কপোত কপোতী যথা
রাতে খাওয়া দাওয়ার পর আড্ডা চলছিল আমাদের। শুভ্রর ঘরে। মেয়েরা কেউ ছিল না, নিশ্চিন্তে কথা বলা যাচ্ছিল। ট্যুরের হিসেবপত্র মেয়েদের সামনে করার শতেক রখেড়া। কবে কোথায় যাওয়া হবে তা নিয়ে আলোচনা করারও ঝঞ্ঝাট অনেক, কিছুতেই মেয়েরা একমত হবে না। মাঝখান থেকে হয়তো এর সঙ্গে ওর মন কষাকষি—বিচ্ছিরি ব্যাপার। কোনার্ক যাওয়া তো ঠিকই হয়ে আছে, অন্তু চিল্কার কথা তুলছিল। গেলে হয়! মিত্রারও খুব চিল্কা দেখার শখ। তবে গিয়েই ফিরে আসার কোনও মানে হয় না, একটা দুটো দিন ওখানকার রেস্ট হাউসে থাকতে হবে! পকেট কি অত পারমিট করবে? শুভ্র অন্তুর কী এসে যায়! এ ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার, ও কলেজের প্রফেসার, ফ্যাট স্যালারি পাচ্ছে…। আর মধুর তো চিন্তাই নেই। এসেছে অন্তুর ঘাড়ে চেপে, অন্তু যদি ওকে বঙ্গোপসাগরের নীচেও নিয়ে যায়, সেখানেই চলে যাবে। নাহ্, আমার মতো প্রাইভেট কোম্পানীর পেটি চাকুরের অত শখ মানায় না। যাক গে, এখন পুরী কোনার্কই ভাল। পরে যদি কোনদিন সুযোগ সুবিধে হয়…. চিল্কা তো আর পালাচ্ছে না।
একটু আগেও লোডশেডিং ছিল, মিনিট দশেক হল কারেন্ট এসেছে। কী ঘন ঘন এখানে বিদ্যুৎ যায় রে বাবা! যতক্ষণ সমুদ্রের ধারে বসেছিলাম, গোটা শহরটাই অন্ধকারে ডুবে ছিল। যেন ভূতনগর। এখনও ভোল্টেজের কী ছিরি! বালটা জ্বলছে দ্যাখো, যেন মোমবাতি!
মিত্রা খাওয়া দাওয়ার পরই ঘরে এসে টানটান শুয়ে পড়েছে বিছানায়। ফর্সা লম্বা শরীরটা নীল চাদরের ওপর রজনীগন্ধার ডাঁটি হয়ে পড়ে আছে। খাটের গা বেয়ে ঝুলছে মোটা বেণী। বেণী, না সাপিনী? সকালে অতক্ষণ সমুদ্রে দাপাদাপি করে হাল্কা একটা লাল আভা ফুটেছে মিত্রার ফোলা ফোলা গালে, ঠোঁট দুটো যেন কমলালেবুর কোয়া।
—কী দেখছ? মিত্রা চোখ খুলেছে।
—কতক্ষণ পর আবার তোমায় একলা পাওয়া গেল। অজান্তেই আমার ঠোঁট নেমে এল মিত্রার ঠোঁটের ওপর।
চুম্বনটাকে গ্রহণ করল মিত্রা। মুখ টিপে বলল,—আমিও তো কতক্ষণ পর তোমায় একলা পেলাম।
বুকের নীচে তুলতুলে নারী শরীর, তবু কেন বুক চিনচিন? বিয়ের পর মিত্রাকে নিয়ে সেভাবে হানিমুনে যাওয়া হয়নি। শালা, মালিক ছুটিই দেয় না। সাত দিন কোথাও গেলে ব্যাটা সাতশো টাকা কেটে নিত। বিয়ের জন্য পাঁচ দিন ছুটি দিয়েছিল বলে ঠারেঠোরে কম কথা শুনিয়েছে। এবার কত কষ্টে পটিয়ে পাটিয়ে….। আচ্ছা, এইটাই কি আমাদের হানিমুন? ভেবে নিলেই হয়
ধুর, এই হাটের মধ্যে কি মধুচন্দ্রিমা হয়? বউকে নিয়ে একটু একান্ত হলেই চারদিক থেকে আওয়াজ আসবে। সন্ধেবেলা সমুদ্রের ধারে কী ইচ্ছেই না করছিল মিত্রা শুধু আমারই পাশে এসে বসুক। অন্ধকারে বালির ওপর গাঢ় নীল সমুদ্রকে সামনে রেখে ঘন হয়ে বসে থাকব আমরা, মিত্রার রেশমি মাথা থাকবে আমার কাঁপে, গুনগুন গান গাইবে মিত্রা, সমুদ্রের শব্দ আর মিত্রার গুঞ্জন মিলে মিশে ভাক হয়ে যাবে….
—কী ভাবছ? মিত্রা আলগা টোকা দিল গালে।
—ভাবছি ওদের সঙ্গে না এসে পরে শুধু দু’জনে এলে অনেক ভাল হত। সমুদ্রকে চালচিত্র করে তোমায় নতুন করে দেখতাম।
—কাব্য হচ্ছে। তুমিই না বন্ধুদের সঙ্গে আসতে বেশি ব্যস্ত হয়েছিলে? আহা, সে কি সাধ করে? কে না জানে, বিয়ের পর প্রথম সমুদ্র ভ্রমণ শুধু বউকে নিয়েই করা উচিত! কিন্তু দল বেঁধে আসার সুবিধেটাও তো কম নয়। টাকাও বাঁচে, বেড়ানোটাও হয়ে যায়।
—মিত্রার কি এ নিয়ে কোনও ক্ষোভ আছে? থাকতেই পারে, নতুন বউ বলে কথা।
—মন বোঝার জন্যই হাল্কা গলায় বললাম, –সবার সঙ্গে এসে তোমার ভাল লাগছে না, না?
—তা নয়। তবে শুধু তুমি আমি এলে আরও ভাল লাগত।
আরেকটু কাছে টানলাম মিত্রাকে,—জানো, কলেজে পড়ার সময়ে আমরা তিন বন্ধু খুউব বেড়াতাম। মধুও থাকত আমাদের সঙ্গে, কখনও সখনও। তখনই ঠিক করেছিলাম, যে সব জায়গায় বেড়াচ্ছি, বিয়ের পর সবাই মিলে বউদের নিয়েও সে সব জায়গায় যাব আমরা। অন্তত এক বার। তা মধুটার তো বিয়ে টিয়ের কোনও চান্স নেই…..
মধুময়ের নাম শুনেই মিত্রার মুখ ভেঙেচুরে গেল,—ওই ক্যাবলাটাকে কেন তোমরা সঙ্গে এনেছ বলো তো?
—কেন? কী হল?
—ইডিয়টের মতো কথা বলে। ভাব দেখায় যেন কিচ্ছু বোঝে না, ওদিকে কী ড্যাবড্যাব করে তাকায়….
—না না, ভুল করছ। মিত্রার চুল ঘেঁটে দিলাম,—ওর চোখটাই ওরকম, একটু ড্যাবাড্যারা।
—কচু পোড়া। ও একটি বজ্জাতের ধাড়ি।
এ কী ভাষা মিত্রার! মধু যেমনই হোক, সে আমার বন্ধু, তার সম্পর্কে উল্টোপাল্টা মন্তব্য করা মিত্রার মোটেই উচিত নয়। বেচারা কত অভাগা, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিটা ঠিক বেড়ে ওঠে নি। ছোটবেলায় কী একটা কঠিন অসুখ হয়েছিল মধুর, টাইফয়েড মেনিনজাইটিস ধরনের, বেশি দূর লেখাপড়া করতে পারে নি, পাড়ার কাছে একটা পেনের কারখানায় লেবারের চাকরি করে। ওই অন্তুই হাত ধরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। মাথা নেই ঠিক, তবে ভয়ানক দৈহিক পরিশ্রম করতে পারে মধু। বন্ধুবান্ধবদের যাবতীয় ফাইফরমাস মধুই খেটে দেয়। ওর পিছনে লেগে হয়তো মজা পাই আমরা, কিন্তু ভালও তো বাসি। ভালবাসার দায় মিত্রার না থাক, করুণা তো করতে পারে।
ঠাণ্ডা গলায় বললাম,—শোন, তুমি মধুর সম্পর্কে যা ইঙ্গিত করছ তা কিন্তু সত্যি নয়।
থামো তো। মিত্রা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিল আমাকে,—সকালে সমুদ্র থেকে উঠেছি, ফস করে বলে দিল, তোমায় ভিজে ড্রেসে দারুণ লাগছে। ঠিক যেন কিমি কাতকার।
হো হো করে হেসে উঠলাম,—বুঝলে না কেন বলেছে?
—কেন?
—আরে, আমি তখন জয়াকে মনীষা কৈরালা বললাম, তাই শুনে শুনে…. কাল ব্যাটাকে এমন ঝাড় দেব না….
—থাক, তুমি আর সিন ক্রিয়েট কোরো না। মিত্রার বিরাগ ঝপ করে উবে গেল,—ওই বোকাটাকে তোমাদের নিয়ে আসাই উচিত হয় নি।
—না গো, তুমি জানো না, মধু ট্যুরে কত কাজে লাগে। আসার সময়ে দ্যাখো নি, কত বার ব্যাটা নামল ট্রেন থেকে? চা আনা, জল আনা, খাবার আনা…. মিত্রার গালে ঠোঁট রাখলাম,—তুমি কোনও একটা কাজ দিয়ে দেখো, কেমন গুছিয়ে করে দেবে।
—কী রকম?
—এই ধরো, তোমার এক ডজন সেফটি পিন চাই, বা তিনটে চুলের কাঁটা, কিম্বা দুটো স্যারিডন… এখন ডেকে বলো; এক্ষুনি বাজারে ছুটবে।
—আমার দরকার নেই।
আবহাওয়াটা কি একটু গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে না? মিত্রার গলা জড়িয়ে ধরলাম,—বাদ দাও মধুর কথা। অন্য কথা বলো।
—কী কথা?
—কাকে শেষমেশ পছন্দ করলে তুমি? অন্তুকে, না শুভ্রকে?
মিত্রা ফিক করে হেসে ফেলল। কুটুস করে একটা চিমটি কাটল আমাকে,—খুব শখ, অ্যাঁ? জয়াকে নিয়ে অতক্ষণ স্নানলীলা করেও আশ মেটে নি?
—হিংসে হচ্ছে?
—হিংসে করতে আমার বয়েই গেছে। হিংসুটে তো তুমি। কেন জয়াকে নিয়ে নেমেছিলে আমি জানি না?
—কেন বলো তো?
—শুভ্রদা আমাকে নিয়ে নামল, তাই।
ছদ্ম গাম্ভীর্য আনলাম মুখে,—আমার তো হিংসে হওয়ারই কথা। আমার মিষ্টি বউটাকে নিয়ে শুভ্র জলকেলি করবে….
—এই ছিঃ। শুভ্রদা না আমার দাদার মতো?
—আহা, লজ্জা পাচ্ছ কেন? ….ধরে নাও, জয়াও আমার বোনের মতো। ব্যস্, কাটাকুটি হয়ে গেল।
মিত্রার শরীরটা ওমে গলে গলে যাচ্ছে। এখন ওকে নিয়ে যা খুশি করা যায়। আমার হাত মুখ ঠোঁট কিছুই আর এখন আমার বশে নেই। মিত্রারও না।
বুকে লেপটে থেকেই মিত্রা ফিসফিস করল,—যাই বলো, তুমি কিন্তু বেশ ব্যাকডেটেড আছ।
—কেন?
—এত পজেসিভ হবে কেন? শুভ্রদার সঙ্গে একটু চান করলে কি আমি ক্ষয়ে যাব?
—যাবেই তো, যাবেই তো। তুমি আমার ফিক্সড ডিপোজিট, সেখানে আমি অন্যের হাত সইব কেন?
—ফের সেকেলে লোকদের মতো কথা?
মিত্রার তেজী, অথচ প্রেমে আপ্লুত দুই চোখ যে কী অপরূপ এখন! আর একটু উস্কে দিতে ইচ্ছে করল মিত্রাকে। বললাম,- পজেসিভনেস কিন্তু ছেলেদের থেকে মেয়েদেরই বেশি।
—কক্ষনো না। তোমরাই সব সময়ে আমাদের সম্পত্তি ভাবো। নইলে বউ পাল্টানোর প্ল্যান মাথায় আসে?
এবার পুরোপুরি চুপ করিয়ে দিলাম মিত্রাকে। এখন কথা বলার সময় নয়, এখন প্রেম করার সময়। শরীরে ডুব দেওয়ার সময়
কতটা সময় যে বয়ে গেল কে জানে! ব্যালকনি দিয়ে একটা নরম ঠাণ্ডা হাওয়া এল ঘরে, ঘুরপাক খাচ্ছে। আমাদেরই ঘিরে। সমুদ্রের স্বর শুনতে পাচ্ছি আমরা, যেন এক অলৌকিক গান হয়ে বাজছে।
হাই তুললাম একটা। উঠে বসে সিগারেট ধরালাম। মিত্রা শুয়ে আছে পাশে, চোখ বুজে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। ওই হাসিকে কী বলে? সুখ? তৃপ্তি? আনন্দ?
একটু পরে মিত্রা বলে উঠল,–এই, তোমায় একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—এখনও কথা আছে? আমি হাসলাম, –আমি কিন্তু ওয়ার্ক মোর টক লেসেই বিশ্বাসী।
—এই, ফাজলামি নয়। বলো না গো, শুভ্রদার সঙ্গে বন্দনার গণ্ডগোলটা কী নিয়ে?
অস্বস্তিকর প্রশ্ন। মিত্রা আমার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে নতুন মিশছে, এখনই তাদের সম্পর্কে কিছু উল্টো সিধে ধারণা করবে, সেটা কি ভাল?
যা হোক কিছু বলার মতো করে বলে দিলাম,—কী কেস আমিও ঠিক জানি না। তবে মনে হয় ওই ছেলেপুলে না হওয়াটাই….
—ডাক্তার দেখায় নি?
—শুনেছিলাম তো একবার দেখাচ্ছে। আমি এই নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করি না। তবে শুভ্রর থেকে বোধহয় বন্দনা অনেক বেশি ফ্রাট্রেডেড।
— স্বাভাবিক। মেয়েরা মা হতে না পারলে আপসেট হয়ে যায়। মিত্রা সামান্য চুপ। ভাবছে কী যেন। হঠাৎ বলল, ওদের লাভ ম্যারেজ না?
—লাভ ম্যারেজ কী গো? বলো সুপার লাভ ম্যারেজ। সিগারেটটা ছাইদানে গুঁজে মিত্রার পাশে শুয়ে পড়লাম,—ওদের প্রেম কলেজে একটা দারুণ সেন্সেশান ছিল। বন্দনাকে বিয়ে করল বলে শুভ্র তাড়াহুড়ো করে চাকরি জোগাড় করে ফেলল, এম. এস. সি. টা পর্যন্ত কমপ্লিট করল না। ওর যা মেরিট ছিল, তাতে কি শুধু ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার হওয়ার কথা? শুভ্রও অন্তুর মতো প্রফেসার হতে পারত, যদি তক্ষুনি তক্ষুনি মাথাচাড়া দিয়ে না উঠত খ্যাপামিটা। কী কাণ্ড করে ওরা যে বিয়ে করেছে আমরা তো জানি।
—হ্যাঁ হ্যাঁ শুনেছিলাম কী একটা যেন কেলো হয়েছিল।
নব পরিণীতা বউ-এর মুখে কেলো শব্দটা কানে খট করে বাজল। বিশেষত বিছানায়, এই আবেগঘন মুহূর্তে। মাঝে মাঝেই মিত্রার মুখ দিয়ে এরকম রকের ভাষা বেরিয়ে যায়।
চোখ কুঁচকে প্রশ্ন করলাম,—কেলোর খবর তুমি কী করে পেলে?
—জয়া একদিন কী যেন প্রসঙ্গে বলছিল, পুরোটা শোনা হয়নি। কী কিচাইন হয়েছিল বলো না গো?
কিচাইন শব্দটাও কানে টুসকি মেরেছে। হেসে ফেলে বললাম, – সে এক ইতিহাস। হঠাৎ একদিন দুপুরে শুভ্র আমার বাড়িতে হাজির। মুখ থমথম, ঘাড় ঝুলে গেছে… যাকে তোমার ভাষায় বলা যায় বিলা থোবড়। কী, না বন্দনাকে আর পাওয়া হল না। বন্দনার বিয়ের ঠিক হয়ে গেছে, মাঝে আর মাত্র নটা দিন, পাছে শুভ্রর সঙ্গে বন্দনা যোগাযোগ করে, মা বাবা ঘরে শিকল তুলে আটকে রেখেছে মেয়েকে। সুতরাং শুভ্রর আর প্রাণধারণ বৃথা, এক্ষুনি ওর সঙ্গে আমাকে হাওড়া ব্রিজে যেতে হবে, ধাক্কা মেরে গঙ্গায় ফেলে দিতে হবে ওকে।
—যাহ্।
—যা নয়, হ্যাঁ। ….আমি তো চিন্তায় পড়ে গেলাম। খিঁচিয়ে উঠে বললাম, অ্যাদ্দিন কী করছিলি? শুভ্র বলল, বিশ্বাস কর, আমি জানতাম না। দু দিন বন্দনা আমার সঙ্গে ডেট ফেল করল, আমি ওকে বাড়িতে ফোন করলে হয় ওর বাবা নয় ওর মা তোলে, আর সঙ্গে সঙ্গে রেখে দেয়, তখনই আমার মনে হল ডালমে কুছ কালা হ্যায়। ওদের ক্লাসের সীতা, ওই যে কেলেকুষ্টি মেয়েটা, যাকে আমরা শাঁকচুন্নি বলতাম, ওকেই জপিয়ে জাপিয়ে পাঠালাম বন্দনার বাড়ি, ব্যস্ কেস্ কট।
—তার মানে বন্দনার সেই বিয়েতে সায় ছিল?
—মোটেই না। কোথায় কোন্ বিয়ে বাড়িতে দেখে ওকে নাকি পছন্দ করে ফেলেছিল ছেলের বাপ, তার থেকেই একেবারে নহবতখানার অর্ডার হয়ে গেছে। ….হ্যাঁ, তারপর যা বলছিলাম। শুভ্রকে বললাম, খ্যাপামি করিস না, অন্তর কাছে চল্, একটা কিছু সলিউশন বেরোবেই। গেলাম….। অন্তু শুনল চুপচাপ একটু ভেবে নিয়ে বলল, যার সঙ্গে বিয়ে তার অ্যাড্রেস তোর কাছে আছে? শুভ্ৰ কাঁচুমাচু মুখে বলল, না রে, বন্দনা আমায় একটা চিরকুট পাঠিয়েছে। তার থেকে শুধু জানি পাত্র শিবপুর বাজারের কাছে থাকে। অন্তু বলল, ওতেই হবে। চল্, একটা ট্যাক্সি ধর।
—তার পর?
—তারপর সে কী গরু খোঁজা রে ভাই। মাংসের দোকান, ফলঅলা, লড়ী, সেলুন, সর্বত্র সন্ধান করতে করতে শেষে হদিশ পাওয়া গেল। রাস্তাটার নাম এখনও মনে আছে। রাজা রাজনারায়ণ রায়চৌধুরী ঘাট রোড। সে এক আদ্যিকালের পেল্লায় বাড়ি। তার নাম আবার বাতাসী মঞ্জিল। জয় মা বলে ঢুকলাম বাড়িটায়। কপালগুণে পাত্রটাও ছিল বাড়িতে। অন্তু তাকে স্ট্রেট বলল, আপনার সঙ্গে একটু জরুরী কথা আছে, এক্ষুনি বাইরে চলুন। অন্তর চেহারায় জৌলুস তো আছেই, লোকটা ভড়কে গেল, নার্ভাস মুখে আমাদের সঙ্গে রাস্তায় বেরিয়ে এল। আমি লোকটাকে বললাম, আপনি জেনেশুনে দুটো মানুষের মৃত্যু চান? লোকটা আমতা আমতা করে বলল, কেন, এ কথা বলছেন কেন? অন্তু বলল, জানেন যার সঙ্গে আপনার বিয়ের ঠিক হয়েছে সে অন্যপূর্বা? বন্দনা মোটেই আপনাকে বিয়ে করতে চায় না। লোকটার মুখ গোমড়া হয়ে গেল। কী যেন ভাবল একটু। তারপর উদাস মুখে বলল, কিন্তু বিয়ে তো স্থির হয়ে গেছে, আমার আর এখন কিছু করার নেই। আমি বললাম, এত কিছু জানার পরও আপনি বিয়ে করবেন? লোকটা… তুমি মাইরি বিশ্বাস করবে না, অম্লান বদনে বলল, বিয়ের আগে কত মেয়েরই তো ওরকম লটঘট থাকে, স্বামীরা কি সব জানতে পারে? আমি নয় ধরে নেব, আমি কিছু শুনি নি।
—এমা ছি ছি…। মিত্রা আমার গা ঘেঁষে এল, কী নির্লজ্জ লোক রে বাবা!
—কারেক্ট। এই কথাটাই আমরা বললাম লোকটাকে। বললাম, অত কানকাটা হবেন না। এই যে যুবকটি আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, এই হল বন্দনার প্রেমিক। কাবাবমে হাড্ডি বনে দুটো নিৰ্মল প্ৰাণকে বিনষ্ট করার আপনার কোনও রাইট নেই। লোকটা কটকট করে দেখল শুভ্রকে। হয়তো মায়া হল। ভয়ও পেয়ে থাকতে পারে, শুভ্রর তখন ফিজিকটা আরও ভাল ছিল। মিনমিন করে বলল, দেখুন ভাই, বিয়ে তো ঠিক করেছেন আমার বাবা। বিয়ে দেওয়ারও মালিক তিনি, ভাঙারও মালিক তিনি। বড়বাজারের পগেয়া পট্টিতে চলে যান, ওখানে আমাদের কাপড়ের দোকান, বাবাকে পেয়ে যাবেন ওখানে, তাঁর সঙ্গে গিয়ে কথা বলুন।
মিত্রার চোখ বড় বড় হয়ে যাচ্ছে। যেন কোনও রহস্য উপন্যাস শুনছে। মুখ হাঁ করে বলল,–তোমরা গেলে?
—অফ-কোর্স। তখন আমরা শুভ্রর জন্য জান লড়িয়ে দিয়েছি। যদি সাহারা মরুভূমিতে যেতে বলত, সেখানেও যেতাম।
—ভদ্রলোক শুনেই বিয়ে ভেঙে দিলেন?
—আরে নাহ্। সে এক মহা তিক্ড়ম লোক। শুনেই তার কী লম্ফঝম্প! কক্ষনো না, বিয়ে আমি ভাঙব না! তোমরা কোথাকার কোন্ অপগণ্ড, আমি এক্ষুনি পুলিশে খবর দিচ্ছি, চাবকে তোমাদের লম্বা করে দেবে! শুভ্র তো নার্ভাস হয়ে বলেই ফেলল, চল্ কেটে পড়ি। দেখি কোনও ভাবে বন্দনাকে ইলোপ করা যায় কিনা। কিন্তু অন্তু ওই মোমেন্টে স্ট্যামিনা দেখাল বটে। কিছুতেই জমি ছাড়ল না। লোকটার চোখে চোখ রেখে বলল, আপনি আমাদের কেটে কুচি কুচি করে ডালকুত্তা দিয়ে খাওয়াতে পারেন, কিন্তু তাতে সত্য মরবে না। এবং আপনার ছেলেও সুখী হবে না। বন্দনার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে, ও ফুলশয্যার রাতে পটাশিয়াম সায়ানাইড খাবে। চিঠিও লিখে রাখবে হয়তো, আমার মৃত্যুর জন্য দিজ দিজ পারসনস্ আর দায়ী। এখন ভেবে দেখুন আপনি কী করবেন, আমরা চলি। ব্যস্, রাত এগারোটার সময়ে বন্দনার বাবা মা মুক্তকচ্ছ হয়ে শুভ্রর বাড়ি উপস্থিত। বিয়েটাও হয়ে গেল। ওই দিনই। তবে শুভ্রর বাবা খুব জিদ্দি আদমি তো, বলল তুমি কোথায় লভ করে ফেঁসেছ, তার জন্য তোমার বউকে আমায় খাওয়াতে হবে, আমি সে পার্টি নই। তিন মাস টাইম দিলাম, এর মধ্যে নিজের পায়ে দাঁড়াও। নয়তো দু’জনে ওই গাছতলায় গিয়ে থাকবে। ব্যস্, শুভ্ররও এম. এস. সি-র পাট চুকে গেল। প্রথমে একটা ছোটখাটো চাকরি জোগাড় করল, তারপর ব্যাঙ্কে পরীক্ষা দিয়ে ক্যাশিয়ার। কাহিনী শেষ।
মিত্রা নীরব হয়ে গেছে। নখ দিয়ে নখ খুঁটছে, অন্য মনে। বললাম,—কী, দারুণ রোমহর্ষক এপিসোড নয়?
—এই হল গিয়ে ভালবাসা। প্রেম। বুঝলে?
—হুঁ। …কিন্তু সেই গভীর প্রেমেও চিড় ধরে!
এবার কথা নয়, কথার সুরটা কানে বাজল। যেন আমার আদুরে বউ নয়, কোনও পরিণত নারী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আমারও শ্বাস পড়ল একটা। বললাম,—তাই তো দেখছি। প্রেম ট্রেম বোধহয় খুব পল্কা শব্দ। মানুষ কি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে কখনও ভালবাসে? স্বার্থে ঘা লাগলে, চাওয়া পাওয়ায় গরমিল হলে, সমস্ত সম্পৰ্কই চিড় খেয়ে যায়।
মিত্রা যেন কেঁপে উঠল, ভীতু পাখির মতো। বলল,—আমাদেরও কি এমনটা হতে পারে কোনও দিন?
মিত্রার নাকে নাক ঘষে দিলাম,—আমি হতে দেবই না। আমরা চিরটা কাল হানিমুন কাপল্ থাকব, দেখো।
আর কথা বলল না মিত্রা, উঠে বসল। বিছানায় পড়ে থাকা সালোয়ার কামিজ জড়ো করছে দু হাতে, ভাঁজ করে খাটের বাজুতে রাখল। পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ড্রেসিং টেবিলের সামনে। দেখছে নিজেকে। গায়ে সুতোটি নেই মিত্রার। স্বচ্ছন্দ পায়ে হাঁটছে ঘরে। যেন মানবী নয়, যেন জল থেকে উঠে এসেছে ভেনাস, কোনও যাদুমন্ত্রে ঢুকে পড়েছে এ ঘরে। ঈষৎ অবনত স্তন, রূপোর পিরিচের মতো নাভিদেশ, শঙ্খধবল উরু—কে এই মায়াবিনী!
বুক ধড়াস ধড়াস করছে আমার। শুধু এই মুহূর্তটাই কি অনন্তকাল হতে পারে না?
মিত্রা আমার মনের কথা কিছুই টের পেল না। নিজের খেয়ালে বাথরুমে ঢুকে গেল। ফিরে এসে নাইটি পরে নিয়েছে। বসল বিছানায়। আবার সে এক সামান্য মানবী।
সামান্য মানবীর মতোই বলল,—যাই বলো, তোমাদের বন্দনা কিন্তু একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে। যন্ত্রণাটা তো ওর একার নয়, শুভ্রদারও কষ্ট আছে।
আমিও রূঢ় বাস্তবে ফিরেছি। মাথা নেড়ে বললাম,—শুভ্রর জন্য একটু বেশি খারাপ লাগে। বন্দনা ওকে যেখানে সেখানে এমন বিশ্রী ভাবে হার্ট করে, যখন তখন রাফ বিহেভ্ করে….অথচ শুভ্র, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আজও বন্দনাকে তেমনই ভালবাসে।
—শুভ্রদা ভীষণ ভীষণ ভাল। এত হাসিখুশি, এত লাইলি, কে বলবে মানুষটাকে এত হিউমিলিয়েশান সহ্য করতে হয়!
—বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু….আমার ধারণা, শুভ্র সব কিছু ভুলে থাকতে চায়।
মিত্রা ঝেঁঝে উঠল,—বন্দনা ওকে ভুলে থাকতে দিলে তো! দেখলে না, আজ সকালে কী কুচ্ছিত ভাবে অন্তুদার সঙ্গে ঢলাঢলি করছিল!
ছি ছি ছি, মিত্রাও লক্ষ করেছে? অবশ্য দেখবে না’ই বা কেন, মেয়েদের চোখ এ সব ব্যাপারে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হয়। অন্তু আর বন্দনার মধ্যে কোনও রিলেশান গড়ে উঠেছে কিনা খোদাই মালুম, আশা করি ওদের মধ্যে কিছু নেই। কিন্তু যদি কিছু হয়ে থাকে, শুভ্রর থেকে বেশি আঘাত পাবে জয়া। এত ভাল মেয়ে, হয়তো কেঁদে কেঁদেই মরে যাবে। এত মিষ্টি মেয়ে জয়া, এত সরল, সাদাসিধে! জয়ার মতো ওরকম একটা নরম মনের মেয়ে পেলে সব পুরুষই সুখী হতে পারে। কী যেন একটা আলাদা চার্ম আছে জয়ার। মিত্রার মতো নয়, অন্য রকম।
—-এই, কী ভাবছ গো?
—কিছু না তো। চমকে উঠলাম।
মিত্রা ঝুঁকল আমার দিকে। আলগোছে জড়িয়ে ধরল গলা,এই, আমাদের ভালবাসা যদি কখনও ফুরিয়ে যায়….?
কথাটা শেষ করল না মিত্রা। হঠাৎ থেমে গেছে। মুখচোখও কেমন বদলে গেছে মিত্রার। যেন সেই অচেনা ভেনাস আবার উঁকি দিচ্ছে!
আমি আচ্ছন্নের মতো বললাম,—চুপ। ও কথা বলতে নেই।
সমুদ্রের গর্জন বাড়ছে। জোয়ার আসছে বোধহয়। আমাদের এই ঘরেও যেন ঢুকে পড়ছে জোয়ার।
আলোটা নিবিয়ে দিলাম।
