ভ্রু। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। বলে দিতে হয় না ইনিই আদিত্যনাথ।
আমি চণ্ডীমণ্ডপের চাতাল থেকে নেমে দাঁড়ালাম। গোকুল শশব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এসে বলল, ‘ইনি আদিত্যনাথ। আমাদের গ্রামে কিছুদিন…’
‘উনি জানেন আমি কে। এবং উনি আমার সঙ্গেই দেখা করতে এসেছেন। তাই তো রওয়ান সাহেব?’ আদিত্যনাথ মৃদু হেসে আমার চোখের দিকে তাকালেন।
চোখাচোখি হতেই আমার শরীরের মধ্যে দিয়ে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহ খেলে গেল। হঠাৎ বরফ গলা জলে ঝাঁপ দিলে যেমন হয়। প্রত্যুত্তরে আমি হাতজোড় করে নমস্কার করলাম। সাধারণত যেটা করি না। কিন্তু ভদ্রলোকের চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। চোখের মণিটা একটু বড় আর প্রায় গোটা চোখে ছড়িয়ে পড়েছে বলে ভ্রম হয়। অসমান ব্লটিং পেপারে একফোঁটা কালি ফেললে যেমন সেটা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে যায়, পুরো গোলাকার থাকে না, অনেকটা সেইরকম।
‘রওয়ান সাহেব, এখানে বড্ড ভিড়। চলুন এই গরিবের কুটিরে বসে একটু আলাপটা সেরে নেওয়া যাক। কি গোকুল, আপত্তি নেই তো?’
আদিত্যনাথ মৃদু গলায় কথা বললেও কর্তৃত্বের সুর স্পষ্ট।
‘না না, আপত্তির কী আছে!’ গোকুল কিছু বলার আগেই আমি বলে উঠলাম। ততক্ষণে আমি নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়েছি। ‘চলুন আপনার বাড়িতে বসা যাক। মুস্তাক তুমি এখানেই অপেক্ষা করো।’ মুস্তাক মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। গ্রামের বাকিরাও আর কিছু বললেন না। বোঝাই যায় আদিত্যনাথ একটু বেশিই সম্মান পেয়ে থাকেন, সেটা কতটা ভয়ে আর কতটা শ্রদ্ধায় তা নিয়ে অবশ্য সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।
গ্রামের একপ্রান্তে আদিত্যনাথের কুঁড়ে ঘর। একদম জঙ্গলের সীমানায় বলা যায়। ঘরটা একটু অদ্ভুত। সাধারণত গ্রামের বাড়িগুলোর ভিত একটু উঁচু করে বানানো হয়। দু’ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে বারান্দা মতো থাকে। সেটা ঘিরেই একটা বা দুটো ঘর। কিন্তু আদিত্যনাথের বাড়ি একদম উলটো পদ্ধতিতে বানানো। একটা বৃত্তাকার জমির মাটি খুঁড়ে ফেলে বাকি রাস্তা থেকে সেটাকে নিচু করে ফেলা হয়েছে। এবং সেই নিচু জমিতেই ঘরটা বানানো। আর পাঁচটা গ্রামের বাড়ির থেকে আকারে বড়ো, কিন্তু দরজা খুব ছোট! আন্দাজ সাড়ে চার ফুট উচ্চতা হবে।
দরজার সামনে এসে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালেন আদিত্যনাথ। তারপর ঘরে প্রবেশ করলেন। আমিও পিছু পিছু মাথা নিচু করে ঘরের মধ্যে
ঢুকলাম।
ঘরটা খুবই সাধারণ। দেওয়াল কুলুঙ্গিতে মৃৎপাত্রে রাখা রেড়ির তেলের প্রদীপ জ্বলছে। জানলায় সরু এবং লম্বা করে কাটা কাপড়ের ফালি ঝোলানো। খুব সম্ভব ওগুলোতে সুগন্ধী দেওয়া আছে, জানালা দিয়ে আসা বাতাস সেই সাক্ষ্যই বহন করছে। ঘরে একটা নিচু কাঠের চৌকি আর বাঁশ কেটে বানানো একটা উঁচু টুলের মতো বসার জায়গা।
কোথায় বসব ভেবে আমি ইতস্তত করছিলাম। আদিত্যনাথ টুলের ওপরে আমাকে বসতে ইঙ্গিত করে নিজে চৌকির ওপরে পদ্মাসনে বসলেন। তারপর গলা তুলে চেঁচিয়ে কাউকে ডাকলেন। ‘চন্দিরা! চন্দিরা!’
রান্নাঘর থেকে এক তরুণী দ্রুতপায়ে ঘরে প্রবেশ করল। সাদা বোরখা পরা। মুখও অর্ধেকটা ঢাকা। আমি একটু অবাক হলাম। তরুণী কি মুসলিম? হিন্দু মুসলিম বিবাহ একেবারে অসম্ভব না হলেও খুবই বিরল তো বটেই।
‘আমার সহধর্মিণী, চন্দিরা।’ আদিত্যনাথ আলাপ করিয়ে দিলেন। ‘যাও, অতিথির জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করো।’ তরুণী দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আদিত্যনাথ পদ্মাসনে বসে চোখ বন্ধ করলেন। ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। খাবার না আসা পর্যন্ত উনি কথা বলতে চান না। লোকটার ব্যবহার খুবই অদ্ভুত! যাই হোক, আমিও একটু সময় পেলাম ওঁকে আরেকটু খুঁটিয়ে স্টাডি করার। নাকি এটাই উনি চাইছিলেন?
যদিও ওঁকে দেখে কিছুতেই আমার ২৫০ বছর বয়স বলে মনে হচ্ছিল না। খুব বেশি হলে ৫৫-৬০ হবে হয়তো। এবং ওঁর স্ত্রীয়ের মুখ ঢাকা থাকলেও ২৪-২৫ এর বেশি বয়স হবে বলে আমার মনে হয়নি। ভারতবর্ষে অবশ্য স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যে বয়সের এইরকম ফারাক তখনকার দিনে বেশ স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।
অল্পক্ষণ পরেই চন্দিরা এসে কলাপাতায় কিছু মরসুমি ফল আর দুধ এবং নারকেল দিয়ে তৈরি মিষ্টিজাতীয় জিনিস পরিবেশন করল। তারপর ঘরের এক কোণে দেওয়ালে হেলান দিয়ে মাটিতে বসল। চন্দিরার মুখ এখন আর ঢাকা ছিলনা। মেয়েটি বেশ রূপবতী। বড় বড় চোখ। ধনুকের মতো ভ্রু।
‘আপনার স্ত্রী কি মুসলিম?’ প্রশ্নটা জিজ্ঞেস না করে আর পারলাম না।
আদিত্যনাথ হেসে উঠলেন। ‘না না, মুসলিম কেন হবে। চন্দিরা হিন্দু। তা রওয়ান সাহেব, আপনি কি বিবাহ করেছেন?’
‘না।’ আমি উত্তর দিলাম। ‘আমাদের মধ্যে খুব কম বয়সে সাধারণত বিয়ে হয় না। আগে চাকরিতে উন্নতি করি, তারপর না হয় ওসব নিয়ে ভাবা যাবে।’
‘খুবই অদ্ভুত।’ আদিত্যনাথ একটা ফলের টুকরো মুখে দিয়ে বললেন। ‘রওয়ান সাহেব, আপনাদের মতো গোরা যুবকরা আমাদের এই দেশটা চালাচ্ছে। কত গুরুদায়িত্ব সামলান আপনারা। অথচ মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তি, কাম! তাকেই উপেক্ষা করেন? বলুন রওয়ান সাহেব, সারাদিনের কাজের শেষে রাত গভীর হলে কোনও নগ্ন নারীদেহের স্পর্শ পেতে কি ইচ্ছা করে না আপনার?
আদিত্যনাথের বলার ভঙ্গিতে একটা অদ্ভুত মাদকতা আছে। ক্ষণিকের জন্য কোনও কোনও হিন্দু মন্দিরের গায়ে খোদাই করা সঙ্গমরত নরনারীর মূর্তি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই আমি নিজেকে সামলে নিলাম।
‘ক্ষমা করবেন, বাবু আদিত্যনাথ।’ আমি গলায় যথাসম্ভব গাম্ভীর্য এনে উত্তর দিলাম। ‘এইসব ব্যক্তিগত ব্যাপারে খোলাখুলি আলোচনা করতে আমি ঠিক প্রস্তুত নই।’
‘তাই?’ আদিত্যনাথ হেসে উঠলেন। নাক দিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ করলেন। ‘তোমরা শাসক জাতি, তোমাদের রাজত্বে নাকি সূর্য কখনও অস্ত যায় না? প্রায় গোটা পৃথিবীর মানুষের প্রভু তোমরা, কিন্তু মানুষ মাত্রেই যার দাস সেই রিপু নিয়ে আলোচনাতেই তোমাদের এত অনীহা? আচ্ছা তোমার কথা থাক, আমি আমার কথা বলি।
জীবনে বহুবার বিবাহ করেছি আমি। এক-একটি নারী যেন এক-একটি আধার, ইন্দ্রিয়সুখ সঞ্চয় করার।
কী ভাবছ সাহেব?’ গাঢ় স্বরে বললেন আদিত্যনাথ। তারপর কেমন যেন একটা মন্দ্র স্বরে সম্মোহনী সুরে আবৃত্তি করতে শুরু করলেন-
তন্বী শ্যামা শিখরি-দশনা পক্ববিম্বাধরোষ্ঠী
মধ্যে ক্ষামা চকিত-হরিণী-প্রেক্ষণা নিম্ন-নাভিঃ
শ্রোণীভারাদলস-গমনা স্তোক-নম্রা স্তনাভ্যাং…
‘কুসুম ছিল তেমন। চোখে হরিণের দৃষ্টি, ছোট ছোট নিখুঁত দাঁত। সরু কোমর, স্তন যুগলের ভারে একটু ঝুঁকে হাঁটতো। গুরুনিতম্বিনী কুসুমের চলন ছিল মদমত্ত হস্তীর মতন। আবার পারুল ছিল মরালগামিনী। লম্বা লম্বা পা দিয়ে রতিক্রিয়ার সময়ে আমাকে এমন ভাবে আঁকড়ে ধরত, যেন নাগপাশ!
রাধিকা ছিল এক কাশ্মীরি ব্রাহ্মণের মেয়ে। গায়ের রং শঙ্খের মতো সাদা। চোখ পদ্মের মতো। স্তন গভীর, কোঁকড়ানো চুল। নাসারন্ধ্র ছোট, গীতবাদ্যে পারদর্শিনী।
কুমুদকে যখন বিবাহ করি তখন সে সদ্য কুমারী থেকে যুবতী হয়েছে। সে ছিল দীর্ঘাঙ্গী। দীঘল শ্রবণ, দীঘল নয়ন, দীঘল চরণ, দীঘল পাণি! কুমুদের সারা গায়ে একটুও রোম ছিল না। শুধু নাভির নীচে নবরোমরাজির আভাস। যেন স্বর্গের প্রবেশপথে পারিজাত ছড়ানো, রওয়ান সাহেব, পারিজাত!’
আমি কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। আদিত্যনাথ যে এইভাবে খোলাখুলি নিজের অতীত যৌনজীবন নিয়ে অক্লেশে কথা বলবেন, তা-ও নিজের বর্তমান স্ত্রীর উপস্থিতিতে, সেটা আমি ভাবতেই পারিনি! আমি অপ্রস্তুত হয়ে চন্দিরার দিকে তাকালাম।
আদিত্যনাথের বুঝতে অসুবিধা হল না আমি কী বলতে চাইছি। হেসে বললেন, ’চন্দিরা আছে বলে সঙ্কোচ করবেন না। ও আমার সাধনসঙ্গিনী। আর সাধনমার্গে শরীর ও কামকে আমরা অবহেলা করি না।
তারপর যা বলছিলাম। ফুলন আর শামীমের হাত আর পা ছিল বলিষ্ঠ এবং সুগঠিত। ওদের ভূমি ছিল উর্বর। আমার সবথেকে বেশি সন্তান ওঁদের গর্ভ থেকেই ভূমিষ্ঠ হয়। হরপাল ছিল অন্ধ এবং বধির। কিন্তু ওর বাকি ইন্দ্রিয়গুলো সাধারণ মানুষের থেকে অন্তত দশগুণ বেশি প্রখর ছিল।’
আদিত্যনাথ থামলেন। একটা ফলের টুকরো মুখে দিয়ে বললেন, ‘এরাই ছিল বাকি স্ত্রীদের মধ্যে আমার সবথেকে বেশি পছন্দের।’
আমার অপ্রস্তুত ভাব তখনও কাটেনি। সেটা লুকোনোর জন্য আমি বললাম, ‘কিন্তু একজন মানুষ নিজের জীবদ্দশায় কতবার বিয়ে করতে পারে? আপনি কি বহুবিবাহ করতেন?’
আদিত্যনাথ অন্তর্ভেদী দৃষ্টি হানলেন। ‘তুমি নিশ্চয় আমার বয়স জানতে চাইছ, রওয়ান সাহেব? টেলর সাহেবের কথা নিশ্চয় তোমার বিশ্বাস হয়নি। তোমারই বাংলোয় বসে তামাক সেবন করতে করতেই তো তিনি তোমায় জানিয়েছিলেন যে, আমার বয়স প্রায় ২৫০ বছর! না না, চমকে ওঠার প্রয়োজন নেই। সাধনার পথে কিছু বিশেষ স্তর অতিক্রম করলেই অতি দূরদৃষ্টি জন্মায়। তখন যে ঘটনা তোমার চোখের সামনে ঘটছে না তাও প্রত্যক্ষ করা সম্ভব।’
আদিত্যনাথ কখন আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছেন তা আর খেয়াল করিনি। তবে আমার মনে হচ্ছিল আমার সঙ্গে শুধু গল্প করার জন্যই তিনি আমাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেননি। এসবই গৌরচন্দ্রিকা। নিশ্চিত তাঁর অন্য কোনও গূঢ় উদ্দেশ্য আছে। আমি খাবারে মনোনিবেশ করলাম। আদিত্যনাথ বলে চললেন-
‘…হ্যাঁ, আমার বয়স প্রায় আড়াইশো বছর। সাধনার যে পথ আমি বেছে নিয়েছিলাম তাতে মৃত্যু এবং বার্ধক্যকে বিলম্বিত করা সম্ভব। বলতে বাধা নেই এই কাজে আমি সফল হয়েছি। কিন্তু মৃত্যুকে বিলম্বিত করা সম্ভব হলেও, তা অবশ্যম্ভাবী। এবং আমার গণনা অনুযায়ী আমার মৃত্যু অতি নিকটে। তাই জীবনের শেষ দিনগুলো শান্তিতে কাটানোর জন্য আমি এই গ্রামে চলে আসি। রওয়ান সাহেব, আমার মৃত্যুর পরে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে, এবং সেই অনুরোধ করবার জন্যই আমি তোমাকে আজ নিমন্ত্রণ করেছি।’
‘আমি? আমাকে কোনও কাজের ভার দিতে চান? এবং সেটাও আপনার মৃত্যুর পরে করতে হবে? কী সেটা?’
‘আমি এখনই তা বলতে অপারগ। আমার মৃত্যুর পরে তুমি নিজেই জেনে যাবে কাজটি কী। এখন এসো, আমার সাধনার সামান্য কিছু নিদর্শন দেখাই তোমাকে।’
আদিত্যনাথ খাট থেকে নেমে দরজার দিকে অগ্রসর হলেন। আমিও তাঁকে অনুসরণ করলাম। ঘর থেকে বেরোবার আগে চন্দিরাকে খাবারের জন্য ধন্যবাদ জানালাম। সে-ও মিষ্টি হেসে ঘাড় নাড়ল।
আদিত্যনাথের সঙ্গে বাড়ির পেছনের দিকে এসে উপস্থিত হলাম। ঘন বাঁশঝাড়ের জঙ্গল বলে ভেতরটা একটু অন্ধকার অন্ধকার। কিছুটা এগোতেই তীব্র পচা গন্ধ এসে নাকে ধাক্কা মারল।
একটা কুকুরের আধপচা গলা মৃতদেহ। চোখ দুটো নিশ্চয় কাকে ঠুকরে খেয়েছে। সেই স্থানে কালো গর্ত। মুখ হাঁ করা। জিভ অর্ধেকটা নেই। সারা গায়ে পিঁপড়ে থিকথিক করছে। মুখ দিয়ে পিঁপড়ের সারি কুকুরটার দেহের ভিতরে চলে গেছে। বড় বড় নীল মাছি ভনভন করে উড়ছে। চোখের গর্তগুলোর মধ্যে ম্যাগট কিলবিল করছে।
নোংরা দৃশ্য। আমি মুখে রুমাল চাপা দিলাম। আদিত্যনাথ বললেন, ‘কুকুরটা যে মৃত সেই বিষয়ে তোমার কোনও সন্দেহ আছে?’
‘না! এতে আবার সন্দেহের কী আছে?’ আমি অবাক হলাম। ‘অন্তত দিন চারেক আগে মরেছে নিশ্চয়।’
‘বেশ।’ আদিত্যনাথ কুকুরের মৃতদেহটাকে ঘিরে পায়ের নখ দিয়ে একটা বৃত্তাকার দাগ কাটলেন। তারপর ডান হাত দিয়ে বাম হাতের অনামিকা মুঠো করে ধরে আকাশের দিকে কোনাকুনি তাকিয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় অতি দ্রুত কোনও মন্ত্রচ্চারণ করতে শুরু করলেন।
নিমেষে দিনের ঝকঝকে রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনটা যেন একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আকাশে মেঘ করে এল, সূর্যের রংটা সামান্য ঘোলাটে হয়ে উঠল। কয়েকটা দাঁড়কাক কর্কশ স্বরে ডাকতে ডাকতে মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল।
পরিবেশটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে আমার মনে হচ্ছিল এখান থেকে চলে যাওয়াই উচিত। কিন্তু শেষপর্যন্ত কী হয় জানার তীব্র কৌতূহলেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই কুকুরের মৃতদেহে একটা অদ্ভুত কম্পন শুরু হল। আমি বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে ছিলাম। এও কি সম্ভব? কিন্তু আমার সমস্ত যুক্তিতর্কের চিন্তাভাবনাকে ধূলিসাৎ করে কুকুরটা কিংবা বলা ভালো কুকুরের মৃতদেহটা আধখানা জিভ এবং ম্যাগটভরতি চোখের অতলস্পর্শী গহ্বর নিয়ে ঘাড় উঁচু করে আমার দিকে তাকাল।
এখানে আর এক মুহূর্তও নয়! আমি একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে জঙ্গল ভেঙে গ্রামের দিকে ছুটতে শুরু করলাম।
(৩)
‘সাহেব! আপনি সকালে কী দেখে এত ভয় পেয়েছিলেন?’ মুস্তাক খান টেবিলে রাতের খাবার পরিবেশন করতে করতে জিজ্ঞেস করল।
আদিত্যনাথের বাড়ি থেকে আমাকে অমন উদভ্রান্তের মতো ফিরতে দেখে মুস্তাক সত্যিই খুব অবাক হয়েছিল। আমার মুখে ভয়ের ছাপ নিশ্চয়ই ওর দৃষ্টি এড়ায়নি। আমিও বিশেষ সময় নষ্ট না করে একলাফে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসে রওনা দিয়ে দিয়েছিলাম। গোকুল কিছু একটা বলতে এসেছিল বটে, কিন্তু ‘দরকারি কাজ আছে তাই ফিরে যাচ্ছি, আবার কিছুদিন বাদে আসব’ ইত্যাদি বলে দ্রুত কাঁটাচারি থেকে বেরিয়ে আসি। রাস্তাতেও মুস্তাকের সঙ্গে বিশেষ কথা বলিনি।
এখনও কোনও জবাব দিলাম না। রাতে ভালো ঘুম হল না। সারারাত স্বপ্নে পচাগলা জীবজন্তুর মৃতদেহ দেখে চমকে চমকে ঘুম ভেঙে গেল।
অন্তত এক সপ্তাহ লাগল নিজেকে পুরোপুরি সামলে নিতে। ব্রায়ার্নকে কাঁটাচারি গ্রাম ভিজিট নিয়ে রিপোর্টও পাঠিয়ে দিলাম। অবশ্য স্বাভাবিক ভাবেই কুকুরটার কথা রিপোর্টে লিখিনি। তারপর বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কাঁটাচারি গ্রামের স্মৃতিও ফিকে হয়ে উঠতে লাগল। নিজের মনকে নিজেই বোঝালাম যে কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটেনি, নিশ্চয়ই আদিত্যনাথ খাবারে কিছু মিশিয়ে দিয়েছিলেন। সেজন্যেই সম্ভবত আমার দৃষ্টিভ্রম হয়ে থাকবে।
আরও মাস চারেক পরের কথা। সারাদিন কাজের শেষে সন্ধ্যায় বাংলোয় ফিরেছি। কড়া করে একটা পানীয় বানিয়ে চেয়ারে বসতেই ধূপ-ধুনোর সঙ্গে অপরিচিত কোনও ফুলের গন্ধ পেলাম। কিন্তু এই গন্ধটা আমার খুব চেনা! এই গন্ধের সঙ্গে কোনও স্মৃতি জড়িত, যেটা আমি কিছুতেই মনে করতে চাই না। হঠাৎ মনে হল ঘরের কোণে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। চমকে তাকিয়ে দেখি আদিত্যনাথ দু-হাত জোড় করে আমায় নমস্কার জানাচ্ছেন। পরনে সেই সেদিনের মতো সাদা চাদর আর ধুতি।
দৃশ্যটা এতই অসম্ভব যে, চিৎকার করে উঠতেই ঘুমটা ভেঙে গেল! কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝতেই পারিনি। তাহলে স্বপ্নই দেখছিলাম হয়তো। কিন্তু স্বপ্ন কী এত বাস্তব হয়? এমনকি সেই গন্ধটাও এখনও নাকে লেগে আছে। এখন মনে পড়েছে, আদিত্যনাথের ঘরেও এই গন্ধটাই ছিল।
‘সাহেব এইমাত্র একটা খবর এসেছে।’ মুস্তাক ঘরে এসে লম্বা স্যালুট ঠুকল। ‘কাঁটাচারি গ্রামে আদিত্যনাথ দেহত্যাগ করেছেন। শোনা যাচ্ছে ওঁর স্ত্রী নাকি সতী হবে!’
আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম। এইমাত্র আমি আদিত্যনাথকে স্বপ্নে দেখলাম আর সঙ্গে সঙ্গেই ওঁর মৃত্যু সংবাদ এল! এটা কি নিছকই কাকতালীয় নাকি সত্যিই ওঁর কোনও অলৌকিক ক্ষমতা আছে? কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, চন্দিরা সতী হবে!
সতী মানে সতীদাহ প্রথার কথা কে না শুনেছে। ভারতবর্ষের অন্যতম বর্বর এবং অমানবিক ধর্মীয় উন্মাদনা ছিল এই সতীদাহ প্রথা। কিন্তু বছর কুড়ি আগেই তো আইন করে সেটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে! ব্রিটিশ সরকার এই আইন পালনের ব্যাপারে চরমপন্থা অবলম্বন করে থাকে। আর কাঁটাচারি যেহেতু আমার ডিভিশনেই পড়ছে…
‘আমরা কাল সকালে কাঁটাচারি যাব মুস্তাক।’
‘জি, হুজুর!’
(৪)
পরদিন সকালে কাঁটাচারি পৌঁছতে আগের বারের মতো আন্তরিক অভ্যর্থনা আর পেলাম না। ধর্মপালনের ব্যাপারে গ্রামের লোকেরা খুবই গোঁড়া। ভণিতা না করে সরাসরি গোকুলকে বললাম চন্দিরার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
‘কিন্তু চন্দিরা শোকাতুর, আর ওর শরীরও ভালো নেই। তা ছাড়া আপনার… ওর সঙ্গে কী প্রয়োজন থাকতে পারে!’
‘গোকুল।’ আমি সৌজন্যের খোলস ছেড়ে প্রশাসকের মুখোশ পরে নিলাম। ‘আমি জানি তোমরা আমাকে কী লুকোচ্ছ। কিন্তু ডিস্ট্রিক্ট অফিসার হিসেবে কোনও রকম বেআইনি কাজ আটকানো আমার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। আমি চন্দিরার সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছি। মুস্তাক, দেখো আমাকে কেউ যেন বিরক্ত না করে!’
মুস্তাক উত্তরে নিজের গোঁফে একবার হাত বুলিয়ে নিল। আমি আদিত্যনাথের বাড়ির দিকে এগোলাম।
ঘরের সামনেই চন্দিরার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ‘আসুন সাহেব।’ ম্লান হেসে বলল চন্দিরা। দ্বিতীয়বারের জন্য আদিত্যনাথের ঘরে প্রবেশ করলাম।
কিছুই বদলায়নি। শুধু সেই চেনা গন্ধটার সঙ্গে একটা হালকা পচা গন্ধও যেন পাচ্ছিলাম। কালই আদিত্যনাথের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর গন্ধ কি? কিন্তু ওঁর মৃতদেহই বা কোথায়? আমি ঘরের চারদিকে তাকালাম।
‘ওঁর মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আপনি বসুন।’ চন্দিরা বাঁশের টুলে বসতে ইঙ্গিত করল। তারপর নিজে খাটে হেলান দিয়ে মাটিতে বসল।
‘চন্দিরা!’ আমি দ্রুত প্রসঙ্গে এলাম। ‘তুমি যা হারিয়েছ সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করার ক্ষমতা আমার নেই ঠিকই, কিন্তু তবুও তোমায় সতী হতে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
চন্দিরা হাসল। বড়ই দুঃখের সে হাসি। ‘কিন্তু এ ছাড়া তো আমার কাছে আর কোনও রাস্তা নেই সাহেব। তবে আপনাকে সত্যিটা বললে আপনি নিশ্চয়
আর আপত্তি করবেন না।’
চন্দিরা উঠে দাঁড়াল। তারপর পরনের কাপড় খুলতে শুরু করল!
‘থামো! আমি চেঁচিয়ে উঠলাম। তুমি আমাকে তোমার শরীরের প্রলোভন দেখিয়ে নিজের সতী হওয়ার মনস্কামনা পূর্ণ করতে চাও! কিন্তু আমার ওসবে উৎসাহ নেই। আমি ব্রিটিশ রাজকর্মচারী। কোনওরকম প্রলোভনেই বেআইনি কাজ করব না।’ আমি গভীর আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বললাম। আশ্চর্য এদের ধর্মীয় উন্মাদনা।
‘ভুল করছেন সাহেব। আপনাকে আমি কোনও লোভ দেখাচ্ছি না। আমার দিকে তাকান!’ চন্দিরা আদেশের স্বরে বলল। তারপর সম্পূর্ন নগ্ন হয়ে আমার সামনে দাঁড়াল। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে ওঁর দিকে তাকালাম।
চন্দিরার স্তন সুডৌল, শঙ্খের মতো। কটিদেশ সরু, চওড়া জঙ্ঘা। হাত ও পা লম্বা এবং সুগঠিত। গায়ের রং হাতির দাঁতের মতো সাদা। যেন গ্রীক দেবী অ্যাফ্রদিতি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। শুধু কবজি, হাঁটু, কাঁধ ইত্যাদি স্থানে জটিল নকশার মতো করে উল্কি আঁকা। পায়ে পায়ে চন্দিরা এগিয়ে এল, একদম আমার সামনে এসে দাঁড়াল। শরীরে কোথাও রোম নেই, শুধু নাভির সামান্য নীচে…
‘ভালো করে দেখুন।’ চন্দিরা নিজের হাতটা আমার চোখের সামনে এনে কবজির উল্কির দিকে ইঙ্গিত করল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম দূর থেকে যেটা দেখে উল্কি বলে মনে হচ্ছিল সেটা আসলে সূক্ষ্ম সেলাইয়ের দাগ। নিপুণ দক্ষতায় কেউ যেন পশমের সুতো দিয়ে কব্জিতে দুরুহ কোনও অস্ত্রোপচার করেছে। একইরকম দাগ কাঁধ, হাঁটু প্রভৃতি স্থানে। বিদ্যুচ্চমকের মতো একটা সম্ভাবনা আমার মনে ঝলসে উঠল। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব!
‘এই দাগ… এই দাগগুলো কীভাবে…!’
‘হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ভাবছেন।’ চন্দিরা ক্লান্ত পায়ে হেঁটে গিয়ে জানলার সামনে দাঁড়ালো। তাঁর প্রশস্ত সাদা পিঠে জাফরি দিয়ে আসা আলোর আল্পনা। ‘আদিত্যনাথ যদিও উচ্চমার্গের সাধক ছিলেন এবং নিজের জীবনে জরা ও মৃত্যুকে বিলম্বিত করেছিলেন, তবুও অন্য কোনও মানুষকে দীর্ঘায়ু করার বিদ্যা তিনি আয়ত্ত করতে পারেননি। কিন্তু তিনি মৃতদেহে প্রাণসঞ্চার করতে পারতেন। তাই নিজের দীর্ঘ জীবনে তিনি তাঁর পছন্দের নারীদের দেহাংশ বিশেষ ক্ষমতাবলে সংরক্ষণ করে রাখতেন। কারও হাত, কারও পা, কারওর বুক, কারওর উদর। তারপর সেইসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে একটি পূর্ণ নারীদেহ তৈরি করেন এবং তাতে প্রাণসঞ্চার করেন। নামকরণ করেন, চন্দিরা!’
চন্দিরা থামল। আবার আমার সামনে এসে দাঁড়াল। ‘রওয়ান সাহেব, উনি চেয়েছিলেন আমায় দীর্ঘায়ু করতে। তাঁর সৃষ্টি তাঁর মৃত্যুর পরও যেন আরও বহু দিন পৃথিবীতে থাকে সেটাই কামনা করতেন। কিন্তু মানুষ তো ভগবান নয়, তাই তাদের সব মনস্কামনা পূর্ণও হয় না। জীবনের শেষ সাধনায় সিদ্ধিলাভের আগেই তাঁকে চলে যেতে হল। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি আমিও আর বেশিদিন নেই। আমার শরীরে পচন শুরু হয়েছে ওঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই! যাদের অঙ্গ নিয়ে আমায় সৃষ্টি করা হয়েছে তাদের আত্মারাও শান্তি পায়নি এতদিন! বারবার তারা আমার কাছে আসছে। বিদেহী হয়েও নিজের দেহের অধিকার ছাড়তে তারা রাজি নয়! আমি বেঁচে থাকলে তা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর হবে রওয়ান সাহেব! দয়া করে আমায় অনুমতি দিন। আদিত্যনাথ অগ্নির উপাসক ছিলেন। তাঁর সঙ্গে এক আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেই আমার আত্মাও শান্তি পাবে!’
চন্দিরার আকুতি আমার কানে বাজতে লাগল। আমি আমার করণীয় স্থির করে উঠতে পারলাম না। হঠাৎ দূর থেকে ঢাক, ঢোল, খোল-করতালের শব্দ ভেসে এল।
‘ওঁর সৎকারের সময় উপস্থিত। চলুন আমরা শ্মশানে যাই। বেশি দূর নয়, এখান থেকে হাঁটাপথ।’
চন্দিরা ততক্ষণে একটা সাদা শাড়ি পরে নিয়েছে। সে ঢাক-ঢোলের শব্দ যেখান থেকে ভেসে আসছে সেদিকে অগ্রসর হল। আমার যুক্তিবুদ্ধি তখন আর বিশেষ কাজ করছিল না। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে দুলতে আমি একবস্ত্রা নারীটিকে অনুসরণ করলাম।
শ্মশানে গোটা গ্রাম ভেঙে পড়েছে। বিশাল করে চিতা সাজানো হয়েছে। সেখানে আদিত্যনাথের মৃতদেহ শোয়ানো। গোকুল হাতে একটা মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
‘আপনি চলে যান, রওয়ান সাহেব! আমাকে আমাদের কাজ করতে দিন।’ গোকুল হিসহিস করে বলল।
ততক্ষণে আমার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে। আমি কোনও উত্তর না দিয়ে গোকুলের হাত থেকে মশালটা কেড়ে নিয়ে চিতার দিকে এগিয়ে গেলাম। চিতার মাঝখানে চন্দিরা পদ্মাসনে বসে ছিল।
দাহ্যপদার্থে ভেজানো কাঠ আগুনের সংস্পর্শে দ্রুত জ্বলে উঠল। সর্বগ্রাসী আগুনের লেলিহান শিখা যখন একটি মৃত এবং আরেকটি জীবিত শরীরকে অধিকার করে নিচ্ছিল তখনও চন্দিরার ঠোঁটের কোণে একটু হাসির চিহ্ন লেগে ছিল। মুক্তির হাসি।
লেখকের অনুমতিক্রমে কাহিনিটি অনূদিত এবং প্রকাশিত হল।
