সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১.৫

১.৫

কর্মসূত্রে সাতগাঁয় আসার আগে কলকাতা শহরের বাইরে পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে রথীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। যা ছিল তা এক ঝাপসা গ্রাম-মফস্সলের ছবি, সাদাকালো ইতিহাসবিহীন কতগুলি দৃশ্যখন্ড, যা সেইকালে বাংলা ছায়াছবির পর্দা জুড়ে ফুটে উঠত যখন রোম্যান্টিক নায়ক হুডখোলা ক্যাডিল্যাকে নায়িকাকে পাশে বসিয়ে চুল উড়িয়ে শহর ছাড়িয়ে ‘লং ড্রাইভ’ -এ যেত, তাদের চোখে থাকত কালো রোদচশমা, ঠোঁটে গানের কলি ও বার্ডস-আই। যেদিন সে তার টিনের তোরঙ্গটি নিয়ে মার্টিন্‌স কোম্পানির লাইট রেলে চেপে সাতগাঁ ক্যাম্প অফিসে কাজে যোগ দিতে এল, সেই অনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট হারিয়ে গেল।

অফিস বলতে জনপদের বাইরে ঘাসে ছাওয়া উঁচুনীচু পরিত্যক্ত জমির মাঝে তিনটি ক্যানভাসের তাঁবু। ইতস্তত বাবলা গাছ, গরু চরছে। পাশেই সরস্বতী নদীর মজা সোঁতা। এরই মাঝে এদিক ওদিক খননের কাজ হয়েছে, তার আয়তাকার গর্তগুলো বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। চারদিকে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন আমলের টেরাকোটার টুকরো।

সুতির ঢিলা কোট-পাতলুন পরা বছর পঞ্চাশের ক্যাম্প সার্ভেয়ার কেশব কুমার গুছাইতের চেহারা দেখলে মনে হবে সাম্প্রতিক দুর্ভিক্ষে লুপ্তপ্রায় মানবগোষ্ঠীর শেষ জীবিত প্রতিনিধি। তারের চশমা নাকে গলিয়ে খুব ধীরে ধীরে তিনি নিয়োগপত্রটি পড়লেন, ততোধিক ধীর গতিতে তাঁবুর এক কোণে ব্যুরো টেবিলের দেরাজ টেনে খুলে এক খন্ড সাদা কাগজ বের করলেন।

‘এখানে আপনার জয়েনিং রিপোর্ট লিখুন।’ পকেট ঘড়ি বের করে সময় দেখে অবসন্ন গলায় বললেন ‘যদিও এখন বেলা তিনটে, আপনি ফোর-নুনই লিখুন। নাহলে আজকের বেতনটা অর্ধেক পাবেন।’

যোগদানপর্ব মিটলে অফিসের অন্যান্য কর্মচারী, অর্থাৎ দুজন বেতনভুক খননকারী, চারজন ঠিকা কুলি ও একজন পাচককে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিলেন রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে। হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে গুছাইত বললেন

‘মিস্টার চ্যাটার্জি, আজ এই মুহূর্ত থেকে আপনি আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া পরিবারের একজন সদস্য।’ যেন তার স্বীকৃতি স্বরূপ একটি বাক্স থেকে লম্বাটে সোলার টুপি বের করে তরুণ সহকর্মীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন ‘দিনদুপুরে সাইটে থাকার সময় এই জিনিসটি কখনো মাথায় পরে থাকতে ভুলবেন না। সাহেবরা এটি পরে থাকত বলেই এই চাঁদিফাটা রোদ্দুরের দেশে দুশো বছর রাজত্ব করতে পেরেছিল। জানেন তো?’

এই অব্দি বলে থেমে, বার দুই দম নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ‘তবে কী জানেন, ওরা বড়ো বেশি হুটোপাটি করেছিল। তাইতো একদিন বাক্সপ্যাঁটরা বেঁধে চলেও যেতে হলো।’

সাতগাঁর ক্যাম্পসাইটে গুছাইত ইতিমধ্যে দুটি ডিগিং সিজন কাটিয়ে ফেলেছেন। একটি প্রাচীন বাণিজ্যতরীর ফসিলের টুকরো, কিছু লোহার যন্ত্রাদি, কড়ি, প্রবাল, চীনা হরফ আঁকা পোর্সেলিনের টুকরো আর রাশি রাশি পোড়ামাটির খোলামকুচি ছাড়া কিছু তেমন মেলেনি।

‘আমাদের এই সাইটটার আশেপাশে এককালে জাহাজ নির্মাণের কারিগরদের একটা বসতি ছিল বলে অনুমান হয়। আর.ডি. সাহেব যেখানে কাজ করেছিলেন সেই সাইটটা এখান থেকে মাইল দেড়েক উত্তরে, সরস্বতী নদীর খাতের পাশে।’

রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুরাতত্ত্ব পরিবারের লোকেরা ‘আর.ডি. সাহেব’ বলে সেটা রথীন জানত। চাষিদের লাঙলের ফলায় মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলের মুদ্রা উঠে আসছে খবর পেয়ে উনি এখানে আসেন, এবং সুলতানী টাকশালের ভগ্নাবশেষ খুঁজে বের করেন।

‘এই সাতগাঁয়ে এসে আর.ডি. সাহেব এক রহস্যময় ধাঁধার সম্মুখীন হন, গুছাইত একদিন বললেন। ‘এখানে যত খুঁড়বেন, ততই দেখবেন অনেকটা নীচের লেয়ারে ওপরের সময়ের আর্টিফ্যাক্ট রয়েছে, প্রায় দুটো-তিনটে সেঞ্চুরি মিলেমিশে আছে। আসল ব্যাপারটা বুঝলেন কি, চ্যাটার্জি?’

রথীন বিস্ময়ে মাথা নাড়ে। গুছাইত রহস্যের হাসি হাসেন, দুহাতের আঙুল পরস্পরে জড়িয়ে ক্যাম্প খাটে দেহের উপরিভাগ এলিয়ে দেন ধীরে ধীরে।

‘ত্রিবেণীর নীচের দিকে সরস্বতী আর হুগলি নদী বারে বারে বন্যায় কুল ভাসিয়ে খাত বদলিয়ে মাটির স্তর দইয়ের ঘোলের মতো ঘেঁটেছে। আর.ডি. সাহেব সেটা এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে লিখে গিয়েছেন।’ চোখ বন্ধ করে মন্ত্র আওড়ানোর মতো করে গুছাইত বলেন–‘হিয়ার দা পাস্ট অ্যান্ড দা প্রেজেন্ট আর সো ইনেক্সট্রিকেবলি লিংকড দ্যাট সীকিং এ প্রপার ক্রনোলজিকাল সিকোয়েন্স ইজ অ্যাজ গুড অ্যাজ চেজিং আ মিরাজ। হা হা হা! বুঝলে চ্যাটার্জি, আমরা এখানে মরীচিকার পেছনে ধাওয়া করছি! এ কথা আমি নয়, খোদ আর.ডি. সাহেব বলে গিয়েছেন।’

কেশব কুমার গুছাইত আর্কিওলজিকাল সার্ভে বিভাগে কর্মজীবন শুরু করেছেন রথীনের বয়সে। তখনও দেশ পরাধীন, কাজ শিখেছেন পুরাতত্ত্বে নিবেদিতপ্রাণ সাহেবদের কাছে। সেই সময়ে কাজের প্রতি একধরনের নিষ্ঠা আর আবেগ হয়তো গড়ে উঠেছিল, এতকাল ধরে বিভিন্ন গুরুত্বহীন সাইটে পড়ে থেকে থেকে সেসবই শুকিয়ে মরে গিয়েছে। সন্ধ্যাবেলা তাঁবুর ভেতর কেরোসিন বাতির আলোয় পাল আমলের টেরাকোটার মুখোশের মতো গুছাইতের ভাবলেশহীন মুখে সেই অতীত উদ্দীপনার চিহ্ন খুঁজতে চেষ্টা করে রথীন।

অপরিসর তাঁবুতে দুই দিকে দুই সার্ভেয়ার বাবুর জন্য দুটি ক্যাম্প খাট আর চারিদিকে বড়ো বড়ো কাঠের বাক্সে বোঝাই আর্টিফ্যাক্ট। বাক্সগুলোকেই আসবাবের মতো করে ব্যবহার করা হয়। তৃতীয় দিন সন্ধ্যাবেলা সাইট থেকে তাবুতে ফিরে সোলার টুপিটা কাঠের খুঁটিতে পেরেকে ঝুলিয়ে বাক্সগুলো দেখিয়ে গুছাইত বললেন—

‘সপ্তাহ মাস ধরে ডিগিং চালিয়ে কী পেলে সেটা বড়ো কথা নয়, বুঝলে হে চ্যাটার্জি। আসল কথা হলো লগ বুকে রোজ কাজের খতিয়ান লিখে রাখা, আর যতদূর সম্ভব ডিটেল রিপোর্ট তৈরি করে হেড অফিসে পাঠানো।’

গুছাইত মাসে দুবার সেই রিপোর্ট জমা দিতে এবং ঠিকা কর্মীদের বেতন তুলতে কলকাতায় যান, এবং দেড় দিন ডিউটি লীভের সঙ্গে আরও দেড়দিন ফ্রেঞ্চ লীভ জুড়ে হাওড়ার ডোমজুড়ে তাঁর পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে আসেন। সাইটের রুটিন কাজ বিহারী খননকর্মী আর কুলিরাই করে। সার্ভেয়ার বাবুদের মাঝে মাঝে গিয়ে তদারকি করতে হয় আর লম্বা লম্বা খতিয়ান লিখতে হয়। শামুকের গতিতে সেই কাজ শেষ করতে করতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামে। সেজবাতির শিখা কমিয়ে দিয়ে আলোআঁধারির ভেতর ক্যাম্পখাটে চিৎ হয়ে শুয়ে গুছাইত অপেক্ষা করেন পাশের মেস টেন্ট থেকে ধূমায়িত ভাতের গন্ধ ভেসে আসার জন্য

‘আমাদের এই ক্যাম্প বসার আগে এখানে যত খোঁড়াখুঁড়ি হয়েছে, বর্ষায় বন্যায় সেই সাইটগুলো খুঁজে গিয়েছে পলিমাটিতে। তার ওপর ঝোপজঙ্গল গজিয়ে চারপাশের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছে আর আলাদা করে চেনাই যাবে না।’ বুকের ওপর দুটো হাত জড়ো করা, চোখ বোঁজা, গুছাইত কথা বলেন স্বগতোক্তির স্বরে। ‘এতদিনে যতখানি কাজ হবার কথা ছিল তার কিছুই প্রায় করা হয়নি।’

‘কেন?’ রথীন জিজ্ঞেস করে।

‘তার কারণ এখানে বেশিরভাগ দেবোত্তর জমি। মন্দির ট্রাস্ট আর ব্রাহ্মণদের সম্পত্তি। ওরা সেখানে মাটি খুঁড়তে দেবে না। এর বাইরে হুগলির পাড় বরাবর যা কিছু জমি আছে, তার বেশিরভাগটাই ছিল ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ট্রেডিং কোম্পানির দখলে। সেসব জমি এতদিনেও খাস করা যায়নি।’

‘এদিকটায় তো পর্তুগীজরা এসেছিল।’

‘পর্তুগীজ ওলন্দাজ দিনেমার আর্মানি… কে নয়? সবার নামে নামে ডাঙা আছে। পর্তুগীজরা প্রথম এসেছিল, আর সবার শেষে বিদেয় হয় ফরাসিরা। ইংরেজরা যাবার পাঁচ বছর পরে। ওদিকটায় অবশ্য সেন আমলের আগে তেমন বসতি ছিল বলে মনে হয় না। যা কিছু সরস্বতীর ধারে এই সাতগাঁর দিকটায় আছে। অনেক কিছুই আছে। কিন্তু আমাদের এই কাজে প্রধান অন্তরায় হল স্থানীয় লোকজন।’

‘তারা কারা?’ রথীন জিজ্ঞেস করে।

‘টুলো পণ্ডিত আর জ্যোতিষীদের বংশধর। দাদু-ঠাকুর্দারা কে কবে সমৃত আতপান্ন খেয়েছিল তার গন্ধ হাতে লেগে আছে, এদিকে নিজেরা সব ক-অক্ষর- গোমাংস। ওরা পাল আমলের ইঁট খুলে নিয়ে গিয়ে ঘরবাড়ি মেরামত করে, সুলতানী টেরাকোটার ম্যুরালে ঘুঁটে দেয়, আরবি থুলুথ লিপি খোদাই করা পাথর দিয়ে শিলনোড়া বানায়! কল্পনা করতে পারো? ইংরেজরা আজ থাকলে সব কটাকে ফাঁসিতে লটকাতো না?’

উত্তেজনার চোটে গুছাইত উঠে বসেন। রথীন দেখে, সেজবাতির আলোয় ওঁর অতিকায় ছায়া তাঁবুর দেয়ালে দুলছে। সোঁতার দিক থেকে হাওয়া বইতে শুরু হয়েছে, ক্যানভাস চুঁইয়ে সেই হাওয়ার শব্দে মিশছে ঝিঁঝিপোকার ডাক। তাতে মিশে যাচ্ছে গুছাইতের কন্ঠস্বর। শুনতে শুনতে ক্যাম্প খাটে হাত পা ছড়িয়ে তন্দ্রার ভেতর রথীন কল্পনা করে সাইট থেকে সামান্য দূরে এক সুপ্রাচীন জনপদ ও তার বাসিন্দাদের জীবন।

.

সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই তেমন দুজনের সঙ্গে পরিচয় হয়। বিশু মুখুজ্জ্যে আর শিবু চক্কোত্তি–নামের ধ্বনিতে যেমন চেহারাতেও তেমনই, একে অপরের পরিপূরক। শিবুর দেহ থেকে বুঝি সব মাংস খুবলে তুলে নিজের গায়ে ঝুলিয়েছে বিশু, তার বদলে দিয়েছে মাথার সব চুলগুলো। দুজনেরই পরনে আধময়লা খদ্দরের ধুতি ফতুয়া, কপালে চন্দনের ফোঁটা। সম্পর্কে ওরা দূরসম্পর্কীয় জ্ঞাতি। সাতগাঁর বনেদি পরিবার। বিশু মুখুজ্জ্যে মন্দিরের সেবাইত, শিবু চক্কোত্তি পেশায় জ্যোতিষী ও একটি ছাপাখানা চালায়। দীর্ঘ অলস দুপুর ওরা দাবা পাশা খেলে, ধর্মতলায় বটের নীচে আফিমখোর গেঁজেলদের ঠেকে আড্ডা দিয়ে, সরস্বতীর সোঁতায়–লোকমুখে যার নাম ছাড়িগঙ্গা–ছিপ ফেলে অতিবাহিত করে। এক সন্ধ্যায় নবাগত অ্যাসিস্টেন্ট সার্ভেয়ারটির সঙ্গে আলাপ করতে এল।

রথীনের বিশদ পরিচয় জেনে বিশু মুখুজ্জ্যে বলে–‘অ, বাঙাল!’

‘তবে চাটুজ্যে বামুন!’ শিবু টিপ্পনী কাটে।

হাতের ছিপ তাঁবুর খোঁটায় হেলান দিয়ে রেখে বিশু পা তুলে বসে প্যাকিং বাক্সের ওপর।

‘তা বটে। কিন্তু পুকুর খোঁড়ায় বামনাই কীসে লাগে?’

‘পুকুর খোঁড়া?’ রথীন অবাক হয়।

‘বই তো কী?’ বিশু ঠাকুর ভুঁড়ির ওপর হাত বুলিয়ে হাসে। ‘মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে চাদ্দিকে বড়ো বড়ো খোঁদল বানিয়ে আর গাদাখানেক খোলামকুচির জঞ্জাল তুলে কার উবগারটা হচ্ছে শুনি? দুনিয়ার সবাই জানে এ হল আদ্যিকেলে থান।’

‘সেটা আমাদের থেকে ভালো আর কে-ই বা জানে?’ শিবু এক টিপ নস্যি নাকে টেনে ধুতির খোঁটায় নাক ঝেড়ে বাক্সগুলো দেখিয়ে বলে ‘এক হপ্তার মধ্যে আমরা অমন বিস্তর খোলামকুচি তুলে আনতে পারি যা তোমরা বাপু ছ মাস ধরে মাথা কুটলেও পাবে না।’

‘পারি তো!’ বিশু ঠাকুর মাথা নাড়ে। ‘কিন্তু আমাদের সেসব করার সময় কই!’

জানা যায়, উনত্রিশ জন ভিন্ন ভিন্ন কুলদেবতা নিয়ে একটি ঠাকুরবাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের ভার রয়েছে বিশু মুখুজ্যের ওপর। সেই দেবতাদের প্রত্যেকের আলাদা জাতি গোত্র, আলাদা রুচি, পুজোআর্চা আরতির সময়, উপাচার ও ভোগের মেনুও আলাদা। বিশু ঠাকুরকে এই সবকিছু একা হাতে সামলাতে হয়। এদিকে শিবু ঠাকুরের জ্যোতিষচর্চার গুমটি ঘর আছে ডকবাজারে, সেখানে সে কোষ্ঠীবিচার করে। সেইসঙ্গে একটি পুরোনো পারিবারিক প্রেস চালায়। এককালে সেখানে বিখ্যাত পাঁজি ছাপা হতো, এখন দোকানের বিল রসিদ ছাপা হয়।

‘লোফার!’

ওরা চলে যাবার পর ক্যাম্প খাটে শায়িত গুছাইত বলেন। কিন্তু যতক্ষণ ওরা থাকে তিনি শত প্ররোচনাতেও মুখ খোলেন না। খাতা খুলে হিসেব পত্তর লেখেন, নয়তো বুকের ওপর হাত জড়ো করে চিৎ হয়ে শুয়ে উৎকর্ণ হয়ে থাকেন মেস টেন্টে ভাত ফুটে ওঠার শব্দে। তাঁর ধৈর্যের কারণ রথীন জানতে পারে ক্রমশ। ছাড়িগঙ্গায় ছিপ ফেলে ঘরে ফেরার পথে মাঝেসাঝেই শোল পাঁকাল জাতীয় মাছ গুছাইতকে উপহার দিয়ে যায় ওরা।

মাছ ধরাটা নেশা, কিন্তু সব মাছ তো আর ব্রাহ্মণের ভোজ্য নয়।

‘কনৌজি ব্রাহ্মণেরা মাছ খায় না,’ শিবু চক্কোত্তি ব্যাখ্যা করে। ‘তবে এই সাতগাঁ হলো গিয়ে মৎস্যভূমি। সত্যযুগের শেষে মহাপ্লাবনের সময়ে ভগবান বিষ্ণু মৎস্যের রূপ ধরেছিলেন। তা’বলে সব মাছ শাস্ত্ৰীয় নয়।’

‘যে মাছের রঙ হবে রুপোলি, যার গায়ে আঁশ থাকবে, এবং যার আকার হবে বর্শার ফলার মতো, কেবলমাত্র সেইসব মাছ শাস্ত্রীয়,’ বিশু বলে। ‘সেই মাছ ভক্ষণ চলতে পারে।’

গুছাইত এবং রথীনের অবশ্য কোনো মাছেই অরুচি নেই, মুফতে পাওয়া সোঁতার টাটকা মাছে তো নয়ই। এবং সেই কারণে রথীনের সিগারেটে বিশুদের ন্যায্য অধিকার জন্মায়। অন্ধকার নামার আগে সাইট থেকে ফিরে রথীন যখন ক্যাম্প খাটে হাত-পা ছড়িয়ে বসে, কুক এসে চা দিয়ে যায়, তখন প্রায় দিনই এসে উপস্থিত হয় দুই সাতগাঁইয়া। খেঁটো ধুতি হাঁটুর ওপর তুলে বাক্সের ওপর মৌজ করে বসে বিশু বলে–

‘কই হে চাটুজ্যেবাবু, দাও দিকি তোমার বাডসাই একখান।’

রথীন প্যাকেট খুলে সিগারেট বাড়িয়ে দেয়। ‘আপনাকে কতবার বলেছি না এ বার্ডসআই নয়, এ হল পাসিং শো। বার্ডস আই যেকালে পাওয়া যেত তখন আমি সিগারেট ধরিনি।’

‘ওই হলো বাপু! যার নাম পরমেশ্বরী তারই নাম পাঁচি!’

সিগারেটটা মুঠির ফাঁকে ছিলিমের মতো ধরে রামটান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বিশু মুখুজ্যে বলে গুপ্তধন শিকারীদের কথা, এক সময়ে যারা শাবল বেলচা নিয়ে সুলতানি মোহরের খোঁজে নদীর খাতে জেগে থাকা পোড়ো টাঁকশালের ধ্বংসাবশেষে হানা দিত।

‘তবে তারা আসত নিঝুম রাতে। তোমাদের মতো দিনদুপুরে মিছিমিছি মাটি খুঁড়ত না।’

‘মাস গেলে সরকারি মাইনেও পেত না।’ শিবু বলে।

‘ইংরেজরা পাততাড়ি গুটিয়ে পগাড় পার হলো, দেশটা যে কাদের হাতে ছেড়ে গেল!’ বিশু গোড়ালি টিপতে টিপতে আনমনা হয়ে পড়ে।

‘আমি শুনেছি কলকাতায় নাকি হুগলির ঢেউ গোনার জন্য সরকারের মাইনে করা লোক আছে।’ শিবু রথীনের দিকে ফিরে শুধোয়। ‘এটা কি সত্যি?’

রথীন জবাব দেবার আগেই বিশু ধমকের সুরে বলে, ‘আলবাৎ সত্যি! নদীতে বড়ো বান ডাকলে কেল্লা থেকে ঢেউয়ের মাথায় কামান দাগে তো, জানিস নে? নইলে জাহাজঘাটায় ঠোকাঠুকি লেগে জাহাজ ভেঙে যাবে না?’

‘আমার এক ভায়রার মুখে শুনেছি কলকাতায় সদাগরী আপিসে নাকি লোক থাকে যাদের কাজ হলো সারাদিন জিভ বের করে উবু হয়ে টেবিলের মাথায় বসে থাকা।’–শিবু তার লিকলিকে ঠ্যাঙদুটো বাক্সে তুলে উবু হয়ে লম্বা জিভ বের করে। ‘এইরকম!’

‘তারা কী করে?’ রথীন জানতে চায়।

‘তারা নিজেরা কিছু করে না। ক্যাশিয়ার বাবুরা সারাদিন ধরে মোটা মোটা নোটের বান্ডিল গোনার সময়ে থেকে থেকে ওদের জিভে আঙুল ছুঁইয়ে ভিজিয়ে নেয়।

‘তোর ভায়রা তবে কোনোদিন কলকেতার বড়োবাজারে যায়নি, বিশু বলে। ‘গেলে দেখত ওখানে কত ধরনের পেশার লোক আছে। মাড়োয়াড়িগুলো সারাদিন গদিতে উপুড় হয়ে নোটের বান্ডিল গোনে আর ভয়সা ঘিয়ের ভুজিয়া খায়। এত মোটা হয়ে যায় যে বাতকৰ্ম্ম করতেও চাকর লাগে।’

খিকখিক করে হেসে ওঠে শিবু। ‘সত্যি?’

‘সত্যি না তো কি মিথ্যে?’ বিশু খেঁকিয়ে ওঠে। ‘বাতকম্ম পেলেই হাতের সামনে ঘন্টায় চাঁটি মারে খটাং! চাকর এসে বিরাট ঢোলের মতো পাছাখানা তুলে ধরে, শেঠজী তখন গুড়ুম গুড়ুম করে তোপ দাগে!’

চোখ বুজে মটকা মেরে শুয়েছিলেন গুছাইত। হাসি চাপতে তিনি হাই তোলার ভান করে ঠোঁটের ওপর তিনবার তুড়ি মেরে বলেন, ‘আজ মনে হয় ঠাকুরমশাইয়ের দু ছিলিম বেশিই হয়ে গেছে!’

কলকাতা থেকে মাত্র তিপ্পান্ন কিলোমিটার দূরে একটি জনগোষ্ঠী বহু শতাব্দী ধরে এক নদীবেষ্টিত স্থানে বাস করে আসছে। এক অনড় মন্থর জীবনছন্দ, সেখানে দৈনন্দিন যাপনের জমে ওঠা জঞ্জালের নীচে চাপা পড়ে যেতে থাকে অতীত। সরস্বতী নদীটিও চারশো বছরে আগের এক ফিকে স্বপ্ন বই কিছু নয়। মধ্যযুগের খিলান, গম্বুজ ও অনান্য পোড়ামাটির স্থাপত্যচিহ্ন উপর্যুপরি বন্যা আর খাতবদলের পলির নীচে হারিয়ে গিয়েছে। চওড়া দেয়াল ও ভিতের উল্লম্ব অংশ কিছু কিছু মাধ্যাকর্ষণ উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থেকেছে, যতদিন না নরম মাটি তাদের ভূগর্ভে টেনে নেয়, কিংবা ঝোপঝাড়ে ঢেকে যায়। সাতগাঁর আশেপাশে এখনও পুকুর কিংবা নতুন বাড়ি নির্মাণের ভিত খুঁড়তে গিয়ে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ থেকে শুরু করে চীনা হরফ আঁকা পোর্সেলিনের টুকরো, আদি বাংলার লিপি খোদাই করা পাথরের ট্যাবলেট, প্রবাল, পুঁতি ও কড়ি উঠে আসে।

নরম মোলায়েম পলিমাটি কেকের মতো করে কেটে তার খাড়া গা থেকে প্রত্নবস্তু বুরুশ দিয়ে খুবলে আনা, বেতের ছোটো ঝুড়িতে ধুলো চেলে বের করে আনা, সারাদিনে কী মিলল আর কী মিলল না তার অনুপুঙ্খ খতিয়ান লেখার ক্লান্তিকর কাজের পর সন্ধ্যায় এই দুই সাতগাঁইয়ার সঙ্গ রথীনের ভালো লাগে না। ক্রমশ সে বুঝতে পারে, বিশু মুখুজ্জ্যে আর শিবু চক্কোত্তির মতো মানুষদের কাছে সাতগাঁ নামক এই নদীবেষ্টিত ভূখন্ডে যা আছে তাই নিয়েই পৃথিবী, এখানে যা নেই তা পৃথিবীতে কোথাও নেই।

কলকাতার জন্য তার মন উচাটন হয়। সদ্য ছেড়ে আসা কঠিন দারিদ্র্যের দিনগুলোয় মহানগরের যে মহার্ঘ্য ভোগ্যসম্ভার অলীক স্বপ্ন ছিল, এখন তার কিছু কিছু দিয়ে রথীন ভরিয়ে দিতে পারে অন্তত মাসের প্রথম রবিবারটা, পার্ক স্ট্রিটে ফ্লুরিজে ব্রেকফাস্ট দিয়ে শুরু হয়ে যা শেষ হতে পারে চৌরঙ্গিতে মেট্রো সিনেমায় শেষ ইংরিজি শোয়ে, এমনকি তারও পরে নিজামের কাঠি রোলে। প্রতি শুক্রবার দুপুর ১.২৫-এর মার্টিন্‌স রেল ধরে বন্দর-হুগলি হয়ে হেড অফিসে যায় সপ্তাহের রিপোর্ট জমা দিতে। এতদিনে কলকাতা শহরে তার একান্ত নিজের একটি ঠিকানা হয়েছে। সন্তোষ রায়চৌধুরী বড়োবাজারে খাতা লেখার কাজ থেকে অবসর নিয়ে চলে গিয়েছেন রামরাজাতলায় বোনের কাছে, ২৩/৩ কলুটোলা লেনের ভাড়াটিয়া স্বত্ব দিয়ে গিয়েছেন রথীনকে। সেখানে আজকাল প্রায়ই তার জাঠতুতো খুড়তুতো ভাইবোনেরা এসে ওঠে।

এই ব্যবস্থায় কেশব গুছাইতও সন্তুষ্ট। তিনি এখন তিনটি আস্ত দিন ডোমজুড়ে পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে আসতে পারেন। তরুণ সহকর্মীটির প্রবল কলকাতা প্রেম তিনি মনে মনে উপভোগই করেন। তিনি জানেন, ফিল্ড সার্ভেয়ারের চাকরিতে মাসের পর মাস বিজন পান্ডববর্জিত স্থানে নিষ্ফল মাটি ছেনে রিপোর্ট লিখে আর তাঁবুতে রাত কাটিয়ে যৌবনের এই উদ্দীপনা অচিরেই ঝুরঝুর করে ঝরে যাবে গঙ্গারিডি আমলের অ্যাম্ফোরার মতো।

কিন্তু গুছাইত জানেন না, তরুণ সহকর্মীটি এই জীবন থেকে নিষ্ক্রমণের পথ খুঁজছে। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। তাঁবুর এক কোণে কাঠের বাক্স দিয়ে টেবিল বানিয়ে সেটির ওপর কুরুশের কাজ করা টেবিলঢাকা পেতে, টেরিটি বাজার থেকে শৌখিন চীনা লন্ঠন কিনে ইতিহাস, সিভিক্স, ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রির বই এনে সাজিয়ে রেখেছে (শেষের দুটি প্রিয় বিষয় সে শেষপর্যন্ত কলেজে পড়তে পারেনি)। বাঁশের গায়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের যুগলে ফ্রেমবাঁধানো ছবি।

‘এই লোকটা কে?’ কবির পাশে একমাথা কাশফুলের মতো চুল লোকটাকে দেখিয়ে জানতে চায় বিশু ঠাকুর।

‘অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক

‘তুমি কমিউনিস্ট নাকি হে?’ বিশু চোখ সরু করে তাকায়, তারপর ব্যাখ্যা করে। ‘আমার মামাতো ভাইয়ের ছেলে হেমন্ত দেয়ালে রবিঠাকুরের ছবি ঝোলাতো আর সারাক্ষণ গুনগুন করে তেনার গান ভাঁজতো। সে ব্যাটা কিছুদিন কমিউনিস্ট হয়েছিল, এখন অবশ্য শুধরেছে।’

‘রবিঠাকুর কমিউনিস্ট ছিলেন এটা তো জানা ছিল না!’ রথীন বলে।

‘তার থেকেও খারাপ।’ বিশু নাক কুঁচকে বলে। ‘রবিঠাকুর বাঙাল ছিল! তেনার বাপঠাকুদ্দারা মোছলমানের হাতে ভাত খেয়ে পতিত পীর-আলি বামুন হয়েছিল। বাবা অদ্বৈত বেদান্ত থেকে ঝেঁপে দিয়ে নতুন ধম্মো আবিষ্কার করেছে বলে ঢাক পিটিয়েছিল, বীরভূমে আখড়া বানিয়েছিল। পুত্রটি আরও সরেস। তিনি সেখানে ছেলেমেয়ের অবাধ মেলামেশা, বনে জঙ্গলে নাচনকোঁদনের বন্দোবস্ত করেছিলেন। ভালো ভালো ঘরের মেয়েরা সেই ফাঁদে পা দিয়ে কলকাতায় স্টেজে উঠে মুজরো বসায় বাইজিদের মতো।’

রথীনের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি প্রসারিত হয়। বলে–‘রবীন্দ্রনাথ কিন্তু বাঙাল ছিলেন না। ওঁর বাস্তুভিটে ছিল কলকাতায় জোড়াসাঁকোয়।

‘আরে বাপু পদ্মাপারে জমিদারি তো ছিল নাকি? যেখান থেকে ভাতকাপড়ের বন্দোবস্ত হতো?’ বিশু বলে। ‘কলকেতায় কারোর আবার বাস্তুভিটে হয় নাকি!

বিশু ঠাকুর বার কয়েক হাওড়া স্টেশন দিয়ে কাশী গিয়েছে, কিন্তু জীবনে কখনো নদী পেরিয়ে কলকাতা শহরে পা রাখেনি। হুগলি-সরস্বতীতে ঘেরা সাতগাঁর মৎস্যভূমির ব্রাহ্মণেরা সচরাচর কখনোই কোথাও যায় না। খুব যারা গোঁড়া, তারা এমনকি হুগলির পাড় বরাবর ম্লেচ্ছ ফিরিঙ্গিদের শহরগুলোও কখনো মাড়ায় না। কেউ কেউ অবশ্য সাতগাঁ ছেড়ে কাশী যায় শেষবারের মতো, মোক্ষলাভের বাসনায়।

ছাপাখানার সরঞ্জাম কিনতে শিবু চক্রবর্তীকে মাঝেসাঝে কলকাতায় যেতে হয় বটে, তবে নির্ঝঞ্ঝাট সরকারি চাকরি জুটিয়ে নিয়েও মানুষ যে কেন লেখাপড়া করে সেটা তার মাথায় ঢোকে না। সিগারেটে সুখটান দিয়ে রথীনের বইগুলোর দিকে আঙুল নির্দেশ করে বলে–

‘আমিও পড়ি বইকি! তবে সেসব কমপোজে গাঁথা ছাপার ম্যাটার। আমার সেজখুড়ো মস্ত নৈয়ায়িক শাস্ত্রীমশাই পুথি পড়েন, কারণ সেটা তাঁর জাতধম্মো। আদিরামবাটির টোলে হাজার হাজার পুথি আছে। কিন্তু এইসব গরুখোর সাহেবদের লেখা বই তোমার ঐ পুকুর খুঁড়তে কী কাজে লাগে?’

এই সময়ে রথীন তার তাঁবুজীবনের অভিজ্ঞতা চিঠিতে লিখত রুপু আর চিনিকে। খোকারা তখনও গৌহাটি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেনি। দুই নিষ্কর্মা গেঁজেল বামুনের গায়ে-পড়া সঙ্গ বড়ো বিরক্তিকর লাগত তার। কিন্তু তবুও রাতে খাওয়াদাওয়ার পাট চুকলে ক্যাম্প খাটে শুয়ে, ক্যানভাস ছুঁইয়ে আসা ক্ষীণ চাঁদের আলোয় গুছাইতের নাসিকাধ্বনি আর মশার গুঞ্জন ছাপিয়ে প্রহরে প্রহরে শিয়ালের ডাক শুনতে শুনতে মনে হতো এই বিজন মাঠের প্রান্তে ওই অচেনা জনপদে তবু তো দুজন মানুষ রয়েছে যাদের সে চেনে।

.

রাত বাড়লে শিয়ালগুলো ছাড়িগঙ্গায় ভেসে আসা মৃত পশুর সন্ধানে আসে। দিনের বেলা লুকিয়ে থাকে ধর্মতলার প্রাগৈতিহাসিক বটের ছায়ায়। বটগাছটি সাতগাঁর প্রাচীনতম জীবন্ত সত্তা। মহাপ্লাবনের পর জল থেকে জেগে উঠল এই মৎস্যাকৃতি ভূমি, কনৌজের সাত রাজপুত্রের ময়ূরপঙ্খী পাড়ে এসে লাগল, সেই তখন থেকেই গাছটি আছে। মহীরুহের ছায়ায় ধর্মঠাকুরের কচ্ছপাকৃতি পাথরটি কবে থেকে রয়েছে কেউ তার হিসেব রাখেনি। ম্যাওবেড়ালের গির্জা হবার আগে এই বটগাছটিই ছিল সবচেয়ে উঁচু ভূনির্দেশিকা। কুয়াশাচ্ছন্ন দিনে নাবিকেরা বটগাছের মাথা দেখে সরস্বতীর ছলনাময়ী খাতে দিক নির্ণয় করত।

চৈতন্যদেব তাঁর বাইশজন শিষ্য নিয়ে এসে ধর্মতলায় দুটি রাত কাটিয়েছিলেন। তারপর থেকে এতকাল কত যে সাধুসন্ত ঠগ-ডাকাত লম্পট-জোচ্চোর, কত যে পাখি তক্ষক হরিণ শিয়াল ভামবিড়ালের নিশ্চিন্ত আশ্রয় হয়েছে আড়াই বিঘা জমির ওপর ঝুরিনামানো এই বটের পরিবার, তার কোনো লেখাজোকা নেই। ধর্মঠাকুরের থানে ইঁটের বেদির ওপর কচ্ছপাকৃতি পাথরে এলাকার অন্ত্যজ অচ্ছুতেরা চিনির ডেলা আর পোড়ামাটির ঘোড়া চড়ায়। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় যেবার সাতগাঁয় এলেন, পিঠে ডুমো ডুমো দাগ প্যালিওআর্কটিক কচ্ছপের আকারের পাথরটিকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল এটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের বুদ্ধমূর্তির মস্তকের উপরিভাগ। তাঁর অনুমান ছিল, দেহের বাকি অংশটি ওই ইটের বেদীর নীচে চাপা পড়ে রয়েছে। পাল রাজাদের কাল শেষ হবার পর এই অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অত্যাচার করে তাড়ানো হয়। তখনই সম্ভবত বাসাল্টের মূর্তিটি মাটিতে পুঁতে দিয়ে শুধুমাত্র ওই মাথার অংশটুকু ধৰ্ম্ম-রূপে পূজিত হতে থাকেন। কিন্তু আর.ডি. সাহেবের অনুমান পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব হয়নি; ধর্মঠাকুরের বেদিতে জমাট বাঁধা বটের ঝুরির মতো আগলে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের ধর্মবিশ্বাস।