উপসংহার

পুলিসকোর্ট জন ডগলাসের কেস পাঠিয়ে দিল উচ্চতর আদালতে। দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারের সাময়িক অধিবেশনে বেকসুর খালাস পেয়ে গেল ডগলাস–আত্মরক্ষার জন্যে গুলি ছুঁড়ে গিয়েছে হাত থেকে সুতরাং সে নিরপরাধ। মিসেস ডগলাসকে চিঠি লিখল হোমস। যেভাবে পারেন এখুনি ওঁকে ইংলন্ডের বাইরে সরিয়ে নিয়ে যান। যাদের খপ্পর থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এত বছর, তাদের চাইতেও ঢের বেশি ওত পেতে আছে এখানে। আপনার স্বামী ইংলন্ডে নিরাপদ নয় জেনে রাখবেন।

মাস দুয়েক পরে কেসটা অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছিল আমাদের মনের মধ্যে। তারপর একদিন সকালে একটা প্রহেলিকাময় চিঠি পাওয়া গেল লেটারবক্সে। অসাধারণ সেই পত্রের বয়ান অতিশয় সংক্ষিপ্ত : আহা রে! বেচারা মি. হোমস! চিঠিতে সম্বোধন নেই, স্বাক্ষর নেই। কিম্ভুতকিমাকার বার্তাটি পড়ে হেসে ফেললাম আমি। কিন্তু অস্বাভাবিক সিরিয়াস হয়ে গেল হোমস।

ওয়াটসন, শয়তানির গন্ধ পাচ্ছি, বলে মেঘাচ্ছন্ন ললাটে বসে রইল দীর্ঘক্ষণ।

সেইদিন একটু রাতে ল্যান্ডলেডি মিসেস হাডসন একটা খবর নিয়ে ওপরে এল–এক ভদ্রলোক নাকি এখুনি দেখা করতে চাইছে হোমসের সঙ্গে অত্যন্ত জরুরি একটা বিষয় সম্পর্কে। পেছন পেছন ঘরে ঢুকে পড়ল পরিখা-বেষ্টিত ম্যানর হাউসের পুরোনো বন্ধু মি. সিসিল বার্কার। চোখ-মুখ উদ্ভান্ত, বিহুল।

মি. হোমস, খুবই খারাপ খবর নিয়ে এসেছি অত্যন্ত ভয়ংকর সংবাদ।

আমি জানতাম, বললে হোমস।

ডগলাসের খবর জানেন? শুনলাম ওর আসল নাম নাকি এডোয়ার্ডস। আমি কিন্তু চিরটাকাল ওকে বেনিটো ক্যানিয়নের জ্যাক ডগলাস নামেই জানব। আপনাকে বলেছিলাম না, তিন সপ্তাহ আগে পালমিরা জাহাজে সাউথ আফ্রিকা রওনা হয়েছে স্বামী-স্ত্রী?

বলেছিলেন।

গতরাতে কেপটাউন পেীছোয় জাহাজ। আজ সকালে পেলাম এই কেলটা। মিসেস ডগলাস পাঠিয়েছেন—

সেন্ট হেলেনায় ঝড়ের সময়ে জাহাজ থেকে পড়ে নিখোঁজ হয়েছে জ্যাক। কেউ জানে কখন ঘটল দুর্ঘটনা–আইভি ডগলাস।

চিন্তাম্বিত স্বরে হোমস বললে, আচ্ছা! শেষটা তাহলে এইভাবে করা হল। সাজানোটা ভালোই হয়েছে মানতে হবে। ত্রুটি কোথাও নেই।

আপনার কী মনে হয়? দুর্ঘটনা নয়?

কখনোই নয়।

খুন?

নিশ্চয়!

আমারও তাই মনে হয়। শয়তানের বাচ্চা এই স্কোরারস… ক্রিমিন্যালদের এই নাটকীয় প্রতিহিংসা—

আরে না, মশাই, না। এ-ব্যাপারে ওদের চেয়ে বড়ো একজনের হাত রয়েছেস্কোরারসদের গুরু হওয়ার মতো ক্ষমতা সে রাখে। করাত দিয়ে কাটা শট গান বা জবরজং ছ-ঘরা রিভলবারের কেস এটা নয়। নামি শিল্পীর তুলির টান দেখেই বোঝা যায়। ক্রাইমের ধরন দেখলে আমিও চিনতে পারি মরিয়ার্টিকে। এ-কাজ লন্ডনের আমেরিকার নয়।

কিন্তু কেন? এ-খুনে তার কী মোটিভ?

মোটিভ একটাই–সে কখনো ব্যর্থ হয় না–যে-কাজে হাত দেয় সে-কাজ শেষ না-করে ছাড়ে না। অপ্রতিদ্বন্দ্বী সে এই কারণে। একটিমাত্র লোককে নিকেশ করার জন্য বিরাট একটা মস্তিষ্ক ও বিশাল একটা সংগঠন সক্রিয় হয়েছিল খেয়াল রাখবেন। হাতুড়ির এক ঘায়ে বাদাম গুঁড়িয়ে দেবার মতো এরা সমস্ত শক্তি সংহত করে আঘাত হানবার সময় তাই কখনো ব্যর্থ হয় না–নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ হাসিল করে প্রতিবারে!

কিন্তু এ-ব্যাপারে সে নাক গলাচ্ছে কেন?

এ-ব্যাপারে প্রথম খবরটাই তো পেয়েছিলাম তারই এক শাকরেদের কাছ থেকে। বিদেশ বিভুঁয়ে খুনখারাপি করতে গেলে সেখানকার ক্রিমিন্যালের শরণ নিতে হয়–অংশীদার হয়ে কাজ সারতে হয়। এ-পরামর্শ আমেরিকানরা পেয়েছিল বলেই ক্রাইমের এই বিরাট কনসালট্যান্টের শরণ নিয়েছিল। সেই মুহূর্ত থেকেই কিন্তু আয়ু ফুরিয়েছিল জন ডগলাসের। প্রথম সংগঠনের লোকজন লাগিয়ে হদিশ বার করা হয়েছিল জন ডগলাসের। এজেন্ট ব্যর্থ হয়েছে, খবরের কাগজে এ-খবর পড়েই কিন্তু সে ঠিক করেছিল এবার হাত লাগাবে নিজে ওস্তাদের খেল দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেবে দুনিয়াকে। মনে পড়ে বির্লস্টোন ম্যানর হাউসে বলেছিলাম আপনার বন্ধুকে, এরপর যে-বিপদ আসছে তা ফেলে-আসা বিপদের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ানক? কি, ঠিক বলেছিলাম কিনা?

নিষ্ফল ক্রোধে হাতের মুঠোয় কপাল ঠুকতে ঠুকতে বার্কার বললে, এইভাবেই কি এর রাজত্বে থাকতে হবে আমাদের? শয়তান শিরোমণির সঙ্গে টক্কর দেওয়ার মতো কেউ কি নেই?

আরে না, সে-রকম কথা আমি বলি না, যেন দূর ভবিষ্যতের পানে তাকিয়ে বললে হোমস। কেউ ওকে হারাতে পারবে না, এমন কথা আমি বলব না। কিন্তু আমাকে সময় দিন–আরও সময় দিন!

নীরবে বসে রইলাম আমরা প্রত্যেকেই কয়েক মিনিট। শার্লক হোমস কিন্তু চেয়ে রইল দুরের পানে–সাংঘাতিক ওই চোখজোড়ায় চূড়ান্ত চাহনি দিয়ে যেন এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফেলতে চাইল দূরবিস্তৃত প্রহেলিকার দুর্ভেদ্য অবগুণ্ঠন।