৪. তারা-মাছ – স্নায়ুমণ্ডলী

চতুর্থ শাখার প্রাণী

এ-পর্য্যন্ত যে-সব প্রাণীদের কথা বলা হইল, তাহাদের মধ্যে প্রথম প্রাণীদের শরীরে এক একটি করিয়া কোষ থাকে ইহা তোমরা শুনিয়াছ। ইহার পরে যে-সকল প্রাণীদের কথা বলিয়াছি, তাহারা অনেক কোষ দিয়া শরীর নির্ম্মাণ করে, ইহাদের জীবনের কথা তোমরা শুনিয়াছ। এই দুই শাখার প্রাণীর উদর বা পাকযন্ত্র নাই, জলের ভিতরে শেওলার গায়ে ইহারা জড়ের মত বাস করে। কাছে যদি খাদ্য আসে, তবে সর্ব্বশরীর দিয়া তাহার সার অংশ চুষিয়া খায়। ইহাদের চোখ, কান, নাক কিছুই নাই, কাজেই কিছু দেখিতে বা শুনিতে পায় না। কিন্তু তৃতীয় শাখার প্রাণীরা এই রকম জড়ের মত বাস করে না। তাহাদের দেহে অনেক কোষ। আমাদের দেহের কতক কোষ একত্র হইয়া যেমন শরীরের জায়গায় জায়গায় চোখ, কান, নাক ইত্যাদি তৈয়ার করে, তৃতীয় শাখার প্রাণীদের শরীরের কোষ সেই রকমে ভাগ ভাগ হইয়া কেহ শুঁয়ো, কেহ পাকযন্ত্র গড়িয়া তোলে, আবার কতকগুলি মিলিয়া সন্তান উৎপাদনের জন্য ডিমও নির্ম্মাণ করে। ইহাও তোমরা শুনিয়াছ।

এই সকল কথা যদি তোমরা একটু ভাবিয়া দেখ, তাহা হইলে প্রাণীরা কেমন ধাপে ধাপে উন্নতির দিকে চলিয়াছে তাহা বেশ বুঝিতে পারিবে। আমরা চতুর্থ শাখার যে দুই-একটি প্রাণীর পরিচয় দিব, তোমরা তাহাদের দেহের আরো উন্নতির কথা শুনিবে। কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয়, এই প্রাণীদের প্রায় সকলেই সমুদ্রে থাকে। আমাদের দেশে সমুদ্র নাই, কাজেই তাহাদিগকে খোঁজ করিয়া লইয়া তোমরা পরীক্ষা করিবার সুবিধা পাইবে না। যাহারা সমুদ্রের ধারে বাস করে, এই সকল প্রাণী তাহারা সর্ব্বদাই দেখিতে পায় এবং দেখিয়া শুনিয়া পরীক্ষা করিতে পারে।

তারা-মাছ

চতুর্থ শাখার প্রাণীদের মধ্যে তারা-মাছই প্রধান। আমি জ্যান্ত তারা মাছ কখনো চোখে দেখি নাই, তোমরাও হয় ত দেখ নাই। ইহারা সমুদ্রের জলে বাস করে। মান্দ্রাজের উপকূলে ইহাদের সন্ধান পাওয়া যায়। আটলান্টিক্ মহাসাগরের ঠাণ্ডা জলেই কিন্তু তারা-মাছ অনেক থাকে। এই প্রাণীদের বাংলায় কোনো নাম নাই। ইংরাজিতে Star Fish বলে, তাই আমরা ইহাদিগকে তারা-মাছ বলিলাম।

তারা-মাছের মুখ আছে, পেট আছে, নিশ্বাস টানিয়া লইবার যন্ত্র আছে, পা দিয়া চলিয়া যাইবার শক্তি আছে, আবার বাহির হইতে কোনো আঘাত পাইলে তাহা বুঝিয়া নড়াচড়া করিবার ক্ষমতাও আছে। ইহারা নিতান্ত ছোটো প্রাণী নয়। তাহা হইলে দেখিতেছ, কুকুর, বিড়াল, মানুষ প্রভৃতি জন্তুরা দেহের নানা অংশ দিয়া যেমন জীবনের নানা কাজ করে, ইহারাও কতকটা সেই রকমেই জীবন কাটায়। কিন্তু তথাপি ইহারা বড় বড় জন্তুদের চেয়ে অনেক নিকৃষ্ট। যে-সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থাকিলে প্রাণীরা খুব উন্নত হয়, তাহারি একটু একটু আভাস ইহাদের শরীরে পাওয়া যায় মাত্র।

এখানে একটি তারা-মাছের ছবি দিলাম। আকাশের নক্ষত্র হইতে যেমন আলোর রেখা বাহির হয়, ইহার শরীর হইতে সেই রকম হাতের মত পাঁচটি অংশ বাহির হইয়াছে। শরীরের আকৃতি কতকটা তারার মত। এই জন্যই ইহাদিগকে তারা-মাছ বলা হয়। ইহারা সমুদ্রের তলে, সমুদ্রের অল্প জলে, পাথরের গায়ে বা পাথরের ফাটালে লুকাইয়া বাস করে। শরীরটা এক-কোষ প্রাণীদের মত নয়, ইহাতে মাংস এবং হাড়ের মত শক্ত চূণো পাথর দুইই আছে। চূণো পাথরগুলি শরীরের মধ্যে মাংস দিয়া ঢাকা থাকে। কিন্তু সেগুলি পরস্পর জোড়া থাকে না, কাজেই ইহারা যেমন ইচ্ছা সাপের মত শরীরটা নোয়াইতে পারে; একটুও আড়ষ্ট ভাব নাই। তা ছাড়া গায়ের উপরে সজারুর কাঁটার মত অনেক কাঁটাও লাগানো থাকে; শত্রুরা এই কাঁটার ভয়ে কাছে ঘেঁষিতে পারে না। শুঁয়ো পোকারা যেমন অনেক ছোট ছোট পায়ের মত অংশ দিয়া চলিয়া বেড়ায়, ইহারাও সেই রকমে চলে। কিন্তু ইহাদের পা দেহের নীচে লুকানো থাকে, চলিবার সময় সেগুলিকে বাহির করিয়া ইহারা চলাফেরা করে।

অনেক প্রাণীরই মুখ শরীরের উপরের দিকে বা পাশে থাকে। কিন্তু তারা-মাছের মুখ একবারে দেহের তলায় দেখা যায়। ছোট মাছ, গুগ্‌লি বা শামুক কাছে পাইলে ইহারা সেই ছোট পা বাহির করিয়া অতি ধীরে ধীরে শিকারের কাছে যায় এবং তাহাকে শরীরের তলায় ফেলিয়া তাহার সার ভাগ চুষিয়া লয়। খাওয়া শেষ হইলে দেখা যায়, শিকারের হাড়গোড় খোলা সব পড়িয়া আছে, কিন্তু শরীরের সারবস্তুটা নাই।

যখন তারা-মাছ বড় বড় শামুক বা সমুদ্রের শঙ্খ শিকার করে তখন ইহাদের ছোট মুখের ভিতরে ঐ রকম বড় শিকারের জায়গা হয় না। এই অবস্থায় তারা-মাছ যা করে তাহা বড় মজার। ইহাদের পাঁচটা হাতের ভিতরে পাক-যন্ত্রের পাঁচটা থলি থাকে। বড় শিকারের গায়ের উপরে উঠিয়া ইহারা সেই পাঁচটা হাত হইতে থলি বাহির করে এবং সেইগুলি দিয়া শিকারকে জড়াইয়া ধরে। শিকারের দেহে যে সারবস্তু থাকে, তারা মাছেরা শিকারকে না গিলিয়াই এই রকমে হজম করিয়া ফেলে।

যাহার পাঁচটা অঙ্গে পাকযন্ত্রের থলি সে জানোয়ার কি রকম ভয়ানক একবার ভাবিয়া দেখ। ইহাদের এই রকম পাকযন্ত্রের উৎপাতে সমুদ্রের শামুক ঝিনুকের দল সর্ব্বদাই ভয়ে ভয়ে থাকে।

আগে যে ছবি দেওয়া হইয়াছে, তাহা তারা-মাছের উপর পিঠের চিত্র। এই পিঠে মুখ থাকে না। প্রত্যেক হাতে শিকড়ের মত যে শুঁয়ো বাহির হইয়াছে, ঐ গুলি ইহার গায়ের কাঁটা। তার পরে, দুইখানি হাতের মাঝামাঝি যে কালো দাগটি দেখিতেছ তাহা জল-প্রবেশের পথ। তোমাদের বাগানের গাছে জল দিবার বোমার নলে যেমন ঝাঁঝরি লাগানো থাকে, তারা-মাছের দেহে জল-প্রবেশের পথে সেই রকম ঝাঁঝরি আছে। এই ব্যবস্থায় জলের কাটাকুটা শরীরে প্রবেশ করিতে পারে না।

তারা-মাছ কি রকমে তাহার পা নড়াইয়া চলাফেরা করে, এখন তাহার কথা বলিব। ইহারা যে উপায়ে চলিয়া বেড়ায়, তাহা অন্য কোনো প্রাণীতে দেখা যায় না, এই জন্যই তাহার কথা বলিতেছি। ইহাদের সকলি অদ্ভুত।

রবারের সরু নল যদি ভালো করিয়া গুটানো যায়, তবে তুমি তাহা হাতের মুঠার মধ্যে বা বাক্সের মধ্যে অনায়াসে রাখিতে পার। কিন্তু সেই নল যখন জলে ভর্ত্তি করা যায়, তখন তাহাকে আর মুঠার মধ্যে রাখা যায় না,—তখন নল ফুলিয়া খাড়া হইয়া উঠে। তারা মাছদের সেই ছোট পা গুলি এক একটা খুব সরু নলের মত জিনিস, সেগুলির আগাগোড়াই ফাঁপা। কিন্তু নলের দুই মুখই বন্ধ থাকে না; ইহার যে দিক্‌টা গায়ে লাগানো থাকে, সেটা খোলাই থাকে এবং অন্য মুখটা একেবারে বন্ধ দেখা যায়।

এখানে তারা-মাছের আর একটা ছবি দিলাম। ইহা দেখিলে তাহার হাত ও মুখের চারিদিকের অবস্থান জানিতে পারিবে। ছবির ঝাঁঝরিওয়ালা অংশটা জলপ্রবেশের পথ। তার পরে, মাছের কাঁটার মত আর যে সব অংশ দেখিতেছ,—সেগুলি সত্যই কাঁটা নয়,—জলের নল। কলিকাতা বা ঢাকার মত বড় সহরের মাটীর তলা যেমন নর্দ্দমা ও জলের নলে আচ্ছন্ন থাকে,—তারা মাছের সর্ব্ব শরীর সেই রকম নলে নলে ঢাকা আছে। ছবির দুই পাশে চিরুণীর দাঁতের মত অংশগুলি তারা-মাছের পা। আগেই বলিয়াছি এগুলি ফাঁপা নল, কেবল বাহিরের মুখটা বন্ধ। ঝাঁঝরি-ওয়ালা পথ দিয়া জল দেহে প্রবেশ করে এবং তার পরে ঐ সকল নল দিয়া তাহা শরীরে চলাফেরা করে। কাজেই বাহিরের জল যখন ঝাঁঝরি দিয়া আসিয়া ঘুরিয়া ফিরিয়া পায়ের নলে পৌঁছে, তখন পা খাড়া হইয়া উঠে এবং যখন জল না আসে, তখন উহা গুটানো অবস্থায় থাকে।

প্রত্যেক পায়ের গোড়ায় এক একটি গাঁটের মত যে অংশ দেখিতে পাইতেছ, সেগুলি জলের থলি। তারা-মাছ ঐ সকল থলিতে জল জমাইয়া রাখে এবং যখন এক জায়গা হইতে অন্য জায়গায় যাইবার দরকার হয়, তখন জল টানিয়া পায়ের নল খাড়া করে এবং চলিতে আরম্ভ করে। এই রকমে চলিয়া বেড়াইবার উপায়, আর কোনো প্রাণীর শরীরে দেখা যায় না।

অক্সিজেন বাষ্প দেহে না লইলে প্রাণীরা বাঁচে না। জলে যে বাতাস মিশানো থাকে, তাহাতে অনেক অক্সিজেন বাষ্প থাকে—ইহা তোমরা আগেই শুনিয়াছ। শরীরের নলের ভিতর দিয়া যে জল যাওয়া-আসা করে, তারা-মাছেরা তাহা হইতে অক্সিজেন্ বাষ্প চুষিয়া লইয়া জীবিত থাকে। গোরু, ভেড়া, মানুষ প্রভৃতি প্রাণীরা বাহিরের বাতাস নাক দিয়া দেহের মধ্যে টানিয়া লয় এবং শেষে শরীরের ভিতরকার ফুস্‌ফুস্ সেই বাতাসের অক্সিজেন শুষিয়া লয়। মাছ ও কাঁকড়াদের নাক বা ফুস্‌ফুস্ নাই; কান্‌কো দিয়া ইহারা ফুস্‌ফুসের কাজ চালায়। ইহারা কান্‌কো দিয়াই জলে-মিশানো বাতাসের অক্সিজেন টানিয়া লয়। তারা-মাছদের দেহের উপরে কান্‌কোর মত কতকগুলি অংশ আছে, ইহারা কখনো কখনো সেই পথেও অক্সিজেন টানিয়া লইতে পারে।

আমরা এ-পর্য্যন্ত যে-সকল প্রাণীর কথা বলিয়াছি, তাহাদের মধ্যে কোনোটিরই স্ত্রী-পুরুষ ভেদ দেখা যায় নাই। কিন্তু তারা-মাছদের কতক স্ত্রী এবং কতক পুরুষ হইয়া জন্মে। স্ত্রী-মাছের প্রত্যেক হাতের গোড়ায় ডিম রাখিবার জায়গা আছে। সেখানে ডিম জন্মিয়া বড় হইলে, তাহা হইতে ছোটো ছোটো তারা-মাছ বাহির হয়।

মানুষ, বানর, শিয়াল, কুকুর প্রভৃতি বড় জন্তুদের যদি হাত, পা বা অপর কোনো অঙ্গ নষ্ট হইয়া যায়, তবে তাহার জায়গায় আর নূতন অঙ্গ গজায় না। আমাদের চুল বা নখ কাটা পড়িলে, সেইগুলিকেই কেবল নূতন করিয়া গজাইতে দেখা যায়। কিন্তু খুব নিকৃষ্ট প্রাণীর কোনো বিশেষ অঙ্গ নষ্ট হইলে, শূন্য স্থানে আপনা হইতেই নূতন অঙ্গ উৎপন্ন হয়। কোনো রকম আঘাত পাইলে টিকটিকির লেজ খসিয়া। যায়—ইহা তোমরা দেখ নাই কি? কিন্তু একবার লেজ খসিলে টিক্‌টিকি চিরদিনই লাঙ্গুলহীন থাকে না। কিছুদিনের মধ্যেই তাহার নূতন লেজ গজাইতে আরম্ভ করে। তারা-মাছেও ঠিক্ তাহাই দেখা যায়। কোনো রকমে যদি ইহাদের একটা হাত নষ্ট হইয়া যায়, তাহা হইলে কয়েক দিনের মধ্যেই শূন্য জায়গায় আবার নূতন হাত গজাইয়া উঠে। কেবল ইহাই নয়,—তোমরা যদি একটি তারা-মাছকে ধরিয়া তাহার শরীরের কিছু অংশের সহিত একখানা হাত কাটিয়া সমুদ্রের জলে ফেলিয়া দাও, তবে তাহার সেই হাত হইতে একটি নূতন তারা-মাছের সৃষ্টি দেখিবে। ইহাদের যেন মৃত্যু নাই!

যাহা হউক, আমরা তারা-মাছের যে অল্প পরিচয় দিলাম তাহা হইতে তোমরা বোধ হয় বুঝিতে পারিয়াছ,—ইহারা খুব নীচু শাখার প্রাণীদের চেয়ে অনেক উন্নত। ইহাদের শরীরে পাকযন্ত্র, ডিম্বাশয়, শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র ইত্যাদির এক-একটু চিহ্ন আছে। প্রাণীদের রক্তে সাদা এবং লাল, এই দুই রকমের কণিকা ভাসিয়া বেড়ায়। রক্তের লাল-কণিকাগুলির দ্বারাই তাহার রঙ্ লাল হয়। তারা-মাছদের শরীরেও রক্ত আছে, কিন্তু তাহাতে লাল-কণিকা নাই। এইজন্য ইহাদের রক্ত সাদা। যখন ছোট পা-গুলি বাহির করিয়া ইহারা সমস্ত শরীর দোলাইয়া চলিতে আরম্ভ করে, তখন চলার আন্দোলনে সেই সাদা রক্ত সমস্ত শরীরের ভিতরে চালাফেরা আরম্ভ করে। শরীরের সকল জায়গায় রক্ত চলাবার জন্য বড় বড় প্রাণীদের দেহে হৃদ্‌যন্ত্র আছে। তোমরা যেমন পিচ্‌কারি দিয়া রঙ্ ছিটাও, বড় প্রাণীদের দেহের হৃদ্‌পিণ্ড সেই প্রকারে শরীরের শিরা-উপশিরা দিয়া সর্ব্বাঙ্গে রক্ত চালাইয়া থাকে। কিন্তু তারা-মাছদের দেহে হৃদ্‌পিণ্ড পাওয়া যায় নাই।

স্নায়ুমণ্ডলী

প্রাণীদের মৃতদেহ কাটিয়া পরীক্ষা করিলে, তাহার সকল অংশে খুব সরু সূতার জালের মত একটি জিনিষ দেখা যায়। বড় বড় প্রাণীদেরও শরীর এই সূতার জালে আচ্ছন্ন থাকে। এই জালকে স্নায়ুমণ্ডলী বলে। চোখ দিয়া আমরা দেখি, কান দিয়া আমরা শুনি, নাক দিয়া আমরা গন্ধ পাই, জিভ দিয়া স্বাদ পাই, গায়ে চিম্‌টি কাটিলে বেদনা পাই—এই সকল বোধ স্নায়ুমণ্ডলীই উৎপন্ন করে। বড় প্রাণীদের মাথার ভিতরে যে মগজ অর্থাৎ মস্তিষ্ক আছে, শরীরের সকল স্নায়ুই সেই মস্তিষ্কের সঙ্গে যুক্ত থাকে। শরীরের কোনো অংশে কোনো রকমে আঘাত লাগিলে সেই আঘাতের উত্তেজনা স্নায়ুর সূতা বহিয়া মস্তিষ্কে পৌঁছে এবং ইহাতে সেই আঘাত প্রাণীরা বুঝিতে পারে।

মনে কর, তোমার পায়ের এক জায়গায় আস্তে চিম্‌টি কাটা গেল এবং ইহাতে একটু বেদনা বোধ করিলে। কি রকমে এই বেদনার সৃষ্টি হইল, তাহা খোঁজ করিলে দেখা যায়—চিম্‌টির আঘাত পাইলেই আহত জায়গার স্নায়ুগুলি উত্তেজিত হইয়া উঠে এবং আঘাতের উত্তেজনাটা মস্তিষ্কে বহিয়া লইয়া যায়। তার পরে মস্তিষ্কই তোমাকে চিম্‌টির বেদনা জানাইয়া দেয়। কেবল চিম্‌টির বেদনা বহন করা স্নায়ুর কাজ নয়। ভালো রসগোল্লা খাইলে তোমরা যে সুস্বাদ পাও, নাকের কাছে ফুল বা অপর জিনিস রাখিলে যে গন্ধ পাও, গায়ে হাত বুলাইলে যে আরাম পাও, ছেলেরা চীৎকার করিলে যে শব্দ শুনিতে পাও,—তাহাদের প্রত্যেকটি স্নায়ুই তোমাদের জানাইয়া দেয়। স্নায়ুর সূতাগুলি যেন টেলিগ্রাফের তার। এগুলি ঠিক টেলিগ্রাফের তারের মতই শরীরের এক জায়গার খবর আর এক জায়গায় বহিয়া লইয়া যায়। তার ছিঁড়িলে টেলিগ্রাফের খবর চলে না, সেই রকম স্নায়ুমণ্ডলী কোনো প্রকারে খারাপ হইয়া গেলে, মস্তিষ্কে খবর যায় না। পা চাপিয়া অনেকক্ষণ এক জায়গায় বসিয়া থাকিলে, পায়ে ঝিঁ ঝিঁ ধরে। তখন পা-খানা যেন অসাড় হইয়া পড়ে, পায়ে জোরে চিম্‌টি কাটিলে ব্যথা লাগে না; পায়ে হাত বুলাইয়া দিলেও সাড়া পাওয়া যায় না। পায়ের স্নায়ু কিছুকালের জন্য বিগ্‌ড়াইয়া যায় বলিয়াই এই সকল ব্যাপার হয়। এই অবস্থায় পায়ের স্নায়ু চিম্‌টির উত্তেজনা বা হাতের স্পর্শ মস্তিষ্কে বহিয়া আনিতে পারে না; কাজেই তখন আমরা চিম্‌টীর বেদনা বা হাতের স্পর্শ জানিতে পারি না। পক্ষাঘাত প্রভৃতি অনেক রোগে শরীরের স্নায়ু বিগ্‌ড়াইয়া যায়, তখন গায়ে হাত দিলে বা চিম্‌টি কাটিলে রোগীর কিছুই বুঝিতে পারে না।

কেবল এইগুলিই যে স্নায়ুর কাজ তাহা নয়। তোমার স্মৃতিশক্তি, তোমার স্নেহভক্তি দয়ামমতা, সকলি স্নায়ুমণ্ডলী তোমার মনে জাগাইয়া রাখে। তুমি কোনো খারাপ লোককে দেখিলে যে ঘৃণা কর, ভালো কথা শুনিলে যে আনন্দ পাও, অন্ধকারে সাপ বা বিছে দেখিলে যে ভয় পাও,—তাহাও স্নায়ুর কাজ।

মনে কর, তোমার মুখের উপরে একটী মাছি বসিয়া মনের আনন্দে একবার নাকের ডগায়, একবার ওষ্ঠের উপরে এবং একবার চোখের পাতায় বেড়াইতেছে। এই অবস্থায় তুমি কি হাত গুটাইয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে পার? কখনই পার না। তোমার হাত আপনা হইতে মাছির কাছে যায় এবং তুমি হাত দিয়া তাহাকে তাড়াইয়া দাও। ইহাও স্নায়ুর আর এক রকম কাজ। মাছির উৎপাতের খবর, মুখের স্নায়ুজাল মস্তিষ্কে বহিয়া লইয়া যায়। তার পরে মস্তিষ্ক সেই খবর আর এক রকম স্নায়ু দিয়া হাতের পেশীর উপরে চালান করে। হাতের পেশী মস্তিষ্কের হুকুম অমান্য করিতে পারে না; কাজেই সব কাজ ফেলিয়া সে মাছি তাড়াইতে আরম্ভ করে।

কোনো দুর্গন্ধ পাইলে তোমরা নাকে কাপড় দাও। এখানেও স্নায়ুর কাজ দেখিতে পাওয়া যায়। খারাপ গন্ধ প্রথমে নাকের স্নায়ু উত্তেজিত করে এবং স্নায়ু সেই উত্তেজনা মস্তিষ্কে বহিয়া লইয়া যায়। কিন্তু মস্তিস্ক এই খবর পাইয়া নিশ্চিন্ত থাকিতে পারে না; সে নাকে কাপড় গুঁজিবার জন্য নিকটের এক প্রকার স্নায়ুকে হুকুম করে। এই হুকুম হাতের মাংসপেশীতে পৌঁছিলে, তুমি নাকে কাপড় গুঁজিতে আরম্ভ কর। মজার গল্প শুনিলে আমরা হাসিয়া গড়াগড়ি দিই; হাতে আগুন ঠেকিলে হাতখানা সরাইয়া লই। আমাদের এই রকম সকল কাজই শরীরের দুই রকম স্নায়ু এবং মস্তিষ্কের সাহায্যে চলে।

যাহা হউক স্নায়ুসম্বন্ধে আমরা এ-পর্য্যন্ত যে-সকল কথা বলিলাম, তাহা হইতে বোধ হয় তোমরা বুঝিতে পারিতেছ,—স্নায়ুই প্রাণীকে সজাগ ও বুদ্ধিমান্ করে। আমিবা, স্পঞ্জ্ বা প্রবাল-প্রাণীর দেহে স্নায়ু নাই, এইজন্য, তাহারা জড়ের মত পড়িয়া থাকে; যদি খাবার কাছে আসে তবেই খায়, নচেৎ ক্ষুধায় মরিয়া যায়। গায়ের কোনো অংশ কাটিয়া ফেলিলেও তাহারা সাড়া দেয় না। কিন্তু যে তারা-মাছদের কথা বলিয়াছি, তাহারা এই-রকম নয়। ইহাদের গায়ের চামড়ার নীচে অল্প পরিমাণে স্নায়ু দেখা যায়; তাই বড় বড় প্রাণীর মত ইহারা চলা-ফেরা করিতে পারে এবং নিজের বিপদ-আপদ বুঝিতে পারে।

তারা-মাছদের মত আরো কয়েক জাতির প্রাণী চতুর্থ শাখায় আছে। ইহাদের মধ্যে কাহারো দেহ গোলাকার, তাহা খোলা ও কাঁটা দিয়া ঢাকা থাকে, কেছ লম্বা দেহ লইয়া গুঁড়ি মারিয়া জলের তলায় চলে। ইহাদের সকলেরি শরীরের কাজ তারা-মাছদের মতই দেখা যায়। কিন্তু সমুদ্রের তলায় খোঁজ না করিলে এই সকল প্রাণীর সন্ধান মেলে না। তোমাদের মধ্যে হয় ত অনেকেই সমুদ্র দেখ নাই, কাজের এই সকল প্রাণীর কোনো কথা তোমাদিগকে বলিব না। যদি কখনো কলিকাতায় যাদুঘর দেখিতে যাও, তাহা হইলে সেখানে বোতলের ভিতরে তারা-মাছ এবং এই শাখার অন্য প্রাণীদিগের আকৃতি দেখিতে পাইবে। সেখানে এই রকম আরো অনেক মরা-প্রাণীর দেহ বোতলের ভিতরে আারক দিয়া রাখা হইয়াছে এবং বোতলের পাশে সেই সকল প্রাণীর ভালো ছবিও আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *