১.৪
অভয়চরণের হৃদয়ভঙ্গকারী কলকাতা নিবাসী পূর্ববঙ্গজ প্রথম সাতগাঁয়ে আসে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্ভেয়ার হিসেবে। দেশভাগ হয়ে হরপ্পা মহেঞ্জোদড়ো পাকিস্তানে চলে গেল, নেহরু-কথিত প্রাচীন সভ্যতাবাহী নবীন নেশন অচিরেই দীন হয়ে পড়ল, আর্কিওলজিকাল সার্ভে বিভাগের ওপর দায়িত্ব বর্তাল খন্ডিত ভারতবর্ষের সীমানার ভেতরেই প্রাচীনত্বের নিদর্শন খুঁড়ে বের করার। সেই সময়েই সাতগাঁ প্রোজেক্টের পুরোনো ফাইল ধুলো ঝেড়ে বের করে আনা হয়। মি’লেডি, গঙ্গারিডি সভ্যতার রাজধানী হিসেবে সাতগাঁর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় টলেমির লেখায়। পরবর্তীকালে বাংলার বিভিন্ন শাসকের আমলে ব্যস্ত বন্দর সাতগাঁর খ্যাতি অব্যাহত ছিল। ভূমির ওপরে, ভূমির নীচেও, প্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষে অনুসন্ধান চালান রেভারেন্ড জেমস লং ও কর্নেল ডিজি ক্র্যাফর্ডের মতো শখের প্রত্নবিদেরা। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ও এখানে এসে সুলতানি আমলের টাকশাল ও মাটির গড়ের ভিত খুঁড়ে বের করেন। সেসবই মহেঞ্জোদড়ো আবিষ্কারের আগে। এরপর যথারীতি ব্রিটিশ সরকারের নজর ঘুরে যায় উপমহাদেশের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলে। সেখানে তখন অজানা সিন্ধু সভ্যতার নাটকীয় উন্মোচন ঘটছে। প্রত্নতাত্ত্বিকের চোখে ব্রাত্য হয়ে পড়েছে বাংলার বদ্বীপভূমি। তার কারণ এখানে পাথরের নিদর্শন বিরল, আর নদীগুলি কেবলই খাত বদল করে অতীতের চিহ্ন মুছে দেয়।
দেশভাগের পর নিরুপায় হয়ে সেই মনোভাব বদলাল। এ.এস.আই.-এর হেড অফিস থেকে কলকাতায় জরুরি নির্দেশ এল পুরোনো, পরিত্যক্ত প্রকল্পগুলিতে ফের কাজ শুরু করতে হবে।
সেই সময়ে কলকাতার আধিকারিকদের হাতে অবশ্য কাজের অভাব ছিল না। সদ্য দেশভাগ হয়েছে, দ্বিখণ্ডিত বাংলায় মাটির নীচে মাটির ওপরেও প্রত্নসামগ্রীর ভাগবাটোয়ারা চলছে। কলকাতা ও ঢাকায় মিউজিয়ামের কর্মীরা রাশি রাশি টেরাকোটার মূর্তি ও সিল খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে তাদের প্রাপ্তিস্থান ও সময়কাল অনুযায়ী আলাদা করে ‘আমরা’ আর ‘ওরা’ লেখা বড়ো বড়ো লোহার সিন্দুকে ভরে তুলছে। এভাবেই কলকাতার অফিসে পাহাড়পুর মহাবিহারের বৌদ্ধ সিলগুলো ভরা হচ্ছে ‘ওরা’-য় আর গঙ্গারিডি সভ্যতার মূর্তিগুলো যাচ্ছে ‘আমরা’-য়, সেন আমলের ফলকগুলো থাকছে ‘আমরা’-য় আর বাংলার সুলতানি আমলের সিলগুলো পোরা হচ্ছে ‘ওরা’-য়। বিভিন্ন শতকের চিহ্নবিহীন প্রত্নখোলামকুচি, যা মিউজিয়ামের নীচতলার স্যাঁতসেঁতে গুদামে বহুকাল ডাঁই হয়ে ছিল শ্যাওলায় আকীর্ণ, বেলচায় তুলে ভরা হতে লাগল চটের বস্তায়, সারি সারি গরুর গাড়িতে বোঝাই হয়ে যশোর রোড দিয়ে চলল ঢাকায়, কলকাতায়।
সে বড়ো অস্থির সময়, মি’লেডি। নতুন দুই দেশের সংযোগকারী যশোর রোডে বুভুক্ষু দস্যুদের উপদ্রব, খাদ্যশস্যের গাড়ি লুটপাট চলছে। কিন্তু টেরাকোটা নিয়ে ক্যারাভানগুলি নিরাপদেই গন্তব্যে পৌঁছেছিল, তার কারণ খুঁড়ে-আনা অতীত ভোজ্য নয়। এবং এই প্রত্নতাত্ত্বিক আদানপ্রদান মিটতে সাড়ে আটমাস লেগেছিল একটি মানচিত্রের ওপর লাল ফেল্টের পেনে লাইন টেনে দ্বিখন্ডিত করতে সিরিল র্যাডক্লিফের যতদিন লেগেছিল তার থেকে ঢের বেশি সময়।
মনুষ্য খোলামকুচির আদানপ্রদান অবশ্য তারপরেও চলেছিল। এবং আরও বছর দুই পরে এক অক্টোবরের ভ্যাপসা বিকেলে গৌহাটি থেকে কলকাতায় এসে পৌঁছল এক তরুণ। গৌহাটি থেকে এলেও তার যাত্রা শুরু হয়েছে সিলেটে, দেশভাগের একমাস আগে ভোটাভুটি করে যে অঞ্চলটি পূর্ব বাংলায় (যার পূর্ব পাকিস্তান নামকরণ হবে তারও আট বছর পরে) থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। ঐতিহাসিক সাইক্লোনের ধাক্কায় তরুণটির পরিবার ভেঙে খান খান হয়ে যায় ফঙ্গবেনে নৌকার মতো। তার বাবা মা থেকে যান সিলেটে বাস্তুভিটেয়, আত্মীয়স্বজনেরা ছড়িয়ে পড়ে আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে। এই কাহিনির তরুণ গৌহাটিতে তার জাঠতুতো দাদার কাছে থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে এবং কটন কলেজে বিএসসি কোর্সে ভর্তি হয়। এবং কিছুদিনের মধ্যেই একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে; সে কলকাতায় যাবে!
‘পাগল হয়েছিস?’ জাঠতুতো দাদা চোখ কপালে তুলে বলেছিল। ‘কলকাতায় আমাদের আছেটা কে? আত্মীয়গুষ্টির সবাই তো এই আসামেই। এখানেই আমাদের ঘর।’
‘এখানে কখনোই আমাদের ঘর হতে পারে না।’ শান্ত, জেদি গলায় বলেছিল সেই তরুণ।
‘আর তোর লেখাপড়া? ছেড়ে দিবি?’
‘না। কটন কলেজ তো ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির আওতাভুক্ত। আমি কলকাতার কোনো কলেজে চেষ্টা করব।’
ওইটুকু ছেলের সংকল্প দেখে পরিবারের সকলেই অবাক হয়েছিল, এবং একযোগে বলেছিল হঠকারী ভাবনা। তারা ভাবতেও পারেনি কেউই ভাবতে পারেনি কয়েক বছরের মধ্যেই আসামে জ্বলে উঠবে বঙ্গাল খেদা আন্দোলন। এবং কটন কলেজ হয়ে উঠবে সেই আগ্নেয়গিরির মুখ। তারা ভাবতেও পারেনি এক দশকের মধ্যেই তাদের ফের সবকিছু ছেড়ে ধরতে হবে সেই তরুণের পথ।
.
কলকাতায় চেনা মানুষ বলতে ছিলেন সন্তোষ রায়চৌধুরী নামে সিলেটের এক প্রতিবেশী। তিনি একটি মার্চেন্ট আপিসে চাকরি করতেন, মেসবাড়িতে থাকতেন। তাঁর সম্পর্কে আর প্রায় কিছুই জানা ছিল না শুধু ওই মেসবাড়ির ঠিকানাটা ছাড়া, তার কারণ তিনি এক বিধবা পিসিকে মাঝেসাঝে মানি অর্ডারে টাকা পাঠাতেন। শেষ মানি অর্ডারটি আসে দেশভাগের আগের বছর। সে বছর কলকাতায় ভয়ঙ্কর দাঙ্গা হয়। তিনি আদৌ বেঁচে ছিলেন কি না সেটাও জানতে পারেনি সেই তরুণ। শুধু তার হস্তগত হয়েছিল মানি অর্ডারের একটি রিসিট, যাতে লেখা ছিল ২৩/৩ কলুটোলা লেন, কলকাতা ৭৩। উত্তাল সমুদ্রে ভাসমান কাষ্ঠখন্ডের মতো সেই রিসিট খামচে ধরে, একটি টিনের ছোটো তোরঙ্গে কিছু জামাকাপড় আর বই নিয়ে, বুকে স্পন্দিত আতঙ্ক, মোহ আর আশা নিয়ে মহানগরে এসে পৌঁছল সেই বিংশতিবর্ষীয় তরুণ, এক আশ্বিনের গুমোট অপরাহ্ণে।
শিয়ালদহ রেল স্টেশন থেকে হ্যারিসন রোড ধরে কিছুদূর গিয়ে ডানদিকে উঁচু উঁচু ইমারতের ফাঁক দিয়ে এঁকেবেঁকে ঢুকেছে কলুটোলা লেন। ২৩/৩ নম্বরের দোতলা বাড়িটি প্রাচীন, এবং কী যে তার রঙ বোঝার উপায় ছিল না। শেষ রঙের পোঁচ মুছে গিয়ে ধুসর চুনবালির পলেস্তারা বেরিয়ে পড়েছিল। ঝুলবারান্দায় ক্ষয়া কাঠের জাফরিতে, দরজার মাথায় খিলানে সূক্ষ্ম পঙ্খের কাজ দেখে মনে হবে না বাড়িটির নির্মাতা কোনোদিন কল্পনা করেছিল এই অবহেলিত ভগ্ন দশা। এটি কোনো মেসবাড়ি নয়। বিভিন্ন অংশে ভাড়াটিয়ারা থাকে। সেই ভাড়ার স্বত্ব এত বছর ধরে এতবার হাত বদল হয়ে এসেছে যে বাড়ির প্রকৃত মালিক কে কেউই জানে না। সন্তোষ রায়চৌধুরীর অংশটি সরু সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায়। বেঁটেখাটো চেহারা, নির্লোম, প্রায় ভ্রূবিহীন গোবেচারা দুটো চোখ, অস্পষ্ট বয়সের মানুষটিকে দেখেই তরুণের মনে পড়ল গোগোলের ওভারকোট উপন্যাসের সেই কেরানি নিকোলাই নিকোলিয়েভিচের কথা। সন্তোষ রায়চৌধুরীও সারাদিন বড়োবাজারে এক মাড়োয়াড়ির গদিতে ঝুঁকে বসে হিসেবের খাতা লেখেন। সন্ধ্যাবেলা বাসায় ফিরে ইকমিক কুকারের ডালভাত-আলুসেদ্ধ খেয়ে কাঠাল কাঠের চৌকিতে চিৎ হয়ে শুয়ে অল ইন্ডিয়া রেডিও শোনেন। নিজেরটা নিজে চালিয়ে নিতে পারলে দেশের পাড়ার ব্রাহ্মণ যুবককে থাকতে দিতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই, নীচু ফ্যাসফেঁসে গলায় জানালেন সন্তোষ। রিপন কলেজে ভর্তি হতেও কোনো বেগ পেতে হলো না, যেমনটি সে ভেবেছিল।
কিন্তু যে ব্যাপারটা সে ভাবেনি, কেউ তাকে সতর্ক করেনি, তা হলো মহানগরে আকীর্ণ সীমাহীন ক্ষুধা আর অভাবের ছায়া। কয়েক বছর আগের দুঃসহ মন্বন্তরের রেশ, যা ঘনিয়ে উঠেছে দেশভাগে বাস্তুহারার জোয়ারে। সেই করাল ছায়ার কবলে পড়ল তরুণ। কলেজে দিবাবিভাগ ছেড়ে সান্ধ্যবিভাগে ভর্তি হলো, সায়েন্স ছেড়ে কমার্সে, এবং কাজের সন্ধান করতে লাগল।
একদিন বিকেলে সন্তোষবাবু গদি থেকে ফিরে বললেন
‘আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার নাম শুনেছ? চৌরঙ্গিতে সদর স্ট্রিটের গায়ে জাদুঘরের বাড়িতে ওদের আপিস। আজ গদিতে দুজন বলাবলি করছে শুনলাম ওখানে নাকি লোক নেওয়া হচ্ছে। কাল একবার খোঁজ নিয়ে দেখবে নাকি?’
পরদিন সকালেই সে চলে গেল ২৭ নং চৌরঙ্গি রোডে। হ্যাঁ, টেম্পোরারি রেকর্ড কীপার পদে লোক নেওয়া হচ্ছে। যোগ্যতা ম্যাট্রিক পাস, মাইনে ৩২ টাকা। কাজটি পেয়ে গেল ছেলেটি। হাতে চাঁদ পেল; ৩২ টাকায় কলেজের ফি দিয়ে একজনের খাইখা ট্রামভাড়া হয়ে যাবে। কাজ বলতে দেশভাগের ফসল পাহাড়প্রমাণ প্রত্নসামগ্রী নথিকরণ। রাশি রাশি পোড়ামাটির সিল, মূর্তি, পাত্র যার বেশিরভাগই বস্তাবন্দি করে গরুর গাড়িতে আনার সময়ে ভেঙে গিয়েছে, কালক্রম ঘেঁটে গিয়েছে বাছাই করা, তাদের দৈর্ঘ্য প্রস্থ মাপা, পেন্সিলে তাদের গায়ে নম্বর লেখা, এবং জাবদা খাতায় তাদের অনুপুঙ্খ বিবরণ লিখে রাখা।
সদর স্ট্রিটের গায়ে অফিসের ঘুপচি বেসমেন্টে খোলামকুচির পিরামিডের মাঝে হারানো সময়ের সোঁদা গন্ধের ভেতর বসে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করত সেই তরুণ। ছুটির পর ফুটপাতে এক আনার ছোলামুড়ি কিনে চিবোতে চিবোতে হেঁটে চলে যেত সান্ধ্য কলেজে। কমার্স ক্লাসে বিভিন্ন বয়সের যুবক না-যুবকের দল, তার মতোই দেশভাগে ছত্রখান জীবন গুছিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। দু বছর পরে যখন বি-কম পাশ করল, তার জন্য তখন পুরাতত্ত্ব বিভাগে অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিল্ড সার্ভেয়ারের একটি চাকরি অপেক্ষা করছে। বেতন মাসে ৮৫ টাকা, কর্মস্থল কলকাতা থেকে ৫৩ কিলোমিটার উত্তরে সাতগাঁয়।
