এক দিন দল বেঁধে
কামরা থেকে একটা একটা করে মালপত্র নামাচ্ছিল শুভ্র আর পল্লব। ব্যস্তসমস্ত মুখে। সতর্ক চোখে। একটু অসাবধান হলেই কে কোথায় কোন্ মাল নিয়ে চম্পট দেয় তার ঠিক কী! পুরী ধর্মস্থান বটে, তবে কে না জানে পুণ্যক্ষেত্রেই চোর ছ্যাঁচোড়ের উপদ্রব বেশি।
জগন্নাথ এক্সপ্রেস আজ ঘণ্টা দেড়েকের ওপর লেট। ভুবনেশ্বর অবধি ঠিকঠাকই চলছিল, খুর্দারোডে এসে খামোকা দাঁড়িয়ে রইল নিঝুম। ছাড়েই না, ছাড়েই না। যাও বা ছাড়ল বাকি পথ এল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। একটু থামে, একটু চলে, থামে… কোথায় সাড়ে পাঁচটায় ইন্ করে যাওয়ার কথা, সাতটা বাজিয়ে দিল!
মেয়েরা আগেই নেমে পড়েছে। জয়া মিত্রা বন্দনা তিন জনেরই চুল উশকো খুশকো, শাড়ির ভাঁজ এলোমেলো, বাসি মুখে আলগা ক্লান্তি। জয়ার গা ঘেঁষে টুটুল, ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিরীক্ষণ করছে চারদিক। সাড়ে তিন বছরের মেয়েটার চোখে অচেনা স্বপ্নরাজ্য দেখার বিস্ময়।
অবাক চোখেই টুটুল প্রশ্ন করল,—বাবা, ও বাবা, এটা কি পুরী?
অনুতোষ মাথার ওপর দু হাত ছড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙছিল। মেয়ের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসল, ইয়েস ম্যাডাম, আমরা পৌঁছে গেছি।
—যাহ্, এখানে সমুদ্র কোথায়?
—দূর বোকা, সমুদ্র কি স্টেশনে থাকে?
—তাহলে কোথায় আছে?
—আছে, নিজের জায়গাতেই আছে। অনুতোষ মেয়ের চুল ঘেঁটে দিল। এক্ষুনি দেখতে পাবি, আমরা স্টেশন থেকে বেরোই।
বাপ মেয়ের বকর বকর চলছে। মাল নামানোর পালা শেষ, এবার নেমেছে মধুময়। ঘাড়ে ইয়া এক কিটস্ ব্যাগ। প্ল্যাটফর্মে পা রেখেই সে ব্যাগ স্যুটকেসের পাহাড়ের দিকে তাকাল,—মোট টা হল রে?
শুভ্র আঙুল চালিয়ে আরেক বার গুনে নিল, — নাইনটিন।
—তোরা মাত্র সওয়া ছ’ জন মানুষ, থাকবি মাত্র ক’টা দিন, তাতেই এত? মধুময় মেয়েদের দিকে তাকিয়ে দাঁত বার করে হাসল,—মাইরি, মেয়েছেলে সঙ্গে থাকা মানেই এক গাদা লাগেজ।
সঙ্গে সঙ্গে মধুময়ের কাঁধে পল্লবের চটাস থাপ্পড়,–এই এঁড়ে, মেয়েছেলে কী রে? এখনও ভাষাজ্ঞান হল না?
—যাহ্ বাবা, ভুল কী বললাম?
—শালা, লেবার তো লেবারই। মহিলা বা লেডিজ বলতে পারিস না?
—ও এই কথা! ঘাড়ে হাত বোলাল মধুময়,—সরি বস্।
মিত্রার জিম্মায় গোটা চারেক ওয়াটার বটল। এখনও তলানি জল পড়ে আছে, রেল লাইনে ঢেলে ঢেলে শূন্য করল বোতলগুলো, গুছিয়ে নিচ্ছে কাঁধে। মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠল,— কথার কী ছিরি!
শুভ্র ফুট কাটল,—ভাষাজ্ঞান যেমনই হোক, খুব ভুল কথা কিন্তু মধু বলে নি। মেয়েরা সঙ্গে না থাকলে কত ঝাড়া হাত পা থাকা যায়।
—তাই বুঝি? আমরা সঙ্গে থাকলে বুঝি বোঝা বাড়ে? জয়ার চোখে ছদ্ম কোপ।
—অফকোর্স। শুভ্র পল্লবকে চোখ টিপল, –আসল লাগেজ তো তোমরাই। লিভিং লাগেজ।
—কী রে মিত্রা, চুপচাপ শুনে যাচ্ছিস, কিছু বলছিস না যে?
—বলতে দে, বলতে দে। মিত্রার ঠোঁটে আবার ভাঙচুর,—কে যে কার বোঝা তা যদি অত সহজেই বোঝা যেত!
—আরেব্বাস পুলু, তোর বউ-এর তো দেখছি দিব্যি মুখ ফুটে গেছে। ক’মাস হল তোদের বিয়ের?
—সাড়ে পাঁচ মাস। পল্লব হাসি হাসি মুখে সিগারেট ধরাল,—টু বি মোর এগ্জ়্যাক্ট, পাঁচ মাস দশ দিন।
মালপত্র ঘিরে গুলতানি চলছে। কামরাটা একেবারে প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে, স্টেশন থেকে বেরোতে বেশ খানিকটা পথ যেতে হবে। যাত্রীরা এগোচ্ছে যে যার মতো, এদিকটা প্রায় ফাঁকা হয়ে এল। পড়ে আছে শুধু পাণ্ডারা, কানের কাছে গুনগুন করছে। মন্ত্র পড়ার মতো। পল্লবরা কেউই তাদের কথা শুনছে না, তবুও তাদের নড়ার লক্ষণ নেই।
অনুতোষ কুলিদের সঙ্গে দরাদরি শুরু করল। তার কথাবার্তা হাঁটাচলা সবেতেই বেশ নেতা নেতা ভাব, ধমকে ধামকে নিজের দরেই রাজী করিয়ে ফেলল কুলিদের। ব্যাগ স্যুটকেস তাদের কাঁধে গুছিয়ে দিতে দিতে বলল, —চল্ চল্, হ্যাহ্যা হিহি পরে করিস্
সকালটা আজ ভারি মনোরম। সবে ফাল্গুন পড়েছে, বাতাসে এখন বসন্তের ঘ্রাণ। রোদও তেমন ওঠে নি এখনও। কচি সূর্য ঘুমভাঙা শিশুর মতো লেপটে আছে পূব আকাশে। আড়মোড়া ভাঙছে, হাই তুলছে, তাপ ছড়ানোয় মন নেই।
অনুতোষ কুলিদের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গেল। পিছু পিছু বন্দনা। খানিক গিয়ে দাঁড়াল অনুতোষ, বন্দনাকে পাশে আসতে দিল, পাশাপাশি দ্রুত পায়ে হাঁটছে দুজনে।
পল্লব শুভ্রকে দেখাল দৃশ্যটা। হাল্কা ভাবে বলল,—কী রে, তোর বউ যে দেখি এখনই অন্তুর সঙ্গে সেঁটে গেল!
শুভ্র হাত ওল্টালো,—তাই তো দেখছি। ট্রেন থেকে নেমেই লক্ষ্মী মেয়ের মতো শর্ত পালন শুরু করল। এদিকে জয়া আমার সঙ্গে শুধু ঝগড়াই করে চলেছে।
বেশিক্ষণ চুপচাপ থাকা মধুময়ের ধাতে নেই। ফস্ করে সে স্বভাবসিদ্ধ নির্বোধ মন্তব্য করে বসল,—তুই যদি জয়াকে নিস, তাহলে তো শুধু মিত্ৰা পড়ে থাকে। মিত্রার তাহলে কী হবে?
—মানে?
—মানে আর কি! ও তো আর তোদের শর্ত মতো পল্লবের নয়। মিত্রা কি তবে আমার ভাগে পড়ল?
—খুব যে রে শালা। পল্লব আবার এক রদ্দা কষাল মধুময়ের কাঁধে, খুব রস হয়েছে, অ্যাঁ?
শুভ্র ঠং করে একটা গাঁট্টা মারল,—তোর ভাগে কাকে রাখা হয়েছে জানিস না?
বন্ধুদের এ ধরনের চড় চাপড়ে মধুময় মোটামুটি অভ্যস্ত। সেই ছোটবেলা থেকেই সে শুভ্র পল্লবদের মজা আর হাতের সুখ করার খোরাক। এতে কি মধুময়ের মনে কোনও গ্লানি আছে? সে তো জানেই তার বুদ্ধি কম। সুতরাং বন্ধুদের সঙ্গ করতে গেলে এই ব্যবহার তো তার প্রাপ্যই।
নির্মল হেসে মধুময় প্রশ্ন করল,–কে রে? কে রে?
—টুটুল, আবার কে! যাহ্, ওকে কাঁধে তুলে নে।
টুটুলকে নিয়ে জয়া মিত্রা সামান্য পিছনে। শুভ্র পল্লবদের কথা বুঝি কিছু কানে গেছে তাদের। জয়া লঘুস্বরে কথা ছুঁড়ল,—অ্যাই, কী ব্যাপার বলুন তো?
মধুময়ই ঘাড় ঘোরাল,—কীসের কী ব্যাপার?
—ওই যে বন্দনা শর্ত মেনে চলছে …. কীসের শর্ত?
—ওমা, তোমরা জানো না? পল্লব শুভ্র বারণ করার আগেই মধুময় বলে উঠল,–ট্রেনে ওঠার আগেই তো ঠিক হয়ে গেছে, পুরী পৌঁছে বর বউ সব বদল হয়ে যাবে।
—মানে? জয়ার চোখ বড় বড় হল।
—মানে খুব সহজ ম্যাডাম। মধুময়কে থামিয়ে শুভ্র কাঁধ ঝাঁকাল, – আমরা ডিসাইড করেছি একঘেয়ে জীবনে একটু বৈচিত্র্য আনব। রোজই এক বউ,
পানসে ব্যাপার। ….মধুর অবশ্য শুধুই সমুদ্র দেখার কথা ছিল, এখন দেখছি ওরও প্রাণে পুলক জেগেছে।
টুটুল ছুট্টে এসে মধুময়ের হাত ধরল,—পুলক মানে কী গো মধুকাকা? —তুই থাম্। মেয়েকে আলগা ধমক দিয়ে খিলখিল হেসে উঠল জয়া,—প্ল্যানটা কার শুনি? আপনার?
—যদি বলি তোমার বরের?
—হতেই পারে না। আমার বর মোটেই আপনাদের মতো অসভ্য নয়।
—বটেই তো, বটেই তো। অন্তু একেবারে ভিজে বেড়ালটি।
—আর তুমি হলে গিয়ে চিত করা ভাজা মাছ
পল্লবের ফোড়নে পায়রা ওড়ানো হাসি উঠল। জয়া হাসছে, মিত্রা হাসছে, এমনকি টুটুলও হাসছে কিছু না বুঝে। হাসতে হাসতেই সকলে প্ল্যাটফর্মের বাইরে।
পর পর চারটে রিক্সায় তোলা হয়েছে মালপত্র। অনুতোষ আর বন্দনা নতুন করে মাল গুনে নিচ্ছে।
শুভ্র কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল,—এবার তাহলে কে কোন্ রিক্সায়, উঠবে ঠিক করো।
মিত্রা তড়িঘড়ি বলে উঠল, – আমি আর জয়া একটায় উঠছি।
—উঁহু। শুরুতেই প্ল্যান ভেস্তে দিও না। পল্লব ফিচেল হাসল, –বন্দনা তো আগেই অন্তুকে বেছে নিয়েছে, এবার তোমাদের টার্ন।
বন্দনা থতমত মুখে সবার দিকে তাকাল,—ও আবার কী কথা? আমি আবার কখন কী বাছলাম?
শুভ্র দাঁতে ঠোঁট চেপে গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করল, – অন্তুকে তোমার পছন্দ নয় বলছ? বেশ তবে পুলু… নয়তো মধু …
সকলেই মুখ টিপে টিপে হাসছে। এমনকি অনুতোষও। বন্দনার কিছুই মাথায় ঢুকছিল না।
হঠাৎই সে খেপে গেল,—আমি একাই একটা রিক্সায় যাব।
—আহা, চটছ কেন? অনুতোষের মুখে স্বভাবসুলভ নরম হাসি,-বুঝছ না, ওরা তোমার পেছনে লাগছে।
বন্দনা দুম করে সামনের রিক্সাটায় উঠে বসল,—অমন ভালগার রসিকতা আমার ভাল লাগে না।
পলকে গোটা পরিবেশটাই বদলে গেছে। সবাই গম্ভীর, সবাই অন্যমনস্ক। যেন কেউই বন্দনার কথা শুনতে পায় নি এমন একটা ভান করছে সক্কলে। শুভ্র যে শুভ্র, যার মুখে সর্বদা কথার খই ফোটে, চটুল রসিকতা ছাড়া যে এক মুহূর্ত থাকতে পারে না, তার মুখের হাসিটিও উধাও।
মধুময় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকাল এদিক ওদিক। আমতা আমতা করে বলল, —তাহলে আমি কি টুটুলকে নিয়ে একটা রিক্সায় যাব?
মিত্রা রুক্ষ হল,—যা ইচ্ছে করুন। জয়া, তুই আমার সঙ্গে আয়।
কিঞ্চিৎ টালবাহানার পর চারটে রিক্সাই ছাড়ল। টুটুলকে কোলে নিয়ে মধুময়, পাশে অনুতোষ, শুভ্র পল্লব চতুর্থ রিক্সায়। স্টেশন চত্বর পেরিয়ে রিক্সার মিছিল ঢুকে পড়ল পুরী শহরে। হু হু ছুটছে, বালি বালি পথ মাড়িয়ে। বাতাসে নোনা গন্ধ, বাড়ছে ক্রমশ।
ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে চুয়িংগাম বার করে মুখে পুরল মিত্রা। জয়াকেও দিল একটা। ভুরু কুঁচকে বলল,—বন্দনাটা হঠাৎ অমন রেগে গেল কেন বল্ তো?
—ও এই রকমই। জয়া যেন সামান্য উদাস।
—বেশি বেশি। সবাই বুঝতে পারছে একটা ঠাট্টা ইয়ার্কির ব্যাপার চলছে…. আননেসেসারি সিন্ ক্রিয়েট করার কোনও মানে হয়!
—বোধহয় শুভ্রদার সঙ্গে কিছু গণ্ডগোল চলছে। আজকাল কেউ কিছু বললেই…. বিশেষ করে শুভ্রদা….। দেখলি না, কাল ট্রেনে কী করল? সামান্য চাদর পাতা নিয়ে কী অশান্তি!
—টুউউ মাচ্। নিজেদের মধ্যে যা থাকে থাকুক, এক সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়ে ওরকম করবে কেন?
—অথচ তুই শুভ্রদাকে দ্যাখ্। ওই মানুষটাও তো কত অসুখী, তবু মুখে হাসি কিন্তু লেগেই আছে।
—সত্যি, শুভ্রদার মতো দিলখোলা মানুষের সঙ্গে বন্দনাকে একটুও মানায় না। …কী নিয়ে ওদের গণ্ডগোল বল্ তো?
—বুঝি না। মনে হয় ছেলেপুলে হয় নি তাই…
—শুধু ওই কারণে?
—শুধু বলছিস কী রে? ছ’ বছর হল ওদের বিয়ে হয়েছে। আমাদেরও আগে।
—সো হোয়াট? এখনও এমন কিছু বয়স হয় নি। আজকাল কত রকম ট্রিটমেন্ট হচ্ছে… মিত্রা কচকচ চুয়িংগাম চিবোল,—আমার ধারণা অন্য কোনও কেস আছে।
—কী রকম?
—সে আমি কী করে বলব?
—তাহলে বললি কেন হঠাৎ?
—না… মানে মনে হল….
—উঁহু, নিশ্চয়ই পল্লবদা তোকে কিছু বলেছে!
—না না, কী বলবে? এসব নিয়ে আমাকে ও কিছুই বলতে চায় না। জিজ্ঞেস করলেই চটে যায়। বলে পি এন পি সি ছাড়ো।
কথা বলতে বলতেই কখন যেন এসে পড়েছে সমুদ্র। নীল বঙ্গোপসাগরের সফেন গর্জন বাড়ছে ক্রমশ, বাড়ছে।
স্বর্গদ্বার এসে গেল।
সামনেই হোটেল। ব্লু লেগুন!
