সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১.৮

১.৮

চেম্বারের দেয়ালে গঙ্গারাম চক্রবর্তীর ছবিটির নীচে এক কোণে ছোটো হরফে লেখা আছে— Dufay’s Daguerreotype Studio, Rue de Banaras, Croissantville। সাদাদের শহর কোয়ার্সভিলে যখন দুফে সাহেবের স্টুডিও পত্তন হয়, সেই সময় কবিরাজ হিসেবে গঙ্গারামের সুনাম হচ্ছে। আদিরামবাটির গোঁড়া স্মার্ত পরিবারে জন্মে তিনি অল্প বয়স থেকেই ছিলেন স্বতন্ত্র স্বভাবের, ফিরিঙ্গিপাড়ায় সাহেবদের সঙ্গে ওঠাবসা ছিল। বংশ পরম্পরায় অধীত আয়ুর্বেদের সঙ্গে যুক্ত করেন চিকিৎসাশাস্ত্রের অন্যান্য ধারা।

গঙ্গারামের পিতা বেদজ্ঞ পণ্ডিত রাজারাম সার্বভৌমের ছিল তিন পুত্ৰ- রামানুজ, গঙ্গারাম ও পাগলরাম। পিতার মৃত্যুর পর বড়ো ছেলে রামানুজ পারিবারিক বৃত্তি গ্রহণ করেন। তিনি টোলের আচার্য হন, এবং বংশরক্ষায় ব্রতী হন। তাঁর চার সন্তানেরা যথাক্রমে রামশশাঙ্ক, কাত্যায়নী, শাকম্ভরী ও রামরাম। এঁদের মধ্যে ছোটো ছেলে রামরাম অধ্যাপনার ধারা বহন করেন। তিনি কাশীতে গিয়ে শাস্ত্রী উপাধি পান এবং পিতার মৃত্যুর পর টোলের অধ্যক্ষ হন। বড়ো ছেলে রামশশাঙ্ক গুরুগিরি করতেন, দূরদূরান্তে শিষ্যসেবকদের বাড়িতে ঘুরে ঘুরে বছরের বেশিরভাগ সময় কাটাতেন। এই রামশশাঙ্কেরই পুত্র রামপ্রাণ, ওরফে পরাণ।

রামপ্রাণের বয়স যখন দেড় মাস, তাঁর মা কলেরা মহামারীতে মারা যান। সেইসময় রামানুজের মেয়ে শাকম্ভরী উনিশতম মৃত পুত্র প্রসব করার পর চাঁদেরডাঙায় শ্বশুরালয়ে মানসিক নির্যাতনের মধ্যে কালাতিপাত করছিলেন। ততদিনে রামানুজ মারা গিয়েছেন। গঙ্গারাম চক্রবর্তী নিজ উদ্যোগে ভ্রাতুষ্পুত্রী শাকম্ভরীকে আদিরামবাটিতে ফিরিয়ে আনেন। স্বামী জীবিত থাকা সত্ত্বেও শ্বশুরবাড়ির অমতে রজস্বলা নারীকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ব্রাহ্মণ কুলপতিদের সায় ছিল না। কিন্তু গঙ্গারাম ততদিনে নামকরা কবিরাজ, মূলত ওঁর আয়েই আদিরামবাটির যৌথ পরিবারের ব্যায়ভার বহন হয়। কারোর আপত্তি ধোপে টেকেনি। এবং এর কলে দুটি মানুষের নতুন জীবন লাভ হয় শাকম্ভরী ও শিশু রামপ্রাণ। সাতমাস বয়স পর্যন্ত রামপ্রাণ শাকম্ভরীর বুকের দুধ পান করেছিলেন। শাকম্ভরীর সহোদরা কাত্যায়নীর বিবাহ হয়েছিল সরস্বতীর পশ্চিম তীরবর্তী গ্রামে এক হতদরিদ্র পুরোহিতের পরিবারে। তাঁর দুই পুত্র কন্যা বিশ্বনাথ (বিশু) এবং কমলা (ওরফে বনলতা)-কে মন্বন্তরের ছায়াকবলিত জীবন থেকে উদ্ধার করে আদিরামবাটিতে মাতুলালয়ে নিয়ে আসেন গঙ্গারাম।

.

আয়ুর্বেদ বেদেরই একটি শাখা। কিন্তু কট্টর স্মার্তরা কোনোকালেই জ্ঞানচর্চায় আয়ুর্বেদকে উচ্চে স্থান দেননি। আয়ুর্বেদ থেকে জীবিকা নির্বাহের জন্য তো আলাদা বৈদ্য বর্ণই ছিল। একই কথা জ্যোতিষচর্চার ক্ষেত্রেও খাটে। কিন্তু সাতগাঁয় বন্দরের সুবাদে সেই মধ্যযুগ থেকে জ্ঞানের এই দুটি শাখায় এই অঞ্চলের ব্রাহ্মণদের প্রভূত অর্থাগম হয়। দূরদূরান্তের বন্দর হয়ে আসত বণিক ও নাবিকেরা, তারা দেহে বয়ে আনতো বিবিধ রোগবালাই। এছাড়া দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার কুপ্রভাব ছিল। মৌসুমী বায়ুর দিকপরিবর্তনের জন্য দীর্ঘ সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সাতগাঁয় অপেক্ষার কালে তারা আয়ুর্বেদজ্ঞদের শরণাপন্ন হতো। এছাড়া সেকালে, নৌচালনার প্রযুক্তি উন্নত হবার আগে, সমুদ্রযাত্রা ছিল ঘোর বিপদসঙ্কুল ঝঞ্ঝা, প্লাবন, বৈরী বায়ু ও মহাসাগরীয় স্রোতের প্রতিকূলতা সহ অজানা প্রকৃতির রহস্যময় শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ। জাহাজের নাখোদা ও বণিকেরা জ্যোতিষীদের পরামর্শ নিয়ে যাত্রার শুভ দিনক্ষণ নির্ণয় করত।

সাগরপারের দেশ থেকে তারা আনতো বিরল ওষধি গাছগাছড়ার বীজ ও চারা। তার কিছু কিছু ঠাঁই পায় আদিরামবাটির ঔষধিবাগানে। গঙ্গারাম চক্রবর্তী বন্দর-হুগলির ফিরিঙ্গি শল্যবিদের লেখা ও ধর্মতলায় সুফি আউলেদের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞানের আলোয় সেইসব জড়িবুটি ব্যবহার করে চিকিৎসা করতেন। ভাইপোর ছেলে রামপ্রাণের বাল্যকালে কবিরাজী বিদ্যায় হাতেখড়ি তাঁরই কাছে।

রামপ্রাণ যখন আয়ুর্বেদের পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি চর্চা শুরু করলেন, ততদিনে গঙ্গারাম গত হয়েছেন। চেম্বারের দেয়ালে রামচন্দ্র ও স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের পাশে তাঁর ছবি ঝোলে। জীবিত থাকলে তিনি এক জার্মান সাহেবের উদ্ভাবন করা এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে আগ্রহী হতেন কী না জানার কোনো উপায় নেই।

.

একবার কালীপুজোর আগের দিন রাঁধুনি বামুনদি ওষধিবাগান থেকে গিমে শাক ভেবে অ্যাকোনাইট লতা চোদ্দ শাকে মিশিয়ে রান্না করেছিল। খাবার পর বাড়ির প্রায় সকলের তীব্র পেটে ব্যথা শুরু হলো। রামপ্রাণ সময় মতো অসুস্থতার কারণ চিহ্নিত না করতে পারলে, কাঠকয়লার গুঁড়োয় মধু মিশিয়ে প্রতিষেধক না খাওয়ালে অনেকেরই অবস্থা গুরুতর হতো। এই ঘটনার পরে ওষধিবাগানে বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়, কাঠের গেট তালাচাবি দিয়ে রাখা হয়। চাবিটা চেম্বারে রাখা থাকে, সেই চাবি ব্যবহারের অধিকার আছে কেবলমাত্র দুজনের–পরাণ ডাক্তার স্বয়ং এবং তাঁর ফার্মাসিস্ট কন্যার।

শিউলির খুব ছোটোবেলার একটি অস্পষ্ট স্মৃতি হলো, ভোরবেলায় ওষধিবাগানে শিশিরে ভেজা গাছপালার দেশে বাবার পিছু পিছু টলোমলো পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। বাগানের মাঝখানে নাগকেশর গাছের নীচে বেদি, পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের রশ্মি এসে পড়েছে। বেদির ওপর সাদা দাড়িগোঁফ আর আলখাল্লা টুপি-পরা এক পুরুষ, যেন কুয়াশা জমিয়ে তৈরি, বাবার সঙ্গে নীচু মসৃণ স্বরে আলাপচারিতা করছেন। তাঁর সামনে বিছানো নীল-সাদা চেককাটা রুমালে অদ্ভুত সব শিকড় বাকল বীজ।

নাগকশরের কান্ডে গুচ্ছ গুচ্ছ গোলাকৃতি ফল ঝোলে। একটু বড়ো হয়ে বিশুকার মুখে সে শুনেছে, বহুকাল আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ থেকে ক্লাইভের ছোঁড়া যে গোলাটা উড়ে এসে আদিরাম মন্দিরে লাগে, সেটা বাগানে গড়িয়ে এসে বর্ষার জল পেয়ে অঙ্কুরিত হয়। তার থেকেই নাকি হয়েছে এই নাগকেশর গাছটা। পরে শিউলি জানবে, যদিও নাগকেশরের ইংরেজি নাম ক্যানন- বল ট্রি, তবে বিশুকার আরও অনেক গল্পের মতোই এটাও আজগুবি। তবে তাতে আকর্ষণ কিছুমাত্র কমেনি, ছোটোবেলাতেই ওষধিবাগানের গাছগাছড়ার সঙ্গে আত্মীয়তা গড়ে ওঠে শিউলির। মনে হতো ওরাও যেন পরিবারেরই সদস্য। বড়ো হবার পর তার সঙ্গে যুক্ত হল তাদের চেহারা চরিত্র ও গুণাগুণ সম্পর্কে জ্ঞান। ইস্কুলে পড়া শেষ হলে উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে পড়ার বাসনা ছিল। কিন্তু বন্দর-হুগলিতে একটিমাত্র মেয়েদের কলেজে বিজ্ঞান শাখা ছিল না। বহুকাল আগে কলকাতায় পড়তে গিয়ে বনলতার ভয়ঙ্কর পরিণতি পারিবারিক স্মৃতিতে দগদগে হয়ে ছিল। আদিরামবাটির অনুশাসন ভাঙার সাহস করেননি রামপ্রাণ। তার বিকল্প হিসেবে তিনি শিউলিকে ওষধিবাগানে অবাধ প্রবেশাধিকার দেন, এবং ফার্মেসিতে ক্ষীণদৃষ্টি শ্রীশ লাহিড়িকে সাহায্য করার জন্য নিযুক্ত করেন।

আইবুড়ো মেয়ে একগাদা বাইরের লোকের সামনে বসে পুরুষ মানুষের মতো ওষুধ তৈরি করবে, এ নিয়ে শাকম্ভরী দেবীর আপত্তি ছিল। কিন্তু রামপ্রাণ কর্ণপাত করেননি। এই ব্যাপারে তাঁর স্ত্রী সরোজারও সমর্থন ছিল।

ফার্মেসি ঘরে আরক ও স্পিরিটে মেশা যে অদ্ভুত গন্ধটা রথীনকে বিচলিত করে, শিউলির কাছে সেটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে প্রিয় সুগন্ধ। কলেজে দর্শন আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাসে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা ক্লান্তিকর লেকচার শোনা আর নোট নেবার থেকে তার ঢের পছন্দের ছিল একইরকম দেখতে সারি সারি শিশির গায়ে সংকেতলিপি পড়ে নির্দিষ্ট ওষুধ খুঁজে নেওয়া, সুগার অফ মিল্ক পাউডারের ওপর কাত করে কর্কের ছিপি ধরে নির্দিষ্ট সংখ্যক ফোঁটা মেশানো, ছোটো ছোটো পুরিয়া বানিয়ে রোগীদের সেবনের নির্দেশাবলী বুঝিয়ে দেওয়া, এমনকি প্রয়োজনে তাদের শাসন করা।

অধিকাংশই পুরোনো রোগী, শিউলিকে তারা শৈশবকাল থেকে চেনে, কোনো তরফেই তাই স্বাচ্ছন্দ্যের ঘাটতি ছিল না। আর তাই যেদিন, উনিশে পা দেবার ঠিক দুদিন আগে, এক ক্ষীণতনু আমাশয়দীর্ণ যুবক তাকে প্রেম নিবেদন করল, শিউলি হতবাক হয়েছিল। চার পাতা লম্বা ফুলস্কেপ কাগজে লেখা চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে ধাক্কা সামলাতে বেশিক্ষণ লাগেনি। এবং যেভাবে সে হাতের তালুতে আঘাত করে হোমিওপ্যাথি ওষুধের অণু বিভাজন ঘটায়, সেভাবেই যুবকের আশা বিচূর্ণ করে। এক শিশি কালমেঘের সঙ্গে তার কানে ঢেলে দেয় কয়েক ফোটা উপদেশ, যা কালমেঘের চেয়েও তিক্ত ও কষা। বিক্ষত হৃদয় খামচে ধরে পালাবার পথ পায়নি সেই যুবক। আর কোনোদিন ফিরে আসেনি।

এই ঘটনার কথা কাউকে বলেনি শিউলি। সে জানত, বললেই ফার্মেসিতে তার পা রাখা বন্ধ হয়ে যাবে চিরতরে। এবং সে বড়ো দুঃসহ হবে, তার কারণ তার কাছে ওটি ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় প্রিয়তম স্থান (প্রথমটি অবশ্যই ওষধিবাগান)। কিন্তু সাতগাঁয় মাটি-খুঁড়তে-আসা কলকাতার এক যুবকের সঙ্গে বিবাহপ্রস্তাব যখন এল খোদ বাবার কাছ থেকে, সেটি কীভাবে যে মোকাবিলা করবে ভেবে কুল পায়নি।

খয়েরি ট্রাউজার্সের ওপর নীল চেক শার্ট, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, দাড়িগোঁফ নিখুত কামানো, চুলের ছাঁট দেখলেই বোঝা যায় সাতগাঁর কোনো নাপিতের কাজ নয়, আত্মবিশ্বাসী কিন্তু সদ্য অসুখ থেকে ওঠা ক্লান্তির ছাপ মুখে— শরতের অমলিন আলোয় ফার্মেসিতে রোগীদের ভিড়ে বড়ো কাগজের প্যাকেট হাতে যুবকটিকে দেখেই শিউলি বুঝেছিল এই সেই ‘পুকুর-কাটা বাবু’, যার কথা সে তার বিশুকার মুখে শুনেছে। বিশুকার সঙ্গে অপেক্ষমাণ রোগীদের টপকে চেম্বারে তাকে ঢুকতেও দেখেছে। সেই কারণে, এবং ওর ওই আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিটার জন্য, শিউলি বেশ বিরক্তই হয়ে ছিল। আর তাই যুবকটি যখন তার হাতের প্যাকেটটি তুলে দেখালো, ওর মধ্যে কী আছে জেনেও সে বেশ ঝাঁঝের সঙ্গেই বলে উঠেছিল—

‘অ্যাঁ! মশারি? মশারি নিয়ে আমি কী করব?’

.

সেদিনের পর থেকে সে নিয়ম করে প্রতি শুক্রবার আসতে শুরু করল। চেম্বারে ঢুকে অন্যান্য রুগিদের চেয়ে বেশি সময় বাবার সঙ্গে কাটায়, শিউলির কাছে চিরকুট দেখিয়ে ওষুধ নেয়। স্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টি বিনিময় হয়, কিন্তু কোনো বাক্যবিনিময় হয় না। না, মোটেই প্রথম দর্শনে, কিংবা দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ দর্শনে, কোনোরূপ প্রেম জাগেনি! এই কথাটা শিউলিকে বিয়ের পরে অনেককাল ধরে অনেকের কাছে আদিরামের দিব্যি কেটে বলতে হয়েছে।

তাঁর নয়নের মণি একমাত্র মেয়ের জন্য রামপ্রাণ যখন সুপাত্রের নামটি বললেন, সর্ব প্রথম আপত্তি উঠল যার কাছ থেকে, সেই ছেলেটিকে এই বাড়িতে নিয়ে আসে।

‘ওই পুকুর-কাটা বাবু?’ বিশু বলেছিল।

‘আর পুকুর-কাটা বাবু নয়,’ রামপ্রাণ বলেছিলেন। ‘এখন সে উত্তরবঙ্গের দিনহাটায় সরকারি ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার।’

আদিরামবাটিতে প্রথমবার আসার পর বছর না ঘুরতেই রাজ্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চিঠি পায় রথীন: সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছে সে, এবং এক্সিকিউটিভ ক্যাডারে নিযুক্ত হয়েছে। রাতের পর রাত তাঁবুতে টেরিটি বাজারের চীনা লন্ঠন জ্বেলে তেল পোড়ানোর সুফল মিলেছে। ফিল্ড সার্ভেয়ারের চাকরি থেকে রিলিজ নিয়ে নতুন পদে যোগ দেবার ব্যস্ততায় সে আর আদিরামবাটিতে আসার সময় পায়নি। তবে দিনহাটায় নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে রামপ্রাণ চক্রবর্তীকে চিঠি লিখে সুসংবাদ জানিয়েছে, প্রাণরক্ষা করার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছে, লিখেছে বিজন ক্যাম্পসাইটে তাঁবুর জীবনে বৈচিত্র্যহীনতার মাঝে তাঁর সান্নিধ্যলাভ মূল্যবান স্মৃতি হয়ে থাকবে। এছাড়াও তার কর্মস্থলের কথা লিখেছে: তার কোয়ার্টারের পেছনে জঙ্গলে বন্য হাতি ও চিতাবাঘ বেরোয় সে কথা লিখেছে, স্থানীয় রাভা কিংবা মেচ পাচকের তৈরি মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে ডাক্তারের নির্দেশমাফিক পথ্য নিজেই রান্না করে নেয়, সে কথা লিখেছে। আরও লিখেছে—

যদিও এখনও আমার হোমিওপ্যাথিতে বিশ্বাস জন্মায়নি, তবে আপনার কাছে একটি অকপট স্বীকারোক্তি করি। মাসখানেক এই প্রত্যন্ত চাবাগান অধ্যুষিত অঞ্চলে অতিবাহিত করার পর, এবং প্রকৃত দারিদ্র্য কাকে বলে সেটা জীবনে প্রথম চাক্ষুষ করার পর, আমি আপনার কথাগুলির মর্মার্থ উপলব্ধি করছি। হোমিওপ্যাথির মতো সস্তা ও সরল চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদের মতো দেশের লক্ষ কোটি গরীব মানুষের প্রকৃত হিতসাধন করতে পারে হয়তো।

উত্তরে রামপ্রাণ তাকে প্রভূত অভিনন্দন ও আশীর্বাদ জানালেন এবং সর্বাগ্রে নিজ স্বাস্থ্যের প্রতি নজর রাখতে বললেন। লিখলেন ‘বিশেষত এখন যেহেতু নূতন চাকুরির দায়িত্বভার পালন করে নিজে খাদ্যদ্রব্য রান্না করে খেতে হচ্ছে, যাহা ঠিক পুরুষের কর্ম নয়।’ এরপর তিনি জানতে চাইলেন, এক্ষণে জীবনে সুস্থিত হবার কোনো পরিকল্পনা আছে কী না, যাতে এই ‘হাত পুড়িয়ে খাওয়ার’ জীবন থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।

প্রত্যুত্তরে রথীন লিখল–‘উক্ত বিষয়ে আমি এখনও কিছু চিন্তাভাবনা করিনি। তবে তার মানে এই নয় যে এমন কিছুর সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে নেই। এই বিষয়ে আমার বয়ঃজ্যেষ্ঠ জাঠতুতো দাদা অভিভাবক স্বরূপ, কোনোরূপ সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন।’ এর পরের চিঠিতে সে খোকার গৌহাটির ঠিকানা রামপ্রাণকে পাঠিয়েছিল।

রামপ্রাণের প্রস্তাবে সরোজার সবিশেষ সম্মতি ছিল। সাতগাঁ থেকে বাইশ মাইল উত্তরে গঙ্গার পূর্বপাড়ে রাধানগর নামে এক প্রাচীন ক্ষয়িষ্ণু জনপদে সরোজার জন্ম। বিবাহের পর সাতগাঁয় পালটি-ঘর কনৌজি ব্রাহ্মণ পরিবারে আসেন। দুটি জায়গাতেই তিনি দেখেছেন অতীতের হৃত গৌরবের ছায়া কীভাবে আস্ত প্রজন্মকে কর্মবিমুখ আর সংকীর্ণমনা করে তোলে। রথীনকে তিনি দেখেননি, কিন্তু স্বামী ও দেওর বিশুর মুখে ওর কথা শুনেছেন, আত্মীয় পরিজন ছেড়ে কলকাতায় ভাগ্যের সন্ধানে এসে ওর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের কথা জেনেছেন। সাতগাঁর গন্ডি থেকে বেরিয়ে এমন একটি ছেলের সঙ্গে ঘর বাঁধলে মেয়ে জীবনে সুখী হবে, তাঁর মনে হয়েছিল।

‘কিন্তু ও যে কলকাতার ছেলে!’ বিশু নাছোড় গলায় বলেছিল। ‘তাতে কী, ঠাকুরপো?’ সরোজা জবাব দিয়েছিলেন। ‘কলকাতায় কি ভালো মানুষ বাস করে না? অনেকেই তো মাথা খাটিয়ে, ঘাম ঝরিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে।’

মি’লেডি, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কামানের গোলা আদিরামের মন্দিরে উড়ে এসে লাগার পর থেকে কলকাতার প্রতি সাতগাঁর ব্রাহ্মণদের জাতক্রোধ ছিল। তাদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, কলকাতায় গেলে—

১। হিন্দুরা উচ্ছন্নে যায়, জাতধর্ম খুইয়ে কেরেস্তান হয়

২। মদ-গোমাংস খায়

৩। এক বিচিত্র বাংলায় কথা বলে, পদ্য লেখে

৪। সেই পদ্যে এমনকি রামচন্দ্রকে দুর্বল কাপুরুষ হিসেবে দেখায়।

গঙ্গারাম চক্রবর্তীর অতীব স্নেহের ছোটোভাই পাগলরাম দাদার অমতে সাতগাঁ ছেড়ে কলকাতায় গিয়ে ছাপাখানার ব্যবসায় সফল হন, বাগবাজারে প্রাসাদোপম বাড়ি বানান এবং সেখানেই সংসার পাতেন। এর ফলে দুই ভাইয়ের সম্পর্ক ছিন্ন হয়। গঙ্গারাম জীবনে মাত্র একবার কলকাতায় গিয়েছিলেন, বৃদ্ধ বয়সে, সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে যোগসাজসের সন্দেহে ইংরেজ পুলিশের হাতে বন্দি হয়ে। ফোর্ট উইলিয়ামে তিনটি রাত কাটিয়ে তিনি ফিরে আসেন, এবং তার দিন কয়েক পরেই তাঁর মৃত্যু হয়।

কলকাতার অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়ায় পাগলরাম মারা যান তার আগেই। তাঁর একমাত্র কন্যা রাধারাণী ব্যবসার হাল ধরেন, এবং আদিরামবাটির সঙ্গে ছিন্ন সম্পর্ক জোড়া লাগাতে সচেষ্ট হন। তিনি পরিবারে আশ্রিত বনলতাকে কলকাতায় নিজের কাছে নিয়ে আসেন, বেথুন স্কুলে ভর্তি করে দেন। সেখানে বনলতা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে, এবং ইংরেজ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিখোঁজ হয়; সম্ভবত আত্মহত্যা করে সে। তাকে আর পাওয়া যায়নি। এই ঘটনার পর দীর্ঘকাল বাগবাজারের সঙ্গে যখন আদিরামবাটির মুখ দেখাদেখি একেবারে বন্ধ, সেই সময় রাধারানীর স্বামী দুর্ঘটনায় মারা যান। তখন রামপ্রাণের স্ত্রী সরোজা একা গিয়ে সদ্যবিধবার পাশে দাঁড়ান, পরিবারের দুই শাখার মধ্যে সেতুবন্ধন করেন। সরোজা কলকাতা দেখেছেন, সেখানে কিছুদিন থেকেছেন। শহরটিকে নিয়ে তাঁর কোনো ছুৎমার্গ ছিল না।

‘শেষপর্যন্ত মেয়েটাকে একটা চালচুলোহীন বাঙালের গলায় ঝুলিয়ে দিবি, পরাণ? ওর পরিবারের ঠিকুজি-কুলুজি কিছুই তো জানা নেই! এই বংশে এমন কাজ এর আগে কেউ করেছে বলে তো শুনিনি।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নেড়েছিলেন শাকম্ভরী দেবী। ‘তবে তুই আর কবেই বা বংশের বিধান মেনে চলেছিস!’

শেষের খোঁচাটি বৃদ্ধার প্রিয় লব্জ। রামপ্রাণ বংশের রীতি মেনে তাঁর দুই পুত্রসন্তানের নামের অগ্রপশ্চাতে ‘রাম’ রাখেননি; তিনি আয়ুর্বেদের সঙ্গে বিলিতি শাস্ত্র মিশিয়ে চিকিৎসা করেন; তাঁর বড়ো ছেলে বসস্ত প্যারিসে ডিপ্লোমা করে ফিরে আসার পর তিনি তাকে দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করাননি; মেয়েকে ডাক্তারখানায় বসিয়েছেন; এবং, সর্বোপরি, তিনি স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করেন। শিশু বয়সে বুকের দুধ খাইয়ে মানুষ করেছেন যাকে, সেই পুত্রাধিক পরাণের এই অপকর্মগুলির জন্য পিসিমা শাকম্ভরীর অনুযোগের অন্ত ছিল না।

‘না, আমি ওর পরিবার সম্পর্কে সত্যিই বিশেষ কিছু জানি না,’ রামপ্রাণ বললেন। ‘কিন্তু এটুকু জানি ছেলেটির পদবী চাটুজ্যে, সে জাতে ব্রাহ্মণ, তার আদি বাড়ি শ্রীহট্ট। ছেলেটি বি.এ. পাস, সরকারি চাকরি করে। নেশাভাঙ করে না, স্বাস্থ্য মোটের ওপর ভালো। আমাদের হোমিওপ্যাথি শাস্ত্র অনুসারে ছেলেটি কার্বোনিক ধাতের, এছাড়া যতদূর ওকে পরীক্ষা করেছি, মেরুদন্ডটি সিধে আর হৃৎপিন্ডটিও যথাস্থানে আছে। অর্থাৎ কি না যাকে বলে সোজাসাপ্টা, হৃদয়বান, স্থিতধী। শিউলির মধ্যে ফসফোরিক ধাতের প্রাবল্য আছে। তার মানে খুঁতখুঁতে টাইপের কিন্তু উদ্দীপনার অভাব। এবং অস্থিরচিত্তও বটে। ওরা এক সঙ্গে থাকলে একে অপরের পরিপূরক হবে। চেম্বার ছেড়ে এক পা না বেরিয়ে এর চেয়ে ভালো ঘটকালি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এবার তোমরা বিচার করো।’

.

অনেক কাল পরে ২৩/৩ কলুটোলা লেনের সেই রবিবারের দুপুরগুলোর কথা ভাবলে বাপ্পার মনে ভেসে উঠবে পুরোনো সাদা-কালো ফোটোগ্রাফের মতো একটা ছবি। শহরের এঁদো গলির ভেতর সেই পুরোনো বাড়িটায় (যা ভেঙে বহুতল উঠেছে বহুদিন আগেই) দোতলার ঘরে মেঝেয় হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে একদল বাস্তুহারা ভাইবোন (যাদের অনেকেই আর পৃথিবীতে নেই)। দুপুরের খাওয়া শেষ হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে, সবার সামনে এঁটো ভাতের থালা, হাতের এঁটোও শুকিয়ে গিয়েছে। কিন্তু কেউই আর উঠতে পারছে না। তার কারণ তাদের গল্প আর ফুরোচ্ছেই না। এদিকে ক্রমশ বাইরে আলো কমে আসছে, পাশের উঁচু বাড়িটার মাথায় রোদ সরছে, কাক ডাকছে, নীচের গলিতে তেলেভাজার দোকানে ঝাঁপ উঠেছে, ঘন্টি বাজিয়ে হেঁকে গেল বোম্বেমিঠাইওয়ালা। পুণ্যার্থীরা যেভাবে গঙ্গায় সারি দিয়ে বুকজলে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি ভরে জল তুলে ফেলে, সেভাবেই ওরা যেন এক অনর্গল স্মৃতির প্রবাহে অর্পণ করছে শৈশব-বাল্যস্মৃতির খুঁটিনাটি অনুষঙ্গ, কিস্সা, গুজব, রঙ্গরসিকতা এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের নদী, করুণা আর হাস্যরসের কুল ছাপিয়ে, শ্লীল-অশ্লীলের বাঁধ ভাসিয়ে বয়ে চলেছে। তার কিছু কিছু সে বুঝতে পারছে, অনেক কিছুই পারছে না। সকলে হেসে উঠলে সেও হাসছে।

তার স্মৃতিতে কেবল অশ্লীলগুলোই আছে। গ্রামের এক জমিদার, যার ‘মোতনের লইগ্যা’ এক বিঘা জমি লাগত; পাড়ার এক নাপিত, যার বিশাল ‘কোরল্ড’ (হাইড্রোসিল?) পূর্ণিমা-অমাবস্যায় কোলা ব্যাঙের মতো কটকট করে ডাকত; পাশের বাড়ির এক খুনখুনে বৃদ্ধা, যিনি একটি পা ঊর্ধ্বে তুলে পাড়া কাঁপিয়ে প্রবল নাদে বাতকর্ম করতেন, এবং তাঁর ‘ভাউরের’ সঙ্গে সামাজিক রীতি মেনে যাঁর সঙ্গে তাঁর সরাসরি কথা বলা বারণ ছিল এই ধ্বনির প্রতিযোগিতায় নামতেন।

এইসব বিচিত্র আজগুবি কাহিনি হাত মুখ নেড়ে বলত খোকাজেঠু, ঘাড়ে চর্বির পরত কাঁপিয়ে অট্টহাসি জুড়ত। মিঠুপিসি খিলখিল করে হেসে চিনিকাকার পিঠে গড়িয়ে পড়ে বলে উঠত

‘বউত্তা মিসা মাত!’

কখনো-সখনো একটি চিঠির প্রসঙ্গ উঠত। চিঠিটি সাতগাঁর ডাক্তারবাবু খোকাজেঠুকে লিখেছিলেন গৌহাটির ঠিকানায়। সঙ্গে ছিল তাঁর একমাত্র কন্যার কোষ্ঠীবিচার। চিকিৎসকের পক্ষে বিরল স্পষ্ট হস্তাক্ষরে লেখা সেই চিঠিতে সবচেয়ে তাৎপর্যময় বাক্যটি ছিল ‘ওরা দুজনে একে অপরকে দেখিয়াছে, আশা করা যায় উহাদের কাছে পরস্পরের সান্নিধ্য অপ্রীতিকর হইবে না।’

বাক্যের মাঝে কমাটি সহ খোকাজেঠু এমনভাবে আওড়াতো, যেন চিঠিটি চোখের সামনে খোলা রয়েছে।

‘এ কথার মানে কী?’ বাপ্পার মোমবুচান ওর বাবার মুখের সামনে তর্জনী উঁচিয়ে উকিলের ভঙ্গিতে সওয়াল করত। অন্যেরা দুষ্টুমিভরা কৌতূহলের চোখে একবার রথীনের দিকে একবার শিউলির দিকে তাকাতো। দুজনের ঠোঁটে ফুটত সলজ্জ, অসহায় হাসি। আর সেই দেখে হেসে কুটিপাটি হতো সকলে।

‘এ হলো গিয়া পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য!’ রুপু ঘোষণা করত। গৌহাটি ছেড়ে কলকাতায় আসার পর থেকে রথীন ওদের নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে চিঠি লিখত। সাতগাঁয় কাজে যোগ দেবার পর লম্বা লম্বা চিঠিতে লিখত একঘেয়ে তাঁবুর জীবনের কথা, এক স্থবির মফস্সল শহরের কথা, কেশব গুছাইতের কথা, রাতে তার নাসিকাধ্বনির সঙ্গে প্রহরে প্রহরে শিয়ালের সংগতের কথা, দুই নিষ্কর্মা গঞ্জিকাসেবী ব্রাহ্মণের কথা, তাদের কলকাতা সম্পর্কে আজগুবি ধারণার কথা। এমনকি সাতগাঁর এক মজার ডাক্তারবাবুর কথাও সে লিখেছিল, যিনি কবিরাজির সঙ্গে হোমিওপ্যাথি মিশিয়ে চিকিৎসা করতেন।

‘কিন্তু সবচেয়ে গুরুতর ব্যাপারটাই ও ঘুণাক্ষরেও কখনো লেখেনি!’ রুপু নাটকীয় ভঙ্গিতে চোখ কপালে তুলে বলত।

‘সেডা কি?’ চিনি জানতে চাইত।

রুপু শিউলির দিকে প্রশ্রয়ভরা চাহনি হেনে উত্তর দিত–‘সেডা অইল এই যে ডাক্তারবাবুর এট্টা ছেমড়ি ছিল যে অরে দিওয়ানা বানাইসিল! রথির তহন চিরাবারা দশা!’

‘আর ওর বেঁচে ফেরার একটাই দাওয়াই,’ চিনি যোগ করত। ‘সেডা অইল ডাক্তারবাবুর ওই ছেমড়ি!’

আরেকপ্রস্থ হাসির হররা ছুটত। সেই হাসিতে যোগ দিত শিউলিও, কখনো নীচের ঠোঁট কামড়ে অস্ফুটে বলেও উঠত ‘কচুপোড়া!’ এই সময়গুলোয়, বিশেষত যখন ওরা রথীনের ব্যাচেলর জীবনের খুঁটিনাটি নিয়ে চর্চা করত, বাপ্পা ওর মায়ের চোখে দেখতে পেত কৌতূহলের ঝিলিক। অনেক পরে সে বুঝতে পেরেছে, মা বাবার জীবনে আসার আগে যে জীবনটা একান্তই বাবার ছিল, যার কথা ওরা জানত কিন্তু মা জানত না, সেই অজানা অঞ্চলটাকে অধিকার করার একটা উৎকণ্ঠা মায়ের মধ্যে কাজ করত।

.

শিউলিরানির সঙ্গে রথীন্দ্রনাথের বিবাহ কনৌজি স্মার্ত রীতি মেনেই হয়, যদিও শ্রীহট্টে পাত্রের বংশ ছিল শাক্ত, তাদের কুলদেবী ছিলেন মুণ্ডেশ্বরী। সম্প্রদান করেন রামপ্রাণের কাকা আদিরামবাটির শেষ নৈয়ায়িক রামরাম শাস্ত্রীমশাই, ওরফে মশাই। বিবাহের মূল অনুষ্ঠানের আগে বৈদিক রীতি অনুসারে আভ্যুদরিক হয়, পাত্র ও কন্যার পূর্বতন পাঁচ পুরুষকে এবং পাঁচ নারীকেও আবাহন করে তাদের আত্মার উদ্দেশে পিণ্ডদান করা হয়। দেশভাগে শ্রীহট্টের ভদ্রাসন থেকে উৎপাটিত হওয়ায় রথীন্দ্রনাথের পারিবারিক নথিপত্র হারিয়ে গিয়েছিল। পূর্বতন পাঁচ প্রজন্মের নাম সংগ্রহ করতে বেগ পেতে হয়। বিশেষ করে ওর বাবা মারা যাবার পর, এবং মা শিলঙে দেওরের পরিবারে গিয়ে থিতু হবার পর বাস্তুভিটেয় আপনজন বলতে কেউ ছিল না। পরিবারের পুরোহিত জনৈক ভটচাজমশাই কোনোরকমে মুণ্ডেশ্বরীর নিত্যপুজোটা টিকিয়ে রেখেছিলেন। গৌহাটি থেকে খোকা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে। বিয়ের ঠিক তিনদিন আগে ২৩/৩ কলুটোলা লেনের বাসায় সিলেট থেকে পাঁচ প্রজন্মের নামের তালিকা সংবলিত পোস্টকার্ড এসে পৌঁছয়। হোমাগ্নির সামনে ঘি, মধু ও তিল সহযোগে সেই নামগুলি পাঠ করেন সাতগাঁয়ের পুরোহিত।