আনমনে জয়া

আনমনে জয়া

ভাগ্যিস তিন খানা ঘর পাশাপাশি ঠিক করাই ছিল! এখন অবশ্য ভিড়ের সময় নয়। স্কুলকলেজের পরীক্ষা চলছে, অফিস কাছারিতেও তেমন ছুটিছাটা নেই, তবু আগে থেকে বুক না করলে এমন সুন্দর ঘর কি পাওয়া যেত? দোতলায় তিনটে ঘরের সামনেই এক টুকরো করে ব্যালকনি, দাঁড়ালেই মাতাল সমুদ্র একেবারে মুখোমুখি। নীলাভ সবুজ জলে উজ্জ্বল দীপ্তি ছড়িয়ে সম্রাটের মতো মাথার ওপর দাঁড়িয়ে সূর্য, হীরের কুচি মেখে ঝিকমিক করছে জল, বালি, আকাশ পৃথিবী। ভেজা বাতাসের ঝাপটানিতেও কী বিবশ মাদকতা! ঘরের আসবাব অল্প ক্ষয়া বটে, বিছানা টিছানা স্যাঁতসেঁতে…. কী এসে যায়? সমুদ্রের

কাছে এসে তার নোনা স্বাদ গায়ে মাখব না?

উফ্, কী ভাল যে লাগছে! কত দিন পর আবার পুরী এলাম!

এখানে আসা ঠিকঠাক হওয়ার পর শুভ্রদা বলেছিল,—আবার আলাদা আলাদা ঘর কেন? একটাই মিক্সড্ বেডেড রুম নিলে হয় না?

সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়েছে অনুতোষ, – ঠিকই তো। একসঙ্গে বেড়াতে বেরোচ্ছি, কেউ তো আর হানিমুনে যাচ্ছি না!

শুভ্রদা বিশ্বফাজিল, এরকম প্রস্তাব দেওয়া তাকে মানায়। কিন্তু অনুতোষ কী করে যে বলেছিল কথাটা! ওভাবে কখনও সবাই মিলে শোওয়া বসা করা যায়? মেয়েদের কত রকম অসুবিধে থাকে না?

ভাগ্যিস তখন জোর গলায় আপত্তি জানিয়েছিলাম,—উঁহু, অন্তত দুটো ঘর নাও।

মিত্রাও বলল, – হ্যাঁ, একটা মেয়েদের, একটা ছেলেদের।

বন্দনা হাঁ হাঁ করে উঠেছিল,—পাগল হয়েছিস? এদের এখনও চিনিস না? আমরা একটা ঘরে থাকলে সারা রাত ওরা তাণ্ডব চালাবে।

শুনেই পল্লবদার হা হা হাসি,—ওটা তোমাদের অজুহাত। আসলে তোমরাই আলাদা ঘরে থাকতে ভয় পাও। ইউ নিড সাম মেল কেয়ার। অ্যাট লিস্ট ডিওরিং নাইট। যখন কোনও অচেনা মাতাল এসে দরজায় দুম দুম ধাক্কা মারবে….

ব্যাস্, ওমনি শুভ্রদার ফোড়ন, চেনা মাতাল ধাক্কা দিলে অবশ্য তোমাদের ভয় নেই…..

যখন এসব কথা হচ্ছিল, তখন অবশ্য মধুদার আসার কোনও ঠিক ছিল না। একদম শেষ মুহূর্তে মধুদাকে নেওয়া হল। অসুবিধে হল একটু, সামান্য ছিটকে গেল মধুদা। সিঙ্গল রুম পেয়েছে, একতলায়, একটু ভেতর দিকে।

অনুতোষ এখনও নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। আয়েসি মানুষ বটে একটা, খাওয়া দাওয়ার পর দু মিনিটও গেল না, সোজা ঝাঁপ দিয়েছে বিছানায়। সকালে সমুদ্রে যেতেই চাইছিল না, শেষ পর্যন্ত অবশ্য শুভ্রদার পীড়াপীড়িতে গাত্রোত্থান করল। বেড়াতে এসেও দলছুট হয়ে আলস্য দেখানো কী ধরনের ঢঙ্ কে জানে!

বন্দনা মিত্রারা এখন যে যার নিজের ঘরে। ঘুমোচ্ছে কি? যা হুডুদ্দুম সব করেছে আজ সমুদ্রে, নিশ্চয়ই ক্লান্ত এখন। সমুদ্রস্নানের একটা ফল তো হয়েছেই, বন্দনার রাগটা একদম পড়ে গেছে। অনুতোষের হাত ধরে যখন জলে নেমে গেল, বেশ হাসিখুশিই দেখাচ্ছিল। মেয়েটা যেন কেমন কেমন! খুব অহংকারী কি? কিসের দেমাক? রূপসী বলে? আমিই বা কী এমন খেদিবুচি! বেশি পড়াশুনো করেছে বলে? চাকরি করে বলে? আহা, আজকাল ওরকম এম. এ. পাশ ঘরে ঘরে গড়াগড়ি যায়। চাকরি তো জয়াও করতে পারত, টালিগঞ্জ গালর্স স্কুলে ইন্টারভিউও দেওয়া হয়ে গিয়েছিল, নেহাত টুটুল পেটে এসে গেল…..।

টুটুলটা এসেই মধুদার সঙ্গে একেবারে সেঁটে গেছে। খুব ভাব দুজনের। এখনও মেয়ে মধুদার ঘরেই। অনুতোষ বলে মধুটার আই. কিউ. কম তো, টুটুলের সঙ্গে ওর ওয়েভলেঙথ্ মেলে। সে যাই হোক, সারাক্ষণ গায়ে লেপটে থাকছে না, ম্যা ম্যা করে ঘ্যানঘ্যান করছে না, আমি বাবা নিশ্চিন্ত। মধুকাকুই এখন ওর হিরো। কাঁধে করে সমুদ্রের অনেক ভেতরে নিয়ে গিয়েছিল…..। লুডোর বোর্ড নিয়ে তো গেল, খেলছে কি এখন? নাকি ঘুমিয়ে পড়ল? বেয়ারাকে ডেকে একটু পরে মধুদার ঘরে মুসম্বিগুলো পাঠিয়ে দিতে হবে।

ব্যালকনিতে দুটো চেয়ার। বেতের। বেঁটে বেঁটে। একটু বসি এখানে। আহ্, সমুদ্র কী সুন্দর হাওয়া পাঠাচ্ছে! বাষ্পমাখা, নরম নরম। ফাল্গুনের রোদকেও যেন আর তত কড়া লাগে না।

সকালের কথা মনে পড়ছে বার বার। কাঁটা দিচ্ছে শরীরে। ছি ছি, এমন কেন হচ্ছে? অনুতোষ জানতে পারলে কী ভাববে?

ইস, সমুদ্রের ঢেউগুলো কী ভীষণ দুরন্ত। অবিরাম নাচতে নাচতে আছড়ে পড়ছে তীরের বুকে। ক্লান্তি নেই, শ্রান্তি নেই, মাতামাতি চলছে তো চলছেই। যত দূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। সব্‌জে নীল রঙ ঘন হতে হতে আকাশের কাছাকাছি পৌঁছে গাঢ় নীল। দীঘায় এমন ধারা হয় না, কেমন যেন ঘোলাটে ভাব থাকে। মাঝসাগরে কোনও কোনও শান্ত ঢেউ-এর মাথায় মুক্তোর মতো ফুটে উঠেই মিলিয়ে যাচ্ছে ধবধবে ফেনা। জেলেদের নৌকোগুলো কালো বিন্দু। ডুবছে, ভাসছে, আবার ডুবছে। মনে হয় যেন তুলিতে আঁকা ছবি।

হাই উঠছে। অনুতোষের পাশে গিয়ে একটু গড়িয়ে নিলে হয়। থাক, এখানেই বসে থাকতে ভাল লাগছে বেশি। নয় এখানে বসেই ঢুলি।

আড়চোখে একবার দেখলাম অনুতোষকে। কী নির্লিপ্ত সুখে ঘুমোয় মানুষটা! জেগে যখন থাকে তখনও কি বদলায়? আশ্চর্য, পাঁচ বছরের ওপর বিয়ে হয়েছে, এখনও যেন অনুতোষের মনের তল পাওয়া গেল না। বড্ড বেশি শান্ত, বড় বেশি চুপচাপ। শাশুড়ি বলেন, ছোটবেলা থেকেই নাকি এরকম। নিজের মধ্যে ডুবে থাকা মানুষ। দুটো চারটে কলেজের ছাত্রছাত্রী যা আসে বাড়িতে, তাদের কথাও তো কানে আসে! এই, আস্তে কথা বল্, এ আর সি বিরক্ত হবে! এই এত শব্দ করে হাসছিস কেন, এ আর সি খচে যাবে! অর্থাৎ কলেজেও অনুতোষের একই চেহারা। হোক না আমার সব থেকে কাছের লোক, এমন মানুষের সঙ্গে বাপু প্রাণ খুলে মেশা যায় না, কেমন যেন বাধ বাধ লাগে। অন্তত আমার মতো বকবক ষষ্ঠীর। হাসির কথা শুনলে হেসে লুটোপুটি খাব, হৈ চৈ করব, এর পিছনে লাগব, তার পিছনে লাগব, এই না হলে বেঁচে থাকা? ঘরের মানুষটিও অমনটা না হলে ভাল লাগে? অনুতোষ কেন যে পল্লবদা শুভ্রদাদের মতো হল না?

মানুষটার ভেতরে কি কোনও উচ্ছ্বাস নেই? উঁহু, তা তো বাপু নয়। দুটো চারটে বিরল মুহূর্তে অনুতোষ কী অসম্ভব বদলে যায়, তা কি দেখি নি আমি? বেতলার জঙ্গলে বেড়াতে গিয়ে সেবার কী বৃষ্টি! মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখি বিছানা ফাঁকা। খোঁজ খোঁজ খোঁজ। ও হরি, বাবু বাংলোর হাতায় দাঁড়িয়ে অন্ধকারে একা একা ভিজছেন! আমি ডাকতেই মুখে ধরা পড়ে যাওয়া হাসি, সঙ্গে সঙ্গে আহ্বান,—এসো না, এক সঙ্গে ভিজি দুজনে! খুব খুব ভাল লেগেছিল সেদিন অনুতোষকে। কেন যে অনুতোষ সব সময়ে ওরকম থাকে না!

আবার সমুদ্রস্নানের কথা মনে পড়ে কেন? সমুদ্রে নামার আগে মেয়েরা সবাই সালোয়ার কামিজ পরে নিয়েছিলাম, ছেলেরা সুইমিং কস্টিউম। আর মধুদা ঢোল্লা এক হাফপ্যান্ট। মধুদাকে কী চাঁটান চাঁটাচ্ছিল পল্লবদারা। আহা রে, ভালমানুষ বলে মধুদাকে নিয়ে সকলে যা করে! নেহাত সহজ সোজা মন বলে হাসিমুখে সব সহ্য করে নেয়, অন্য কেউ হলে রেগে ফায়ার হয়ে যেত।

মধুদার স্নানের পোশাক নিয়ে ঠাট্টা মরার পর পল্লবদা দুম করে আমায় নিয়ে পড়ল,–ফ্যান্টাস্টিক! দারুণ দেখাচ্ছে তোমায়! একেবারে মনীষা কৈরালা! আমি লজ্জায় মরে যাই। বিয়ের পর থেকে সালোয়ার কামিজ আর পরিই না, নেহাত সমুদ্রে শাড়ি সামলানো যাবে না বলেই…..।

বললাম,—অ্যাই মশাই, আমায় গ্যাস দিচ্ছেন কেন? নিজের বউকে দেখুন।

পল্লবদা ভুরু কুঁচকোল,—কার কথা বলছ?

—ন্যাকামি করবেন না। চোরা চোখে তো দেখছেন মিত্রাকে।

—ও আর এখন আমার বউ নয় ম্যাডাম, ও শুভ্রর বউ।

—ফের ওই ফাজলামো?

পাশ থেকে মধুদা ফস্ করে বলে উঠল,—তোরা কিন্তু আমার সঙ্গে বিক্লাসি করলি। আমার প্রাপ্য ছিল মিত্রা, টুটুল নয়।

শুনেই মিত্রা যা মুখ বেঁকাল! বন্দনাও কটকট করে তাকাল মধুদার দিকে। ওরা মধুদাকে একটুও সহ্য করতে পারে না। বেচারা বোকাসোকা মানুষ, কোথায় কী বলতে হয় জানে না, বন্ধুদের চপলতা দেখে নিজেরও তো একটু রঙ্গরসিকতা করার সাধ জাগতে পারে। বন্দনা মিত্রা কিছুতেই কথাটা বুঝতে চায় না। অনুতোষেরও বলিহারি, এদের মধ্যে কী দরকার ছিল মধুদাকে টেনে আনার?

হোটেল থেকে বেরিয়ে ছেলেরা আগে গেল ট্রাভেল এজেন্টের অফিসে, কবে কোনার্ক যাওয়ার বুকিং পাওয়া যায় দেখতে। আমরা তিন সখী চললাম সমুদ্রের পানে। বালির ঢাল বেয়ে নামতেই জল এসে ছুঁল পা। একটার পর একটা ঢেউ এসে ফেনার মুকুট খুলে রাখছিল পায়ের কাছে। কী অসহ্য সুখের অনুভূতি! মিত্রা আর বন্দনা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। ক্ষণে ক্ষণে দামাল বাতাস এসে এলোপাতাড়ি জড়িয়ে ধরছে ওদের, চুল টুল সব উড়ে একসা

আমি আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম,—আহ্ মারভেলাস। আমি আর এখান থেকে ফিরব না রে, সমুদ্রেই থেকে যাব।

বন্দনা এগিয়ে আসতে আসতে বলল,—দূর, সমুদ্র বড় বোরিং। আই লাভ মাউনটেন।

—কী যে বলিস! পাহাড়ের এরকম লাইফ আছে? সমুদ্র অনেক বেশি সুন্দর।

মিত্রা অত শত তর্কে গেল না। আপোষের সুরে বলল,—আমার ভাই পাহাড় সমুদ্র দুটোই খুব প্রিয় হঠাৎই কোথেকে একটা বড়সড় ঢেউ দৌড়ে এল কাছে, দ্যাখ না দ্যাখ

ছিটকে ফেলে দিয়েছে আমাদের। তিন জনই ভেজা বালিতে বেসামাল।

কোথায় খুশিতে পাগল হয়ে যাবে তা নয়, পিছিয়ে শুকনো বালিতে যেতে যেতে বন্দনা গজগজ করে উঠল,–এই জন্যই আমার সমুদ্রের কাছে আসতে ভাল লাগে না।

মিত্রা চোখ টিপে বলল, – কেন রে, ঢেউগুলো কি বেশি ইনকুইজিটিভ?

বন্দনার মুখ হাঁড়ি। আমি বন্দনাকে টানলাম জলের দিকে,—আয় না, এখানে বসে থাকলি।

বন্দনা হাত ছাড়িয়ে নিল, ছাড় ছাড়, আমার ভাল লাগে না। ঢেউগুলো অত্যন্ত ভালগার।

বন্দনার সালোয়ার তখন হাঁটু অবধি ভেজা। বেচারা জানে না, সে সময়ে ওকে কী সুন্দর যে লাগছিল! সত্যি, বন্দনা হিংসে করার মতো সুন্দরী। মিত্রার রঙ খুব ফর্সা, ফিগারটাও চোখা, একটু অবাঙালি ধরনের, কিন্তু মুখচোখে তেমন শ্রী নেই। হয়তো মিত্রা পাশে ছিল বলেই বন্দনাকে আরও বেশি সুন্দর লাগছিল। বন্দনার ভীতু ভীতু বিরক্ত মুখ দেখে মজাও লাগছিল আমার। আবার হাত ধরে টানলাম।

বন্দনা খেঁকিয়ে উঠল,—তোর ভাল্লাগে তুই যা না, আমায় টানছিস কেন? —মর্ গে যা। তুই পাহাড়ে গিয়েই মর্। জলে পা ডোবালাম আমি। হাল্কা শ্লেষ ছুঁড়লাম,—বেরসিকের ডিম একটা। ঠিক আমার বরের মতো

শেষের কথাটা যেন শুনতেই পেল না বন্দনা। উদাসভাবে বলল, – পাহাড়ে গিয়ে মরাও সুখের। পাহাড় কী শান্ত! ধ্যানগম্ভীর! আহ্, যেন রূপবান এক বলিষ্ঠ পুরুষ!

—রূপবান না হাতি। পাহাড়কে আমার গোমড়ামুখো হুঁকোমুখো হ্যাংলা বলে মনে হয়। সমুদ্রের উচ্ছ্বাস তুই পাহাড়ে কোথায় পাবি?

মিত্রা আমার দিকে আঙুল তুলল,—তুই তাহলে উচ্ছলতা ভালবাসিস? বন্দনার দিকে তর্জনী হেলাল,– আর তোর পছন্দ গাম্ভীর্য? বলেই খিলখিল হেসে উঠল,—ওদের কথা মতো তোরা তাহলে বদলাবদলিটা করেই ফ্যাল্ না। পারমানেন্টলি।

ভাগ্যিস তক্ষুনি ছেলেরা এসে গেল, নইলে বন্দনা হয়তো দৃষ্টি দিয়েই মিত্রাকে কাঁচা খেয়ে ফেলত!

পল্লবদা ঢেউ-এ আলগা লাথি মারতে মারতে এগিয়ে এল,—এখনও এখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছ তোমরা? জলে নামো নি?

আমি ঠোঁট ফোলালাম,—দেখুন না, এই মেয়ে দুটো একেবারে ভীতুর ডিম, নামতেই চাইছে না।

—ইস্, আমি মোটেই ভয় পাই না। মিত্রা চোখ ঘোরাল,—একা নামি নি, পাছে কোনও অ্যাক্সিডেন্ট হয়। যা জলের ধাক্কা! দীঘায় একবার এক নেমে যা জোর আছাড় খেয়েছিলাম! পুরো তিন দিন পিঠে ব্যথা ছিল।

—এবার তোমার কোনও ভয় নেই। শুভ্রদা মিত্রার হাত ধরে তরতর জলে নেমে গেল, –আমি এবার তোমার পার্টনার আছি, প্রাণ থাকতে চোট লাগতে দেব না। আই প্রমিস।

মিত্রার কী হি হি হাসি!

টুটুল বাবার পাশে ছিল। একবার দৌড়ে গিয়ে জলে পা ছুঁইয়েই ঢেউ-এর সঙ্গে সঙ্গে তীর বেগে পালিয়ে আসছে পাড়ে। আবার এগোচ্ছে পাঁচ পা, তো দশ পা পিছোচ্ছে। মধুদা টুটুলকে কোলপাঁজা করে তুলে নিল,—কী রে, যাবি ভেতরে?

টুটুল মধুদার গলা আঁকড়ে ধরল,—যাব যাব যাব।

বন্দনা হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ল,—যা বাবা যা, তোরা প্রাণের সুখে জল খেয়ে মর্। আমি এখন একটু সূর্যস্নান করি।

শুনে অনুতোষ বলল,—সে কী, এক যাত্রায় পৃথক ফল কেন? চলো, তুমিও নামবে।

—না না, আমার ভীষণ ভয় করে।

অদ্ভুত মেয়ে, যেই ছেলেরা এল ওমনি আর সমুদ্রকে বিশ্রী লাগার কথা বলছে না, ভয়ের দোহাই দিচ্ছে!

অনুতোষ তোয়ালেগুলো শুকনো বালিতে গুছিয়ে রেখে চশমা খুলল, কীসের ভয়? এসো আমার সঙ্গে।

আশ্চর্য, বন্দনা উঠেও দাঁড়াল! মুখে গদগদ ভাব,—আমি কিন্তু বেশি দূর যাব না।

বলল বটে, কিন্তু অনুতোষের হাত ধরে কত দূর চলে গেছে! বুকটা আমার ভার হয়ে যাচ্ছিল। অনুতোষ কি এসে আমাকে ডাকতে পারত না? ও তো জানে আমি কতটা সমুদ্র ভালবাসি!

সবাই নেমে গেছে জলে। আমি শুধু তীরে একা। একাই যেতে পারি, কিন্তু ইচ্ছে করছে না। অভিমান হচ্ছিল সমুদ্রের ওপর। হাস্যকর অভিমান। সমুদ্র কি এক সামান্য মানবীয় অভিমান টের পায়?

হয়তো পায়। নাহলে ঠিক তখনই পল্লবদা জলে নেমেও উঠে আসবে কেন?

—অ্যাই, তুমি দাঁড়িয়ে? চলো চলো।

পল্লবদার সঙ্গে জলে যেতে যেতে অদ্ভুত ভাবে মনটা বদলে যাচ্ছিল আমার। একবার দেখলাম বন্দনা অনুতোষকে, মুখ ফিরিয়ে নিলাম। আরও জোরে আঁকড়ে ধরেছি পল্লবদার হাত।

বললাম, আমরা পাড়ের এত কাছে থাকব না। চলুন দূরে যাই, অনেকটা দূরে।

পদ্মবদার হাতটা কী সবল! সত্যিকারের পুরুষের হাত বুঝি এমনই হয়। ঢেউ এলেই কী করতে হবে আমায় শিখিয়ে দিচ্ছে পল্লবদা। কখনও কাঁধ ধরে আমায় তুলে দিচ্ছে ঢেউ-এর মাথায়, কখনও বা এক সঙ্গে ডুব দিচ্ছি আমরা। পলকের জন্য বেসামাল হলেই পল্লবদা ধরে নিচ্ছে আমায়, আগলে রাখছে। বড় ঢেউ এলেই বলছে, লাফাও! পায়ের তলা থেকে সর সর সরে যাচ্ছে বালি, নাকে চোখে মুখে নোনা জলের ঝাপটা, আছড়ে পড়া ঢেউ জাপটে ধরছে আমাদের দুজনকে।

অনুতোষ কি ঠিক ওই সময়ে দেখেছে আমাদের? আমি অন্তত তাকাই নি। কী দেখব? বন্দনার আহ্লাদী মুখ? তার চেয়ে পল্লবদার সঙ্গে অশান্ত উন্মাদনায় ডোবা ভাসার খেলাটা ঢের ঢের ভাল। পল্লবদার হাত কি একটু বেশি চঞ্চল ছিল তখন?

ভাবতেই গায়ে আবার পদ্মকাঁটা। ছি ছি, এসব কী চিন্তা! অনুতোষ যেমনই হোক, ওকে ছাড়া অন্য কাউকে মনে আনাও পাপ। অনুতোষের দোষই বা কী? শুভ্রদাকে নিয়ে সুখী নয় বলে বন্দনা যদি নির্লজ্জের মতো গায়ে পড়ে, কতক্ষণ আর নিজেকে সামলে রাখবে? হাজার হোক পুরুষের মন, অমন একটা মেনকা রম্ভা গোছের মেয়ে ঢলাঢলি করলে মতিভ্রম হতেই পারে।

না। অনুতোষকে ছাড়া আর সমুদ্রে নামা নেই। শত্রুরা বদলা বদলি করুক, আমার বর আমারই থাক। এক্ষুনি আমি অনুতোষকে জাগাব, জড়িয়ে ধরে আদরে আদরে অস্থির করে তুলব। বলব,—আদর করো আমায়। ভালবাসো, শুধু আমাকেই ভালবাসো।

আহ্, ঘুম ভাঙে না কেন? এ যে কুম্ভকর্ণের জ্যাঠা!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *