০৫. নাটকের পাত্রপাত্রী

নাটকের পাত্রপাত্রী

বাড়িতে ফিরে আসার পর হোয়াইট ম্যাসোন জিজ্ঞেস করলেন, পড়ার ঘরের সব কিছু দেখেছেন তো?

ইনস্পেকটর বলল, এখনকার মতো যা দেখবার দেখছি। মাথা নেড়ে নীরবে সায় দিল হোমস।

এবার নিশ্চয় বাড়ির লোকের জবানবন্দি নেবেন? ডাইনিংরুমে বসা যাক। অ্যামিস, আগে তোমার পালা। বলো কী জানো।

খাসচাকরের বক্তব্য সরল এবং পরিষ্কার। আন্তরিকতার জন্য বিশ্বাস জাগায়। মি. ডগলাস পাঁচ বছর আগে বির্লস্টোনে আসেন। তখন থেকেই সে কাজে বহাল হয়েছে। এইটুকু সে বুঝেছে যে মি. ডগলাস অনেক টাকার মালিক এবং টাকা তিনি রোজগার করেছেন আমেরিকায়। মনিব হিসেবে দয়ালু, বিচক্ষণ ঠিক যেরকম মনিবের সঙ্গে আগে ঘর করেছে অ্যামিস, সে-রকমটি না-হলে চমৎকার–তা ছাড়া সবকিছুই একসঙ্গে সবার ভাগ্যে জোটে না। মি. ডগলাসকে কখনো ভয়ে কুঁচকে থাকতে সে দেখেনি বরং উলটোটাই দেখেছে–জীবনে এমন নির্ভীক পুরুষ সে কখনো দেখেনি। রাত হলেই ড্রব্রিজ তুলে রাখার নির্দেশ মি. ডগলাসেরই কেননা এ-বাড়ির পুরোনো প্রথা তাই। লন্ডনে কদাচিৎ যেতেন মি. ডগলাস, গাঁ ছেড়ে প্রায় বেরোতেন না। তবে খুন হওয়ার আগের দিন টানব্রিজ ওয়েলস-এ বাজার করতে গেছিলেন। সেইদিন অ্যামিস মি. ডগলাসকে একটু উত্তেজিত অবস্থায় দেখেছিল–ধৈর্য হারিয়ে ফেলছিলেন, মেজাজ খারাপ করছিলেন–যা তার স্বভাব নয়। সে-রাতে অ্যামিস তখনও ঘুমোতে যায়নি–বাড়ির পেছনদিকে খাবারদাবার রাখার ঘরে রুপপার কাঁটা চামচ সাজাচ্ছিল, এমন সময়ে ভীষণ জোরে বেজে উঠল দরজার ঘণ্টা। বন্দুকের আওয়াজ শোেনা যায়নি, না শোনাটাই স্বাভাবিক। কেননা রান্নাঘর আর ভাড়ার ঘর বাড়ির একদম পেছন দিকে মাঝে অনেকগুলো বন্ধ দরজা আর টানা লম্বা গলিপথ আছে। ওইরকম ভীষণ জোরে ঘণ্টা বাজানো শুনেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিল হাউসকিপার। দুজনে একসঙ্গে গিয়েছিল বাড়ির সামনের দিকে। সিঁড়ির গোড়া পর্যন্ত যেতেই দেখেছে ওপর থেকে নেমে আসছেন মিসেস ডগলাস। না, তরতর করে নামেনি খুব একটা উত্তেজিত হয়ে তাড়াহুড়ো করে নামছেন বলে মনে হয়নি অ্যামিসের। সিঁড়ির নীচের ধাপে পৌঁছোতেই ভাড়ার ঘর থেকে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এলেন মি. বার্কার। পথ আটকালেন মিসেস ডগলাসের–কাকুতি-মিনতি করে বললেন ওপরে চলে যেতে।

চিৎকার করে বলেছিলেন, দোহাই তোমার, ঘরে যেয়ো না! জ্যাক বেচারা মারা গেছে। তোমার কিছু করার নেই। ঈশ্বরের দোহাই, ফিরে যাও।

সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে এইভাবে কিছুক্ষণ বোঝানোর পর মিসেস ডগলাস ওপরে চলে গেলেন। চেঁচাননি। কোনোরকম হাহাকার করেননি। হাউসকিপার মিসেস অ্যালেন ওঁকে ওপরে নিয়ে যায়–ওঁর সঙ্গেই শোবার ঘরে থাকে। তারপর অ্যামিস আর মি. বার্কার ফিরে আসেন পড়ার ঘরে–পুলিশ যা দেখেছে, ওরাও তাই দেখেছে। তখন মোমবাতিটা জ্বলছিল না, জ্বলছিল লম্ফ! জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিলেন বটে, কিন্তু মিশমিশে অন্ধকারে কিছু দেখতে পাননি, শুনতে পাননি। ছুটতে ছুটতে হল ঘরে এসেছেন দু-জনে, ড্রব্রিজ নামানোর চরকি কল ঘুরিয়ে দিয়েছে অ্যামিস। দৌড়ে বেরিয়ে গেছেন মি. বার্কার পুলিশকে খবর দিতে।

সংক্ষেপে, এই হল গিয়ে খাসচাকরের জবানবন্দি।

হাউসকিপার মিসেস অ্যালেন যা বলল, তা অ্যামিসের কথারই সমর্থন। অ্যামিস কাজ করছিল ভাঁড়ার ঘরে সে-ঘর থেকে হাউসকিপারের ঘর বাড়ির সামনের দিকের অনেকটা কাছে। শুতে যাচ্ছে, এমন সময়ে ভীষণ জোরে ঘণ্টা বেজে ওঠায় খটকা লাগে। মিসেস অ্যালেন কানে একটু কম শোনে? সেই কারণেই বোধ হয় গুলির আওয়াজ কানে যায়নি তা ছাড়া পড়ার ঘরটাও বেশ দূরে। দড়াম করে দরজা বন্ধ করার মতো একটা শব্দ যেন কানে এসেছিল। তাও ঘণ্টা বাজার প্রায় আধঘণ্টা আগে। মি. অ্যামিস সদর দরজার দিকে ছুটে যেতেই মিসেস অ্যালেনও গিয়েছিল পেছন পেছন। দেখেছিল ভীষণ ফ্যাকাশে আর উত্তেজিতভাবে পড়ার ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসছেন মি. বার্কার। বেরিয়ে এসেই পথ আটকে দাঁড়িয়েছিলেন মিসেস ডগলাসের–উনি তখন নামছিলেন সিঁড়ি বেয়ে। কাকুতি-মিনতি করে বলেছিলেন ফিরে যেতে কথা শুনেছিলেন মিসেস ডগলাস–কিন্তু কী বলেছিলেন, তা শোনা যায়নি।

মি. বার্কার তখন বলেছিলেন মিসেস অ্যালেনকে ওপরে নিয়ে যাও। সঙ্গে থাকো।

মিসেস অ্যালেন তখন মিসেস ডগলাসকে শোবার ঘরে নিয়ে গিয়ে অনেক সান্ত্বনার কথা বলে শান্ত করার চেষ্টা করেছিল। ভীষণ উত্তেজিত হয়েছিলেন মিসেস ডগলাস, পা থেকে মাথা পর্যন্ত কাঁপছিল ঠকঠক করে। কিন্তু নীচে নামার আর চেষ্টা করেননি। শোবার ঘরের আগুনের পাশে ড্রেসিংগাউন পরে বসে দু-হাতে মুখ ঢেকেছিলেন। প্রায় সারারাত কাছে কাছে ছিল মিসেস অ্যালেন। অন্য চাকরবাকররা শুয়ে পড়েছিল–পুলিশ আসবার আগে পর্যন্ত টের পায়নি কী সর্বনাশ হয়ে গেল। বাড়ির একদম পিছনে ঘুমোয় ওরা আওয়াজ-টাওয়াজ সেইজন্যেই কানে যায়নি।

জেরা করে এর বেশি আদায় করা গেল না হাউসকিপারের পেট থেকে হা-হুতাশ আর ভ্যাবাচাকা ভাব ছাড়া।

মিসেস অ্যালেনের পর সাক্ষী হিসেবে এলেন মি. সিসিল বার্কার। আগের রাতের ঘটনা সম্বন্ধে পুলিশের কছে দেওয়া জবানবন্দির বাড়তি কথা একটিও বললেন না। উনি নিজে বিশ্বাস করেন, হত্যাকারী চম্পট দিয়েছে জানলা গলে। রক্তের দাগটাই তার মোক্ষম প্রমাণ। এ ছাড়াও ড্রব্রিজ ওঠানো থাকায় পালাবার আর পথ নেই। তারপর গুপ্তঘাতক কোথায় গেল, সাইকেল যদি বাস্তবিকই তার হয়, ফেলেই-বা গেল কেন–এসব প্রশ্নের সদুত্তর দিতে অবশ্য পারলেন না। পরিখার জলে ড়ুবে মরাও সম্ভব নয়–কেননা জল কোনো জায়গাতেই তিন ফুটের বেশি গভীর নয়!

খুন সম্বন্ধে তার নিজের মনের মধ্যে নিদিষ্ট একটা অনুমিতি আছে। ডগলাস ছিল স্বল্পবাক পুরুষ। জীবনের কিছু অধ্যায় সম্বন্ধে কদাপি মুখ খুলত না। আয়ারল্যান্ড থেকে আমেরিকায় গিয়েছিল খুব অল্প বয়সে। সেখানে বেশ দু-পয়সা করেছিল। ডগলাস বার্কারের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ কালিফোর্নিয়ায়। সেখানে বেনিটো ক্যানিয়ন বলে একটা জায়গা আছে। দু-জনে অংশীদার হয়ে খনির কারবারে নামে এবং আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়। বেশ দু-পয়সা হচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ নিজের অংশ বিক্রি করে দিয়ে ডগলাস ইংলন্ডে চলে যায়। তখন সে বিপত্নীক। পরে বার্কার নিজের টাকা আদায় করে নিয়ে লন্ডনে থাকতে আসেন। পুরোনো বন্ধুত্ব নতুন করে মাথাচাড়া দেয়। ডগলাস প্রায় বলত, তার মাথার ওপর বিপদের খাঁড়া ঝুলছে। এই বিপদের ভয়েই আচমকা ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে ইংলন্ডে এমন নিরিবিলি জায়গায় বাড়ি ভাড়া করে সে রয়েছে। বার্কারের মনে হয়েছিল গুপ্তসমিতি জাতীয় কিছু একটা ছায়ার মতো লেগে রয়েছে ডগলাসের পেছনে। ক্ষমাহীন এই নির্দয় সংস্থা ওকে খুন না-করা পর্যন্ত পেছন ছাড়বে না। ডগলাসের ছাড়া-ছাড়া কয়েকটা মন্তব্য থেকেই এই ধারণা এসেছিল বার্কারের মাথায় কিন্তু গুপ্তসংস্থাটি কী এবং কেনই-বা তাদের বিষ নজরে পড়েছে, ডগলাস কখনো তা বলেনি। তবে বার্কারের বিশ্বাস, বিজ্ঞপ্তিতে লেখা কিংবদন্তির মধ্যে গুপ্তসংস্থার নিশ্চয় কোনো উল্লেখ আছে।

ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড জিজ্ঞেস করল, ক্যালিফোর্নিয়ায় ডগলাসের সঙ্গে আপনি কদ্দিন ছিলেন?

সবসুদ্ধ পাঁচ বছর।

উনি তখন বিয়ে করেননি বললেন না?

বিপত্নীক ছিল।

প্রথম স্ত্রী কোন দেশের মেয়ে কখনো শুনেছিলেন?

না। তবে একবার যেন বলেছিল ভদ্রমহিলার ধমনীতে সুইডিশ রক্ত আছে–ছবিও দেখেছিলাম। অনিন্দ্যসুন্দরী মহিলা। আমার সঙ্গে ডগলাসের প্রথম দেখা হওয়ার আগের বছর টাইফয়েড়ে মারা যান।

আমেরিকায় বিশেষ কোনো অঞ্চলের সঙ্গে ওঁর অতীত জীবনের যোগসূত্ৰ বার করতে পারেন?

শিকাগো সম্পর্কে ওকে কথা বলতে শুনেছি। শহরটা ওর নখদর্পণে কাজও করেছে সেখানে। কয়লা আর লোহার জেলা সম্পর্কেও গল্প করতে শুনেছে। বয়সকালে প্রচুর দেশভ্রমণও করেছে।

রাজনীতিবিদ ছিলেন কি? রাজনীতি নিয়ে ক্ষুব্ধ কি গুপ্তসংস্থা?

না। রাজনীতির ধার ধারত না ডগলাস!

ক্রিমিন্যাল বলে কখনো মনে হয়েছে আপনার বন্ধুকে?

ঠিক উলটোটাই মনে হয়েছে। জীবনে এমন সোজা মানুষ দেখিনি।

ক্যালিফোর্নিয়ায় ওর জীবন সম্পর্কে অদ্ভুত কোনো ঘটনা জানেন?

বেশির ভাগ সময় পাহাড়ে আমাদের খনিতে থেকে কাজ করতে পছন্দ করত ডগলাস। পারলে পাঁচজনের মধ্যে কখনো যেতে চাইত না। সেই কারণে প্রথমে ভেবেছিলাম নিশ্চয় ওর পেছন নিয়েছে কেউ। সন্দেহটা আর সন্দেহ রইল না, বিশ্বাস হয়ে গেল যখন বলা নেই কওয়া নেই দুম করে চলে গেল ইউরোপে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস কেউ হুশিয়ার-টুশিয়ার করেছিল বলেই পালিয়েছিল। কেননা, চলে যাওয়ার পরে সাতদিনও গেল না–জনাছয়েক লোক এসে খোঁজ করেছে ডগলাসের।

কী ধরনের লোক?

দুঁদে টাইপের। পেটাই লোহার মতো ভীষণ চেহারা। খনিতে এসে জিজ্ঞেস করেছিল ডগলাস কোথায়। বললাম, ইউরোপ গেছে, ঠিকানা জানি না। কথাবার্তা শুনেই বুঝেছিলাম জামাই-আদর করার জন্য খুঁজছে না ডগলাসকে।

লোকগুলো কি আমেরিকান–ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা?

ক্যালিফোর্নিয়ার মানুষ সম্বন্ধে খুব একটা খবর আমি রাখি না–আমেরিকান এইটুকু বলতে পারি। খনির লোক নয়। তারা যে কে তা জানি না–চলে যাওয়ার পর হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম।

এ-কাণ্ড ঘটেছিল ছ-বছর আগে?

প্রায় সাত বছর আগে।

তখন আপনারা দু-জনে বছর পাঁচেক আছেন ক্যালিফোর্নিয়ায় তার মানে সব মিলিয়ে কম করেও ব্যাবসা করেছেন এগারো বছর?

হ্যাঁ।

এত বছর ধরে ঝাল পুষে রাখা মানে কারণটা খুবই গুরুতর। ছোটোখাটো ব্যাপার নয় মোটেই।

আমার তো মনে হয় সারাজীবনটাই এই করাল ছায়ার তলায় কাটিয়েছে ডগলাস। এক মুহূর্তের জন্যেও মন থেকে সরাতে পারেনি।

কিন্তু যে-লোক জানে মাথায় বিপদের খাড়া ঝুলছে, বিপদটা কী তাও যখন তার অজানা নয়–তখন কি বাঁচবার জন্যে পুলিশের শরণাপন্ন হওয়া উচিত ছিল না তার?

বিপদটা হয়তো এমন ধরনের যার খপ্পর থেকে পুলিশ তাকে বাঁচাতে পারবে না। এটা জেনেই পুলিশকে জানায়নি। একটা ব্যাপার আপনাদের জানা দরকার। সবসময়ে সশস্ত্র থাকত ডগলাস। অষ্টপ্রহর রিভলবার রাখত পকেটে। কিন্তু কপাল খারাপ তাই গতরাতে ড্রেসিংগাউন পরার ফলে শোবার ঘরে রেখে এসেছিল রিভলবার, ব্রিজ তুলে ফেলার পরেই নিজেকে নিরাপদ মনে করত বলেই মনে হয়।

তারিখগুলো আর একটু পরিষ্কার ভাবে জানতে চাই, বলল ম্যাকডোনাল্ড। ডগলাস ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়েছেন ঠিক ছ-বছর আগে। পরের বছর আপনিও তাই করেছেন, কেমন?

হ্যাঁ।

পাঁচ বছর আগে মি. ডগলাস যখন বিয়ে করেন, তখন থেকেই ওঁর কাছে আছেন?

বিয়ের একমাস আগে থেকে। আমি ওর নিতবর হয়েছিলাম।

বিয়ের আগে মিসেস ডগলাসকে চিনতেন?

না, চিনতাম না! ইংলন্ড ছেড়েছিলাম বছর দশেক।

কিন্তু বিয়ের পর থেকেই দেখাসাক্ষাৎ প্রায় হত?

কঠোর চোখে ডিটেকটিভের পানে তাকালেন বার্কার।

ডগলাসের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ প্রায় হত! মিসেস ডগলাসের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়ে থাকলে জানবেন স্ত্রী সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ বাদ দিয়ে স্বামীর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ সম্ভব নয় বললেই হয়। অন্য কোনো সম্পর্ক যদি কল্পনা করে থাকেন—

কিছুই কল্পনা করিনি, মি. বার্কার। কেস সম্পর্কে সব কিছুর খোঁজে খবর নিতে বাধ্য কিন্তু অপমান করার অভিপ্রায় নেই।

কিছু তদন্ত অপমানকরই হয়। রাগত কণ্ঠে জবাব দিলেন বার্কার।

আমাদের দরকার শুধু ঘটনার। আপনার এবং মামলায় জড়িত সবার স্বার্থে ঘটনাগুলো পরিষ্কার হয়ে যাওয়া দরকার। স্ত্রীর সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব অনুমোদন করেছিলেন মি. ডগলাস?

ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন বার্কার। বিরাট বলিষ্ঠ হাত দুটোয় যেন খিঁচ ধরল মুঠি পাকালেন প্রচণ্ডভাবে।

বললেন গলা চড়িয়ে, এ-কথা জিজ্ঞেস করার অধিকার আপনার নেই। যা তদন্ত করতে এসেছেন, তার সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?

প্রশ্নটা আবার করছি।

আমিও জবাব দেব না বলছি।

জবাব না হয় না-দিলেন, কিন্তু না-দেওয়াটাই জানবেন আপনার জবাব। লুকোনোর মতো খবর আছে বলেই জবাব দিতে চাইছেন না।

মুহূর্তের জন্য কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন বার্কার। নিবিড় চিন্তায় গুটিয়ে রইল কালো ভুরু জোড়া। তারপর চোখ তুলে হাসলেন!

ঠিক আছে, আপনারা যখন নিছক কর্তব্য করছেন, বাধা দেওয়ার অধিকার আমার নেই। তবে একটা কথা যথেষ্ট ধকল চলেছে মিসেস ডগলাসের ওপর। এই মুহূর্তেই এ-প্রসঙ্গ নিয়ে তাকে আর বিব্রত করবেন না। শুনে রাখুন, একটাই দুর্বলতা ছিল ডগলাসের ঈর্ষা। আমাকে যেভাবে ভালোবাসত ডগলাস, বন্ধুর প্রতি তার চাইতে বেশি ভালোবাসা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। স্ত্রীকেও ভালোবাসত খুব। ও চাইত আমি আসি এখানে, ডেকেও পাঠাত। তা সত্ত্বেও স্ত্রীর সঙ্গে আমাকে কথা বলতে দেখলে, অথবা দু-জনের মধ্যে একটু সহানুভূতির সুর লক্ষ করলে ঈর্ষায় জ্বলে যেত, মাথা ঠিক রাখতে পারত না, দুম করে অনেক সাংঘাতিক কথা বলে ফেলত। এই কারণে বহুবার ঠিক করেছি আর আসব না। কিন্তু এমন কাকুতিমিনতি করে চিঠি লিখত ডগলাস যে না-এসে পারতাম না। তবে আমার শেষ কথা শুনে রাখুন এইরকম পতিব্রতা সতী স্ত্রী সংসারে দেখা যায় না, আমার মতো বিশ্বাসী বন্ধুও এ-দুনিয়ায় দেখা যায় না।

আবেগ অনুভূতির এমন কথা শোনবার পরেও দেখা গেল প্রসঙ্গটা বাদ দিতে পারছে না। ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড।

বলল, জানেন তো মৃত ব্যক্তির আঙ্গুল থেকে বিয়ের আংটি খুলে নেওয়া হয়েছে?

সেইরকমই মনে হচ্ছে, বললেন বার্কার।

মনে হচ্ছে, বললেন কেন? আপনি জানেন এটা একটা ঘটনা। মনে হওয়ার মতো তো নয়।

আংটি না-থাকার ফলে, সে যেই সরাক না কেন, প্রত্যেকেই কিন্তু ধরে নেবে বিয়ের সঙ্গে এই ট্র্যাজেডির একটা সম্পর্ক আছে ঠিক কিনা বলুন?

গুলিয়ে ফেললেন যেন বার্কার, কী বলা উচিত ভেবে পেলেন না।

মনে হচ্ছে বলেছি অন্য একটা সম্ভাবনার কথা ভেবে। আংটিটা নিজেও তো খুলে রাখতে পারে।

প্রশস্ত দুই কাঁধ ঝাঁকালেন বার্কার।

বললেন, কে কী ধরে নেবে তা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে যদি আপনারা ধরে নেন যে এর ফলে এই ভদ্রমহিলার সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়বে বলতে বলতে মুহূর্তের জন্যে দপ করে জ্বলে উঠল বার্কারের চোখ; প্রবল চেষ্টায় সামলে নিলেন আবেগের বহিঃপ্রকাশকে তাহলে কিন্তু বলব ভুল পথে চলেছেন।

ঠান্ডা গলায় ম্যাকডোনাল্ড বললেন, আপনাকে জিজ্ঞেস করার মতন আর কিছু তো দেখছি না।

মন্তব্য শোনা গেল শার্লক হোমসের, একটা বিষয় ছাড়া। আপনি যখন ঘরে ঢোকেন, তখন তো একটাই মোমবাতি জ্বলছিল টেবিলে, তাই নয়?

হ্যাঁ, তাই।

সেই আলোয় আপনি দেখলেন যে একটা অতি ভয়ংকর কাণ্ড ঘটেছে?

ঠিক বলেছেন।

তক্ষুনি ঘণ্টা বাজিয়ে লোক জড়ো করলেন?

হ্যাঁ।

খুবই তাড়াতাড়ি এসে গেল সবাই?

মিনিটখানেকের মধ্যে।

ওইটুকু সময়ের মধ্যে এসেও তারা দেখলে মোমবাতি নিভে গেছে, লম্ফ জ্বালানো হয়েছে। ব্যাপারটা কিন্তু আশ্চর্য রকমের।

গোলমালে পড়েছেন মনে হল বার্কার।

একটু থেমে বললেন, খুব একটা আশ্চর্য বলে তো আমার মনে হয় না, মি. হোমস। মোমবাতির অতি যাচ্ছেতাই আলোয় ভালো দেখা যাচ্ছিল না। প্রথমেই তাই ভাবলাম ভালো আলোর ব্যবস্থা করা যাক। লক্ষটা টেবিলের ওপরেই ছিল বলে জ্বালিয়ে ফেললাম।

তারপর মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিলেন?

ঠিক তাই।

হোমস আর প্রশ্ন করল না। কীরকম যেন বেপরোয়া, তোয়াক্কা-না-করা গোছের চাহনি পর্যায়ক্রমে আমাদের ওপর বুলিয়ে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন বার্কার।

মিসেস ডগলাসের সঙ্গে তার ঘরেই দেখা করতে চান, এই মর্মে চিরকুট লিখে পাঠিয়েছিল ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড, মিসেস ডগলাস জবাব দিয়েছিলেন তার চাইতে বরং ডাইনিং রুমেই দেখা করবেন আমাদের সঙ্গে। এখন ঘরে ঢুকলেন তিনি। দীর্ঘাঙ্গী, সুন্দরী। বয়স তিরিশ। চাপা স্বভাবের এবং বিপদেও আশ্চর্য রকমের স্থির, সংযত বিষাদময়ী, উন্মত্তপ্রায়, যে চিত্র এঁকেছি তার ঠিক উলটো। প্রচণ্ড মানসিক আঘাত সহ্য করলে মুখ যেরকম পাণ্ডুর এবং অস্বাভাবিক হয়ে যায়–ওঁর মুখভাবও সেইরকম ঠিকই, কিন্তু হাবভাব সংযত এবং সুগঠিত হাতটি টেবিলে রাখার পর দেখা গেল আমার হাতের মতোই তা নিষ্কম্প। বিষণ্ণ, মিনতিপূর্ণ দুই চোখের মধ্যে অদ্ভুত একটা অনুসন্ধিৎসুভাব জাগিয়ে পর্যায়ক্রমে তাকালেন আমাদের সকলের মুখের ওপর। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি সহসা রূপান্তরিত হল আচমকা কথার মধ্যে।

কিছু পেয়েছেন?

আমার কল্পনা কিনা জানি না, কিন্তু আশার বদলে যেন ভয় ধ্বনিত হল প্রশ্নের মধ্যে?

ইনস্পেকটর বললেন, যা করবার সবই করেছি মিসেস ডগলাস। নিশ্চিত থাকতে পারেন–কিছুই বাদ যাবে না।

যত টাকা লাগে লাগুক, মৃতবৎ উত্থানপতনহীন কণ্ঠে বললেন মিসেস ডগলাস। আমি চাই–যা করবার সব যেন করা হয়।

আপনার কথা শুনলে হয়তো কিছু জানা যাবে।

মনে তো হয় না। তবে যা জানি সব বলব।

মি. সিসিল বার্কারের মুখে শুনলাম, শোচনীয় ঘটনাটা যে-ঘরে ঘটেছে, সে-ঘরে আপনি এখনও ঢোকেননি–স্বচক্ষে কিছু দেখেননি?

না, দেখিনি। সিঁড়ি থেকেই ফিরিয়ে দিলেন। কাকুতিমিনতি করে বললেন ঘরে ফিরে যেতে।

ঠিক তাই। গুলির আওয়াজ আপনি শুনেছিলেন, শুনেই তৎক্ষণাৎ নেমে এসেছিলেন?

ড্রেসিংগাউন পরেই নেমে এসেছিলাম।

গুলির আওয়াজ শোনবার কতক্ষণ পরে সিঁড়ির নীচে মি. বার্কার পথ আটকে ছিলেন আপনার?

মিনিট দুয়েক হতে পারে। এ-রকম সময়ে সময়ের হিসেব রাখা খুব কঠিন। মিনতি করে বললেন আর যেন না-এগোই। বললেন, আমার কিছু করার নেই। তারপর হাউসকিপার মিসেস অ্যালেন ওপরে নিয়ে গেল আমাকে। সবটাই যেন একটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন।

গুলির আওয়াজ শোনবার আগে পর্যন্ত কতক্ষণ আপনার স্বামী একতলায় গিয়েছিলেন বলতে পারবেন কি?

না পারব না। ড্রেসিংরুম থেকে কখন বেরিয়ে গিয়েছিল শুনতে পায়নি। বাড়িতে আগুন লেগে যেতে পারে এই ভয়ে প্রতি রাতে শুতে যাওয়ার আগে গোটা বাড়ি টহল দেওয়ার অভ্যেস ছিল। এই একটাই ব্যাপারে ওকে যা ভয় পেতে দেখেছি আমি আর কোনো ব্যাপারেই নার্ভাস হতে দেখেনি।

মিসেস ডগলাস, ঠিক এই বিষয়টাতেই আসতে চাইছি আমি। আপনার স্বামীকে শুধু এই ইংলন্ডেই আপনি দেখেছেন, তাই না?

হ্যাঁ। বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর।

আমেরিকায় থাকার সময়ে এমন কোনো ঘটনার কথা বলতে শুনেছেন যে-ঘটনার ফলে উনি বিপদগ্রস্ত?

আন্তরিকভাবে ভাবলেন মিসেস ডগলাস, জবাব দিলেন তারপরে।

হ্যাঁ শুনেছি। মাথার ওপর বিপদ ঝুলছে, এ-রকমটাই সবসময়ে মনে হয়েছে তার। কিন্তু কী বিপদ, তা নিয়ে কিছুতেই কথা বলতে চাইত না আমার সঙ্গে। বিশ্বাস করত না বলে বলত না ভাববেন না যেন–গভীর ভালোবাসত আমাকে, গোপন বলে কিছু ছিল না আমার কাছে–কিন্তু বিপদ-আপদের ব্যাপারে আমাকে জড়াতে চাইত না, পাছে ভেবে মরি বলে। তাই চুপ করে থাকত।

তাহলে আপনি জানলেন কী করে?

চকিত হাসির ছটায় আলোকিত হল মিসেস ডগলাসের মুখচ্ছবি।

স্ত্রীর কাছে সারাজীবন কোনো কথা কি স্বামী লুকিয়ে রাখতে পারে? স্বামী যার নয়নের মণি, সন্দেহ কি তার হয় না? আমিও জেনেছিলাম নানাভাবে। আমেরিকায় থাকার সময়ে ওর জীবনের কয়েকটি ঘটনা নিয়ে একদম কথা বলতে চাইত না বলে জেনেছিলাম। কতগুলো ব্যাপারে ওর সতর্কতা দেখে জেনেছিলাম। মুখ ফসকে কিছু কথা বেরিয়ে পড়ায় জেনেছিলাম। অপ্রত্যাশিত আগন্তুকদের দিকে ওর চাউনি লক্ষ করে জেনেছিলাম। স্পষ্ট বুঝেছিলাম ওর পেছনে শক্তিশালী শত্রু ঘুরছে, ও জানে ওরা তাকে খুঁজছে, সেইজন্যেই সবসময়ে তৈরি থাকত টক্কর দেওয়ার জন্যে। এসব জেনেছিলাম বলেই এতগুলো বছর কোনোদিন বেশি রাত করে বাড়ি ফিরলে ভয়ে কাঠ হয়ে থাকতাম।

হোমস জিজ্ঞেস করে, কী-কী কথা শুনে আপনার খটকা লেগেছিল শুনতে পারি?

ভ্যালি অফ ফিয়ার, বললেন ভদ্রমহিলা। আমার প্রশ্নের উত্তরে একবার বলেছিল, আতঙ্ক-উপত্যকায় ছিলাম–এখনও বেরোতে পারিনি। অস্বাভাবিক সিরিয়াস হয়ে গেছে দেখে জিজ্ঞেস করেছিলাম–আতঙ্ক-উপত্যকা থেকে কখনোই কি বেরোতে পারবে না? ও বলেছিল–মাঝে মাঝে মনে হয় তাই কখনোই আর বেরোতে পারব না আমরা।

আতঙ্ক-উপত্যকা বলতে কী বুঝিয়েছিলেন, জিজ্ঞেস করেছিলেন নিশ্চয়?

করেছিলাম। কিন্তু খুব গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল, মাথা নেড়ে বলেছিল–আমাদের একজন যে এর ছায়ায় রয়েছে। এটাই খুব খারাপ। ভগবান করুন যেন ছায়াটা আমাদের গ্রাস–করে। বেশ বুঝেছিলাম, সত্যিকারের একটা উপত্যকায় ও থেকে এসেছে এবং তখন ভয়ংকর কিছু ওর ঘটেছে কিন্তু সেটা যে কী, তা জানি না।

কখনো কারো নাম বলেননি?

বলেছে, বছর তিনেক আগে শিকারে বেরিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। জ্বর হয়। প্রলাপ বকত। একটা নাম বার বার আওড়াত। ভয়ে বলত, রেগে বলত। নামটা ম্যাকগিন্টি–বডিমাস্টার ম্যাকগিন্টি। সেরে ওঠার পর জিজ্ঞেস করেছিলাম বডিমাস্টার ম্যাকগিন্টি আবার কে? কার বডির মাস্টার সে? হেসে বলেছিল ও, আমার নয় ভগবান বাঁচিয়েছেন। আর কোনো কথা বার করতে পারিনি পেট থেকে। তবে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি, ভ্যালি অফ ফিয়ারের সঙ্গে বডিমাস্টার ম্যাকগিন্টির সম্পর্ক আছে।

পরে একটা বিষয় জিজ্ঞেস করব, বললেন ইনস্পেকটর ম্যাকডোনাল্ড। মি. ডগলাসের সঙ্গে আপনার প্রথম সাক্ষাৎ হয় লন্ডনের একটা বোর্ডিং হাউসে বিয়ের কথাও হয় সেখানে, তাই না? বিয়ের ব্যাপারে কোনো রোমান্স, গুপ্ত ব্যাপার বা রহস্য কিছু ছিল কি?

রোমান্স ছিল–সবসময়েই রোমান্স ছিল–রহস্য কিছুই ছিল না।

মি, ডগলাসের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী?

না, আর কারো সঙ্গে প্রেম বা বিয়ের ব্যাপার ঘটেনি আমার।

শুনেছেন নিশ্চয়, ওঁর বিয়ের আংটি সরানো হয়েছে। শুনে কিছু মনে হচ্ছে? ধরুন পুরোনো জীবনের কোনো শত্রু খুঁজে খুঁজে ওকে বার করে খুন করেছে, কিন্তু বিয়ের আংটি নিয়ে যাওয়ার কী কারণ থাকতে পারে?

দিব্যি গেলে বলতে পারি পলকের জন্য হাসির একটা হালকা ছায়া ভেসে গেল সুন্দরীর অধরের ওপর দিয়ে!

বললেন, সত্যিই আমি জানি না। খুবই অসাধারণ ব্যাপার।

ইনস্পেকটর বললেন, আর আটকে রাখব না আপনাকে। এ সময়ে এইভাবে কষ্ট দেওয়ার জন্যে দুঃখিত। আরও কিছু বিষয় অবশ্য আছে, কিন্তু সময় এলে তা উত্থাপন করব।

উঠে দাঁড়ালেন রূপসী মহিলা। আবার আমার মনে হয়, ঘরে ঢুকেই যেরকম চকিত জিজ্ঞাসু চাহনি নিয়ে নিরীক্ষণ করেছিলেন আমাদের, ঠিক সেইভাবেই চাইলেন ফের : আমার জবানবন্দি শুনে আমার সম্বন্ধে কী ধারণা করলেন শুনি? প্রশ্নটা মুখে বললেও বুঝি এত স্পষ্ট হত না। পর মুহূর্তেই মাথা হেলিয়ে অভিবাদন করে বেগে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর চিন্তাকুটিল ললাটে বলল ম্যাকডোনাল্ড, ভদ্রমহিলা সুন্দরী। বার্কার লোকটা প্রায় আসত এখানে। ও-রকম চেহারা দেখলে সব মেয়েই মজে যায়। নিজের মুখেই তো বলে গেল, ঈর্ষাকাতর ছিল ডগলাস–ঈর্ষাটা কী নিয়ে তাও ও জানত। তারপর এই বিয়ের আংটি। এইসব তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মড়ার আঙুল থেকে যে আংটি ছিনিয়ে নিয়ে যায় আপনি কী বলেন, মি. হোমস?

দুই করতলে মাথা ড়ুবিয়ে সুগভীর চিন্তায় মগ্ন ছিল বন্ধুবর। এখন উঠে দাঁড়াল, ঘণ্টা বাজাল। খাসচাকর ঘরে ঢুকতেই বললে–অ্যামিস, মি. সিসিল বার্কার এখন কোথায়?

দেখে আসছি, স্যার।

ক্ষণপরেই ফিরে এসে বললে, বাগানে রয়েছেন মি. বার্কার।

অ্যামিস কাল রাতে পড়ার ঘরে ঢুকে মি. বার্কারের পায়ে কী দেখেছিলে মনে আছে?

আছে মি. হোমস। শোবার ঘরের চটি। আমি বুট এনে দিলে সেই পরে পুলিশ ডাকতে যান।

চটিজোড়া এখন কোথায়?

হল ঘরে চেয়ারের নীচে।

বেশ, বেশ। কোন পায়ের ছাপ মি. বার্কারের আর কোনটা বাইরে থেকে এসেছে জানতে হলে চটির খবর নেওয়া দরকার।

ঠিক বলেছেন, স্যার। ওর চটিতে রক্ত লেগেছিল দেখেছি আমার চটিতেও লেগেছে।

তা তো লাগবেই ঘরের যা অবস্থা। ঠিক আছে, অ্যামিস। দরকার হলে ঘণ্টা বাজাব।

মিনিট কয়েক পরে এলাম পড়ার ঘরে। হল ঘর থেকে কার্পেট স্লিপার জোড়া নিয়ে এসেছে হোমস। অ্যামিস ঠিকই দেখেছে, সুখতলায় কালো হয়ে রয়েছে রক্ত।

অদ্ভুত! জানালার সামনে আলোয় দাঁড়িয়ে চুলচেরা চোখে শুকতলা দেখতে দেখতে বললে হোমস। সত্যিই খুব অদ্ভুত!

বেড়ালের মতো একলাফে চটি হাতে রক্তের দাগের সামনে পৌঁছালো বন্ধু এবং মিলিয়ে দেখল গোবরাটের রক্ত-চিহ্নের সাথে। মিলে গেল হুবহু। নিঃশব্দে হাসল সতীর্থদের পানে চেয়ে।

উত্তেজনায় চেহারা পালটে গেল ইনস্পেকটরের। রেলিংয়ে ছড়ি টানলে যেমন কড়মড় আওয়াজ হয়, সেইরকম কড়মড় শব্দে বেরিয়ে এল জন্মগত উচ্চারণ।

কী, আর তো সন্দেহ নেই। জানালায় নিজেই ছাপ রেখে গেছে বার্কার। যেকোনো বুটের ছাপের চেয়ে অনেক চওড়া ছাপ। আপনি বলেছিলেন বটে পা খুব চ্যাটালো–এইবার তো বোঝা গেল। কিন্তু খেলাটা কী মি. হোমস?–এ আবার কী খেলা?

তাই তো বটে! এ আবার কী খেলা? চিন্তা-নিবিড় চোখে পুনরাবৃত্তি করল বন্ধুবর।

কাষ্ঠ হেসে মোটা মোটা হাত কচলে পেশাগত সন্তোষ প্রকাশ করলেন হোয়াইট ম্যাসোন।

বললেন উচ্চকণ্ঠে, বলেছিলাম না এক একটি তুমুল ঝড়! সত্যিই তুমুল ঝড়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *