শ্যামলীর প্রবেশ ও প্রস্থান

০৩. শ্যামলীর প্রবেশ ও প্রস্থান

মিসেস সেনের বয়স অনুমান করার প্রথম বাধা হল ওঁর ঘোমটা-ঢাকা অর্ধেক মুখ। বাকি অর্ধেকও ঢাকা পড়েছে বলা যায়। শরীরে প্রচুর মেদ থাকলেও বেশ শক্তসমর্থ মনে হচ্ছিল। আমি আন্দাজে বয়সটা বিয়াল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যে কোথাও দাঁড় করাতে পারি।

ভদ্রমহিলার কণ্ঠস্বরটা অদ্ভুত লাগল। চাপা, একটু ভাঙা, সেইসঙ্গে ফিসফিসানির মতো কতকটা ইংরাজিতে যাকে বলে হিসিং সাউন্ড। টনসিলের দোষ থাকলে এমন হতে পারে শুনেছি।

আমাদের ড্রইংরুমে ঢোকার আধ মিনিটের মধ্যে উনি এসে গিয়েছিলেন। আমার পরিচয় কর্নেল যথারীতি দিলেন। তারপর ওঁদের কথা শুরু হল। কর্নেল বললে বলুন ম্যাডাম, অধমকে কী জন্যে স্মরণ করেছেন?

মিসেস স্বাগতা সেন বললেন, আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় মৃগেন দাশগুপ্ত রিটায়ার্ড মুন্সেফ উনি, বলছিলেন যে উইলটা নিশ্চয় জাল। কিন্তু প্রমাণ করতে হলে অনেক ব্যাকগ্রাউন্ড ইনফরমেশান দরকার হবে। সেগুলো যোগাড় করে দিলেই উনি কেস লড়বার ব্যবস্থা করতে পারবেন। তাছাড়া আমাদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানও বলেছেন।

কর্নেল টাক চুলকে বললেন রাইট, রাইট।

মৃগেনদাই আপনার কথা বলেছেন। আপনি তো একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার মানে, গোয়েন্দা হিসাবে আপনার কথা আমিও নিউজপেপারে পড়েছি। আপনি যদি আমাকে সাহায্য করেন, তাহলে…

কর্নেল আবার বললেন রাইট, রাইট।

স্বাগতা সেন সোৎসাহে ঝুঁকে পড়লেন ওঁর দিকে। বললেন–আপনার ফি কত জানি না–যদি কিছু না মনে করেন, আড়াই হাজার টাকা আপনাকে রেমুনারেশান দেব!

কর্নেল–আশ্চর্য, অতীব বিস্ময়কর, সহাস্যে বললেন–অগ্রিম কত দেবেন শুনি?

–আপাতত একহাজার নিন। কেস জিতলে বাকিটা অবশ্য দেব।

আমাকে হতভম্ব করে কর্নেল দরাদরি শুরু করলেন। অগ্রিম অন্তত দুহাজার চাই–কেস জিতুন আর হারুন, বাকি পাঁচশো পুরো তথ্য দাখিল করলে দিতে হবে। অনেকটা সময় এই বিচিত্র এবং অকল্পনীয় দরদস্তুর চলল। আমি ঘেমে সারা। এ কী কাণ্ড করছেন কর্নেল! জীবনে কখনও কোন কেসে একটি পয়সা কারো কাছে চাননি–দাবি করেননি, নিজের পকেট থেকে একগাদা টাকা খরচ করে গেছেন হাসিমুখে, তিনি এই কেসে টাকার অঙ্ক এবং শর্ত নিয়ে তুমুল লড়ে যাচ্ছেন!

অবশেষে রফা হল। স্বাগতা সেন কর্নেলের শর্তই মেনে নিলেন। বুকের ভিতর থেকে যাদুকরীর মতো একটা ছোট্ট পার্স বের করলেন। তার মধ্যে ভাঁজকরা চেকবই আর কলম ছিল। তক্ষুনি একটা চেক লিখে দিলেন। কর্নেল সেটা পকেটস্থ করে চুরুট ধরালেন। তারপর বললেন–হুম! তাহলে এবার আমাকে কিছু সঠিক তথ্য দিতে হবে ম্যাডাম।

মিসেস সেন হিসহিস করে উঠলেন বা রে! তথ্য যদি আমিই দিতে পারব। তাহলে আপনাকে টাকা দিলাম কেন? এ আপনি কী বলছেন?

-দেখুন মিসেস সেন, অন্ধকারে আমি এগোতে চাই না। আমি শুধু আপনাকে প্রশ্ন করে যাবো, আপনি জবাব দেবেন–যে জবাব আপনার জানা।  যা জানা নয়, বলবেন–জানিনে, ব্যস! চুকে গেল।

মিসেস সেন একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, ঠিক আছে।

–বিলাসপুরের বাগানবাড়িতে পিকনিক করার প্রথা আপনাদের নতুন নয়। প্রতি বছর চৈত্রের দোল-পূর্ণিমায় আপনারা সেখানে একটা দিন ও রাত কাটিয়ে আসেন। পার্টি হয়। অনেকটা রাত অব্দি নাচগান ধূমধামও হয়। কেমন?

-হ্যাঁ।

এবার অর্থাৎ গত ২৩শে মার্চ আপনারা ওই উদ্দেশ্যে গেলেন। এবারও কি পার্টি দিয়েছিলেন?

–না। আমরা পিকনিকটা নিজেদের কয়েকজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলাম।

–কেন?

মিঃ সেন ইদানীং হইহল্লা বরদাস্ত করতে পারতেন না। একা থাকতে ভালবাসতেন। বয়স হচ্ছিল–শরীরও ভালো যাচ্ছিল না। আমি ওঁকে ফিল করতে পেরেছি বরাবর। আমরা নিঃসন্তান দম্পতি বুঝতেই পারছেন। তাই ঠিক হল, এবার মোটেও পার্টি দেওয়া হবে না।

রাইট। তা কে কে গেলেন ওখানে?

–আমরা স্বামী-স্ত্রী, আমার বোনের ছেলে ডাক্তার অমরেশ গুপ্ত, ওঁর বন্ধু অ্যাটর্নি সুশান্ত মজুমদার, এই ক’জন মাত্র। বাকি একজন আমাদের রাঁধুনি ঘনশ্যাম, দুজন চাকর জগন্নাথ আর সোফার সুরেন্দ্র। সুশান্তবাবু নিজের গাড়ি চালিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। আমার পৌঁছানোর অনেকটা পরে উনি পৌঁছান।

–এবার খুব ভাল করে স্মরণ করুন মিসেস সেন, ঘটনাটা কীভাবে ঘটল।

 মিসেস সেন এতক্ষণে ফোঁস করে উঠলেন। কী বিপদ! আপনি ওঁর অ্যাকসিডেন্ট নিয়ে এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? আপনি উইল সম্পর্কে কোন কথাও তো জিগ্যেস করছেন না! অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাকসিডেন্ট! আর ওই ভয়ঙ্কর স্মৃতি ঘেঁটে কি আমার স্বামীকে ফিরে পাব?

মিসেস সেন ঠিক যে সুরে ‘অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাকসিডেন্ট’ বললেন–লক্ষ্য করলাম–অবিকল একই সুরে বলছিল শ্যামলী। উইল ইজ উইল!’

কর্নেল মুখ গোমড়া করে বললেন-ম্যাডাম, আমার কাজে যথেষ্ট স্বাধীনতা না দিলে আমি এক্ষনি চেক ফেরত দেব এবং চলে যাব। কোন তথ্য আপনার স্বার্থে যাবে, ডিয়ার ম্যাডাম, তা যদি আপনি টের পেতেন–তাহলে এই নীলাদ্রি সরকারকে কারো দরকার হত না।

–আপনি বলছেন, অ্যাকসিডেন্টের সঙ্গে উইলের সম্পর্ক আছে?

–কে বলতে পারে নেই বা আছে? যদি থাকে?

কী জানি, আমি ওসব বুঝি না। আপনি যা জিগ্যেস করার করুন।

–যখন রাইফেল হাতে মিঃ সেন দৌড়ে যান……

–উঁহু। গোড়া থেকে শুনুন। তখন সবে সাড়ে পাঁচটার কাছাকাছি হবে— সূর্য গাছপালার আড়ালে গেছে। কিন্তু যথেষ্ট আলো আছে। আমি, অমরেশ আর সুশান্তবাবু তাঁবুর সামনে ঘাসের উপর চেয়ার পেতে গল্প করছি। ঘনশ্যাম কাছেই বটগাছটার নিচে ইট জড়ো করে উনুন জ্বেলেছে সবে। জগন্নাথ আর হরিয়া মশলা বাটা ইত্যাদিতে ব্যস্ত। সুরেন্দ্র দাঁড়িয়ে তদারক করছিল। তারপর দেখলাম, সুশান্তবাবু ঢিল ছুঁড়ে কাক তাড়াতে লাগলেন। তখন সবাই তাকিয়ে দেখি বটগাছটায় রাজ্যের কাক এসে বসে রয়েছে প্রচণ্ড চেঁচামেচি করছে। আমরাও দেখাদেখি ওর সঙ্গে কাক তাড়াতে লাগলাম হইচই করে। কাকগুলোর নড়ার নাম নেই তবু।

–তখন মিঃ সেন কোথায় ছিলেন?

–ঘরে কোথাও ছিলেন।

–ঘরে মানে?

–কি বিপদ! ওখানে আমাদের–মানে ওঁর পৈতৃক বাড়ি রয়েছে যে। কুঠিবাড়ি বলে সবাই। নীলকুঠি না রেশমকুঠির কোন ব্রিটিশ অফিসার থাকত। পরে আমার শ্বশুর নাকি কিনেছিলেন। একশ বছরের বেশি বয়স বাড়িটার। একতলা। আটদশটা ঘর রয়েছে। আমরা মোটামুটি সাজিয়ে রেখেছি বরাবর। তা–

–আপনারা যেখানটা তাবু করেছিলেন, তার কতদূরে বাড়িটা?

–আমি মেপে দেখিনি। অনেকটা দূরে। ইচ্ছে হলে গিয়ে দেখে আসবেন।

তারপর কী হল বলুন?

 –আশেপাশে ভাঙা পাঁচিলের অজস্র ইট পড়েছিল। আমরা তা গুঁড়ো করে ছুঁড়তে শুরু করলাম। একসঙ্গে অতসব তাড়া খেয়ে কাকগুলো পালাতে লাগল। কুঠিবাড়ির কাছাকাছি যেতেই দেখি উনি বন্দুক হাতে নিয়ে দৌড়চ্ছেন।

কোন্‌দিকে?

 কাকগুলো যেদিকে যাচ্ছিল, সেইদিকে।

–তারপর?

ব্যাপার দেখে আমরা হাসাহাসি করলাম।

–আপনারা কেউ গেলেন না?

কী হবে গিয়ে? আমরা আবার গল্পগুজবে মেতে গেলাম।…বলে স্বাগতা সেন আবার চটে গেলেন।–ওই দেখুন, সেই অ্যাকসিডেন্ট আর অ্যাকসিডেন্ট। মিঃ সরকার, আমি যা বলার পুলিশকে সব বলেছি। ইচ্ছে হলে ওদের কাছে গিয়ে জেনে নিন। প্লিজ, সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার কাছে আমাকে আর নিয়ে যাবেন– না।

প্লিজ মিসেস সেন, এটা ভাইটাল। শুধু বলুন–ঠিক ক’টায় মিঃ সেনকে খুঁজতে পাঠান আপনারা?

-সাড়ে সাতটায়।

তাহলে সাড়ে পাঁচটা থেকে সাড়ে সাতটা অব্দি আপনি, ডাক্তার অমরেশ গুপ্ত, মিঃ, মজুমদার, রাঁধুনী, দুজন চাকর এবং সোফার ওইখানেই ছিলেন? নাকি কেউ ইতিমধ্যে কোথাও গিয়েছিল?

মিসেস সেন হিসহিস করে উঠলেন কী বলতে চান আপনি?

–আমি ঘটনাটার একটা স্পষ্ট ছবি চাই।

কেউ আমরা নড়িনি ওখান থেকে।

–আপনার তাহলে নিশ্চয় কড়া নজর ছিল প্রত্যেকের দিকে?

তার মানে?

তা না হলে কেমন করে জানলেন যে কেউ কোথাও গিয়েছিল কি না?

 দমে গেলেন স্বাগতা সেন। তিনি এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন আপনি হয়তো ঠিকই বলেছেন। আমি অত লক্ষ্য রাখিনি। কিন্তু যদি কেউ ওখান থেকে সরে গিয়ে আবার এসে থাকে, সে তো আমাদের রাঁধুনী চাকর দুজন আর সোফারের মধ্যে কেউ। অমরেশ বা মিঃ মজুমদার আমার কাছেই ছিলেন। জগন্নাথদের জিগ্যেস করলেই হবে। কিন্তু ওরা–ওরা কেন…মিঃ সরকার, আবার আপনি সাংঘাতিক কিছু হাতে নিয়েছেন! আপনি কি বলতে চাই কেউ ওঁকে খুন করেছে?

–আমি কিছুই বলতে চাইনে স্বাগতা দেবী। আমি সত্যে পৌঁছতে চাই।

মিসেস সেন এবার ছটফট করে উঠলেন। ঘোমাটি ভালো করে ঢেকে কুৎসিত ভঙ্গিতে কেঁদে উঠলেন! প্রথমে কিছুক্ষণ কিছু বোঝা গেল না কী বলছেন। অবশেষে বোঝা গেল।–এ আমি ভাবিনি! সত্যি, ভাবিনি! আপনি ঠিকই বলেছেন। ওই হারামজাদী বেশ্যা মেয়েটা ওঁকে ভুলিয়ে সর্বনাশ করবে আমি জানতাম! ঠিক-ঠিক। ওঁকে গুণ্ডা লাগিয়ে খুন করেছে। আমরা ভুল বুঝেছিলাম! পুলিশ–পুলিশকেও টাকা খাইয়ে ও মিথ্যা রিপোর্ট লিখিয়েছে!

কর্নেল ওঁকে সান্ত্বনা দিতে ব্যস্ত হলেন। আমার মাথা ধরে উঠেছিল। কর্নেলকে ইশারায় বললাম বাইরে একটু ঘোরাঘুরি করছি। কর্নেল আমার দিকে মনোযোগ দিলেন না। আমি বেরিয়ে এলাম। এটা দোতলা। সিঁড়ি বেয়ে নিচে গেলাম। কাকেও দেখলাম না। বাথরুমে যাওয়ার দরকার হল সেইসময়। ভাবলাম কাজটা সেরে নিই। এদিক-ওদিক খুঁজেও টয়লেটের পাত্তা পেলাম না। কোন লোক নেই যে জিগ্যেস করব। ডাইনের ঘরে ভারী পর্দা ঝুলছে। ভিতরে কথা বলার আওয়াজ পেলাম। মরিয়া হয়ে ওখানেই কাকেও জিগ্যেস করব ভেবে পর্দা একটু ফাঁক করলাম। তারপরই অবাক হয়ে পেছিয়ে এলাম। মিস শ্যামলী বসে রয়েছে।

হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি–সেইসময় একজন খাকি হাফপ্যান্ট শার্ট পরা বুড়ো সারভ্যান্ট গোছের লোক সিঁড়ি বেয়ে নামছে দেখলাম। তাকে জিগ্যেস করতেই বলল বাঁদিকে পড়বে।

 টয়লেটে কাজ সেরে আরামে পাইপ ধরিয়ে আসছি, সেই দরজার কাছে এসে শ্যামলী আর কার চাপা কথাবার্তার আওয়াজটা আবার কানে এল। কৌতূহলও বটে, আবার শ্যামলীকে চমকে দেবার ছেলেমানুষি তাগিদেও বটে কর্নেলের তোয়াক্কা না করে পর্দাটা ফাঁক করলাম। দেখলাম, শ্যামলীর মুখোমুখি বসে রয়েছেন মিসেস সেন। সেই হিসহিসে ভাঙা কণ্ঠস্বর!

কখন নেমে এসেছেন ভদ্রমহিলা–আমি টয়লেটে ঢোকার পরে। তাহলে কর্নেল বেরিয়ে গেছেন! আমি বেরিয়ে লনে গেলাম। কিন্তু কর্নেলকে খুঁজে পেলাম না। কোথায় গেলেন বৃদ্ধ গোয়েন্দাপ্রবর? আমার গাড়িতে হেলান দিয়ে সিগ্রেট ধরালাম। দাঁড়িয়ে থেকে থেকে পা ধরে গেল। এগারোটা বাজল। কর্নেল বেরোচ্ছেন না। বাড়ির কোন লোকও দেখছি না যে জিগ্যেস করব। তখন ফের ঢুকলাম গিয়ে। প্রথমে সেই ঘরের পর্দাটা তুললাম, মিস শ্যামলী নেই–মিসেস সেনও নেই! তাহলে সবাই ওপরে গেছেন! যাক গে, উইলের একটা ফয়সালা হয়ে যাক।

ওপরে গেলাম। সেই ড্রইংরুমে কর্নেল নেই। কোথায় গেলেন তাহলে? হয়তো অন্য কোন ঘরে–গোপনে বোঝাপড়া হচ্ছে। টানা বারান্দা দিয়ে এগোলাম সেইসময় ফের সেই খাকি পোশাকপরা লোকটাকে দেখা গেল। বললামবুড়ো ভদ্রলোক–মানে যিনি মিসেস সেনের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তিনি কোথায়?

ও বলল–এই তো একটু আগে নিচে গেলেন। চলুন, আমি দেখছি।

 সে পা বাড়াল। বললাম-তোমার নাম কী?

আজ্ঞে, জগন্নাথ স্যার।

 –হরিয়া নামে আরেকজন আছে, সে কোথায়?

–দেশে গেছে স্যার। গত কালকে। মেদিনীপুর ওর বাড়ি। সেখানে গেছে। পরশু আসবে।

–জগন্নাথ, তুমি তো অ্যাকসিডেন্টের দিন বিলাসপুরে ছিলে!

 সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে গেল সে। সন্দিগ্ধ স্বরে প্রশ্ন করল–আপনি কি স্যার পুলিশ?

–আরে, না না! আমি এমনি জিগ্যেস করছি। আমি খবরের কাগজের লোক।

–ছিলাম স্যার। আরো সবাই ছিল–হরিয়া, অ্যাটর্নির্বাবু…ডাক্তারবাবু তো এখনও আছেন। ওনাকেও জিগ্যেস করুন। সব বলবেন।

–আচ্ছা জগন্নাথ, সেদিন পিকনিকে নিশ্চয় খুব ধূমধাম হয়েছিল?

আগেরবারের মতো কিছুই নয়।

–তবে ফুলটুল দিয়ে নিশ্চয়, ইয়ে সাজিয়েছিলে তোমরা?

জগন্নাথ ফাঁচ করে হাসল।কী সাজাব স্যার? ও তো বনভোজন। বনজঙ্গুলে জায়গা। ফুল এমনিতেই কত ফুটেছিল চারদিকে। হ্যাঁ–একসময় মালী ছিল, তখন কেতা ছিল। এখন আর যত্ন হয় না। সব জঙ্গল হয়ে গেছে।

–তাহলেও তো আমোদ-প্রমোদের জন্যে যাওয়া। নিশ্চয় তোমরা সবাই জামায় টামায় দু’একটা ফুলটুল গুঁজেছিলে? আঁ?

আমার কৌতুকি ভঙ্গিতে ও হেসে গড়িয়ে পড়ল প্রায়। বলল–আমরা কাক তাড়াব, না মশলা বাটবনা ফুল..কী যে বলেন স্যার! আমরা চাকরবাকর লোক। আমাদের ও সখ থাকতে নেই।

–তোমাদের সায়েবরা নিশ্চয় ফুল গুঁ…

 জগন্নাথ পা বাড়িয়ে বলল, নাঃ–ফুল টুল…না তো!

–তোমাদের গিন্নিমা নিশ্চয় গুঁ….

জগন্নাথ ভাঙা দাঁত খুলে হেসে খুন। তারপর চাপা গলায় এবং নিজের মাথা দেখিয়ে বলল-গুজবেন কোথা? মুখ যে পোড়া হনুমান! সে জানেন না বুঝি? আর বলবেন না–যদ্দিন থেকে জুটেছেন, হাড়মাস কালি হয়ে গেল! হরিয়া কি সাধে অ্যাদ্দিন পালিয়েছে? আপনাকে বলার মতো মনে হল–তাই দুঃখের কথা বলছি স্যার। খবরের কাগজে তো আপনারা চাকরদের চোর ডাকাত খুনে বলে। নিন্দে করেন, কিন্তু মনিবের সাইডটা তো দ্যাখেন না!

–কেউ বললে তো লিখব সেকথা! এই তুমি বলছ এবার লিখব।

–লিখবেন স্যার, তবে যদি সরকারের চোখে পড়ে! বুঝলেন স্যার হরিয়া আর আসবে না। আমিও কেটে পড়ছি শিগগির।

–কেন, কেন জগন্নাথ?

বলছি তো। নতুন গিন্নিমা এসে..

নতুন গিন্নিমা মানে?

–হ্যাঁ স্যার। এই তো কমাস হল সায়েব বিয়ে করে বসলেন আবার। বোম্বে গেলেন–ফিরে এলেন একেবারে বউ নিয়ে। বউ না কালসাপ! এসেই খেল ওনাকে!

আমি অবাক হয়ে গেলাম। বললাম সায়েবের আগের স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন নাকি?

-হ্যাঁ। সে তো কবে–আট ন’বছর আগে। অমন মানুষ আর জন্মায় না স্যার। আর এনার কথা বলবেন? দজ্জাল, খটরাগী। সবচেয়ে অবাক লাগে স্যার, সায়েব আর মেয়ে পাননি–ওই মুখপোড়া রাক্ষুসীকে ঘরে নিয়ে এলেন?

বল কী জগন্নাথ! মুখপোড়া অবস্থায় ঘরে নিয়ে এলেন?

–আজ্ঞে হ্যাঁ। নতুন বৌদি এসে অব্দি দেখি ঘোমটা খোলেন না। পরে শুনি কী অ্যাকসিডেন্ট হয়ে মুখটা গেছে। পেলাস্টিক করিয়েছিলেন

–প্লাস্টিক সার্জারি?

–তাই হবে। কিন্তু তাতেও নাকি কাজ হয়নি।

আমরা সিঁড়ি থেকে নেমে ইতিমধ্যে লাউঞ্জে এসে কথা বলছি। সেইসময় ফুটফুটে সাদা সায়েবচেহারার এক ভদ্রলোককে ওদিকের একটা ঘর থেকে আরেকটা ঘরে ঢুকতে দেখলাম। জগন্নাথ চোখ নাচিয়ে বলল–উনিই গিন্নিমার ভাই–সেই ডাক্তারবাবু। পিকনিকের আগের দিন এসেছেন। থাকেন বোম্বেতে।

 হঠাৎ লাফিয়ে উঠল জগন্নাথ।–ওই যাঃ! আমার দেরি হয়ে গেল। আপনি ঐ ঘরে চলে যান স্যার, লাইব্রেরি ঘরে। বুড়ো সায়েব ওখানেই ঢুকেছেন।

জগন্নাথ চলে গেল। ও যে ঘরটা দেখাল, সেই ঘরেই আমি শ্যামলীকে মিসেস সেনের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি। সটান ঢুকে দেখি, কর্নেল আর মিসেস সেন, কোণে একসার আলমারির কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমাকে দেখে কর্নেল ইশারায় কাছে যেতে বললেন।

অজস্র ছোটবড় আলমারি আর বুকসেলফে ভরতি ঘরটা। কোণের দিকে সোফাসেট একটা। কাছে গিয়ে আমার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। অস্ফুট চিৎকার করে উঠলাম–শ্যামলীর কী হয়েছে কর্নেল?

শ্যামলী মেঝেয় পড়ে রয়েছে। নিথর একেবারে। চোখ দুটো ফেটে বেরিয়ে পড়েছে। জিভটাও বেরিয়ে গেছে। কী বীভৎস দেখাচ্ছে ওকে! সেই সুন্দর শরীর থেকে একটা ভয়ঙ্কর বিকৃত সত্তা আত্মপ্রকাশ করেছে।

কর্নেল বললেন, শি ইজ ডেড। একটু আগে কেউ ওকে গলা টিপে খুন করেছে, জয়ন্ত। কিন্তু বুঝতে পারছিনে–কেন এখানে এল ও?

আমি মিসেস সেনের দিকে আঙুল তুলে বলতে যাচ্ছিলাম যে ওঁকেই একটু আগে এখানে শ্যামলীর সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি কর্নেল যেন চকিতে টের পেয়ে বলে উঠলেন–আমি আর মিসেস সেন বরাবর একসঙ্গে ছিলাম, জয়স্ত। দুজনে একইসঙ্গে এঘরে ঢুকে শ্যামলীর ডেডবডিটা দেখতে পেয়েছি।

মিসেস সেন কাঁপছিলেন। হিসহিস কণ্ঠস্বরে বললেন–কেউ পুলিসে ফোন করছেন না কেন আপনারা? আমি যে বিপদে পড়ে গেলাম। আমারই ঘরে– ওঃ! দু’হাতের তেলোয় মুখ নামালেন উনি। পিঠটা ফুলে ফুলে কাঁপতে থাকল।

কর্নেল বললেন–জয়ন্ত, লালবাজারে আরেক জয়ন্ত রয়েছে। প্রথমে ওকে ডাকো। ওই দ্যাখো, ফোন রয়েছে। শুধু বলো এখানে কর্নেল সরকার এক্ষুনি আসতে বলেছেন।

–যদি উনি না থাকেন?

ময়ূখ ব্যানার্জিকে ডেকে দিতে বলবে।

 আমি ফোনের কাছে গেলাম। ফোন করতে করতে লক্ষ্য করলাম, কাছে যে বিশাল পর্দাটা ঝুলছে, তার ওধারে কেউ দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার পা দুটো দেখা গেল। পুরুষই। পায়ে হালকা চটি রয়েছে। পাজামা পরা লোক।

ময়ুখবাবুকেই পাওয়া গেল। ফোন করেই পর্দা তুললাম। ডাক্তার অমরেশ। গুপ্ত হকচকিয়ে গেলেন। বললাম–এখানে কী করছেন আপনি?

ভদ্রলোক কাচুমাচু মুখে জবাব দিলেন–কী ব্যাপার ঘটেছে লাইব্রেরির ভেতরে, আঁচ করছিলাম। কিন্তু সাহস হচ্ছিল না–পাছে আবার ডেডবডি দেখতে হয়।

–আপনি তো ডাক্তার। ডেডবডিতে ভয় হবার কথা নয়।

 কর্নেল ডাকছিলেন-কার সঙ্গে কথা বলছ জয়ন্ত?

আমি অমরেশের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলাম। ভদ্রলোক গুটিসুটি দিব্যি চলে এলেনবাধা দিলেন না। তারপর আঁতকে উঠে বললেন কী সর্বনাশ!

মিসেস সেন স্প্রিঙের মতো ঘুরে ভাইয়ের বুকে ভেঙে পড়লেন। সে দৃশ্য দেখবার মতো। কর্নেল ঘড়ি দেখছেন আর টাক চুলকোচ্ছেন। আমি থ…।