১.৭
ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হবার আঠেরো দিনের মাথায় রথীন চাটুজ্জ্যে পরাণ ডাক্তারের ফার্মেসিতে গেল। ততদিনে সে সুস্থ হয়েছে, কিন্তু দুর্বল, গাঁটে গাঁটে ব্যথা রয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে নিয়মিত বিশুর মারফৎ তার শারীরিক অবস্থার খবর নিয়েছেন ডাক্তার, ওষুধ পাঠিয়েছেন। বিশু ঠাকুরই তাকে নিয়ে এল আদিরামবাটিতে।
‘এ বাড়িতে এলে সর্বাগ্রে যেনার দর্শন দস্তুর তিনি হলেন কুলদেবতা আদিরাম,’ বিশু বলে।
দেবতার থেকেও তাঁর বাসস্থানটি রথীনের চোখ টানে। এক-বাংলা টেরাকোটার শৈলী, গম্বুজে খিলানের ছাদে সুলতানী স্থাপত্যের প্রভাব স্পষ্ট। গর্ভগৃহে দু ফুট দৈর্ঘ্যের আদিরামের মূর্তিটি গোলাপি স্টিয়াটাইট পাথরের। দেবতা এখানে ধনুক কাঁধে যোদ্ধা, কিন্তু বহু বছরের ক্ষয় আর ভক্তিতে পাথরে কোঁদা পেশির রেখা মসৃণ হয়েছে। ধনুকটিও পৈতের মতো। সব মিলিয়ে চেহারায় নাদুস নুদুস বাঙালি ব্রাহ্মণ বালকের আদল। ফুল চন্দনের গন্ধে ভারি আবছায়ায় চিরবন্দি, রূপোর রাংতায়-মোড়া চোখ মেলে দরজার বাইরে চেয়ে আছেন।
‘কনৌজের রাজপুত্ররা রামের যে বিগ্রহ সঙ্গে নিয়ে এদেশে এসেছিল, ইনিই সেই ‘ বিশু বলে। ‘সেই জন্যে ইনি আদিরাম।’
‘সে তো পুরাণের গল্প,’ রথীন বলে। ‘তার কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ তো নেই।
‘কলকেতার পণ্ডিতেরা তাই বলে বটে। তবে আমাদের কাছে বাপু এই হলো ইতিহাস, এই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ!’ – টুং করে ঘন্টা বাজিয়ে প্রণাম ঠোকে বিশু ঠাকুর। বাইরে দেয়ালে জমজমাট পোড়ামাটির প্যানেল, পুরাণ ও মহাকাব্যের পরিচিত মোটিফগুলি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবন গাছপালা পশুপাখি মানুষ: ফলন্ত গাছের নীচে ঘুম-ঘুম চোখের নারী, ডালে বসে উন্মুখ বাঁদর; কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ করতে কাড়া নাকাড়া বাজাচ্ছে রাক্ষসের দল; মকরমুখী নৌকা নিয়ে বেনের দল চলেছে সাগরে; বাতায়নে একাকী নারী; বাদ্যযন্ত্র নিয়ে শোভাযাত্রা চলেছে; বন্দরে বিভিন্ন দেশের জাহাজ ঢাও, সাম্পান, চীনাদের জাঙ্ক, একটিতে বোঝাই জিরাফের দল; দেবতা-দানবদের সমুদ্রমন্থনের দৃশ্য; রামসেতু গড়ছে বানর সেনারা; মাথায় ত্রিকোণ টুপি, বন্দুক হাতে ফিরিঙ্গিদের দল; বনের মধ্যে আশ্রম, গুরুর সামনে বসে বেদ পাঠ করছে একদল শিষ্য; এক ব্রাহ্মণ ও এক তুর্কী যোদ্ধা মুখোমুখি বসে, ব্রাহ্মণ পদ্মাসনে, তুর্কীটি হাঁটু মুড়ে গোড়ালির ওপর; একদল ব্রাহ্মণ ধর্মযোদ্ধা ত্রিশুল হাতে ষাঁড়ে সওয়ার হয়ে ছুটেছে, মাথার পেছনে শিখা উড়ছে; এক নাগা সাধু আর এক আউলে ফকির নদীপাড় থেকে কামানের তোপ দাগছে ফিরিঙ্গিদের জাহাজে। একলা তরুণ যোদ্ধা ঘোড়ায় চেপে চলেছে অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে, একটি শিয়াল নিষ্ঠুর মুখব্যাদান করে হাসছে। কিছু কিছু প্যানেলের কারুকাজ নোনা ধরে ক্ষয়ে গিয়েছে, কোথাও বা সবজেটে শ্যাওলায় ঢেকে ক্ষয় জীবন্ত হয়ে উঠেছে যেন। খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে রথীনের প্রশিক্ষিত চোখে ধরা পড়ে, প্যানেলগুলো এলোমেলো কোলাজের মতো বসানো। মন্দিরগাত্রে সাধারণত মহাকাব্য পুরাণ সাম্প্রতিক ইতিহাস যেভাবে নির্দিষ্ট স্তরে সাজানো থাকে, সেই রীতি ভাঙা হয়েছে। তাছাড়া কারুকাজের শৈলীতে তারতম্য রয়েছে, সব প্যানেল একই সময়ের নয়।
চাতালের পরিক্রমা পথ দিয়ে পূব দিকে এসে থমকে দাঁড়ায় রথীন। এই দেয়ালে প্যানেল খসে গিয়েছে, অতিকায় ক্ষত ইটের টুকরো আর চুন-সুরকি দিয়ে বোজানো। দেখে মনে হয় যেন কোনো দৈত্যের হাতুড়ির ঘা পড়েছে।
‘এটা কী করে হলো!’
‘এ হলো তোমার কলকেতার এক গুন্ডার কীর্তি!’ বিশু রথীনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে। ‘রবার্ট ক্লাইভ! ওর চেয়ে বড়ো গুন্ডা এ বাংলায় আর আসেনি। পলাশীর যুদ্ধের আগে একবার সে নৌবহর নিয়ে চাঁদেরডাঙার কেল্লায় হামলা করে। ইংরেজ রয়্যাল নেভির গানবোট থেকে ছোঁড়া গোলা ফসকে উড়ে এসে লাগে।’
মন্দির থেকে ফার্মেসিবাড়ি যাবার পথে পড়ে এক মস্ত ইঁদারা। তার পাড় নেই, মুখ পুরু জালে ঢাকা।
‘ইঁদারার জলে জোয়ার-ভাটা খেলে, বিশু বলে। ‘সরস্বতীর সঙ্গে যোগ রয়েছে।’
সেটা উঁকি মেরে দেখলেই বোঝা যায় . আগাছায় আকীর্ণ ভিজে গা, কালো জলে প্রতিফলিত আকাশ। জাল সরিয়ে দড়ি বালতি দিয়ে জল তুলে একটি খর্বাকৃতি বাদামী ঘোড়াকে নারকেল ছোবড়া ঘষে চান করাচ্ছে গামা। দিনের আলোয় লোকটাকে দেখে আবার হাঞ্চব্যাক অফ নোতরদামের কথা মনে পড়ে রথীনের লোকটার ডান পায়ের বুড়ো আঙুল নেই।
.
পরাণ ডাক্তারকে কৃতজ্ঞতা জানাতে গেলে তিনি মুচকি হেসে বিশু ঠাকুরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেন।
‘ধন্যবাদ যদি দিতে হয় তাহলে বরং আমার এই পিসতুতো ভাইটিকে দিন। যাহোক একখানা কাজের কাজ করেছিল বটে সেদিন। আরও দেরি হলে আমার ওষুধে কাজ হতো না, হাসপাতালে পাঠাতে হতো।’
‘আমায় দয়া করে আপনি বলবেন না!’ রথীন বলে।
‘আচ্ছা বেশ, তুমি তো আমার বড়ো ছেলে বসন্তর থেকেও বয়সে ছোটোই হবে।’
দেয়ালে তাকে কালো রেক্সিন-বাঁধানো নোটবইয়ের সারি। ফ্রেমে বাঁধানো রামচন্দ্র, স্যামুয়েল হ্যানিম্যান ও এক অচেনা পুরুষ যাঁর পরনে ধুতি আর কোট, গলায় ঝুলছে শিঙার মতো আদ্যিকেলে স্টেথোস্কোপ। সাদাকালো ছবিতে সুদৃশ্য টিপয়ে সেই ওষুধের বাক্স, যেটা রথীন সেদিন তাঁবুতে দেখেছিল।
রামপ্রাণ রথীনের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে রুটিন প্রশ্ন সেরে জিজ্ঞেস করেন—
‘তা এই সাতগাঁয়ে এসে ঠিক কী কাজ করা হচ্ছে?’
সাতগাঁর প্রত্নতাত্ত্বিক ঐশ্বর্য ও সম্ভাবনার ব্যাপারে ইতিমধ্যে যা জেনেছে বলতে গিয়ে বেশ প্রগলভ হয়ে ওঠে রথীন। অনেকদিন পরে এক অসম বয়সী মানুষের সঙ্গে কথা বলতে খুব স্বচ্ছন্দ লাগছে দেখে নিজেই অবাক হয়।
ওর কথাগুলো আগ্রহভরে শোনেন রামপ্রাণ, গোঁফের আড়ালে হাসি প্রসারিত হয়, বড়ো চোখদুটো চিকচিক করে।
‘কী অপচয়!’ মাথা নেড়ে বলেন। ‘মাটির নীচে কী আছে তার পেছনে অর্থ শ্রম না ঢেলে মাটির ওপরে যা আছে তার রক্ষণাবেক্ষণ করলে ভালো হয় না কি? টাকাগুলো রাস্তা নর্দমা মেরামতে ব্যয় করলে তো লোকের উবগার হতো।’
‘আপনি কি বলতে চাইছেন?’ রথীন প্রশ্ন করে। ‘আমাদের অতীত ইতিহাস জানার দরকার নেই?’
‘তুমি কি বিশ্বাস কর মাটি খুঁড়ে লোকের কোনো উপকার হবে?’ পালটা প্রশ্ন ছোড়েন রামপ্রাণ।
হঠাৎ ধৈর্য হারায় রথীন। ‘বিশ্বাস না থাকলেও আমরা তো অনেক কিছু করি, তাই না? এই যেমন দেখুন, আমি হোমিওপ্যাথিতে বিশ্বাস করি না কিন্তু তা বলে একবারের জন্যেও আপনার পাঠানো ওষুধ খেতে ভুলে যাইনি।’
যা ভেবেছিল তার ঠিক উলটোটা ঘটে, সুপক্ক কাশঝোপের মতো গোঁফের আড়ালে হাসির বিস্ফোরণ ঘটে। সেই শুনে চেম্বারের দরজার ওপাশ থেকে উঁকি দেয় অপেক্ষমাণ রুগি। হাসির দমক সামলে রামপ্রাণ ফতুয়ার পকেট থেকে স্টিলের নস্যির কৌটো বের করেন, দুবার টোকা মেরে এক টিপ নস্যি নাকে গোঁজেন।
‘আচ্ছা, তুমি হোমিওপ্যাথিতে বিশ্বাস কর না। বেশ কথা।’ আন্তরিক গলায় বলেন। ‘তাবুতে এক দাড়িওয়ালা কবির ছবি ঝুলিয়েছ দেখলাম, তিনি কিন্তু করতেন।’
মুখ ফস্কে কথাটা বলে ফেলার পর লজ্জা পায় রথীন, অসহায় হাসে। রামপ্রাণ বলে চলেন–
‘আচ্ছা বাবা, বলো দিকি তুমি কোন জিনিসটা বিশ্বাস করো না? এই যে সেরে উঠেছ সেটা? নাকি একটি ক্ষুদে মশা যে তোমায় এভাবে ধরাশায়ী করে দিতে পারে সেটা?’
‘কোনো গাছের নির্যাসে অগুন্তিবার জল মিশিয়ে মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করলে তার ওষধি শক্তি বেড়ে যায়, কিংবা হাতের চেটোয় আঘাত করে করে তার পরমাণু বিভাজন ঘটানো যায়, হোমিওপ্যাথির এই প্রধান সূত্রটাই আমি বিশ্বাস করি না।’
রোগী ও চিকিৎসকের তাত্ত্বিক আলোচনায় দরজার বাইরে অপেক্ষমাণ বয়স্ক রোগীটির ঘুংরিকাশি ওঠে।
‘বেশ, এই নিয়ে আমরা আরেকদিন আলোচনা করব।’–বলে রামপ্রাণ এক টুকরো কাগজে প্রেসক্রিপশান লিখে রথীনের হাতে দেন। কিন্তু অনেক অনুনয় করেও কিছুতেই ফি দেওয়া যায় না। বলেন–‘যেদিন তোমার হোমিওপ্যাথি শান্তরে বিশ্বাস জন্মাবে সেদিন নেব, তার আগে নয়।’
চেম্বার থেকে ফার্মেসি ঘরটায় ঢুকে প্রথমেই যে জিনিসটা রথীনকে সচকিত করে, যা সে কোনোদিন ভুলতে পারবে না, তা হলো এক অদ্ভুত অবর্ণনীয় গন্ধ: সারি সারি বোতলে নানান বিচিত্র নির্যাস, ইথাইল অ্যালকোহল, বয়ামে অস্বচ্ছ তরলে চোবানো অচেনা প্রাণীর দেহাবশেষ, ভ্রূণ, কশেরুকার আকারের ক্যাকটাস, বাকল ও শেকড়ের ঘ্রাণ। সেই সঙ্গে মিশেছে একদল রোগীর গায়ের তেলের, ঘামের, রোগের গন্ধ। তবে এই সব কিছুর মাঝে, এই সব কিছুর চেয়েও, অবাক- করা হলো ফার্মাসিস্টটি। কাঠের উঁচু কাউন্টার টেবিলের পেছনে বসে গম্ভীর নিবিষ্ট ভঙ্গিতে কাজ করে চলেছে সে। তার পরনে নীলপাড় সাদা শাড়ি ও ফুলহাতা ব্লাউজ, ছিপছিপে চেহারা, একমাথা কোকড়ানো চুল হলুদ রবারের ব্যান্ডে বাঁধা, মুখে আলগা লাবণ্য, নাকে ছোট্ট রুপোর নাকছাবি।
ডান হাতে প্রেসক্রিপশান আর বাম বগলে কাগজে মোড়া মশারির প্যাকেটটা নিয়ে রোগীদের ভিড়ে দাঁড়িয়েছিল রথীন। বিশু চলে গিয়েছে তার পোষ্য দেবদেবীর টিফিনের ব্যবস্থা করতে। ফার্মাসিস্টটির হাত চলছে যত দ্রুত, ততোধিক দ্রুততায় তার চঞ্চল দুটি চোখ এদিক সেদিক ঘুরছে। কিন্তু কিছুতেই আর সে রথীনকে দেখতে পাচ্ছে না। এদিকে পরে আসা রোগীরা একের পর এক ওষুধ পেয়ে চলে যাচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর অবশেষে সে রথীনের দিকে ফিরল, টেবিলের ওপ্রান্ত থেকে বাড়িয়ে দিল হাতটা, হাতে সরু সোনার চুড়ি একগাছা। রথীন প্রেসক্রিপশানটা হাতে দিয়ে প্যাকেটটি তুলে দেখালো।
‘কী এটা?’ ফার্মাসিস্টের জোড়া ভ্রূ কপালে ওঠে।
‘মশারি।’ রথীন বলল।
‘অ্যাঁ! মশারি? মশারি নিয়ে আমি কী করব?’
বিস্ময়ে উচ্চকিত কন্ঠ শুনে রোগীরা সবাই ফিরে তাকালো। আর ঠিক সেই মুহূর্তে রথীন আবিষ্কার করল মেয়েটি ডাক্তারবাবুর কন্যা, কারণ তার চোখদুটি অবিকল তার বাবার মতো, এবং তার ডান ভুরুর ওপর একটি কাটা দাগ আছে, এবং সে বেশ সুন্দরী।
প্যাকেটের ভেতরে কী আছে সেটা ফার্মাসিস্টটি জানত। সে নিজেই শুটি কাগজে মুড়ে গামার হাতে দিয়েছিল জ্বরের দিন সন্ধ্যাবেলা। এবং রথীন ঘরে ঢোকামাত্র সে আগে না দেখে থাকলেও তাকে চিনেছে। ইচ্ছে করেই তার দিকে দৃকপাত না করে পরে-আসা রোগীদের ছেড়ে দিয়েছে, কারণ সে এও জানত ওর বিশুকা রথীনকে সঙ্গে নিয়ে রুগিদের লাইন ভেঙে বাবার চেম্বারে ঢুকেছিল।
.
শ্রীমান রথীন চট্টোপাধ্যায়ের জন্য একটি কালো খাতা বরাদ্দ হলো। ম্যালেরিয়া- পরবর্তী দুর্বলতা সারিয়ে তোলার পর পরাণ ডাক্তার নজর দিলেন দীর্ঘদিন পুষে রাখা অম্লশূলে, যা কলকাতায় একলা অনিয়ন্ত্রিত জীবনে দিনের পর দিন পাইস হোটেলের ভাত খেয়ে বাঁধিয়েছিল রথীন। এজন্য তিনি দিলেন নেট্রাম ফস আর জোয়ান ও আমলকীর এক ধ্রুপদী আরক। প্রাচীন আয়ুর্বেদের সঙ্গে উনিশ শতকের এক জার্মান অ্যালোপ্যাথের শাস্ত্র মিশিয়ে এই বিচিত্র চিকিৎসাপদ্ধতির ব্যাপারে রথীনের বিস্ময়ের অন্ত ছিল না।
‘এতে অবাক হবার মতো কিছু নেই,’ রামপ্রাণ বলেন। ‘বলতে পারো এ হলো একই নদীর দুটি ধারা। দুইয়েরই অভিমুখ সাগরের দিকে। সেই সাগর হলো গিয়ে রোগীর দেহতন্ত্র। সে তুমি আয়ুর্বেদই বল কিংবা হোমিওপ্যাথি, দুইই কিন্তু রোগীর চিকিৎসা করে, রোগের নয়।’
একদিন তিনি শোনালেন স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের জীবনকথা। স্যাক্সনি প্রদেশে তামার খনি অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে চিকিৎসা করতে গিয়ে হ্যানিম্যান সাহেব অ্যালোপ্যাথির কুপ্রভাবে বীতশ্রদ্ধ হয়ে নিজেই, সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরে, সিঙ্কোনা গাছের ছাল চিবিয়ে খেলেন। তখনও অবশ্য ম্যালেরিয়ার প্রকৃত কারণ জানা ছিল না, কিন্তু রোগটা ছিল। স্যাক্সনির মানুষেরা প্রাচীনকাল থেকেই যা করে নিরাময় ঘটাতো, সেটাই তিনি করলেন। এবং কিমাশ্চর্যম! সিঙ্কোনার বাকল চিবানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর দেহে দেখা দিল অবিকল ম্যালেরিয়ার মতো উপসর্গ। এবং এভাবেই তিনি আবিষ্কার করলেন এক যুগান্তকারী সূত্র– সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার।
‘সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার!’ মন্ত্রোচ্চারণের মতো করে আওড়ান রামপ্রাণ। ‘কী সহজ আর সর্বজনীন! বেদের মন্ত্র নয় তো কী? সমহ সমং শময়তি!’
চিকিৎসার জন্য প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে আদিরামবাটিতে যেতে শুরু করল রথীন। রসিক উদার মনের ডাক্তারবাবুটি তাকে যতটা আকর্ষণ করতেন, ঠিক ততোটাই আকর্ষণ করত… ওই পোড়ামাটির একচালা মন্দিরটি! অন্তত বিশু ঠাকুরকে তাই বলত সে। মন্দিরের একদিকে বিশুর তত্ত্বাবধানে দেবদেবীদের বৃদ্ধাশ্রম। যেসব পরিবার বাস্তুভিটে ছেড়ে চিরকালের মতো বিদেশ বিভুঁইয়ে চলে গিয়েছে, তাদের কুলদেবতারা থাকেন। এখানে তাঁরা নিত্য পুজো পান, ভোগ আরতি পান। বাঁশের বেড়া দেওয়া ওষধিবাগানে দেশবিদেশের দুষ্প্রাপ্য গাছগাছড়া রয়েছে, এককালে তার থেকে কবিরাজি ওষুধ তৈরি হতো। বাইরের বাগানে ইঁদারাটির গায়ে একটি বড়ো ঘড়ির ডায়ালের মতো কাঠের চাকতি, গায়ে নীল লাল রঙে চিহ্ন আঁকা, একটি কাঁটা। প্রথম দিন রথীনের চোখে পড়েনি।
‘ওটা হলো জোয়ারভাটা মাপার মিটার। ওটি আমার ভাইপো হেমস্তর বানানো কল। তোমার ডাক্তারবাবুর ছোটো ছেলে। এমন অনেক রকমারি কল বানিয়েছে।’
বিশু, পরাণ ডাক্তার ও তাঁর কন্যাটিকে ছাড়া এই পরিবারের আর কারোর সঙ্গেই পরিচয় হয়নি রথীনের। ওরা ওষধিবাগানের পেছনে পাঁচিলে ঘেরা ভেতরবাড়িতে থাকে। ফার্মাসিস্টটি সেই প্রথম দিনের পর আর রথীনের সঙ্গে বাক্য বিনিময় করেনি। ওষুধের সেবনপ্রণালী পেনসিলে গোটা গোটা হস্তাক্ষরে খামের গায়ে লিখে দেয় কেবল। ওই অদ্ভুত গন্ধের ছিটমহলে বসে সে ওষুধ মেশায়, মাদার টিংচারের দ্রবণ প্রস্তুত করে, হাতের তালুতে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে তার শক্তি বৃদ্ধি করে, নিরক্ষর গ্রাম্য রোগীকে আন্তরিক স্বরে স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দেয়, কম্পাউন্ডার শিরিষবাবু আলমারি হাতড়ে নির্দিষ্ট আরক খুঁজে না পেলে ধমক দেয়, এবং নিজে উঠে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই তাক থেকে অব্যর্থ খুঁজে নিয়ে আসে। সেই প্রথম দিনের পর রথীন আর চেম্বারে ঢোকার লাইন টপকায়নি; যদিও ডাক্তারবাবু স্বয়ং তার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ অসুখ বহির্ভূত বিষয়ে গল্প জুড়ে অপেক্ষমাণ রোগীদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়েছেন। ফার্মাসিস্টও তাকে আর অহেতুক অপেক্ষা করিয়ে শাস্তি দেয়নি।
অপেক্ষা করালেও যে রথীনের মন্দ লাগবে এমনটা নয়। রোগীদের লাইনে ফার্মেসির এক কোণে দাঁড়িয়ে কর্মব্যস্ত মেয়েটিকে দেখতে দেখতে সে ভাবে, ওর মনটাও কি বাগানে ইঁদারাটির মতো গভীর আর শাস্ত? সেখানে কি জোয়ার-ভাটা খেলে?
শরতের শেষে শুরু হয়ে শীত পেরিয়ে যাবার পরেও রথীনের অম্লশূলের চিকিৎসা চলতে লাগল। ইতিমধ্যে মটরশুঁটি ফুলের মতো নীল আকাশ আর ছাড়িগঙ্গায় সাদা কাশফুলের রাশি বিবর্ণ ধূসর হয়ে এল, সরস্বতীর মরা খাত থেকে ভোরের কুয়াশা উঠে চারদিক ছাইল। তারপরে এল বসন্ত। আমের মুকুলের গন্ধে ভারাতুর দখিনা বাতাস বইতে শুরু হলো সাতগাঁর মৎস্যভূমিতে। এই হাওয়া গরানকাঠের তাঁতে বেঁধে নিয়ে মসলিন বুনত তাঁতিরা, এই হাওয়ায় পাল তুলে আরব বণিকদের জাহাজগুলো এসে ভিড়ত, এই হাওয়া একদা এক নোটারি ক্লার্কের সহকারীর অন্ত্রাশয়ে তুলেছিল অচেনা কাঁপন।
