ফাঁদে পড়ল বার্ডি এডোয়ার্ডস

ম্যাকমুর্দো ঠিকই বলেছিল, বিধবা ম্যাকনামারার বাড়ি সত্যিই খুব নিরিবিলি জায়গায় পরিকল্পনামতো খুনের পক্ষে আদর্শ। শহরের একদম শেষে রাস্তা থেকে অনেক ভেতরে। চক্রীরা সাধারণত যাকে মারে, তার নাম ধরে ডেকে রিভলবার দিয়ে দেহটা ঝাঁঝরা করে ফেলে রেখে যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে ওভাবে খুন করলে চলবে না। লোকটা কতদূর জেনেছে, কীভাবে জেনেছে এবং কী-কী খবর মালিকের কাছে পাঠিয়েছে সেই খবর আগে পেট থেকে বার করতে হবে। কে জানে হয়তো খুবই দেরি হয়ে গেছে–খবর পাঠাননাও শেষ হয়েছে। সেক্ষেত্রে, এ-কাজ যে করেছে, অন্তত তার ওপর প্রতিশোধ তো নেওয়া যাবে। তবে সে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জেনেছে বলে মনে হয় না। জানেনি বলেই ম্যাকমুর্দোর বানিয়ে বলা গল্পগুলো পরের দিন টেলিগ্রাম করে পাঠিয়েছিল। যাই হোক, কী খবর পাঠিয়েছে অ্যাদ্দিন, স্বমুখেই এবার শোনা যাবে। একবার কবজায় আনতে পারলে কথা বলিয়ে তবে ছাড়বে। এই তো প্রথম নয়, বেঁকে বসা অনেক সাক্ষীকেই ঢিট করা হয়েছে এর আগে।

বন্দোবস্তমতো হবসন্স প্যাঁচ-এ গেল ম্যাকমুর্দো। সেদিন সকালেই যেন পুলিশের নেকনজর একটু বেশিভাবে পড়তে দেখা গেল ওর ওপর। ডিপোতে দাঁড়িয়ে ছিল ম্যাকমুর্দো গায়ে পড়ে এসে কথা বলে গেল ক্যাপ্টেন মার্ভিন সেই মার্ভিন যে নাকি শিকাগো থেকে এসেছে এবং ম্যাকমুর্দোকে এক নজরেই চিনেছে। ম্যাকমুর্দো কিন্তু কথা বলেনি–সরে এসেছে। কাজ শেষ করে ফিরল বিকেলে, ইউনিয়ন হাউসে গিয়ে দেখা করল ম্যাকগিন্টির সঙ্গে।

বলল, আসছে।

চমৎকার! বলে ম্যাকগিন্টি। আস্তিন গুটিয়ে বসে আছে দানব। প্রশস্ত ওয়েস্টকোটের ফঁক দিয়ে ঝকমক করছে চেন আর স্টিল। খাড়া খাড়া দাড়ির ফাঁকে রোশনাই ছড়াচ্ছে একটা হিরে। মদ আর কূটনীতি বসকে কেবল ধনবানই করেনি, শক্তিমানও করেছে। সেইজন্যেই গতকাল রাতে কল্পনায় জেগে ওঠা গারদ বা ফাঁসিকাঠকে আরও বেশি ভয়ংকর মনে হচ্ছে।

শুধোয় উদবিগ্ন কণ্ঠে, কী মনে হল তোমার? খুব বেশি জেনে ফেলেছে?

মুখ কালো করে মাথা নাড়ে ম্যাকমুর্দো।

বেশ কিছুদিন এ-অঞ্চলে ও রয়েছে–ছ-সপ্তাহ তো বটেই। নৈসর্গিক দৃশ্য দেখবার জন্যে নিশ্চয় সে আসেনি। রেল কোম্পানির টাকার জোরে এতগুলো দিন আমাদের মধ্যে যে কাজ করেছে, আমার তো মনে হয় নিশ্চয় সে কাজ হাসিল করেছে–খবর পেয়েছে, পাঠিয়েছে।

চিৎকার করে বলে ম্যাকগিন্টি, লজে নরম ধাতের লোক তো কেউ নেই। প্রত্যেকেই খাঁটি স্টিল। তবে হ্যাঁ, জঘন্য ওই মরিসের কথা আলাদা। দেখলেই গা ঘিন ঘিন করে, ভোঁদড় কোথাকার! যদি কেউ আমাদের পথে বসিয়ে থাকে, তবে সে ওই মরিস। আমার ইচ্ছে ছিল সন্ধের আগেই দু-জন বয় পাঠিয়ে ওকে রামধোলাই দিয়ে পেট থেকে কথা বার করে নেওয়া।

ম্যাকমুর্দো জবাব দেয়, তাতে ক্ষতি অবশ্য কিছু নেই। মরিসকে আমি আবার একটু পছন্দ করি–মারধর খেলে আমারই মন খারাপ হবে। লজের ব্যাপারে দু-একবার আমার সঙ্গে কথা বলেছে! দেখেছি, চিন্তাধারা আমার বা আপনার মতো ঠিক নয়। না-হলেও, বেইমানি করার পাত্রও সে নয়। যাই হোক, আপনাদের দুজনের মাঝে আমি দাঁড়াতে চাই না।

খিস্তি দিয়ে বলে ম্যাকগিন্টি, ওকে আমি শেষ করব। সারাবছর চোখে চোখে রেখেছি।

ম্যাকমুর্দো বললে, যাই করুন না কেন, কালকের আগে করবেন না। পিনকারটন ঝামেলা–মিটানো পর্যন্ত চুপচাপ থাকাই মঙ্গল। এতদিন গেল, আর আজকেই যদি শহরের সমস্ত পুলিশকে চাঙা করে তুলি, ক্ষতি আমাদেরই।

বলেছ ঠিক, বলে ম্যাকগিন্টি। এই বার্ডি এডোয়ার্ডসের পেট থেকেই কথা টেনে বার করব–দরকার হলে হৃৎপিণ্ডটা উপড়ে আনব কিন্তু বলিয়ে ছাড়ব কার মুখে শুনেছে এত কথা। ফাঁদ পেতেছি সন্দেহ করেনি তো?

হেসে ওঠে ম্যাকমুর্দো।

বলে, ঘা দিয়েছি ওর দুর্বল জায়গায়। স্কোরারসদের ঠিকানার লোভে ঠিকই দৌড়ে আসবে। টাকাও নিয়েছি। দাঁত বার করে এক বান্ডিল ডলার নোট পকেট থেকে বার করে–সব কাগজ দেখালে এ-রকম বান্ডিল আর একটা পাওয়া যাবে।

কী কাগজ?

কাগজ আবার কী? কিচ্ছু নেই। সমিতির সংবিধান, নিয়মের বই আর সদস্য পদের দরখাস্ত দিয়ে লোভটাকে বাড়িয়ে তুলেছি। মনে খুব আশা, যাওয়ার আগে স্কোরারস-দের নাড়ি নক্ষত্র জেনে তবে যাবে।

কুটিলকণ্ঠে ম্যাকগিন্টি, এখুনি যদি পেতাম হাতের কাছে! কাগজপত্র নিয়ে যাওনি কেন জিজ্ঞেস করেনি?

এসব কাগজ সঙ্গে নিয়ে ঘোরা যায় নাকি? পুলিশের সন্দেহ আমার ওপর? আজকেই ডিপোতে গায়ে পড়ে কথা বলে যায়নি ক্যাপ্টেন মার্ভিন?

শুনেছি সে-কথা। ঝক্কিটা শেষ পর্যন্ত দেখছি তোমাকেই পোহাতে হবে। মার্ভিনকে এখুনি ড্রেনে ঢুকিয়ে দিতে পারি। কিন্তু হবসন্স প্যাঁচ-এ তোমাকে দেখা গেল যেদিন, সেদিনই খুন হয়ে গেল সেখানকার একজন–এ-ঘটনা তো চাপা দেওয়া যাবে না।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে ম্যাকমুর্দো বললে, ঠিকমতো কাজ সারতে পারলে খুন যে করা হয়েছে সেইটাই তো প্রমাণ করতে পারবে না। অন্ধকারে এ-বাড়ি ঢুকলে কারুর চোখে পড়ার কথা নয়। বেরিয়ে যাওয়াটাও কারুর চোখে পড়ার কথা নয়। কাউন্সিলর, এবার শুনুন আমার প্ল্যান। প্ল্যানমাফিক যাকে যা কাজ দেবার আপনি দেবেন। ঠিক সময়ে আপনারা আসবেন সবাই। বেশ, বেশ। সে আসবে দশটায়। তিনবার দরজায় টোকা দিলেই পাল্লা খুলব আমি। তারপরেই আমি চলে যাব ওর পেছনে বন্ধ করে দেব দরজা। মুঠোর মধ্যে পাবেন বার্ডি এডোয়ার্ডকে।

এ তো দেখছি জলের মতো সোজা ব্যাপার।

হ্যাঁ, কিন্তু এর পর কী করবেন, সেইটাই ভাববার কথা। লোকটা কিন্তু আস্ত গুলবাজ বললেই চলে। তার ওপর দারুণভাবে সশস্ত্র। আমি বোকা বানালেও যেকোনো পরিস্থিতির জন্যে সে তৈরি থাকবে, এইটাই স্বাভাবিক। যে-ঘরে আমার একলা থাকার কথা, সে-ঘরে যদি সাতজন লোককে সে দেখে, গুলি চালাবেই–কেউ-না-কেউ জখম হবে।

তা ঠিক।

শহরে যত টিকটিকি আছে, আওয়াজ শুনে দৌড়ে এসে ধরে ফেলবে আমাদের।

কথাটা ঠিকই বলেছ।

আমাদের কাজ হাসিল করা উচিত এইভাবে। আপনারা সবাই থাকবেন বড়ো ঘরে যে-ঘরে বসে আমার সঙ্গে গল্প করেছিলেন। দরজা খুলে ওকে আমি নিয়ে গিয়ে বসাব দরজার ঠিক পাশেই বৈঠকখানায়–কাগজ খুঁজতে যাচ্ছি বলে বসিয়ে রাখব সেখানে। তাতে আমার পক্ষে একটা সুবিধে হবে। আপনাদের এসে বলতে পারব অবস্থা কীরকম। তারপর কিছু জাল কাগজপত্র নিয়ে ফিরে যাব বৈঠকখানায়। যেই পড়তে শুরু করবে, লাফিয়ে পড়ে চেপে ধরব পিস্তল ধরার হাতটা। আমার চিৎকার শুনলেই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়বেন ঘরের মধ্যে। যত তাড়াতাড়ি আসবেন, ততই মঙ্গল। কেননা সে আমার মতোই শক্তি ধরে। তবে আপনারা না-আসা পর্যন্ত ধরে রাখতে পারব।

ম্যাকগিন্টি বললে, প্ল্যানটা ভালো। লজ ঋণী রইল তোমার কাছে। আমার পর এ-চেয়ারে কে বসবে, চেয়ার ছাড়বার আগে তার নাম আমি বলে যেতে পারব আশা করছি।

সামান্য সদস্য ছাড়া আমি কিছুই নয়, কাউন্সিলর, বলে ম্যাকমুর্দো। কিন্তু মুখ দেখে বোঝ যায় বিখ্যাত ব্যক্তিটির অভিনন্দনে কী ধরনের চিন্তা ঘুরছে তার মাথায়।

বাড়ি ফিরে আসন্ন সান্ধ্য কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি শুরু করে সে। প্রথমেই নিজের স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন রিভলবার পরিষ্কার করে, তেল মাখিয়ে, গুলি ভরে রাখল। তারপর, যে-ঘরে ফাঁদে ফেলা হবে ডিটেকটিভকে, খুঁটিয়ে দেখল সেই ঘরের চেহারা। ঘরটা বড়ো, মাঝে সাদা পাইন কাঠের একটা টেবিল, এক প্রান্তে বড়ো স্টোভ। দু-দিকে জানলা। জানলায় খড়খড়ি নেইটেনে সরানোর মতো হালকা পর্দা দিয়ে ঢাকা। মন দিয়ে এইসব পরীক্ষা করল ম্যাকমুর্দো। এ ধরনের অত্যন্ত গোপনীয় কাজের পক্ষে ঘরটা যে বড়ো বেশি খোলামেলা–তা নজর এড়াল নাস। তবে রাস্তা থেকে অনেক দূরে থাকার ফলে খোলামেলা হলেও কারো টনক নড়বে না। সবশেষে, বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করল দোস্ত স্ক্যানল্যানের সঙ্গে। স্ক্যানল্যান স্কোরারস হলেও নিরীহ মানুষ। দুর্বলচিত্ত। কমরেডদের মতের বিরুদ্ধে কথা বলার শক্তি তার নেই। বহু রক্ত ঝরানো কুকর্মে তাকে বাধ্য হয়ে সহযোগিতা করতে হয়েছে। ভেতরে ভেতরে তাই সে। শিহরিত। ম্যাকমুর্দোও সংক্ষেপে তাকে বলে কী ঘটতে চলেছে এই ঘরে।

মাইক স্ক্যানল্যান, আমি যদি তুমি হতাম, তাহলে রাতটা অন্য কোথাও কাটাতাম। ভোরের আলো ফোঁটার আগেই রক্তস্রোত বইবে এখানে।

স্ক্যানল্যান বললে, ম্যাক, আমার মধ্যে ইচ্ছের অভাব নেই, অভাব কেবল স্নায়ু আমার সইতে পারে না। কয়লাখনির ম্যানেজার ডানকে ধরাশায়ী হতে দেখে কী কষ্টে যে দাঁড়িয়েছিলাম, তা শুধু আমিই জানি। তোমার বা ম্যাকগিন্টির মতো আমি নই–এসব কাজের জন্য তৈরি হইনি। লজ যদি কিছু মনে না করে তাহলে তোমার কথা মতোই চলব, রাত্রে আর বাড়ি ফিরছি না–যা খুশি করো তোমরা।

যথাসময়ে সবাই উপস্থিত। বাহ্যত প্রত্যেকেই মানী নাগরিক। বেশবাস পরিপাটি এবং পরিচ্ছন্ন। মুখের চেহারা খুঁটিয়ে দেখলেই কেবল বোঝা যায় বার্ডি এডোয়ার্ডসের বাঁচবার আশা খুব একটা নেই। প্রত্যেকটা মুখ ইস্পাতকঠিন, চোখ অনুতাপহীন। কম করেও বারোবার নররক্তে হাত রাঙায়নি, এমন ব্যক্তি এক জনও নেই ঘরের মধ্যে। কশাই যেমন চোখের পাতা না-কাঁপিয়ে মেষ জবাই করে, এরাও তেমনি নিষ্কম্প চিত্তে মানুষ জবাই করে। চেহারা এবং কুকীর্তির দিক দিয়ে পুরোধা অবশ্য ভয়ংকর দর্শন বস ম্যাকগিন্টি। সেক্রেটারি লোকটা শীর্ণকায়, উগ্র। ঘাড়খানা লম্বা, অস্থিসার। হাতপায়ে অনবরত স্নায়বিক খিচের টান। সঙ্গের টাকাকড়ি সংক্রান্ত ব্যাপারে তার বিশ্বস্ততা অতুলনীয়–কিন্তু এই আওতার বাইরে কারো প্রতি সুবিচার বা সততার লেশমাত্র তার মধ্যে নেই। কোষাধ্যক্ষ কার্টার মাঝবয়সি, মুখখানা আবেগহীন উদাসীন–কেমন যেন একটু অপ্রসন্ন ভাব, গায়ের চামড়া হলদে পার্চমেন্ট কাগজের মতো। দক্ষ সাংগঠনিক হিসেবে তার জুড়ি নেই, বহু প্রকাশ্য কুকীর্তির নিখুঁত পরিকল্পনা বেরিয়েছে তারই উর্বর মস্তিষ্ক থেকে। উইলাবাই ভ্রাতৃদ্বয় কাজের লোক হাতের কাছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী–লম্বা, ছিপছিপে তরুণ–মুখ দৃঢ়সংকল্পে সুকঠিন। টাইগার করম্যাক আকারে একটু ভারী, মলিন–জিঘাংসাবৃত্তির জন্যে কমরেডরা পর্যন্ত ভয় পায়। পিনকারটন ডিটেকটিভ নিধনের সংকল্প নিয়ে এহেন ব্যক্তিরাই সেই রাতে জমায়েত হল ম্যাকমুর্দোর বাড়িতে।

টেবিলে হুইস্কি রেখে দিয়েছিল নিমন্ত্রণকারী ম্যাকমুর্দো–আসন্ন কাজের জন্যে গা এবং মন তাতিয়ে নিল সবাই সুরায় চুমুক দিয়ে। বলড়ুইন আর করম্যাক আগে থেকেই চুর চুর হয়ে এসেছিল–হুইস্কি পেটে পড়ায় জিঘাংসার করাল রূপ পুরোমাত্রায় প্রকট হয়ে উঠেছিল চোখে-মুখে। স্টোভের ওপর ক্ষণকের জন্যে হাত রাখল করম্যাক–খুব ঠান্ডা পড়ায় আগুন দেওয়া হয়েছিল স্টোভে।

খিস্তি দিয়ে বললে, এতেই হবে!

অর্থ বুঝল বলড়ুইন। বলল, ঠিক বলেছ। স্টোভের গায়ে কষে বেঁধে রাখলেই ভুর ভুর করে কথা বেরিয়ে আসবে বাছাধনের পেট থেকে।

ম্যাকমুর্দো বললে, ঘাবড়াও মাত, আসল কথাটা পেট থেকে ঠিক বার করে নেবখন। সত্যিই স্নায়ুর জোর আছে বটে ম্যাকমুর্দোর। সমস্ত ঝক্কি তার একার মাথার ওপর তা সত্ত্বেও কথাবার্তা ঠান্ডা যেন কিছুই হয়নি। ইস্পাতকঠিন স্নায়ু না-থাকলে এমন নির্বিকার থাকা যায় না। নার্ভের এই জোর লক্ষ করেছে সবাই। এখন মুখর হল সবার প্রশংসায়।

অনুমোদনসূচক স্বরে বললে ম্যাকগিন্টি, ওর ভার তোমার ওপর রইল। গলাটা টিপে ধরার আগে যেন কিছু টের না-পায়। জানলাগুলোয় খড়খড়ি থাকলে ভালো হত।

একে একে প্রত্যেকটা জানলার সামনে গিয়ে পর্দা টেনে এঁটে দিল ম্যাকমুর্দো।

আড়াল থেকে কেউ দেখতে পাবে না। সময় হয়েছে আসবার।

সেক্রেটারি বললে, নাও আসতে পারে। হয়তো হাওয়ায় বিপদের গন্ধ পেয়েছে।

ম্যাকমুর্দো বললে, ভয় নেই, আসতে তাকে হবেই। আসবার জন্যে ছটফটিয়ে মরছে–এলেই বুঝবেন। চুপ!

মোমের পুতুলের মতো স্থির হয়ে গেল প্রত্যেকে কয়েকজনের হাতের গেলাস দাঁড়িয়ে গেল ঠোঁটের কাছে এসে। সজোরে তিনবার টোকা মারার শব্দ হল দরজায়।

চুপ!

হাত তুলে হুঁশিয়ারি দেয় ম্যাকমুর্দো! বিকট উল্লাসে চোখ চক চক করে ওঠে ঘরসুদ্ধ প্রত্যেকের, হাত নেমে আসে লুকোনো হাতিয়ারের ওপর।

খবরদার! একদম শব্দ না হয়! ফিসফিস করে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ম্যাকমুর্দো, যাবার সময়ে দরজাটি বন্ধ করে দেয় সাবধানে।

কানখাড়া করে ওত পেতে থাকে মানুষখুনির দল। সিঁড়ি বেয়ে কমরেডের নেমে যাওয়ার শব্দ ভেসে আসে মনে মনে গোনে ক-ধাপ নামা হল। তারপর শুনল দরজা খুলছে ম্যাকমুর্দো! স্বাগত সম্ভাষণের দু-চারটে কথা ভেসে আসে কানে। এরপর বাড়ির ভেতরে শোনা যায় অদ্ভুত পদধ্বনি এবং একটা অচেনা কণ্ঠস্বর। মুহূর্তকাল পরেই দড়াম করে দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে চাবি ঘুরোনোর আওয়াজ। ফাঁদের মধ্যে ঢুকেছে শিকার আর ভয় নেই। বিকটভাবে হেসে ওঠে টাইগার করম্যাক–বিরাট থাবা-হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে বস ম্যাকগিন্টি।

বলে চাপা গলায়, চুপ, গাধা কোথাকার! কাঁচিয়ে ছাড়বে নাকি?

বিড়বিড় স্বরে কথাবার্তা শোনা যায় পাশের ঘরে। একঘেয়ে একটানা। যেন অনন্তকালেও ফুরোবে না। তারপরেই খুলে গেল দরজা, ঘরে ঢুকল ম্যাকমুর্দো–আঙুল ঠোঁটের ওপর।

টেবিলের প্রান্তে এসে ঘুরে দেখল সবাইকে। সূক্ষ্ম একটা পরিবর্তন এসেছে চোখে-মুখে। বিরাট একটা কাজের জন্যে যেন দেহমন প্রস্তুত, এমনি হাবভাব। গ্রানাইট দৃঢ়তায় কঠিন মুখচ্ছবি। চশমার আড়ালে দু-চোখ জ্বলছে প্রচণ্ড উত্তেজনায়। নেতৃত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে সর্বাঙ্গে। সাগ্রহে তাকায় সবাই কিন্তু একটি কথাও বলে না ম্যাকমুর্দো। একইরকম বিচিত্র অসাধারণ চাহনি বুলিয়ে যায় পর্যায়ক্রমে সবার মুখের ওপর।

শেষকালে আর থাকতে না-পেরে বলে বসে ম্যাকগিন্টি, কী হল, এসেছে সে? বাড়ি ঢুকেছে বার্ডি এডোয়ার্ডস?

হ্যাঁ, এসেছে আস্তে আস্তে বলে ম্যাকমুর্দো। বার্ডি এডোয়ার্ডস এখানেই আছে। আমিই বার্ডি এডোয়ার্ডস।

সংক্ষিপ্ত এই ভাষণের পর দশ সেকেন্ড এমন অখণ্ড নীরবতা বিরাজ করতে লাগল ঘরের মধ্যে যেন কেউ নেই ঘরের মধ্যে একদম খালি। স্টোভের ওপর চাপানো কেটলির ফেস ফেঁস শব্দটাই কেবল তীক্ষ্মতর হয়ে কানের পর্দার ওপর যেন বিষাণ বাজিয়ে চলল বিরামবিহীন ভাবে। নিঃসীম আতঙ্কে কাঠ হয়ে বসে সাতজনে সাতটি সাদা মুখ তুলে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল এমন একটি মানুষের দিকে যার প্রবল প্রতাপের প্রভাবে প্রত্যেকেই যেন সম্মোহিত, পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তারপরেই আচম্বিতে ঝনঝন শব্দে ভেঙে ঠিকরে গেল জানলার শার্সি, ভাঙা কাচের মধ্যে দিয়ে প্রত্যেকটা জানলায় আবির্ভূত হল একটি করে রাইফেলের চকচকে নলটান মেরে ফেলে দেওয়া হল পর্দাগুলো। দেখেই জখম ভাল্লুকের মতো গর্জন করে আধখোলা দরজার দিকে ঠিকরে গেল বস ম্যাকগিন্টি। কিন্তু থমকে যেতে হল একটা উদ্যত রিভলবারের সামনে–নলচের মাছির ঠিক পেছনে জ্বলছে কোল অ্যান্ড আয়রন পুলিশের ক্যাপ্টেন মার্ভিনের পাথর-কঠিন নীল চোখ। কেঁচোর মতো গুটিয়ে পেছনে হেঁটে এসে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে বস।

ম্যাকমুর্দো নামে এতদিন নিজের পরিচয় দিয়ে এসেছে যে, এবার সে বলে, কাউন্সিলর, যেখানে আছেন ওইখানেই থাকুন–নিরাপদে থাকবেন। বলড়ুইন, রিভলবারের ওপর থেকে হাত না-সরালে কিন্তু ফাঁসির জল্লাদকে কলা দেখাবে মনে হচ্ছে। হাত সরাও বলছি, তবে রে–ঠিক আছে, ওতেই হবে। চল্লিশজন সশস্ত্র পুলিশ বাড়ি ঘিরে আছে খেয়াল থাকে যেন। পালাবার চেষ্টা করে লাভ নেই। মার্ভিন, ওদের পিস্তলগুলো কেড়ে নাও।

অতগুলো রাইফেলের সামনে বাধা দেওয়া নির্বুদ্ধিতা। অনায়াসেই নিরস্ত্র করা হল প্রত্যেককে। মুখ ভারী করে ভিজে বেড়ালের মতো ভীষণ অবাক হয়ে টেবিল ঘিরে বসে রইল সাতটি নরপশু।

ফাঁদে যে ফেলেছে, এবার সে বললে, ছাড়াছাড়ি হওয়ার আগে একটা কথা বলে যাই। আদালতের কাঠগড়ায় ফের আমাদের দেখা হবে, তার আগে আর নয়। এই সময়টুকু যাতে ভেবে কাটাতে পারেন, সেইরকম ভাবনার খোরাক আমি এখনই দিয়ে যাচ্ছি। আমি কে এখন জেনেছেন। তুরুপের তাস ফেলে গেলাম আজ রাতে। আমিই পিনকারটনের বার্ডি এডোয়ার্ডস। আপনাদের দল ভাঙাবার জন্যে নির্বাচন করা হয়েছিল আমাকে। বড়ো কঠিন আর বিপজ্জনক খেলায় নামতে হয়েছিল আমাকে। ক্যাপ্টেন মার্ভিন আর আমার অন্নদাতারা ছাড়া পৃথিবীর আর কেউ জানে না আমি কী খেলায় নেমেছি আমার প্রাণের মানুষ, কাজের মানুষরাও জানে নাআগুন নিয়ে খেলে গিয়েছি এতদিন। ঈশ্বর সহায়। তাই খেল খতম হল আজ রাতে জিতলাম আমিই।

আড়ষ্টমুখে সাতজন চেয়ে রইল। আত্যন্তিক ঘৃণায় বিকৃত প্রতিটি মুখ–কোনো কথাতেই সে-ঘৃণা মুছবার নয়। রক্ত-হিম-করা সে-চাউনির অর্থ বুঝল বার্ডি এডোয়ার্ডস–ইহজীবনে পরিত্রাণ নেই তার।

বলল, খেল এখনও খতম হয়নি ভাবছেন। নিলাম সেই ঝুঁকি। আপনাদের কয়েকজনকে ইহজীবনে আর কোনো খেলাই খেলতে হবে না। আপনারা ছাড়াও আরও ষাটজন আজ রাতেই শ্রীঘরের চেহারা দেখবে। যাবার আগে বলে যাই, এ-কাজে বহাল হওয়ার সময়ে বিশ্বাসই করিনি যে সত্যিই এ-রকম একটা সমিতি থাকতে পারে। ভেবেছিলাম স্রেফ কাগুঁজে গুজব, প্রমাণও করব সেইভাবে। শুনেছিলাম, ফ্রিম্যানদের সঙ্গে আমাকে চলতে হবে। তাই শিকাগো গিয়ে ফ্রিম্যান হয়েছিলাম। পুরো ব্যাপারটা যে কাগুঁজে গুজব ছাড়া সত্যিই কিছু নয়, সমিতির সদস্য হওয়ার পর তা বদ্ধমূল হল। কেননা, বদান্যতা আর জনহিতৈষণা ছাড়া সমিতির কার্যকলাপে খারাপ কিছু দেখলাম না। কিন্তু কাজ শেষ না-করলে তো চলবে না, তাই এলাম এই কয়লা উপত্যকায়। পৌঁছোনোর পর বুঝলাম, যা ভেবেছি তা নয়। সত্যিই এই সমিতির অস্তিত্ব আছে এবং তা নিছক রোমাঞ্চ কাহিনি নয়। তাই থেকে গেলাম সুলুক সন্ধানের জন্যে। আমি শিকাগোয় জীবনে কখনো নরহত্যা করিনি। জীবনে কখনো টাকা জাল করিনি। আপনাদের যা দিয়েছিলাম, এগুলো আসল ডলার–দু-হাতে এভাবে ডলার কখনো ওড়াইনি কিন্তু আপনার মনের মানুষ হওয়ার জন্যে সব করতে হয়েছে। এমন ভান করেছি যেন পুলিশ ঘুরছে আমার পেছনে। কাজও হয়েছে। যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই ঘটেছে।

ঢুকে পড়লাম আপনাদের নরককুণ্ডে এই লজে। মিটিংয়ে বসলাম। হয়তো শুনবেন আমিও বদ হয়ে গিয়েছিলাম আপনাদের মতো। যে যাই বলুক, আপনাদের খাঁচায় পোরাই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু সত্যিই কি আমি বদ হয়ে গিয়েছিলাম? যে-রাতে যোগ দিলাম লজে, সেই রাতেই আপনারা বৃদ্ধ স্ট্যানজারকে ঠ্যাঙালেন। ভদ্রলোককে হুঁশিয়ার করার সময় পাইনি, কিন্তু বলড়ুইন, তোমার মনে আছে নিশ্চয়, তোমার হাত চেপে না-ধরলে নির্ঘাত সেদিন তাকে খুন করে ফেলতে। আপনাদের ভেতরে মিশে থাকার জন্যে অনেক সময়ে পরামর্শ আপনাদের দিয়েছি কিন্তু দিয়েছি তখনই, যখন জেনেছি সেসব চক্রান্ত বানচাল করার ক্ষমতা আমার আছে। যথেষ্ট খবর পাইনি বলেই ডান আর মেনজিসকে বাঁচাতে পারিনি কিন্তু তাদের হত্যাকারীরা যাতে ফাঁসিকাঠে ঝোলে, সে-ব্যবস্থা আমি করব। চেষ্টার উইলকক্সকে আমিই সাবধান করে দিয়েছিলাম। তাই বোমার বারুদ দিয়ে বাড়ি উড়িয়ে দেওয়ার আগের দিন সপরিবারে পালিয়েছিল সে। অনেক কুকর্ম আমি নিরোধ করতে পারিনি। কিন্তু যদি একটু মনে করতে চেষ্টা করেন তাহলেই দেখবেন আমার কাজ কখনো বন্ধ থাকেনি। বহুবার দেখেছেন আপনাদের শিকার যেখানে থাকার কথা সেখানে থাকেনি। যে-রাস্তা দিয়ে আসার কথা সে-রাস্তা দিয়ে না-এসে অন্য পথে বাড়ি ফিরেছে অথবা তোড়জোড় করে খুন করতে গিয়ে দেখেছেন শহরে গিয়ে বসে আছে। এসবই জানবেন আমার কীর্তি।

বিশ্বাসঘাতক! দাঁতে দাঁত পিষে গর্জে ওঠে ম্যাকগিন্টি।

জন ম্যাকগিন্টি, আমাকে বিশ্বাসঘাতক বললে যদি প্রাণটা ঠান্ডা হয় বলতে পারেন। আপনি আর আপনার মতো যারা এ-অঞ্চলে আছে তারা প্রত্যেকে ঈশ্বর আর মানুষের শত্রুরূপে কাজ চালিয়ে গেছেন। অসহায় নরনারী আর আপনাদের মাঝে এসে দাঁড়ানোর দরকার ছিল একজনের টুটি টিপে রেখেছিলেন যাদের, তাদের রক্ষে করার জন্যেই দরকার ছিল একজনের আবির্ভাবের। এ-কাজ করার রাস্তা একটাই ছিল, সেই রাস্তায় গিয়েছি আমি। আপনি আমাকে বিশ্বাসঘাতক বলছেন, কিন্তু আমার তো মনে হয় হাজার হাজার লোক আমাকে ত্রাতা বলে মাথায় নিয়ে নাচবে। নরকে ঢুকতে হয়েছে তাদের বাঁচানোর জন্যে। দীর্ঘকাল নরকবাস করেছি এইভাবে। ওয়াশিংটনের খাজাঞ্চিখানা আমার সামনে হাট করে ধরলেও এইরকম আর তিনটে মাসের মধ্যে যেতে রাজি নই। প্রত্যেকটা লোক আর প্রতিটা গুপ্তকথার নাড়িনক্ষত্র না-জানা পর্যন্ত আমাকে থাকতে হয়েছে নরককুণ্ডে, আমার সিক্রেট ফাঁস হতে বসেছে কানে আসতেই তাড়াতাড়ি জাল গুটিয়ে নিলাম–নইলে থাকতাম আরও কিছুদিন। এমন একটা চিঠি এসেছিল এই শহরে যা ফাঁস হয়ে গেলে আপনাদের টনক নড়ত–হুঁশিয়ার হয়ে যেতেন। তাই খুব তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হয়েছে। আর কিছু বলার। নেই–একটা কথা ছাড়া। এ-পৃথিবী থেকে আমার বিদায় নেওয়ার মুহূর্ত যখন আসবে, এই উপত্যকায় যা করে গেলাম, তা ভেবে শান্তিতে মরতে পারব। মার্ভিন আর তোমাকে আটকাব না। নিয়ে যাও এদের।

আর বেশি কিছু বলার নেই। স্ক্যানল্যানের হাতে একটা মুখবন্ধ খাম দেওয়া হয়েছিল! মিস এট্টি শ্যাফটারকে খামটা যেন পৌঁছে দেয়। মুচকি হেসে চোখ টিপে খাম নিয়ে গিয়েছিল সে। নিশুতি রাতে একটা স্পেশাল ট্রেন পাঠিয়ে দিল, রেল কোম্পানি। পরমাসুন্দরী এক মহিলা এবং আপাদমস্তক আচ্ছাদিত এক ব্যক্তি উঠে বসল সেই ট্রেনে। নক্ষত্ৰবেগে, কোথাও–থেমে, বিপদ এলাকা পেরিয়ে গেল ট্রেনটা। ভ্যালি অফ ফিয়ারে জীবনে আর ফিরে যায়নি এট্রি আর তার প্রিয়তম। দশ দিন পর শিকাগোয় বিয়ে হল দু-জনের, বিয়ের সাক্ষী রইল বৃদ্ধ জ্যাকব শ্যাফটার।

স্কোরারসদের অনুগামীরা যাতে আইনরক্ষকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে না-পারে, তাই তাদের বিচার্য পর্ব অনুষ্ঠিত হল ভ্যালি অফ ফিয়ার থেকে অনেক দূরে। ওরা লড়ল বটে, কিন্তু বৃথাই। বৃথাই ব্ল্যাকমেল এবং নানা অসৎ উপায়ে সারাতল্লাট থেকে শোষিত লজের অর্থ জলের মতো ব্যয় করা হল। বৃথাই বিবাদীপক্ষ প্রচণ্ড মনোবল দেখিয়ে গেল কিন্তু সব প্রচেষ্টাই নিষ্ফল হল মাত্র একজনের আবেগহীন, স্পষ্ট, নিরুত্তাপ বিবৃতির কাছে সে যে সব দেখেছে, সব শুনেছে, সব জেনেছে, বিবাদীদের সঙ্গে থেকেই প্রত্যেকের কুকীর্তির প্রমাণপঞ্জি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংগ্রহ করেছে; প্রত্যেকের জীবনযাত্রা, সংগঠনের বৃত্তান্ত এবং অপরাধের বিবরণ খুঁটিয়ে নথিভুক্ত করে রেখেছে। শেষকালে, বহু বছর পরে ভেঙে গেল ওদের মনোবল, ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল নানাদিকে। চিরকালের জন্যে আতঙ্ক মেঘ সরে গেল উপত্যকা থেকে। নাকিসুরে ঘ্যানঘ্যান করতে করতে, কাঁদুনে গলায় তোষামোদ করতে করতে ফাঁসিকাঠে নিয়তির সম্মুখীন হল ম্যাকগিন্টি। আটজন পালের গোদারও হল একই হাল। পঞ্চাশ জনকে কারাবরণ করতে হল বিভিন্ন মাত্রার। সম্পূর্ণ হল বার্ডি এডোয়ার্ডসের কীর্তি।

কিন্তু ওর অনুমান বৃথা হল না। খেল খতম হল না। আরও অনেক হাত খেলতে বাকি তখনও! দুবৃত্তদলের ভীষণতম কয়েকজন ফাঁসির মঞ্চে এগিয়ে গেল। এদের মধ্যে ছিল টেড বলড়ুইন আর উইলবি ভ্রাতৃদ্বয়, এবং আরও কয়েকজন। দীর্ঘ দশবছর কারার অন্তরালে জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর ফের এসে দাঁড়াল মুক্ত আকাশের নীচে সেইদিনই বার্ডি এডোয়ার্ডস বুঝল শান্তি বিঘ্নিত হল তার শেষ জীবনের। একবাক্যে ওরা শপথ নিলে রক্ত দিয়েও কমরেডদের শোচনীয় পরিণতির প্রতিহিংসা নেবে। শপথ অনুসারে বেরিয়ে পড়ল বিরাট এই পৃথিবীতে। শিকাগোতে দু-দুবার অনিবার্য মৃত্যুর খপ্পর থেকে বেঁচে পালাল এডোয়ার্ডস। বেশ বোঝা গেল, তৃতীয় বারে আর রক্ষে নেই! শিকাগো ত্যাগ করে ছদ্মনামে এল ক্যালিফোর্নিয়ায়। এট্টি এডোয়ার্ডস দেহ রাখল এইখানে চোখে অন্ধকার দেখল বার্ডি এডোয়ার্ডস। আর একবার খুন হতে হতেও কোনোমতে বেঁচে গেল সে! আবার নাম পালটাল। ডগলাস ছদ্মনামে একটা নিরালা গিরিখাতে বার্কার নামে একজন ইংরেজ অংশীদারের সঙ্গে কারবার করে অনেক পয়সা করল। আবার খবর এল রক্তপিশাচ কুকুরের দল গন্ধ শুকে শুকে হাজির হয়েছে তল্লাটে। আর একটু দেরিতে খবর পেলে আর বাঁচতে হত না এডওয়ার্ডসকে। ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে পালাল ইংলন্ডে। মনের মতো মহিলা পেয়ে আবার বিয়ে করল জন ডগলাস, সাসেক্সে শান্তিতে সংসার করল দীর্ঘ চার বছর–তারপরেই যা ঘটল, অদ্ভুত সেই কাণ্ডকারখানা আগেই শোনা গেছে আমাদের।