০৩. বির্লস্টোন ট্র্যাজেডি

বির্লস্টোন ট্র্যাজেডি

পাঠকের অনুমতি নিয়ে কিছুক্ষণের জন্যে এবার আমার অতি-নগণ্য ব্যক্তিত্ব সরিয়ে রাখছি কাহিনির মধ্যে থেকে। আমরা খবর পেয়ে দৌড়েছিলাম অকুস্থল অভিমুখে। কিন্তু তার আগে ঘটনাটা যেভাবে ঘটেছিল হুবহু সেইভাবে বর্ণনা করছি। তাতে পাঠকেরই সুবিধে। অদ্ভুত এই রহস্যে যারা জড়িত তাদের চিনতে পারবেন। কী ধরনের দৃশ্য আর পরিবেশের মধ্যে বিচিত্র এই রহস্য-নাটিকা অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা আঁচ করতে পারবেন।

বির্লস্টোন গ্রামটা সাসেক্স প্রদেশের উত্তর সীমান্তে খুব সেকেলে খানকয়েক কাঠের গুড়ি দিয়ে তৈরি কুঁড়ে নিয়ে গড়ে উঠেছে ছোট্ট গ্রাম। কয়েকশো বছরেও গ্রামটার কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু গত কয়েক বছরের মধ্যে জায়গাটার মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যে আকৃষ্ট হয়ে বেশ কিছু বিত্তবান ব্যক্তি ভিলা বানিয়েছেন চারপাশের জঙ্গলের মধ্যে। স্থানীয় লোকের বিশ্বাস, উত্তর দিকে চকখড়ি উপত্যকার দিকে আস্তে আস্তে পাতলা হয়ে গিয়েছে যে সুবিশাল উইন্ড অরণ্য, জঙ্গল তারই প্রত্যন্ত কিনারা। গায়ে লোক বাড়তেই তাদের চাহিদা মেটাতে ছোটো ছোটো অনেকগুলো দোকানেরও পত্তন ঘটেছে। ফলে, অদূর ভষ্যিতে সুপ্রাচীন গ্রামটি আধুনিক নগরের রূপ নিতে পারে, এমন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সাসেক্স প্রদেশের বেশ খানিকটা অঞ্চলের কেন্দ্রে রয়েছে এই বির্লস্টোন। সবচেয়ে কাছের গুরুত্বপূর্ণ লোকালয় বলতে টানব্রিজ–মাইল দশ বারো পুবে, কেন্টের সীমান্তের ওপারে।

নগর থেকে আধমাইলটাক দূরে প্রকান্ড বীচগাছের জন্যে বিখ্যাত একটা প্রাচীন বাগানে অবস্থিত বির্লস্টোনের সুপ্রাচীন ম্যানর হাউস। সুপ্রাচীন ভবনের কিছু অংশ নির্মিত হয়েছে প্রথম ধর্মযুদ্ধের সময়ে। হিউগো দ্য ক্যাপাসকে বেশ কিছু জায়গা দিয়েছিলেন রেড কিং। জমিদারির মাঝামাঝি জায়গায় একটা খুদে দুর্গ নির্মাণ করেন ক্যাপাস। ১৫৪৩ সালে আগুন লেগে ধ্বংস হয়ে যায় দুর্গা। জ্যাকবের আমলে ধোঁয়ায় কালো কিছু ভিতের পাথর নিয়ে সুপ্রাচীন সামন্ত কেল্লাবাড়ির ধ্বংসস্তুপের ওপর নির্মিত হয় ইটের গ্রাম্য-ভবন। এই হল গিয়ে বির্লস্টোনের ম্যানর হাউস। সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ভবন-নির্মাতা বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেও এখনও বাড়িতে রয়ে গেছে অসংখ্য ঢালু ছাদ দিয়ে ঘেরা তিনকোনা দেওয়াল। অসমকোণী শার্সি বসানো ছোটো ছোটো জানলা। পূর্বসূরি যোদ্ধার জীবনযাপন করেছিলেন। ম্যানর হাউস ঘিরে একজোড়া পরিখা খুঁড়েছিলেন। বর্তমান মালিক বাইরের পরিখার জল–ছেড়ে শুকিয়ে এনেছেন এবং সেখানে পাকশালা-উদ্যানের চাষ হয়েছে। ভেতরের পরিখাটা এখনও আছে। চওড়ায় চল্লিশ ফুট, কিন্তু গভীরতায় মাত্র কয়েক ফুট। পুরো বাড়িটাকে ঘিরে আছে এই পরিখা। ছোট্ট একটা স্রোতস্বিনীর জলে পুষ্ট হওয়ায় পরিখার জল ঘোলা হলেও অস্বাস্থ্যকর নয়, নালার মতোও নয়। স্রোতস্বিনীর জল পরিখার একদিক দিয়ে ঢুকে আরেক দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। একতলার জানলাগুলোর এক ফুট দূরেই পরিখার জল। একটিমাত্র ড্রব্রিজ সেতু দিয়ে যাতায়াত করতে হয় বাড়িতে ওঠানো নামানো যায় এ-সেতু। চরকি-কল আর শেকল বহুদিন আগেই মরচে পড়ে ভেঙে গিয়েছিল। ম্যানর হাউসের বর্তমান বাসিন্দারা প্রাণবন্ত করিতকর্মা ব্যক্তি। চটপট মেরামত করে নেন চরকি-কল আর শেকল। ড্রব্রিজ এখন আগের মতোই যে শুধু ওঠানো যায় তা নয়–প্রতিদিন সন্ধে হলেই সত্যিসত্যিই ওঠানো হয় এবং ভোর হলে নামানো হয়। সেকেলে সামন্ত রাজাদের কায়দায় ম্যানর হাউসকে এইভাবে সুরক্ষিত করার ফলে রাত হলেই এ-বাড়ি এখন একটা জল ঘেরা দ্বীপ হয়ে যায়। ঘটনাটা গুরুত্বপূর্ণ। অচিরেই যে-রহস্য সারা ইংলন্ডের টনক নড়িয়েছে, সে-রহস্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে এই ঘটনার।

বাড়িটায় অনেক বছর কেউ বাস করেনি। নয়ন সুন্দর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হচ্ছিল একটু একটু করে। এই সময়ে বাড়ির দখল নিলেন ডগলাস পরিবার। পরিবারের মানুষ বলতে শুধু দু-জনই, জন ডগলাস এবং তার স্ত্রী। চরিত্র এবং চেহারা উভয় দিক দিয়েই ডগলাস অসাধারণ পুরুষ; বয়স পঞ্চাশের ধারেকাছে, শক্ত চোয়াল, রুক্ষ তেজি অসমান মুখ, ধূসর গোঁফ, অদ্ভুত ধারালো ধূসর চক্ষু এবং মাংসপেশি বহুল বলিষ্ঠ গঠন–যৌবনের শক্তি এবং তৎপরতার কোনো ঘাটতিই নেই সেই শরীরে। আমুদে এবং সবার প্রতি অমায়িক হলেও আচার আচরণ কেমন যেন শিষ্টাচারহীন, দেখে মনে হয় সাসেক্সের গ্রাম্যসমাজের চাইতে দূর নিম্নদিগন্তের সামাজিকতাই এ-জীবনে তিনি বেশি দেখেছেন। কৃষ্টি সংস্কৃতিতে অনেক বেশি উন্নত প্রতিবেশীরা ওঁর প্রতি কৌতূহল আর তুষ্ণীভাব বজায় রাখলেও গ্রামবাসীদের কাছে তিনি দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। গাঁয়ের সব ব্যাপারেই মোটা চাঁদা দিতেন, গানবাজনা ধুমপানের আড্ডায় যোগদান করতেন। কোনো অনুষ্ঠানই বাদ দিতেন না। গলার স্বর ছিল পুরুষের মতো চড়া, আশ্চর্য রকমের সমৃদ্ধ। গলা ছেড়ে চমৎকার গান গেয়ে আসর মাত করতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দেখে শুনে মনে হত দেদার টাকা আছে তার। সে-টাকা নাকি এসেছে ক্যালিফোর্নিয়ার সোনার খনি থেকে। তার নিজের এবং স্ত্রীর কথাবার্তা শুনেও বোঝা যেত জীবনের কিছু অংশ কাটিয়েছেন আমেরিকায়। বদান্যতা আর সবার সঙ্গে সমানভাবে মেশবার ক্ষমতার জন্যে এমনিতেই তার সম্বন্ধে ধারণা ভালো হয়ে গিয়েছিল গাঁ-সুদ্ধ লোকের। এই ধারণা বেড়ে গিয়েছিল তাঁর আর একটি গুণের জন্যে বিপদ-টিপদ একদম পরোয়া করতেন না ভদ্রলোক। ঘোড়া চালাতেন যাচ্ছেতাই, তা সত্ত্বেও সবক-টা ঘোড় দৌড়ে আশ্চর্য রকমের আছাড়-টাছাড় খেয়েও দেখা যেত সব সেরা ঘোড়সওয়ারের সমান সমান যাচ্ছেন। গিঞ্জেয় আগুন লেগেছিল একবার। স্থানীয় দমকল আগুন নেভানো অসম্ভব দেখে হাল ছেড়ে দিলে। কিন্তু অকুতোভয় এই জন ডগলাস জ্বলন্ত বাড়ির মধ্যে ঢুকেছিলেন দামি জিনিসপত্র উদ্ধারের জন্যে। এই ঘটনার পরেই বিশিষ্ট ব্যক্তি হয়ে ওঠেন ভদ্রলোক। এইভাবেই পাঁচ বছরের মধ্যেই বির্লস্টোনে দারুণ খ্যাতি অর্জন করেন ম্যানর হাউসের জন ডগলাস।

স্ত্রীও খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বাড়ি বয়ে লোক আসত অবশ্য খুবই কম। ইংরেজ রীতিই তাই। বহিরাগতের সঙ্গে গায়ে পড়ে আলাপ করে না। কিন্তু যাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তাদের মনের মানুষ হতে পেরেছিলেন ভদ্রমহিলা। গায়ে পড়ে আলাপ না-করলেও অবশ্য কিছু এসে যেত না তাঁর। কেননা স্বামী আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন দিবারাত্র। গেরস্থালির দিকেই নজর থাকত বেশি। স্বভাবটাও সেইরকম। জানা যায়, ভদ্রমহিলা জাতে ইংরেজ। লন্ডনে আলাপ জন ডগলাসের সঙ্গে তখন তিনি বিপত্নীক ছিলেন। খুব সুন্দরী, দীর্ঘাঙ্গী, জল হাওয়ায় গাঢ় রং, কৃশকায়া। স্বামীর চেয়ে বিশ বছরের ছোটো। কিন্তু দাম্পত্য জীবনের পরিতৃপ্তি তাতে বিঘ্নিত হয়নি। যারা একটু বেশি খবর রাখে, তাদের মুখে অবশ্য শোনা যেত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাঁপড়াটা কিন্তু পরিপূর্ণ নয় বলেই মনে হয়। স্বামীর পূর্ব জীবন সম্বন্ধে নাকি একদম কথা বলতে চাইতেন না স্ত্রী অথবা এমনও হতে পারে যে তাঁকে পূর্ব বৃত্তান্ত জানানো হয়নি। কিছু কিছু চোখ-খোলা লোকের মুখে এমন মন্তব্যও শোনা গেছে যে স্বামীর অনুপস্থিতিতে বিশেষ করে স্বামী একটু বেশি রাত করে ফেরার দরুন অস্বস্তিতে ভুগতেন মিসেস ডগলাস লক্ষণ দেখে মনে হত যেন ভয় আর উৎকণ্ঠায় ভুগছেন। শহরতলির নিস্তরঙ্গ জীবনযাত্রায় গুজব জিনিসটা বেশি ছড়ায়–একটুতেই ফিসফাস আরম্ভ হয়ে যায়। ম্যানর হাউসের ভদ্রমহিলার এই দুর্বলতা নিয়েও বিলক্ষণ মন্তব্য করা হয়েছে। পরের পর ঘটনা আরম্ভ হয়ে যাওয়ার পরেই প্রসঙ্গটা বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে এবং জনগণের স্মৃতির তারে বেশি করে ঘা দিয়েছে।

ম্যানর ভবনে মাঝে মাঝে আস্তানা নিতেন আরও এক ব্যক্তি। যে বিচিত্র ঘটনা এখন বিবৃত করা হবে, ইনি সেই ঘটনার মধ্যে হাজির ছিলেন। তাই জনগণের কাছে তিনি রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান। এর নাম সিসিল জেমস বার্কার। নিবাস হ্যামসটিডের হেল্স লজে। ম্যানর হাউসে তিনি হামেশাই আসতেন এবং সাদর অভ্যর্থনা পেতেন। বির্লস্টোনের পথেঘাটে তার দীর্ঘ ঢিলেঢালা আকৃতি দেখেছে অনেকেই। ইংলিশ শহরতলিতে আস্তানা নেওয়ার আগে মি. ডগলাসের অজ্ঞাত অতীত জীবনে তিনিই যে একমাত্র বন্ধু ছিলেন, এমনটিই যেন বেশি করে চোখে পড়েছে স্থানীয় লোকের। বার্কার নিজে কিন্তু নিঃসন্দেহে ইংরেজ। কিন্তু কথাবার্তায় বোঝা গেছে ডগলাসের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় আমেরিকায় এবং সেখানেই ঘনিষ্ঠভাবে থেকেছেন দু-জনে। লক্ষণ দেখে বোঝা গেছে বার্কার রীতিমতো বিত্তবান এবং ডাকসাইটে চিরকুমার। বয়েসের দিক দিয়ে ডগলাসের চেয়ে একটু ছোটোই–বড়োজোর পঁয়তাল্লিশ। মাথায় লম্বা, খাড়া চেহারা, চওড়া বুক, পরিষ্কারভাবে দাড়ি-গোঁফ কামানো, বাজি জেতা লড়াকুর মতো মুখমণ্ডল, পুরু, কড়া, কালো ভুরু এবং কর্তৃত্বব্যঞ্জক এমন একজোড়া কৃষ্ণচক্ষু যার দাপটে শক্তিঠাসা দুই হাতের বল প্রয়োগ ছাড়াই মারমুখো ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তিনি রাখেন। ঘোড়ায় তিনি চড়তেন না, বন্দুকবাজিও করতেন না। প্রাচীন গ্রামের চারধারে মনোরম পরিবেশে বেড়াতেন গাড়ি চড়ে। মুখে থাকত পাইপ, পাশে কখনো ডগলাস নয়তো ডগলাসের অনুপস্থিতিতে তাঁর স্ত্রী। খাস চাকর অ্যামিস বলত, ভদ্রলোেক শান্তিপ্রিয়, মুক্তহস্ত পুরুষ। হইচই একদম ভালোবাসতেন না। তবে রেগে গেলে আর রক্ষে নেই। আমি অন্তত তখন সামনে যাচ্ছি না। ডগলাসের সঙ্গে তার সম্পর্কটা প্রাণের এবং অন্তরঙ্গতার। অন্তরঙ্গ ছিলেন তার স্ত্রী সঙ্গেও এবং এই বন্ধুত্বই নাকি মাঝে মাঝে মেজাজ খিচড়ে দিত জন ডগলাসের লক্ষ করেছে চাকরবাকররা। অনর্থটা ঘটবার সময়ে এহেন ব্যক্তি তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবারের মধ্যে। সুপ্রাচীন ভবনের অন্যান্য বহু অধিবাসীদের মধ্যে দু-জনের নাম করলেই যথেষ্ট। একজন ফিটফাট, মর্যাদাসম্পন্ন, গেরস্থালির কাজে পোক্ত। নাম অ্যামিস। আর একজন গোলগাল, হাসিখুশি মহিলা–মিসেস অ্যালেন–সংসারের অনেক ঝক্তি নিজের হাতে নিয়ে রেহাই দিয়েছিলেন কত্রীঠাকরুনকে। ৬ জানুয়ারি নিশীথরাত্রের ঘটনার সঙ্গে বাড়ির অন্য ছ-জন চাকরের কোনো সম্পর্ক নেই।

দুঃসংবাদটা প্রথম পৌঁছোয় রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে। স্থানীয় থানায় সাসেক্স কন্সট্যাবুলারির সার্জেন্ট উইলসন ডিউটিতে ছিলেন তখন। ভীষণ উত্তেজিত হয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে গিয়ে দরজার ঘণ্টা ধরে সাংঘাতিক জোরে টানাটানি করেছিলেন মিস্টার সিসিল বার্কার। ভয়ংকর ব্যাপার ঘটেছে ম্যানর হাউসে সাংঘাতিক ট্র্যাজেডি। নিহত হয়েছেন মি. জন ডগলাস। নিরুদ্ধ নিশ্বাসে শুধু এই খবরটাই বলে দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন ভদ্রলোক, মিনিট কয়েকের মধ্যেই পেছন পেছন ছুটেছিল পুলিশ-সার্জেন্ট—গুরুতর কিছু একটা ঘটে গেছে এই মর্মে কর্তৃপক্ষকে খবর দিয়ে অকুস্থলে পৌঁছেছিল বারোটার একটু পরেই।

ম্যানর হাউসে পৌঁছে সার্জেন্ট দেখলে ড্রব্রিজ নামানো, জানলাগুলো আলোকিত এবং সারাবাড়ি জুড়ে চলেছে তুমুল হট্টগোল আর বিভ্রান্তি। নীরক্ত-মুখে চাকরবাকররা জড়ো হয়েছে হল ঘরে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে দু-হাত কচলাচ্ছে ভয়ার্ত খাসচাকর। সংযমী স্থিতধী পুরুষ শুধু একজনই–সিসিল বার্কার। সদর দরজার সবচেয়ে কাছে একটা দরজা খুলে ধরে সার্জেন্টকেই ইশারায় ডেকে নিয়ে গেছেন পেছন পেছন। ঠিই সেই সময়ে এসে গেছেন গাঁয়ের সবরকম চিকিৎসায় দক্ষ চটপটে ডাক্তার উড। ভয়ানক কাণ্ডের ঘরটিতে প্রবেশ করেছেন এই তিনজনে–পেছন পেছন ঢুকেছে আতঙ্কে-নীল খাসচাকর এবং দরজা বন্ধ করে দিয়েছে যাতে অন্য চাকররা বীভৎস সেই দৃশ্য দেখতে না-পায়।

ঘরের ঠিক মাঝখানে হাত পা ছড়িয়ে চিৎপাত হয়ে শুয়ে মৃত ব্যক্তি। রাত্রিবাসের ওপর গোলাপি ড্রেসিং-গাউন। নগ্ন পায়ে কার্পেট স্লিপার। পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন ডাক্তার। টেবিলের ওপর থেকে হ্যান্ড ল্যাম্প নিয়ে ধরলেন মুখের ওপর। এক নজরেই বুঝলেন তার আর থাকার দরকার নেই। তিনি রোগ তাড়ান, মৃত্যুকে নয়। বীভৎসভাবে জখম করা হয়েছে জন ডগলাসকে। বুকের ওপর ন্যস্ত একটি অদ্ভুত অস্ত্র একটা শটগান কিন্তু নলটা ট্রিগারের ফুটখানেক তফাতে করাত দিয়ে কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, হাতিয়ারটা সোজা তার মুখের ওপরেই ছোড়া হয়েছে–মাথাটা টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। ট্রিগার দুটো তার দিয়ে বাঁধা–যাতে একসাথে দুটো কার্তুজই আরও ধ্বংসাত্মক হতে পারে।

ঘাবড়ে গিয়েছিল গাঁয়ের পুলিশ ভদ্রলোক। অকস্মাৎ এহেন সাংঘাতিক দায়িত্ব কাঁধে পড়ায় বিচলিতও হয়েছিল।

বীভৎস মাথাটার দিকে আতঙ্ক-বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে চাপা গলায় শুধু বলেছিলওপরওলা না-আসা পর্যন্ত কেউ কিছু ছোঁবে না।

সিসিল বার্কার বলেছিলেন, এখনও কেউ কিছুতে হাত দেয়নি। সে-জবাব আমি দেব। ঠিক যেভাবে আপনি দেখেছেন, আমিও দেখেছি সেইভাবে!

নোটবই বার করে সার্জেন্ট জিজ্ঞেস করেছিল, কখন দেখেছিলেন?

কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে এগারোটার সময়ে। তখনও ধড়াচুড়ো ছাড়িনি, শোবার ঘরে আগুনের ধারে বসেছিলাম, এমন সময়ে শুনলাম, বন্দুকের আওয়াজ। খুব জোর আওয়াজ নয়–চেপে দেওয়া আওয়াজ। দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। বড়োজোর তিরিশ সেকেন্ড লেগেছে এ-ঘরে পৌঁছোতে।

দরজা খোলা দেখেছিলেন?

হ্যাঁ, খোলাই ছিল। যেভাবে এখন দেখছেন, ডগলাস বেচারা পড়েছিল ঠিক ওইভাবে। টেবিলের ওপর জ্বলছিল ওর শোবার ঘরের মোমবাতি। মিনিট কয়েক পরে ল্যাম্পটা আমিই জ্বালাই।

কাউকে দেখেননি?

না। পায়ের আওয়াজে বুঝলাম মিসেস ডগলাস আমার পেছন পেছন দৌড়ে নেমে আসছেন। তাই তক্ষুনি ছুটে বেরিয়ে গিয়ে পথ আটকালাম ওঁর ভয়ংকর এই দৃশ্য যাতে দেখতে না-পান। হাউসকিপার মিসেস অ্যালেন এসে সরিয়ে নিয়ে গেলেন ওঁকে। ততক্ষণে অ্যামিস এসে গেছে। ওকে নিয়ে ফের ছুটে ঢুকলাম ঘরে।

কিন্তু আমি যে শুনেছি সারারাত ড্রব্রিজ ভোলা থাকে?

তাই থাকে। তোলাও ছিল। আমি গিয়ে নামাই।

তাহলে খুনি পালায় কেমন করে? সে-প্রশ্নই ওঠে না। মি. ডগলাস নিশ্চয় নিজেই নিজেকে গুলি করেছেন।

আমিও প্রথমে তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু এই দেখুন, বলে পর্দা টেনে সরালেন বার্কার–দেখা গেল অসমকোণী হীরক-সদৃশ শার্সি বসানো লম্বা জানলা দু-হাত করে খোলা। এদিকে দেখুন! ল্যাম্পটা নামিয়ে ধরলেন গোবরাটের ওপর। এক ধ্যাবড়া রক্ত লেগে সেখানে। ঠিক যেন বুট জুতোর সুখতলার ছাপ। গোবরাট মাড়িয়ে বাইরে গেছে কেউ। দেখলেন তো গোবরাটে পা দিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল ঘর থেকে বেরোনোর জন্যে।

তাহলে কি বলতে চান কাদা ঠেলে পরিখা পেরিয়েছে হত্যাকারী?

ঠিক তাই বলতে চাই।

তার মানে খুনের আধ মিনিটের মধ্যে আপনি যখন এ-ঘরে, সে তখন পরিখায় ?

কোনো সন্দেহই নেই তাতে। সেই মুহূর্তে জানালার সামনে দৌড়োনো উচিত ছিল আমার। কিন্তু পর্দা টানা ছিল বলে জানলা খোলা বুঝতে পারিনি। সম্ভাবনাটা মাথাতেও আসেনি। তারপরেই মিসেস ডগলাসের পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম। বেরিয়ে গেলাম যাতে ঘরে ঢুকে না-পড়েন, বীভৎস এ-দৃশ্য সইতে পারতেন না।

বীভৎস তো বটেই। খণ্ডবিখণ্ড মাথা ঘিরে ভয়ংকর চিহ্নগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন ডাক্তার। বির্লস্টোন রেল অ্যাক্সিডেন্টের পর এ-রকমভাবে জখম হতে কাউকে দেখিনি।

খোলা জানলার-রহস্য থেকে মন্থর গ্রাম্যবুদ্ধিকে তখনও সরিয়ে আনতে পারেনি পুলিশ সার্জেন্ট। বললে, পরিখার কাদা ঠেলে পালিয়েছে বলছেন। বলে তো দিলেন। কিন্তু ব্রিজ যখন ভোলা ছিল তখন ভেতরে এল কী করে?

প্রশ্ন তো সেইটাই, বললেন বার্কার।

ক-টার সময়ে ভোলা হয়েছিল ব্রিজ?

ছ-টার সময়ে জবাব দিলে খাসচাকর আমিস।

আমি তো শুনেছি সূর্য যখন অস্ত যায়, ব্রিজ তখন ভোলা হয়। বছরের এ সময়ে সূর্য অস্ত যায় সাড়ে চারটে নাগাদ ছ-টায় নয়।

অ্যামিস বললে, মিসেস ডগলাস চায়ের মজলিশে বসেছিলেন অতিথিদের নিয়ে। ওঁরা–যাওয়া পর্যন্ত ব্রিজ ভোলা যায়নি। তারপর আমি নিজে গিয়ে তুলে দিয়েছিলাম।

সার্জেন্ট বললে, তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এই বাইরে থেকে কেউ যদি এসেই থাকে, তাদের আসতে হয়েছে ব্রিজ ভোলার আগেই ছ-টার আগে এসে লুকিয়ে ছিল কোথাও, মি. ডগলাস এগারোটা নাগাদ ঘরে ঢুকতেই চড়াও হয়েছে তাঁর ওপর।

ঠিক বলছেন। শুতে যাওয়ার আগে প্রতিদিন রাতে সারাবাড়ি টহল দিয়ে মি. ডগলাস দেখেন আলোগুলো ঠিক আছে কিনা। এ-ঘরেও এসেছিলেন সেই কারণে। ওত পেতে ছিল লোকটা ঘরে ঢুকতেই সটান গুলি করেছে মুখের ওপর। তারপর বন্দুক ফেলে বেরিয়ে গেছে জানলা দিয়ে। এভাবে ছাড়া আর কোনোভাবে সাজানো যায় না ঘটনাগুলো।

মৃত ব্যক্তির পাশে মেঝের ওপর একটা কার্ড পড়েছিল, তুলে নিল সার্জেন্ট। বদখত ধ্যাবড়াভাবে কালি দিয়ে কার্ডে লেখা একটা নামের আদ্যাক্ষর-V. V., এবং তলায় লেখা একটা সংখ্যা—৩৪১।

এটা কী? শুধোয় কার্ডটা তুলে ধরে।

কৌতূহলে উন্মুখ হয়ে কার্ডের দিকে তাকান বার্কার।

বললে, আগে লক্ষ করিনি। খুনি নিশ্চয় ফেলে রেখে গেছে।

  1. V. 341.–মানে বুঝলাম না।

মোটা মোটা আঙুলে কার্ডখানা নাড়াচাড়া করতে থাকে সার্জেন্ট।

  1. V. মানে কী? নিশ্চয় কারো নামের প্রথম অক্ষর। ড. উড, কী দেখছেন?

আগুনের চুল্লির ধারে কম্বলের ওপর পড়ে একটা হাতুড়ি বেশ বড়োসড়ো, কারিগরের হাতের হাতুড়ি। ম্যান্টেলপিসের ওপর একটা বাক্স দেখালেন সিসিল বার্কার বাক্সের মধ্যে তামার মাথাওলা অনেকগুলো পেরেক।

বললেন, কাল রাতে ছবি এদিক-ওদিক করছিলেন মি. ডগলাস। নিজেই চেয়ারে দাঁড়িয়ে বড়ো ছবিটা দেয়ালে টাঙাচ্ছিলেন। আমি দেখেছি। হাতুড়ি পড়ে আছে সেইজন্যেই।

হতবুদ্ধি সার্জেন্ট মাথা চুলকে বললে, যেখানকার হাতুড়ি সেখানেই রেখে দেওয়া ভালো। এ-রহস্যের শেষ দেখতে হলে দেখছি পুলিশ ফোর্সের সেরা ব্রেনের দরকার হবে। লন্ডনের লোক আনা দরকার। হাত-লক্ষ তুলে ধরে আস্তে আস্তে ঘরময় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল উত্তেজিত স্বরে, আরে! আরে! একী ? পর্দা সরানো হয়েছিল ক-টার সময়ে বলুন তো?

লক্ষ যখন জ্বালানো হয়েছিল তখন। চারটের একটু পরেই। বললে খাসচাকর।

নিশ্চয় কেউ লুকিয়ে ছিল এখানে। লম্ফটা নীচু করে ধরল সার্জেন্ট, কাদা-মাখা জুতোর চাপ স্পষ্ট দেখা গেল ঘরের কোণে। মি. বার্কার, আপনার অনুমানই ঠিক হল দেখছি। পর্দা সরানো হয়েছিল চারটের সময়ে, ব্রিজ ভোলা হয়েছে ছ-টার সময়ে লোকটা বাড়িতে ঢুকেছে চারটের পর কিন্তু ছ-টার আগে। এই ঘরটাই প্রথম চোখে পড়ছে বলে ঢুকে পড়েছিল। এই কোণ ছাড়া লুকোনোর জায়গা নেই বলে লুকিয়েছিল এইখানেই। এইতো বেশ পরিষ্কার হয়ে গেল ব্যাপারটা। এসেছিল চুরিচামারি করতে, মি. ডগলাস হঠাৎ তাকে দেখে ফেলেছিলেন–তাই তাকে খুন করে পালিয়েছে।

বার্কার বললেন, আমারও মনে তাই হয়েছে বটে। কিন্তু খামোখা সময় নষ্ট করছি কেন বলতে পারেন? এখানে দাঁড়িয়ে না-থেকে বেরিয়ে পড়লে কাজ দিত–দেশ ছেড়ে লম্বা দেওয়ার আগেই তাকে ধরা যেত।

প্রস্তাবটা মাথার মধ্যে নাড়াচাড়া করে সার্জেন্ট।

বলে, সকাল ছ-টার আগে আর ট্রেন নেই। কাজেই রেলপথে সে পালাতে পারবে না। ট্যাঙস ট্যাঙস করে রাস্তা ধরে যদি হাঁটতে শুরু করে, রক্তের ফোটা পড়বে রাস্তার লোকের চোখে পড়বে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই অন্য অফিসার না-আসা পর্যন্ত যেতে পারছি না আমি। আপনারা কেউ যাবেন না।

লম্ফর আলোয় লাশ পরীক্ষা করলেন ডাক্তার।

বললেন, এ-দাগটা কীসের? খুনের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি?

ড্রেসিং গাউনের ডান হাতা থেকে ঠেলে বেরিয়ে এসেছিল মৃত ব্যক্তির হাত–অনাবৃত হয়ে গিয়েছিল কনুই পর্যন্ত। বাহুর মাঝমাঝি জায়গায় একটা অদ্ভুত বাদামি নকশা বৃত্তের মাঝে একটা ত্রিভুজ জ্বলজ্বল করছে শুয়োরের চর্বি রঙের চামড়ার ওপর।

চশমার মধ্যে দিয়ে চোখ পাকিয়ে দেখতে দেখতে ডাক্তার বললেন, উল্কি নয়। এ-রকম উল্কি জীবনে দেখিনি। গোরুছাগলকে যেমন দাগানো হয়, একে দাগানো হয়েছিল কোনো এক সময়ে। মানেটা কী?

সিসিল বাকার বললেন–মানেটা আমারও জানা নেই। তবে গত দশ বছর এ-দাগ ডগলাসের হাতে আমি দেখেছি।

আমিও দেখেছি, বললে খাসচাকর। আস্তিন গুটোলেই চোখে পড়েছে, মানে বুঝিনি।

সার্জেন্ট বললে, তাহলে খুনের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। ব্যাপারটা কিন্তু যাচ্ছেতাই! এ-কেসের সব কিছুই যাচ্ছেতাই। আবার কী হল?

সবিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠে মৃতব্যক্তির ছড়ানো হাতের দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে খাসচাকর।

বললে দম আটকানো স্বরে, বিয়ের আংটিটা নিয়ে গেছে।

কী!

হ্যাঁ, হ্যাঁ, বিয়ের আংটি উধাও হয়েছে! বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলে পরতেন সাদাসিদে গড়নের সোনার আংটিটা। বিয়ের আংটি। এই দেখুন সোনার গুটি, এই দেখুন সাপ, নেই বিয়ের আংটি।

বলেছে ঠিক, বললেন বার্কার।

সার্জেন্ট বললেন, তাহলে বলছেন বিয়ের আংটি তলায় ছিল?

সবসময়েই তাই থাকে!

তাহলে খুনি যেই হোক না কেন, আগে খুলেছে গুটিপাকানো সাপ আংটি, তারপরে বিয়ের আংটি, শেষকালে সাপ আংটি ফের পরিয়ে দিয়েছে আঙুলে!

ঠিক তাই।

মাথা নাড়তে থাকে সুবিবেচক গ্রাম্য পুলিশ।

বলে, দেখছি যত তাড়াতাড়ি লন্ডনে খবর পাঠানো যায় ততই মঙ্গল। হোয়াইট ম্যাসোন তুখোড় লোক। স্থানীয় কোনো সমস্যাই তাঁর কাছে সমস্যা নয়। এখুনি এসে যাবেন তিনি। কিন্তু রহস্যভেদ করতে গেলে আমার তো মনে হয় লন্ডনের দ্বারস্থ হতে হবে। তবে হ্যাঁ, স্বীকার করতে লজ্জা নেই, এই ধরনের গোলমেলে কেসে আমার মাথা তেমন খোলে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *