১৩. বিপদ

বিপদ

চরমে উঠল সন্ত্রাসের রাজত্ব। ম্যাকমুর্দো এখন ইনার ডীকন নিযুক্ত হয়েছে। যেকোনো দিন

বডিমাস্টার ম্যাকগিন্টির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তার পরামর্শ আর সাহায্য ছাড়া উপদেষ্টা পরিষদ এখন এক পা-ও চলে না। সঙ্গীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গেসঙ্গে রাস্তাঘাটে বেরুলেই ম্যাকমুর্দোর প্রতি জনসাধারণের প্রাকুটি নিক্ষেপ বৃদ্ধি পেয়েছে, কৃষ্ণতর হয়েছে ঘৃণামিশ্ৰিত চাহনি। আতঙ্ক অবশ্য চিত্তেও কিন্তু শহরবাসীরা অত্যাচারীকে আঘাত হানবার জন্যে জোট বাঁধতে চেয়েছে গোপনে, সাহস এনেছে মনে। হেরাল্ড অফিসে নাকি গোপন-সভা বসেছিল এবং আইন-ভক্ত নাগরিকদের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র বিলি করা হয়েছে, এমন গুজবও এসেছে লজে। কিন্তু এসব গুজবে কান দেয়নি বস ম্যাকগিন্টি আর স্যাঙাতরা কানাঘুসোয় বিচলিত হবার পাত্র তারা নয়। সংখ্যায় তারা অগণিত, দৃঢ়চিত্ত এবং সশস্ত্র। শত্রুপক্ষ বিক্ষিপ্ত এবং শক্তিহীন। অতীতের মতো এবারও এই আন্দোলন স্রেফ লক্ষ্যহীন গুলতানি আর কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ ধরপাকড়ের মধ্যে দিয়েই নিশ্চয় শেষ হবে। ম্যাকগিন্টি ম্যাকমুর্দো এবং লজের অন্যান্য ডাকাবুকো সদস্যরা একবাক্যে প্রকাশ করল এই অভিমত।

মে মাস। শনিবারের সন্ধে। শনিবারেই মিটিং বসে লজের। ম্যাকমুর্দো বেরুতে যাচ্ছে বাড়ি থেকে মিটিংয়ে যাবে বলে, এমন সময়ে দেখা করতে এল দুর্বলচিত্ত মরিস। ভুরু চিন্তাক্লিষ্ট, সৌম্য, মুখখানি উৎকণ্ঠায় কালো, উদ্ভান্ত।

মি. ম্যাকমুর্দো, মন খুলে কথা বলতে পারি আপনার সঙ্গে?

নিশ্চয়।

একদিন আপনাকে আমার প্রাণের কথা বলেছিলাম, বস ম্যাকগিন্টি নিজে এসে জিজ্ঞেস করেও আপনার পেট থেকে তা বার করতে পারেনি। আমি তা ভুলিনি মি. ম্যাকমুর্দো।

আমাকে বিশ্বাস করেছিলেন বলেই বলতে পারিনি। আপনার সঙ্গে একমত হয়েছিলাম বলে মুখ খুলিনি ভাববেন না যেন।

তা জানি, ভালোভাবেই জানি। কিন্তু কী জানেন আপনি একমাত্র ব্যক্তি যার সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলেও নিরাপদে থাকা যায়। নিজের বুকে হাত রেখে বললে মরিস, এইখানে একটা গুপ্তকথা লুকিয়ে রাখতে গিয়ে জ্বলেপুড়ে মরতে বসেছি। খবরটা আমার কানে না-এসে আপনাদের কারুর কানে গেলে বাঁচতাম। কিন্তু আমি যদি বলি, রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে আরও খুন হবে। যদি না-বলি, আমাদের প্রত্যেকের দিন ফুরিয়েছে জানবেন। ভগবান ছাড়া এই সমস্যা থেকে কেউ আর আমাদের উদ্ধার করতে পারবে না। আমার মাথায় আসছে না কী করা উচিত এখন।

তীক্ষ্ম চোখে মরিসকে লক্ষ করছিল ম্যাকমুর্দো। আপাদমস্তক থরথর করে কাঁপছে বেচারার। গেলাসে হুইস্কি ঢেলে এগিয়ে দেয় ম্যাকমুর্দো।

বলে, এই তো আপনাদের শরীরে অবস্থা! নিন, খান, তারপর বলুন।

এক নিশ্বেসে গেলাস খালি করে দেয় মারিস। বলে নিরুদ্ধ নিশ্বাসে, এক কথায় খবরটা এই–পেছনে একজন ডিটেকটিভ লেগেছে।

বিস্ময়ে বিস্ফারিত চোখে চেয়ে থাকে ম্যাকমুর্দো।

মাথা খারাপ হল নাকি? পুলিশ আর ডিটেকটিভে চেয়ে ফেলেছে যে-জায়গা, সেখানে পুলিশকে ভয় পাওয়ার কী আছে?

আরে না, জেলার পুলিশের কথা আমি বলছি না। ওদের আমি চিনি–কিসু করতে পারবে না, কিন্তু পিনকারটনের নাম শুনেছেন?

ওই নামের কিছু লোকের কাহিনি আমি পড়েছি।

এরা যদি পেছনে লাগে, পাঁয়তারা কষবারও সুযোগ পাওয়া যায় না জানবেন। এ সরকারি তদন্ত নয়। হলে হল না-হলে নাহল গোছের মনোবৃত্তি এদের নয়। এরা ফল ছাড়া আর কিছু চায় না এবং যেন-তেন-প্রকারেণ সেই ফল লাভের জন্যে লেগে থাকে পেছনে। পিনকারটন ডিটেকটিভ যদি পেছনে লাগে তো জানবেন আমাদের দিন ঘনিয়ে এসেছে।

খুন করলেই হল।

আমিও প্রথমে তাই ভেবেছিলাম। লজেও সবাই তাই ভাববে। বললাম না খবর দিলেই রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে! আরও খুন হবে!

তাতে কী? খুন তত আকছার হচ্ছে এ-অঞ্চলে। খুন কি একটা নতুন ব্যাপার?

তা ঠিক। কিন্তু আমি নিমিত্ত হতে চাই না। আমি চিনিয়ে দেবার পর একজন খুন হবে, এ আমি চাই না। জীবনে শান্তি পাব না। অথচ আমাদের ঘাড়ের ওপরেও মাথা থাকবে না এমনি অবস্থা দাঁড়িয়েছে। হা ঈশ্বর! কী করি আমি? সামনে পেছনে দুলতে দুলতে চরম দোটানায় পড়ে যেন যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে মরিস।

কথাগুলো কিন্তু গভীরভাবে নাড়া দিল ম্যাকমুর্দোকে। বেশ দেখা গেল, বিপদ সম্পর্কে এবং বিপদের মোকাবিলা করার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে একই মত সে পোষণ করছে মরিসের সঙ্গে। তাই মরিসের কাঁধ খামচে ধরে ঝাঁকি দিতে দিতে চেঁচিয়ে উঠল প্রায় চিলের মতো আরে মশাই, চুপচাপ বসে ভেবে আকুল হয়ে কোনো লাভ আছে কি? জানেন তা বলুন। লোকটা কে? এখন সে কোথায়? কীভাবে জানলেন তার খবর? আমার কাছেই-বা এলেন কেন?

একমাত্র আপনিই এ-বিপদে আমাকে পরামর্শ দিতে পারেন জেনেই এসেছি আপনার কাছে। আগেই বলেছি আপনাকে, এখানে আসার আগে পূর্বাঞ্চলে একটা দোকান ছিল আমার। অন্তরঙ্গ বন্ধুবান্ধবের অভাব নেই সেখানে এদের একজন কাজ করে টেলিগ্রাফ অফিসে। গতকাল তার কাছ থেকে এই চিঠি পেয়েছি। চিঠির মাথায় যেটুকু আছে পড়ুন।

ম্যাকমুর্দো যা পড়ল, তা এই :

ও তোমাদের ওদিকে স্কোরারস-দের হালচাল কীরকম? কাগজে এদের অনেক কাহিনিই পড়ছি। শুধু তোমাকেই বলি, খুব শিগগিরই আরও খবর তোমার মুখে শোনার আশা করছি। পাঁচটা বড়ো কর্পোরেশন আর দুটো রেলকোম্পানি এই অরাজকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। খুব শিগগিরই দেখবে খেলা আরম্ভ হয়েছে। অনেক এগিয়েছে এর মধ্যে। পিনকারটন নিজে লোক লাগিয়েছেন এদের হুকুমমতো। ওঁর সেরা গোয়েন্দা বার্ডি এডোয়ার্ডস কাজ আরম্ভ করে দিয়েছে। এই অনাচারের ইতি হতে আর দেরি নেই।

এবার পুনশ্চটা পড়ুন।

কাজের মধ্যে ড়ুবে থাকি বলেই অনেক রকম সংকেতলিপি চোখে পড়ে! অদ্ভুত সেইসব গুপ্ত সংকেতের মানে সাধারণ চোখে পড়ে না। আমি যা জেনেছি, তা যেন আর কেউ na-জানে।

অস্থির হাতে চিঠিখানা নাড়াচাড়া করতে করতে নিশ্চুপ হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল ম্যামুর্দো। ক্ষণেকের জন্যে সরে গেছে কুয়াশার পর্দা সামনে দেখা যাচ্ছে নিতল খাদ।

শুধোয়, আর কেউ জানে এ-চিঠির কথা?

কাউকে বলিনি।

কিন্তু আপনার এই বন্ধু চেনা-জানা আর কাউকে লেখেননি তো?

সে-রকম চেনা-জানা আরও দু-একজন এ-তল্লাটে আছে বটে।

লজের মেম্বার?

হতে পারে।

বার্ডি এভোয়ার্ডস দেখতে কীরকম, হয়তো আর কাউকে লিখেছেন আপনার বন্ধু। জানা থাকলে খুঁজে বের করতে সুবিধে হত। তাই জিজ্ঞেস করছিলাম।

তা হত ঠিকই কিন্তু অত খবর আমার বন্ধু জানে বলে মনে হয় না। কাজ করতে করতে চোখে যা পড়েছে, তাই লিখেছে। পিনকারটন ডিটেকটিভকে দেখতে কীরকম জানব কী করে?

ভীষণ চমকে ওঠে ম্যাকমুর্দো।

আরে সর্বনাশ! বুঝেছি কে। কী বোকা আমি, আগেই বোঝা উচিত ছিল। কিন্তু কপাল ভালো আমাদের! ঠিক আছে, দিচ্ছি বাছাধনকে ঢিট করে। মরিস, এ-ব্যাপার আমার ওপর ছেড়ে দিচ্ছেন কিনা বলুন।

নিশ্চয়। কিন্তু আমাকে এর মধ্যে রাখবেন না।

কথা দিলাম। আপনি সরে দাঁড়ান আপনার কোনো দায়িত্ব আর নেই–যা করবার আমি করব। আপনার নাম পর্যন্ত প্রকাশ পাবে না। সব ঝুঁকি আমি নিলাম চিঠিখানা যেন আমিই পেয়েছি–আপনি নন। খুশি?

আমি তাই বলতে যাচ্ছিলাম।

তাহলে সব আমার ওপর ছেড়ে দিন, মুখে চাবি দিয়ে রাখুন। লজে চললাম। পিনকারটনের আক্কেল দাঁত গজিয়ে ছাড়ছি।

খুন করবেন নাকি?

দোস্ত মরিস, খবর যত কম জানবেন, ততই পরিষ্কার থাকবে আপনার বিবেক, ঘুম হবে ভালো। প্রশ্ন করবেন না, দেখুন কোথাকার জল কোথায় দাঁড়ায়। যা ঘটবার তা ঘটবে। দায়দায়িত্ব আমার।

যাওয়ার আগে বিষণ্ণভাবে মাথা নেড়ে গেল মরিস।

বললে ভাঙা গলায়, বেশ বুঝেছি, লোকটার রক্তে হাত রাঙিয়ে গেলাম।

কুটিল হেসে বললে ম্যাকমুর্দো–আত্মরক্ষার নাম নরহত্যা নয়। এ-লোক যদি খুশিমতো ঘুরে বেড়ায় উপত্যকায়, আমরা কেউ নিরাপদ নই। সবাইকে শেষ করে ছাড়বে একাই। ব্রাদার মরিস, লজকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে আপনি কিন্তু বডিমাস্টার নির্বাচিত হতে পারেন।

মুখে পরিহাস করলেও ম্যাকমুর্দোর কার্যকলাপ দেখে বোঝা গেল উটকো উৎপাত এই লোকটিকে নিয়ে সে যথেষ্ট সিরিয়াস। নিজের মনে পাপ থাকার জন্যেই হোক, পাঁচ পাঁচটা শক্তিশালী সমৃদ্ধ কর্পোরেশন এক জোট হয়ে স্কোরারসদের সাফ করে দেওয়ার খবর কানে আসার দরুনই হোক–চরম অবস্থার সম্মুখীন হওয়ার মতোই তৎপর হতে দেখা গেল তাকে। নিজেকে দোষী প্রতিপন্ন করা যায়, এ-রকম সব কাগজ পুড়িয়ে ফেলল বাড়ি ছেড়ে বেরোনোর আগে। কাগজপত্র ধ্বংস করে বেশ বড়ো রকমের একটা তৃপ্তির নিশ্বেস ফেলেও মনে হল বোধ হয় বিপদ এখনও কাটেনি, তাই লজে যাওয়ার পথে গেল বুড়ো শ্যাফটারের বাড়ি। যদিও এ বাড়িতে প্রবেশ তার নিষেধ, কিন্তু জানলায় টোকা মারতেই এটি বেরিয়ে এল বাইরে। দেখল, প্রিয়তমের দুই চোখ থেকে উধাও হয়েছে আইরিশ শয়তানির নাচানাচি। মুখভাব সিরিয়াস। দেখেই বুঝল এট্টি, বিপদে পড়েছে ম্যাকমুর্দো।

শুধোল উদবিগ্ন কণ্ঠে, কী হয়েছে, জ্যাক? কী হয়েছে তোমার? ঝামেলায় পড়েছ নিশ্চয়?

খুব একটা সাংঘাতিক কিছু নয়। তবুও সময় থাকতেই সরে পড়া দরকার।

সরে পড়ার কথা বলছ?

তোমাকে কথা দিয়েছিলাম, সময় হলেই এ-তল্লাট ছেড়ে চলে যাব। সেই সময় এখন আসছে বলেই মনে হচ্ছে। আজ রাতেই একটা খবর পেয়েছি। খুবই খারাপ খবর বিপদ ঘনিয়ে আসছে।

পুলিশ নাকি?

পিনকারটন। কিন্তু অতকথা জানবার তোমার দরকার নেই, সখী। আমাদের মতো লোকদের কাছে পিনকারটন মানে কী, তাও শোনবার দরকার নেই। খুব জড়িয়ে পড়েছি এইসব ঝামেলায়, তাই যত তাড়াতাড়ি কেটে বেরিয়ে যেতে পারি, ততই মঙ্গল। তুমি বলেছিলে, আমি গেলে আমার সঙ্গে তুমি আসবে।

জ্যাক, তাহলেই জানবে বেঁচে গেল এ-যাত্রা।

এট্টি, কয়েকটা ব্যাপারেও আমি কিন্তু সৎ– অসততার চিহ্ন পাবে না আমার মধ্যে। বিশ্ব যদি একদিকে থাকে, আর আমি একদিকে তাহলেও জানবে তোমার কেশাগ্র ছুঁতে দেব না কাউকে, মেঘলোকের যে সোনার সিংহাসনে তোমাকে বসিয়েছি–কোনোদিন সেই আসন থেকে আমার চোখে তুমি বিচ্যুত হবে না। বিশ্বাস করবে আমাকে?

মুখে একটি কথাও বলল না এট্টি–শুধু হাত রাখল প্রিয়তমের হাতে।

তাহলে যা বলি শোনো এবং সেইমতো কাজ করো–এ ছাড়া জানবে বাঁচবার পথ আর নেই। শিগগিরই অনেক কিছু ঘটতে চলেছে এই উপত্যকায় আমার সমস্ত সত্তা দিয়ে তা অনুভব করছি। আমাদের অনেককেই পালাতে হবে এখান থেকে আমি তাদের একজন। দিনে বা রাতে যখনই যাই না কেন, তোমাকে আসতে হবে আমার সঙ্গে।

আসব জ্যাক, আমি আসব, তোমার পরেই আসব।

না, না, আমার সঙ্গে আসতে হবে। পরে নয়। এ-উপত্যকায় আর কোনোদিন ঢুকতে নাও পারি, তোমাকে ফেলে রেখে যাওয়া তাই সম্ভব নয় পুলিশের জ্বালায় হয়তো আর কখনো খবর পর্যন্ত পাঠাতে পারব না। যেখান থেকে এখানে আমি এসেছি, সেখানে এক ভদ্রমহিলাকে আমি চিনি। অত্যন্ত ভালো মানুষ। তার কাছেই তুমি থাকবে আমাদের বিয়ে না-হওয়া পর্যন্ত। আসবে?

আসব জ্যাক, নিশ্চয় আসব।

আমার ওপর তোমার এই বিশ্বাসের জন্যে ভগবান তোমার ভালো করবেন। শোনন, খবর পেলেই সব ছেড়েছুঁড়ে দিয়ে সোজা চলে আসবে ডিপোর ওয়েটিং হলে আমি না-আসা। পর্যন্ত থাকবে। খবর পাঠাব খুব অল্প কথায়–কিন্তু সে-খবর যদি একটা শব্দও হয় সব ফেলে চলে আসবে।

দিনে অথবা রাতে যখন ডাকবে, আমি আসব, জ্যাক।

পলায়নের প্রস্তুতিপর্ব এইভাবে শুরু করে এবং মনে মনে অনেকটা হালকা হয়ে লজে গেল ম্যাকমুর্দো! সদস্যরা এসে গেছে অনেকেই। চিহ্ন আর পালটা চিহ্ন বিনিময় করে ভেতরের আর বাইরের প্রহরীদের বেড়াজাল পেরিয়ে হল ঘরে ঢুকল ম্যাকমুর্দো। স্বাগত সম্ভাষণের সানন্দ গুঞ্জরণে মুখরিত হল কক্ষ। তিলধারণের জায়গা নেই সুদীর্ঘ ঘরে, চুরুটের ধোঁয়ার ঝাঁপসা আবরণের মধ্যে দেখা গেল বডিমাস্টারের কালো চুলের জটা, বলড়ুইনের নৃশংস বৈরী মুখচ্ছবি, হ্যারাওয়ের শকুনি মুখ এবং লজের নেতৃস্থানীয় আরও ডজনখানেক মুখ! এতগুলি মানুষের সামনে খবরটা প্রকাশ করতে পারবে দেখে আনন্দে উল্লসিত হল ম্যাকমুর্দো।

সোল্লাসে বললে চেয়ারম্যান, এসো ব্রাদার এসো। একটা ঝামেলা করছে–বড়ো বিচারক দরকার!

ম্যাকমুর্দো আসন গ্রহণ করতেই বুঝিয়ে দিলে পাশের লোক, ল্যান্ডার আর ইগানের মধ্যে ঝগড়া লেগেছে। স্টাইলসটাউনে বুড়ো ক্যাবিকে খুন করার পারিতোষিকটা দু-জনেই দাবি করছে। বুলেটটা ছুঁড়েছে কে, সমস্যা সেইটাই।

উঠে দাঁড়াল ম্যাকমুর্দো। হাত তুলল। মুখের ভাব দেখেই আকৃষ্ট হল প্রত্যেকে। চাপা গুঞ্জন শোনা গেল ঘরময় নতুন কিছু শোনবার প্রত্যাশায়।

ভাবগম্ভীর কণ্ঠে বললে ম্যাকমুর্দো, শ্রদ্ধেয় হুজুর, জরুরি কথা আছে।

ম্যাকগিন্টি বললে, ব্রাদার ম্যাকমুর্দোর জরুরি কথা আছে। লজের নিয়ম অনুসারে দাবি মঞ্জুর হল। বলো কী বলবে।

পকেট থেকে চিঠিটা বার করল ম্যাকমুর্দো।

শ্রদ্ধেয় হুজুর এবং ভাইগণ, খুব খারাপ খবর এনেছি আজ রাতে। কিন্তু খবরটা না-জেনেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আগে জেনে গিয়ে সেইমতো তৈরি হওয়া ভালো। আমি একটা গোপন খবরে জেনেছি, যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটা অত্যন্ত শক্তিশালী আর সমৃদ্ধ সংস্থা একজোট হয়েছে আমাদের নিকেশ করার জন্য এবং এই মুহূর্তে বার্ডি এডোয়ার্ডস নামে একজন পিনকারটন ডিটেকটিভ এ-অঞ্চলে সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করে বেড়াচ্ছে যাতে আমাদের অনেককে ফাঁসিকাঠে তুলতে পারে। বাকি সবাইকে গারদঘরে ঢুকিয়ে রাখতে পারে। এই ব্যাপার নিয়ে জরুরি আলোচনা দরকার।

ঘরের মধ্যে সূচীভেদ্য স্তব্ধতা। তারপর শোনা গেল চেয়ারম্যানের গলা।

ব্রাদার ম্যাকমুর্দো প্রমাণ কী?

প্রমাণ এই চিঠি হাতে এসেছে একটু আগে। বলে অনুচ্ছেদটা উচ্চকণ্ঠে পড়ে শোনায় ম্যাকমুর্দো। কথা দিয়েছি বলেই এ-চিঠি আপনাদের হাতে দিতে পারছি না, চিঠি সম্বন্ধে এর বেশি একটা কথাও আর বলতে পারব না। এছাড়া আর কোনো কথাও নেই। যেভাবে এ-কেস এসেছে আমার কাছে, সেইভাবেই হাজির করলাম আপনাদের কাছে।

একজন বয়স্ক ব্রাদার বললে, মি. চেয়ারম্যান, বার্ডি এডোয়ার্ডসের নাম আমি শুনেছি। পিনকারটন সার্ভিসের সবসেরা গোয়েন্দা হিসেবে তার সুনাম আছে।

তার চেহারা দেখে চিনতে পারবে এমন কেউ আছে এখানে? শুধোয় ম্যাকগিন্টি।

আমি পারি, জবাব দেয় ম্যাকমুর্দো।

বিস্ময়ের গুঞ্জর ভেসে যায় ঘরময়।

চোখে-মুখে উল্লাসের হাসি ভাসিয়ে আরও বলে ম্যাকমুর্দো, সে এখন আমাদের মুঠোর মধ্যে বললেই চলে। বুদ্ধিমানের মতো এখন যদি চটপট চড়াও হতে পারি, ঝটপট শেষ করে ফেলা যাবে ব্যাপারটা। আমাকে যদি বিশ্বাস করেন, সাহায্য করেন–ভয়ের কোনো কারণ নেই জানবেন।

ভয়টা কীসের? আমাদের কাজকারবার সে জানবে কী করে?

কাউন্সিলর, আমরা প্রত্যেকেই আপনার মতো শক্ত হলে ও-কথা মানাত। কিন্তু এ-লোকের পেছনে ধনকুবেরদের কোটি কোটি টাকার শক্তি কাজ করেছে। টাকায় কেনা যায় না এমন দুর্বলচিত্ত ব্রাদার কি এই লজে নেই মনে করেছেন? সব খবরই সে পাবে এতদিনে হয়তো পেয়েও গেছে। ওষুধ এখন একটাই।

এ-উপত্যকা ছেড়ে সে যেন বাইরে যেতে আর না-পারে, বললে বলড়ুইন।

মাথা হেলিয়ে সায় দেয় ম্যাকমুর্দো।

বললে, ব্রাদার বলড়ুইন, অনেক ব্যাপারেই তোমার সঙ্গে আমার মতের মিল হয়নি। আজ রাতে কিন্তু তুমি আমার মনের কথা বলেছ।

কোথায় সে? চিনব কী করে?

শ্রদ্ধেয় হুজুর, সাগ্রহ কণ্ঠে বলল ম্যাকমুর্দো। বিষয়টা গুরুতর। প্রকাশ্যভাবে আলোচনা করা ঠিক নয়। আমাদেরই কোনো একজনকে আমি সন্দেহ করছি–ঈশ্বর যেন ক্ষমা করেন সেজন্যে। কিন্তু কথাটা যদি ঘুণাক্ষরেও সেই লোকের কানে পৌঁছায়, তাহলে আমরা তার টিকি পর্যন্ত আর ধরতে পারব না। মি. চেয়ারম্যান, আমি প্রস্তাব করছি, আপনাকে ব্রাদার বলড়ুইনকে এবং আরও পাঁচজনকে নিয়ে একটি ট্রাস্টি কমিটি করা হোক। সেখানেই আমি জানি মন খুলে আলোচনা করতে পারব এবং কী করা উচিত তাও বলতে পারব।

সঙ্গেসঙ্গে গৃহীত হল প্রস্তাব। নির্বাচিত হল কমিটি! চেয়ারম্যান আর বলড়ুইন ছাড়াও কমিটিতে রইল শকুনি-মুখ সেক্রেটারি, হ্যারাও; নরপশু তরুণ গুপ্তঘাতক, টাইগার করম্যাক; কোষাধ্যক্ষ, কার্টার; এবং উইলাবি ভ্রাতৃদ্বয় ভয়শূন্য বেপরোয়া প্রকৃতির জন্যে যারা হেন কাজ নেই যা পারে না। লজের অধিবেশনে মদ খাওয়াটা একটা প্রথা। কিন্তু সেদিন এই পর্বটি সংক্ষেপে এবং প্রায় চুপচাপ সাঙ্গ হল। মাথার ওপর বিপদের কালোমেঘ দেখলে প্রাণে তার ফুর্তি থাকে না। এতদিন যে নির্মেঘ নির্মল আকাশের তলায় সবাই যা খুশি তাই করে বেড়িয়েছে, সেই আকাশ থেকে প্রতিহিংসা পাগল আইনের থাবা নেমে আসছে এই কল্পনাতেই অনেকের বুকে কাঁপন ধরল এই প্রথম। সন্ত্রাস সৃষ্টি করে এবং প্রত্যেকের প্রাণে শিহরন জাগিয়ে এরা অভ্যস্ত পালাবদলের কল্পনাও কখনো করেনি। তাই পালটা মার হঠাৎ এত কাছে এসে পড়েছে দেখে চমকিত প্রত্যেকেই। সেই কারণেই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ল সবাই লজ ছেড়ে–শলা-পরামর্শ করতে বসল ট্রাস্টি কমিটি।

শুরু করো ম্যাকমুর্দো, বললে ম্যাকগিন্টি। সাতটি চেয়ারে পাথরের মতো বসে রইল সাতটি পুরুষ।

ম্যাকমুর্দো বললে, বার্ডি এডোয়ার্ডকে চিনি এইমাত্র বলেছি আপনাদের। সে যে স্বনামে এ-অঞ্চলে নেই, তা না-বললেও চলে। লোকটার সাহস আছে, কিন্তু মাথা পাগলা নয়। স্টিভ উইলসন–এই নাম নিয়ে উঠেছে হবসন্স প্যাঁচ-এ।

তুমি জানলে কী রে?

তার সঙ্গে গল্প করে। তখন কিন্তু ভাবিওনি, পরেও মাথায় আসেনি–এই চিঠিখানা হাতে পেতেই বুঝলাম সেই লোকই বটে। গত বুধবার গাড়িতে আলাপ। আমাকে বলল পেশায় সে সাংবাদিক। কথাটা বিশ্বাস করেছিলাম তখনকার মতো। এসেছে নিউইয়র্ক প্রেস পত্রিকার তরফ থেকে। স্কোরারস সম্পর্কে যত রকমের খবর আছে, সব তার চাই। পুরো ব্যাপারটা নাকি ওর ভাষায় একটা প্রকাশ্য অত্যাচার। অনেক প্রশ্নই জিজ্ঞেস করল আমাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। উদ্দেশ্য : খবরের কাগজে ছাপানোর মতো খবর। কিন্তু বিশ্বাস করুন একটা বেফাঁস কথাও বলিনি। বলে কিনা, সম্পাদকের মনের মতো খবর হলে কাঁড়ি কাড়ি টাকা দেব। তখন এমন সব খবর দিলাম যা শুনলে খুশি হয় সে। পুরস্কার স্বরূপ পেলাম বিশ ডলারের নোট। বললে, এর দশগুণ পাবে যদি আরও খবর আনতে পারো।

কী বললে তখন?

মুখে মুখে বানিয়ে বলে গেলাম রাশি রাশি গল্প।

সে যে আসলে খবরের কাগজের লোকই নয়, বুঝলে কী করে?

তা-ও বলছি। ও নেমে গেল হবসন্স প্যাঁচ-এ, আমিও নামলাম। টেলিগ্রাম ব্যুরোয় আমি যখন ঢুকছি, ও তখন বেরুচ্ছে।

বেরিয়ে যাওয়ার পর অপারেটর বলল আমাকে এ-জিনিসের ডবল চার্জ হওয়া উচিত। আমি বললাম ঠিক কথা। ফর্মটা দেখলাম। আগাগোড়া উদ্ভট কথা আমাদের কাছে চৈনিক ভাষা ছাড়া আর কিছু মনে হবে না। ক্লার্কটা বললে, রোজ এইরকম একখানা টেলিগ্রাম পাঠায়। আমি বললাম–খবরের কাগজের বিশেষ খবর কিনা। পাছে আর কেউ মানে বুঝে ফেলে তাই সংকেতে খবর লেখে। অপারেটর নিজেও কিন্তু তাই ভেবেছিল। আমিও এর বেশি ভাবতে পারিনি। কিন্তু এখন আর তা ভাবি না।

ম্যাকগিন্টি বললে, ধরেছ ঠিক। কিন্তু এখন কী করা উচিত বলে মনে হয় তোমার?

একজন বললে, এক্ষুনি গিয়ে খতম করে দিলেই হয়।

হ্যাঁ, হা যত তাড়াতাড়ি হয়, ততই মঙ্গল।

ম্যাকমুর্দো বললে, কোথায় তাকে পাওয়া যাবে জানলেই বেরিয়ে পড়ব। হবসন্স প্যাঁচ-এ থাকে জানি, কিন্তু বাড়িটা চিনি না। একটা ফন্দি এঁটেছি, শুনবেন?

বলো।

কাল সকালে প্যাঁচ-এ যাব আমি। অপারেটরকে জপিয়ে ঠিক বার করে নেব সে কোথায় আছে। অপারেটর খুঁজে পাবে সহজেই। দেখা করে বলব, আমি নিজেই একজন ফ্রিম্যান। লজের সমস্ত গুপ্ত কথা ফাঁস করতে রাজি আছি, কিন্তু ভালো দাম দিতে হবে। বাজি ফেলে বলতে পারি, এ-টোপ সে গিলবেই। বলব কাগজপত্র আমার বাড়িতেই আছে। রাত দশটায় যদি আসে, তখন বাড়িতে আর কেউ থাকবে না বেরিয়ে যাবে যে যার কাজে–কিন্তু কাগজগুলো সেই ফাঁকে সে দেখে নিতে পারবে। লোকটা চতুর বুঝে নেবে। আমরাও তাকে কবজায পাব।

তারপর?

তারপর কী করবেন, সে-প্ল্যান আপনার। বিধবা ম্যাকনামারার বাড়ি এমনিতে ফাঁকা। নিরিবিলি। ভদ্রমহিলার ধাত শক্ত, কানে একদম কালা। বাড়িতে থাকি শুধু আমি আর স্ক্যানল্যান। লোকটা যদি কথা দেয়, আসব, আপনাদেরকে জানিয়ে দেব। রাত ন-টার মধ্যেই আপনারা সাতজন হাজির থাকবেন আমার ঘরে। ভেতরে তাকে ঢোকাব–তারপর যদি জ্যান্ত বেরিয়ে যেতে পারে তো বাকি জীবনটা বলে বেড়াবেখন বার্ডি এডোয়ার্ডয়ের কপাল ভালো।

ম্যাকগিন্টি বললে, পিনকারটন সার্ভিসে শিগগিরই একটা চাকরি খালি হতে চলেছে। ম্যাকমুর্দো, ওই কথাই রইল। রাত নটায় তোমার ঘরে আসছি। ভেতরে ঢুকিয়ে দরজাটা বন্ধ করার পর বাকিটা ছেড়ে দিয়ে আমাদের ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *