এ কমপ্লিট ওম্যান – রোবার্তা ল্যানেস – সুদীপ দেব
এখনও আমি শব্দহীন, দৃষ্টিহীন। আমার হাত নেই, পা নেই। কী অসহ্য যন্ত্রণা! যখন ভাবি পশ্চিম আকাশে লাল আবির ছড়িয়ে সূর্য ডুবে যাচ্ছে, কিন্তু আমার চোখে শুধুই অন্ধকার, সেই যন্ত্রণা যেন আরও সহস্রগুণ বেড়ে যায়। তাই সে ভাবনা থেকে বিরত হই।
আজ সকাল ছ’টায় নার্স এসেছে। শুধুমাত্র শব্দ শুনেই আমি সময়ের ধারণা করতে পারি। রাত্রিবেলা ডাক্তারের বোন আমার পাশে বসে ছিল। তার নাকি অনিদ্রা রোগ আছে, সেই জন্য রাতে সে আমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য বসে থাকে। আমার খুব একটা বিশ্বাস হয়নি ওর কথা। তবে মেয়েটার সঙ্গ আমি মাঝে মাঝে উপভোগ করি। আসলে এই অবস্থায় শুধুমাত্র চিন্তা করার ক্ষমতা ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না আমি।
আমাকে স্নান করানো, খাওয়ানোর মতো সকালবেলার নিত্যনৈমিত্তিক কাজগুলো শেষ করার পর আমার দু’জন নার্সের একজন রেডিওতে ক্লাসিক্যাল গান চালিয়ে দিল। আমি হেসে আমার ভালো লাগার কথা তাকে জানালাম। দু’জনের মধ্যে ওকে আমার বেশ পছন্দ।
আমাকে স্নান করানো যেমনই দুরুহ, তেমনই যন্ত্রণাদায়ক একটা ব্যাপার। আমার কাঁধ বেয়ে যে টিউবগুলি নেমেছে তাদের পরিষ্কার করে সিন্থেটিক চামড়ার আশপাশের মৃতকোষগুলি ঘষে তুলে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ওষুধ লাগানো হয়। স্নান করানোর এই পর্বটা সত্যিই অসহ্য। ব্যথায়, যন্ত্রণায় আমি কাতরাতে থাকি; তাই ওই সময়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়। আর সেই জন্য আমি আসল জিনিসটাই উপভোগ করতে পারি না। আমার প্রিয় নার্স তার মোলায়েম হাত দিয়ে ধুয়ে দেয় আমার স্তনবৃন্ত, সাবানমাখা কাপড় বুলিয়ে দেয় আরও নীচে মাংসপিণ্ডাকার প্রত্যঙ্গগুলিতে। যার নীচে কয়েকদিন পরেই আমার পায়ের সৃষ্টি হবে। আমার ভালো লাগাটাও বুঝতে পারে, তাই বেশ সময় নিয়ে ধীরে ধীরে এই কাজটা করে। আমি নিশ্চিত, যন্ত্রণার শেষে প্রশান্তির ছাপ আমার মুখের অভিব্যক্তিতে বোঝা যায়। আমি তার নিশ্বাস প্রশ্বাসে স্বস্তির ছন্দ অনুভব করতে পারি।
প্রাত্যহিক এই প্রভাতি কার্যকলাপের পর যখন বিষাদে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি, মৃদুসঙ্গীতের মূর্ছনায় আমি আবার আমার অতীত ও ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর হয়ে যাই। এরপর ডাক্তার আসে।
আহ্, ডাক্তার। তোমার চেহারা আমার মানসচোখে এখনও ভাসে। দীর্ঘকায়, প্রশস্ত বুক, বাদামি চুল। নাহ্, তার রূপ, মেধা বা বাকচাতুর্যের মোহে আমি আমার সিদ্ধান্ত নিইনি। সেদিন বিকেলের প্রতিটি কথা আমার অনুপুঙ্খভাবে মনে আছে।
ক্যানসার আমার স্তনদুটি আর লিম্ফনোড কেড়ে নিয়েছিল। আমার কেমোথেরাপি চলছিল। নেড়া মাথার এক বিষণ্ণ মূর্তির মতো অপেক্ষা করছিলাম অন্তিম দিনটির জন্য। ভিজিটিং আওয়ারের ঠিক পরেই ডাক্তার এল। একজন সফল লেখক আর গবেষক হিসেবে জীবনের আটাত্তরটা বসন্ত পেরিয়ে আসার পর আমাকে ভিজিটিং আওয়ারে দেখতে আসার মতো কেউ ছিল না। তাই ওকে দেখে আমি একটু বিস্মিত হয়ে ছিলাম।
প্রবীণ লোকটা মন্দ্র মোলায়েম স্বরে বলল, ‘মিস ক্রাগ, আমি একজন ডাক্তার।’ তার দৃষ্টি আমার স্তনহীন বক্ষ আর শীর্ণ হাতের ওপর খেলা করছিল।
আমি রুক্ষভাবেই বললাম, ‘কী ব্যাপার?’
‘আমি আপনার লেখার একজন ভক্ত। রেনেসাঁ শিল্পী বিশেষ করে সঙ্গীতকারদের জীবনী নিয়ে আপনার অসাধারণ বইগুলির আমি এক মুগ্ধ পাঠক। আপনি নিঃসন্দেহে রুচিশীল এবং নিষ্ঠাবান একজন মানুষ। আপনি ইতিহাসকে রোমাঞ্চকর আর অসম্ভব উত্তেজনাপূর্ণ কল্পনাশক্তির সঙ্গে মিশিয়ে উপস্থাপিত করতে পছন্দ করেন।’ সে অর্থপূর্ণ কটাক্ষ করল। আমার বেশ মনে আছে, সেই মুহূর্তে হতাশভাবে ভেবেছিলাম যে এই ধরনের মানুষকে আকৃষ্ট করার মতো রূপ বা সামর্থ্য কোনটাই আর আমার নেই। এমন একজন মানুষ আমার কলমের আবেগ অনুভব করতে পেরেছে।
“আশা করি, আপনি রাগ করবেন না। কিন্তু আমি আপনার চার্টে যাওয়ার স্বাধীনতা নিয়েছি। আমি অঙ্কোলজিস্ট নই, কিন্তু মনে হচ্ছে আপনি কিছুটা বেশি পরিমাণে মেটাস্ট্যাসাইজ করতে পারবেন।”
“হ্যাঁ, আমি তো এখন সেই অর্থহীন মরীচিকার পিছনেই অর্থব্যয় করছি, তাই না?”
“হুম। তবে আমি আপনাকে এর মধ্যেও মরুদ্যানের সন্ধান দিতে চাই।”
আমি অতি কষ্টে উঠে বসার চেষ্টা করতে লাগলাম, সে দ্রুত আমার আরও কাছে এগিয়ে এল। আমি ভুরু কুঁচকে তাকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলাম।
“আপনি কি আমার চিকিৎসার ব্যয় বহন করার মতো কোনও প্রস্তাব দিতে চাইছেন?”
“আপনার অনুমান শক্তির খুব একটা প্রশংসা করতে পারছি না।” সে ঘাড় ফিরিয়ে তার পাশে থাকা ছেলেটিকে দেখিয়ে বলল, “আমি এর মতো আরও কয়েকজনকে একটি নতুন জীবনের সন্ধান দিতে পেরেছি, আর আপনাকেও সেটা দিতে চাই।”
নাকের কাছে নেমে আসা চশমাটা তুলে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, কিন্তু অস্বাভাবিক কিছুই নজরে এল না।
“কীভাবে ম্যাজিকটা দেখাবেন? আরও একবার অস্ত্রোপচার?”
“আমি আপনাকে কোনও সর্বরোগনাশক বড়ি দিতে পারব না, মিস ক্রাগ। ডাক্তারি পরিভাষার কচকচিতে না গিয়ে সোজা করে বলতে গেলে এ হল সম্পূর্ণ মস্তিষ্কের প্রতিস্থাপন, যা করা হবে অন্য একটি সুস্থ সবল মাথা এবং শরীরের মধ্যে।” সে চুপ করে আমার উত্তরের প্রতীক্ষা করতে লাগল।
ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আগে কেউ আমাকে এমন প্রস্তাব দিলে কী করতাম জানি না, কিন্তু এখন আমি অসুস্থ, দুর্বল, অবসাদগ্রস্ত এক বৃদ্ধা যে আর কোনওদিন এই বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর আশাটাও ত্যাগ করেছে। এসব শোনার পর তার অভিব্যক্তি কী হতে পারে! আমি উচ্চকিত হেসে উঠলাম।
সে আমাকে হাসতে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। আমি জানি, সে আশা করেছিল যে আমি হয়তো খুব ভয় পেয়ে যাব বা খুব অবাক হয়ে যাব। কিন্তু আমি যে কেন হেসে উঠলাম তা আমি নিজেও জানি না।
“মিস ক্রাগ, এটা কিন্তু খুব সিরিয়াস একটা বিষয়। আপনাকে বেছে নেওয়ার অনেকগুলি কারণের মধ্যে অন্যতম হল আপনার প্রখর বাস্তববোধ।”
তার সেই আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, গোলাপি হয়ে যাওয়া অজেয় কচি মুখখানা দেখে আমি সত্যি প্রেমে পড়ে গেলাম।
“মাই ডিয়ার ডক্টর…”
“ডক্টর চার্নস্কি… কেনেথ।”
“ডক্টর চার্নস্কি, তুমি যেটা করছ নিশ্চয়ই সেটা পুরোপুরি নিজের বিশ্বাস থেকেই করছ। কিন্তু তুমি তো আমার জায়গায় নেই, থাকলে বুঝতে পারতে এমন একটা সময় এমন একটা অদ্ভুত প্রস্তাব নিয়ে আসার অভিঘাত কীরকম হতে পারে।”
“হ্যাঁ, অবশ্যই অদ্ভুত, অভূতপূর্ব আর অবিশ্বাস্য। ঠিক আপনারই মতো। আপনার মতো অসাধারণ একটি মন, একে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়। আর সেটাই আমি সম্ভব করে দেখাব। আমি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। আমি মাইকেল এঞ্জেলো। আপনি ঠিক যেমনটি চান অস্ত্রোপচার করে আমি সেটাই আপনাকে দিতে পারি।” পাশের ছেলেটির কাঁধে হাত দিয়ে তাকে টেনে আরও কাছাকাছি নিয়ে এল সে, “আমি আমার করা কাজগুলির মধ্যে একটি নিদর্শন সঙ্গে নিয়ে এসেছি।”
আমি আরও ভালোভাবে ছেলেটির দিকে দেখলাম, “তাহলে আপনি আগেও এইরকম বীভৎস সার্জারি করেছেন?”
“হ্যাঁ, তবে আপনার জানা উচিত যে এ জিনিস যুক্তরাষ্ট্রের কোনও মেডিকেল
বোর্ড বা স্কুল দ্বারা অনুমোদিত নয়।”
“অবৈধ?”
“বেআইনিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এমন অর্থে অবৈধ নয়। এইরকম সার্জারি এখনও পর্যন্ত করা হয় না। কিন্তু যখন আমি তার স্বীকৃতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে পারব তখনই হবে। আরও কয়েকজনের সঙ্গে সাইমন, এবং আশা করব আপনিও আমাকে এই কাজে সাহায্য করবেন।”
আমি সেই নিদর্শন হিসেবে উপস্থিত ছেলেটির দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলাম, “ওহে, বলো তো, এটা কি খুব যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার?” যে যন্ত্রণা সহ্য করার মধ্যে দিয়ে ইতিমধ্যেই আমাকে আসতে হয়েছে এখন মনে হচ্ছে তার পুরোটাই হতাশাজনক, তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভালো করে যাচাই করে নিতে হবে।
সে মুচকি হেসে বলল, “আমি অন্যরকম উত্তর দিতে পারলে খুশিই হতাম, কিন্তু সত্যিই ব্যাপারটা খুব যন্ত্রণাদায়ক ছিল। ঘুমের ওষুধ আর পেইন কিলার দিয়ে কিছুটা ব্যথার উপশম করা হয় মাত্র। কিন্তু এখন, অস্ত্রোপচারের দীর্ঘদিন পর আমি নিশ্চিতভাবে স্বীকার করতে পারি সেই কষ্ট বা বেদনা বিফলে যায়নি।”
আমি ডাক্তারের দিকে ঘুরে গেলাম, “আধুনিক বিজ্ঞানের জয় হোক। এই ফ্র্যাঙ্কেনস্টিনিয়ান ক্রিয়াকলাপ শেষ হতে কতক্ষণ সময় লাগবে?”
সে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল, “সাইমনের প্রায় এক বছর লেগেছিল।”
“এক বছর? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না এত সময় কীভাবে লাগে।”
“যখন আমি আমার গবেষণা শুরু করেছিলাম, প্রথমে আমি ছিন্নভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে পুনরুদ্ধার করেছি; হাড় থেকে হাড়, পেশি থেকে পেশি, ধমনী থেকে ধমনী। এছাড়া অপটিক স্নায়ু বা বিচ্ছিন্ন চোখের মতো জিনিসের পুনঃসংযোগ করেছি। এসব ব্যাপারে আমার দক্ষতা এখন সব প্রশংসার ঊর্ধ্বে। এরপর আমি এই সেলাই ফোঁড়াইয়ের চিহ্নগুলো অদৃশ্য করতে প্লাস্টিক সার্জারির কৌশল শিখেছি। মস্তিষ্ক সংযুক্তি ব্যাপারটা দু’বছর ধরে পরীক্ষামূলক ধাপে ছিল, যতক্ষণ না আমি তা সম্পূর্ণ নিখুঁত করে তুলতে পারি। এরপরেও মস্তিষ্কের সঙ্গে অন্যান্য অঙ্গগুলিকে সমাবেশ করানোর এই যে পদ্ধতি, তা কিন্তু একটি দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া।”
“আমার নির্বোধ প্রশ্নের জন্য ক্ষমা করবেন, সময় বাঁচানোর জন্য একটা শরীর সমেত মুন্ডুর মধ্যে মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন করে দিলেই তো ব্যাপারটা অনেক সহজ হয়ে যেত, তাই নয় কি?”
“না, এটা নির্বোধ প্রশ্ন নয়। এইভাবে করলে অবশ্যই পদ্ধতিটা আরও গতিশীল হবে। সারা বিশ্বে বেসরকারি হাসপাতালের মাধ্যমে দান করা দেহাংশের খোঁজ আমি পাচ্ছি। কিন্তু আমার প্রয়োজনমতো স্বাস্থ্য এবং চেহারা সম্পন্ন একটি সম্পূর্ণ শরীরের সন্ধান কোথাও পাইনি আমি। এমন একটি শরীর
যাকে আপনি নিজের যোগ্য বলে মনে করবেন।”
“আমার একটাই চাওয়া, যদি আমাকে এই ব্যথা-বেদনা ও কষ্টের মধ্যে দিয়ে
যেতে হয়, তবে সেটা যেন বিফলে না যায়। তাই ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার মতো কোনও পদ্ধতি নেই?”
সে শ্রাগ করে বলল, “আমার প্রয়োজন মতো যেমন যেমন দেহাংশ পাব সেই হিসেবে এগিয়ে যাব।”
“আর তোমার পছন্দমতো মুন্ডু খুঁজে পাওয়ার আগেই যদি আমার মৃত্যু হয় তবে কী হবে?” আমি মৃদু হেসে বললাম।
“সেটা হবে না। দেখুন, আমার কাছে এই মুহূর্তে একটি নিখুঁত মাথা এবং ধড় আছে। আপনাকে আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
“কয়েক ঘণ্টা?” হঠাৎ আমার অ্যাড্রেনালিন ক্ষরণ বৃদ্ধি পেল আর আমার সামনে বিকল্প চিন্তার সম্ভাবনাগুলি ক্রমশই কমে আসতে লাগল।
“মেয়েটি সর্বতোভাবে নিখুঁত। আজ বিকেলে আমি তাকে পেয়েছি। তার মস্তিষ্কের মৃত্যু হয়েছে, আমি তার শরীরের বাকি অংশটা লাইফ সাপোর্টে রেখেছি। সেটার কোনও রকম অবনতি আমি চাই না, তাই আমাকে তাড়াতাড়ি কাজ করতে হবে।”
আমি নিজেকে নিজেই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে শুরু করলাম। গল্পের চরিত্র ছাড়া আর কাউকে এরকম অবস্থায় পড়তে দেখিনি। আমার যদি আরও পঞ্চাশ বছর বাঁচার সুযোগ হয়, তাহলে আমি কি সেটা গ্রহণ করব? অন্য কারও শরীরে কি আমি বেঁচে থাকতে পারব? আমি কি আবার সব কিছু করতে সক্ষম হব? নতুন করে? নাকি সবটাই মূল্যহীন হয়ে যাবে?
আর যদি আমি না রাজি হই, তাহলে মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনও পথ তো সামনে খোলা নেই। আমি জানি আমার মুখের অভিব্যক্তিতে আমার এই দোটানা ফুটে উঠেছে।
“সাইমন, তুমি মিস অ্যালিসন নেরি ক্রাগের সঙ্গে কথা বলো। সাইমন লেফেভের, আমার সর্বশেষ সৃষ্ট মানুষ।”
“কথাকার সাইমন লেফেভের! তিনি তো মারা গিয়েছেন!” বিস্ময়ে আমার চোয়াল ঝুলে পড়ল।
“হ্যাঁ, তিনি মারা গিয়েছিলেন। এখন তিনি অন্য নাম নিয়েছেন।”
আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। “নিউমোনিয়ায় মারা যাওয়ার সময় তাঁর বয়স হয়েছিল নব্বই বছর। আমি জানি, কাগজে পড়েছিলাম।” আমি ছেলেটিকে কাছে টেনে আরও ভালোভাবে তাকে খুঁটিয়ে দেখলাম।
“তার মৃত্যুর আগে তাকে আমি গ্রহণ করেছিলাম। বিস্তারিত খুঁটিনাটি বলে আপনাকে বিরক্ত করতে চাই না।”
আমার মাথা সত্যি সত্যিই ঘুরছিল। আমি লেফেভেরের প্রায় সব লেখাই পড়েছি। গভীর আধ্যাত্মিক সব শক্তিশালী উপন্যাস। তিনি এমনকী দ্বিতীয় জুলিয়াস সম্পর্কেও লিখেছিলেন, সেই পোপ যিনি রেনেসাঁর প্রাথমিক শিল্প সমর্থকদের একজন ছিলেন। একটি অতুলনীয় লেখা, সেই সময় আমি তাঁর পাশে সর্বক্ষণের জন্য ছিলাম।
ছেলেটির বয়স খুব বেশি হলে উনিশ বছর হবে, উচ্চতা এবং চেহারা মোটামুটি চলনসই, কিন্তু আগে আমি যেমন দেখেছি তেমনটা সুন্দর নয় মোটেও। এই ছেলেটির মধ্যে যদি সাইমন লেফেভেরের মনটা থেকে থাকে, তাহলে সে আবার সেইরকম মহান সৃষ্টি করতে পারে! ডাক্তার নিশ্চয়ই আমার মুখে বিস্ময়কর আনন্দ প্রতিফলিত হতে দেখতে পেয়েছে।
“সাইমন, অ্যালিসন নেরি ক্রাগকে চিনতে পেরেছ নিশ্চয়ই।”
ছেলেটা আমার হাতদুটো তার মুঠোতে ধরল, আমি শিহরিত হলাম। নেড়া মাথা নেড়ে বললাম, “আমি বিশ্বাস করি না।”
“আচ্ছা, বেশ। আমি আপনার ভক্ত। শিল্প সম্বন্ধীয় আপনার নিবন্ধ ‘আর্ট অ্যান্ড অ্যান্টি কুইটিস’ আমাকে ‘দ্য পোপ’ উপন্যাসটি লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিল। আপনার মনে আছে কি না জানি না, উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার ঠিক আগেই এব্যাপারে আমি আপনাকে একটা চিঠিও লিখেছিলাম।”
“সত্যি! সত্যিই আপনি বেঁচে আছেন।”
“হ্যাঁ, আছি। আর সেটা সম্ভব হয়েছে কেনেথের জন্যই। এই দেখুন…” তিনি আমাকে তাঁর কবজিতে আর কাঁধে দুটি জোড়ের চিহ্ন দেখালেন। আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলাম।
“এখনও কি খুব যন্ত্রণা হয়?”
সাইমন তার চিবুকে হাত বুলিয়ে বলল, “অনাক্রম্যতা রোধের ওষুধগুলো খেলে মাথাব্যথা করে, অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিছু আছে, যেমন কখনও কখনও খুব দুর্বল লাগে, কিন্তু বুড়ো বয়সে আমার যে অবস্থা হয়েছিল তার তুলনায় এ কিছুই নয়। তা ছাড়া দিন দিন আরও ভালো বোধ করছি।”
“বাহ! খুব ভালো কথা। আশা করি আপনি এখনও লেখালিখি চালিয়ে যাচ্ছেন।”
“অবশ্যই। তবে আমি এখন ছদ্মনামে লিখছি। সাইমন লেফেভেরের ভূত তো আর লিখতে পারে না। এখন আমি জিনলুক ফোরাড।”
“হুম…‘ঈগলের বাসা’ নামে আপনার একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। আমার বাড়িতে আছে।” আমি নব্বই বছর বয়স পেরিয়ে আসা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে দেখলাম। এখন তার বয়স তিরানব্বই বছর হওয়ার কথা। আমিও এরকম একটি সুন্দর, নবযৌবন পেতে পারি। আবার আমার লেখার শক্তি ফিরে আসতে পারে, এমন একটি ভবিষ্যৎ।
“আপনি কেনেথকে সম্মতি জানাবেন কি না জানি না, কিন্তু যদি সম্মত হন তবে ভবিষ্যতেও আপনার সঙ্গে আমি যোগাযোগ রাখতে চাই। আমি এখনও আপনার কাজের একইরকম ভক্ত।”
“আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। ডঃ চার্নস্কি, আমি আপনার সাহায্য এবং সঙ্গ চাই। আমি আবার আমার যৌবন ফিরে পেতে চাই।” শিশুর মতো হেসে আমি বলে উঠলাম।
“চিরকালের জন্য…” ডাক্তার ঠাট্টার ছলে বললেন।
আমাকে হাসপাতাল থেকে গোপনে সরিয়ে নিয়ে আসা হল। পরের দিন, একটি মোটেলের ঘরে পাওয়া গেল আমার লাশ, আমার হাতে পাওয়া শট গানের গুলিতে ছিন্নভিন্ন আমার মাথা। ঘটনাটিকে নিখুঁত করার জন্য আমার মাথায় বসানো হয়েছিল সেই মহিলার মৃত মস্তিষ্ক, যার মাথায় আমার মস্তিষ্ক খুব তাড়াতাড়ি বসানো হবে। আমার আত্মহত্যার চিঠিটা খুব ছোট এবং মিষ্টি ছিল।
তিন সপ্তাহ পরে আমি কোমা থেকে বেরিয়ে এলাম। ডাক্তারের কণ্ঠস্বরে নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে আমার চেতনা ফিরে এল। সে প্রথমেই বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে আমার মৃত্যু সংবাদ পড়ে শোনাল। তারপর সে আমার ক্ষতিগ্রস্ত অপটিক স্নায়ু, আর আমার ল্যারিংসের অস্থায়ী অবস্থার ব্যাখ্যা করে বলল, এসবই শুধরে নেওয়া তার আয়ত্তের মধ্যে আছে। আমাকে শুধু ধৈর্য রাখতে হবে।
এই অবস্থায় আমি প্রায় দু’মাস ধরে আছি। গত সপ্তাহে ডাক্তার আমাকে বলেছিল, জার্মানিতে একটি হাত পাওয়া গেছে, যার টিস্যু ম্যাচ করেছে। একটা হাতে অন্তত আমি ছুঁয়ে দেখতে তো পারব। তবে হাত লাগানোর পর সেই ক্ষমতা ফিরে পেতেও নাকি একমাসের মতো অপেক্ষা করতে হবে। প্রতিটি পদক্ষেপেই আমাকে অসীম ধৈর্যশক্তির পরীক্ষা দিয়ে যেতে হবে।
ডাক্তার আসছে। আমার নতুন হৃৎস্পন্দনের মতোই তার পদধ্বনি আমার কাছে পরিচিত।
“তোমার হাত এসে গেছে। আমাকে ঠিক যেমনটি বলা হয়েছিল তেমনই সুন্দর হাত। গ্রেটা তোমাকে তৈরি করে দেবে, আমরা কয়েক মিনিটের মধ্যে অস্ত্রোপচার করব।”
আমি তাকে বলতে চাইলাম যে আমি খুব ভয় পাচ্ছি, অসহনীয় যন্ত্রণা, তারপরেও সেই হাত কাজ করবে না, আমি তারপরেও তাকে স্পর্শ করতে পারব না। কিন্তু আমার গলা দিয়ে ঘড় ঘড় শব্দ ছাড়া আর কিছুই বের হয় না। ডাক্তার পরমস্নেহে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
“সব ঠিক হয়ে যাবে। যখন আমি হাতের অস্ত্রোপচার করব, তখনই অপটিক স্নায়ুর মেরামতির কাজটাও সেরে নেব। খুব তাড়াতাড়ি আমরা একজোড়া চোখ
পেতে চলেছি।”
আমি যাতে শান্ত হই সেই জন্যও আমায় আশ্বাস দিয়ে চলে। কিন্তু আমি সত্যিই খুব ভয় পেয়ে আছি। আমি যা শুনতে চাই ডাক্তার আমাকে সেটাই বলে চলেছে, কিন্তু আমি এতে আশ্বস্ত হতে পারি না।
ওরা আমাকে অপারেশন রুমে নিয়ে এল, আমি নিশ্বাসে অ্যান্টিসেপ্টিকের গন্ধ পাচ্ছি। ঠান্ডা বাতাসের অনুভুতি, টালির মেঝেতে ঢাকনা পরা জুতোয় চলাফেরার শব্দ। মুখোশে ঢাকা মুখ নিঃসৃত কন্ঠস্বর। ধাতব ট্রের উপর যন্ত্রপাতি রাখার ঠুংঠাং আওয়াজ। আমার মন শেষবারের মতো আমার সঙ্গে বলা কেনেথের ব্যক্তিগত কথাগুলিতে ফিরে যাচ্ছিল। ঠিক দু’দিন আগের ঘটনা।
ওষুধের প্রভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ার আগে আমি তাকে আমার খুব কাছে অনুভব করলাম।
“অ্যালিসন, আমি ভাবছিলাম সেই সকালটির কথা যেদিন তুমি সম্পূর্ণ রূপ ফিরে পাবে এবং আমরা একসঙ্গে জেগে উঠতে পারব।” সে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। “আমার স্বপ্ন যে আর বাধ মানছে না। আমি সেদিন হাসপাতালে সেই রোগে জর্জরিত শীর্ণ বৃদ্ধ খোলসের মধ্যে আটকা থাকা মহিলাটির প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। এখন তুমি একজন শিল্পীর আত্মা এবং এই শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ মননের সঙ্গে এক বিস্ময়কর সুন্দর নারী হতে চলেছ। আমি জানি না তুমি কি ভাববে… আচ্ছা, আমরা দু’জন কি সুখী দম্পতি হতে পারি না?”
কত সহস্র লক্ষ কথা যে অনুক্ত থেকে গেল… কত কিছুই না বলতে চেয়েছিলাম… আমি শুধু তার হাতে ধরে থাকা আমার মাথাটা সামান্য নাড়াতে পারলাম তার প্রস্তাবের উত্তরে। প্রথমে সে তার তর্জনী রাখল আমার ঠোঁটের ওপর। তারপর পেলাম তার ঠোঁটের স্পর্শ। আমি একটি অদ্ভুত মুখ দিয়ে তাকে চুম্বন করলাম। একটা টক-মিষ্টি লেবুর জলের স্বাদ।
“আমি তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ছি, যে শব্দগুলি তুমি বলতে পারছ না। আমি তা শুনতে চাই। আর বেশি দেরি নেই… আমরা একসঙ্গে আমাদের মনের কথা, আমাদের স্বপ্নের কথা একে অপরকে বলতে পারব।”
“আমি জানি না তুমি বুঝতে পেরেছ কি না… আমার অনেক অনেক দিনের পরিকল্পনা সফল হয়েছিল সেই দিন… যেদিন তোমার সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করলাম। এর আগে কাগজে তোমার ছবি দেখেছি, তোমার ওপরে বানানো রোনাল্ড ন্যাপের তথ্যচিত্র দেখেছি। তোমার নিজের লেখা এবং তোমার ওপরে যাবতীয় লেখা আমি পড়েছি। আমি তোমাকে জানি, তোমার সারাটা জীবন সম্বন্ধে জানি। আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসি বলেই তোমার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। এমনকী তোমার সেই নেড়া মাথা বৃদ্ধ শরীরটাকেও আমি ভালোবেসেছি।”
“এখন তোমার নতুন মুখটা যদি তুমি দেখতে পেতে তাহলে দেখতে, কী অপূর্ব সুন্দর এই মুখখানি। শুধু চমকপ্রদ মিষ্টি সৌন্দর্য নয়, তোমার জন্য আমি হন্যে হয়ে খুঁজেছি এমন একটি মুখ, যার মধ্যে সৌন্দর্য ও বুদ্ধিমত্তার সঠিক মেলবন্ধন ঘটেছে। ঠিক এমনটাই আমি চেয়েছিলাম।”
“আমাকে অহংকারী মনে করো না। হয়তো ভাবতে পারো যে আমি খুব স্বার্থপর।
কিন্তু এটা বলতে পারি, সাইমনের ক্ষেত্রে ঠিক যেমন আমি জানতাম সাইমনও আমার বন্ধুত্ব চাইবে। তোমার বেলায় আমি আরও নিশ্চিত ছিলাম যে তুমি আমায় ফিরিয়ে দেবে না।”
আমি মনে মনে চিৎকার করে বলে উঠলাম, না না। আমি ফিরিয়ে দেব না। আমি যখন আমার সব কিছু হারিয়ে রিক্ত হয়ে বসেছিলাম, সেই সময় তোমার মতো একজনকে পেলাম যে আমার জন্য জীবনের সব রং-রস-গন্ধ ফিরিয়ে নিয়ে এল, তোমাকে কি আমি ফেরাতে পারি!
জীবনের অনেকগুলো বছর আমি একা কাটিয়েছি। মানুষের মধ্যবিত্ত মানসিকতা প্রত্যক্ষ করেছি, তাদের শারীরিক আর আধ্যাত্মিক কামনা বাসনার রূপ দেখে দেখে বিতৃষ্ণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। বিভিন্ন সময়ে অনেকেই আমার জীবনে এসেছে, কিন্তু আমার স্বপ্নের মানুষটি তো অধরাই থেকে গেছে। হয়তো তাদের কোনও দোষ নেই, কিন্তু আমি ঠিক যেমনটি চেয়েছিলাম কেনেথের মধ্যে তার সবটুকুই আছে। যত্নবান, কিন্তু ন্যাকামো নেই। মনোযোগী, কিন্তু স্বতন্ত্র। উজ্জ্বল, সুদর্শন এবং আকর্ষক। প্রতিভাবান, কিন্তু উচ্চকিত নয়। সব থেকে বড় কথা, সে আমার মনটাকে ভালোবাসে।
হ্যাঁ, আমি তোমারই হতে চাই কেনেথ।
যন্ত্রণা আমার অন্যান্য অনুভূতিগুলিকে ভোঁতা করে দিয়েছে। একটা বড় হাতুড়ি দিয়ে যেন কেউ আমার কাঁধে ক্রমাগত আঘাত করে চলেছে। ব্যথায় গোঙাতে গোঙাতে আমার প্রিয় নার্সের শীতল স্পর্শ অনুভব করলাম।
“মিস ক্রাগ, ব্যথা কমানোর জন্য আপনাকে একটু মরফিন দিই? ডাক্তারবাবু আসবেন একটু পরেই।”
আমি অস্ফুটে সম্মতি জানালাম।
“আপনার হাত দুটো কী অসম্ভব সুন্দর দেখতে হয়েছে। লম্বা লম্বা আঙুল, সুন্দর নখ। সত্যিই অপূর্ব!”
হাত দুটো? আমার দুটো হাতই প্রতিস্থাপন করে আমাকে সারপ্রাইজ দিয়েছে! হ্যাঁ, এটা ওর পক্ষেই সম্ভব। ও জানে কীসে আমি খুব খুশি হব।
“এ বাবা! আমি বলে ফেললাম। প্লিজ, এটা আপনি ডাক্তারবাবুকে বলবেন না। আমাকে উনি বলতে বারণ করেছিলেন।”
আমি বলব না। গ্রেটাও আমাকে সবসময় খুশি রাখতে চায়। খুব ভালো মেয়ে।
“ওই যে উনি আসছেন।”
ওর পায়ের আওয়াজ দ্রুত এগিয়ে আসছে শুনতে পেলাম। ও বুঝতে পেরেছে যে আমার জ্ঞান ফিরেছে। তাই ওর আসার গতি আরও বেড়ে গেল, সবসময় আমার কথা চিন্তা করছে। আমাকে এত ভালোবাসে। সত্যিই আমি খুব ভাগ্যবান!
“অ্যালিসন, তুমি জেগে আছ।” ড্রিপ গেজের ওপর ওর আঙুলের টোকা মারার
শব্দ শুনতে পেলাম, “যাক, গ্রেটা তোমায় কিছুটা মরফিন দিয়েছে। কাঁধে কি খুব যন্ত্রণা হচ্ছে?”
আমি মাথা নাড়লাম।
“তুমি কি ভেবেছিলে আমি তোমার দুটো হাত দু’রকমের দেব? একজন লেখকের দু’রকম হাত হতে পারে? সাইমনকে যেমন দিয়েছিলাম, তার জন্য এখনও নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না।” ধাতব চার্টে ওর কলম বোলানোর শব্দ শুনতে পাচ্ছি। সে আমার কপাল থেকে চুলের গাছিটা পরম যত্নে সরিয়ে দিল। ওর কাছেই শোনা, যে আমার চুলের রং সোনালি। “তুমি জেনে হয়তো খুশি হবে বেলেরিনা থেকে এক অষ্টাদশীর দুটি হাত তোমার জন্য আনানো হয়েছিল। সেই দুটি পেলব নিখুঁত হাত এখন তোমার।” ওর ঠোঁট আমার ঠোঁট ছুঁলো। ওর চিবুক আমার চিবুক স্পর্শ করল। ভিজে ভিজে লাগছে। ও কি কাঁদছে?
আমি যে কীভাবে ওকে ধরে রাখতে চাই সেটা যদি বলে বোঝাতে পারতাম! কিন্তু এই টিউবগুলি যতদিন না খোলা হবে এ যন্ত্রণা আমার কমার নয়।
আমি চেতনা এবং অবচেতনের মধ্যে আসা যাওয়া করছি। দিন আসে দিন যায়, আমি শুধু আমার কেনেথ আর গ্রেটার স্পর্শ অনুভব করি।
এখন রাতই হবে। ওর বোন, সোনিয়া, আমার পাশে বসে বই পড়ছে। ফিসফিস করে তার পড়ার শব্দ মাঝে মাঝে শুনতে পাচ্ছি। সোনিয়া আমাকে কখনও স্পর্শ করে না। এমনকী, আমি যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকলেও না। তখন সে ডাক্তারকে ডেকে দেয়। তাই আমি শুধু তার গলার আওয়াজ চিনি, আর তার বইয়ের পাতা ওল্টানোর শব্দ।
হঠাৎ আমার গলা থেকে এক গভীর গোঙানোর মতো আওয়াজ বেরিয়ে আসে। আমি ভীষণভাবে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠতে চাই, “বাঁচাও!”
সোনিয়া তার বই নামিয়ে রেখে এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। দরজাটা বন্ধ করে যায়নি বুঝতে পারছি। কারণ, হলঘর থেকে ঠান্ডা হাওয়া এসে ঢুকছে। তারপর টেলিফোনে তার উত্তেজিত গলা শুনতে পাই।
“হ্যাঁ হ্যাঁ, কথা বলেছেন… খুব অস্পষ্ট… কিন্তু বোঝা গেছে… ‘বাঁচাও’।”
যার সঙ্গেই সে কথা বলুক না কেন, সে এই সংবাদে নিশ্চয়ই খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। কারণ এরপর সোনিয়ার কন্ঠস্বরে একটা সাবধানতার ছোঁয়া পেলাম।
“ঠিক আছে, অবশ্যই, এক্ষুনি।” সে ফোন রেখে দিল।
তড়িঘড়ি ঘরে ঢুকে তারপর সে ধীরে ধীরে আমার বিছানার কাছাকাছি এগিয়ে এল। আমি খুব অবাক হয়ে ভাবি, মানুষ কীভাবে দৃষ্টিহীনদের নির্বোধ বলে মনে করে। যেন চোখে না দেখতে পেলেই অন্য সব অনুভূতিগুলিও আর থাকে না।
“আমি কেনেথকে ডেকেছি। এখুনি সে আসছে।”
আমি খুব কষ্ট করে উচ্চারণ করলাম, “আমি কথা বলতে পারছি।” আমার কণ্ঠস্বর একইসঙ্গে বেশ তীক্ষ্ণ আর খসখসে। ল্যারিংস সম্ভবত এখনও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত, যে অস্ত্রোপচার করার কথা ছিল সেটা এখনও করা হয়নি।
“হ্যাঁ, আপনি কথা বলতে পারছেন।” সোনিয়া কৃত্রিম উচ্ছ্বাস দেখিয়ে বলল।
এই সময় কেনেথ ছুটে এসে ঘরে ঢুকল, বিছানারও পর প্রায় ঝাঁপিয়ে পরে চুমুতে চুমুতে আমাকে ভরিয়ে দিল। আমার ঠোঁটে, আমার গলায়, আমার মুখে।
“সোনিয়া বলল যে তুমি নাকি কথা বলতে পারছ। শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ করো, শুনি। শুধু আমার নাম।”
হয়তো বা এটাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। আমি সুন্দর হেসে লম্বা করে টেনে বললাম, “কেনননননেথ।”
“আহ্! এখন তোমার কণ্ঠস্বরকে বিশ্রাম দাও। আমি আর তার ধকল বাড়াতে চাই না। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না এখনও, এ যেন স্বতঃস্ফূর্ত পুনর্জন্ম!”
আমি মাথা নেড়ে হাসলাম। তুমি যা বলবে আমি তাই করব। আগামীকাল, আমি তোমাকে বলব যে, আমি তোমাকে ভালোবাসি।
ঘটনার অভিঘাত কাটিয়ে উঠে যখন আমি আবার ঘুমের জগতে চলে যাচ্ছি, বাইরের ঘর থেকে আমি তাদের কথাবার্তার কিছুটা শুনতে পেলাম। দরজা প্রায় পুরোটাই বন্ধ, তাই তাদের কণ্ঠস্বর তেমন স্পষ্ট নয়।
“ওঁর গলার আওয়াজ যে ঠিক তার মতো শোনাচ্ছে।” সোনিয়া ভয়ে ভয়ে বলছে।
“ল্যারেংসের অপারেশনটা হয়ে গেলে ওর গলা অ্যালিসনের মতোই লাগবে। ওই কণ্ঠস্বর এ জীবনে আমি আর শুনতে চাই না। যেমন আমি চাই না সেই দুটি চোখ আমাকে আবার দেখুক।”
“কেনি, আমি জানি তুমি তোমার সিদ্ধান্তে অবিচল থাকবে, কিন্তু ব্যাপারটা এর মধ্যেই অন্য দিকে চলে যাচ্ছে।”
“সোনিয়া, আমাকে বাধ্য করো না।” কেনেথের কথায় আমি ঠিক অবাক
হলাম না, কিন্তু ওর বলার ধরনে এমন কিছু ছিল যেন সে বলতে চাইছে, “যদি তুমি আর একটি শব্দ উচ্চারণ করো তবে আমি তোমাকে হত্যা করব।”
সোনিয়া চুপ করে গেল। আমি বুঝতে পারলাম সে ফিরে আসছে, বসল, বইটা তুলে নিল, একবার ঢোক গিলল। ও খুব ভয় পেয়ে গেছে। আমার কাঁধে সে হাত রাখল। এবার আমি ভয় পেয়ে গেলাম।
আমার চোখে ঘুম নেই। মরফিনে আচ্ছন্ন হয়ে আমি দিবাস্বপ্ন দেখতে লাগলাম। যেন আমি ওদের সবার শিকার। যেন কেনেথ আর সংবেদনশীল প্রেমিক কারিগর নয়, যেন সে একটি কসাই, যে তাকে আঘাত করবে তাকেই সে সংহার করবে।
গ্রেটা আসার পর সোনিয়া চলে গেল। সে আমাকে পরিষ্কার করা পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করলাম, তারপর আমার নতুন কণ্ঠস্বরে আমি ডাকলাম, “গ্রেটা।”
“আপনি কিছু বললেন কি?” ও জানে না যে আমি কথা বলতে পারছি।
“আমি খুব ভয় পাচ্ছি গ্রেটা।”
“ওহ, মাই গড!” গ্রেটা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “উনি জানেন যে আপনি কথা বলতে পারছেন?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “তুমি জানো আমি কে?”
“অ্যালিসন নেরি ক্রাগ। আমি আপনার লেখা একটা বই পড়েছি, তবে আমি পাঠক নই। আমি সাধারণ একজন মানুষ, আপনার বইটার নাম আমি শুনেছিলাম, তারপর একদিন হাতে পেয়ে পড়ে ফেললাম, এই পর্যন্তই।”
“আমি যে আসলে কে, তা কি ডাক্তার আগে জানতেন?”
“আপনি জানেন না আপনি কে?” তার গলায় ভয়ের ছাপ।
“তুমি যার কথা বললে আমি সেই। কিন্তু আমার শরীর? আমার মুখ? ডাক্তার আমার কন্ঠস্বর শুনে তার বোনকে বললেন, যতদিন তিনি বেঁচে থাকবে ততদিন তিনি আমার কন্ঠস্বরটি আর শুনতে চায় না। তাই তিনি এটা পাল্টে ফেলবে।”
“আমি ঠিক জানি না।” আমি গ্রেটার উত্তরে অবাক হয়ে গেলাম, “আপনি আমার কাছে খুব সুন্দর, কিন্তু আপনি… আপনি কি জানেন আমি কীভাবে…”
আমি জানতে চাই, “আমার মনে হচ্ছে এই শরীর… এই মুখ সে আগে থেকেই চেনে। না হলে এই চোখ বা কণ্ঠস্বর কেন তাকে অন্য কারও কথা মনে করিয়ে দেয়?”
“মিস অ্যালিসন।” সে আমার চিবুকটা ধরে বলল, “আমি আপনার কোনও ক্ষতি হতে দেব না।”
আমরা দু’জনেই হল ঘরের মধ্যে দিয়ে ডাক্তারের শান্ত পদক্ষেপে এগিয়ে আসার শব্দ শুনতে পেলাম। গ্রেটা আমাকে স্নান করানোর প্রস্তুতি নিতে লাগল।
“আজ সকালে কেমন আছ?” আমার নগ্ন শরীরটা ঢেকে রাখা হালকা কম্বলটা
সরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল কেনেথ।
“আমার কষ্ট হচ্ছে।” আমি মৃদু স্বরে বললাম।
“তোমার স্নানের পরে ব্যথা কমানোর জন্য ওষুধটা বাড়িয়ে দেব। একটা দারুণ খবর আছে। দুটো পা পাওয়া গেছে। আমাকে ফ্যাক্স করে পাঠানো ছবি দেখে আমার পছন্দ হয়েছে। এখন শুধু টিস্যু মিলে যাওয়ার অপেক্ষা। তবে আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে ওই পা দুটো তোমারই হবে। বেশ লম্বা সুন্দর দুটি পা।” তার কণ্ঠে আনন্দের রেশ বুঝতে পারছি। ও সত্যিই খুব খুশি। আমার সন্দেহ কিছুটা কমে গেল।
“বেশ।” আমি জোরে বলে উঠলাম, “তাহলে এবার আমি তোমার জন্য নাচতেও পারব।”
সে শান্তভাবে হেসে বলল, “ধৈর্য রাখো।” আমার স্তনবৃন্তের কাছে তার আঙুলের স্পর্শ পেলাম। তার হাত আমার স্তনের প্রতিটি খাঁজ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। ওর আঙুল ক্রমশই আরও নীচের দিকে নামছে। হঠাৎ আমার গ্রেটার কথা মনে এল, সে নিশ্চয়ই সব দেখতে পাচ্ছে।
গ্রেটা বেসিনে একটা আওয়াজ করে বলল, “আমরা স্নানের জন্য রেডি।”
কেনেথ হাত সরিয়ে নিয়েছে। একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলল, “পনেরো মিনিট পরে আসছি।”
গ্রেটা আমার হাত ধুয়ে দিচ্ছে। আমি শপথ করে বলতে পারি সে বেশ তাড়াহুড়ো করছে।
“প্লিজ, গ্রেটা। আস্তে আস্তে করো।”
“এবার আমার কিন্তু খুব ভয় করছে।”
আমি তাকে শান্ত করতে চাইছিলাম, পরিবর্তে আমি বরং তাকে আরও দ্রুত আমার স্নান করাতে সাহায্য করলাম। তার অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য একটিও শব্দ উচ্চারণ না করলেও আমি খুব ভালোভাবে তার উদ্বেগ বুঝতে পারছি। স্নান করানো শেষ হয়ে গেলে সে আমার কাছে তাড়াহুড়ো করার জন্য ক্ষমা চাইল। আমি তাকে নিরস্ত করলাম, যদিও আমি তার অল্প ছোঁয়ায় ঠিক তৃপ্ত হইনি। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেল।
কেনেথ ফিরে এল, আমার ওষুধ বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “সোনা, এবার তুমি মিষ্টি মিষ্টি স্বপ্নের দেশে পাড়ি দাও।”
আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
একটা একটা করে কুয়াশার চাদর সরে যাচ্ছে। আমি ডাক্তারকে একজন মহিলার সঙ্গে কথা বলতে শুনতে পাচ্ছি। একজন নার্স। অপারেশন রুমের গন্ধ নাকে আসছে।
“সুন্দর দুটি পা। আমি বুঝতে পারছি সেই ড্যান্সার যদি শেষ পর্যন্ত বেঁচে
ওঠে তবে নিশ্চয়ই সে তার পা দুটির জন্য বেশ কষ্ট পাবে।”
“ওকে কি জানানো হয়নি যে, পা দুটো বাদ দেওয়া হচ্ছে?”
“দুর্ঘটনায় ওর পেট চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছিল। মেয়েটার জ্ঞান ছিল না যখন নিয়ে আসা হয়। সে জানবে কী করে যে তার পা দুটো সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল?”
“আপনি একটি শয়তান, ডাঃ চার্নস্কি। যদি আমি জানতাম যে এমন একটি কাজের জন্য আমাকে ডাকা হয়েছে তাহলে কখনই আসতাম না।”
“ডেবি, এই ধরনের কাজের জন্য আপনাকে আর প্রয়োজন হবে না।”
ভদ্রমহিলার চাপা হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। কিন্তু তাদের কথাবার্তা থেমে গেল। আমি মাথা ঘোরানোর চেষ্টা করলাম। আমার গলার কাছে ব্যান্ডেজ বাঁধা। আমি ঢোক গিলতে পারছি না। নাক বা মুখ দিয়ে নিশ্বাস নিতেও পারছি না। মেশিন চলার শব্দ কানে আসছে।
“জ্ঞান ফিরে আসছে। ওকে নীচে নামিয়ে আনো। জলদি।”
আমি আবার সংজ্ঞা হারালাম।
আবার যখন জ্ঞান ফিরে এল তখন গ্রেটা আমাকে স্নান করাচ্ছে। ওর নাক টানার শব্দ পেলাম। ঠান্ডা লাগল নাকি মেয়েটার। আমি কথা বলতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমার গলা বন্ধ। আমার মনে হল বুঝি এবার দম বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু একটা টিউব দিয়ে আমার ফুসফুসে বাতাস সরবরাহ করা হচ্ছে। আমি ছটফট করে উঠলাম।
“মিস অ্যালিসন, অনুগ্রহ করে শান্ত হন। ডাক্তারবাবু আপনার ল্যারিংসে কিছু কাজ করেছেন। ফোলাটা না কমা পর্যন্ত আপনি একটি নলের মাধ্যমে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে পারবেন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আপনার শরীরের অনেক সমস্যা হয়েছে। নিজেকে উত্তেজিত করবেন না। আমি আপনার দেখভাল করছি।” তার কন্ঠস্বরে মনে হল সত্যি কেউ যেন আমার পাশে আছে। আমি তার স্পর্শে স্বস্তি ফিরে পাচ্ছি। “এই তো, খুব ভালো মেয়ে। আপনি অনেক ভালো হয়ে গেছেন।”
আমি এমনকী যন্ত্রণায় কাঁদতেও পারছি না। কেনেথ আসে, তাকে বিভ্রান্ত দেখায়।
“আমার আজ দুপুরে দুটো জরুরি অপারেশন আছে। আমি তোমার পাশে বসতে পারব না। যাই হোক, গ্রেটা থাকবে। আমি ঘুমের ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি।”
আবার আমি এই দুনিয়া থেকে বিরতি নিলাম।
পেইন কিলারের প্রভাব কমে গেলেই আমার কাঁধ আর নিতম্ব অসহ্য যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যায়, তখন আমি জেগে উঠি। কাঁটার বল গিলে ফেললে যেমন হতে পারে গলায় ঠিক তেমনই ব্যথা। আমার হাতের মধ্যে এমন একটা অনুভূতি হচ্ছে যেন আমি ফ্রস্ট বাইটে কয়েকটা আঙুল প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলাম, এখন আবার সেখানে সাড় ফিরে আসছে। আমি গ্রেটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সে আমার এত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, সে যেন আমার মতোই আমার যে কোনও ব্যথা বা আনন্দের ব্যাপারে সচেতন। আজ এখনও সে আসেনি।
প্রথমবার, আমি কাঁদতে চেষ্টা করি। চেষ্টা করি কারণ আমি কোনও অশ্রু অনুভব করতে পারি না। শুধু আমার চোখের কোণে এবং হৃদয়ে ক্ষরণ।
তারপর সে আসে।
“এই তো।” তার উপস্থিতি আমার আবেগের রসায়ন পরিবর্তন করে দেয়, আর আমি আস্তে আস্তে ব্যথাহীনতার মধ্যে হালকা পালকের মতো ভেসে যাই। “আমি খুব দুঃখিত, অনেকটা দেরি হয়ে গেল। ডাক্তারবাবুর অফিসে একটা ছিঁচকে চুরির সুযোগ এসে গেল। ভাবলাম, তোমার রেকর্ডটা একবার দেখে নিই, কিন্তু অস্বাভাবিক কিছুই পেলাম না। তবে তোমার রেকর্ডের মধ্যে অন্য মহিলাদের ফাইল পেলাম, কিন্তু কেনেথের কাছে তাদের আলাদা ফাইলও আছে। দাঁড়াও… ভাবি… একজনের নাম লিডিয়া, অন্য একজন চ্যান্টাল, এবং শেষ জনের নাম ক্যারল।” সে তার জিভে চুকচুক শব্দ করে বলে, “তুমি কী ভাবলে জানি না, আমার কি এটা করা উচিত হল।”
আমি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লাম। মাথা নড়ল কি না তা ঠিক বুঝলাম না, ওষুধের প্রভাবে মাথা ঘোরাও হতে পারে। আমার কেবলই মনে হচ্ছে আমি যেন নৌকোয় বসে দুলছি।
“আমি শনিবার আসব না। ভাইপোর দু’বছরের জন্মদিনের পার্টিতে যাব। আমি চাই না কেউ আমাদের সন্দেহ করুক…” আমার চুলে হাত বুলিয়ে সে বলল, “আমি তোমার জন্য একটু কেক নিয়ে আসব, কেমন?”
সেটা যে এত তাড়াতাড়ি আমার খাওয়া হবে না।
প্রথমে আমার ডান হাতে অনুভূতি পেতে শুরু করলাম। তর্জনী এনে বুড়ো আঙুলে ঠেকাতে পারলাম। কেনেথ স্বাভাবিকভাবেই খুব খুশি হল। আমি অপেক্ষা করছিলাম কখন সে আমার গলার নলটা খুলে দেবে আর আমি কথা বলতে পারব। আমি জানি যে, ফুলো ভাবটা কমে গেছে। তবুও সে আমাকে আশ্বস্ত করতে একই কথার পুনরাবৃত্তি করে বলল, খুব তাড়াতাড়ি চোখ আসছে। আমিও তার কথা বিশ্বাস করতে চাই না, বা এমনভাব দেখাই যেন তার কথা শুনতেই পাইনি। এভাবেই এখন আমি ওর ওপর প্রতিশোধ নিই।
আমার মনে পড়ে যায়, আমার ডাক্তারের ক্লিনিকে পৌঁছনোর প্রায় ছ’মাস পরে সাইমন একবার এসেছিল। কেনেথের সঙ্গেই এসেছিল, কিন্তু একটা অপারেশনের জন্য কেনেথ তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার পরেও সে থেকে যায়।
“কেনেথ আপনার অগ্রগতি সম্পর্কে আমাকে বলেছিল। আমি এখন চোখের
সামনে দেখতে পাচ্ছি আপনাকে কত সুন্দর লাগছে।”
আমি আমার নতুন হাত দিয়েই ইশারা করি। গ্রেটাই আমাকে ইশারার ভাষা শিখিয়েছে। আমার কাছে একটা বড় কাগজের প্যাড আর বাচ্চাদের পেন্সিল রয়েছে। যা দিয়ে আমি মনের কথা লিখে বোঝাতে পারি।
“আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।”
আমি বসেই ছিলাম, রাত্রিবেলা গ্রেটার রেখে যাওয়া কাগজ পেন্সিল তুলে নিয়ে আমি লিখলাম, “যদি আমি নিজে দেখতে পেতাম যে আপনি কতটা সুন্দর দেখছেন আমাকে। আমার জন্য চোখ আসছে অবশ্য।”
“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। কেনেথ আমাকে বলেছিল, তিনি আপনার কণ্ঠস্বরের পুনর্নির্মাণ করেছেন। গলার নলটা কবে খুলবেন উনি?”
আমি লিখলাম, “তাকেই জিজ্ঞেস করুন না। অনেকদিন হয়ে গেল, মাসখানেকের মতো মনে হয়।”
“হুম, এটা তো ঠিক কথা নয়। আমি অবশ্যই জিজ্ঞেস করব। গ্রেটাকে আপনার সঙ্গে দেখলাম। সে আমারও নার্স ছিল। সেরা নার্স। আমি ওকে ছাড়া পারতামই না। ও মনে হয় বিশেষ করে আপনার খুব পছন্দের।”
খুব তাড়াতাড়ি হিজিবিজি করে লিখলাম, “আমি একমত। ও যেন ঈশ্বরের দূত!”
“আমি ঠিক পড়তে পারছি না। যাই হোক, আমি জানি সে তুলনাহীন।”
তারপর তিনি তাঁর নতুন বই সম্পর্কে অনেক কথা বললেন, কিন্তু আমার সার্জারি বা কেনেথ নিয়ে আর কোনও কথা হল না। গ্রেটা একঘণ্টার মধ্যে লাঞ্চ থেকে ফিরে এল। তারপর তারা আমার পাশে কথা বলতে লাগল। তাদের হৃদ্যতা আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
আর কেনেথ আমাকে খালি আশ্বাস দেয়।
আমি এখানে পৌঁছনোর পর ন’মাস কেটে গেছে। কেনেথ গত মাসে টিউবটা বের করে নিয়েছে। সে আমাকে বলেছে, আর কয়েকদিনের মধ্যেই আমি কথা বলতে পারব। চোখ এখনও আসছে শুনি। আমি ইতিমধ্যেই কথা বলতে পারি, কিন্তু আমি সেটা ওকে জানাইনি।
সে আমাকে ভালোবাসে বলেছে ঠিক কথা, কিন্তু আমি তাকে বিশ্বাস করি না। সে এসে আমার পায়ের ব্যায়াম করিয়ে দেয়, কখনও কখনও আমাকে ছুঁয়ে উত্তেজিত করতে চেষ্টা করে। সে বলেছে, আমরা পরস্পরকে খুব তাড়াতাড়িই ঘনিষ্ঠভাবে ভালোবাসতে পারব। শুধু আমার চোখটা পাওয়ার অপেক্ষা। আমাকে কেউ এভাবে স্পর্শ করুক তা আমি চাই না। কিন্তু গ্রেটা… আমি বুঝতে পারছি না… হয়তো চাই।
এই কয়েক মাসে আমার একটা খিদে জন্মেছে। যা এতদিন কোথাও আবদ্ধ
হয়েছিল তা যেন আগল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমি আবার লিখতে চাই, আমি আবার পড়তে চাই।
চোখ এসে পৌঁছেছে। সবুজ রঙের চোখ, গ্রেটা বলেছে। কেনেথ আমাকে সতর্ক করে দেয় যে, স্নায়ুগুলি সর্বোত্তম অবস্থায় রাখা হয়েছে। তবে এ হল অস্ত্রোপচারের সবচেয়ে কঠিন ধাপ। আমি মনে করি, যদি সে আমার মস্তিষ্ক পুনরায় সংযুক্ত করতে পারে, তবে তার অসাধ্য আর কিছুই থাকবে না।
এবার আমি যখন জেগে উঠলাম, অন্ধকার যেন সত্যি পরতে পরতে ঢাকা বলে মনে হল। চোখের ওপর ব্যান্ডেজ অনুভব করতে পারছি আর যদিও আমার চোখের পেশি সরাতে বারণ করা হয়েছে, গ্রেটা যখন ঢুকল সেদিকে দেখার চেষ্টা করার থেকে নিজেকে বিরত করতে পারলাম না। যন্ত্রণা অসহনীয় নয়। আমি তাকে বললাম যে, আমি সর্বপ্রথম তার মুখটাই দেখতে চাই।
সে আমাকে ধরে রাখে। আমি তার নিশ্বাসের গন্ধ পাচ্ছি, লবঙ্গ আর মধু দেওয়া চায়ের গন্ধ।
“আমিও সেটাই চাই। কিন্তু আমার ভয় করছে। কারণ আমি তো তোমায় দেখেছি। কিন্তু তুমি আমাকে কখনও দেখনি।”
“তোমাকে দেখার পর কি তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা কমে যেতে পারে? কেন কমবে বলতে পার? যদি কেনেথ আটাত্তর বছর বয়সি আমাকে ভালোবাসতে পারে, আমি যদি না দেখেও তোমাকে ভালোবাসতে পারি, তারপরেও কি সম্ভব?
“এটাই আমি ভয় পাচ্ছি। ওহ, আমাকে মনে করিয়ে দিও না। আমি তোমার এতটাই ঘনিষ্ঠ হয়েছি, আমরা দুজনেই একে অপরের জন্য এত বেশি অনুভব করছি… তুমি তো জানো, একজন নার্স হিসেবে এতটা কাছে আসা আমার উচিত নয়। এটাই আমাদের শেখানো হয়। মূল বিপদ হল সেখানেই।”
“কেন তাহলে তুমি একে বাড়তে দিলে? তুমি তো আটকাতে পারতে।”
“আমি চিন্তা করেছি। আমরা একে অপরের থেকে কতটা আলাদা। আমি তোমার অতীত সম্পর্কে জানতাম, যে তুমি পুরুষদের পছন্দ করো। আমি নিজেকে অনেকবার সরিয়ে নিতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু তোমার শরীরের স্পর্শ পেলেই কিছু একটা হয়ে যেত। যেন আমাদের মধ্যে একই বিদ্যুৎ বয়ে চলেছে। যেন আমরা আমাদের নিজের চেয়ে বড় কিছু একসঙ্গে তৈরি করি এমন একটা ইচ্ছে। ঠিক এভাবেই যে ভেবেছি তা হয়তো নয়। কিন্তু এর শেষ দেখার একটা জেদ আমার ভিতরে কাজ করত। যার থেকে আমি বেরতে চাইনি, বেরতে পারিনি।”
আমি বললাম, “আমি সবটাই বুঝেছি। যাই হোক সে তো আমি নিজেও নিজেকে সামলাতে পারিনি। তাহলে বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই, তোমার ভয় পাওয়ার
কোনও কারণ নেই।”
তার কম্পিত কন্ঠস্বর কানে এল, “তুমি ঠিকই বলেছ।”
সেই রাতে, আমি জেগে শুয়েছিলাম, চোখে এখনও ব্যান্ডেজ বাঁধা, সোনিয়ার ফিসফিস করে বই পড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। এক সময় সে উঠে হল ঘরে গেল। সেখানে এমন একজন কেউ এসেছে যার গলার স্বর আমি এর আগে শুনিনি। তারা খুব আস্তে আস্তে কথা বলছিল যাতে আমি শুনতে না পাই। কিন্তু আমার শ্রবণেন্দ্রিয় এখনও যথেষ্ট প্রখর। আমি সব কথাই ভালোভাবে শুনতে পেলাম।
“আচ্ছা, ও তো প্রায় শেষের কাছাকাছি চলে এসেছে।” সোনিয়া সন্তর্পণে বলল।
“সম্পূর্ণ হলে তারপর বলবেন। এই কাজের জন্য একটি মৃতপ্রায় হেটেরোসেক্সুয়াল মস্তিষ্কের দরকার ছিল। কিন্তু ক্যারলের আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এখন শুধু কন্ঠস্বরের প্রশিক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে।”
“পায়ের জন্য এখনও মাসখানেক কসরত করতে হবে। রিড, সে যদি তাকে আবার তৈরি করে? যাই হোক না কেন, সেই একই শরীর তো। যে হাত দিয়ে ওকে ঠেলে দিয়েছিল সেই হাত সে সরিয়ে দিয়েছে। যে পায়ে হেঁটে মেয়েটা ওর কাছ থেকে দূরে চলে গিয়েছিল সেই পা সে বাদ দিয়েছে। আমি জানি ওর রুচি, ও সবসময় ড্যান্সারদের পছন্দ করে। সে শুধু ক্যারলের মাথা আর ধড়টা চেয়েছিল। সে অনেক খুঁজেছে, কিন্তু ওই দেহের সৌন্দর্য যে খুব বিরল। অমন সুন্দর স্তন ক’টা আছে। আর কী অদ্ভুত পরিহাস দেখ, ওই মহিলা, ক্রাগ, সে কি না স্তন ক্যানসারেই মারা যাচ্ছিল। কেনি তাদের দু’জনকেই বাঁচিয়ে রাখল।”
“পরিহাস! কিন্তু ঐশ্বরিক পরিহাস। যদি ক্যারল ঠিক ওইভাবে মারা না যেত… তারপর থেকেই সে অনেক শান্ত, ধীর, স্থির হয়ে গেল। ও ভাবতে পারেনি যে মেয়েটা তাকে শুধু গর্ভবতী হওয়ার জন্য ব্যবহার করে নিজের প্রেমিকার কাছে ফিরে যাবে। আমি ভেবেছিলাম সে আর মেয়েটাকে কখনই ফিরে পেতে চাইবে না।”
“ওহরিড, তোমার স্ত্রী যদি অন্য মহিলার জন্য তোমায় ছেড়ে দিত তাহলে তুমি সেটা কীভাবে নিতে?”
“অসম্ভব।”
“কেনেথ একই জিনিস ভেবেছিল। পুরুষকার! সে নিজেও এটা মেনে নিতে পারেনি।” সোনিয়া নাক টেনে বলল, “ছাড়ো, ওকে ওর মতো থাকতে দাও।”
“কিন্তু ও কি আবার একজন নতুন ক্যারল তৈরি করতে চলেছে?”
“অ্যালিসন। ওর নাম অ্যালিসন। তোমার ভালো মনে থাকা উচিত।”
কথোপকথনের বাকি অংশ আমার কাছে ঝাপসা হয়ে এল। প্রত্যেকটি সন্দেহ নিশ্চিত প্রমাণিত হল। সোনিয়া যখন ফিরে এল, আমি নিঃসাড়ে পড়ে
রইলাম, যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
আজ ব্যান্ডেজ খোলা হবে। প্রত্যেকবার ডাক্তার যখন ব্যান্ডেজ পাল্টে দেয়, আমি অল্প অল্প দেখতে পাই। শুধুই আলোর আভাস। এতেই আমি সুখী। আমার নতুন কণ্ঠস্বর গ্রেটা ছাড়া আর সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে পেরেছি। আমি চোখে দেখতে পাওয়ার পর কেনেথের সঙ্গে কথা বলতে চাই। ওকে অনেক কিছু বলার আছে আমার, আর সেই সব শোনার পর তার প্রতিক্রিয়াকে মনে হয় সেটাও দেখতে চাই।
কেনেথ আমার দৃষ্টি উন্মোচন করতে আসে। অন্যান্য নার্সদের সঙ্গে রিডের গলাও শুনতে পাচ্ছি। গ্রেটা চকিতে আমার হাত একবার চেপে ধরে চলে গেল। কেনেথ উপস্থিত সবার উদ্দেশে কিছু বলতে চলেছে।
“এই যে বসে আছে আমার অ্যালিসন। ও খেতে পারে, লিখতে পারে আর খুব তাড়াতাড়ি নাচতেও পারবে। আজ ও দু’চোখ ভরে দেখবে। আমি আপনাদের সবাইকে এখানে ডেকেছি আমার প্রথম সৃষ্টি পরিপূর্ণ নারীর সাক্ষী হওয়ার জন্য। আপনাদের কেউ কেউ জানেন আমার ভাই, রিড, একজন নিউরো সার্জন। তিনি বিশেষ করে এই উপলক্ষে শহরে এসেছেন।” তারপর সে আমার দিকে ঘুরে যায়, “অ্যালিসন, আমার ভাই, রিড। রিড, অ্যালিসন।”
“অবশেষে আপনার সঙ্গে দেখা করতে পেরে আমি খুব খুশি।” তার হাত আমার হাত স্পর্শ করল।
আমি মাথা নাড়লাম। কোনওরকম ভনিতা ছাড়াই কেনেথ ব্যান্ডেজ অপসারণ করল। আমি চোখ মেললাম। কতগুলো ফ্যাকাশে গর্তের চারপাশে জেলিফিশের মতো কিছু ভেসে বেড়াচ্ছে, তার মধ্যে দিয়েই আমি দরজার মতো একটা আকৃতি দেখতে পাচ্ছি।”
“তুমি কী দেখতে পাচ্ছ?” কেনেথ আমার কপালে লেগে থাকা আঠা মুছে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল। আমি জানি সে আমাকে উত্তর লিখে জানানোর জন্য এবার কাগজের প্যাড এগিয়ে দেবে।
আমি বললাম, “ঝাপসা ঝাপসা বিভিন্ন আকৃতি।” আমার কণ্ঠস্বর আমার নিজের মতোই একদম, ক্যারলের আর কোনও ছাপ নেই।
একটা দমকা বাতাস কেনেথের গলা থেকে বেরিয়ে আসে, “তুমি কথা বলতে পারছ! উফ! এ তো আমি ভাবতেও পারছি না, আশাতীত ঘটনা। সবাই শুনুন, অ্যালিসন কথা বলতেও পারে!” সবার কাছ থেকে সাধুবাদ ছিটকে আসে।
রিড চোখ পরীক্ষা করার সরঞ্জাম এনে আমার চোখের ওপর একটি আলো ফেলল। “রেটিনাল প্রতিক্রিয়া একদম যথাযথ। পিউপিল ঠিকঠাক প্রসারিত হয়েছে। ভাই, তুমি কিন্তু একটা দারুণ কাজ করেছ। আমি আবার তোমার প্রশংসা করি। অ্যালিসন, তুমি সত্যিই এক বিস্ময়।” সে আমার হাত ধরে তুলে নেয়, তার পর তা ছেড়ে দেয়।
“আমি ক্লান্ত। আমি দুঃখিত, হইচই করার জন্য আমার আর শক্তি অবশিষ্ট নেই।”
কেনেথ সবার দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে নেয়। গ্রেটাও রয়েছে, আমি তার অবয়ব অস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। ছোটখাটো কালো চেহারা।
“তুমি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছো?” কেনেথ আমার মুখের সামনে হাত নাড়িয়ে বলল।
“আমার মনে হয় তুমি হলে দ্য গ্রেট চার্নস্কি। ঠিক তো?”
“ওহ, অ্যালিসন।” সে আমার ওপর ঝুঁকে পড়ে। গ্রেটা আর আমার চুম্বনের সঙ্গে এই চুম্বনের কোনও তুলনাই হয় না। ওর জিভ আমার জিভকে নিয়ে খেলা করছে আর আমি ভাবছি গ্রেটার ওপর আমার যে আকর্ষণ তা ক্যারলের কোষের কারণে নয় তো, নাকি আমি নিজের যৌনতার জন্য আমার সঠিক অনুভূতিগুলি এর আগে কখনও স্বীকার করিনি। যাই হোক না কেন, আমি আর কেনেথের কল্পনার পুতুল হয়ে থাকতে চাই না। তার প্রতি আমার কোনও আবেগই আর অবশিষ্ট নেই।
“আমি তোমাকে গ্রিক দ্বীপপুঞ্জে সমুদ্র ভ্রমণে নিয়ে যেতে চাই। সেটাই দারুণ হবে, তোমার কী মত?”
“কেনেথ, আমি আমার লেখার জগতে ফিরে যেতে চাই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।”
সে কিছুটা হতাশ হয়েছে মনে হল, “তুমি যখন প্রথম এসেছিলে তখন তুমি কতটা অধৈর্য হয়ে উঠেছিলে মনে আছে? আর আজ এতটাই নিস্পৃহ?” আমার হাতের ওপর হালকা চাপড় মেরে বলল, “ঠিক আছে, অ্যালিসন। আমাদের সামনে দীর্ঘজীবন পড়ে রয়েছে।”
আমি হাসতে চেষ্টা করি, কিন্তু বোঝা যায় সেটা ছলনার হাসি। সে সামান্য ভ্রূকুটি করে কি? নাকি ভুল দেখলাম, “আমাকে কি খুব বিরক্তিকর বলে মনে হচ্ছে?”
“জানি না, আমার নিজেকে খুঁজে পেতে হবে। আমার নতুন সত্তা। তুমি আমাকে এই নতুন শরীর দিয়েছ, আর একটি নতুন জীবন। এর অর্থ আমাকে জানতে হবে।”
তার কন্ঠে বিষণ্ণতার আভাস খেলা করে যায়, “কোথাও আমার মনে হচ্ছে যেন আমি তোমাকে হারাতে চলেছি। তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না।” সে মুখ ফিরিয়ে নিল। “পারব না।” আবার সেই একই রকম বলার ধরন যেমনটা সেদিন সোনিয়ার সঙ্গে ব্যবহার করেছিল, “আমি তোমাকে হত্যা করব…”
আমি স্থির ভাবে বলার চেষ্টা করলাম, তবু আমার কণ্ঠস্বর কেঁপে গেল, “কেনেথ, তুমি আবার খুব তাড়াহুড়ো করছ।”
সে সামান্য শান্ত স্বরে বলল, “তোমার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন।”
“থ্যাঙ্ক ইউ।” আমি তার হাতে মৃদু চাপ দিলাম। সে এতেই কৃতজ্ঞ মনে করল। সে চলে যাওয়ার পর আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।
গ্রেটা তার পিছনে দরজা বন্ধ করে এক ছুটে আমার কাছে চলে আসে। আমি এখনও তাকে পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু তার ওষ্ঠ আমার কাছে বাস্তব এবং আমাকে বেষ্টন করে থাকা তার বাহু দুটি আমার আশ্রয়স্থল।
“আমি তোমাকে ভালোবাসি।” এই কয়েক মাসের জমিয়ে রাখা শব্দগুলো আমি উচ্চারণ করে ফেলি।
সে দু’হাতের তালুতে আমার মুখটা স্থির ভাবে ধরে থাকে। ধীরে ধীরে আমার দৃষ্টি পরিষ্কার হয়ে আসে, কিন্তু শুধুমাত্র একটি মুহূর্তের জন্য। ও তো আমার কত পরিচিত। কত চেনা একটি মুখ। সে মুখে বলিরেখার দাগ। একবছর আগে আমার নিজের মতো। আমি যে এক বয়স্ক মানুষের প্রেমে পড়েছি। তার হাতের ব্যবহার দেখে আমি নিজের হাত ব্যবহার করতে শিখেছি। স্পর্শের সূক্ষ্ম অনুভুতি আমার এখনও আসেনি যাতে আমি তরুণ ত্বকের পেলবতা অনুভব করতে পারি। আমি ওর সঙ্গে আমার জীবন কাটাতে পারব না। আমার সারাটা জীবন।
আমি প্রার্থনা করি, যেন আমার হতাশা প্রকাশ না পায়। আমাকে আবার বিষণ্ণতা গ্রাস করে নেয়। যদি জানতাম, অন্যরকমভাবে ভালোবাসতে পারতাম কি না জানি না। প্রকৃতির ওপর আমাদের কোনও নিয়ন্ত্রণই যে নেই। ভগবানের সঙ্গে খেলা করার ক্ষমতা এমনকী, কেনেথেরও নেই।
আমি আমার দু’হাত প্রসারিত করে দিলাম তার দিকে। আমার ঘাড়ে সে মুখ গুঁজে দিয়েছে। ওর চোখের জল গড়িয়ে নামছে আমার কাঁধ বেয়ে। আর এই প্রথমবার আমার নিজের গাল বেয়ে নামছে অশ্রু।
লেখকের অনুমতিক্রমে কাহিনিটি অনূদিত এবং প্রকাশিত হল।
