সাগরের মুখোমুখি
সন্ধে নেমেছে।
গাঢ় নীলাম্বরী পরে চঞ্চল অভিসারিকার মতো ছটফট করছে সমুদ্র। তীরে এসে আছড়ে পড়ছে পায়ের নূপুর, শব্দ বাজছে ঝুমঝুম ঝুমঝুম।
মনটা বড় চঞ্চল আমারও। যেন আমার মন আমারই বশে নেই। স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি নিজের হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ, ডুবডুব ডুবডুব। আজ সকালে যে ঘটনাটা ঘটে গেল, তার জন্য কে দায়ী? আমি? বন্দনা? শুভ্র? অন্তহীন জলরাশির সামনে বসে প্রশ্নটা কুরে কুরে খাচ্ছে আমাকে। নিজেকে গোপন রাখা বড় কঠিন এখন।
আমি, আমিই অপরাধী।
তটভূমির এদিকটা অপেক্ষাকৃত নির্জন। পিছনে উঁচু বালিয়াড়ি, লোকজন তেমন আসছে না এদিকে। আছি শুধু আমরা ক’জন। এখনও চাঁদ ওঠে নি, নীলচে অন্ধকারে সমুদ্র এখন আরও রহস্যময়। ছোট ছোট ঢেউ ফেনা ছড়িয়ে চিকচিক করে উঠছে। হঠাৎ হঠাৎ। দূরে দূরে। আচমকা মনে হয় যেন জলকন্যারা মাথা তুলল।
—অ্যাই অন্তু, সিগারেট আছে?
শুভ্র। অকারণ চমকটা সামলে প্যাকেট বাড়িয়ে দিলাম।
শুভ্র প্যাকেট রাখল না। একটা সিগারেট বার করে নিয়ে ফিরিয়ে দিল। গলা ঝেড়ে বলল,—একটাও চাঅলা আসছে না কেন বল্ তো?
সত্যি, এখন একটু চা পেলে ভাল হত। কিন্তু জুটছে কোথায়? যা দু’ চারটে ফেরিঅলা আসছে, তাদের হাতে শাঁখ, নয় ঝিনুক। একটু আগে জয়া আর মিত্রা একটা বাচ্চা ছেলের সঙ্গে ঝিনুকের মালা নিয়ে দরাদরি করছিল। মেয়েদের জন্যই ফেরিঅলারা আসে বেশি।
মধু ভেজা বালিতে চিৎ হয়ে শুয়ে। বেচারার শরীরটা সকালে ভাল ছিল না, তার ওপর বিকেলে যা জোর একটা ঝাড় খেল পুলুর কাছে! বন্দনাকে নিয়ে পুলু বুঝি হাঁটতে বেরিয়েছিল, মধু নাকি তখন ধাওয়া করেছিল ওদের! ইচ্ছে করে! কড়া ধমক খেয়ে বেচারার কী কাঁচুমাচু দশা! এখন অবশ্য দিব্যি ভুলে গেছে, খেলা করছে টুটুলের সঙ্গে। টুটুল আঁজলা ভরে বালি তুলে মধুর বুকপকেটে ভরে দিচ্ছে, মধু ঝেড়ে ফেলছে পকেট থেকে, টুটুল আবার ভরছে। বাচ্চারা মধুকে বড় তাড়াতাড়ি ভালবেসে ফেলে। মধুও।
শুভ্রর দু’ পাশে বন্দনা আর জয়া। না, বন্দনা ঠিক পাশে নয়, খানিক তফাতে। মিত্রা পুলু আরও দূরে। নতুন বিয়ে হয়েছে, এখন ওরা তো একটু আলাদা আলাদা থাকতে চাইবেই। তা বলে বেশি আদিখ্যেতা দেখানোরও মানে হয় না। সবার সঙ্গে যখন এসেছিসই, একটু মানিয়ে গুনিয়ে চলা উচিত নয় কি? না এলেই পারতিস।
আমারও কি আসাটা ঠিক হয়েছে? এ ভাবে দল বেঁধে না এলে হয়তো ঘটনাটা ঘটত না। বন্দনাকে দোষ দিই না, সে বেচারা হয়তো কোনওভাবে একটু শান্তি চাইছে, পালাতে চাইছে শুভ্রর কাছ থেকে। এত তাড়াতাড়ি ধৈর্য হারাল বন্দনা?
অস্বীকার করব না বন্দনার ওপর এক কালে আমারও দুর্বলতা ছিল। নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পাই নি, তার আগেই বন্দনা শুভ্রর হয়ে গেল। মনের ইচ্ছে মনেই মেরে ফেললাম আমি। প্রিয় বন্ধুর প্রেমিকার দিকে ভুলেও হাত বাড়াবে, অনুতোষ রায় চৌধুরীর সে ধাতই নয়। সত্যি কথা বলতে কি, বুকে তখন কাঁটা খচখচ করলেও খুশিও কি হই নি আমি? কেন হব না? শুভ্রর মতো দরাজদিল ছেলে ক’টাই বা আছে দুনিয়ায়? পুলুর ভেতরে তাও কিছু কিছু ছোট ছোট নীচতা আছে, স্বার্থপরতা আছে। টাকাপয়সার ব্যাপারে তো রীতিমত ছ্যাঁচড়া, যত টাকা দিচ্ছে তার পাইপয়সা প্রতি স্টেপে বুঝে নিচ্ছে। কোথায় কোন্ ট্রাভেল এজেন্সি কোনার্ক ট্যুরে পাঁচ টাকা কম নেবে, পুলু সেখানেই ছুটল। এত চমৎকার হোটেল তাও ব্যাটার মন ওঠে না। কথায় কথায় বলছে, শালারা চামার, গলায় গামছা দিয়ে পয়সা আদায় করে! মাংস কেন তিন পিস দেয়, চিকেনটা কেন বুড়ো….! শুভ্র একদম আলাদা। আজও আমি বললে আমার সামান্য উপকারের জন্য জান লড়িয়ে দেবে। এ কি শুধুই কৃতজ্ঞতাবোধ? ওদের বিয়েটা ঘটিয়ে দিয়েছিলাম বলে? কক্ষনো না। আবেগ ভালবাসা পরোপকার শুভ্রর রক্তে আছে, জানি আমি। তবু শুভ্রর জীবনটাই কেন এমন হয়ে গেল? কেন ওরা অত অসুখী?
বন্দনা যা বলল তা কি সত্যি? হতেও পারে। একটা মানুষের তো অজস্র চেহারা থাকে। আমরা হয়তো একটা মুখ দেখি, বন্দনা দেখে আরেকটা মুখ, ওর অফিসের লোকজন দেখে আরও একটা! বাইরে থেকে দেখে স্বামী-স্ত্রীর প্রকৃত সম্পর্ক আন্দাজ করা অত সহজ নয়।
শুভ্র অনেকক্ষণ নিশ্চুপ। সিগারেট শেষ, সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন একটু ঝুঁকে বসে। সমুদ্রের ধারে এলে মানুষ এমনিতেই স্তব্ধ হয়ে যায়, নিজের তুচ্ছতা অসহায়তা বড্ড বেশি মনে পড়ে, শুভ্র কি সেই কারণেই চুপ? চুপ, নাকি গুম?
কিছু কি আন্দাজ করেছে শুভ্র?
সকালে টুটুলকে নিয়ে জগন্নাথ মন্দিরে পুজো দিতে গেল জয়া। মিত্ৰা পুলু আর শুভ্রও গেল সঙ্গে। মধুটার কাল রাত থেকে একটু পেট গড়বড়, নিজের ঘরে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিল। আমি কেন গেলাম না জয়াদের সঙ্গে? ঠাকুর দেবতায় আমার বিশ্বাস নেই ঠিকই, কিন্তু মন্দির ঘুরে দেখতে তো দোষ ছিল না!
কেন মনকে চোখ ঠারিস অনুতোষ? বন্দনা রয়ে গেল বলেই তো তুই….
মোটেই না। বন্দনা হোটেলে থাকবে আমি জানতামই না।
মিথ্যে কথা। ব্রেকফাস্ট টেবিলেই বন্দনা বলেছিল মাথা ধরেছে, সকালে কোথাও বেরোবে না।
আমি অত খেয়াল করি নি। তখন টুটুলকে খাওয়াচ্ছিলাম।
ড্যাম লাই। তুই জেনেশুনে…..
দুটো স্বর ভেতরে যেন ঘেউ ঘেউ শুরু করেছে। ঝগড়া করছে গলার শির ফুলিয়ে। একটা স্বর গর্জে উঠল, বেশ করেছি। নয় জেনেশুনেই ছিলাম। তাতে হয়েছেটা কী? মেয়েটা অসুস্থ, একজন কারুর তো থাকা উচিত।
অন্য স্বর খলখল হেসে উঠল, যাক, সত্যিটা স্বীকার করলি তাহলে? …… বাই দি বাই, বন্দনার মাথাব্যথা কবে থেকে তোর চিন্তার এক্তিয়ারে এল? কাল হাত ধরাধরি করে সমুদ্রস্নানের পর থেকে?
চোপ, একদম চুপ!
কাকে চোখ রাঙাস অনুতোষ? শরীরে শরীর ছোঁয়াতেই বদলে গেলি? নাকি সমুদ্রের ঢেউ বুকে ঢুকে গেল, অ্যাঁ?
অন্য স্বর নীরব। নিথর। আবার হৃৎপিণ্ডে শব্দ বাজছে, ডুবডুব ডুবডুব, ডুবডুব। সকালটা দুলে উঠল চোখের সামনে…..
….বন্দনার ঘরে টোকা পড়ল।
—কে?
—আমি। অন্তুদা।
—ও, আসুন।
উঠে বসে কাপড় চোপড় ঠিক করছিল বন্দন!। শুভ্রর সঙ্গে সকালেই আবার ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল হয়তো। একা শুয়ে কি কাঁদছিল? দুগালে যেন তার অশ্রুচিহ্ন?
অপ্রস্তুত মুখে বললাম, –ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুমি শুয়ে থাকো। তোমার মাথাধরা কমেছে কিনা দেখতে এসেছিলাম।
—না না, এখন ঠিক আছি। বসুন।
তখনই কি আমার ফিরে আসা উচিত ছিল? মন তো সেরকমই বলছিল, তবু কেন চেয়ারে বসলাম? কথাও খুঁজে পাচ্ছি না, উঠেও আসতে পারছি না, কী যে এক উদ্ভট দশা তখন! নৈঃশব্দ্যও যে কখনও কখনও মানুষকে এত বিভ্ৰান্ত করে তোলে।
বন্দনাই বাঁচাল। বলে উঠল, অন্তুদা, কী করি বলুন তো?
—কীসের কী করবে?
—আমার আর আজকাল কিচ্ছু ভাল লাগে না।
কথাটা বাতাসে ভাসতে লাগল। যেন ভাল না লাগার কষ্টটা চাপা গুমোট হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল ঘরে।
মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল,–তোমাদের কী হয়েছে বলো তো?
—কিছু বোঝেন না? একটু আগের কান্না যেন আবার মুক্তোবিন্দু হয়ে জমাট বাঁধল বন্দনার চোখে। চাপা স্বরে বলল,—আপনাকে অন্তত একটু অন্য রকম ভেবেছিলাম। সেন্সেটিভ। সিরিয়াস।
ভীতু গলায় বললাম, – প্রবলেমটা কী খুলে বলো না।
—প্লিজ, আমি কী করব আপনি বলে দিন। আমি আর শুভ্রর সঙ্গে থাকতে পারছি না।
ভাবতেও পারি নি কথাটা এত সরাসরি বলবে বন্দনা। বাক্যস্ফূর্তি হচ্ছিল না আমার। বুঝতে পারছিলাম না ঠিক এই মুহূর্তে আমারই বা কী বলা উচিত।
—অ্যাম আই টু বিলিভ, আপনারা কিচ্ছু বোঝেন না? আমরা কেউ আর কাউকে সহ্য করতে পারি না আজকাল।
—কেন?
—কেন আবার কী, শুভ্র আমায় বিশ্বাস করে না। সন্দেহ করে। যাচ্ছেতাই ভাষায় গালিগালাজ করে, যখন তখন। বন্দনা স্পষ্টতই উত্তেজিত। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। জানলায় গিয়ে স্থির। ফিরল, এবং আচমকা ফুঁপিয়ে উঠল, সবার কাছে আমায় দোষী সাজিয়ে ও ভালমানুষ সাজতে চায়। শুভ্ৰ যে কত বড় হিপোক্রিট আপনারা জানেন না। আমাকে একেবারে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিল। আমি এখন একটা নরকে বাস করি অন্তুদা, নরক।
কেন সন্দেহ করে শুভ্র? কাকে নিয়ে সন্দেহ করে? প্রশ্নটা মনে এলেও ঠোঁট নড়ল না। যদি বন্দনা বলে শুভ্রর সন্দেহের লোকটি আমি নই, অন্য কেউ, সেটা বুঝি আরও গভীরভাবে বিধবে আমাকে।
বন্দনার দু’ গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। বড় বড় ফোটায়। রক্তকরবীর পাপড়ির মতো পাতলা ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠল।
আমার বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম কোনও এক অবচেতনায় বন্দনার প্রতি দুর্বলতাটা আমার রয়েই গেছে। এমনটাই বোধহয় হয়। সব কিছুই তো চিরকাল বুকেই জমে জমে থাকে আমার। জমে পাথর হয়ে যায়, কিন্তু মরে না। আশা আকাঙ্ক্ষা ক্ষোভ দুঃখ…। হয়তো গোপন কামনাও। বাবা মারা গেছে কোন্ ছোটবেলায়, তার মুখটাও মনে পড়ে না। মা ব্যস্ত থাকত কাজে, স্কুল টিউশ্যনি মিলিয়ে উদয়াস্ত পরিশ্রম। আমাকে তেমন সময় দিতে পারত কই! শৈশব আমার কেটেছে একা একাই। হয়তো সেই জন্যই আমি এরকম। আমার ইনট্রোভার্ট নেচারটাকে লোকে অহঙ্কার বলে ভাবে। চাকরির জায়গার লোকেরা, আমার বন্ধুরা, এমনকি জয়াও। কিন্তু কী করব আমি? আমি যে আমার মধ্যেই থাকতে ভালবাসি।
বন্দনা সামনে এসে বসল। অদ্ভুত একটা কাণ্ড করে ফেলল সহসা। শাড়ির আঁচল সরিয়ে ব্লাউজের হাতাটা কাঁধ থেকে নামিয়ে দিল,—দেখুন; আপনার বন্ধুর কীর্তি। দেখুন, কীভাবে ছ্যাঁকা দিয়েছে আমাকে। সিগারেট দিয়ে।
দগদগ করছে পোড়া দাগ। টাটকা। শিউরে উঠলাম,—এ কী, এমন কেন করেছে?
—মেজাজ। ইচ্ছে। নিজেই বলল বউ বদলা বদলির খেলা খেলি, অথচ আপনার সঙ্গে সমুদ্রে গেছি বলে…. ও একটা ইমপসিবল্ ধরনের মানুষ। ওর সঙ্গে কোনও সুস্থ স্বাভাবিক মেয়ে এক ছাদের নীচে বাস করতে পারবে না।
বন্দনার মাথায় হাত উঠে গেল আমার, কেঁদো না, কেঁদো না। আমি তো আছি। দেখছি, দেখছি সব।
বন্দনা আমার হাতটা তুলে নিয়ে মুখে চেপে ধরল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে –অন্তু, অন্তু….অন্তু, আমায় বাঁচাও। প্লিজ বাঁচাও।
এমন একটা পরিস্থিতি যে জীবনে কখনও আসবে স্বপ্নেও ভাবি নি। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। হৃৎপিণ্ড তড়াং তড়াং লাফাচ্ছে, মনে হচ্ছে এক্ষুনি খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে যাবে।
সমস্ত সংযম ছিঁড়ে গেল। এতদিনের শিক্ষা দীক্ষা, চর্চিত অন্তর্মুখীনতা কোথায় ভেসে গেল। যেন হৃদয়ের অতলে কবেই হারিয়ে যাওয়া কথাটা বেরিয়ে এল,—আমি তোমায় ভালবাসি বন্দনা, বিশ্বাস করো। কোনও দিন মুখ ফুটে বলতে পারি নি….। তুমি এভাবে কাঁদলে আমার খুব কষ্ট হয়।
বন্দনা পাগলের মতো জড়িয়ে ধরল আমায়। পাগল, না কুহকিনী? কুহকিনী, না সাপিনী? নাকি এ এক অসহায় লতা, পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ধরছে মহীরুহকে? কতক্ষণ আমাদের ঠোঁটে ঠোঁট মিশেছিল? কতক্ষণ থেমে ছিল সময়?….
বন্দনা এখন দু’ হাঁটুর মাঝে থুতনি ঠেকিয়ে সাগরমনস্ক। তরল অন্ধকারে মুখ স্পষ্ট দেখা যায় না। ওর দিকে আর সোজাসুজি তাকাতে পারছি না আমি। কেন পারছি না? সংকোচ? লজ্জা? আত্মধিক্কার? বড় বেশি নিঃসঙ্গ লাগছে নিজেকে। অন্ধকারের আয়নায় নিজের মুখ দেখে আমি চমকে চমকে উঠছি। এতই যদি বন্দনার ওপর দুর্বলতা ছিল, কেন বিয়ে করেছিলাম জয়াকে? নয় নয় করে পাঁচ পাঁচটা বছর ঘর করছি আমরা, টুটুলের মতো একটা ফুটফুটে মেয়ে রয়েছে আমাদের, নিটোল সুখী দম্পতি বলে ভাবি নিজেদের, সবটাই তাহলে ফাঁকি? জয়ার ওপর কোনও টান নেই আমার? সে কি শুধুই শরীর?
জয়া জানলে কী ভাববে? শিশুর মতো সরল জয়া, আমি ছাড়া দুনিয়াটাকে ভাবতেই পারে না। ওকে প্রতারণা করার কী অধিকার আছে আমার?
আবার প্রতিস্বর জেগে উঠছে বুকে। ও ভাবে ভাবছিস কেন অনুতোষ? জয়াকেও ভালবাসিস তুই, তোর মতো করে ভালবাসিস। এক জনকে ভালবাসলে কি আরেক জনকে ভালবাসা যায় না? পুরুষের হৃদয় কি এত ক্ষুদ্ৰ কুঠুরি, যে একজনকে রাখলে দ্বিতীয় জনকে সেখানে ধরবে না? জয়াকে আঘাত দিস না, কিন্তু বন্দনাকেও পাশে রাখ। শুধু একটু সতর্ক থাকলেই হোল।
টুটুল দৌড়ে বেড়াচ্ছে। কোথেকে এক বেলুনঅলাকে জোগাড় করে এনেছে, জয়ার কাছে বায়না ধরেছে বেলুনের।
জয়া চাপা স্বরে ধমকাল। কাঁদ কাঁদ মুখে মধুময়ের পাশে বসে পড়ল টুটুল। মধুময় ছুটল বেলুনঅলার পিছু পিছু। দু’ হাতে দু’খানা বেলুন কিনে ফিরছে, গাল ভর্তি হাসি। টুটুল বেলুন হাতে উচ্ছল, ছুটছে এদিক ওদিক, ঘুরে ঘুরে সব্বাইকে বেলুন দেখাচ্ছে।
উঠে জয়ার পাশে এসে বসলাম। নীরবে আকাশের তারা গুনছি। মেঘহীন আকাশে শলমা চুমকি টিপ টিপ। এখনও চাঁদ উঠল না।
—কী ভাবছ? জয়া নীচু গলায় প্রশ্ন করল।
—কিছু না।
—উঁহু, কিছু একটা তো ভাবছই।
—সত্যি, কিছু না। সমুদ্রের পাড়ে চুপচাপই বসে থাকতে হয়।
চোখ কুঁচকে জয়া তাকাল আমার দিকে,—শরীর টরীর খারাপ হয় নি তো? বলেই কপালে হাত ছুঁইয়েছে,-সমুদ্রে আজ নেমেই উঠে এলে….
ভাত খেলে ওইটুকুন….কোনও অস্বস্তি টস্বস্তি হচ্ছে?
মায়া মাখা স্বর। একটুতেই বড় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে জয়া। জোর করে হেসে উঠলাম, আরে না না, আমি হানড্রেড পারসেন্ট ফিট। ….তারপর তোমাদের মন্দির ভ্রমণ কেমন হল?
জয়া সামান্য ঠোঁট ফোলাল,—এতক্ষণে মনে পড়ল? তোমার মতো নাস্তিক বাপু আমি জীবনে দেখিনি।
—শুধু কি নাস্তিক? বলো, পাষণ্ড নাস্তিক। ….তারপর, কত টাকা গচ্ছা দিলে পুজোয়?
—বেশি না, পঁচিশ টাকা।
—জগন্নাথ দর্শন হল?
—একদম কাছ থেকে দেখেছি। শুভ্ৰদা একটা পাণ্ডাকে ফিট করে ফেলেছিল, সে একেবারে….
—তবে আর কী! তোমার পুণ্য এখন খায় কে!
—ঠাট্টা করছ?
—উঁহু, হিংসে হচ্ছে। সামনে থেকে জগন্নাথ দেখা, এ তো এক বিরল সৌভাগ্য। গর্বও হচ্ছে, কত বড় এক পুণ্যবতীর স্বামী আমি…..
—অ্যাই, টিজ করবে না।
নিজের আকস্মিক প্রগল্ভতায় নিজেরই অবাক লাগছে। বেশি উচ্ছলতা দেখে জয়া আবার কিছু সন্দেহ না করে বসে!
তবু উচ্ছ্বাসটাকে ধরে রেখেই বললাম,—জগন্নাথবাবুর সঙ্গে ফেস্ টু ফেস্ দেখা হয়ে গেল, কিছু বর টর চাও নি?
—চেয়েছি তো। বললাম আমার রামগরুড় স্বামীটাকে একটু হাসিখুশি করে দাও।
—কী বলল জগা? হাত তুলল, তথাস্তু? ওহো, জগন্নাথের তো আবার হাত নেই। পুওর ফেলো।
জয়া হেসে গড়িয়ে পড়ল,—ঠাকুর দেবতা নিয়ে মস্করা? দেখবে দেখবে…. শুভ্র পাশ থেকে বলে উঠল,—অ্যাই, তখন থেকে তোরা কী গুজগুজ করছিস বল্ তো? প্রেম করতে হলে ও পাশে যা, মিত্রা পুলুদের ওদিকে।
—ইস্, প্রেমের কথা বলবে আপনার বন্ধু? তাহলেই হয়েছে।
—তাহলে কি জিওমেট্রির এক্সট্রা বোঝাচ্ছে?
জয়া আবার হেসে গড়িয়ে পড়ল।
শুভ্র হৈ হৈ করে উঠল,–এই তো, এতক্ষণ পর জমেছে! সারাক্ষণ কেউ চুপচাপ, কেউ গুজগুজ, ভাল লাগে? ….এই জয়া, একটা গান ধরো তো।
জয়া হাসতে হাসতে হোঁচট খেল,– গান? এখন? এখানে?
—হ্যাত্মা। আমরা শুনব। তোমার বর শুনবে। সমুদ্র শুনবে।
পলকের জন্য মনে পড়ল এই শুভ্র সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়েছে বন্দনাকে। আমার সঙ্গে সন্দেহ করে।
তেতো গলায় বললাম,—গাও না। শুভ্র যখন বলছে। চুপ করে বসে থাকতে আর ভালও লাগছে না।
বন্দনা চকিতে মুখ তুলল হাঁটু থেকে। এক ঝলক আমার দিকে তাকিয়ে নিয়ে আবার মুখ নামিয়েছে।
শুভ্র বলল, – আমি বলছিলাম বলে তো দর বাড়াচ্ছিলে। এবার বর বলছে, গাও।
—তুৎ, কোনও ভাল গান মনে আসছে না।
—ওরকমই হয়। সমুদ্রের ভাস্টনেসের সামনে সব গুলিয়ে যায়। মধু চেঁচিয়ে উঠল,—আমি গাইব?
টুটুল হাততালি দিয়ে উঠল,—তুমি গানও গাইতে পার মধুকাকা?
—মধু যে কী না পারে! শুভ্র হা হা হাসল, খেলতে পারে, হাসতে পারে, চপল সুরে গাইতে পারে…. কী গান গাইবি রে?
মধু গা মুচড়োল,—হাম তুম এক কামরেমে বন্ধ হো গাইব?
—শালা, চতুর্দিক হু হু করে খোলা, সামনে এত বড় একটা সমুদ্র দাপাচ্ছে, আর তোর কিনা এই গানটা মনে এল? মারব পাছায় তিন লাথ….
—তাহলে জিকি বিবি মোটি গাই?
—শালা, মোটা বিবি পেলেও তুই বর্তে যেতিস রে। অন্য গান ভার্।
পুলু দূর থেকে স্বর পাঠাল,—অ্যাই, পাগলটাকে সাঁকো নাড়াতে বলিস্ না। জয়াই গাক।
বন্দনা আবার মুখ তুলেছে। ঘাড়টা হেলাল সামান্য। নরম স্বরে বলল, – গা না জয়া।
—একটা পুরনো গান গাই? জয়া নড়ে বসল।
—পুরনো গানই তো ভাল। গা।
গুনগুন করে গানটাকে একটু ভেঁজে নিল জয়া। তারপর খোলা গলায় গাইতে শুরু করল,এই বালুকাবেলায় আমি লিখেছিনু/একটি সে নাম আমি লিখেছিনু/আজ সাগরের ঢেউ দিয়ে তারে যেন মুছিয়া দিলাম…..
মিত্রা পুলু গুটি গুটি এসে বসল কাছে। জয়া গায় ভাল, এখনও সময় পেলে বসে হারমোনিয়াম নিয়ে। আজ, এই মুহূর্তে ওর স্বরটা যেন অন্য রকম লাগছিল। কোথেকে যেন এক চাপা বিষাদ এসে ভর করেছে ওর গলায়, সমুদ্রকেও যেন থমকে দিচ্ছে মাঝে মাঝে। এই জয়াই না একটু আগে খিলখিল হাসছিল? কোন্টা সত্যি? ওই হাসি, না এই বিষণ্ণতা?
বন্দনা আবার মাথা নীচু করে বসে। গান শেষ করে আবার একটা গান ধরেছে জয়া, শেষ করে আবার একটা। মিত্রা গলা মেলাল জয়ার সঙ্গে, পুলুও। কোরাসে গাইছে সকলে, মাঝখানে নাচছে টুটুল।
চাঁদ উঠল। মায়াবী চাঁদ। সমুদ্রে এখন সোনালি জ্যোৎস্না।
