সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১.২

১.২

ছোটোবেলায় মায়ের সঙ্গে বাপ্পার সাতগাঁ যাওয়াটা ছিল কোনো-না-কোনো মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। এবং সেটা সাধারণত ঘটত শীতকালে। রথীনের পরিবার –কলকাতায় পরিবারের যে অংশটাকে সে দেখতে পেত—যদি হয় যৌবনের প্রাচুর্যে ভরা, তাহলে সাতগাঁয় শিউলির পরিবার ছিল বার্ধক্যে আচ্ছন্ন। অন্তত সেই বয়সে বাপ্পার তেমনই মনে হতো। শীতকালে শুকনো পাতা ঝরার মতো সেখানে আত্মীয়বিয়োগ ঘটত। টেলিফোন বেজে উঠত ভোররাতে। স্তব্ধ প্রহরে দমকলের ঘন্টির মতো সেই আওয়াজে প্রথম বিছানা ছেড়ে উঠত রথীন।

‘শিউলি, সাতগাঁ থেকে!’ রিসিভারটা স্ত্রীর হাতে দিয়ে নীচু স্বরে ‘বুড়িপিসিমা, শ্বাস উঠেছে!’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা আসছি। ঘাটে নিয়ে যাবার আগেই ঠিক পৌঁছে যাব।’–বলে শিউলি রিসিভারটা নামিয়ে রাখল ধীরে ধীরে, যেন ঘুমন্ত সরীসৃপ। বাপ্পা লেপের ফাঁক দিয়ে ঘুমজড়ানো চোখে দেখছে সেই দৃশ্য। রথীন ছোট্ট হাই তুলে ঠোঁটে তর্জনীর টোকা মেরে বলল–‘বুড়ির আর কতবার শেষ শ্বাস উঠবে, শিউলি?’

ওর দিকে আহত দৃষ্টি হেনে শিউলি ঘন কোঁকড়ানো চুলের গোছা দুহাতে মাথার পেছনে তুলে গিঁট বাঁধল একটা। অস্ফুটে বলল–‘এবার ওরা অন্তর্জলীযাত্রার বন্দোবস্ত করছে!’

ততদিনে অন্তর্জলীযাত্রা ব্যাপারটা কী বাপ্পা জেনে গিয়েছে, এবং যত তাড়াতাড়ি সে নিজেই হাতমুখ ধুয়ে জামাকাপড় পরে তৈরি হতে শিখেছে, তার চেয়েও দ্রুত শিউলি গুছিয়ে নিয়েছে সেই কালো-বাদামি চৌখুপি চামড়ার ব্যাগটা, যেটা সাতগাঁ যাবার সময়ে ওদের সঙ্গে যেত। এবং টেবিলে এনামেলের বাটিতে বাপ্পার জন্য প্রস্তুত ধূমায়িত ফেনা ভাত, তাতে ভাসমান পলসনের মাখন এক খাবলা।

‘তুমি কি পরে একবার আসবে?’ দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে গলিতে নামতে নামতে শিউলি জিজ্ঞেস করত রথীনকে। উত্তরের অপেক্ষা করত না, কারণ উত্তরটা শিউলি জানত। এবং শিউলি যে জানে সেটাও রথীন জানত। ভোরের বেফাঁস মন্তব্যের পর কন্ঠস্বরে কিছু বাড়তি অসহায়তা এনে সে আওড়াতো, ‘কী করে যাব শিউলি, জানোই তো বছরের এই সময়টা অফিসে কত কাজ জমে থাকে।’

‘আমি যেদিন মরব সেদিনও তোর বাবা অফিস করবে, দেখিস!’ শিউলি একবার ঠাট্টা করে বলেছিল বাপ্পাকে, এবং অদ্ভুতভাবে সেটা সত্যিও হয়, যদিও শিউলি যা বলতে চাইছিল ঠিক সেভাবে নয়। তবে সে অনেককাল পরের কথা, মি’লেডি।

বাপ্পার ছোটোবেলায় সেইসব শীতের ভোরে রথীন ওদের গলির মুখে ট্রামের স্টপ পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসত। বাপ্পাকে পাদানিতে তুলে দিয়ে চুলে আলতো বিলি কেটে দিত আর শিউলির দিকে ফিরে হাত নাড়ত। বাপ্পা চলন্ত ট্রামের জানলা দিয়ে দেখছে ঘুমন্ত শহরটা জাগছে, সারি সারি শাটার-নামানো দোকানের মাথায় সাইনবোর্ডে ছবি দেখে কীসের দোকান মনে মনে আন্দাজ পাবার চেষ্টা করছে, দেখছে চায়ের দোকানের সামনে গুটিশুটি মানুষের ভিড়, দুহাতে অঞ্জলির মতো ধরা মাটির ভাঁড় থেকে ধোঁয়া উঠছে, দেখছে গঙ্গার দিক থেকে স্নানার্থীর দল ভিজে কাপড়ে ফিরছে, তাদের কম্পিত ঠোঁটনিঃসৃত প্রার্থনা শীতবাস্প হয়ে উঠছে কমিকস বইয়ে কথার বুদবুদের মতো। তারপর যখন ট্রামগাড়িটা হ্যারিসন রোড থেকে বাঁক নিয়ে কুয়াশায় মুড়িঝুড়ি ঘুমন্ত নদীর ওপরে উঠে পড়বে, হাওড়া ব্রিজের অতিকায় ক্যান্টিলিভারে গম্ভীর কাড়া-নাকাড়া বেজে উঠবে কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গের মতো।

হাওড়া স্টেশন থেকে হলদে-সবুজ লোকাল ট্রেনে চেপে একঘন্টায় বন্দর- হুগলি জংশন, সেখান থেকে গাড়ি বদল করতে হয়। সাতগাঁ যাত্রার সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্বটা শুরু হয় এখান থেকেই। স্টেশনের উত্তর প্রান্তে প্ল্যাটফর্ম যেখানে ঢালু হয়ে রেলের লাইনে মিশেছে, তার ডানদিকে রয়েছে নীচু লাল টালির ছাউনি। একটি ন্যারোগেজ রেলের লাইন বেঁকে গিয়েছে সবুজ গাছগাছালির ভেতর। ছাউনির নীচে দাঁড়িয়ে একটি ছোট্ট খেলনা রেলগাড়ি–বোতল-সবুজ রঙে সোনালি ট্রিমিং দেওয়া তিনটি কামরা আর একটি লাল-কালো ইঞ্জিন, তার বয়লারের গায়ে খোদাই করা–W.G. Bagnall and Company, Stafford। চিমনিটি ফানেলের আকারের, আর বয়লারের মুখের সামনে সাদা রঙের কাউক্যাচারের জাল–দেখলেই বাপ্পার মনে হতো ইঞ্জিনটা দাঁত বের করে হাসছে।

ক্ষুদে ডেল্টা ক্লাস ইঞ্জিনটি ইংল্যান্ডের স্ট্যাফোর্ড শহরে তৈরি হয়েছিল মিশরে পিরামিডের গর্ভ থেকে প্রত্ন ধনরত্ন নীল নদের উপত্যকা দিয়ে বন্দরে টেনে আনার জন্য। অনেক পরে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাপনার বিচিত্র খামখেয়ালে এটি বাংলার মার্টিন্‌স ফিডার রেলওয়ে কোম্পানির হাতে আসে। একটিই ট্রেন সারাদিনে আট বার বন্দর-হুগলি থেকে সাতগাঁ এগারো মাইল পথ আসা-যাওয়া করত, হুগলি আর সরস্বতী নদীর মাঝে মাছের আকারের ভূমির পৃচ্ছ থেকে মাথা পর্যন্ত, যেখানে এসে গঙ্গা মুক্তবেণী হয়েছে।

বন্দর-হুগলিতে গাড়ি বদলের সময়টা খুব অল্প, আর একবার মার্টিন্‌স কোম্পানির ছোটো গাড়ি ছেড়ে গেলে পরের গাড়ির জন্য প্রায় দুই ঘন্টার অপেক্ষা। ততক্ষণে হয়তো মৃতের অন্ত্যেষ্টিকর্ম হয়ে যাবে। তাই প্ল্যাটফর্মে নেমেই শুরু হবে মা-ছেলের বিপজ্জনক অ্যাডভেঞ্চার। শিউলি বাপ্পার হাতটা বগলের কাছে খামচে ধরবে, আর তারপর দুজনে ছুট-ছুট-ছুট সময় বাঁচাতে দুটি স্টেশনের সংযোগকারী ফুটব্রিজ এড়িয়ে, প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে ঢালু দিয়ে নেমে নুড়িপাথরের বিছানায় লাইনের গুচ্ছ পেরিয়ে নীচু টালির ছাউনিটার দিকে দে-ছুট। শীত সকালের আলোয় ইস্পাতের লাইনগুলো চিকচিক করছে ব্লেডের মতো, সিগন্যাল পোস্টে রক্তলাল চক্ষু মটমট করছে, লাল-কালো ইঞ্জিনটা বুক ভরে বাস্প নিয়ে দমবন্ধ করে দেখছে, হুইসিলের লিভারে হাত রেখে নীল উর্দিপরা, মাথায় নীল ফেট্টি-বাঁধা লোকো ড্রাইভার দেখছে, ধবধবে সাদা কোট-প্যান্টালুন পরা গার্ডসাহেব সবুজ পতাকা হাতে উৎকণ্ঠাভরে দেখছে, এক বেপরোয়া নারী ও এক ছোট্ট বালক একের পর এক রেললাইন পার হয়ে ছুটে আসছে। ওরা কামরায় উঠে পড়তেই হুইসিল বেজে উঠবে, ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করবে ট্রেনটা।

‘আমায় ছুঁয়ে দিব্যি কাট বাবাকে কক্ষনো লাইন পেরোনোর কথা বলবি না!’ শিউলি দম নিতে নিতে বলবে।

বাপ্পা, তখনও মায়ের বজ্রমুঠিতে ধরা, বলবে–‘দিব্‌বি কাটছি মা কক্‌খুনো বলব না!’

উপহারের বাক্স যেমন রঙীন রিবনে বাঁধা থাকে, সেভাবেই বাপ্পার ছেলেবেলার সাতগাঁ বাঁধা ছিল গুচ্ছ গুচ্ছ দিব্যিতে। ‘আমায় ছুঁয়ে দিব্যি কাট…’–লুকিয়ে হেঁশেল থেকে খাবার চুরি করে ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতে নিতে দিদিরা যেমন করে বলে, অনেকটা সেই ভঙ্গিতেই বলত শিউলি। বাপ্পাও চিরবাধ্য ছেলের মতো দিব্যি কাটত। মামাবাড়ির লোকজনের মাঝে থাকলে শিউলি মুখ ফুটে কিছু বলত না, শুধু ছেলের মাথায় আলতো করে হাত ছুঁইয়ে বিশেষ ভঙ্গিতে তাকাতো। সেই ছোট্ট বয়সেই বাপ্পা শিখে গিয়েছে কোন স্মৃতি মনের কোন খোপে রাখতে হয়, কোন খোপটা কলকাতার আর কোনটা সাতগাঁর। এ যেন দুটি ভিন্ন দেশে দ্বিনাগরিকত্ব, দিব্যিগুলো ছিল যাতায়াতের পাসপোর্ট।

.

মি’লেডি, সাতগাঁর জন্মের পঞ্জীকরণ হয়নি। এই সংক্রান্ত কোনো নথি কোথাও নেই। তবে সবাই জানে তার জন্মদাতা কনৌজের রাজা প্রিয়বন্তের সাত পুত্র। তাঁরা ছিলেন পৌরাণিক হিপি। রাজপ্রাসাদের বিলাসব্যসনে হাঁপিয়ে উঠে একদিন সাত ভাই গৃহদেবতা রামের বিগ্রহ নিয়ে সাত ময়ূরপঙ্খীতে ভেসে পড়ল গঙ্গায়। তারপর অনেক কুজ্ঝটিকাময় অরণ্য, অনেক রৌদ্রচুম্বিত উপত্যকা, বণিক ও তীর্থযাত্রীতে মুখরিত অনেকানেক জনপদ পেরিয়ে ভাসতে ভাসতে এসে পড়ল পুবের এই বঙ্গদেশে। এ ছিল ত্যাজ্যভূমি। যযাতি তাঁর তৃতীয় পুত্র দ্রুহুকে এখানে নির্বাসন দেন। আর্যাবর্তের কেউ বঙ্গের মাটিতে পা রাখলে স্বদেশে ফিরে প্রায়শ্চিত্তকর্মের প্রথা ছিল। কিন্তু সাত রাজপুত্র ভেসে এসেছিল পবিত্র গঙ্গাবক্ষে। রাজমহল পাহাড় পেছনে ফেলে ক্রমশ দক্ষিণে ভেসে আসতে আসতে দুপাড়ে মাইল মাইল সবুজ পলিমাতৃক ভূমি আর মিঠে দখিনা বাতাসে তাদের চিত্ত চঞ্চল হল, ময়ূরপঙ্খীর রেশমি পালগুলো ব্যাগপাইপের মতো ফুলে উঠে তাদের হৃদয়ে বেজে উঠল অশ্ৰুত সঙ্গীত, মখমল তৃণভূমিতে শরত মেঘের মতো সাদা গাভীর দুধ আর জুঁইয়ের পাপড়ির মতো ভাত আস্বাদন করে জিভে সুপ্ত স্বাদকোরকগুলি ফের জেগে উঠল। এক অপরাহ্ণে তারা এসে পড়ল সেখানে, যেখানে গঙ্গা মুক্তবেণী হয়েছে ত্রিধারায়। গঙ্গার দুই শাখা ভাগীরথী আর সরস্বতীর মাঝে পলি জমে জমে সৃষ্টি হয়েছে এক আশ্চর্য মৎস্যাকৃতি ভূখন্ড–মহীরুহে ছাওয়া, পাখির কলকাকলিতে মুখরিত, পত্রপল্লবের ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যের রশ্মিতে ছোপানো চিত্রল হরিণ দলে উষ্ণ সজীব এক বনাঞ্চল।

তারা ঠিক কীসের সন্ধান করছিল, কীসের খোঁজে তারা রাজপ্রাসাদের বিলাসব্যসন ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল, সেই অনির্বচনীয় রহস্য সাত রাজপুত্র আবিষ্কার করল একযোগে। একটিও বাক্যবিনিময় হলো না, সাত ভাই পরস্পরের দিকে চাইল কেবল। তীরে এসে ভিড়ল সাত তরী।

এখানে বাস করে বঙ নামে এক প্রোটো-দ্রাবিড়ীয় জনজাতি। তাদের দেবতার নামও বঙ, কিংবা বোঙা। রাজপুত্রেরা দেখল, এই বঙরা মোটেই হিংস্র বৈরী স্বভাবের নয়, যেমনটা তারা জেনেছিল। ওদের মুখমন্ডলে তিনটি চোখ বা পায়ে ক্ষবও নেই যেমনটা পরিব্রাজকেরা লিখেছিল। এক শান্তিপ্রিয় জাতি, যারা নরম ভাষায় কথা বলে, সরিষার তেলে রান্না করে, গোড়ালিমুক্ত চটি পরে, আর অঙ্গে জড়ায় সেলাইবিহীন এক ধরনের বস্ত্র, যা পালকের মতো হালকা আর কুয়াশার মতো অর্ধস্বচ্ছ। তারা সাত রাজপুত্রের জন্য সরস্বতীর পাড়ে শুকনো পাতা আর ডালপালা দিয়ে সাতটি আশ্রম বানিয়ে দিল, তাদের দেবতা রামের প্রস্তর বিগ্রহের জন্যে বানিয়ে দিল কাদামাটির ছাউনি। কালে কালে সাতটি আশ্রম ঘিরে গড়ে উঠল সাতটি গ্রাম, রামের মন্দির। ক্রমে ক্রমে জন্ম নিল সাতগাঁ, সরস্বতীর পাড়ে বন্দরনগরী।

এই নদী পুরাণের সেই সরস্বতী নয়, মি’লেডি, যা ঋকবেদের সূত্র বেয়ে নেমে এসে উত্তর-পশ্চিম ভারতের এক বিতর্কিত ভূখন্ডের ওপর দিয়ে বইছে। এই সরস্বতী একান্তই বাংলার, একদা গঙ্গার প্রধান শাখা।

মানচিত্রে তাম্রলিপ্ত আবছা হয়ে মিলিয়ে যাবার সময় থেকেই সাতগাঁ বন্দরের উত্থান। পর্তুগিজ বৈদ্য টম পিরিসের লেখায় তার উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। পিরিসের সমসাময়িক বিপ্রদাস পিপিলাইয়ের মনসামঙ্গল কাব্যেও রয়েছে সাতগাঁর সুসজ্জিত বাড়িঘর আর ঘন্টাধ্বনিতে মুখরিত মন্দিররাজির বর্ণনা। কনৌজের রাজপুত্রদের এই দোয়াবে বেঁধে নিয়েছিল যে মলয় সমীর, তারই টানে একদিন ত্রিকোণ লাটিন পাল তুলে ভেসে এল আরব বণিকদের জোড়া মাস্তুলের ঢাওগুলো। গ্রীষ্মের শুরু থেকে বর্ষা ঋতুর অবসান পর্যন্ত দক্ষিণ দিক থেকে বয় এই মৌসুমী হাওয়া। সাতগাঁর তাঁতিরা এই হাওয়া গরান কাঠের তাঁতে বেঁধে নিয়ে বুনে তুলত শিশিরের মতো স্বচ্ছ এক ধরনের বস্ত্র, যা আরবরা নিয়ে যেত সুদূর পশ্চিমে। ওরা এর নাম দিয়েছিল বত্ হাওয়া, কেউ বলত মসলিন। চীনের রাজপ্রাসাদ থেকে রোমের হারেম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই মহার্ঘ্য বস্ত্রের কদর। ফিনফিনে মসলিনে স্বেদসিঞ্চিত অঙ্গ ঢেকে বাদামী ত্বকের ক্রীতদাসদাসীরা জ্যোৎস্নালোকিত বাগানে দুলে দুলে শ্রান্ত সম্রাটদের হিমেল জঘনে অগ্নিসংযোগ ঘটাত।

পাল রাজাদের আমলেও বাঙালি বণিকেরা এই জাদুবস্ত্র ও বৌদ্ধ পুথি আর জাতকের কাহিনিতে জাহাজ বোঝাই করে পাড়ি দিয়েছে পুবের মশলাগন্ধী দ্বীপগুলোয়। এরপর দাক্ষিণাত্যের হিন্দু সেন রাজারা বাংলা দখল করল। বঙ্গোপসাগর–যা ছিল বহির্জগতের দুয়ার হয়ে উঠল নিষিদ্ধ কালা পানি। নৌবণিক ও হস্তশিল্পীরা অনেকেই ছিল বৌদ্ধ। নতুন জাতপাতদীর্ণ, ব্রাহ্মণ পুরোহিত নিয়ন্ত্রিত সমাজে তারা হয়ে পড়ল ব্রাত্য, এমনকি অদ্ভুত। তাদের শূন্যস্থান পূরণ করতে এল আরব বণিকেরা, মুখে মুখে সাতগাঁর জয়গাথা ছড়িয়ে পড়ল বন্দরে বন্দরে। প্রাইমাম এম্পোরিয়াম ইন্ডে হয়ে উঠল সাতগাঁ, যার জাহাজঘাটার বাতাস দিবারাত্র দপদপ্ করে মান্দারিন আরবি সোয়াহিলি বাংলা ফারসি আর তামিল ভাষার কলধ্বনিতে, মশলা, কস্তুরি থেকে শুরু করে আরবি ঘোড়া আর ক্রীতদাসদের ঘামের গন্ধে।

সেই সস্তা অঢেল বাজার দেখে চোখে ঝিলমিল লেগে গিয়েছিল মরোক্কোর ইবন বতুতার। দুটি মাত্র স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে তিনি খরিদ করেছিলেন বারো গজ বত্‌ হাওয়া আর আসুরা নাম্নী এক সুন্দরী অক্ষতযোনি ক্রীতদাসী। এই বঙ্গদেশে ইবন্‌ বতুতা ছিলেন প্রথম ড্যাঞ্চিবাবু, মি’লেডি।

.

বুড়িপিসিমার অন্তর্জলীযাত্রা সরস্বতীর ঘাটের পথে বেরিয়ে পড়ার আগে ওরা পৌঁছতে পারবে কী? শিউলির উৎকণ্ঠা ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল। ছোট্ট বাপ্পা দেখছিল মায়ের আরক্তিম মুখ, নাকের চারপাশে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠছে। কিন্তু ডেল্টা ক্লাস ইঞ্জিন আর তিনটি সবুজ কামরার ছোটো রেলগাড়িটার বুঝি কোনো তাড়া নেই। পাড়াগেঁয়ে ষাঁড়ের মতো মন্থর নিতম্ব দুলিয়ে, আকাশে নাক তুলে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে ধোঁয়া ছেড়ে সে ছায়াঘেরা আমবাগান, মাঠঘাট, বাঁশঝাড়, গোরস্তান, পোড়ো পরিত্যক্ত ভিলা বাংলো ছাড়িয়ে, বাঁয়ে মুমূর্ষু সরস্বতী আর ডাইনে প্রাণবন্ত হুগলিকে রেখে, চষা ক্ষেতের ওপর দিয়ে মৎস্যভূমির পেট বরাবর চলেছে। তার জানলা দিয়ে পোড়া কয়লার গুঁড়োর সঙ্গে ভেসে আসে সোঁদা মাটির গন্ধ, সজনে ফুলের গন্ধ, পাটপচা গন্ধ আর সেই শীতের সকালে পাকা ধানের গন্ধ। ইঞ্জিনের বাঁশিতে খোঁটায় বাঁধা বাছুরেরা তাতাথৈথৈ নাচে, তেঁতুলের নীচু ডাল থেকে মাছরাঙা ডুব দেয় সবুজ পানাপুকুরে, খালি-গা মাথায়-টোকো মাঠফিরতি মুনিষেরা লাফ দিয়ে উঠে পড়ে কামরার পাদানিতে। এই ডিহি বাংলায় ইউরোপীয় উপনিবেশের এক অতীব ইতিহাসবিধুর ভূখন্ডের ওপর দিয়ে, একে একে চাঁদেরডাঙা (কোয়ার্সভিল), দিনেমারডাঙা, ওলন্দাজডাঙা, আর্মানিডাঙা, পোর্তোঘাটা পেছনে ফেলে কু-ঝিক্‌ ঝিক্‌ খেলনা রেলগাড়ি চলে সাতগাঁর দিকে। মেরুন-সাদা ডোরাকাটা টিনের ছাউনি-অলা হল্ট স্টেশনের নামগুলো বাপ্পার স্মৃতিতে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল ক থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত বাংলার ৩৯টি ব্যঞ্জনবর্ণ মুখস্ত হবারও ঢের আগে। জানলার বাইরে পর পর পাতা উলটে যাওয়া দৃশ্যপটগুলোও। দুফে সাহেবের জঙ্গলাকীর্ণ পোড়ো চিনির কল ছাড়ালেই পাদরিবাগানের প্রাগৈতিহাসিক আমগাছগুলো, যাদের অর্কিডে ছাওয়া ডালপালা দেখে মনে হয় রোমশ স্বার্থপর দৈত্যের দল। তারপর আসে কেরেস্তান গোরস্তানের শ্যাওলা মোড়া পাথরের গম্বুজ আর সেনোটাফগুলো, যেখানে আরেকটু বড়ো হয়ে বাপ্পা দুখী সাহেবের ভুত দেখবে। এই জায়গাটা পার হবার সময় চোখ বন্ধ করে ফেললেও কানে ঠিক বাজবে ট্রেনের চাকায় কেরেস্তান-গোরস্তান- কেরেস্তান-গোরস্তান ধ্বনি, যতক্ষণ না রেলগাড়িটা নীলকুঠি পার হয়, আর দূরে গাছগাছালির পেছন থেকে উঁকি দেয় ম্যাওবেড়ালের গির্জার লাল টালির চুড়ো।

জোরে হাওয়া দিলে ম্যাওবেড়ালের গির্জায় বেড়ালের কান্নার মতো ধ্বনি ওঠে। মামারবাড়িতে বিশুকার কাছে বাপ্পা জেনেছে: সেবার মোগল বাদশার কামানের তোপে গির্জাটা ভেঙে চুরমার হলো, তারপর আবার মেরামত করা হলো, মিস্তিরিরা বেখেয়ালে দেয়ালের ফাটলে সদ্যোজাত পাঁচটি বেড়ালছানা সমেত ইট গেঁথে দিয়েছিল। এতকাল পরেও হাওয়ার রাতে মা বেড়ালীটা এসে ডাকে আর ছানাগুলো আর্ত সাড়া দেয়। সেই থেকেই পর্তুগীজ অগস্টিনীয় সন্ন্যাসীদের পুরোনো গির্জাটির নাম হয়ে যায় ম্যাওবেড়ালের গির্জা।

ম্যাওবেড়ালের গির্জা দেখা যাওয়ার মানে হলো সাতগাঁ আর খুব বেশি দূরে নয়। রেলগাড়িটা এবার ক্যানালের ওপর দিয়ে ঝমাঝম করে ছোট্ট একটা লোহার ব্রিজ পার হবে, রোদেপোড়া ন্যাংটো ছেলের দল লাফ দিয়ে পাদানিতে উঠে পড়বে ব্রিজের মাঝখান থেকে ক্যানালের জলে ঝাঁপ দেবে বলে। ওরা দুষ্টু বাপে-খেদানো ছেলের দল–বিশুকা বলেছে–ইস্কুলে যায় না, সারাদিন এর-ওর বাগানে ফল চুরি করে বেড়ায় আর কাদামাটি মেখে জলে পড়ে থাকে। ক্যানালটা পার হবার পরেই এসে পড়বে অন্তিম ইস্টিশন সাতগাঁ। এগারো মাইল যাত্রায় সাতটি ইস্টিশন পেরিয়ে এসে ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ছাড়বে লাল-কালো ইঞ্জিনটা। এখানে লাইনের প্রান্তে একটি চাকা লাগানো সেতু আছে; ইঞ্জিন ঠেলে ঘোরানো হয়।

বহু প্রতীক্ষিত সেই দৃশ্য বাপ্পা জীবনে প্রথমবার দেখতে পেল সেদিন শীতের সকালে, মায়ের বুড়িপিসীমার অন্তর্জলিযাত্রার দিন। কিন্তু সেটি উপভোগ করার মতো মনের অবস্থা তার ছিল না। তার কারণ ইস্টিশনের গেটে দাঁড়িয়েছিল মূর্তিমান আতঙ্ক। তার খাড়া ধারালো নাক, কালো টুপির নীচে পাটের ফেঁসোর মতো চুল ঘাড়ে এসে নেমেছে, ঢ্যাঙা কঙ্কালসার চেহারা, কাঁধের ওপর ফেলা কালো কোটের হাতাদুটো পত্পত্ করছে হাওয়ায়, হাতে ধরা ইস্পাতের টিকিট-পাঞ্চ যন্ত্ৰ।

টিকিট চেকারটিকে দেখলেই বাপ্পার মনে পড়ে যেত হাড়গিলে পাখির কথা। কলকাতায় বইয়ের আলমারিতে কোম্পানি পেইন্টিং-এর একটি অ্যালবামে তার ছবি ছিল। বহুকাল আগে ওরা কলকাতার আকাশে বাতাসে ছেয়েছিল রথীন বলেছিল একবার ভাগাড়ে আবর্জনা খুঁটে খেত। অ্যালবামের ছবিতেও গভর্নর হাউসের উঁচু গেটের মাথায় বসে আছে হাড়গিলের দল। হাড়গিলেরা ছোটো বাচ্চাদের চোখের মণি খুবলে খায়, এমন একটা জনশ্রুতি ছিল। সাতগাঁ রেলস্টেশনে সেই বিপন্ন পক্ষীকুলের শেষ প্রতিভূ টিকিট-পাঞ্চ উঁচিয়ে কটকট করে শব্দ করে পাখির ঠোঁটের মতো, কর্কশ গলায় ডাকে – ‘টিকিট-টিকিট!’ তার কাঁধে ঝোলানো কোটের বুক পকেটে মার্টিন্‌স রেলওয়ে কোম্পানির পেতলের ব্যাজ, তাতে লেখা— A.C. Ghoshal, TC। ট্রেন থেকে নেমে যাত্রীরা টিকিট দেখায়, কেউ কেউ জামার বুকপকেটে মৃদু চাপড় মেরে চলে যায়।

বাপ্পার হাত ধরে শিউলি দ্রুত পায়ে গেট পার হতে যেতেই হাত বাড়িয়ে পথ আটকাল চেকার সাহেব। ‘টিকিট প্লীজ!’

শিউলির মুঠি বাপ্পার বাহুতে চেপে বসে সেকেন্ডের জন্য, পরক্ষণেই চামড়ার ব্যাগের ভেতর থেকে বের করে আনে ছোট্ট নীল কাপড়ের বটুয়া, যাতে টাকা আর খুচরো পয়সা থাকে। কিন্তু টিকিট মেলে না। বন্দর-হুগলিতে ছোটো ট্রেন ধরার তাড়াহুড়োয় কেনা হয়েছে কি? বাপ্পা মনে করতে পারে না। ছুটে লাইন পার হবার সময়ে কি পড়ে গেল। শিউলি ব্যাগের ভেতর হাতড়ায়, হাড়গিলে পাখি কট-কট- কট করে টিকিট-পাঞ্চ বাজায়, ভয়ে বাপ্পার কান্না পেয়ে যায়। কেন ওর সবুজ ফ্লানেলের কার্ডিগানে, ইলাস্টিক-দেওয়া প্যান্টুলে একটাও পকেট নেই? তাহলে তো সে নিজেই টিকিটদুটো রাখতে পারত!

‘হারি আপ! হারি আপ! টিকিট! টিকিট!

শিউলি এবার ব্যাগের ভেতর হাত চালাতে থাকে ডুবন্ত মানুষের মতো। এদিকে ক্রমশ ইস্টিশান খালি করে দিয়ে যাত্রীরা চলে যাচ্ছে, ফিরতি ট্রেনের যাত্রীরা আসতে শুরু করেছে। ঢোলা খাকি জামা আর হাফ প্যান্ট পরা দুজন রোগামত গ্যাঙম্যান ইঞ্জিনের কাপলিং খুলে ছোট্ট লাইনের সেতুর দুই প্রান্তে ঠেলে ঘোরাতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে ব্যাগের ভেতর থেকে জিনিসপত্র পড়তে শুরু হয়েছে: বাপ্পার নীল টি-শার্ট, ডোরাকাটা প্যান্ট, আরেকটা শার্ট, লাল মাফলার, চিরুনি, চাবির গোছা, মেরুন ব্লাউজ, টুথব্রাশ… একটি সাদা ব্রা প্ল্যাটফর্মে ঝরে পড়ে মরা বকের মতো। বাপ্পা উবু হয়ে সেগুলো একে একে কুড়িয়ে নিতে নিতে মাথাটা ওপর দিকে তুলে দেখতে পায় ঘাম আর চোখের জল মায়ের মুখে ইঞ্জিনের ভুষোকালির পরতের ওপর নকশা কেটেছে, দেখতে পায় ইঞ্জিনটা ঘোরানো হয়ে গেছে, কামরাগুলো আবার ভরে উঠেছে বন্দর-হুগলিগামী যাত্রীতে, দেখতে পায় AC Ghoshal, TC-র চোখে এক বিচিত্র ঝিলিক।

‘হুম, বোঝা গেছে!’ বরফের মতো গলায় সে বলে। ‘স্টেশন মাস্টারের অফিসে এবার আসতে হবে যে!’

অন্যদিন হলে মামারবাড়ি থেকে কেউ-না-কেউ বাপ্পাদের স্টেশনে নিতে আসে। কিন্তু আজ সকলেই অন্তর্জলীযাত্রার কাজে ব্যস্ত, গেটের বাইরে একটিও চেনামুখ দেখতে পায় না শিউলি। শীতের সকালটা হঠাৎ কেমন যেন ম্রিয়মান হয়ে আসছে, আকাশে পাতলা মেঘের আস্তরণ। বাপ্পার শীত করতে থাকে। ইতিমধ্যেই সে জেনেছে, বিনা টিকিটে ট্রেনে চাপলে কয়েদখানায় পোরা হয়। কয়েদখানাটা কি ওই মেরুন-সাদা ছাউনি ঘরটার ভেতরে? ওখানে কি ওরা বাপ্পাদের পাথর ভাঙতে দেবে? কম্বলে শুতে দেবে? লাসি খেতে দেবে?