সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১.৬

১.৬

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাবেলা বিশু মুখুজ্যেরা আড্ডা দিয়ে গেল। রাতের খাওয়া সেরে পরদিন অফিসে জমা দেবার জন্য সারা সপ্তাহের ওয়ার্ক রিপোর্ট শেষ করতে গিয়ে রথীনের মাথাযন্ত্রণা শুরু হলো। প্রথমে মনে হচ্ছিল সারাদিন সোলার টুপিটা মাথায় পরে থাকার জন্য হচ্ছে। রাতের খাবার বমি হয়ে উঠে গেল। পরদিন সকালে গায়ে জ্বর, কলকাতায় যাওয়া হলো না। দুপুরের পর জ্বরটা ছাড়ল। সামান্য মাথাঘোরা আর জিভে একটা তামাটে স্বাদ নিয়ে রথীন কাজকর্ম করতে লাগল। রাতের দিকে জ্বরটা ফের তেড়েফুঁড়ে ফিরে এল, সেইসঙ্গে কাঁপুনি। মনে হলো মাটির গর্ভ থেকে প্রত্নহিম উঠে এসে মজ্জার ভেতরে ঢুকছে। বিকারের ঘোরে আচ্ছন্ন হলো রথীন। গভীর রাতে ঘুম ভাঙতে দেখে গায়ে কম্বল, গুছাইত কখন জড়িয়ে দিয়েছেন টের পায়নি, সারা শরীর ঘামে জবজবে। জ্বরটা নেমে গিয়েছে কিন্তু মাথার যন্ত্রণা ফিরে এসেছে, খুলির ভেতরে নখ আঁচড়াচ্ছে একশোটা শিয়াল।

.

বাপ্পার চিনিকাকার মতো সুন্দর গল্প বলতে পারত না ওর বাবা। কিন্তু ছোটোবেলায় অসুখ বিসুখ হলে, জ্বরের পথ্য (দুধ-সাবু, রবিনসন বার্লি) খাব না বলে কান্নাকাটি জুড়লে, কখনো-সখনো রথীন ওকে গল্প বলে খাওয়ানোর চেষ্টা করত। সেগুলোকে অবশ্য ঠিক গল্প বলা যায় না। খুব নরম গলায় আশ্বাসের স্বরে রথীন মুখে মুখে সুখাদ্যের একটা তালিকা বানাতো বাপ্পা জ্বর থেকে উঠলেই ওরা দুজনে মিলে একদিন চৌরঙ্গীতে গিয়ে অনাদি কেবিনে মোগলাই পরোটা খাবে। মোগলাই পরোটা জিনিসটা আসলে কী, কীভাবে ময়দার ভেতর কিমার পুর ভরে ডিমে চুবিয়ে সেটা ভাজা হয়, বলতে বলতে রথীন এক চামচ বার্লি ঢেলে দিত বাপ্পার ঠোঁটের কাকে। বাপ্পা মুখ বেঁকিয়ে ফেলে দেবার আগেই ওরা দুজনে কলেজ স্ট্রিট-গানী ট্রানে চড়ে বসেছে, টুং টুং ঘন্টি বাজাতে বাজাতে ট্রাম বাপ-ছেলেকে নিয়ে চলেছে হ্যারিসন রোডে দিলখুশা কেবিনে, যেখানে ফিশ কবিরাজি পাওয়া যায়, যেটা কিন্তু মোটেই দাদুর কবিরাজী ওষুধের মতো খেতে নয়, যেটা আসলে ভেটকি মাছের পরতের ওপর মুচমুচে কভারেজ। তারপর দ্বিতীয় চামচটা চট করে গিলে নিলেই সেখান থেকে পায়ে হেঁটে গিয়ে প্যারামাউন্টের ডাব শরবতের গ্লাসে চুমুক দেবে ওরা। তৃতীয় চামচে চলে যাবে শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে গোলবাড়ি, যার বাড়িটা সত্যিই গোল আর যেখানে সত্যিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কষা মাংস পাওয়া যায়, লাল-লাল আর ঝাল-ঝাল, আর এমন তুলতুলে যে মুখে দিলেই গলে যায়, আর সুরুৎ করে পেটে চলে যায় বাটির তলানি বার্লির মতো।

এভাবেই রথীন ছোট্ট বাপ্পার মনে কলকাতা মহানগরীর খাদ্যসম্ভারের মানচিত্র এঁকে দিত। প্রতিটি খাবারের রং রূপ স্বাদের এমন নিবিড় বর্ণনা দিত, যে সেই বয়সেও বাপ্পা আবছা টের পেত ওর বাবা নিজে কখনো এমনই রোগশয্যায় শুয়ে সেই মানচিত্র বুনেছে।

বিজন বিভুঁইয়ে তাঁবুর ভেতর একলা যুবকের জ্বরের বিকারে ছটফট করার অনুভূতি কল্পনা করতে পারার ক্ষমতা অবশ্য বাপ্পার তখন ছিল না।

.

সোমবার বিকেলে বিশু ঠাকুর এসে দেখল জ্বরে রথীনের গা পুড়ে যাচ্ছে। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই সে ধরে আনল এতদঞ্চলের বিখ্যাত ডাক্তার রামপ্রাণ চক্রবর্তী ওরফে পরাণ ডাক্তারকে, যিনি সম্পর্কে তার মামাতো দাদা। ডাক্তারবাবু এলেন তাঁর নিজস্ব এক্কাগাড়িতে চেপে, সঙ্গে কোচম্যানের হাতে চৌকোনা কাঠের বাক্স। সেরে ওঠার পর চিনিকে লেখা চিঠিতে সেই কোচম্যানের বর্ণনা দেবে রথীন ‘অদ্ভুত দুঃখী গবাদি পশুর মতো মুখ, বেঁটেখাটো পেশিবহুল দেহ, অনেকটা যেন ভিক্তর উগোর হাঞ্চব্যাক অফ নোতরদামের মতো’। ডাক্তারবাবুর রুপোলি চশমার পেছনে গোল গোল চোখ, ফতুয়ায় নস্যির ছোপ আর কানের ফুটোয় পাকা চুলের গুচ্ছ ছাড়া সেই প্রথম দর্শনের আর কিছুই তার মনে ছিল না। পরাণ ডাক্তার একটি চার ব্যাটারির টর্চ দিয়ে রোগীর চোখ জিভ পরীক্ষা করলেন, পেট টিপলেন, বুকে পিঠে টোকা মারলেন, নখের ডগা দেখলেন। (‘নিজেকে মাইরি মনে হচ্ছিল যেন সদ্য মাটি খুঁড়ে তোলা পোড়ামাটির সুলতানি ফলক!’ – চিনিকে লিখেছিল রথীন।) এরপর তিনি জ্বর আসা-যাওয়ার সময়, শিরশিরে অনুভূতির ধরন, মুখের বিস্বাদ, প্রস্রাবের গন্ধ এবং মলের রঙ বিষয়ে প্রশ্ন করলেন।

সব তথ্য জানার পর ডাক্তার রুপোলি ফ্রেমের চশমার ওপর দিয়ে উৎসুক চোখ মেলে তাঁবুর ভেতরটা খুঁটিয়ে দেখলেন, বাক্সের ওপর রাখা বইগুলো দেখলেন, বাহারি চীনা লন্ঠনটা দেখলেন, বাঁশে ঝোলানো কবি ও বৈজ্ঞানিকের ছবিটা দেখলেন। তারপর কোচম্যানের হাতে ধরা কাঠের বাক্সের ডালা খুলে সারি সারি শিশির ভেতর থেকে একটি তুলে নিয়ে রোগীর নীলচে জিভের ওপর তর্জনির টোকা মেরে নিখুঁত তাক করে ফেলে দিলেন ছটি দানা চাইনিনাম সালফিউরিকাম ২০০।

‘ম্যালেরিয়া!’ ঘোষণা করলেন পরাণ ডাক্তার। ‘এই যে আপনারা যত্রতত্র মাটি খুঁড়ে রাখছেন, সেখানে মশার চাষ হচ্ছে। তাদেরই একটি এই কান্ডটা ঘটিয়েছে। বলা যায় এখানকার ভূমিই এভাবে প্রতিশোধ নিচ্ছে। তার কারণ আপনারা তাকে ছিন্নভিন্ন করে যে জিনিসটা প্রমাণ করতে চাইছেন সেটা সবাই জানে এ হলো এক অতি প্রাচীন জনস্থান!’

সেদিন সন্ধ্যাবেলা সেই বিচিত্রদর্শন কোচম্যান, যার ততোধিক বিচিত্র নাম হলো গামা, রথীনের জন্য নিয়ে এল খামে আঁটা ছোটো ছোটো ওষুধের পুরিয়া। খামের গায়ে পেনসিলে গোটা মেয়েলি হস্তাক্ষরে সেবনের নিয়মাবলী লেখা রয়েছে। এছাড়া আনল একটি মশারি, খবরের কাগজে পরিপাটি করে মোড়ানো।