সৃষ্টির নেশায় – মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়

বিশাল বিমানটি আকাশে উড়ল। পারমাণবিক তেজে আলোর সমগতি ব্যোমযানটি উড়ছে অসীম নীলিমার মধ্য দিয়ে। নীলিমার মুক্তির মধ্যে বসে অমৃতের স্বাদ অনুভব করলাম। পৃথিবী অমৃতময়। সমুদ্র মন্থনে গরল উঠেছিল ঠিকই; কিন্তু হলাহলের চেয়ে প্রাণপুঞ্জের পরিমাণই ছিল অধিক। তার কেঁদে ভারাক্রান্ত ধরিত্রী আজ বেঁচে আছে। বসুন্ধরার বিশুদ্ধ অক্সিজেন আজও আমাদের হৃদয় উদ্বোধিত করে।

যদিও ফেলে আসা কাহিনির তিক্তরসে মনটা ভারী হয়ে উঠেছে, তবুও এ চিন্তা আজ পাষাণ হয়ে চেপে নেই। মানুষই ভুল করে। মানুষেরই অধঃপতন হয়। তাই মানুষ হয়ে মানুষকে ঘৃণা অবজ্ঞা করতে মন চায় না।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের দিকে উড়ে চলেছি। ফেলে আসা পথে রিটা অপেক্ষা করছে অমৃতের পাত্র নিয়ে। ওর পাসপোর্ট পাইনি। যে যন্ত্রণা বুকে নিয়ে আজ দীর্ঘ দশটি বছর পরে দেশে ফিরছি, তা দূর করে দেবে রিটার হৃদয়-মধু। মানুষ মানুষকে বিপদে, দুঃখে ভালোবাসবে, রক্ষা করবে তবেই তো আমাদের এই বিচিত্রা বিপুলা এবং সু-উন্নতা বসুমাতা গর্ব করবে সন্তান সৌভাগ্যে। তবেই তো কৃষ্টি ও সভ্যতায় তুলনামূলক বিচারে পিছিয়ে থাকা গ্রহান্তরের মানুষ আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা এবং হৃদয়ের উৎকর্ষের কাছে মাথা নত করবে।

নীচে সমুদ্রর জল দেখতে পাচ্ছি শক্তিশালী কাচের মধ্য দিয়ে। আমার অতীত স্মৃতিই যেন ওই নীল জলে ফসফরাস হয়ে জ্বলছে।

(২)

সানফ্রান্সিসকোর একেবারে পশ্চিম প্রান্তে সমুদ্রের তীরেই বিশাল কারখানাটি। আধুনিক মহাকাশযান এবং আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি তৈরি হয় এখানে। এই কারখানাতেই চাকরীটা পেয়েছিলাম স্বর্গীয় পিতৃদেবের বিদেশী বান্ধব মিঃ গিনেসের সুপারিশে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান স্নাতক হয়ে বেরিয়েছি মাস দুয়েক আগে। হঠাৎ চাকরীটা পেয়েই বাড়ী থেকে বিদায় নিলাম। চাকরীতে ঢুকে মাস কয়েক মনটা খারাপ লাগল মায়ের জন্য। বছর আড়াই সাধারণভাবে কাটল। কারখানার রসায়নাগারে আমার কাজ। রসায়নগারটি আকারে প্রকারে বিরাট। কারণ মহাকাশ যাত্রার সঙ্গে রসায়নের একটা ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রয়েছে। রসায়ন উন্নত হয়েছে নানা বিষয়ে। মহাকাশ সম্পৰ্কীয় গবেষণা থেকেই আবিষ্কৃত হয়েছে কৃত্রিম খাবার। মানুষ আজ সংখ্যায় পৃথিবী থেকে উপচে পড়লেও কৃত্রিম খাদ্যগুণে সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক ভাবেই বাস করছে। পৃথিবীর বাইরেও তাদের ঘর। মহাকাশযানের ভেতরকার জল যাতে নষ্ট না হয়, তা আবিষ্কার হওয়ার পরই পৃথিবীতে জলবিহীন স্থানের জলকষ্ট দূর হয়েছে।

পড়াশুনার সুবিধা এখানে চিরদিনই। তাই মাষ্টার ডিগ্রীটা পেতে অসুবিধা হল না। তারপর আড়াই বছর বাদে আমার সাধারণ জীবনযাত্রা বদলে গিয়ে অসাধারণ হয়ে উঠল।

ডঃ অ্যাণ্ডারসন কারখানাটির অন্যতম প্রধান পরিচালক। তাঁর বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ডঃ ব্রুয়াণ। ভারতে থাকতেই এঁর সুনাম শুনেছি। শুনেছি, মহাকাশ- বিজ্ঞানের বর্তমান কর্ণধার ইনি। তা ছাড়া জীব-রসায়ন শাস্ত্রেও ইনি সমান পারদর্শী। মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চারের কল্পকাহিনিকে ইনিই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। তবে এঁর প্রণালী নাকি অসম্পূর্ণ ছিল প্রথমটায়। সোভিয়েট বিজ্ঞানীগণ সঙ্গে সঙ্গেই সম্পূর্ণ প্রণালী আবিষ্কার করে গৌরবের ভাগীদার হয়েছেন।

এই আড়াই বছরে কারখানার নূতন উদ্ভাবনের কাজে কয়েকটি মৌলিক প্রণালী আবিষ্কার করায় আমার সুনাম হয়েছে কিছুটা। প্রৌঢ় পরিচালক ভদ্রলোকের অকৃত্রিম স্নেহাশীষ লাভ করে কৃতার্থ হয়েছি এর ফলে। তিনিই গরজ করে জীব রসায়নের ওপর আমার থিসিসটি পাঠিয়েছেন বিজ্ঞান সভায়।

সেদিন উনি ডেকে হাসিমুখে দুটো সুসংবাদ শোনালেন। প্রথম, আমি ডক্টরেট পেয়েছি। দ্বিতীয়, বিজ্ঞানী ডঃ ব্রুয়ান আমাকে তার সহকারী হিসেবে পেতে চেয়েছেন। ডঃ অ্যাণ্ডারসনও আমাকেই উপযুক্ত মনে করেন এ কাজে। এ খবরে আমি আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিলাম সেদিন। অত বড় বৈজ্ঞানিকের সহকারী হয়ে কাজ করব— এ যে কল্পনাতীত সৌভাগ্য! আনন্দের আতিশয্যে সেদিন ডঃ অ্যাণ্ডারসনকে ভারতীয় প্রথায় প্রণাম করলাম। উনি বুকে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। অনাবিল আনন্দে স্নেহাতুর মনটা ভরে উঠল।

তার পরদিন থেকেই ডঃ ব্রুয়ানের প্রাসাদোপম অট্টালিকায় চলে এলাম। উত্তর কোণে সমুদ্রের আড়াআড়ি ফ্ল্যাটটিতেই আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। বাড়ীর-ই লাগোয়া বিশাল পরীক্ষাগার। এরপর পরিচিত হলাম মিস সিমন এবং মিস্ অ্যানার সঙ্গে। সিমনের মাতৃসুলভ ব্যবহারে মুগ্ধ হলাম। ক্রমে ক্ৰমে ওদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠলাম। ভারতীয় বিদেশীকে ওঁরা একান্ত আপন করে নিলেন।

(৩)

এখানে আসার পরদিন শূন্যমনে বসেছিলাম ঘরটিতে। দূরে জানলার ওপাশে নীল সমুদ্র। শ্বেত ফেনিল জল এখান থেকে দেখতে পাচ্ছি। চড়া রোদ এখানে

বেশি ওঠে না। আজ উঠেছে। সকাল বেলার তরীতরকারী ফেরিওয়ালা তার বিরাট গাড়ীটা নিয়ে আনন্দ করতে করতে ফিরছে। সমুদ্রের তীরে লাফালাফি করছে কয়েকটা শিশু। এ দেশে বসন্ত সমাগত।

পর্দার বাইরে থেকে মিষ্টি স্বর কানে এল— ভেতরে আসতে পারি আমরা? নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, বলতে বলতে সহাস্যে অভ্যর্থনা করলাম অ্যাানা ও সিমনকে। ওরা অনেক কথা বললেন সেদিন। আমার পরিচয় নিলেন। জানলেন, আমার দেশে, বাবা নেই, মা বোন ভাই আছেন। আমি এবার অনুযোগ করলাম, আমাকে বন্ধু বলে স্বীকার করলেন, অথচ নিজেদের পরিচয় দিলেন না! শুধু স্বার্থপরের মতো আমার পরিচয় জানলেন!

অ্যানাই প্রথমে বলল, ক্ষমা করুন মিঃ রয়। আমার নাম মিস অ্যানা হেওয়ার্ড। আমি ডক্টরের বন্ধুর মেয়ে। বাবা বহুদিনই গত হয়েছেন। তারপর থেকে আমাকে এবং আমার স্বৰ্গতা মাকে ডক্টরই স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে দেখাশোনা করেছেন। বুঝলাম, ডঃ ব্রুয়ানকেই ডক্টর নামে অভিহিত করছে অ্যাানা। আমি ভেবেছিলাম সিমন অ্যানার মা। তাই বললাম, তাহলে আপনার পরিচয় তো…?

সিমন আমাকে থামিয়ে দিলেন। বললেন, বুঝেছি, তোমার প্রশ্ন অনুধাবন করতে পেরেছি। আমার জীবনটা খুব বৈচিত্র্যময়। ডক্টর যে ক-জনকে মৃত অবস্থা থেকে পুনর্জীবিত করেছেন, আমি তাদের মধ্যে একজন। আমার পূর্বের ইতিহাস এখন বলব না। সময়ে শুনতে পাবে। কথাগুলো মৃদু হেসে বলে সিমন থামলেন। ওঁর কথাবার্তায়, চেহারায়, ওঁকে অত্যন্ত উচ্চ অভিজাত বংশের মনে হল।

অ্যানা বিদায় নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ওর সম্পূর্ণ অবয়বটি এবার দেখলাম। শ্বেত শুভ্র একটি গাউন পরনে। শরীরের শুভ্রতার সঙ্গে পোষাকের ঔজ্জ্বল্য মিশে এক স্বর্গীয় সুষমার সৃষ্টি করেছে।

হঠাৎ কোণের সবুজ আলো জ্বলে উঠল। অলোর লেখা পড়লাম— ‘এসো’। বুঝলাম, ডক্টর ডাকছেন। আমার সঙ্গে সঙ্গে সিমনও এলেন বাইরে। অ্যানা চলে গেল ডিনারের তদারক করতে।

(৪)

ডক্টরের ঘরে ঢুকতে একটু সংকোচজনিত ভয় হল। কি জানি তিনি কেমন! তিনি বাইরের জগতের সঙ্গে বেশি সংযোগ রাখেন না। এ ধরনের সাধকগণ প্রায়ই রাগী মানুষ হন। ডক্টর যে বাইরের মানুষের কথায় কান না দিয়ে সমাজকে উপেক্ষা করে চলেন, তা বুঝেছি। কারণ, অবিবাহিতা অনাত্মীয়া সিমনকে নিয়ে এই দেশের সমাজেও কথা হয়, এবং ডক্টর আত্মবিশ্বাসে, প্রায় সদর্পেই তা উপেক্ষা করে চলেন। অবশ্য আত্মনিমগ্ন সাধকগণের পক্ষে এ সব ব্যাপারে মনঃসংযোগ করা সম্ভবও নয়। কিন্তু ঘরে ঢুকে তাঁর মুখের দিকে চেয়ে অবাক হলাম। তাঁর চোখে মুখে নৈর্ব্যক্তিকতার ছোঁয়া মাখানো। জগৎ-অনাসক্ত মানুষের দৃষ্টিতে বৈষ্ণবীয় শুদ্ধ শান্তরসের প্রলেপ থাকে। ডক্টরের চোখ দুটিও অকারণ হাসছে। অভিবাদন করতেই উনি এগিয়ে এসে হাত ধরলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন, আমি জানি ইয়ংম্যান, তুমি ভারতীয় এবং এও বিশ্বাস করি, ভারতীয়দের মনের জোর বা নিষ্ঠা খুব। তাই তোমাকেই আমার এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে সহকারী হিসেবে পেতে চেয়েছি।

তারপর ক্রমে ক্রমে উনি পরীক্ষাগারের সম্পূর্ণ একটি সমীক্ষা বুঝিয়ে দিলেন। দেখলাম, জীব-রসায়ন সম্পর্কীয় নব-উদ্ভাবিত মেশিনগুলোই বেশি স্থান জুড়ে আছে। পৃথিবীর অন্যান্য বিজ্ঞানীগণ মহাকাশ, গ্রহ নক্ষত্র, নীহারিকা নিয়ে মেতে আছেন। ডক্টরও একদিন তা-ই ছিলেন। সুদূরের নক্ষত্রও আজ বিজ্ঞানীদের স্পেসশিপের আওতার মধ্যে। আবার কয়েকজন বিজ্ঞানী জীব-রসায়ন এবং চিকিৎসা বিদ্যায় অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে এসেছেন। আজ কোনও রোগই মানুষকে ধ্বংসের পথে ঠেলতে পারে না। সর্বোপরি সৃষ্টিতত্ত্বের রহস্য আজ প্রায় প্রকাশিত হয়ে এসেছে। যেন সামান্য একটি স্বচ্ছ পর্দা তুললেই দেখা যাবে সৃষ্টি রহস্য তার সমস্ত গোপনীয়তা উন্মুক্ত করে দিয়েছে পৃথিবীর কাছে। তাই, এখন এই বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে— কে আগে চরম লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।

দেখলাম সূর্যালোক, জল, মাটি, নানারকম সামুদ্রিক কঠিন পদার্থ এবং নানান ধরনের উদ্ভিদের, প্রকৃতি, অণু-পরমাণু সম্বন্ধীয় বিচিত্র কয়েকটি মেশিনও রয়েছে। ঘরের মধ্যে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ও প্রাচীন মিশরের ম্যমীকরণের কয়েকটি বিরাট বিরাট অয়েল পেষ্ট রয়েছে।

উচ্চকোটির সাধকগণ সাধনার চরমে পৌঁছে, ষট্‌চক্র ভেদ করে, কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত করার পর যে উত্তেজনা, যে অনুভূতি লাভ করে, বিশেষতঃ তন্ত্রসাধকগণ, সেই অনুভূতিকে ‘প্রগাঢ় রোমান্স’ বলা চলে। এবং ডক্টর এই রোমান্সের রসে সিঞ্চিত। আমারও মনে হয়, ওই অনুভূতির স্বরূপ খানিকটা বুঝেছি। তাই, ক-দিনের মধ্যেই ডক্টরের সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টির নেশায় মেতে উঠলাম।

***

কাজের নেশায় ভুলে গেলাম বাইরের জগৎ। তারপর একদিন রক্তিম গোধূলী বেলায় ডক্টর অভাবনীয় সংবাদ দিলেন। ডক্টর বোধ হয় খুঁজে পেয়েছেন সৃষ্টি রহস্যের মূল সূত্র এবং তাহলে নুতন প্রাণসৃষ্টিও অসম্ভব নয়। শুনতে শুনতে আমিও রক্তিম হয়ে উঠলাম। ডক্টর চাপা উত্তেজনায় উদ্বেল হয়ে উঠলেন। ওঁর চোখে মুখে গোধূলীর অলক্তকরাগ ছড়িয়ে পড়েছিল। কানের পাশের শুভ্র চুল ক-টি রক্তরাঙা হয়ে উঠল। সেই উজ্জ্বল মুহূর্তে ডক্টরকে কি মহান— কি সুন্দর দেখাল। জানলা দিয়ে স্বর্ণালী রোদ যেন ডক্টরের কৃতিত্বের সাক্ষী হয়ে হেসে হেসে লুটিয়ে পড়ছে আমাদের গায়।

ডক্টর আমার দিকে চাইলেন। বললেন, রয়, আমি কৃত্রিম নিউক্লিয়াস আবিষ্কারের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছি। এই কাজেই খুঁজে পেয়েছি পদার্থে প্রাণ সঞ্চারের মূলসূত্র। আনুষঙ্গিক কাজগুলো এবার তুমি করবে। আমি আনন্দে অধীর হয়ে বললাম, নিশ্চয়ই ডক্টর, বাকীটুকু আমার ওপর ছেড়ে দিয়ে আপনি এগিয়ে চলুন। আমি আমার সমস্ত আত্মা দিয়ে এ কাজ করব।

—অসংখ্য ধন্যবাদ ইয়ংম্যান। তবে, একটা কথা, এ ব্যাপার এখন যেন সিমন আর অ্যানা ছাড়া কেউ না জানে। কারণটা তো বুঝবেই— আমি জগৎকে একটা চমক দিতে চাই।

(৫)

বিশাল পরীক্ষাগারটির একাংশে ডক্টর তাঁর এই পরীক্ষাকার্যের স্থান ঠিক করেছেন। বিরাট তিনটি টবে বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ-চারা। দুষ্প্রাপ্য কয়েকটি গাছও দেখলাম। একটা টবে ঘাসযুক্ত খানিকটা মাটি। কাচের পাত্রটায় তরল সূর্যালোক। বায়বীয় পদার্থের কয়েকটি সিলিণ্ডার পাশে দাঁড় করানো। ডানপাশেই রয়েছে সৌরবিদ্যুৎ সৃষ্টির গোলাকার যন্ত্রটি। রিফ্লেক্‌টাবে গোধূলিবেলার শেষ রোদ এসে পড়ছে। বাঁ পাশে আট ফুট লম্বা একটি গামলার মতো কাচের পাত্রে থলথলে ঘন সবুজ পদার্থ। পাত্রটির চারপাশে গায়ে লাগানো ছোট বড় অনেকগুলো তার গিয়ে যুক্ত হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে। কতকগুলো গিয়ে যুক্ত হয়েছে বাকী তিনটি মেশিনে। কাচের পাত্রটি একটি স্প্রিং এর ওপর বসানো। পাত্রটি অনবরত দুলছে। এই স্পন্দনটুকু একান্ত প্রয়োজনীয়।

ডক্টর সুইচ টিপলেন। ঢাকনা খোলা চৌকোনা চারটি মেশিন থেকে জোরালো আলো সলিউশনটির ওপর বিচ্ছুরিত হতে লাগল।

ডক্টরের নির্দেশ অনুসারে কাজ করে যেতে লাগলাম।

(৬)

কয়েকদিন পর ফিলিপ এল। অ্যানার বন্ধু। ফিলিপ বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের লেকচারার। ও ভারতীয় দর্শন সম্বন্ধে খুব আগ্রহান্বিত। সিন্টের মিঃ গ্রাহাম স্টিভেনসনের তৃতীয় পুত্র ফিলিপ। অ্যানা বিজ্ঞানের ছাত্রী, আর ফিলিপ দর্শনের। মনে মনে ভাবলাম, বিপরীত চরিত্রের মিলনই মধুর।

ফিলিপ ধরল ওকে, ভারতীয় দর্শন সম্বন্ধে কিছু বলতে হবে। আমি অপারগ। শেষে ওকে স্বামিজীর লেখা, শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী ও বাণী, শঙ্করাচার্য, রামানুজ,

গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন, গীতা, উপনিষদ ইত্যাদি পড়তে বললাম। মহাভারতের কয়েকটি অধ্যায় ওকে অনুবাদ করে বোঝালাম। দুদণ্ডেই ও পরম বন্ধু হয়ে উঠল। এবং শেষে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিল। বার বার ধন্যবাদ শুনে ভাবলাম, কথায় কথায় ধন্যবাদ দেওয়ার সৌজন্য ওদের আবেগসঙ্গতি নীতির ফল।

গভীর রাত। নিস্তব্ধ হয়ে গেছে চারিদিকের চাঞ্চল্য। সারা শহরটি ঘুমিয়ে পড়েছে। দূরে সমুদ্র। গর্জন শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট। ওর গর্জন আজকাল আরও বেড়েছে। কারণ, ‘নটিলাস’ আজ সত্যিই ডুব দিয়েছে ওর গভীরতম গর্ভে। অনাঘ্রাতা, চিরশুদ্ধা ভৈরবীর কৌমার্য নষ্ট করেছে যন্ত্রদানব। ও তো গর্জন করবেই। মাঝে মাঝে প্রলাপোক্তি শোনা যাচ্ছে নাইট ক্লাব ফেরৎ মাতালদের। মোটর গাড়ীর চাকার অসংলগ্ন ব্রেক কষার কর্কশ চিৎকার। পুলিশের বাঁশীও শুনছি তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায়। হঠাৎ তন্দ্রা ভেঙ্গে গেল— অকারণেই। জানলার দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম দূরে পরীক্ষাগারে আলো জ্বলছে। বিস্মিত হয়ে এগিয়ে গেলাম। একটু সংকোচ হল। ডক্টর কি মনে করবেন কে জানে। তবুও কৌতুহল দমন করতে পারলাম না। পায়ে পায়ে পরীক্ষাগারের কাছে পৌঁছলাম। আরও বিস্মিত হয়ে দেখলাম ভেতরে ডক্টরকে অপারেশন গাউন পরিয়ে দিচ্ছেন সিমন। টেবিলে একটি নারীদেহ শোয়ানো। নিরাবরণ তনুদেহটিতে আলো পড়ে তার প্রতিফলন হচ্ছে। একটা কথা ভেবে আশ্চর্য লাগল। এই নারীদেহটি দিনের বেলায় ছিল কোথায়! দেখিনি তো! তা ছাড়া এভাবে রাত জেগে অপারেশন করছেন কেন? আমাকেও জানাননি কিছু! অথচ সিমন ঠিক পাশে আছে! উনিই তো বলেছেন পৃথিবীকে চমক দেবার জন্য এখন কাউকে কিছু বলবেন না। তবে এই মৃতদেহ পেলেন কোথায়! আর আমাকে উনি বিশ্বাস করতে পারেন না। ধিক্কার দিতে ইচ্ছা হল নিজেকে।

অ্যানাকে সব বললাম পরদিন। আমরা খবর নিয়ে জানলাম বিজ্ঞান পরিষদই সব পাঠিয়েছে। তিনটি মৃতদেহ পাঠিয়েছে গতকাল দিনে। ভেবে অবাক হলাম, মৃতদেহগুলোকে কোথায় রেখেছেন। পরীক্ষাগারের এককোণে কয়েকটি শূন্য বড় পাত্র দেখেছি। কিছুটা করে সাদা সলিউসন রয়েছে ওগুলোর মধ্যে। তবে কি তিনি অদৃশ্যতত্ত্বকে বাস্তবায়িত করেছেন? অ্যানা আরও বিস্মিত হল এ কথা শুনে।

পরদিন ডক্টরের সঙ্গে দেখা হল। তিনি ধীরে ধীরে সব বললেন, কাল রাত্রে তোমায় ডাকিনি বলে আমায় মার্জনা করো, রয়। সারাদিনের পরিশ্রান্তির পর ঘুমিয়েছ বলেই ডাকলাম না।

তাঁর গলার স্বরে স্নেহের আভাস পেয়ে মুগ্ধ ও লজ্জিত হলাম। বললেন, কাল আমি ব্যর্থ ও সফল দুই-ই হয়েছি পরীক্ষায়। যা চেয়েছিলাম তা পেয়েছি। আবার পাইনিও। দেখেছি যে, সাধারণ নারীদেহকে যদি প্রয়োজন মতো তৈরি করে নিতে পারি— তবে তা-ই উপযুক্ত আধার হয়ে উঠবে। আমার জিজ্ঞাসু চোখে অর্থ বুঝলেন— বললেন, হ্যাঁ, সৃষ্টির প্রধান কথা হল, এ কার্যে একটি উপযুক্ত আধার চাই। এই রহস্যের সর্বত্রই তাই। বিশেষত, বহুকোষী প্রাণীর ক্ষেত্রে তো বটেই। আধার না হলে সৃষ্টি সম্ভব নয়। এবং আমার ধারণা কৃত্রিম আধার এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নয়।

আরেকদিন বললেন, দেখো, সাধনার পথে বহু বাধা, অনেক বিঘ্ন। সবই সহ্য হয়। কিন্তু সামান্য একটি জিনিসের জন্যই যদি হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে হয়, তাহলে ধিক্কার জন্মে নিজের ওপর। আজ বহুদিন হল বিজ্ঞান পরিষদকে বলছি আমাকে সমুদ্র তলদেশে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করতে, কারণ একটা নতুন সলিউসন তৈরি করতে একটা বিশেষ সামুদ্রিক পদার্থ দরকার— তা কিছুতেই শুনছেন না সে কথা। কিন্তু এও জেনো রয়, আমিও আমার সাধনা যে কোনও উপায়ে সফল করব। আমাকে সিদ্ধিলাভ করতেই হবে।

‘করতেই হবে’ কথা দুটির ওপর অসম্ভব জোর দিলেন। ‘আর শোনো, সিমন আমাকে ওর সব কিছু দিয়ে দ্বিধাহীন ভাবে সাহায্য করছে। তুমিও আশা করি আমাকে…’

আমি মাঝপথেই বললাম, আমারই দুর্ভাগ্য যে, এতদিনেও আমাকে পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারলেন না।

তিনি এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, বেশ, বেশ, এতে তুমি দুঃখ পেও না বন্ধু। এবার থেকে জেনো বাকী সব ভার তোমার ওপর রইল।

(৭)

তারপর আমার আর তাঁর মধ্যে এ ব্যাপারে দীর্ঘ আলোচনা হল। উনি আমাকে, রিটাকে এবং অ্যানাকে ওঁর পরীক্ষনীয় বিষয়টি সরলভাবে বুঝিয়ে দিলেন। বিটা অ্যানার বিশেষ বান্ধবী। বললেন, জানো তো, একদিন আমাদের ধারণা ছিল, জীবদেহের ও উদ্ভিদের শরীরের মধ্যে যে সব জৈব পদার্থ আছে, তা কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। আজ কোনও জৈব পদার্থই বাকী নেই তৈরি হতে। এমন কি ভিটামিন, হরমোন, অ্যান্টিবায়োটিক এনজাইম ইত্যাদি পদার্থগুলোও পরীক্ষাগারে সফলতার সঙ্গে প্রস্তুত হচ্ছে। সৃষ্টির আদি থেকে এই সেদিন পর্যন্ত এগুলো সব প্রকৃতির অকৃত্রিম রসানাগারে উৎপন্ন হত। এই আবিষ্কারগুলোর ওপর ভিত্তি করেই আমি এগিয়ে চলেছি।

—কিন্তু এ সব জৈব পদার্থগুলোর মধ্যে প্রাণের স্পন্দন তো দেখা যায় না। অ্যানার প্রশ্নে হাসলেন উনি। বলতে শুরু করলেন, এইখানেই তো যত উৎকণ্ঠা। আচ্ছা, তোমরা নিশ্চয়ই জান, প্রোটোপ্লাজমের প্রধান অংশ হচ্ছে প্রোটিন। অর্থাৎ প্রাণ নামক অদৃশ্য বস্তুর প্রকৃত আধারই ওই জিনিসটি। আর প্রকৃতির রসায়নাগারের অর্থাৎ সমুদ্রের সমস্ত রহস্যই আজ আমাদের কাছে গ্রন্থিমুক্ত। যেটুকু বাকী ছিল তা উন্মোচন করতেই আমি একবার সমুদ্রের তলদেশে গিয়েছিলাম এবং আরেকবারও যাওয়া দরকার। সিমনও প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, প্রোটিন তো কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন এবং হাইড্রোজেনের সমন্বয়। কিন্তু প্রাণের স্ফুলিঙ্গটি যদি…

ডক্টর মৃদু হেসে বললেন, বুঝেছি, তোমার কথা বুঝেছি। আচ্ছা, তার আগে শোন— জীবনের মূল লক্ষণ কি? দিনে দিনে পুষ্ট হওয়া এবং সময় এলে বংশবৃদ্ধি করা— তাই তো? আদিম প্রাণের লক্ষণটিও এইভাবেই ধরা পড়েছিল। অর্থাৎ সেই সৃষ্টির প্রথম ক্ষণটিতে কোনও জৈব পদার্থ, অন্যান্য পদার্থকে নিজের মধ্যে আত্মসাৎ করেছিল এবং তারই ফলে পুষ্ট হয়ে বংশ ছড়িয়েছিল চারদিকে। থামলেন ডক্টর। আমি রিটার দিকে চাইলাম। ও অন্য লাইনের ছাত্রী হয়েও মন দিয়ে শুনছে কথাগুলো। ওর নিবিষ্ট মুখখানিতে আলো পড়েছে। উজ্জ্বল দেখাচ্ছে ওর চোখ দুটো। টকটকে লাল কপোল। প্রসাধনহীন ঠোঁট দুটি স্বভাবতই রক্তিম।

আবার বলতে শুরু করলেন, তোমরা নিশ্চয়ই জান যে, আদিম প্রাণটি উৎপন্ন হয়েছিল একটি বিশেষ ধরনের সলিউসনের মাধ্যমে। তার নাম ‘কলয়ডাল সলিউসন’। এই সলিউসন-ই বিবর্তনের চক্রে পড়ে অথবা হঠাৎ একদিনেই হোক, জৈব অজৈব সবরকম পদার্থ আত্মসাৎ করতে করতে নিজের আকার পরিবর্ধিত করে প্রাণময় হয়ে ওঠে। তাহলে, এটা অনুমান করা চলে নিশ্চয়ই, সেই সলিউসনটির সঙ্গে সেদিন এমন একটি কিছু মিশেছিল, যার ফলে ওই সলিউসনের পুষ্টি সম্ভব হয় এবং প্রাণের স্পন্দন দেখা যায়। তাহলে সৃষ্টির পূর্বেকার আবহাওয়ায় যে পদার্থটির সংযোগে প্রাণের স্পন্দন অনুভূত হয়, সেটি-ই সিমনের কথায় প্রাণের স্ফুলিঙ্গ। আর এ জন্যই তখন প্রোটোপ্লাজমের কোনও আবরণ ছিল না। এই ব্যাপারটিকে অন্যভাবেও বলতে পারি— সৃষ্টির প্রথমে যখন ধীরে ধীরে পৃথিবী শীতল হতে শুরু করে, তখনই আবহাওয়ায় এমন একটা কিছুর আবির্ভাব হয়, যার ফলে জৈব পদার্থ প্রাণময় পদার্থে পরিণত হয়।

একটু থেমে বললেন, আদিম সমুদ্রে কলয়ডাল সলিউসনের মধ্য থেকে যেভাবে প্রাণ-চিহ্ন দেখা দিল, এখন যদি আমি সেই পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারি, তাহলে পরীক্ষাগারে প্রাণ সঞ্চার সম্ভব নয় কেন? এবং তাই হয়েছে। আমি সার্থক হয়েছি এই ভাবেই। ওই যে মেশিনটি দেখছ— তিনি বাক্সের মতো নব আবিষ্কৃত মেশিনটির দিকে অঙ্গুলি সংকেত করলেন— ওইটিই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। ওইটির দ্বারাই আমি আর ক’দিনের মধ্যে পরিপূর্ণ একটি কৃত্রিম মানুষ উৎপন্ন করতে পারব।

শুনতে শুনতে উত্তেজনা বোধ করলাম। ইনি আজ অভাবনীয় কথা শোনাচ্ছেন। মানুষ হয়ে তিনি ভগবানের কাজ করতে চলেছেন। প্রকৃতি নামে সেই চরম শক্তির প্রকাশ দেখব আজ ডক্টরের মধ্যে। অ্যানা আবার জিজ্ঞেস করল, তাহলে একদল বিজ্ঞানী যে বলেন, যখন আকাশের ওপরে অক্সিজেনের অর্থাৎ বায়ুর স্তর গঠিত হয়নি, তখন সূর্যের আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মি আদিম সমুদ্রের জলে পড়ে কলয়ডাল সলিউসন উৎপন্ন হয়েছিল, তাই কি ঠিক?

ডক্টর নির্বিকার মুখে হাসলেন, উত্তর দিলেন না এ কথার। সিমন সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, পৃথিবী জন্মের সেই প্রথম দিনে পৃথিবী তো টগবগ করে ফুটছিল। তারপর দিনে দিনে ঠান্ডা হয়েছে এবং এই পৃথিবীর ভেতরকার ফুটন্ত পদার্থগুলো নিশ্চয়ই অনেক রকম বায়বীয় পদার্থের নিঃশ্বাস ছেড়েছে। তাহলে কি বলতে চাও, সেই বায়বীয় পদার্থের কোনও একটিই প্রাণের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের শূন্যে বিলীন হয়ে গেছে? সিমনের কথায় তিনি এবারও হাসলেন। কোনও উত্তর দিলেন না। বুঝে পেলাম না অ্যানা ও সিমনের কথার মধ্যে সত্য কতখানি আছে।

রিটার দিকে চেয়ে দেখলাম, ও নীরবে উপভোগ করছে আমাদের যুক্তি তর্ক। চাকর আরেকবার কফি দিয়ে গেল। কাপে চুমুক দিতে দিতে ডক্টর বললেন, চলো, এবারে ডিনারের টেবিলে যাই। বুঝলাম উনি এর বেশি কিছু বলতে চান না। মূল রহস্যটুকু আমি ধরে উঠতে পারলাম না। ডিনারে পরিবেশন করলেন সিমন। ডক্টরের প্রতি ওঁর তীক্ষ দৃষ্টি। মনে মনে মুগ্ধ হলাম এই ঐকান্তিকতায়।

(৮)

এর পরদিন রিটার সঙ্গে ভালো করে আলাপ হল। ও ইতিহাসের ছাত্রী। আমাকে অনুরোধ করল, যদি জানি, ভারতের প্রাচীন ইতিকথা কিছু বলতে। বাধ্য হয়ে গুপ্তযুগের উৎপত্তি সম্বন্ধে কিছু বই থেকে আর কিছু বানিয়ে বললাম। একেবারে কল্পনা নয়— সম্ভাব্য কাহিনি বললাম। রিটা শুনে বিস্মিত হল। হয়তো মুগ্ধও হল। যাবার সময় বলে গেল, মাঝে মাঝে এভাবে এসে বিরক্ত করবে। ওর গমন পথের দিকে চেয়ে রইলাম। মনে অনুভব করলাম রিটার প্রতি প্রেমের চেতনা। ভাবলাম, শত তিক্ত কাজের ভীড়েও প্রেমের ঠিকানা হারাইনি। তাই, আজ আমার হৃদয় তার পূর্ণ প্রেম নিয়ে এই অচেনা বিদেশী মেয়েটির কাছে ধরা দিয়েছে। একটু পরেই বাদলা নামল। রেডিয়োতে শুনলাম, সুদূর বাংলা থেকে ভেসে আসছে চির চেনা সুর— ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে, ময়ূরের মতো নাচে রে।’

***

হঠাৎ লাল আলো জ্বলে উঠল। ডক্টর তাড়াতাড়ি ডাকছেন। দ্রুত পায়ে পরীক্ষাগারে পৌঁছলাম। তাঁর মুখ গম্ভীর। তবুও যেন উদ্বেলতা রয়েছে স্বরে— রয়, আমি টিসু উৎপত্তি ব্যাপারে বিঘ্ন দেখছি। সাপোর্টিং, এডিপোজ, ফিবরাস, কনেকটিভ মাসল সবই হচ্ছে, কিন্তু এপিথিলিয়াল এবং নিউরন নিয়েই গণ্ডগোল হচ্ছে। তবে এপিথিলিয়াল স্তরে স্তরেই হয়ে যাবে, কিন্তু নিউরন সম্বন্ধে চিন্তা হচ্ছে আমার। দেখে তো, তুমি কিছু ধরতে পার কি না।

আমি অনেকক্ষণ পরীক্ষা করলাম। বুঝলাম, তাঁর কথা ঠিকই। আধারের সংযোগ হলে স্তরে স্তরে এপিথিলিয়াল উৎপন্ন হবে। তবে নিউরনের সম্ভাবনা দেখছি না। উনি খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললেন, দেখি। আশা করি কাল পরশুর মধ্যেই পেয়ে যাব সব কিছু।

(৯)

উদ্বেগের মধ্য দিয়ে পাঁচটা দিন কাটল। তারপর এল সেই চরম লগ্ন। ডক্টর ডাকলেন সবাইকে। ফিলিপ, অ্যানা, রিটা এল। আমি আর সিমন তো সর্বদাই রয়েছি। দেখলাম, একটা পাত্রে খানিকটা সমুদ্রের জল রয়েছে। পাশেই সেই ছোট মেশিনটা। সূর্যালোক যেন গলে গলে পড়ছে জলের ওপরে মেশিনটার মধ্য দিয়ে। ডক্টর ওই জলটি সবুজ থলথলে পদার্থের মধ্যে মিশ্রিত করলেন। একটা সিলিণ্ডারের মুখ খুলে দিয়ে তারের দ্বারা সংযুক্ত করলেন সেটাকে। এই গ্যাসটি দেখে অবাক লাগল। এটি তো এতদিন দেখিনি। তবে কাল উনি সমুদ্রতীরে গিয়েছিলেন এবং কি একটা নূতন পদার্থ তৈরি করেছেন। তাহলে এই গ্যাসটিই সেই পদার্থ। বোর্ডে দেখলাম, কতকগুলো জটিল অঙ্ক কষা এবং প্রত্যেকের সমাধানই পূর্ণ।

ডক্টর সুইচের কাছে এলেন। বললেন, এবার আমি আমার মূল কাজ আরম্ভ করছি। ফিলিপের দিকে চেয়ে বললেন, জানি না, ভগবান বলে কেউ আছেন কি না— যদি থাকেন, তবে তাঁর কাজে হস্তক্ষেপ করার জন্য আমাকে ক্ষমা করতে বোলো। সুইচ অন করলেন। শব্দ করে মেশিনগুলো চলতে শুরু করল। ওরা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে উঠল।

কাচের পাত্রটিতে থলথলে পদার্থ নড়ছে। আরেকটা পাত্রে একটি নারী দেহ শোয়ানো। সমস্ত দেহটিই প্রায় ওই পদার্থে ঢাকা। লোহার পাতগুলো তারের সঙ্গে দেহটির সঙ্গে যুক্ত। মেশিন থেকে আলো পড়তে লাগল দেহটির ওপর। পাতলা ধাতুর চাদর দিয়ে ঢেকে দিলাম পাত্রটি। উনি এবার হাসি মুখে বললেন, আপাতত নিশ্চিন্ত। এবার চলো সমুদ্রের তীর থেকে বেড়িয়ে আসি।

সানন্দে ডক্টরের আনন্দে যোগ দিলাম। সকলে চললাম ছুটোছুটি করতে করতে, আজ পরম মুক্তির দিন। আজ উনি সার্থক হতে চলেছেন পৃথিবীর আশ্চৰ্যতম এবং অচিন্ত্যপূর্ব গবেষণায়।

(১০)

ডক্টর সেদিন দুঃখ প্রকাশ করছিলেন। বিজ্ঞান পরিষদের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন আরেকবার সমুদ্রযাত্রার আয়োজন করতে। বিশেষ একটি পদার্থ সংগ্রহ করা ছিল তাঁর কাম্য। কিন্তু ভেতরের দলাদলি ঈর্ষার জন্যই তাঁর প্রার্থনা পূরণ হয়নি। অসুবিধা অবশ্য দূর হয়েছে কোনও রকমে। তিনি বললেন, মানুষের বিরুদ্ধে মানুষ এখনও ক্রূর, ঈর্ষাপরায়ণ এবং চক্রান্তপ্রবণ। আমাদের এই উন্নতির যুগেও এই মধ্যযুগীয় মনোভাব। এসব দেখলে মনের কি অবস্থা হয় বলো তো।

মনে মনে আমিও ব্যথিত হলাম। কারণ, এই ব্যাপারে আমারও অভিজ্ঞতা আছে। মানুষ আজ বিজ্ঞানের বলে চরম শক্তিমান। জলে স্থলে অন্তরীক্ষে তার বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা। সে আজ ঈশ্বরের সমতুল। তবুও সুযোগ পেলে একে অপরকে শারীরিক কিংবা মানসিক দিক থেকে আঘাত হানতে ছাড়বে না। সমাজের উচ্চস্তরেও দলাদলি, বিদ্বেষ, ঈর্ষা এবং পরশ্রীকাতরতার ধ্বংস বীজ ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যভিচারী শয়তানের দল মুখোশ এঁটে নির্বিবাদে চলাফেরা করছে বুক ফুলিয়ে। আমাদের ভাই না খেয়ে মরছে; দরিদ্র ছাত্র অর্থের অভাবে পড়াশুনা করতে পারছে না, আর আমরাই ছদ্মবেশি বারবণিতার পায়ে কোটি কোটি টাকা ঢেলে দিচ্ছি। সভ্যতায় উন্নত দেশ নিলজ্জের মতো সভ্যতা, ঐতিহ্য ভুলে গিয়ে প্রতিবেশী দেশকে আক্রমণ করছে। জনসাধারণ শুধু প্রাণে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তাও পাচ্ছে না। মানুষের প্রতি মানুষের প্রেম ভালোবাসা আজ কাব্যে-সাহিত্যে সীমাবদ্ধ। সমবেদনার কথা বলতে গেলে হাস্যাস্পদ হতে হয়।

ডক্টরের প্রতি শ্রদ্ধা হল নূতন করে। তিনি বিশুষ্ক বৈজ্ঞানিক নন। তাঁর প্রাণ আছে— তাঁর হৃদয়ে প্রেম আছে। প্রেমের মর্যাদা তিনি দেন।

কয়েকটি দিন কেটে গেল নির্বিরোধে। কোনও ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটল না। রিটার যাওয়া আসা একটু বাড়ল। আমাদের সম্পর্কটা দিনে দিনে মধুর হয়ে উঠতে লাগল। ওকে আমার জ্ঞানের পরিধির মধ্যকার ইতিহাস, কাব্য, সাহিত্য সম্বন্ধে গল্প বলতাম, আর ও প্রায় আবিষ্কারের আনন্দ লাভ করত।

(১১)

তারপর একদিন এল অপর চরম ক্ষণ। ডক্টর সংবাদ পাঠাতে বললেন বাইরে। তিনি সফল হয়েছেন। পৃথিবীর লোক জানল, তিনি আজ পরিপূর্ণ একটি মানবক উৎপন্ন করেছেন। সাংবাদিকগণ, বন্ধুবান্ধবগণ দেখলেন কাচের পাত্রটিতে একটি শিশু নড়ছে। অবিকল মনুষ্য-দেহ। সেই নাক, চোখ, মুখ, হাত পা সবই ঠিক। টেলিভিশন, বিজ্ঞান দপ্তরের নিউজ রিল, সাংবাদিকগণের হৈ চৈ মিটতে সেদিন রাত হয়ে গেল প্রচুর।

প্রশ্নের উত্তর, রিপোর্ট লেখার কাজ মিটলে মুক্ত আকাশের নীচে গিয়ে দাঁড়ালাম।

প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলাম। মনে প্রচণ্ড আলোড়ন উঠেছিল। মানুষ আজ ঈশ্বরের সমান ক্ষমতার অধিকারী। সে আজ কৃত্রিম মানুষ সৃষ্টি করছে— কাল কৃত্রিম পৃথিবী তৈরি করবে। সেই সমাগত দিনের কথা কল্পনা করে উদ্বেলিত হলাম। আকাশের নীলিমার পানে চাইলাম। নক্ষত্র মিটিমিটি জ্বলছে। আকাশে মেঘ নেই এতটুকু। গ্রহান্তরের প্রাণীগণ এতক্ষণে হয়তো খবর পেয়ে গেছে।

ডক্টরের শোবার ঘর থেকে হঠাৎ ডক্টরের কথা কানে এল। — আর তোমার কথা শুনব না প্রিয়। তোমার পিতৃদেবও আর নিশ্চয়ই মনঃক্ষুন্ন হবেন না। তাঁর সম্মানও ঠিক থাকবে। তা ছাড়া এতদিন তো তুমি তাঁদের জগতের কাছে মৃত ছিলে। তোমায় পূর্বস্বামীও নিশ্চয়ই তোমার ওপর থেকে সব দাবী তুলে নিয়েছেন। সিমন কিছু বললেন না। ডক্টর বললেন, তাহলে আজ থেকে তুমি আমার স্ত্রী, আমি তোমার স্বামী। এসো— কাছে এসো। দরজায় ছায়া পড়েছিল সিমনের। দেখলাম তিনি এগিয়ে গেলেন।

পরদিন ভোরেই ডক্টর হেসে বললেন, আমাদেরকে, অর্থাৎ আমাকে আর সিমনকে অভিনন্দন জানাতে পার। আগামী কালই আমাদের বিবাহের দিন।

সিমনের প্রকৃত পরিচয় শুনলাম। উনি কেন্দ্রীয় গবেষণা-মন্ত্রীর একমাত্র কন্যা। বিরোধী দলের সভাপতি মিঃ উইলিয়ামের পূর্ব স্ত্রী। মৃত্যুর পূর্বেই ওঁদের বিচ্ছেদ হয়। সিমনের মৃত্যু হয়েছিল কঠিন অসুখে। তারপর ডক্টর তার অমানুষিক সাধনায় ওঁকে এবং আরও কয়েকজনকে প্রাণদান করেছেন এবং সিমন এ পর্যন্ত প্রায় সকলের কাছেই মৃত। শুধু মন্ত্রী মহোদয় গোপনে জানেন। এ গোপনীয়তা সিমন ইচ্ছা করেই রচনা করেছেন। কিছুদিন পরই মিঃ উইলিয়াম বিখ্যাত এক চিত্রাভিনেত্রীকে বিবাহ করেছেন। আগামীকাল মন্ত্রী মহোদয় নিজে আসবেন এ বিয়েতে।

(১২)

বিরাট হৈ চৈ এর মধ্যে কাটল একটা মাস। সারা পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, সাহিত্যিক, শিল্পী, পণ্ডিতগণ অভিনন্দন বাণী পাঠালেন। প্রত্যেকের বাণীর উত্তর পাঠালাম যত্ন করে। রাষ্ট্রপ্রধানগণ শুভেচ্ছা জানালেন। তাঁদেরও উত্তর পাঠালাম।

দিনগুলো আনন্দে কাটছে। লস এঞ্জেলস, সাক্ৰামেন্টো থেকে ভারতীয় বন্ধু-বান্ধব এলেন দেখা করতে। ডক্টরের সহকারী হিসেবে আমারও সুনাম হয়েছিল একটু। বন্ধুগণ খাঁটি বাঙালী রান্নার লোভ দেখিয়ে গেলেন। নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে রিটাকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম। বান্ধবীরা রিটাকে বাঙালী বধুরূপে সাজিয়ে দিল।

এরপর সুসম্পন্ন হল অ্যানা আর ফিলিপের বিয়ে। উৎসব, আনন্দ, ফুল, উপহার আর সঙ্গীতে কেটে গেল আর ক-টা মাস। সমাজের বিভিন্ন স্তরে ঘুরলাম। দেখলাম পৃথিবীর সব মানুষই আশা আকাঙ্ক্ষায়, কামনা বাসনায় এক। কোনও দেশ হয়তো সভ্যতায় বেশি অগ্রসর, কোনও দেশ পিছিয়ে আছে। কিন্তু

মানসিকতায় প্রায় এক স্তরের। মানুষ সর্বত্রই মানুষ।

এভাবে দেড়টি বছর কেটে গেল। ডক্টর এবার তাঁর নবজাতক বাইরে আনবেন। বিশেভাবে নির্মিত হয়েছে একটি ঘর। শিশু বালকটির দেখাশোনার জন্য দুজন সেবিকা ঠিক করা হয়েছে। বোজ বোজ রিপোর্ট বের হচ্ছে এ সম্বন্ধে। একদিন তোয়ালে জড়ানো শিশুটিকে নিয়ে ডক্টর বাইরে এলেন। বাইরের আবহাওয়াও বেশ খাপ খেয়ে গেছে ওর শরীরের পক্ষে। আবার হৈ চৈ— ফটোগ্রাফারদের ভীড়। পুলিশ এল জনতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে, বিস্মিত জগৎ উন্মুখ হয়ে থাকে খবর পাবার জন্য। শিশুর বয়স অনুযায়ী শরীরটি বিশেষ পুষ্ট হয়নি। তবে তা হঠাৎ বোঝা যায় না।

এভাবে হৈ চৈ, কর্মচাঞ্চল্য, গান, রিটার সঙ্গে কাব্য সাহিত্য আলোচনা, বিভিন্ন জায়গায় বেড়ানোর মধ্যে দিয়ে কেটে গেল ছ-টি বছর।

শেষে রিটার বাবা রাজী হলেন। শুভলগ্নে আমার আর রিটার বিয়ে হল। বিয়ের ঠিক পরদিনই দুর্ঘটনাটি ঘটল।

(১৩)

সেদিনটা ছিল রবিবার। নব-বিবাহের সুখস্মৃতি নিয়ে ভোর হল। সবাই মিলে প্রার্থনায় যেতে হল। বিয়ের হৈ চৈ এর মধ্যেই ডক্টরকে কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখেছি। প্রার্থনায় উনি গেলেন না। যানও না কোনওদিন। সেদিন প্রার্থনা সেরে ফিরে পরীক্ষাগারের নিকটবর্তী হতেই বুকের স্নায়ুগুলোতে অনুরণন অনুভব করলাম। বুঝলাম পরীক্ষাগারের অনুভূতি-নির্দেশক মেশিনটিতে কিছু হয়েছে। ছুটে গেলাম। দেখলাম, ডক্টর স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে আছেন। মনে হল চেতনা নেই। সিমন ওর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আমি মেশিনটির দিকে না গিয়ে সুইচ বন্ধ করলাম। সেবিকাদের মধ্যে একজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে বোধহয় ভয়ে কাঁপছে। আরেকজন নেই। দেখলাম ছ-বছরের শিশু বালকটি মেশিনটির তলায় পড়ে আছে। মুখ নাক দিয়ে রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ছে। ডক্টর খানিক পর চোখ মেললেন। জিজ্ঞেস করলাম, এ শোচনীয় দুর্ঘটনা ঘটল কি করে? উত্তর দিলেন তিনি— দুর্ঘটনা নয়। এ ঘটতোই। শিশুর শরীরে বাইরের সঙ্গে সংযোগ রক্ষার কোনও স্নায়ু ছিল না। বুঝলাম, নবজাতকের মধ্যে নিউরণ বাদ পড়ে গিয়েছিল। ডক্টর প্রায় শিশুর মতো বলে উঠলেন, আমি ব্যর্থ হলাম, রয়। এখন জগতের কাছে মুখ দেখাব কি করে!

আমি সান্ত্বনা দেবার জন্য বললাম, এ নিয়ে ভেবে কি হবে, ডক্টর। এখন হয় প্রচার করে দিই— হঠাৎ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে বালকটির। কেউ তো দেখতে আসছে না, বা জানছে না যে নিউরণ নেই বলেই তীব্র অনুভূতি নির্দেশক মেশিনটির সমুখে এসে মৃত্যু হয়েছে শিশুর। শিশু বুঝতেই পারেনি সমুখে বিপদ। ডক্টর মেশিনটি চালিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সেবিকাদের অসাবধানতাবশতঃ ঘরের দরজা খোলা ছিল। শিশুটি ঘর ছেড়ে নিঃশব্দে পরীক্ষাগারে ঢুকেছিল এবং সোজা গিয়ে পড়েছে সামনের ওই মেশিনটির আওতায়। সিমন ডক্টরকে সান্ত্বনা দিলেন নানা প্রকারে। হঠাৎ ডক্টর উঠলেন— দৃঢ়স্বরে বললেন, হারব না রয়, আমার হাতেই যখন সব রয়েছে, তখন একবার শেষ চেষ্টা করে দেখব। কলমনার সেলটিকে নিউরণ বলে ভুল করেছিলাম। এবং সেই ছোট্ট সন্দেহটুকু উপেক্ষা করেছিলাম। এখন বুঝলাম আধারের হৃদয়ের এবং মস্তিষ্কের স্পন্দনের সঙ্গে শিশুর একটা বিশেষ সংযোগ রয়েছে। তাই জীবন্ত একটি আধার প্রয়োজন।

ভাবনা হল কথাটা শুনে। জীবন্ত আধার কোথায় পাব। ডক্টরের কথা চিন্তা ধরিয়ে দিল। উন্মাদনায় ডক্টর কি করে জীবন্ত আধার সংগ্রহ করবেন— কে জানে।

(১৪)

এই সংশয়ে রাত্রে বিনিদ্র রইলাম। সারাটা সকাল দুপুর ডক্টর উত্তেজিত ভাবে কাটালেন। কি একটা প্রচণ্ড আলোড়ন চলছে ওঁর শান্ত মনে— বুঝতে পারলাম না।

বেলা তিনটে নাগাদ প্রচণ্ড বর্ষা নামল। মনটা একটু শান্ত হল জলদ-স্পর্শে। মেঘখণ্ডগুলো যেন দূরের সমুদ্রের ওপর নুয়ে পড়ছে। ঝড় নেই— শুধু স্নিগ্ধ জলধারা। আকাশের এই কান্না সুদূরের অচেনা কোনও বন্ধুর কথা মনে করিয়ে দেয়। রিটা ওর বাবার কাছে বিয়ের পর থেকে। বিয়ের আগে যত আনাগোনা ছিল— এখন তত নেই। বর্ষা মনে করিয়ে দিল বাংলার কথা। দেশের পুকুর মাঠ সবুজ জলে ভিজছে এখন। এখানে সে সবুজত্ব নেই। এখানে মত্ত দাদুরী নেই— পল্লীর বধু বুকে মধু নিয়ে দূরাগত বিরহী স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে নেই। মানসনেত্রে দেখলাম, দেশে এতক্ষণে পাতা থেকে পাতায় টুপ টুপ করে জল পড়ছে। ছোট্ট ছোট্ট ভাই বোনের আনন্দে ছুট দিয়েছে গামছা দিয়ে মাছ ধরার জন্য। ছোট ছোট চিংড়ি মাছগুলো লাফাচ্ছে। মা হয়তো গরম গরম তেলেভাজা ভাজতে বসেছেন। এখানে সে সব কিছুই নেই। আছে শুধু রিটা। তা ও এখন কোথায় কে জানে!

বাইরে চেয়ে দেখলাম কে যেন পায়ে হেঁটে বাড়ীর কম্পাউন্ডে ঢুকছে। ভালো করে লক্ষ করতেই বিস্মিত হলাম— রিটা। মনে মনে ভগবান ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিলাম তাঁর অস্তিত্ব সম্বন্ধে তর্ক ভুলে গিয়ে।

তাড়াতাড়ি সুটকেশ থেকে আমার ধুতি বের করলাম। এখানে পরা হয় না মোটেই। তাই আনকোরা রয়ে গেছে। বাথরুম থেকে ও পোষাক পালটে এল। নূতন সাদা ধুতিখানা জড়িয়ে ও যখন সমুখে দাঁড়াল— তখন মুগ্ধ হয়ে গেলাম ওর রূপে। বিদ্যাপতির শ্রীরাধার তনুদেহটি মানসনেত্রে ভেসে উঠল। সুদেহী রিটা শ্বেত-বসনা হয়ে স্বর্গীয়া হয়ে উঠেছে। সিক্ত কয়েকটি অলোকগুচ্ছ ছড়িয়ে পড়েছে শুভ্র কপালে। দুগ্ধধবল কাপড়টি ওর সমবর্ণা শরীরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আরও উদ্বেল করে তুলেছে চারপাশের পরিবেশটা।

খানিকক্ষণ আগেই মেঘের আড়ম্বরে মনটা ভারী হয়েছিল। মনে পড়ে ছিল ‘বিরহকাব্য’ ‘মেঘদূতে’র সেই বিখ্যাত শ্লোক— মেঘের সঙ্গে যে মন্দাক্রান্তার অপূর্ব আত্মিক মিল—

রূদ্ধাপাঈ প্ৰসর মলকৈরঞ্জন স্নেহশূন্যং প্রত্যাদেশদর্পি চ

মধুনো বিস্মৃত ভ্রূবিলাসম্‌।

ত্বয্যাসন্নে নয়ন মুপরিস্পঙ্গি শঙ্কে মৃগাক্ষ্যা মীনক্ষোভাচ্চল

কুবলয় শ্রীতুলা মেষ্যতীতি।।

কবি বলেছেন বন্ধু মেঘদূতকে উদ্দেশ্য করে— বর্ণনা করছেন প্রিয়ার অবস্থা—ঘনকৃষ্ণ অলকদাম এসে পড়েছে কপালের ওপর, যথেচ্ছভাবে, চোখ দুটি প্রায় ঢেকেছে তাতে। সজল আঁখিতে তার কৃষ্ণাঞ্জন নেই। প্রিয়-হারা ব্যথায় মলিন, নিরুত্তাপ। প্রিয়ার সে মদিরালস চাউনি নেই—সেই কটাক্ষের তেজও নেই। নিতান্তই দীপ্তিহীনা, হে মেঘদূত, তোমায় দেখে মৃগাক্ষী প্রিয়তমা আমার ঊর্ধে চাইবে। দেখবে, প্রিয়ার নয়নতারা থর থর কাঁপছে— চঞ্চল মীনের আঘাতে কমলকলি যেমন কম্পিত হয়। প্রিয়ার হৃদয়তল থেকে উত্থিত সে ব্যথা বিরহে উদ্বেলিত করছে তাকে। আমার প্রিয়ার সে গভীর চাউনি ব্যথা সিঞ্চিত।

রিটাকে কাছে পেয়ে সেই অনির্দেশ্য ব্যথা দূর হল। ওকে অনুবাদ করে শোনালাম। মুগ্ধ বিস্ময়ে ও আরও শুনতে চাইল। বিদ্যাপতি আবৃত্তি করে শোনালাম। শেষে বললাম—

ইন্দিবর বর             
গরব গরাসিত

খঞ্জন গঞ্জন নয়না।

কোমল বিমল            
কমলক কৌশল

জিত স্মিত বিকশিত বয়না।।

ধ্বনি মাধুর্য ও নিজেই বুঝল। ভাব, অর্থ বুঝিয়ে দিলাম। ও আরও মুগ্ধ হয়ে উঠল।

(১৫)

হঠাৎ হুড়মুড় করে করে ঢুকলেন সিমন। বলতে বলতে বসে পড়লেন, রয়, তুমি যাও— দেখো ডক্টরকে বোঝাতে পার কি না। ও বলছে-ও নাকি শেষ পর্যন্ত জোর করেই সংগ্রহ করবে ওর আধার।

বিষন্ন মনে বাইরে এলাম। জানি ডক্টর আমার কথাও শুনবেন না। এই অবস্থায় কেউ শোনে না। দেখলাম, ডক্টর ভীষণ উত্তেজিত ভাবে বারান্দায় পায়চারী করছেন। আমাকে দেখেই চিৎকার করলেন, কি চাই? তুমিও বোঝাতে

এসেছ? যাও— বেরিয়ে যাও।

বুঝলাম— এতদিনের রূদ্ধ চিন্তা আজ ওঁর মস্তিষ্কে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করেছে। এই আঘাতেই ওঁর ব্রেন ভার সামলাতে পারছে না কোনও কিছুর।

সিমন বললেন, সকালে রেডিয়োর খবর শুনেছেন— কোন্ এক জার্মান বিজ্ঞানী নাকি এই পথে এগিয়ে এসেছেন উন্নততর প্রণালীতে। এই খবর ওঁর বর্তমান মানসিক অবস্থার পক্ষে স্বাভাবিক হয়নি। তাই এ অবস্থা।

সিমন বললেন, আমি ওঁকে যথেষ্ট বুঝিয়েছি। বলেছি, জীবন্ত আধারের কি প্রয়োজন। ডক্টর তো মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চারিত করে তা পেতে পারেন। কিন্তু, ডক্টর বলেছেন, তাতে নাকি হবে না। হত, যদি মৃত্যুর তিন চার সেকেণ্ডের মধ্যেই তিনি কাজ শুরু করতে পারতেন। তা ছাড়া মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চারের ফলে নাকি দেহ থেকে কি একটা পদার্থ বাদ যায় এবং তার কৃত্রিম সংযোজন করতে হয়, কিন্তু ওই কাজে কৃত্রিম দিয়ে চলবে না। ডক্টর তাই পাগলের মতো খুঁজছেন জীবন্ত একটি নারীদেহ।

ডক্টর আজকাল দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছেন। ওঁর চিন্তাধারা আমিও বুঝতে পারছি না। ভেবে অবাক লাগল— সেই শান্ত, সৌম্য, মানুষটির আজ একি অবস্থা। তবু অশ্রদ্ধা করতে পারলাম না তাঁকে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায়, করুণায় মনটা ভরে উঠল।

সিমনের অবস্থা মনে করে কষ্ট হল। এ অবস্থায় ডক্টরকে একা ছেড়ে দেওয়াই সঙ্গত। উনি নির্জনে চিন্তার সুযোগ পাবেন। অবশ্য বুঝতে ঠিকই পারলাম, উনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেই গেছেন। তব ওঁকে একা ছেড়ে থাকাই সমীচীন মনে হল। তাই সিমনের কাছে প্রস্তাব করলাম দুদিন বাইরে ঘুরে আসব। কিন্তু তিনি স্বামীকে ছেড়ে যাবেন না। উপকার হলেও না। জানি ডক্টরকে রোধ করার শক্তি কারোই নেই। বিজ্ঞান সাধক উনি। সাধারণ চোখে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা তার আছে। তাই, লস এঞ্জেলসে রিটাকে নিয়ে বন্ধুদের বাড়ী চলে এলাম। তারপর দুদিন পর যখন ফিরলাম তখন আমার এই বিদেশের জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁচেছি!

(১৬)

কমিশনার মিঃ মরিস স্বয়ং থানা থেকে আসছেন খবর এল। ব্যাকুল হয়ে এগিয়ে গেলাম পরীক্ষাগারে, দরজা বন্ধ। লোহার মতো শক্ত, বিশেষ ভাবে তৈরি কাচের জানলা দিয়ে দেখলাম। কথা বলার মেশিনটি চালু ছিল। তাই কথাগুলো কানে এল।

ডক্টর অপারেশন টেবিলে দাঁড়িয়ে আছেন। সমুখে শোয়ানো একটি নারীদেহ। তাকে বাঁধা হয়েছে টেবিলের সঙ্গে। সিমনকে অপরিচিত দুটো লোক চেপে ধরে আছে। ছটফট করছেন তিনি। বলছেন, তুমি ওকে ছেড়ে দাও। ডক্টর, এই পাশবিক কাজটি করো না। তুমি তো আমারও প্রাণ দান করেছিলে, তুমি আমাকেই তোমার কাজে লাগাও। আমি প্রার্থনা করছি। ডক্টর।

সিমনের চুল এলিয়ে পড়েছে কাঁধে, বুকে। গাউনের কয়েকটি জায়গা ছিঁড়ে গেছে। তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন নিজেকে ছাড়াতে।

টেবিলের নারীটির দিকে তাকালাম। অপরিচিত নয়। ডক্টরের কাছে, দু-একবার এসেছিল মেয়েটি। ওকে টেবিলটার সঙ্গে ভালো করেই বাঁধা হয়েছে। ও নিশ্চয়ই জানে অপারেশন হবার পর পর শরীরের সমস্ত স্পন্দন গিয়ে মিশবে কৃত্রিম সন্তানের চেতনায়। ওর সমস্ত অনুভূতি বিদ্যুতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হবে নবজাতকের মস্তিষ্কে। তারপর ধীরে ধীরে নিঃশেষিত হয়ে ও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।

ডক্টর উঠে এলেন সিমনের কাছে। বললেন, যদি চুপ করে থাকতে পার— তবে সজ্ঞানে থাক; না তো… সিমন আক্ষেপে চিৎকার করে উঠলেন— তাই কর— একেবারে মেরেই ফেল আমাকে। মেরে ফেল—।

ডক্টর ওঁকে সম্মোহন-মেশিনটার কাছে আনলেন। এতে মনের জোর পরীক্ষা করা হয়। সিমনের স্নায়ু ধীরে ধীরে অবশ হয়ে এল। ঢলে পড়লেন ডক্টরের বুকের ওপর। লোক দুটি ধরাধরি করে শুইয়ে দিল মেঝেতে। আশঙ্কা হল আমার— ডক্টর কি প্রিয়তমা পত্মীকে চিরনিদ্রায় শায়িত করলেন! কারণ এক ঘণ্টার মধ্যে যদি সিমনকে ওষুধ না খাওয়ানো যায়, তবে এ চেতনাচ্ছন্ন ভাব আর কাটবে না।

বোধ হয় ডক্টরের আদেশেই একটি লোক কথা বলার মেশিনটিকে বন্ধ করল। ডক্টর তাঁর কাজ আরম্ভ করলেন। হঠাৎ বাইরে হৈ চৈ উঠল। মিঃ মরিস দলবলসহ এসে পড়েছেন। এসেই আমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। আমি ডক্টরের সহকারী। আমি নিশ্চয়ই উপায় বলে দিতে পারব যাতে মেয়েটিকে এখনও বাঁচান যায়।

মরিসের অনুরোধে আমার মনে ঝড় উঠল। দরজা খুলার উপায়টি একমাত্র আমিই জানি। কিন্তু ডক্টরের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করার সাধ্য আমার নেই। বিবেক কি বলছে শুনতে পেলাম না। পরীক্ষাগারের দেওয়াল-সংলগ্ন সরু সরু ম্যানহোলগুলোর দিকে তাকালাম। ডক্টরকে বাধা দিতে গেলে উনি যদি পারমাণবিক তেজপুঞ্জের কিছুটা বাইরে চালনা করেন, তাহলে মুহূর্তে অদৃশ্য হব সবাই। তা ছাড়া দেখতে পাচ্ছি ডক্টর ক্ষিপ্রহস্তে কাজ করছেন।

আমার এই চুপ থাকাকে মিঃ মরিস ভুল বুঝলেন, দুজন অফিসারকে বললেন আমার দুপাশে দাঁড়াতে। ছুটে গেলেন বন্ধ দরজার দিকে। খবর পেয়ে সবাই এসেছে। রিটাকে দেখলাম শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ডক্টর কাজ করে চলেছেন। সমস্ত দেহটিতে মলম লাগালেন। বাঁধন খুলে দিলেন মেয়েটির। বুঝলাম— ও মলমের গুণে অবশ হয়ে পড়েছে। বাষ্পের মতো নবাবিষ্কৃত মেশিনটিতে মেয়েটির মাথাটি গলিয়ে দিলেন। কাচের পাত্রটিতে শুইয়ে দিয়ে বাকী মেশিনগুলো চালু করলেন। ছাই রংয়ের একটি বায়বীয় পদার্থ সমস্ত আধারটিকে ঘিরে ধরল। জোরালো আলোগুলো তীব্র রশ্মি বিচ্ছুরণ করতে লাগল। দেখলাম, লোক দুটি বোবা ভয়ে চেয়ে দেখছে ডক্টরের কাণ্ডকারখানা।

মিঃ মরিস এদিকে দরজা ভাঙবার অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু দরজা একচুলও নড়ল না। আক্রোশে ফেটে পড়লেন তিনি অন্যান্য অফিসারদের ওপর। মনে মনে হাসলাম ওঁর অবস্থা দেখে।

হঠাৎ দরজা খুলে গেল। সিমনকে ধরে ডক্টর এসে দাঁড়ালেন বাইরে। বুঝলাম, একঘণ্টার আগেই সিমনকে ওষুধ খাইয়েছেন ডক্টর। ফিলিপ, অ্যানা এগিয়ে এল। সিমনকে ধরাধরি করে নিয়ে গেল। ডক্টর সস্নেহ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন তাঁর দিকে। ডক্টরের দ্বিবিধসত্তা আমাকে মুগ্ধ করল। আশ্চর্য মানুষ!

লোক দুটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল পুলিশ। ওরাই ডক্টরকে সংগ্রহ করে এনে দিয়েছে ওই মেয়েটিকে। পরীক্ষাগারের দরজা পুনরায় বন্ধ হয়ে গেছে। মিঃ মরিস একবার ভেতরে ঢুকতে চাইলেন। কিন্তু ডক্টর রাজী হলেন না। ধীরে ধীরে হাত দুটি প্রসারিত করে দিলেন সমুখে। মরিস বললেন, তার দরকার নেই। এমনিতেই চলুন। আমি ও ডক্টর মরিসের সঙ্গে পুলিশের গাড়ীতে উঠলাম। নারীহত্যার অপরাধে ডক্টর এবং তাঁকে সাহায্য করার অপরাধে আমি বন্দী হলাম।

(১৭)

এরপর বিচার চলল দীর্ঘ ন-মাস ধরে। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করলেন। তবুও ডক্টরের পাঁচ বছর জেল হল। আমার প্রতি আদেশ হল ভারতে চলে যাবার। কিছুদিন আগে থেকেই তাঁর মস্তিষ্কের সামান্য বিকৃতি ঘটেছিল। শাস্তির খবরে পুরোপুরি উন্মাদ হলেন। হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হল তাঁকে।

আমার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছিল। একটা মাস সময় চাইলাম ডক্টরের সৃষ্টির পরিণতি দেখার জন্য। তাঁর পরীক্ষাগার জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞান সভার তত্ত্বাবধানে ওঁর উৎপত্তি পরিণতির পথে তিলে তিলে এগিয়ে চলেছে।

একদিন শেষে খবর প্রকাশিত হল। ডক্টরের উৎপন্ন শিশু সার্থক হয়ে উঠেছে আগের চেয়েও। কিন্তু সূক্ষ্ম অনুভূতির কোনও লক্ষণ নেই শিশুর মধ্যে। বাগযন্ত্র পরিষ্কার— কিন্তু অর্থহীন ধ্বনি নিঃসরণ হচ্ছে। চোখের চাহনিও সুন্দর— কিন্তু ভাবলেশহীন। ডক্টরের মেশিনেই পরীক্ষা করা হল শিশুকে। সত্যি তাই। অনুভূতি নেই। তবে শব্দ বা স্পর্শ একটু একটু বুঝতে পারে নবজাতক।

সমস্ত ব্যাপারটা চিন্তা করে, আমার মনে ক্ষোভ উত্তাল হয়ে উঠল। কোন মুখ নিয়ে ডক্টরের সঙ্গে শেষ দেখা করতে যাব? কি সান্ত্বনার বাণী শোনাব তাঁকে?

দুদিন পরই জার্মান এবং সোভিয়েট রিপোর্ট বের হল। উন্নততর প্রণালীর পরীক্ষা হলেও তাঁরা একই ফললাভ করেছেন। রিপোর্টে বলেছেন, সূক্ষ্ম অনুভূতি সম্পন্ন কৃত্রিম মানুষ উৎপন্ন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যান্য জীবের মতো স্থলে অনুভূতিগুলো উৎপত্তি হয়েছে— কিন্তু সূক্ষ্ম বুদ্ধিবৃত্তি সৃষ্টি হয়তো সম্ভব নয়। কোন অজানা রাসায়নিক মিশ্রণের ফলে এই অণু-পরমাণু গড়ে উঠবে তা হয়তো চিরদিনই অনাবিষ্কৃত থেকে যাবে। মানুষ হয়তো কোনওদিনই প্রকৃতির সমক্ষমতা- সম্পন্ন হতে পারবে না।

ব্যাথিত হৃদয় নিয়ে ডক্টরের কাছে শেষ বিদায় নিতে গেলাম। তিনি বিছানায় চুপচাপ শুয়েছিলেন। আমার দিকে ভাবলেশহীন চোখে চাইলেন। বললাম সব। ভেবেছিলাম হয়তো কিছুই বুঝবেন না। স্পষ্ট দেখলাম আমার শেষ ক-টি কথা শুনে প্রথমে চোখ মুখ লাল হয়ে উঠল। তারপর চোখ দুটো যেন ঔজ্জ্বল্যে হেসে উঠল। কথা বলা ওর বন্ধ হয়েছিল অনেকদিন আগেই। হঠাৎ বলে উঠলেন, ধন্যবাদ। হাসপাতালের কর্মীগণ ছুটে এলেন। ডক্টরের বাকযন্ত্র তবে নষ্ট হয়নি। ভীড় বাড়ল। আমি নিঃশব্দে বিদায় নিলাম। ব্যাথা বিক্ষুব্ধ হৃদয়ে এয়ারপোর্টে চলে এলাম। বিদায় জানাবার জন্য রিটা অপেক্ষা করছিল সেখানে।   

প্রথম প্রকাশ: আশ্চর্য! ১৯৬৪, ফ্রেব্রুয়ারি।

কাহিনিতে মূল বানানবিধি অনুসরণ করা হল। লেখকের নামের বানান প্রচলিত ‘মানিক’ না রেখে লেখক ব্যবহৃত ‘মাণিক’ রাখা হল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *