৪. খাওয়া নিয়ে দুর্বলতা

।।।।

খাওয়া নিয়ে আমার একটা দুর্বলতা আছে। ফলাও করে সেটা বলি। এবার কিন্তু নিজেকে সংযত করছি। খেতে খেতে যে আলোচনাটা হল সেটাই বলি।

সুরেশবাবুর স্মৃতি সুবীরবাবুর কাছে এখন অস্পষ্ট। এটুকু ওঁর মনে আছে বাবা একদিন স্কুলে পড়াতে গিয়ে আর ফেরেননি। মা খুব কান্নাকাটি করছিলেন। আত্মীয়স্বজন বিশেষ কেউ ছিল না, যাঁরা ছিলেন তাঁরাও খুব গরীব। মা একেবারে অথই জলে পড়লেন। তখন সুরেশবাবুর দুই বন্ধু অজয়কাকা আর কনককাকা এগিয়ে এলেন। কনককাকার মেয়েই হল অঞ্জনা। অজয়কাকা বিয়ে করেননি। তিনিই সংসারের হাল ধরলেন। পরে অজয়কাকাকেই মা বিয়ে করেন।

সুবীরকে তিনি অ্যাডপ্ট করেন-সুবীরের পদবী মিত্র থেকে দাস হয়। অঞ্জনা সুবীরের থেকে বছর তিনেকের ছোটো। জগদীশনারায়ণ আর সুরেশবাবুর মৃত্যুর সময় ওঁর বয়স ছিল মাত্র চার বছর। সুতরাং এ ব্যাপারে ওঁর নিজস্ব কোনো স্মৃতি নেই, মা-বাবার কাছে। যেটুকু শুনেছেন। তবে অঞ্জনা বললেন, “কানাইকাকার কাছে কিছু খবর পাওয়া যাবে। ওঁর মেমারি খুব ভালো, উনি সুরেশকাকাকেও চিনতেন। তবে সন্ধ্যের আগে ওঁকে পাওয়া যাবে না। এখনও কলকাতায় নিয়মিত ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেন।”

“আর কে এ ব্যাপারে বলতে পারেন?”

“মা এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু মা’র আজকাল কিছু মনে থাকে না,” অঞ্জনা বলল।

“আপনার বাবা কী করতেন ম্যাডাম?”

“বাবার লরির ব্যবসা ছিল।”

আমি মনে মনে হিসেব করছিলাম, বেঁচে থাকলে অঞ্জনা বা সুবীরবাবুর বাবাদের বয়স কারোরই ষাটের বেশি হওয়ার কথা নয়। সুবীরবাবুর বয়স যদি তিরিশও ধরি, আর উনি যখন জন্মান তখন যদি ওঁর বাবার বয়স হয় তিরিশ, তাহলে এখন ষাট দাঁড়াত। যাই হোক পঞ্চান্ন বা ষাট পঁয়ষট্টি-কোনওটাই আজকের দিনে খুব একটা বেশি বয়স নয়।

“আপনারা কি খাওয়া-দাওয়ার পরে একটু ঘুমিয়ে নিতে চান?”

ওঁরা নিজেরা বোধহয় ঘুমোন, তাই এই প্রশ্ন। আমাদের প্ল্যান আগে থেকেই ঠিক করা ছিল-দুপুরে জগদীশনারায়ণের বাড়িটা দেখতে যাব। সেটা জানাতে সুবীরবাবু বলতেন,

“তাহলে ঠিক আছে, নইলে আপনাদের বিছানাটা রেখাকে এখনই করে দিতে বলতাম।”

রেখা নিশ্চয়ই ওদের কাজের মেয়েটির নাম।

“আপনাদের এখানে মশা কীরকম?” প্রমথ প্রশ্ন করল।

“এবার অত বেশি হয়নি। এমনিতে বিকেলের আগে দরজা-জানলা বন্ধ করে রাখলে ঘরে ঢুকতে পারে না। তারপর রাত্রে জানলা খুলে দিন, তখন বাবাজিরা আর আসবে না। তবু মশারি ব্যবহার করবেন। রেখাই বিছানা করার সময়ে টাঙিয়ে দেবে।”

.

কথাটা শোনা মাত্র একেনবাবু উচ্ছ্বসিত হয়ে প্রমথকে বললেন, “দেখুন স্যার, সমস্যার কেমন সমাধান হয়ে গেল।”

“কীসের সমস্যা?” সুবীরবাবু একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন।

“আমরা স্যার আসার সময়ে আলোচনা করছিলাম, আপনার এখানে মশারি থাকবে কি না।”

“কেন থাকবে না, প্রত্যেকটা গেস্টরুমেই মশারি আছে।”

“আমার মশারির দরকার নেই,” আমি বললাম। “আমি কোলকাতায় মশারি ছাড়াই শুই।“

“এখানে শোবেন না, এ অঞ্চলে ম্যালিগন্যান্ট ম্যালরিয়াটা একটু বেশি।”

“তাই নাকি?”

“হ্যাঁ, অঞ্জনার বাবা ওতেই মারা গেলেন গত বছর। উনিও মশারির ধার ধারতেন না।”

একটা মৃত্যুর উত্তর জানা গেল। ভাবলাম সুবীরবাবুকে জিজ্ঞেস করি, ওঁর পালক পিতার মৃত্যু কী করে হল। নিজেকে সংযত করলাম।

খেয়েদেয়ে আমরা তিনজন বেরিয়ে পড়লাম। সুবীরবাবু ডিরেকশন দিয়ে দিয়েছিলেন। বড় রাস্তা ধরে আরও এক কিলোমিটার এগোলে একটা ছোটো কালভার্ট পাওয়া যাবে। তার ঠিক আগে যে রাস্তাটা বাঁ দিকে গেছে, সেটা দিয়ে আধকিলোমিটার গেলেই জগদীশনারায়ণের বাড়ি। মাত্র দেড় কিলোমিটার পথ। তাও গাড়ি নিয়েই গেলাম। সেখান থেকে আশেপাশে একটু ঘুরে বেড়ানো যাবে।

জগদীশনারায়ণের বাড়ি দীর্ঘকাল সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ। দেয়াল থেকে ইট খসে পড়েছে। কাঠের জানলার বেশির ভাগই অদৃশ্য হয়েছে। সামনের মাঠে অন্তত হাফ ডজন গরু চরে বেড়াচ্ছে। কয়েকটা লোক বারান্দায় বসে বিড়ি খাচ্ছে আর তাস খেলছে। আমাদের গাড়ি থেকে নামতে দেখে সবাই সচকিত। খাকি প্যান্ট পরা বুড়ো মতো একটা লোক উঠে এসে জিজ্ঞেস করল, আমাদের কী চাই।

“পেছনের বাগানটা দেখাশোনা করে কে?” প্রমথ প্রশ্ন করল।

“আমি করি বাবু।”

“ওটা দেখব।”

“আপনারা?”

“আমরা অফিস থেকে আসছি।”

এত কনফিডেন্টলি প্রমথ কথাটা বলল, লোকটা আর দ্বিতীয় প্রশ্ন করল না। বাড়ির ভেতর দিয়ে নিয়ে গিয়ে পেছনের ভাঙ্গা দরজা খুলে যেখানে নিয়ে এল-তার সামনেই একটা বিশাল পুকুর। সেই পুকুরের দুপাশে অনেকগুলো বড় বড় গাছ, আর গাছের ফাঁকে ফাঁকে বেশ কিছু ফুলের বেড। গাছগুলো একটু দূরে দূরে বলে ফুলগাছগুলোতে আলোর অভাব হয় না, থোকা থোকা অজস্র ফুল ফুটে আছে। পুকুরের উলটো পারে একটা ভাঙ্গা ছোটো বাড়ি। সেটাই নিশ্চয়ই সার্ভেন্টস কোয়ার্টার যেখানে সুরেশবাবুর বডি পাওয়া গিয়েছিল।

আমরা পুকুরটা ডানদিকে রেখে বাগানের মধ্যে দিয়ে এগোলাম। হঠাৎ একেনবাবু বলে উঠলেন, “অ্যামেজিং স্যার।”

“কী অ্যামেজিং?”

“এই গাছটা দেখুন একদিকের ফুলগুলো সব লাল, আর অন্যদিকে শুধু বেগুনি।”

সত্যিই ইন্টারেস্টিং! “দু’রকম রঙের ফুল একই গাছে দেখেছি,” আমি বললাম। “কিন্তু সেগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। এরকম কখনও দেখিনি।”

প্রমথ বিজ্ঞের মতো বলল, “এটা এমন কী ব্যাপার –একটা গাছে অন্যরকমের গাছ। গ্র্যাফটিং করা হয়েছে।”

“তুই কী করে জানলি?”

“তোর অন্য কোনো এক্সপ্লানেশন আছে?”

সোজাভাবে উত্তর দেওয়া প্রমথর ধাতে নেই।

আমি আর প্রমথ সার্ভেন্টস কোয়ার্টারের দিকে এগোচ্ছি দেখে বুড়ো লোকটা বলল, “ওদিকে যাবেন না বাবু, ওখানে অনেক সাপ আছে।”

আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম। হয়তো চোখের ভুল, কিন্তু মনে হল আমাদের একটু সামনেই সাপের মতো কিছু একটা কিলবিল করে চলে গেল। আমরা সার্ভেন্টস কোয়ার্টার থেকে

বড়জোর দশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে আছি। এই দিকটায় জঙ্গল সাফ করা হয় না। বড় বড় ঘাস আর আগাছায় ভর্তি।

সার্ভেন্টস কোয়ার্টারটা দেখতে যাচ্ছিলাম নিতান্তই কৌতূহলবশে। এত বছর বাদে ওখানে কিছু আবিষ্কৃত হবে-সে আশা ছিল না। একেনবাবুর মনে হল সার্ভেন্টস কোয়ার্টার দেখার চেয়ে বাগান দেখতেই উৎসাহ বেশি। এদিক যাচ্ছেন, ওদিক যাচ্ছেন-মাঝে মাঝে বুড়ো লোকটাকে গাছ নিয়ে প্রশ্ন করছেন। লোকটা গাছের বিষয়ে বিশেষ কিছু জানে না, ওর কাজ বুঝলাম শুধু জায়গাটা পাহারা দেওয়া।

সকালে আর বিকেলে দুটো মালী আসে। তখন দরকার মতো তাদের একটু আধটু সাহায্য করে। খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর প্রমথ একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করল, “কী মশাই, আর কিছু দেখবেন?”

একেনবাবু একটু অন্যমনস্কভাবে বললেন, “না স্যার, অনেক তো দেখা হল।”

আমরা গাড়ির দিকে যখন এগোচ্ছি, তখন বুড়ো লোকটা বলল, “স্যার, বড়বাবু কবে আসবেন?”

কে বড়বাবু আমাদের কোনো ধারণাই নেই। কিন্তু প্রমথ জিজ্ঞেস করল, “কেন?”

“গোবর সার ফুরিয়ে গেছে, মালীরা ক’দিন ধরে বলছে।”

“এটা আমাকে বলছ কেন, অফিসে গিয়ে খবর দিও।”

“হ্যাঁ, বাবু।”

গাড়িতে উঠে আমি প্রমথকে বললাম, “ভালোই ম্যানেজ করেছিস।”

“কাউকে তো করতে হবে-তোরা দু’জন তো মুখ বুজে বসেছিলি। এই যে গোয়েন্দামশাই, কিছু বুঝলেন?”

“কীসের কথা বলছেন স্যার?”

“কীসের কথা মানে? গোয়েন্দা তো আপনি! এত দূর ঠেঙিয়ে বাপির পেট্রল ধ্বংস করে –এটাই আপনার উত্তর?”

“আসলে স্যার, আমি একটু কনফিউজড।”

“কনফিউজড? কেন, একটা গাছে দু’রকমের ফুল দেখে?” প্রমথর গলায় ঠাট্টার সুর।

“সেটাও একটা কারণ স্যার। আমি বুড়ো দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করছিলাম। ও বলল, বহুদিন ধরে সবাই ভেবেছিল ওটা লালফুলের গাছ। হঠাৎ একদিন দেখে বেগুনি ফুলে গাছটা ভরে গেছে। ওরা স্যার আপনার গ্র্যাফটিং-এর ব্যাপারটা ঠিক বোঝে না। বলল, রাজাসাহেব বেগুনি ফুল ভালোবাসতেন, উনিই ওটা ফুটিয়েছেন।”

“ননসেন্স!” প্রমথ বলল। “দেশটা কুসংস্কারে ভর্তি!”

“প্রমথর কথা বাদ দিন, আপনার কনিফিউশানের অন্য কারণটা কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“আসলে স্যার, আমি ভাবছিলাম এই সুরেশবাবুকে বেঁধে রাখার ব্যাপারটা। কেন গজলালের লোকরা সুরেশবাবুকে বেঁধে রাখল-খুন না করে?”

“এতে কনফিউজড হবার কী আছে? আমার কাছে তো ব্যাপারটা ক্রিস্টাল ক্লিয়ার,” প্রমথ বলল।

“কী ক্রিস্টাল ক্লিয়ার?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“গজলাল আর তার সাঙ্গপাঙ্গ পিস্তল উঁচিয়ে সুরেশবাবুর কাছে সিন্দুকের চাবি চায়। সুরেশবাবু ভয়ে পেয়ে ওদের চাবি দেন। কিন্তু সেটা ঠিক চাবি না ভুল চাবি-সেটা গজলালের জানার কোনো উপায় ছিল না। ওঁকে বেঁধে রেখে জগদীশনারায়ণকে খুন করে গজলাল আর ওর সঙ্গীরা সিন্দুক খোলে। সিন্দুকটা যদি না খুলত, তাহলে আসল চাবির জন্যে আবার সুরেশবাবুর উপর হামলা চালানো যেত, কিন্তু সুরেশবাবুকে খুন করলে, সেটা সম্ভব হতো না।”

“তা বুঝলাম স্যার, কিন্তু সুরেশবাবুকে যদি পুলিশ খুঁজে পেত, তাহলে তো গজল সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ত।”

“ওদের সবার মুখই ঢাকা ছিল, কাজের লোকদের কেউ গজলালকে চিনতে পারেনি। সুরেশবাবু কী করে শিওর হবেন।”

“দ্যাট দ্য পাজল স্যার। সুরেশবাবু গজলালকে চিনতে পেরেছিলেন আর সাংকেতিক ভাবে ওঁর নামটা লিখেছিলেন।”

“সাংকেতিক ভাবে কেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। “আমার মনে হয় দুটো কারণে। সুরেশবাবুর হাত পেছনে বাঁধা ছিল।

ওই অবস্থায় অক্ষর লেখা খুবই কঠিন। একটা পাথর কুচি বা ধারালো কিছু কাছাকাছি পেয়েছিলেন, তাই দিয়ে দেয়ালে সংখ্যা লিখেছিলেন।”

“কী সংখ্যা?”

একেনবাবু পকেট থেকে একটা কাগজের টুকরো আমায় দিলেন। “এটা ফটো থেকে কপি করা।”

দেখলাম সেখানে লেখা আছে:

এটা ফটো থেকে কপি করা

“এর অর্থ কী?”

“উনি পেছনে হাত দিয়ে সংখ্যাগুলো লিখেছিলেন বলে উলটো দেখাচ্ছে। এভাবে পড়ুন স্যার,” একেনবাবু কাগজটা উলটো করে ধরলেন।

7 1 10 1 12 1 12
NA

“7 1 10 1 12 1 12 ……… তা তো বুঝলাম, কিন্তু অর্থটা কী?”

“এগুলো স্যার ইংরেজি ABCD র পজিশন। A হল ‘1’, B হল ‘2’, এইভাবে চললে G হল ‘7’, J হবে ‘10’, আর L হবে ‘12’। অর্থাৎ যেটা লিখেছেন, সেটা হবে GAJALAL।”

“মাই গড!”

“সাংকেতিক ভাবে লেখার আরেকটা কারণও হয়তো ছিল স্যার।”

“আর কী কারণ?” প্রমথ আর আমি দু’জনেই প্রায় একই সঙ্গে প্রশ্নটা করলাম।

“যদি গজলাল ও তার গুণ্ডার দল ফিরে এসে ওকে খুন করে, তাহলে ওরা যাতে না বোঝে যে, উনি গজলের নাম দেয়ালে লিখে যাচ্ছেন।”

“দ্যাটস ক্লেভার অফ হিম।” প্রমথ বলল।

“তবে একটা জিনিস একটু আনক্লিয়ার।”

“কী সেটা?”

“এগুলোর শেষে উনি কী লিখতে চেয়েছিলেন?”

NA বা ওইরকম কিছু একটা….কিন্তু সেটা কী?”

“আপনার কী মনে হয়, এর কোনো একটা অর্থ আছে?”

“সেটাই ভাবছি স্যার।”

প্রমথ লেখাটার দিকে তাকিয়ে বলল, আমার মনে হয় উনি NA লিখতে চেয়েছিলেন, A–এর পেটটা বেশি কাটা হয়ে গেছে।”

“কিন্তু তার অর্থ কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“NA মানে Numbered_Alphabet অর্থাৎ অ্যালফাবেটের নম্বর, প্রমথ বিজ্ঞের মতো বলল। “পুলিশের জন্যে একটা ক্লু।”

“ননসেন্স। এটা কোনো কথা হয় নাকি!”

“তোর কোনো বেটার এক্সপ্লানেশন আছে?”