শ্ৰীমতী – রণেন ঘোষ

সত্যি কথা বলতে কি আনন্দপুর সম্বন্ধে আমি কিছুই জানতাম না। অবশ্য এটা জানতাম যে আমার এক্তিয়ারের মধ্যে আনন্দপুর বলে একটা গ্রাম আছে। আর না জানার কারণ আছে। আমি বদলি হয়ে আসা পর্যন্ত এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি যার ফলে গ্রামবাসীদের আমাদের মানে পুলিশের শরণাপন্ন হতে হবে।

সেদিন সকালে অফিসে ঢুকতেই দেখি একটা খাম পড়ে আছে আমার টেবিলে। ছাপ দেখে বুঝলাম হেডকোয়ার্টার থেকে আসছে। চিঠি পড়ে কিন্তু কিছুই মানে বুঝলাম না। শুধু লেখা আছে আনন্দপুর গ্রাম সম্বন্ধে যেন সতর্ক থাকি। অনেককিছু অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছে সেখানে।

কোনও কিছু বলার আগে আমাদের পরিচয় দেওয়া ভালো। আমি সম্প্রতি এই থানায় বদলি হয়ে এসেছি। এখানে এসে দেখলাম আমার বন্ধু তরুণ সেন এখানকার অ্যাসিস্ট্যান্ট ইন্সপেক্টর। তরুণ সেনের একটু পরিচয় না দিলে তার চরিত্রের অনেকটা বাদ থেকে যাবে। লম্বায় প্রায় পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি, বলিষ্ঠ গড়ন। মাথার চুল কোঁকড়ানো। গায়ের রং ফর্সা। চোখ দুটো ভাসা ভাসা কল্পনাপ্রবণ। এক কথায় বলা যায় সুপুরুষ। অবশ্য তার একটি বিশেষ দুর্বলতা আছে। জীব জন্তুদের অসম্ভব ভালোবাসে সে। তাদের দুঃখ-দুর্দশা দেখলেই বলে, ‘এদের যারা কষ্টে রাখে, আইন করে তাদের শাস্তি দেওয়া দরকার।’ তাই ওর বন্ধু-বান্ধবদের মতে চারটে পা এবং কিছু লোম দেখলেই তরুণ মুগ্ধ হয়ে যায়। জন্তু-জানোয়ারদের সঙ্গে তার ব্যবহার দেখলে মনে হয় তারাই তরুণের প্রকৃত বন্ধু।

সুতরাং চাকরি ছাড়াও তার একটা কাজ হচ্ছে জীবজন্তুদের পরিচর্যা করা এবং যদি আইনের মধ্যে পায় তো জীব-জন্তুদের যারা কষ্ট দেয় তাদের শাস্তি দেওয়া।

যাক্, কিছুক্ষণের মধ্যেই আনন্দপুর থেকে কয়েকজন লোক এল আমার কাছে। তরুণ তাদের বসতে বলল।

একে একে তাদের বক্তব্য শুনতে লাগলাম। আর তরুণ নোট বইতে প্রয়োজনীয় অংশগুলো টুকতে আরম্ভ করলো।

প্রথমে নৃপেন বোস বললেন, ‘সেদিন খুব ভোরে আমি দুধ নিয়ে পাশের গ্রামে যাচ্ছি। তখনও চাঁদ ডোবেনি। পুবের আকাশ অল্প অন্ধকারে লাল হচ্ছে। স্পষ্ট দেখলাম আমার রাস্তার কিছু দূরে কি যেন দুটো দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো রগড়ে নিলাম। না, দেখতে কোনও ভুল হয়নি। দু’পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখখানা ঠিক শেয়ালের মতো। অথচ স্পষ্ট দেখলাম লেজ নেই। আবার দু-পাশ থেকে হাতের মতো ও যেন কি দেখা যাচ্ছে। উচ্চতায় বোধ হয় পাঁচ কি ছয় ফুট হবে। তারা হেলে-দুলে হেঁটে এসে রাস্তায় ওপর দাঁড়াল। এবার চোখে পড়লো বুক পেট একদম গোল মসৃণ। মাথায় কোনও চুল নেই। কিন্তু শিং-এর মতো কি যেন রয়েছে। চোখ দুটো গোল গোল, বেশ বড় আর যেন বাইরের দিকে ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। তার পরেই আমার দিকে এগিয়ে এল ওরা। আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম।’

আরও অনেকে দেখেছে বলল। আর তাদের বর্ণনার সঙ্গে নৃপেনবাবুর পার্থক্যও বেশ। অনেকে বলল যে হাতদুটো ঠিক মানুষের হাতের মতো। আমি বললাম, ‘আচ্ছা এমনও তো হতে পারে ওইরকম বিদকুটে পোষাক পরে কেউ আপনাদের ভয় দেখিয়েছে।’ কিন্তু তারা মানতে রাজি হল না। এর উত্তরে যা বলল তাতে সত্যিই চিন্তিত হলাম। উত্তেজিতভাবে একজন বলল— ‘আপনি কি বলছেন? মানুষ ভয় দেখাচ্ছে। এই তো সেদিন রামদা ওদের তাগ করে গুলি ছুঁড়লো। স্পষ্ট সবাই দেখলো গুলি বুক ভেদ করে চলে গেল। মরা দূরে থাক, দৌড়ে ওরা বনের মধ্যে ঢুকে গেল।’

‘স্যার, আপনারা একবার নিজের চোখে দেখবেন চলুন। তাহলে ব্যাপারটা সব বুঝতে পারবেন’, একজন অনুরোধ করল।

মোদ্দা কথা হল, এই ভূতুড়ে ব্যাপারে গ্রামের সবাই খুব ভয় পেয়ে গেছে। সন্ধ্যার পরে কেউ আর রাস্তায় বেরোয় না। সন্ধ্যেবেলায় যেন গভীর রাত নেমে আসে আনন্দপুরে। গভীর রাতে জানালা দিয়ে তাকালেই ওই দুই মূর্তিকে প্রায়ই দেখা যায় যেখানে সেখানে সুতরাং গ্রামবাসীরা এ বিষয়ে আমাদের সাহায্য চায়।

আমি বললাম, ‘কিন্তু তারা যদি কোনও ক্ষতি না করে থাকে তো তাদের বিরুদ্ধে কি করা যাবে তো বুঝি না!’ তরুণ এবার মুখ খুলল। জোরালো গলায় বলল, ‘আমার মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি আনন্দপুরে আমাদের যাওয়া দরকার। গ্রামের লোকেরা দু’দুটো প্রাণীর ওপর সমানে অত্যাচার চালাচ্ছে। সুতরাং এ সমস্যার সমাধান আমাদের করতেই হবে।’

কথা শুনে ভদ্রলোকেরা বেশ রেগে গেলেন। রেগে মেগেই আরও অনেক কথা বললেন। গ্রামবাসীরা একদিন ওই জীবদুটোকে অনুসরণ করেছিল। কিন্তু আনন্দলোকে এসে তাদের আর দেখতে পায়নি।

‘কে থাকে ওখানে?’ জিজ্ঞাসা করলাম। ‘বাড়ীটা ডাক্তার অনিরুদ্ধ মিত্রের। ডাক্তারবাবু বিয়ে করেননি। একাই থাকেন সেখানে গত চারবছর ধরে’, বলল একজন।

এরপরেই সন্তোষবাবু যা বললেন তা মূল্যবান। সন্তোষবাবুর বক্তব্যের সারমর্ম এই: একদিন সন্তোষবাবু আনন্দলোকের কাছাকাছি গিয়ে পড়েছিলেন। তখন বেশ রাত। আকাশে তারা মিটমিট করছে। হঠাৎ তার মনে হল ডাক্তারবাবুর বিরাট নতুন হলঘরটার থেকে যেন আলো দেখা যাচ্ছে। অনেকদিন থেকেই তাঁর মনে হচ্ছিল ডাক্তারবাবু আবার একটা কেন নতুন ঘর করলেন। তাই এই সুযোগে তিনি জানলার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলেন।

‘আমি হলপ করে বলতে পারি, প্রথমেই ঘরের একদিকে রাখা একটা বিরাট লোহার খাঁচা ছিল। খুব মোটা মোটা লোহার শিক দিয়ে তৈরি। ভেতরে কি আছে দেখতে পেলাম না। সন্দেহ হল এরকম খাঁচা দিয়ে কী করেন ডাক্তারবাবু। তাই ভালো করে দেখবার জন্যে খড়খড়িটা একটু ফাঁক করলাম। দেখলাম ঘরের মাঝখানে বিরাট একটা টেবিল। আর টেবিলের ওপরে— না না সে এক ভয়ানক দৃশ্য। বীভৎস!’, নাটকীয়ভাবে চুপ করলেন সন্তোষবাবু।

‘কী কী দেখলেন ঠিক করে বলুন?’

‘কী করে বলবো আমি বুঝতে পারছি না। টেবিলের ওপর কী যেন একটা পড়েছিল। সাদা, অথচ মনে হচ্ছিল থলথলে। আর, আর সেটা অল্প অল্প করে নড়ছিল। খুব আস্তে আস্তে। ঠিক যেমন করে আমাদের বুক ওঠা-নামা করে।’

‘ব্যাস, এই— আর কিছু নয়?’

‘নানা, আরও আছে।’ সন্তোষবাবু যেন উত্তেজনায় হাঁপিয়ে উঠছেন, ‘কোনও বিশেষ আকৃতি নেই সেটার। কিন্তু তা থেকে বেরিয়েছিল ঠিক যেন একজোড়া হাত। আঙুলও আছে তাতে। আর সেই বীভৎস হাত দুটো অল্প অল্প করে নড়ছিল।’

উপযুক্ত তদন্তের আশ্বাসে গ্রামবাসীরা বিদায় নিল। পাশ ফিরতেই দেখলাম তরুণ যেন কিছু বলতে চায়। উত্তেজনায় অধীর হয়ে পড়েছে সে।

‘শান্ত হও। শান্ত হও। উত্তেজনার কি আছে এতে?’, বললাম আমি। মনে হল আমার কথায় সে আশ্বস্ত হল না।

‘আমার তো মনে হয় ব্যাপারটা খুব সাধারণ। কেউ বোধ হয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে তামাসা করেছে। অথবা কোন অচেনা জন্তুকে দেখেই ভয়ে আঁতকে উঠেছে।’

‘কিন্তু সবাই এক বাক্যে বলে সে হাত-পাগুলো ঠিক মানুষের মতো।’, তরুণ খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলে উঠল।

‘হ্যাঁ, তা অবশ্যি সবাই বলল। কিন্তু…?’

তরুণ নানা কারণ দেখিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করল যে আমি একটা বিরাট ভুল করছি। শেষকালে বলল, ‘আমি কিন্তু বেশ কিছুদিন থেকেই আনন্দপুর সম্বন্ধে কানাঘুষো শুনেছি।’

‘বেশ তো, কি শুনেছ বলই না।’

‘না, অবশ্য খুব নিশ্চয় করে কিছু বলা যায় না। কিন্তু যা রটে তার মধ্যে কিছু সত্যি আছে নিশ্চয়ই।’, বলল তরুণ।

‘বেশ ভালো কথা, তোমার কি মনে হয় বলো।’ আমি তাকে বলার জন্য উৎসাহ দিলাম।

বেশ অনেকক্ষণ ভেবে সে ধীর গলায় বলল, ‘আমার মনে হয় আমরা একটা বিরাট রহস্যের জালে পড়েছি। বৈজ্ঞানিক রিসার্চের আড়ালে ডাক্তার এমন একটা কিছু করেছে যাতে গ্রামের সমস্ত লোক ভয় পেয়ে গেছে। এখন নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পারছেন কী বলতে চাইছি আমি?’

‘না, কিছুই তো বুঝলাম না?’

‘আমরা মানে আমাদের ‘আইল্যাণ্ড অব ডক্টর মোরো’র মতো এক ডাক্তারের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।’ বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল তরুণ।

‘না, না, তুমি বড় বেশি চিন্তা করো। ওসব কোনও কিছু নয়।’

অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে হেসে উঠল তরুণ। বলল, ‘আমি বলতে চাইছি যে আমরা এমন এক ডাক্তারের দেখা পাব যে প্রকৃতিকে মানে না, খোদার উপর খোদকারি করে। জীবজন্তুর অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ করে নিজের খুশি মতো যা খুসি বানায়। জীবজন্তুদের অসীম কষ্ট দিয়ে ভগবান সাজতে চায় সে।’

এতক্ষণে তরুণের বক্তব্য পরিষ্কার হয়ে গেল। তরুণ যে প্রাণ দিয়েও জীবজন্তুদের কষ্ট লাঘব করতে চায়। সুতরাং তরুণের এদিক দিয়ে চিন্তা করা খুবই স্বাভাবিক। হেসে বললাম আমি, ‘তুমি কি মনে করে আমরা আনন্দপুর গেলে প্রথমেই অভ্যর্থনা জানাবে দু-পায়ে দাঁড়িয়ে এক ঘোড়া-মানুষ। অথবা এক কুকুর-মানুষ দরজা খুলে আমাদের নাম জিজ্ঞাসা করবে?’ আরও বললাম, ‘নিতান্ত মন্দ কল্পনা করেনি তরুণ। কিন্তু ভুলে যাচ্ছ কেন আমাদের জগৎ নিতান্তই বাস্তব। অবশ্য অভিযোগ যখন এসেছে তখন তদন্ত আমরা করবোই। কিন্তু আমার বিশ্বাস শেষকালে তুমি নিরাশ হবেই হবে। আরে, সবসময় কল্পনা করলেই কি সব হয়? বাস্তবের কথা চিন্তা করো।’

কিন্তু তরুণকে বোঝানো গেল না। সে গোঁজ হয়ে বসে রইল। কল্পনাই যে তার জীবন। জীবজন্তুর কল্যাণ সাধনই তার জীবনের যেন সব। বেশ বুঝতে পারলাম মনে মনে সে গভীর চিন্তা করে চলেছে।

‘কিন্তু হাত— হাত কেন? আঙুল কেন? জন্তুর হাত কি মানুষের মত হত?’, উত্তেজনা তার চোখে-মুখে প্রকাশ পেতে থাকে।

‘যাক, যখন যাব তখন দেখা যাবে। এখন ওসব ভাবনা ছাড় তো!’, বললাম আমি।

যাই হোক, আমার মনেও কিন্তু অস্বস্তির রেশ জেগে রইল।

পরের দিন। ভোর বেলা। আমি আর তরুণ আনন্দপুরে গেলাম। একটিমাত্র বড় বাড়ী আছে। আনন্দলোক।

আনন্দলোকের সামনে দাঁড়াতেই বেঁটে খাটো একটা লোক বেরিয়ে এল।

আমার পরিচয়পত্র দিলাম হাতে। সে আমাদের এক লম্বা-চওড়া বৈঠকখানায় নিয়ে বসালো।

অনেকক্ষণ বসে থাকতে হল। তরুণ তো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চারদিকে দেখতে লাগলো! চোখে-মুখে তার সন্দেহের আভাস। বেশ ছিমছাম ঘর। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটা বড় টেবিল ও তার চারপাশে কিছু চেয়ার ছাড়া আর কিছুই নেই সেখানে। তরুণকে বললাম সে যেন সব সময় সজাগ থাকে। সবকিছু যেন ভালো করে দেখে। কেননা আমি হয়তো ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সব দেখতে পাব না। অবশ্য তাকে সতর্ক করে দিলাম যেন কোনও বিষয়েই সে উত্তেজিত হয়ে না পড়ে। ডাক্তার যেন কোনও সন্দেহ না করে তার ব্যবহারে।

সেই লোকটি ঘরে ঢুকলো, ‘আপনারা আমার সঙ্গে আসুন। ডাক্তারবাবু নতুন ঘরে রয়েছেন— সেখানেই আপনাদের নিয়ে যেতে বলেছেন।’

নতুন ঘর। সেখানেই সন্তোষবাবু যেন কী সব দেখেছিলেন?

নতুন ঘরটা বিরাট বড়। কিন্তু একতলা হলেও এই ঘরটা এত উঁচু যে দোতলাকেও যেন ছাড়িয়ে যায়। শেষের দিকে একটা দরজা খোলা রয়েছে। আমরা সেই দরজা দিয়েই ঢুকলাম ঠিক আমাদের সামনেই ডাক্তার অনিরুদ্ধ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। বেশ লম্বা ঢিলে-ঢালা পোষাক পরা। মুখে বেশ বড় দাড়ি। সৌম্য শান্ত চেহারা। আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছেন।

তাই তো। একি! এইজন্যেই কি আমরা দেখা করার অনুমতি পেলাম। ‘তোমার কথা মনেই হয়নি যে তোমার নামও অনিরুদ্ধ। আর কী করেই বা মনে পড়বে বলো?’ রীতিমত অবাক হয়ে বললাম আমি।

‘এতে অবাক হবার কি আছে? আমি কিন্তু জানতাম তুমি বদলি হয়ে এই থানায় এসেছো।’

তরুণকে ডেকে বললাম, ‘তরুণ, এসো তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দি। ইনি ডক্টর অনিরুদ্ধ মিত্র। জান তরুণ, ছোটবেলায় এই অনিরুদ্ধই আমাকে প্রাণীবিজ্ঞান শেখাবার অনেক চেষ্টা করত।’

তরুণ কিন্তু বেশ সন্দেহের চোখে অনিরুদ্ধের আপাদ-মস্তক দেখে নিলে। ও ভাবছিল শত্রুতা করতে এসে এতখানি মাখামাখি করার কী দরকার? হাবভাব দেখে মনে হল বন্ধুবর আমার ওপর ও বিরূপ হয়ে উঠেছে।

‘দাঁড়িয়ে আছ কেন? ভেতরে এসো।’ অনিরুদ্ধ সাদর আমন্ত্রণ জানাল।

পিছু পিছু ঘরের মাঝখানে এলাম। চেয়ার টেবিল দিয়ে সুন্দর করে সাজান। একটা মূল্যবান কোচের উপর আমি ও তরুণ বসলাম।

‘কাজের কথায় আসা যাক্‌। তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো আমাদের আগমনের হেতু,’, বললাম আমি, ‘সুতরাং কাজের কথাবার্তা সেরে নিয়ে বরং গল্পগুজব করা ভালো। কি বল? তরুণ তোমার মত কী?’

অনিরুদ্ধ একবার তির্যক দৃষ্টিতে তরুণের দিকে তাকালো। তরুণের অবস্থা

দেখে তার মনে বোধহয় সন্দেহ জেগেছে।

আমরা যা শুনেছি সবই বললাম। শিয়ালমুখো মানুষের কথা শুনে মনে হল অনিরুদ্ধ যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, জানোয়ারগুলোর কোনও ক্ষতি হয়েছে নাকি?’

আমাকেই প্রশ্ন করল অনিরুদ্ধ।

‘এতক্ষণে বোঝা গেল। আপনারই এই কাজ। কতকগুলো নিরীহ জীবকে আপনিই এইরকম করে কষ্ট দিয়েছেন?’, উত্তেজনায় যেন ফেটে পড়ল তরুণ।

অনিরুদ্ধ শুধু অবাক বিস্ময়ে একবার তাকাল তরুণের দিকে। তারপর শান্ত গলায় প্রশ্ন করল, ‘কী কাজ করেছি আমি? কিন্তু আমি যতদূর জানি তারা তো অসুখী নয়! তাদের দুঃখের কথা আপনি জানলেন কেমন করে?’

তরুণ কিন্তু এর ধার দিয়েও গেল না। আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘এটাই চাইছিলাম। উনি স্বীকার করেছেন যে…’

‘তরুণ তুমি চুপ করবে কি? বেশি উত্তেজিত হয়ো না। আমাকে বুঝতে দাও।’ প্রায় ধমক দিয়েই চুপ করালাম ওকে।

কিন্তু তরুণ যেন কিছুই শুনলো না। নিজের কল্পনাকে বাস্তবে রূপায়িত হতে দেখে সে অস্থির হয়ে পড়েছে।

‘আপনি হাতগুলো পেলেন কোথা থেকে?’ বেশ জোরের সঙ্গে প্রশ্ন করল তরুণ।

‘তোমার বন্ধুটি দেখছি বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। কি ব্যাপার বলতো?’ অনিরুদ্ধ প্রশ্ন করল আমাকে।

‘তরুণ, খুব বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না কি? আমাকে কিছু বুঝতে দেবে, না, তুমিই সবকিছু করবে? তোমার যা প্রশ্ন করার তা শেষ কালে করো, এখন চুপ কর দেখি।’ জোর করে থামাবার চেষ্টা করলাম ওকে।

তরুণের হয়ে অনিরুদ্ধের কাছে ক্ষমা চাইলাম। বললাম, ‘ওর ব্যবহারের জন্য সত্যিই দুঃখিত আমি। কিন্তু তুমি বুঝতে পারছ আমাদের অবস্থা। নালিশ এলে তদন্ত করাই আমাদের কাজ। সমস্ত গ্রামবাসীরা ভয় পেয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি তুমি আমাদের কাছে সব খুলে বলবে। আর তরুণ’— আমি তরুণের দিকে ঘুরে বললাম, ‘তুমি তোমার প্রশ্ন করার সুযোগ পাবে। কিন্তু মনে রেখো ইনি আমার বন্ধু অনিরুদ্ধ, ডক্টর মোরো নয়।’

কিন্তু তরুণ যেন কোনওকিছুই মানবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে।

‘আপনি বুঝতে পারছেন না আমি কি বলতে চাইছি। অনিরুদ্ধবাবু প্রকৃতির বিরুদ্ধচারণ করছেন কেন? আমি জানতে চাই কোন অধিকারে সাধারণ জীব জন্তুদের উনি কিম্ভুত আকৃতি দিচ্ছেন?’

ডাক্তার অনিরুদ্ধ ভরাট গলায় আস্তে আস্তে বললেন, ‘আগে আমার সব বক্তব্য না শুনলে আপনি কিছুই বুঝতে পারবেন না তরুণবাবু। কি করে আপনি ধরে নিলেন যে আমি প্রকৃতির ওপরে চালাকি করছি? নতুন করে কোনও জীব বা জীবনের সৃষ্টি করা কি আমার পক্ষে সম্ভব?’

‘কিন্তু আপনার অদ্ভুত ইচ্ছার জন্যে সবাই ভয় পেয়ে গেছে আর তাই নয়…’

তরুণের কথায় কর্ণপাত না করেই অনিরুদ্ধ বলে যেতে লাগল, ‘আপনারা আমাকে আগাগোড়া ভুল বুঝেছেন। আপনারা বলতে চাইছেন যে আমি বৈজ্ঞানিক গবেষণার আড়ালে জীবজগতের উপর অমানুষিক অত্যাচার চালাচ্ছি।’

‘হ্যাঁ, ঠিক তাই বলতে চাইছি। আপনি শুধু সাধারণ গবেষণাই করছেন না। ভয়ানক রকমের ব্যবচ্ছেদ করে কয়েকটি নিরীহ জীবকে কি স্তূতাকার দিয়েছেন। আর তারা গ্রামের লোকেদের হাতে কষ্ট পাচ্ছে।’— এতক্ষণে মনে হল তরুণ যেন সব কথা বলতে পারল, ‘অবশ্য আপনার গবেষণা করার অধিকার আছে। কিন্তু এখানে এমন কতকগুলো অপ্রাকৃতিক ব্যাপার ঘটছে যার ফলে আমাদের আর চুপচাপ বসে থাকা যায় না।’

অনিরুদ্ধ মাথা নেড়ে বলল, ‘ঠিক ঠিক। আগে আমার তাই মনে হয়েছিল। আমি ঠিক করেছি আর কিছুদিনের মধ্যেই আমি গবেষণার ফল সর্বসমক্ষে প্রকাশ করবে! কিন্তু আমি অন্তত দুই কি তিন মাস শান্তিতে থাকতে চাই। ইতিমধ্যে আমার গবেষণার পুরো ফল পাব। নিশ্চয়ই কিছু বুঝতে পারছেন না? সব খুলে বলছি— আশা করি এতে আপনাদের বোঝার সুবিধে হবে।’

বেশ কিছুক্ষণ সে চুপ করে তরুণের দিকে চেয়ে রইল। তরুণের মুখে কিন্তু কোনও ভাবান্তর নেই। তার পর অনিরুদ্ধ নিজেই বলতে আরম্ভ করল—

‘আসল কথা হল, আপনারা যা সন্দেহ করছেন আমি তা করিনি বা একের সঙ্গে অন্যের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জোড়াও দিইনি। আমিই তাদের সৃষ্টিকর্তা।’

কয়েক মুহূর্তবোধ হয় হবে আমি কিছুই যেন বুঝতে পারলাম। কিন্তু তরুণ আবার মুখ খুলল—

‘হ্যাঁ সবাই এরকম বলে। কিন্তু কোনও কিছু তৈরি করার তো একটা পটভূমিকা দরকার। আপনি নিশ্চয়ই কোনও জীবন্ত প্রাণী দিয়ে আরম্ভ করেছেন আর তারই ওপর ব্যবচ্ছেদ করে এক বীভৎস ভয়ানক জীবে পরিণত করেছেন।’

‘না, না’ অনিরুদ্ধ বলল— ‘আমি তা বলিনি, বলব না। আমি বলছি, আমিই ওদের তৈরি করেছি। একদম গোড়া থেকেই তারা আমারই সৃষ্টি। এক টানি প্রাণ বস্তুকে আমি প্রাণ দিয়েছি। আর এই প্রাণ বা জীবন আমারই সৃষ্টি। ধার করা জীবন নয়।’

বলে কি অনিরুদ্ধ? মানুষ কি প্রাণ সৃষ্টি করতে পারে? বললাম, ‘মানে, তুমি কি সত্যি জীবন্ত প্রাণী সৃষ্টি করেছ বলে দাবী কর নাকি?’

‘আরে সেটা তো তুমিও পার আমিও পারি, সবাই পারে। জৈবিক নিয়মে তা প্রত্যেকের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু আমি যা বলতে চাই তা হল এই যে আমি এক জীবনী শক্তিকে আবিষ্কার করেছি। এই ‘জীবনী শক্তি’ ইনজেকসান করেই আমি ওদের জীবন্ত করে তুলেছি।’

অবাক বিস্ময়ে আমরা চেয়ে রইলাম। এ বলে কী? এ কী পাগলের প্রলাপ উক্তি!

বহুক্ষণ পরে তরুণ কথা বলল বেশ জোরেই, ‘আমি এসব বিশ্বাস করি না। আপনি একজন সামান্য ডাক্তার হয়ে জীবনী শক্তিকে আবিষ্কার করে ফেললেন? ভয়ের চোটে আবোল তাবোল বকছেন দেখছি।’

অনিরুদ্ধ কিন্তু মৃদু হেসেই বলল—

‘আবার বলছি, আমি এক জীবনীশক্তিকে আবিষ্কার করেছি। বুঝতে পারছি আপনারা আমার কথা বুঝতে পারছেন না। কিন্তু কেন? কেউ না কেউ একদিন জীবনীশক্তিকে আবিষ্কার করবেই। আর সেটাই যদি আমার দ্বারা সম্ভবপর হয় তো অবাক হবার কি আছে?’

তরুণ কিন্তু নিজের গোঁ নিয়ে রইল।

বলল, ‘আমি বিশ্বাস করি না, করি না, করি না। কোনও প্রমাণ দিতে পারেন আপনি?’

‘নিশ্চয়ই,’ অনিরুদ্ধ বলল, ‘আর প্রমাণ না দিলে কেই বা বিশ্বাস করবে! প্রথম অবস্থায় হয়তো আপনাদের ঘেন্নাই করবে। কিন্তু তা ছাড়া আর কোনও উপায়ও তো নেই। অবশ্য তোমার বন্ধু হাত সম্বন্ধেই বিশেষ চিন্তিত। ওঁর বিশ্বাস হাতটা সত্যিই মানুষের, অবশ্য যদি কোনও সহৃদয় ভদ্রলোক মৃত্যুর আগে হাত দুটো উইল করে দিয়ে যায় তবে সে হাত নিয়ে কাজ করতে মোটেই দ্বিধা করব না আমি। তাতে আমার কাজের অনেক সুবিধে হবে। কিন্তু চাইলেই তো সব পাওয়া যায় না। সুতরাং আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং, রসায়নবিদ্যা আর বুন্ধির শরণাপন্ন হতে হয়েছে। অবশ্য কাছ থেকে দেখলে মানুষের হাতের সঙ্গে অনেক তফাৎ ধরা পড়বে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, এমন একদিন আসবে যে দিন নিখুঁত মানুষের মতো হাত তৈরি করতে পারব।

‘তরুণবাবু, আমার তৈরি জীব দুটি সম্বন্ধে আপনার ধারণা সত্যি অমূলক! ওদের তৈরি করতে আমার প্রচুর সময় আর অর্থ ব্যয় হয়েছে। সুতরাং তাদের হাবভাব, স্বভাব না জেনে অবলা জীবের প্রতি কষ্ট দিচ্ছি বলে আপনার অভিযোগের কোনও মানে হয় কি?’

‘আমি এখনও আপনার কথা বিশ্বাস করছি না।’ তরুণ বলল।

বেশ বুঝতে পারলাম তরুণ চিন্তিত হয়ে পড়েছে। সত্যিই তার অভিযোগ ভিত্তিহীন নয় তো?

‘তাহলে প্রমাণ দিতে হবে, কেমন?’ অনিরুদ্ধ বলল, ‘বেশ, আসুন আমার সঙ্গে।

***

সন্তোষবাবু যা দেখেছিলেন তা খুবই সামান্য। অনেক কিছুই তিনি দেখতে পাননি। অনেক কিছুর মধ্যে সেই ঘরে ছিল একটা অদ্ভুত গন্ধ। বেশ অস্বস্তিকর সেই গন্ধ।

ডাঃ অনিরুদ্ধ অবশ্য ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলল, ‘গন্ধটা সম্বন্ধে তোমাদের আগেই বলা উচিত ছিল আমার।’

‘না, না, আমাদেরই সতর্ক হওয়া উচিৎ ছিল’— কাশতে কাশতে বললাম আমি।

ঘরটা সত্যি খুব বড়। প্রায় ১০০ ফুট লম্বা আর উচ্চতা বোধ হয় ৩০ ফুট। প্রচুর ছোট-বড় যন্ত্রপাতিতে প্রায় ভরতি। সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতিও প্রচুর। আমি অবাক-বিস্ময়ে দেখতে লাগলাম। অবশ্য দুভাগে সাজান আছে যন্ত্রগুলো। একদিকে আছে রসায়নবিদ্যার যন্ত্রপাতি আর অপর দিকে টুল, বেঞ্চি, লেদ-মেশিন ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি একদম শেষে থরে থরে সাজান আছে। দেওয়ালের গায়ে অসংখ্য নানা আকারের মিটার শোভা পাচ্ছে। ঘরের একধারে একটা অপারেশন টেবিল ও তার আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি রয়েছে। তরুণ তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে। ঘরের আর একদিকে বড় বৈদ্যুতিক চুল্লীও রয়েছে।

‘সাইক্লোট্রন, ইলেকট্রোনিক মাইক্রোস্‌কোপই শুধু নেই দেখছি।’ রহস্য করেই বললাম আমি।

‘আরও কিছু বল না? আরে, তোমার বন্ধু কি দেখছে বলতো?’

তরুণ ততক্ষণে অপারেশন টেবিলটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে, টেবিলের ওপর নীচ কোনও জায়গায় বাকী রাখলে না সে। যদি কোনও রক্তের ছিটে ফোঁটা নজরে আসে। আমরা আস্তে আস্তে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

‘তরুণবাবু, এদিকে দেখুন। আপনার কল্পনার উৎস বোধহয় এটাই—’ অনিরুদ্ধ বলল।

ড্রয়ার খুলে একটা হাত বের করে টেবিলের ওপর রাখল অনিরুদ্ধ।

‘দেখুন অরুণবাবু ভালো করে দেখুন।’

কিরকম একটা হলদেটে রং হাতটার। প্রায়ই মোমের মতন দেখতে। গোটা হাত নয়। ঠিক কাঁধ আর কনুয়ের মাঝখান থেকে কাটা, তবে দেখতে ঠিক মানুষের হাতের মতো। কিন্তু কাছে গিয়ে ভালো করে লক্ষ করে দেখলাম— না, মানুষের হাতের মতো নয়। মসৃণ, কোনও চিহ্ন নেই লোম কূপের। আর হাতের আঙুলে কোনও নখের চিহ্ন নেই।

‘এখন একে ওরকম করে দেখার কিছু নেই’, আমাদের অবস্থা দেখে অনিরুদ্ধ বলে উঠল।

হাতের কাটা অংশ থেকে একটা লোহার নল বেরিয়ে আছে। সেটাকে দেখিয়ে

তরুণ জিজ্ঞাসা করল, ‘এটা আবার কি?’

‘স্টেনলেস স্টিল’, অনিরুদ্ধ বলল, ‘সবচেয়ে সোজা আর অল্প খরচে এই দিয়েই কেমন হাড়ের কাজ হয়। অবশ্য পরে আমি এর বদলে প্লাস্টিকের হাত ব্যবহার করবে। আর প্লাস্টিক ওজনেও হালকা।’

তরুণের চোখে মুখে যেন হতাশার ছায়া ঘনিয়ে এল। এটা তো সত্যি কোনও জীবন্ত প্রাণীর অংশ নয়।

‘কিন্তু শুধু হাত কেন? আর সব কোথায়?’ নিজের জেদ বজায় রাখতেই যেন জিজ্ঞাসা করল সে।

‘কোনও জীবন্ত প্রাণীর কাছে হাতের মতো প্রয়োজনীয় আর কিছুই নেই। আর, ‘আর সব’-এর কথা যে বলছেন সেটার সম্বন্ধে বলছি মূল বস্তু যখন আবিষ্কার করতে পেরেছি তখন প্রমাণ করার জন্য আমি এক সম্পূর্ণ জীব তৈরি করেছি। শিয়াল-মানুষ অবশ্য এর প্রথম ধাপ। বেঁচে থাকার মতো তাদের যথেষ্ট বুদ্ধি আছে। কিন্তু গঠনমূলক কোনও কিছুই ওরা চিন্তা করতে পারবে না। অবশ্য তার দরকারও নেই ওদের।’

‘তোমার স্বয়ং সম্পূর্ণ জীবটি তাহলে গঠনমূলক চিন্তা করতে পারে বলো?’, আমি প্রশ্ন করলাম।

‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আমাদের মাথায় যতটুকু মস্তিষ্ক আছে তারও ঠিক ততটুকু আছে। তবে আমাদের চেয়ে ওর মাথাটা একটু বড়। অবশ্য তার অভিজ্ঞতা দরকার— দরকার শিক্ষার। কিন্তু মোটা মগজ থাকার জন্য সবকিছুই শিশুদের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি সে শিখতে পারবে।’

‘কোথায় সে?’ উৎসুকভাবে প্রশ্ন করলাম। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ডাক্তার বলল, ‘সবাই দেখছি একেবারে প্রথমেই তৈরি জিনিস দেখতে চায়। বেশ ভালো কথা। কিন্তু তার আগে মনে হয় আরও কিছু প্রমাণ দেওয়া ভালো। কারণ তোমার বন্ধুর চোখে মুখে এখনও দেখছি অবিশ্বাসের ছাপ।’

এরপর অনিরুদ্ধ সার্জিকাল যন্ত্রপাতির আলমারিটা খুলে ফেলল। ভেতর থেকে আকার বিহীন সাদা এক তাল পাকানো বস্তুকে হাতে করে টেবিলের ওপর রাখলো। পাশের একটা সুইচ টিপে দিল। ওই বস্তুটিকে নিয়ে টেবিলের ওই অংশটি ঘুরতে আরম্ভ করল।

নিজের চোখে বোধ হয় ভুল দেখছি মনে হল। তাল পাকানো ৰস্তুটা থেকে ঠিক হাতের মতো কি একটা বেরিয়ে আসছে না?

‘সর্বনাশ! এযে ঠিক হাতের মতো।’ মুখ থেকে অজান্তে বেরিয়ে এল কথা কটা।

‘হ্যাঁ ঠিক হাতের মতো। আর এই জিনিসটাই আমার এত দিনের সাধনার ফল। এদিয়ে সব কিছুই হয়। একটা দেহ তৈরি করতে যা যা দরকার, সবই এ থেকে পাওয়া যায়। যেমন, খাদ্যনালী, রক্তবাহী শিরা, উপশিরা, স্নায়ুমণ্ডলী,

শ্বাসযন্ত্র ইত্যাদি। আসল কথা এই বস্তুটা জীবন্ত ভাবে বাঁচতে পারে।’

এরপর অনিরুদ্ধ পাশের সুইচ বোর্ড থেকে কয়েকটি তার এনে জিনিসটার সঙ্গে লাগিয়ে দিল।

‘তরুণবাবু, ভালো করে দেখুন এর মধ্যে কোনও প্রাণের স্পর্শ নেই।’

তরুণ ভালো করে বস্তুটাকে পরীক্ষা করল। আঙুল দিয়েও স্পর্শ করল। না, ক্ষুন্ন মনেই ফিরে এল সে।

‘তাহলে ইলেকট্রিক আসল জিনিস বলো’, প্রশ্ন করলাম আমি।

প্রশ্নের জবাব না দিয়ে অনিরুদ্ধ বোতল থেকে ফিকে নীল রংয়ের তরল পদার্থ একটি বিকারে ঢেলে নিল।

‘হতে পারে ইলেকট্রিক। আবার কেমিক্যালও হতে পারে। তুমি কি মনে করো আমার গোপন কথা সব তোমাকে বলব নাকি?’ অনিরুদ্ধ হেসে বলল।

তারপর তরুণের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কি দেখলেন? জীবজন্তু নয় নিশ্চয়ই?’

তরুণের বলার কিছুই নেই। চুপ করে রইল সে।

বেশকিছু ইলেকট্রোড লাগান হল ওটার গায়ে। তারপরে ভালো করে ওই বস্তুটার ওপর তিনটে জায়গা বেছে নিয়ে অনিরুদ্ধ সিরিঞ্জে করে ফিকে নীল আর এক ইনজেকসান করল। তারপর জিনিসটার সারা গায়ে দুবার বেশ ভালো করে ছড়িয়েদিল ওই আরকটা। শেষকালে চার-পাঁচটা সুইচ একসঙ্গে টিপে দিল।

মৃদু হেসে এবার অনিরুদ্ধ বলল, ‘পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে আমাদের।’

কিন্তু তিন মিনিটও গেল না। ওই বস্তুটা মৃদু কাঁপতে আরম্ভ করল। আস্তে আস্তে কাঁপুনি বাড়তে লাগল। বেশ একটা ছন্দ আছে এই কাঁপুনির। তারপর টেবিলের ওপর গড়াতে আরম্ভ করল। হাতদুটো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখন। স্পষ্ট দেখলাম হাতের আঙুলগুলো বেশ টানটান হয়েছে। তারপর টেবিলের ওপরটা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করতে লাগল সেই আঙুলগুলো। উঃ কি ভয়ানক ব্যাপার।

গলার ভেতরটা মনে হল শুকিয়ে যাচ্ছে। বোধহয় চিৎকার করে উঠেছিলাম। নিজের চোখে কি ভুল দেখছি? একি সম্ভব? স্বপ্ন! দেখলে কেউ কল্পনা করতে পারবে না।

কিছুক্ষণ পরে সম্বিৎ ফিরে এল। হঠাৎ মনে হল বিরাট এক সম্ভাবনার কথা। আনন্দে লাফিয়ে উঠে অনিরুদ্ধের হাত চেপে ধরলাম। ‘তাহলে, মৃত দেহে ইনজেকসান করলে তো…!’

কিন্তু, না। অনিরুদ্ধ মাথা নাড়ল। ‘না, কোনও কাজই হয় না সেখানে। আমি চেষ্টা করে দেখেছি। এটাকে আমি ‘জীবনী শক্তি’ বলেছি বটে, তবে প্রকৃতিদত্ত জীবনী শক্তি থেকে এর অনেক পার্থক্য। কিন্তু এর কোনও মানেই আমি বুঝতে

পারি না।’

তফাৎ যাই থাক না কেন এর মধ্যে এক বিরাট সম্ভাবনা আছে। মানুষের সমস্ত চিন্তাধারা পাল্টে যাবে। বিরাট এক বিপ্লবের সূত্রপাত যেন দেখতে পেলাম। অকল্পনীয় সেই সম্ভাবনা।

কিন্তু তরুণ যেন ম্যাজিক দেখছে। সারাক্ষণই অবাক-বিস্ময়ে চেয়ে আছে ওদিকে। চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠেছে। আস্তে আস্তে তরুণ আঙুল দিয়ে বস্তুটা ছুঁলো! তারপরেই ‘বাপ রে’ বলে ছিটকে এল— যেন হাজার ভোল্টের শক লাগল তার হাতে।

***

এতক্ষণে বোধ হয় তরুণের ভুল ভেঙে গেছে। বললে, ‘এবার আপনার সম্পূর্ণ জীবটিকে দেখান তো ডাক্তারবাবু।’

এখনও সন্দেহ? আসল জিনিসটা না দেখে যেন স্বস্তি নেই তরুণের।

‘ভালো কথা’ অনিরুদ্ধ বলল— ‘আগেই বলে রাখি ওকে আমি শ্ৰীমতী বলে ডাকি। কোনও বিশেষ নামই মনে হয় ওকে মানায় না। কিন্তু নাম যাই হোক সে আমারই তৈরি মানুষ!— জীবন্ত মানুষ।’

অনিরুদ্ধর পেছন পেছন গেলাম আমরা। পাশের ঘরে বিরাট এক খাঁচার সামনে এসে দাঁড়ালাম। মোটা লোহার রড দিয়ে তৈরি। অনিরুদ্ধ খাঁচার আরও কাছে এগিয়ে গেল।

খাঁচার ভেতর কি বস্তু যে আছে তা অনুমান করতে পারিনি। তরুণের অবস্থাও তথৈবচ। গভীর উত্তেজনায় অপেক্ষা করতে লাগলাম।

আমাদের বোধহয় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোনও বর্ণনাই বোধ হয় ওর উপযুক্ত নয়। কি বলবো অনিরুদ্ধের ‘পরিপূর্ণ’ জীবটিকে দেখে? ভয়ানক, বীভৎস, অকল্পনীয়, অস্বাভাবিক… তবে যতদূর পারি তার রূপ বর্ণনা করছি। জানি না কতদূর প্রকাশ করতে পারবো তার প্রকৃত রূপ।

কালো, ত্রিকোণাকৃতি চকচকে পদার্থ দিয়ে তৈরি দেহ। ওপরের দিকে গম্বুজাকৃতি মাথা। মাটি থেকে প্রায় ছয় ফুট উঁচু। পেটের কাছটা বোধহয় চার ফুট থেকে ছয় ফুট মোটা। আর এই সমস্ত দেহটা দাঁড়িয়ে আছে তিনটি ছোট ছোট গোলাকৃতি পাথরের ওপর। চারটে হাত বেরিয়ে আছে দেহ থেকে। ঠিক মানুষের হাতের মতো। মাথা থেকে ছয় ইঞ্চি নীচে চোখ দুটো। চোখের পাতাটা শক্ত কিছু দিয়ে তৈরি। বড় বড় গোল গোল চোখ। ড্যাবড্যাব করে আমাদের দিকে চেয়ে আছে। স্বপ্নেও বোধ হয় কেউ এমন বীভৎসতা দেখেনি। কল্পনা করতেও আমার এখন ভয় হয়।

অনিরুদ্ধ কিন্তু গর্বের সঙ্গে ‘শ্রীমতী’র দিকে চেয়ে রইল!

‘শ্ৰীমতী, এরা তোমাকে দেখতে এসেছেন।’ সস্নেহে বললে অনিরুদ্ধ।

বেশ দেখতে পেলাম শ্রীমতী আমার দিকে তাকাল। তারপর এক দৃষ্টে

তরুণের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের পাতা বন্ধ করার সময়ে ‘ক্লিক’ করে একটা ধাতব আওয়াজ হল। শ্ৰীমতীর গলা দিয়ে গুরুগম্ভীর স্বর বেরিয়ে এল।

‘এতদিন পরে! কত দিন ধরে আপনাকে বলছি!’

‘আরে মোলো যা,’ তরুণ বলল, ‘এ যে দেখছি কথা বলতে পারে।’

ড্যাবড্যাবে চোখ দুটো তরুণকেই দেখছে। ধাতব গলায় বলল, ‘একজন হলেই আমার হবে। ওর কাচের মতো চোখগুলো আমার খুব ভালো লাগছে।’

‘শান্ত হও শ্ৰীমতী, তুমি যা ভাবছ এরা তা নয়। ভবিষ্যতে এ ধরণের কথা আর বলো না,’ অনিরুদ্ধ তরুণের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শ্রীমতীর কোনও অভিজ্ঞতাই নেই, কিন্তু ও পুরুষ মহিলার পার্থক্য বোঝে। আর নিজের সম্বন্ধেও অহংকার আছে। অল্পতেই রেগে ওঠা ওর স্বভাব। সুতরাং এমন কিছু করবেন না যাতে ও রেগে ওঠে। ওর চেহারা দেখে অবাক হচ্ছেন তো? খুলে বলছি শুনুন।’

এবার ডাক্তার বক্তৃতার সুরে বলতে আরম্ভ করল, ‘আবিষ্কারের পরে আমার কর্তব্য হল একটি দু’পেয়ে জীব সৃষ্টি করা। পরে অনুকরণ করাই শ্রেয় মনে করলাম। আমার মনে হল মানুষের মধ্যে অনেক অঙ্গ বেশ দুর্বল। আর কয়েকটা অঙ্গ বেশি হলে খুব ভালো হয়। অবশ্য যান্ত্রিক কারণে কিছু কিছু পরিবর্তন করতে হয়েছে।’

তরুণ ভালোভাবে জীবটিকে দেখছে। শ্ৰীমতীও একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।অবশেষে তরুণ মুখ খুলল—

‘এত বড় একটা জীবকে এত ছোট খাঁচায় রাখা মোটেই উচিত হয়নি আপনার।’

ক্লিক!

‘আমার বেশ পছন্দ হয় ওকে। খুব ভালো কথা বলে ও। এতেই আমার হবে।’ শ্ৰীমতী বলে উঠল।

তরুণ একটু বিচলিত হল। বহুকাল থেকেই সে জীবজন্তুদের ভালোবেসে এসেছে। কথা বলে এই প্রথম এই জীবটাই ওকে সমর্থন করল।

অনিরুদ্ধ কোনও কথায় কর্ণপাত না করেই বলতে আরম্ভ করল, ‘প্রথমেই দেখতে পাচ্ছেন শ্রীমতীর আলাদা মাথা বলে কিছুই নেই। সাধারণ মাথাটি সবটাই প্রায় বাইরে বেরিয়ে আছে আর দেখতেও বিদকুটে। চোখ দুটো বাইরের দিকে অনেকটা বার করা আছে। দেখার অনেক সুবিধা হয় এতে।’

‘মাথা যেহেতু ঘোরাতে পারে না সেই জন্য আরও কিছু যোগ করতে হয়েছে। আমি শ্ৰীমতীকে এর জন্য তিনটি চোখ দিয়েছি। দুটোতো আপনারা সামনেই দেখতে পাচ্ছেন। আর একটি চোখ আছে ঠিক পেছনে। সুতরাং শ্ৰীমতীর পেছন দিক বলে কিছু নেই। এর ফলে শ্ৰীমতী যে কোনও দিকে যখন খুশী তাকাতে পারে। মাথা ঘোরানোর কোনও দরকার হয় না। ওর মাথাটি শকপ্রুফ। তাই মাথার প্রধান কয়েকটি অংশ শ্ৰীমতীর পেটের ভেতরে রাখতে হয়েছে। পাকস্থলী আছে অনেক ওপরে।’

‘সবই তো বুঝলাম, শ্ৰীমতী খায় কিরকম করে?’ আমি প্রশ্ন করলাম।

‘শ্ৰীমতীর খাদ্যগ্রহণের ব্যবস্থা আছে পিছন দিকে। চারটে হাতের প্রয়োজন সম্বন্ধে নিশ্চয়ই আপনারা চিন্তা করছেন। আমার মনে হয় মানুষের হাতই প্রধান যন্ত্র। যদি অবশ্য সেটা সত্যি হাতের মতো হয়। সুতরাং দেখতে পাচ্ছেন শ্ৰীমতীর ওপরের দুটি হাত বেশ সরু আর অনেক যত্ন নিয়ে তৈরি করতে হয়েছে। কিন্তু নিচের দুটি হাত বেশ মোটা আর ভারী কর্মক্ষম।

‘শ্বাসপ্রশ্বাস সম্বন্ধে নিশ্চয়ই এবার কিছু জানতে চাইবেন। এখানে আমি প্রবাহমানতা (flow) সূত্রের আশ্রয় নিয়েছি। শ্রীমতী নিঃশ্বাস নেয় এখান দিয়ে আর শ্বাস ত্যাগ করে ওইখান দিয়ে। অবশ্য পরের বারে এই ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে হবে।

‘এমনিতে মনে হতে পারে শ্রীমতীর দেহটা ভীষণ মোটা আর ভারী, ওজন প্রায় এক টন। আর এত ভারীকে ধরে রাখার জন্য আমার পূর্বের পরিকল্পনা একটু পাল্টাতে হয়েছে। সেইজন্য পা আর পায়ের পাতা হাতীর পায়ের অনুকরণে করতে হয়েছে। কিন্তু পরেরবারে এই ব্যবস্থারও সংশোধন করতে হবে।’

‘তিনটি পায়ের যথেষ্ট যৌক্তিকতা আছে। মানুষের দুপায়ের উপরে ভর রাখার জন্য অনেক মাংস পেশির প্রয়োজন আছে। এখানে অত মাংসপেশি যোগ করা সম্ভব হয়নি। তাই শ্ৰীমতীকে তিনটি পায়ের সাহায্য নিতে হয়েছে। অসমতল জমিতে দুপায়ের চেয়ে তিন পায়ের সুবিধে অনেক বেশি।

‘প্রজনন ব্যাপারে আমি বলতে পারি…’

‘আমি বুঝতে পারছি না প্লাষ্টিক আর স্টেনলেস স্টীলের মধ্যে কি করে প্রজনন সম্ভব হবে’— আমি না বলে থাকতে পারলাম না।

‘কেন সম্ভব নয়? প্রজননের প্রয়োজনীয় সমস্ত গ্ল্যাণ্ড প্রভৃতি ওর মধ্যে আছে। পরের বারে এসমস্তেরই আরও উন্নতি করতে হবে। এর জন্য আমাকে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান করতে হয়েছে। যাই হোক শ্ৰীমতীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তার জন্য একজন শ্রীমান তৈরি করে দেবো।’ মুচকি হাসল অনিরুদ্ধ।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ওতেই হবে’ ধাতব কণ্ঠ আবার বাধা দিল অনিরুদ্ধকে। শ্ৰীমতী আবার এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল তরুণের দিকে।

অনিরুদ্ধ কিন্তু বলে চলল— ‘অবশ্য শ্ৰীমতী নিজের চেহারা কেমন তা জানে না। সে হয়ত মনে করে…’

‘আমার প্রয়োজন আমি যথেষ্ট বুঝি’, গম্ভীর গলায় শ্রীমতী বলল, ‘আমি…’

ডাক্তার বেশ জোরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘হবে হবে, আমি যখন বলছি সব হবে।’

‘নানা আমার ওকে চাই’ শ্ৰীমতী ক্রমশঃ অস্থির হয়ে ওঠে।

‘শান্ত হও শ্ৰীমতী, নইলে—’ ধমকে উঠল অনিরুদ্ধ।

বিদকুটে অঙ্গভঙ্গি করে উঠল শ্ৰীমতী।

তরুণ এবার বেশ জোরে বলে উঠল, ‘এ কিছুতেই মানতে পারি না। স্বীকার করি শ্রীমতী আপনার সৃষ্টি। কিন্তু এভাবে ওকে রাখা মোটেই উচিত নয়। আপনি শ্ৰীমতীকে মানুষ করতে গিয়ে এক বিকট দৈত্যে পরিণত করছেন।’

‘যাই হোক, শ্ৰীমতীকে এখন দুঃপ্রাপ্য জীব বলা যায়। আর সেই জন্য তাকে এত ছোট খাঁচায় কষ্ট দিয়ে রাখার কোনও মানে হয় না। আর ওর কথা থেকেই বোঝা যায় যে ওর চাহিদা আছে। কেন ওর চাহিদা মেটাচ্ছেন না, অনিরুদ্ধ বাবু?’

‘তরুণ, ভুলে যেও না ও তোমাকে চায়।’ আমি সাবধান করে দেবার সঙ্গে সঙ্গে শ্রীমতী বলে উঠল—

‘কি সুন্দর! কি সুন্দর ওর চোখ! ওকে আমার চাই-ই-চাই!’ শ্ৰীমতী এবার গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। আর শ্ৰীমতীর দীর্ঘনিঃশ্বাসে মনে হল তরুণ বিচলিত হল।

‘এতেও যদি আপনাদের বিশ্বাস না হয় ও অসুখী তবে…’ বলতে বলতে খাঁচার অনেক কাছে এগিয়ে গেল তরুণ।

‘কি করছেন কি?’ বলেই ডাক্তার ঝাঁপিয়ে পড়ে তরুণকে ধরে ফেলল। হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে নিয়ে এল। ইতিমধ্যে শ্ৰীমতী শিকের ফাঁক দিয়ে একটা হাত বের করে তরুণকে ধরবার চেষ্টা করছে।

‘কি সর্বনাশ করতে যাচ্ছিলেন বলুন তো?’

মুখ দেখে মনে হল তরুণ বেশ ভয় পেয়ে গেছে।

‘মানে…’ কি যেন তরুণ বলতে গেল। কিন্তু তার কথা ডুবে গেলে শ্ৰীমতীর গলার আওয়াজে। ভয় দেখানো কণ্ঠে শ্ৰীমতী বলল, ‘ওকে আমার কাছে আসতে দাও। ওকে আমি চাই।’

চারটে হাত দিয়ে শ্রীমতী সামনের লোহার রড জোর করে ধরে রয়েছে। দুটো শিক হাতের চাপে ভেঙে গেল। মোটা রডটা ধরে ঝাঁকাচ্ছে শ্ৰীমতী। ড্যাবড্যাবে দুচোখ দিয়ে যেন লেহন করছে তরুণকে। রাগে গরগর করে উঠল শ্ৰীমতী।

‘ওকি! ওকি…’ আর কিছু শোনা গেল না।

‘জিমি! জিমি!’ বিকট আর্তনাদে ঘর ভরে উঠল। তিনটে পা মাটির উপরে সজোরে ঠুকছে। আর তার ফলে সমস্ত বাড়ী কেঁপে কেঁপে উঠছে।

ডাক্তারের মুখ ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে উঠছে।

‘বুঝতে পারছি না। হরমোন ইনজেকসান কি খুব বেশি হয়ে গেছে?’ অজান্তে প্রশ্ন করল নিজেকে।

তরুণ এতক্ষণে সচেতন হয়েছে। কয়েক পা পিছনে এল সে। কিন্তু তাতেও

শ্ৰীমতীর উত্তেজনা কমলো না।

বিকট আওয়াজ করে চেঁচিয়ে উঠল শ্ৰীমতী, ‘জিমিজিমিজিমি!’ বুক ফাটা আর্তনাদ, সারা ঘর গম গম করতে লাগল।

সেই ধ্বনি আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।

‘আমার মনে হয়, ওর সামনে থেকে আমাদের সরে যাওয়া দরকার।’ বললাম আমি।

ডাক্তার আমার কথায় সম্মতি দিল। তরুণ বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেই ভালো সেই ভালো।’

আমরা তাড়াতাড়ি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। পেছনে শ্ৰীমতীর গলার আওয়াজ উত্তরোত্তর বাড়তে লাগল।খাঁচাটা ঝনঝন করে উঠল। পা ঠোকার দুমদুম আওয়াজ শোনা গেল।

‘তরুণ তরুণ, যেও না তরুণ। তোমাকে আমার চাই।’ কাতর স্বরে আকাশ বাতাস চিরে গেল।

তরুণ পেছনে চেয়েই দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল। শ্ৰীমতী সজোরে বারংবার ধাক্কা মারতে লাগল খাঁচার গায়ে। অবস্থা বিশেষ সুবিধাজনক মনে হল না। ডাক্তার দরজা বন্ধ করে দিল।

দড়াম! বিকট আওয়াজ হল ঘরের মধ্যে। দরজার ফাঁক দিয়ে যা দেখলাম তাতে রক্ত হিম হয়ে গেল। খাঁচার শিকগুলো চারপাশে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ছে। আর শ্ৰীমতী বিকট চেহারা নিয়ে দরজার দিকে ছুটে আসছে।

‘সর্বনাশ হয়ে গেল’ বলল অনিরুদ্ধ।

তরুণের চোখে মুখে ভয়ের চিহ্ন। অল্প অল্প ঘাম চিক চিক করছে কপালে।

‘আমরা চলে গেলেই সব ঠিকহয়ে যাবে…’ তরুণ বলল।

‘না তা হয়না। বাইরের দিকে জানালা দিয়ে ও আপনাকে দেখতে পাবেই।’

‘তাহলে’— তরুণের স্বরে এবার আতঙ্ক।

ডাক্তারের পিছুপিছু আমরা বসবার ঘরে চলে এলাম। ফায়ার ব্রিগেড ও পুলিশের কাছে ফোন করে তাড়াতাড়ি সাহায্য চাইল অনিরুদ্ধ। ফোন রেখে বলল, ‘ওরা না আসা পর্যন্ত আমরা কিছুই করতে পারি না। ল্যাবরেটারী ঘরটা খুব শক্ত। মনে হয় ভাঙতে পারবে না। তবে ওর শক্তি সম্বন্ধে কিছুই জানি না।’

ভয়ে গলা শুকিয়ে উঠছে আমাদের। ডাক্তার আরও বলল ‘সৌভাগ্যের কথা শ্ৰীমতী এ বাড়ীর দরজা জানলা সম্বন্ধে অজ্ঞ। কিন্তু ল্যাবরেটারীর সবকিছু বোধ হয় গুঁড়িয়ে ফেলছে। শুনুন আওয়াজ শুনুন।’ দূর থেকে মড়মড় আওয়াজ আসছে। কাচ ভাঙার শব্দও শোনা গেল। মাঝেমাঝে অস্ফুট আর্তনাদ ভেসে আসছে। আর থেকে থেকে ‘তরুণ, তরুণ’ চীৎকার শোনা গেল।

অনিরুদ্ধের চোখে মুখে ক্রমশ হতাশার ভাব ফুটে উঠছে। অসহায় অবস্থায়

পায়চারী করতে আরম্ভ করল সে।

‘সমস্ত নষ্ট হয়ে গেল। কত দামী ফরমুলা। সারাজীবনের সাধনা নষ্ট হয়ে গেল। আর এর জন্য গ্রামবাসীদের হয়ত প্রচুর ক্ষতি হবে। কিন্তু আমার যা গেল তা আর ফিরে পাব না। তরুণবাবু তাকে উত্তেজিত না করলে সে কখনই উত্তেজিত হত না। আগে কোনওদিনও এরকম হয়নি।’

তরুণ বোধ হয় প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু একটা কানফাটা আওয়াজ সবকিছু ডুবে গেল। কোনও কিছু ভাঙার শব্দ। আর তারপরেই শোনা গেল— ‘জিমি। তরুণ, তরুণ আমার।’

তরুণ চেয়ার ছেড়ে উঠেই আবার বসে পড়ল। অসহায়ভাবে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল।

‘পেয়েছি পেয়েছি’ অনিরুদ্ধ হঠাৎ যেন লাফিয়ে উঠল, ‘নিশ্চয় আমি শ্ৰীমতীর শরীরের ওজন অনুযায়ী হরমোন দিয়ে ফেলেছি। কি মারাত্মক ভুল! হাড়ের ওজন যে বাদ যাবে। ছিঃ ছিঃ। এ আমি কি করলাম, ইস!’

একটা বিকট আওয়াজে আমরা উঠে দাঁড়ালাম। দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।

শ্রীমতী দরজা ভেঙে ফেলেছে। পাগলা হাতীর মতো ধেয়ে আসছে এদিকেই। যেখান দিয়ে শ্রীমতী আসছে সেখানকার সবকিছু ভেঙে পড়ছে দেহের ভারে। পা ফেলার বিকট আওয়াজ উঠছে প্রতি মুহূর্তেই।

অনিরুদ্ধ আর দেরী করল না। ‘তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি সামমেই সিঁড়ি আছে।’

সেই মুহূর্তেই শ্ৰীমতী আমাদের দেখতে পেল। বিকট চিৎকার করে উঠল সে। আমরা সিঁড়ির দিকে ছুটে গেলাম। দ্রুত গতি একমাত্র আমাদের সম্বল। শ্রীমতী কিন্তু তাড়াতাড়ি ছুটতে পারে না দেখলাম। আমি আর ডাক্তার একসঙ্গেও পরে উঠে এলাম। আমার মনে হল তরুণ ঠিক আমার পেছনেই আছে। সঠিক কিছু বলতে পারবো না। হয়ত তরুণ সিঁড়ির ওপরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল অথবা ভয়ে কাঁপছিল। কিন্তু আমরা যখন দেখলাম তখন তরুণ সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। আর তার পেছনে ধেয়ে আসছে মূর্তিমান যমদূতের মতো শ্ৰীমতী।

তরুণ ওপরে উঠে আসছে। আর শ্রীমতীও ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু সিঁড়ির ধাপ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল না থাকায় শ্ৰীমতীর বেশ অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু কোনও বাধাই শ্ৰীমতীর কাছে বাধা নয়। পাঁচটা কি ছয়টা সিঁড়ি উঠেছে এমন সময় পায়ের চাপে মরমর করে সিঁড়ি ভেঙে পড়ল। শ্ৰীমতী ইঁট, বালি পাথরের সঙ্গে নীচে পড়ে গেল। আর তরুণও টাল সামলাতে না পেরে চীৎকার করে প্রায় শ্রীমতীর গায়ের ওপরই আছড়ে পড়ল।

তৎক্ষণাৎ শ্ৰীমতী চার হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল তরুণকে।

‘কি অপূর্ব বিচার-বুদ্ধি!’ বিড়বিড় করে বলল অনিরুদ্ধ।

‘বাঁচাও, বাঁচাও,’— তরুণের গলা দিয়ে শুধু এই শব্দই শোনা গেল।

‘আঃ’ শ্ৰীমতী যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। হারান প্রিয়কে যেন ফিরে পেয়েছে শ্ৰীমতী।

তরুণকে জড়িয়ে ধরে শ্ৰীমতী কয়েক পা এগিয়ে গেল।

‘অধীর হয়ো না।’ ডাক্তার বলল তরুণকে, ‘এমন কিছু করো না যাতে শ্ৰীমতী ক্ষেপে ওঠে।’

তরুণকে তিন হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে শ্ৰীমতী আর এক হাত দিয়ে আদর করছে।

আমরা দু’জনেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি বললাম, ‘একটা কিছু আমাদের করতে হয়। শুধু দাঁড়িয়ে থাকলে কিছুই হবে না।’

‘কোনও স্ত্রীলোককে এই সময়ে বাধা দেওয়া কি উচিত হবে? হয়ত আরও ক্ষতি হবে তাতে।’ ডাক্তারের গলায় চিন্তার আভাস।

‘বাঁচাও বাঁচাও। পারছি না।’

‘শান্ত হও তরুণ। মনে হয় তোমার কোনও ক্ষতিও করবে না। মোটের ওপর শ্রীমতী স্ত্রীলোক। অতএব…’

বহুদিন আগে মাকড়সার শিকার করা দেখেছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ে গেল। তরুণ সত্যি স্ত্রী-মাকড়সার হাতে পড়েছে।

‘আচ্ছা, কোনও লোভনীয় খাবারের লোভ দেখালে হয় না?’ আমি বললাম।

তিনটি হাতেই শ্ৰীমতী তরুণকে দোলাতে আরম্ভ করেছে। ছটফট করছে তরুণ।

‘তরুণ, ছটফট করো না,’ বললে ডাক্তার। তারপর, ‘ভালো। ভালো বলেছ। কিছু নতুন গুড়ের সন্দেশ পেলে…’

বাইরে কয়েকটা গাড়ী থামার আওয়াজ শোনা গেল। ডাক্তার ছুটে জানলায় চলে গেল। আমি শুনতে পেলাম সে বাইরের লোকদের ভেতরের অবস্থা সম্বন্ধে বুঝিয়ে বলছে। তারপরেই অনিরুদ্ধকে আসতে দেখলাম। দমকলের একজন অফিসারও একজন কর্মী তার পেছনে পেছনে এল। নীচের দিকে তাকিয়েই তাদের চোখে মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল।

‘ওর অজান্তে ওকে ঘিরে ফেলতে হবে।’

‘কাকে ঘিরে ফেলতে হবে? ও কি মানুষ না দৈত্য?’, কেঁপে উঠল অফিসারের গলা।

‘ও কথা পরে ভাবলেও চলবে।’ অধীরভাবে ডাক্তার বলল, ‘যদি কতকগুলো শক্ত দড়ি পেতাম…’

‘বাঁচাও।’

তরুণের গলা আবার শোনা গেল। শ্ৰীমতী জোরে চেপে ধরল তরুণকে। শ্ৰীমতীর মুখ দিয়ে চুকচুক আওয়াজ উঠছে। সেই বীভৎস আওয়াজে অন্তরাত্মা

পর্যন্ত শুকিয়ে যায়।

‘উঃ কি ভয়ানক দৃশ্য।’ অফিসারটি বলল।

‘তাড়াতাড়ি করুন। একটা দড়ির ফাঁস এখান দিয়ে ফেলে দিলেই হবে।’ আদেশ দিলে ডাক্তার।

দমকল কর্মীটি তাড়াতাড়ি একটা দড়ির বাণ্ডিল নিয়ে এল। অফিসার নানাভাবে বোঝাতে লাগল কেমন করে ফাঁসে ধরতে হবে শ্ৰীমতীকে। আস্তে আস্তে ফাঁসটি নামিয়ে দিল। দুটো হাতের নীচে দিয়ে শরীরের ওপর চেপে বসল দড়ির ফাঁস।

শ্ৰীমতীর এতেও ভ্রূক্ষেপ নেই। তখনও সে আদর করে চলেছে তরুণকে। এমন সময়ে নীচের সামনের দরজা দিয়ে কয়েকটা মুখ উঁকি মারল। কয়েকজন দমকলকর্মী ও পুলিশের লোকজন উঁকি দিয়ে দেখতে লাগল সেই বীভৎস দৃশ্য। ওপর থেকে ইতিমধ্যে আরও কয়েকটা দড়ির ফাঁস নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। হঠাৎ আর একটা দড়ির ফাঁস নামাতে গিয়ে ঝুলন্ত আলোটা ঝনঝন করে ভেঙে নীচে পড়ে গেল।

এতক্ষণে যেন শ্রীমতীর সম্বিৎ ফিরল। বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সে সচেতন হয়ে উঠল।

‘না। এ আমার। একে আমি ছাড়বো না।’ বীভৎস গলায় চীৎকার করে উঠল শ্ৰীমতী।

ওপর থেকে দমকলের লোকজন ভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল।

কোনওদিন দৃকপাত না করেই শ্ৰীমতী সোজা চলতে আরম্ভ করল। দড়ি ক্রমশঃ শক্ত হয়ে বসছে। আমাদের হাতে দড়ির প্রান্ত ভাগ ধরা রয়েছে। তাড়াতাড়ি দড়িগুলো একটা থামের গায়ে বেঁধেদিলাম। কিন্তু মড়মড় করে সেই থাম ভেঙে পড়ল। তরুণ চীৎকার করে কেঁদে উঠল। সজোরে ধরে রেখেছে শ্ৰীমতী। চলন্ত বুলডোজারের মতো বাইরের দরজার দিকে চলল। দেহের চাপে দরজা ভেঙে পড়ল।

‘আমার আমার। একে ছেড়ে দেবো না আমি।’

আমরা জানলার কাছে ছুটে গেলাম। শ্ৰীমতী ইতিমধ্যে সমস্ত বাধা কাটিয়ে উঠেছে। আমরা স্পষ্ট দেখতে পেলাম মত্ত জলহস্তীর মতো থপথপ করে চলেছে বাগানের মধ্যে দিয়ে শ্রীমতী। তরুণ তার বুকে ঝুলছে। আর পেছনে প্রায় ১২জন দমকলকর্মীও পুলিশ দড়ির প্রান্ত ভাগ ধরে তার গতিবেগ কমাতে পারছে না। ওদের হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলেছে শ্ৰীমতী। বাগানের গেটটা মালী ইতিমধ্যেই বন্ধ করে দিয়েছিল। গেটের দিকে শ্ৰীমতী এগিয়ে আসতে দেখে মালী ভয়ে পাশের ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। গেট বন্ধ থাক বা থাক শ্ৰীমতীর কিছু এসে যায় না। তার গতি কেউ রোধ করতে পারবে না। অল্প বাধা পেল বটে, কিন্তু পরক্ষণেই গেটটা সশব্দে ভেঙে পড়ল। রাস্তায় উঠে পড়ল শ্রীমতী। তরুণ ঠিক এক অবস্থায় ঝুলছে। ছটফট করছে সেই লৌহবাঁধনের মধ্যে।

বাইরে কোনও গাড়ীর ইঞ্জিন সচল হয়ে উঠল। ডাক্তার ওপর থেকে তাদের থামতে বলল। আমরা কোনও রকমে সেই ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম। দমকলের গাড়ীতে উঠতেই গাড়ী ছেড়ে দিল।

সিকি মাইল যাওয়ার পর রাস্তাটা ক্রমশঃ সরু হওয়াতে গাড়ী আর যেতে পারল না। আমরা গাড়ী থেকে লাফিয়ে নেমে পড়লাম। প্রায় দৌড়েই চললাম পথ ধরে। শ্ৰীমতীর যাওয়ার চিহ্ন পথে রয়েছে। পায়ের ছাপগুলো প্রায় ৬ইঞ্চি বসে গেছে মাটিতে।

আমরা নদীর কাছে এসে পড়লাম। সামনেই পুরানো কাঠের ব্রীজ। তারই ওপর দেখলাম শ্রীমতীকে। সেই একই অবস্থায় তরুণ রয়েছে। হঠাৎ ব্রীজটা মড়মড় করে উঠল। শ্ৰীমতীর ভার সহ্য করতে পারল না ব্রীজ। শ্ৰীমতীর পায়ের নীচেটা ভেঙে গেল। শ্ৰীমতী নিজেকে সামলাতে গিয়ে তরুণকে ছেড়ে দিল। তরুণ আর শ্রীমতী একই সঙ্গে নদীতে পড়ে গেল। তরুণকে একজন পুলিশ সাঁতরে ডাঙায় তুলে নিয়ে এল। আর শ্রীমতী? খরস্রোতা নদীর জলের বিরাট আবর্তনে নীচে তলিয়ে গেল। ‘তরুণকে দেবো না, কিছুতেই দেবো না তরুণকে’ বলে শেষ মুহূর্তে চেঁচিয়ে উঠেছিল শ্ৰীমতী। কিন্তু এখন আর কোনও চিহ্নই নেই তার। জলের ঢেউ আস্তে আস্তে বড় হতে হতে পাড়ের কাছে এসে মিলিয়ে গেল।

সর্বহারার মতো নদীর পাড়ের ওপর ডাক্তার অনিরুদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। জীবনের সমস্ত সাধনার ফল তার চোখের সামনেই বিসর্জিত হয়ে গেল। পায়ের তলার শক্ত মাটি সরে গেছে ডাক্তারের। মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল সে। চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

আর আমার? কেন জানি না শ্ৰীমতীর জন্যে মনটা হুহু করে উঠল।তার সমস্ত বীভৎসতা, অপরাধ আর কিছুই মনে পড়লনা। শুধু মনে ভেসে উঠল কি অসীম আকুতি তরুণকে পাওয়ার জন্যে। নাই বা হল প্রাকৃতিক সৃষ্টি। নাই বা হল আমাদের মতো রক্তমাংসের মানুষ। তবুও কি তার হৃদয়ের আর্তিকে ভোলা যায়? মৃত্যু মুহূর্তেও সে ভোলেনি তরুণকে। এক অভিশপ্ত জীবের এই অমানুষিক ভালোবাসার কোনও মূল্যই কি নেই? কোনও দাম কি নেই শ্ৰীমতীর মিলনের সেই ব্যর্থ প্রয়াসের?

ভারাক্রান্ত হৃদয়ে শ্রীমতীর আত্মার মঙ্গল কামনা করলাম। অবশ্য যদি তার আত্মা বলে কিছু থেকে থাকে।

প্রথম প্রকাশঃ আশ্চর্য! ১৯৬৬, ফ্রেব্রুয়ারি।

কাহিনিতে মূল বানানবিধি অনুসরণ করা হল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *