পিকনিকে দুর্ঘটনা

০১. পিকনিকে দুর্ঘটনা

 অনেকদিন পরে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ইলিয়ট রোডের বাসায় গেলাম। বাড়িটার নাম সানি লজ। কর্নেল থাকেন তিন তলায়–পূর্ব-দক্ষিণ প্রান্তে।

আজ গিয়ে দেখি, কর্নেল পুবের জানলায় ঝুঁকে আমার দিকে পিছু ফিরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ভঙ্গিটা দেখে হাসি পেল। থমকে দাঁড়ালাম।

হঠাৎ কর্নেল ওদিকে মুখ রেখেই বললেন-জয়ন্ত, কাককে শাস্ত্রে অমঙ্গলের প্রতীক কেন বলা হয় জানো?

আমি তো থ। কর্নেল কীভাবে টের পেলেন যে আমিই এসেছি! কাছাকাছি কোন আয়না নেই যে আমার প্রতিবিম্ব দেখতে পেয়েছেন।

কর্নেল এবার ঘুরে বললেন বসো। তোমার পায়ের শব্দ শুনেই বুঝতে পেরেছি।

–পায়ের শব্দ শুনে? বলেন কী কর্নেল?

–ওটা অবাক হবার মতো কিছু নয়। নিতান্ত পর্যবেক্ষণের অভ্যাস। তবে সেই সঙ্গে তোমার সিগারেটের চেনা গন্ধটা আমাকে বলে দিয়েছে। বসো।

বসলাম না। ওঁর পাশে গিয়ে জানলার বাইরে তাকালাম। নিচে একটা বস্তি এলাকা রয়েছে। তার মধ্যে অনেকগুলো গাছ আছে। নিম কৃষ্ণচূড়া শিমূল আর জামরুল। মধ্য কলকাতায় একটা পাড়াগাঁ রয়ে গেছে, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। নিমগাছটা প্রকাণ্ড। তার ডালপালা কালো করে বসে রয়েছে কয়েকশো কাক। তাই দেখছিলেন তাহলে! বললাম কাক কিসের প্রতীক বলছিলেন যেন?

–অমঙ্গলের।..বলে কর্নেল কোণের সোফায় বসে পড়লেন।–এস জয়ন্ত, : আজ আমরা কাক নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা করি।

আমিও বসলাম। বসে বললাম–সায়েবদের শাস্ত্রে কাক নিয়ে কোন প্রসঙ্গ নেই?

কর্নেল বললেন–ঘেঁটে দেখিনি। কিন্তু যাই বলো জয়ন্ত, প্রাচীন ভারতীয়রা যে কাককে অমঙ্গলের সঙ্গে অর্থাৎ এভিলের সঙ্গে যুক্ত করেছেন–তার সঙ্গত কারণ আছে। ওঃ জয়ন্ত, যে কাকগুলো দেখলে এইমাত্র–আমাকে পাগল করে ছাড়লে! কী কর্কশ ডাক, কী চ্যাঁচামেচি সারাদিন।

হেসে বললাম–ওটা নিতান্ত কাকতালীয় ব্যাপার! আপনার ক্ষেত্রে।

–ঠিক বলেছ। কাকতালীয় যোগের কথাটা মাথায় আসেনি এতক্ষণ ..বলে উনি সোজা হলেন। চোখ দুটো যেন জ্বলে উঠল। কর্নেল বিড়বিড় করলেন আপন মনেহাউ ফানি! ভুলেই গিয়েছিলাম। কাকতালীয় যোগ! ঠিক, ঠিক। দ্যাটস দা আইডিয়া।

অবাক হয়ে বললাম কী ব্যাপার কর্নেল?

কর্নেল প্রশ্নে আমল না দিয়ে আমার দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে বললেন-কাক এসে তালের ওপর বসল, ঠিক সেই মুহূর্তে তালটা পড়ে গেল। কেউ যদি তার থেকে ধরে নেয় যে কাকটা বসার দরুন তালটা পড়ল, তাহলে। সে নিশ্চয় ভুল করছে। অথচ ঠিক ওইরকম সিদ্ধান্তই আমরা নানা ব্যাপারে করে ফেলি। পরস্পর বিচ্ছিন্ন দুটো ঘটনা একত্র ঘটলে আমরা একটাকে আরেকটার কারণ বলে ধরে নিই অনেকক্ষেত্রে। আসলে তালটা পড়ার সময় হয়ে এসেছিল-কাকটা না এলেও পড়ত। তাই না জয়ন্ত?

–হ্যাঁ! সে তো বটেই। যেমন, আপনি তো কতদিন ধরে ওই জানালার বাইরে কাকগুলো দেখে আসছেন, নিশ্চয় আজকের মতো এমন বিরক্ত হননি, কিংবা কাক নিয়ে মাথা ঘামাননি, কাজেই কর্নেল, আজ যখন হঠাৎ কাক দেখে বিরক্ত হয়েছেন এবং আমি আসামাত্র কাকপ্রসঙ্গে প্রশ্ন করে বসলেন, তখন আমিও এক্ষেত্রে ব্যাপারটা কাকতালীয় যোগ বলতে বাধ্য হয়েছি। অর্থাৎ আপনার বিরক্তিময় ভাবনার পিছনে অন্য ঘটনা আছে। তা নিতান্ত কাক নয়।

কর্নেল একটু হাসলেন এবার। রাইট, রাইট, তবে কী জানো জয়ন্ত, ভেবে দেখলাম কাকচরিত্র সত্যি বড় রহস্যময়। ভারতীয় পণ্ডিতরা কাকচরিত্র নিয়ে কেন মাথা ঘামাতেন, টের পাচ্ছি। আশা করি, কাকচরিত্র’ নামে প্রাচীন তত্ত্বশাস্ত্র তোমার পড়া আছে।

–ভ্যাট! সে সব গাঁজাখুরি ব্যাপার। আজকাল কেউ মানে না।

–সে আলাদা প্রশ্ন, কে মানে বা মানে না। কিন্তু কাক-ওঃ! হরিবল!..আবার বিড়বিড় করে কী বলতে থাকলেন কর্নেল।

সেই মুহূর্তে ঝট করে আমার মনে পড়ে গেল, আজকের কাগজের প্রথম পাতায় বারো পয়েন্ট বোল্ড হরফে ছাপা বক্স করা ছোট্ট খবরটা। পি টি আই এর খবর। প্রখ্যাত শিল্পপতি শ্রীহিতেন্দ্রপ্রসাদ সেন গত ২৩শে মার্চ তার। বিলাসপুরের বাগানবাড়িতে এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, উড়ন্ত একঝাক কাক লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ার সময় দৈবাৎ তিনি গুলিবিদ্ধ হন। খবরটা এত দেরি করে বেরনোর কারণ সম্ভবত পুলিশের বিধিনিষেধ।

কর্নেলের সামনের টেবিলে একটা স্টেটসম্যান পড়ে ছিল। তক্ষুনি তুলে নিয়ে দেখি, ওঁরাও প্রথম পাতায় ছেপেছেন খবরটা বক্স করেই। আর বক্সটা ঘিরে লাল পেন্সিলে দাগ দিয়ে রেখেছেন কর্নেল। এই ব্যাপার তাহলে!

কর্নেল আমার কাণ্ড দেখছিলেন চুপচাপ। তারপর বললেন–হুঁম্। তোমার উন্নতি হবে জয়ন্ত। তোমার মন খুব দ্রুত কাজ করতে পারে।

-হিতেন সেন মারা গেছেন? কি কাণ্ড! এই তো বিশে মার্চ পার্ক হোটেলে একটা কভারেজে গিয়েছিলাম, বিলাসপুরে একটা স্বদেশী মেলা বসাচ্ছেন– তারই প্রেস কনফারেন্স ডেকেছিলেন।

সর্বনাশ! তাহলে তো আর মেলাটা হবে না।

–হুঁম্। হবে না। হয়তো হত–ওঁর স্ত্রীর উদ্যোগেই তো ব্যাপারটা হবার– কথা ছিল। শ্রী সেন নিঃসন্তান। শ্ৰীমতী সেন–এসব ক্ষেত্রে যা হয়, সমাজসেবা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু মেলাটা হচ্ছে না।

-কেন? অসুবিধা কিসের? সে তো এপ্রিলের মাঝামাঝি শুরু হবার কথা।

হবে না। কারণ, শ্রী সেনের যে উইল বেরিয়ে পড়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে উনি সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মাত্র সিকিভাগ দিয়ে গেছেন স্ত্রী এবং অন্যান্য কিছু দুঃস্থ আত্মীয়কে, প্রত্যেকে সমান-সমান হিস্যা। বাকিটার অর্ধেক একটা আশ্রমের নামে, অর্ধেক কোন এক শ্রীমতী শ্যামলীর নামে।

–সে কী? ভারি অদ্ভুত ব্যাপার তো! কে সে?

–এই শ্যামলী নামে মহিলাটিকে তুমি চিনতেও পারো। অন্তত নাম শোনা উচিত, কারণ তুমি রিপোর্টার।

লাফিয়ে উঠলুম উত্তেজনায়।–কর্নেল, কর্নেল! ক্যাবারে গার্ল মিস শ্যামলী নয় তো?

কর্নেল মৃদু হাসলেন। দ্যাটস রাইট।

–মিস শ্যামলীকে হিতেন সেনের মতো লোক–ভ্যাটু! অসম্ভব! কর্নেল জোরে হেসে উঠলেন।–সম্ভব-অসম্ভব সম্পর্কে যা শেষ কথা বলার, শেক্সপিয়ার বলে গেছেন বৎস জয়ন্ত। যাই হোক, আমার বিরক্তির হেতু কিংবা অস্বস্তির উৎস সেটা নয়। কোটিপতিরা অনেক ব্যাপার করেন–যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে নিশ্চয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে। সেকালে রাজামহারাজা নবাববাদশারা এর চেয়ে অনেক বিস্ময়কর কাজ করতেন। বাদশা সাজাহানের কথাই ধরো। বউয়ের জন্যে তাজমহল নামে কী এলাহি কাণ্ড করে গেলেন! জয়ন্ত, ওসব ছেড়ে দাও। এস, আমরা কাক নিয়ে আলোচনা করি।

–আর কাক!..বিরক্ত হলে বললুম। আশ্চর্য কর্নেল! হিতেন সেন একটা ক্যাবারে নর্তকীকে অত সম্পত্তি দিয়ে গেলেন? ইস্ কোন মানে হয় এর?

–মাই ডিয়ার ইয়ং ম্যান, তুমি দেখছি নেহাত ছাপোষা মানুষের চোখে ব্যাপারটা দেখছ! ভুলে যাচ্ছ যে তুমি একজন সাংবাদিক। যেখানে-সেখানে অজস্র সম্পদের অপচয় তোমাদের তো চোখে পড়ার কথা। সামাজিক বৈষম্যের বাস্তব নিদর্শন চারপাশে এত বেশি যে ও নিয়ে নতুন উত্তেজনা প্রকাশ করা বৃথা। তুমি রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী নও, আমিও নই। তুমি-আমি সমাজের উন্নতি বা সাম্য আনবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠিনি। বলতে পারি বড়জোর–উই হ্যাভ দা ফিলিংস, উই আর কনসাস অ্যাবাউট দা রিয়্যালিটি। কিন্তু আমরা এ ব্যাপারে নিতান্ত অসহায়। যাই হোক, আমি একজন অপরাধবিজ্ঞানী এবং তুমি একজন রিপোর্টার হিসেবে এ মুহূর্তে শুধু ওই অমঙ্গলের প্রতীক কালো রঙের পাখি সম্পর্কে কিছু করতে পারি কি না দেখা যাক।

একটু হাসতে হল। কাক নিয়ে কী করতে চান?

সত্যে পৌঁছতে।

 তার মানে?

–একটু আগে আমরা কাকতালীয় যোগের কথা বলছিলাম, জয়ন্ত। তাই না?

–হ্যাঁ, বলছিলুম তো।

কর্নেল ডাকলেন। ষষ্ঠী! কফি।

.

একটু পরে ষষ্ঠীচরণ নিঃশব্দে ট্রেতে কফির পট, কাপ আর একটা স্ন্যাকসের প্যাকেট রেখে চলে গেল। কর্নেল তার উদ্দেশে কতগুলো মিষ্টি বাক্য উৎসর্গ করে বললেন-কফি বানাও, জয়ন্ত।

কফির পেয়ালা হাতে না পাওয়া অব্দি মুখ খুললেন না কর্নেল।

একটা চুমুক দিয়ে বললেন–হিতেন সেনের মৃত্যুর ব্যাপারে তোমার কোন বিস্ময় জাগছে না?

না তো। উড়ন্ত কাক মারতে বন্দুক তুলেছিলেন, হয়তো পোশাকে কিংবা অন্য কিছুতে লেগে নলটা যথেষ্ট ওপরে ওঠবার আগেই ট্রিগারে চাপ পড়েছিল–অ্যাকসিডেন্ট হয়ে গেছে। এ তো খুবই স্বাভাবিক। আমার বিস্ময় জাগাচ্ছে উইলে মিস শ্যামলীকে–

বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন–হুম, অ্যাকসিডেন্টের বর্ণনাটা অবিকল তোমার ধারণার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে জয়ন্ত। পুলিশের রিপোর্ট এবং বিলাসপুর বাগানবাড়িতে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সকলের বর্ণনা ওইরকম। কিন্তু কাক আমাকে জ্বালাচ্ছে সারাক্ষণ।

-কেন?

কর্নেল উত্তেজিত হলেন যেন।–মাই ডিয়ার জয়ন্ত, এটা কেন তোমার কাছে অদ্ভুত মনে হচ্ছে না যে হিতেন সেন কাক মারতে বন্দুক তুলেছিলেন? আর কিছু নয়–স্রেফ কাক? হিতেন সেন মোটামুটি ভালো শিকারী ছিলেন, আমি জানি। বয়সেও এমন কিছু বুড়ো হননি। মাথাও ছিল পরিষ্কার। কোন অসুখ-বিসুখ ছিল না। ওষুধ খাওয়ার বাতিক ছিল না। কোনরকম অ্যালোপ্যাথি ওষুধ জীবনে খাননি। বড়জোর হোমিওপ্যাথি খেতেন। তাও কদাচিৎ। তা– একজন ধুরন্ধর, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, ঝানু ব্যবসায়ী মানুষ হিতেন সেন–আর কিছু পেলেন না, কাক মারতে গেলেন?

–হয়তো ওখানে কাকের ভীষণ উপদ্রব আছে। ওই তো দেখুন না, অতসব কাক নিমগাছটাতে রয়েছে। আমারই বিরক্ত লাগছে দেখে। হয়তো হিতেনবাবুও ওদের চাঁচামেচিতে বিরক্ত হয়েছিলেন। তাই….

জয়ন্ত, জয়ন্ত! বুদ্ধির সামনে থেকে ঘষা কাঁচটা সরিয়ে ফেলল।

–কেন কর্নেল?

কাক বিরক্তির কারণ নিশ্চয়। কিন্তু তার জন্যে কেউ তাদের তাড়াতেই চাইবে–মেরে ফেলতে নয়। অন্তত যদি সে বদরাগী লোক না হয়। হিতেন সেন মোটেও বদরাগী গোঁয়ার-গোবিন্দ বা হঠকারী বুদ্ধির লোক ছিলেন না। ধরে নিচ্ছি, তিনি বন্দুকই ছুঁড়েছিলেন কাক তাড়াতে কিংবা আরও এগিয়ে ধরে নিচ্ছি, কাক মারতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু ছররা নয় কেন? কেন সাংঘাতিক বিপজ্জনক একটা বুলেট ব্যবহার করে বসলেন? এবং ভেবে দ্যাখোবন্দুক নয়, নিতান্ত শটগান নয়–একেবারে ওঁর উইনচেস্টার রাইফেল হাতে নিলেন।

–তাও তো বটে। পুলিশের কোন সন্দেহ হয়নি এতে?

–কেমন করে হবে? সবাই বলছে এবং তাছাড়া পুলিশ তদন্ত করে প্রমাণ পেয়েছে ওই রাইফেলটা ছাড়া আর কোন অস্ত্র হিতেনবাবুর বাগানবাড়িতে ওই সময় ছিল না। রিপোর্ট বলছে, বাগানবাড়িতে প্রাঙ্গণের শেষদিকে সন্ধ্যার একটু আগে গাছপালার ছায়ায় সুদৃশ্য তাঁবু খাঁটিয়ে পিকনিক মতো করা হয়েছিল। উনুন এবং খাবারদাবার ছিল গাছের নিচে। কাকগুলোর তখন গাছে বসার সময়। তাই বারবার বিরক্ত করছিল। খাবারে পায়খানা করে দিতে পারে–সেই আশঙ্কায় সবাই মিলে অনেকবার ঢিল ছুঁড়ে তাড়া করেছিল। তারপর অবশেষে হিতেনবাবু রেগেমেগে রাইফেলটা নিয়ে বেরিয়ে আসেন। সেইসময় কাকগুলো আচমকা মাথার ওপর থেকে চাঁচাতে চাঁচাতে উড়তে শুরু করে। পিছন পিছন একা দৌড়ে যান হিতেনবাবু। বাগানের ঘন ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে তাকে আর দেখা যায় না কতক্ষণ। পিছনে ওই দিকটায় কোন বসতি নেই। জঙ্গল আর আখের খেত আর একটা ছোট নদী রয়েছে। পাঁচিল ওদিকে গত বন্যায় ধ্বসে গিয়েছিল। মেরামত এখনও হয়নি। নদী থেকে ভাঙা পাঁচিলের মধ্যে ঢালু কুড়ি গজ জঙ্গুলে জায়গার ঠিক মাঝামাঝি পড়েছিলেন হিতেনবাবু। গুলি লেগেছে। চিবুকের নীচে, গলার ওপর অংশে–ডানদিকে। গুলি সোজা মগজে গিয়ে ঢুকেছে। ইতিমধ্যে মিনিট দশকারো মতে মিনিট পনের পরে ওদিক থেকে গুলির আওয়াজ শোনা যায়। হিতেনবাবুর ফেরার নাম নেই। হ্যাঁসাগ জ্বালানো হয়েছে ইতিমধ্যে। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা সাতটা বেজে যায়। তখনও উনি ফেরেন না। সাড়ে সাতটায় মিসেস সেন উদ্বিগ্ন হয়ে খুঁজতে পাঠান। একজন চাকর সঙ্গে নিয়ে যান হিতেনবাবুর অ্যাটর্নি মিঃ সুশান্ত মজুমদার। ওঁরা হিতেনবাবুকে আবিষ্কার করেন। টর্চ ছিল দুজনেরই হাতে। অবশ্য পূর্ণিমার রাত ছিল। প্রতি বছর চৈত্রের দোলপূর্ণিমার রাতে বিলাসপুর বাগানবাড়িতে পিকনিক করা অভ্যাস ছিল হিতেনবাবুর। জয়ন্ত, সমস্ত ব্যাপারটা বিচার করে আমার ধারণা হয়েছে, পুলিশ এবং হিতেনবাবুর আত্মীয়স্বজনের সিদ্ধান্তটা যেন কাকতালীয়। তুমি কী বলো?

–হুঁ, কী রকম যেন খাপছাড়া মনে হচ্ছে। অবশ্য মিস শ্যামলীর সম্পত্তি লাভের ফলে আমাদের প্রেজুডিসড় হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এই অঘটনটা হিতেনবাবু না ঘটিয়ে গেলে তার মৃত্যু দুর্ঘটনা বলেই চালানো যেত।

–তোমার কথা অস্বীকার করছি না। পুলিশও পরে একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেছে। উইলটা ওদের ধাঁধায় ফেলেছে। কিন্তু এদিকে তো মৃতদেহ আর হাতে নেই যে ফের পরীক্ষা করে দেখবে। ইতিমধ্যে সেটা ভস্মীভূত।

মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পুলিশ নিশ্চিত তো?

-হ্যাঁ, অবশ্যই। ওই রাইফেল থেকেই গুলি বেরিয়ে মাথায় ঢুকেছে। রাইফেলের বাঁটে হিতেনবাবু ছাড়া অন্য কারো আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি। কোন উল্টোপাল্টা সাক্ষ্যও কেউ দেয়নি। আবার কোন প্রত্যক্ষদর্শীও ছিল না।

উদ্বিগ্ন মুখে বললুম কর্নেল! তাহলে কি এটা খুনের ঘটনা বলে আপনি নিঃসংশয়?

কর্নেল হাত তুলে বললেন, না জয়ন্ত। আমি ঠিক তা বলতে চাইছি না। কোন নিঃসংশয় সিদ্ধান্তেও আমি পৌঁছইনি। শুধু বলতে চাচ্ছি যে হিতেন সেনের আকস্মিক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পটভূমিকা আমার কাছে যুক্তিসিদ্ধ মনে হচ্ছে না। আগেই বলেছি দুটো ব্যাপার আমার ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না। এক : হঠাৎ ভদ্রলোকের কাকের ওপর তাদের খেপে গিয়ে পিছনে দৌড়নো, দুই : বুলেটভরা রাইফেল হাতে নেওয়া।

–কিন্তু সাক্ষীরা তো বলছেন, তাই দেখেছেন।

–হ্যাঁ, দেখেছেন এবং বলেছেন একবাক্যে।

–তাহলে?

 কর্নেল টাকে হাত বুলাতে বুলোতে বললেন–ডার্লিং! তুমি তো দর্শনের ছাত্র ছিলে। অবভাসতত্ত্ব সম্পর্কে তুমি অজ্ঞ নও। প্রকৃত বস্তু এবং প্রতীয়মান বস্তু অর্থাৎ রিয়েলিটি ও অ্যাপিয়ারেন্সের বিষয় কি নতুন করে বোঝাতে হবে তোমাকে? রেল লাইনে দাঁড়িয়ে দূরের দিকে তাকালে মনে হয় দুটো লাইন ক্রমশ দিগন্তে গিয়ে মিশে গেছে পরম্পর। কিন্তু বস্তুত–আমরা জানি, ওরা বরাবর সমান্তরাল। হিতেন সেন কাকের ওপর রেগে গিয়ে গুলিভরা রাইফেল হাতে দৌড়ে গেলেন এবং পরে গুলির শব্দ শোনা গেল। এবং ঠিক গলার নিচে গুলি ঢুকে মগজ যুঁড়ল। একই রাইফেলের গুলি–ছটার মধ্যে একটা খরচ হয়েছে, পাঁচটা ঠিকঠাক কেসে রয়েছে। এবং আছাড় খাওয়ার চিহ্নও রয়েছে শরীরে। রাইফেলে ওঁর আঙুলের ছাপ ছাড়া কোন ছাপ নেই। সব–সবকিছু আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। মিস শ্যামলীকে বিশাল সম্পত্তি দেওয়াটা আমি ছেড়ে দিলাম। কিন্তু এটা বাদ দিয়েও যে ঘটনাটা দাঁড়ায় অর্থাৎ দুর্ঘটনায় মৃত্যু, সেটা নিছক অ্যাপিয়ারেন্স বা প্রতীয়মানও তো হতে পারে! ধরো–যদি মিস শ্যামলী উইলে নাও থাকতেন, মিসেস সেনই সব সম্পত্তি পেতেন–তবেও ব্যাপারটা কি তোমার রিয়্যাল ইনসিডেন্ট বলে মনে হচ্ছে জয়ন্ত?

–ঠিকই বলেছেন।

–কেন হিতেন সেন হঠাৎ কাকের ওপর খেপে গেলেন?

ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে বললুম–তাই তো! কেন?

–কেনই বা উনি গুলিভরা রাইফেল নিয়ে দৌড়ে গেলেন?

–হ্যাঁ। কেন গেলেন?

কর্নেল খপ করে আমার হাত ধরে বললেন–ওঠ, বেরিয়ে পড়ি।