১.১
মি’লেডি, হারানো স্বদেশভূমির স্মৃতিযাপনের মতো বিলাসিতা আর কিছুতে নেই। এই উপলব্ধিটা বাপ্পার হয়েছিল খুব ছোটোবেলায়, অনাবিল আলোয় ভরা রবিবারগুলোয়, ওদের ২৩/৩ কলুটোলা লেনের বাসা যখন গুষ্টিসুখের হৈহল্লায় ভরে উঠত। তার আগে রথীন সাপ্তাহিক বাজার সেরে ফিরেছে, সোফায় বসে সকাল থেকে চার কি পাঁচ বারের মতো চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে দি সানডে স্টেটসম্যান-এর পাতা দিয়ে নিজেকে ঘিরে একটা কেল্লা বানিয়ে নিয়েছে। কেল্লার ভেতর থেকে ধোঁয়া উঠছে, মেঝেয় ছড়ানো খেলনা আর আঁকার খাতাপেন্সিল নিয়ে বসে বাপ্পা দেখছে। শিউলি রান্নাঘরে, রেডিওয় রোববারের গীতমালা। বেতের টিপয়ে কালো টেলিফোনটা বেজে উঠতেই কাগজের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসবে একটা হাত, আঙুলের ফাঁকে সিগারেট। পরক্ষণেই কাগজের যবনিকা সরে যাবে, উদ্ভাসিত রথীনের মুখ
‘চিনি!’ রথীন বলে উঠবে। মুখে হাসি, কানে রিসিভার। বাপ্পাও মেঝের খেলা ছেড়ে সোফার হাতলে উঠে রিসিভারের উলটোদিকে কান পাতবে। চিনির কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে যেন হাইড্রান্টের ভেতর থেকে শিলচর বিমানবন্দরে পাবলিক বুথ থেকে ফোন করছে।
‘ঘন্টা দুয়েকে এসে পড়ছি রথিদা, সবাইকে খবর দে! বড়দা, বুলু, মিঠু, বৌদি… সব্বাইকে তোর ওখানে ডাক আজ দুপুরবেলা!’
‘সে আর বলতে!’ রথীনের গলায় উত্তেজনা। ‘কিচ্ছু ভাবিস না, তুই দমদমে নামার আগেই সকলে জড়ো হয়ে যাবে!’
‘সঙ্গে কী নিয়ে আসছি বল দিকি রথিদা?’
‘কী?’
টেলিফোনের ওপ্রান্তে রথীনের খুড়তুতো ভাই চিনির গলা কলকল করে উঠবে যেন হাইড্র্যান্ট-ফাসা জলের ভেতর থেকে—‘দু কিলো কাঁচা সিদল, চার মাসের মাতানো, গোটা বরাক ভ্যালি চষে ফেলেও এই জিনিস মেলে না!’
‘দুউউউ কিলো? কী ক’স! দু কিলো সিদলে কলকাতা শহরে গোটা সিলেটি গুষ্টিকে ভোজ খাওয়ানো যাবে!’
লাইনের দুপ্রান্তে অট্টহাসিতে রিসিভারের বেকেলাইট তেতে উঠবে, কানে সেটা মালুম হবে ছোট্ট বাপ্পার।
যে সময়ের কথা, তখন চিনি শিলং থেকে ব্যবসার কাজে নিয়মিত কলকাতায় যাওয়া-আসা করে। সেই উপলক্ষে জমে ওঠে শহরে ও শহরতলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রথীনের বিভিন্ন তুতো ভাইবোনেদের মোচ্ছব। বাপ্পাদের ২৩/৩ কলুটোলা লেনের দেশলাই বাক্সের আকারের বাসাটা ভরে ওঠে আট-দশজন মানুষের হইচই গানবাজনায়, সুখাদ্যের সুঘ্রাণে। শিলচর থেকে কলকাতায় ওদের হারানো স্বদেশভূমির আর্দ্র সবুজ উপত্যকার ওপর দিয়ে চিনির উড়ে আসতে যতক্ষণ লাগে, ততক্ষণে রথীন এক প্রস্থ ফোনাফোনি সেরেছে, রান্নাঘরে ভাঁড়ার দেখে নিয়ে আরেকবার বৈঠকখানা এমনকি এন্টালি বাজারেও ঘুরে এসেছে, একে একে এসে পড়ছে নিকট- দূরসম্পর্কীয় ভাইবোনেদের গুষ্টি। ওরা সকলে জন্মেছে, বড়ো হয়েছে সুরমা নদীর ধারে একই শহরের একই পাড়ায়। দেশভাগ যখন সিলেটকে আসাম থেকে খুবলে নিল, ওরা শহর ছাড়ে। সাইক্লোনের ধাক্কায় কাঠের পালতোলা জাহাজের মতো পরিবারটা ভেঙে খানখান হয়ে যায়, টুকরোগুলো ভেসে ছড়িয়ে যায় বিভিন্ন দিকে। এতকাল পরে, এক অনাবিল আলোয় ভরা রবিবার, কলকাতা শহরে এঁদোগলির ভেতর দোতলায় ঘুপচি বাসায় সেই জাহাজটাকে ফের জোড়া লাগানোর প্রস্তুতি চলছে এক আশ্চর্য আঠা দিয়ে, যার নাম কাঁচা সিদল, যা কলকাতার কোনো বাজারে পাওয়া যায় না।
সবার আগে এসে পড়বে বাপ্পার খোকাজেঠু, চিনির বড়দা, এবং তার স্ত্রী রুপু, যাকে বাপ্পা মোমবুচান বলে ডাকে। নীচের গলি থেকে শোনা যায় তার গলা।
‘রথি! অ্যাই রথি! কোই গেলি রে? এখনও ঘুম দিচ্ছিস নাকি? ওঠ! ওঠ! নেমে এসে ধর এগুলা!’
সদর দরজায় কলিং বেলের সুইচ থাকতেও মোমবুচান কোনোদিন সেটা বাজাবে না, এবং কেউ নীচে নেমে আসার অপেক্ষা না করেই দুহাতে ভর্তি বাঁশের চ্যাঙারি আর শালপাতায় মোড়া শিঙাড়া জিলিপি ইত্যাদি সুখাদ্যের পসরা নিয়ে তার দশাসই দেহটি সরু সিঁড়ি দিয়ে টানতে টানতে দোতলায় উঠে আসবে, আর দরজায় রথীনকে পেয়ে দম নিতে নিতে বলবে—‘কোই গ্যাল আমাদের সাতগাঁর ডলপুতুল? কোই লুকিয়ে রেখেছিস অরে?’
সাতগাঁর ডলপুতুল, অর্থাৎ কি না শিউলি, দ্রুত পায়ে এসে হাত থেকে খাবারের বোঝা নিতে গেলে রুপু বিপুল বাহুদুটো বাড়িয়ে বুকে টেনে নিয়ে বলে উঠবে, ‘অরে আমার মিষ্টিসোনা ডলপুতুলরে!’ এবং পরক্ষণেই, এদিক ওদিক তাকিয়ে—‘ডিমপোনাটা গ্যাল কোই?’
ডিমপোনা, অর্থাৎ কি না বাপ্পা, তখন ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে। মেদভারা দেহটা মোচড় দিয়ে ঘুরে ওকে আবিষ্কার করেই—‘ওমা, পোনা কেমন লকলকাচ্ছে দ্যাখো!’ বলে কোলে তুলে নিয়ে দুগালে চকাস চকাস করে চুমো দেবে।
মোমবুচানের বুকের হিমবাহ থেকে কান্ডা সেন্টের বাস্প আর গোপাল জর্দার গন্ধ বাপ্পার গালে লেগে থাকত সারাটা দিন।
বিপুল দেহভার নিয়েও সদাপ্রাণোচ্ছল, সুন্দরী, আমুদে রুপুর খয়েররঞ্জিত ঠোঁট, গালে গোলাপি রুজের প্রলেপ, খোপায় গোঁজা নকল চুলের বল, বলে গোঁজা রুপোর ঘন্টি দেওয়া হেয়ারক্লিপ ও অন্যান্য রূপসজ্জা নিয়ে সাজগোজের ধরনটা ছিল তার নিজের কৈশোরে দেখা সিনেমার নায়িকাদের মতো। চুলের ঘন্টি বাজিয়ে সাতগাঁর পুতুল ও তার ডিমপোনাকে স্নেহবর্ষণ সেরে সে এরপর ফিরত রথীনের দিকে। চিবুকে চিমটি কেটে, চুমু খেয়ে, কানের লতি কামড়ে পানের রসে লাল করে দিয়ে, সিলেটি ভাষায় আদুরে বুলি আউড়ে খুড়তুতো দেওরটির ওপর নিজের অধিকার কায়েম করত।
অনেককাল পরে সেইসব দৃশ্যের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাপ্পার মনে হয়েছে, মোমবুচান বোধহয় ওর বাবাকে দেখত তার নিজের না-হওয়া সন্তানের চোখে, যদিও দুজনের বয়সের ফারাক বছর দশ-বারোর বেশি ছিল না। এদিকে ওর মুখে সিলেটি আদরের বুলি শুনে ইতিমধ্যে উপস্থিত ভাইবোনেরা হেসে কুটিপাটি। সে ভাষার বিন্দুবিসর্গ বুঝত না বাপ্পা ও তার মা শিউলি, কারণ ওই ক্বচিৎ রবিবারগুলো ছাড়া ওদের সিলেটি বুলি শোনার কোনো উপায় ছিল না। রথীন ঘরে বাইরে সর্বত্র নিখাদ কলকাতার বাংলা বলত। তবে রুপুর নাটুকেপনা দেখে না হেসে উপায় ছিল না ওদেরও।
ওদিকে তার স্বামীটি তখনও নীচে, গলিতে, রিকশাওয়ালার সঙ্গে প্রবল দরকষাকষি করছেন। খোকাজেঠুর মাথাজোড়া টাক, চওড়া মটনচপ জুলফি, দেহভার স্ত্রীর সঙ্গে মানানসই। অথচ ট্রাম রাস্তা থেকে গলির ভেতর ওইটুকু পথ আসার জন্য সর্বদাই ওরা বেছে নিত সবচেয়ে ক্ষীণদেহী টানা-রিকশাওয়ালাটিকে। সে বেচারি চালক ও আরোহীদের মাধ্যাকর্ষণজনিত অসাম্য হেতু ভাড়ার ওপর কিছু বখশিস চেয়ে সওয়াল করলে খোকাজেঠুর উচ্চকিত কন্ঠস্বরে কেঁপে উঠত গলির বাতাস। দোতলা থেকেও স্পষ্ট শোনা যেত।
‘জুঠ মৎ বোলো কেনোকি তুমরা রিকশ একদুম ফটিচর, অউর যব হামি বোলা কি কলুটোলা লেনকো অন্দর হামকো গিরাই দেও, গিরাই দেও, তুমি হামকো দুনিয়া ঘুমাইকে ছোড়! কেইসা সোচ কি হামি মুর্খ ছই, কি মেরো পইসা সস্তা ছই?’
হুবহু এই কথাগুলো হয়তো নয়, তবে এরকমই এক বিচিত্র জগাখিচুড়ি ভাষা –যার নাম হাফলং হিন্দি–আসামের কাছাড় হিলস-এ চালু বুলি। হিন্দি, ইংরিজি, উর্দু, বাংলা, অসমিয়া, নেপালি, মণিপুরী ও পাঞ্জাবি ভাষার এক মিশ্র পিজিন, যার মধ্যে ওই অঞ্চলের বিভিন্ন পাহাড়ি জনজাতি, অর্থাৎ জেমে, দিমাসা, কুকি, বিয়াতে, রংকোল ও জয়ন্তিয়ার থেকেও কিছু কিছু শব্দ ঢুকে রয়েছে। ছড়ির ভেতর লুকোনো গুপ্তির মতো বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে ভাষার এই অস্ত্রটি টেনে বের করত খোকা, চিনির বড়দা। এবং কাজ হতো অব্যর্থ। ওই বিচিত্র বুলি শুনে পথচারীরা দাঁড়িয়ে পড়ত, আর মুণ্ডিতকেশ বিহারিটি কাঁধের গামছা টেনে অসহায় ঘর্মাক্ত মুখমণ্ডল মুছে ভাড়ার পয়সা ট্যাকে গুঁজে ঠুনঠুন ঘন্টি বাজিয়ে চলে যেত।
মধ্য চল্লিশের খোকাজেঠু যদি হয় রোববারের জমায়েতে প্রবীণতম, তাহলে নিশ্চিতভাবেই কনিষ্ঠতম ছিল সদ্যযুবতী মিঠু, বাপ্পার মিঠুপিসি। তবে ভাইবোনেদের উষ্ণ আলাপচারিতায় হাসি-খুনসুটিতে বয়সের তারতম্য ঘুচে যেত। ছোট্ট বাসায় প্রথমেই শোবার ঘরে খাটটাকে খুলে ফেলা হতো। কাঠের পাটাগুলো এক কোনে দাঁড় করিয়ে গদিটা পেতে দেওয়া হতো মেঝেয়। তার ওপর চাদর ও চাদরের ওপর সানডে স্টেটসম্যান বিছিয়ে মুড়ির পাহাড় আর শিঙাড়া জিলিপি ঢেলে আটদশজন নারীপুরুষ হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে বসে, এ-ওর গায়ে হেলান দিয়ে, এর হাঁটু ওর তাকিয়া বানিয়ে নিয়ে যেন একটিই অখন্ড জীবন্ত দেহ হয়ে উঠত: মুখর, কলোচ্ছল, স্মৃতিভারাতুর।
এবং অধীর, উন্মুখ–চিনি ও তার কাঁচা সিদলের জন্য।
অনেককাল পরে সেইসব দিনগুলোর ছবি যখন স্মৃতিপটে ভেসে উঠবে, বাপ্পার মনে হবে অচেতনেই যেন এক শরণার্থী শিবিরের আবহ বানিয়ে তুলত ওরা। তখনও অবশ্য শরণার্থী শিবির ব্যাপারটা যে কী, তা সে জানত না। এমনকি চিনিকাকার নামটা যে চিনি থেকে আসেনি, ছোটোবেলায় চিনাদের মতো চোখ- নাকের জন্য ওই ডাকনামটা সে পায়, তাও জানত না। যৌবনে এসে ছিপছিপে চেহারা, মসৃণ হলদেটে ত্বক আর ঘন উজ্জ্বল চুলের জন্য ওকে বাপ্পার খুব পছন্দ ছিল। পছন্দের আরেকটা কারণ চিনিকাকা বাপ্পার জন্য আনতো শিলং পাহাড়ের মিন্ট চকোলেট। রথীন আর চিনির জন্ম একই বছরে, দুজনে পড়েছেও একই ইস্কুলে। তবে দুজনের স্বভাব ছিল ভিন্ন। রথীন ছিল চুপচাপ আর আত্মমগ্ন ধরনের, অন্যদিকে চিনি সারাক্ষণ হইচই করত। রবিবারের সেই আশ্চর্য দুপুরগুলোয় এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি চড়ে চিনি এসে পড়লেই হুল্লোড়ের হররা ছুটত ২৩/৩ কলুটোলা লেনের বাসায়।
তবে সেটা কেবলমাত্র চিনির জন্যে নয় অবশ্যই। মহার্ঘ্য্য বস্তুটি আসত স্টিলের কৌটোয়, তিন পরত প্লাস্টিকে মোড়া, যাতে তার বিধ্বংসী পারমাণবিক গন্ধটি চাপা থাকে। সেকালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে যে কোনো ধরনের মাছ বহন করা–তা সে জীবিত হোক বা মৃত, অথবা গাঁজানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু চিনি গৌহাটি বিমানবন্দরে চেক-ইন কাউন্টারে এক পাড়াতুতো দাদা খুঁজে বের করে। বাসায় পা রেখে প্রথমেই সে বিজয়ীর ভঙ্গিতে ব্যাগ খুলে স্টিলের কৌটোটা বের করত, এবং একে একে প্লাস্টিকের পরত খুলে যখন জাদুকরের মতো হাতের মোচড়ে কৌটোর ঢাকনা খুলে ধরত, সবাই ওর সামনে এসে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গভীর আঘ্রাণ নিত–চোখ বোঁজা, ঘাড় বাঁকানো, যেন এক রহস্যময় ধর্মানুষ্ঠানের পুরোহিতদল। ঘরের বাতাস সেই বিচিত্র গন্ধে ভরে উঠত, ওরা সবাই সমস্বরে বলে উঠত ‘আহহহ!’ মুখে ফুটত এক অনির্বচনীয় উদ্ভাস।
সবাই নয়, বাপ্পা আর শিউলি নয়। যেদিন ওরা প্রথম শিউলিকে কাঁচা সিদলের গন্ধ নেবার জন্য প্ররোচিত করে, সেইদিনটার কথা বাপ্পা কোনোদিন ভুলতে পারবে না। অন্যদের মতো শিউলিও খোলা কৌটোর ওপর মাথা ঝুঁকিয়ে ঘ্রাণ নিয়েছিল মনে আছে, পরক্ষণেই বাথরুমের বন্ধ দরজার ওপাশে থেকে ভেসে আসতে লাগল অসহায় বমি করার শব্দ। বাপ্পা তখন খুব ছোটো, ভেবেছিল মা বুঝি মারাই যাবে। তীক্ষ্ণ আতঙ্ক আর সেইসঙ্গে বাবার ওপর, চিনিকাকার ওপর, মোমবুচানের ওপর, সকলের ওপর খুব খুব রাগ হয়েছিল ওর। তার কারণ ওরা যে শুধু ওর মাকে মেরেই ফেলছিল তাই নয়, সকলে মিলে সেটা উপভোগও করছিল। এমনকি ওর বাবাও।
তার কিছুকাল পরে, বাপ্পা যখন আরেকটু বড়ো হয়েছে, ওকে কাঁচা সিদলে দীক্ষিত করার ভার নিল চিনি স্বয়ং।
‘কাঁচা সিদল মিন্ট চকোলেট নয়, বাপ্পাসোনা। এর খুব নিজস্ব একটা সোয়াদ আছে যেটা তোমায় শিখতে হবে।’
ভাতের থালার সামনে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে বাপ্পাকে কোলে বসিয়ে মিষ্টি স্বরে বলছিল চিনি, ধোঁয়া-ওঠা ভাতে সিদলভর্তা মাখতে মাখতে, যে ভর্তাটা সদ্য কড়া থেকে নামিয়ে শিলে বেটেছে বাপ্পার মোমবুচান। পাকা সিলেটি রাঁধুনি সে, বাসায় পা রেখেই শিউলিকে উৎখাত করে রান্নাঘরের দখল নিয়েছে। অক্লান্ত খুন্তি নেড়ে, স্লিভলেস বাহুতে চর্বির পরতে পালতোলা জাহাজের মতো হিল্লোল তুলে নাগা মরিচ দিয়ে কষে রেঁধে চলেছে বিবিধ দুর্লভ পদ।
‘তবে সহজ হতো যদি তুই সিলেটে জন্মাতিস!’ এরপর চিনি বলতে শুরু করত ওদের ছেড়ে-আসা দেশটার কথা, যে দেশটা হিমালয় পাহাড় থেকে নামা নদীনালায় কাটাকুটি সবুজ আর অনন্ত বিলে ছাওয়া, যেখানে শীতকালে উত্তরের দেশ থেকে কমলালেবু রঙের হাঁসেরা উড়ে আসে, আর চেরি ব্লসম জুতোর কালির রঙের পানকৌড়ির দল সারাদিন মাছ ধরে খায়। রাতে বাড়ির লাগোয়া বাগানে ঘুমোতে আসে ওরা, ওদের বিষ্ঠার চুনে গাছের পাতাগুলো রুপোলি রাংতার মতো হয়ে যায়। তারপরে যখন বর্ষা আসে–চিনিকাকা বলে যেত–ঠিক যেন একটা
অনন্ত জলের মশারি বঙ্গোপসাগর থেকে উড়ে এসে পুরো উপত্যকাটা ঢেকে দেয় তিন-তিনটে মাস। তখন চারদিক সবুজ ভেলভেটের মতো, এমনকি বাতাসেও সবজেটে গন্ধ। আর তখনই সবকটা জলাশয় ভরে ওঠে রাশি রাশি মাছে।
‘এত্ত মাছ, বুঝলি বাপ্পা, এত্ত মাছ, তোর মা যদি তখন একবার ওখানকার নদীতে নেমে ডুব দেয়, তোর মায়ের ওই ঘন কোঁকড়ানো চুলের গোছে এত কুচো মাছ জড়িয়ে যাবে যে একটা আস্ত পরিবারের একবেলার ভাত উঠে যাবে!’ এই বলে চিনি শিউলির দিকে এমন করে অপাঙ্গে তাকাতো যে সকলে হো হো করে হেসে উঠত। শিউলি আরক্তিম মুখে ঠোঁট কামড়ে অস্ফুটে বলত–‘কচু পোড়া!’
‘সত্যিই অত মাছ!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলত চিনি। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় লোকেরা সেই মাছ নুন মাখিয়ে রোদে শুকিয়ে নেয়। শীতে যখন নদীনালা শুকিয়ে আসে, টাটকা মাছের আকাল হয়, তখন ওই শুঁটকি দিয়েই দিন গুজরান হয়। কিন্তু ওই পুবের দিগরে, যেখানে বাপ্পার বাবা-কাকাদের দেশ, মাটি তখনও ভিজে। বাতাসে তখনও জোলো ভাপ। ওখানে তাই লোকেরা রাশি রাশি কুচো চ্যাপা মাছ মেটে হাঁড়িতে ভরে কলাপাতায় মুখ বেঁধে মাটির নীচে পুঁতে দেয়। মাসের পর মাস কাঁঠাল গাছের ছায়ায় ঘেরা ঠান্ডা অন্ধকারে সঞ্চিত থাকে সেগুলো। ওদিকে আকাশ ফের নীল হয়, পাখিরা ফিরে আসে বাগানে, আর মাটির ভাঁড়ারে মজে-ওঠা গুপ্তধন শুষে নিতে থাকে এই সবকিছু–পাতার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলো, শিউলি ফুলের গন্ধ, শীতপাখির ডাক।
‘আর তুই যদি এখন পরিষ্কার মন নিয়ে এই গরাসটা মুখে তুলিস,’–ভাতের দলাটা বাপ্পার ঠোঁটের কাছে এনে চিনি বলত–‘তাহলে তুইও সেই চাঁদের আলো আর শিউলির গন্ধ টের পাবি।’
বাপ্পা ঠোঁট সামান্য ফাঁক করত, ওর নাকে এসে লাগত সিদলভর্তা মেশা উইলস নেভি কাটের গন্ধ।
বহুকাল পরে প্রৌঢ়ত্বের কিনারায় এসে সেইসব দিনগুলোর কথা ভাবতে বসে বাপ্পার মনে হয়েছে, চিনিকাকা যতটা ওই কথাগুলো বলতে ভালোবাসত, ঠিক ততটাই ভালোবাসত নিজের কন্ঠস্বর শুনতে। সেটা সেইসময় আলাদা করে ঠিক বোঝা যেত না, তার কারণ শিউলি ছাড়া আর সকলে অনর্গল কথা বলত–একে অন্যের কথার পিঠে, কথার বুকে, কথার পেটে, ছুটির ঘন্টা বেজে যাওয়ার পর একঝাঁক কচি ইস্কুল পড়ুয়ার মতো কলকল করে। এবং সিলেটি বুলিতে। জিভের নীচে নুড়ি রেখে কথা বললে ঠিক যেমন শোনায় অনেকটা সেরকম, হাওয়া-ভরা ডিপথং আর গড়ানে ব্যঞ্জনবর্ণের সমভিব্যাহারে।
এমনকি রথীনও। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোয় যে রথীনকে বাপ্পা চিনত, যে রথীন রোজ ফিটফাট হয়ে অফিস যেত কালো ব্রিফকেস নিয়ে, বাড়ি ফিরে কুর্তা- পাজামা গলিয়ে সোফায় বসে খবরের কাগজের কেল্লা বানিয়ে নিত, চারের কাপে চুমুক দিত আর কখনো পা নাচাতো রেডিওয় দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতে, কখনো হাত বাড়িয়ে টেলিফোন তুলে ধমকাতো অফিসের অধস্তন কর্মচারীকে, বাপ্পার সেই একান্ত চেনা বাবা ওই খালি গায়ে লুঙ্গি পরে মেঝেয় পা ছড়িয়ে বসা, দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলা মানুষটাই কী না, সেটা পরখ করার জন্য সে তার ঘাড়ে উঠতে চাইত, গলার কাছে নাক ঘষে ওল্ড স্পাইস আফটারশেভ লোশনের চেনা গন্ধটা খুঁজতে চাইত। আড্ডায় মশগুল রথীন নিস্পৃহ থাকত, এমনকি ঠেলে সরিয়ে ও দিত। বুঝতে চাইত না শিশুটি অমন আচরণ করছে কোন অস্পষ্ট উৎকণ্ঠা থেকে।
সেই উৎকণ্ঠা তার মধ্যে চারিয়ে গিয়েছে তার মায়ের থেকে। সিলেটি বুলি আর কাঁচা সিদলে তৈরি কেল্লার বাইরে থেকে যাওয়া, রান্নাঘরের নিজস্ব পরিসর থেকেও উৎপাটিত, শিউলির ছেড়ে-আসা স্বদেশভূমির স্মৃতিবিলাসের সম্বল ছিল না। তার কারণ কলকাতা থেকে ট্রেনে চেপে দু ঘন্টায় সাতগাঁয় চলে যাওয়া যেত।
