কোনার্ক ও মধুময় : দুই
দুপুরটা নিস্তরঙ্গ কেটে গেল। খেয়ে শুয়ে, গড়িয়ে গড়িয়ে।
মন্দির ছাড়া এখানে প্রায় কিছুই দেখার নেই। এক আছে সমুদ্র, যা এক কালে মন্দিরের পাশে ছিল, তাও এখন সরে গেছে অনেকটা দূর। বিকেলে বললাম সকলকে, চল্ সমুদ্রই দেখে আসি, তা কেউ তেমন গা করল না। আজকের হোডে ট্যুর আধাখেঁচড়া হয়ে গিয়ে সবার মধ্যেই কেমন ঝিমুনি এসে গেছে, নড়তে চড়তে সকলের ভারি আলস্য।
অগত্যা একাই বেরিয়ে পড়লাম, টুটুলকে নিয়ে। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছি বহু দূর, সেই সমুদ্রের পাড়। সমুদ্র এখানে ভীষণ নির্জন, রুক্ষ। ঢেউ-এর কোনও ছিরিছাঁদ নেই, খ্যাপা মোষের পালের মতো শুধু পাড়ে ধেয়ে আসছে। তবে নীলটা বড় অপরূপ, জল যেন তুঁতে বরণ।
ওই সমুদ্রকে দেখে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল আমার। অন্তু বলছিল, মন্দিরের মাথায় নাকি এক সময়ে চৌম্বক কলস বসানো ছিল। সেই কলস নাকি মাঝ-সমুদ্রের জাহাজকেও হিঁচড়ে টেনে আনত পাড়ে, আছড়ে চুরমার করে দিত। কল্পচোখে ভেসে উঠছিল দৃশ্যটা, শুনশান সমুদ্রে। কী আজব খেয়াল ছিল রে বাবা রাজা মহারাজাদের! শুধু মজা পেতেও কত শয়ে শয়ে জাহাজ ডুবিয়েছে! সমুদ্রের এই সরে যাওয়া কি প্রকৃতির প্রতিশোধ? মন্দিরের আজ যে জরাজীর্ণ দশা, সেও কি হাজার হাজার হতভাগ্য নাবিকের দীর্ঘশ্বাসের ফল? এটাই বোধহয় নিয়ম। অন্যের ক্ষতি করে নিজে বেশিদিন সুখে থাকা যায় না। দুঃখী মানুষের অভিশাপ বড় ভয়ানক, তাকে এড়ানো বেজায় কঠিন, এমনকি দেবমন্দিরের পক্ষেও
টুটুল জল দেখেই আত্মহারা। পা ছোঁয়াবে বলে কী বায়না মেয়ের! আমি একদম কাছে ঘেঁষতে দিই নি। এবার ট্যুরটা যেন কেমন ছানা কেটে গেছে, দুম করে নতুন ঝঞ্ঝাট ডেকে না আনাই ভাল।
ফিরলাম সন্ধে গড়ানোর পর। ফিরেই অবাক, সব ঘর ভোঁ ভাঁ, তালা ঝুলছে। হোটেল ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করতে সে হাত উল্টে দিল। আশ্চর্য, বেরোবে না বলেও গেল কোথায় সব?
খোঁজ খোঁজ খোঁজ। মন্দির চত্বর চষে ফেললাম দুজনে। নেই। কাছে ছোটখাটো বাজার মতো আছে একটা, সেখানে গেছে কি? উঁহু, সেখানেও নেই। ছুঁড়ে ছুঁড়ে ক্লান্ত যখন, দর্শন মিলল। মন্দির থেকে বেশ খানিক তফাতে এক গাছতলায় বসে আছে সকলে। গোল হয়ে, অনেকটা ছেলেবেলার সেই রুমালচোর খেলার ভঙ্গিতে।
আমাদের দেখে পুলু চেঁচিয়ে উঠল,—কী রে ছাগল, তোর চরা শেষ?
কথা শুনে মনে হল নেতিয়ে পড়া পরিবেশ চাঙা হয়েছে কিছুটা। হেসে বললাম, –চরব যে এখানে ঘাস কোথায়? শুধুই বালি…..
—সাবাশ, কী ডায়ালগ রে! টুটুল কি তোকে ট্রেনিং দিচ্ছে?
ছোট্ট একটা হাসির তুফান উঠল। বন্দনাও মিটিমিটি হাসছে। যাক, সারাদিন আজ ধকল না নিয়ে ভালই করেছে। মানে মানে এখন কাল সকালে পুরী ফিরলে হয়।
টুটুল লাফিয়ে চলে গেল জয়ার কাছে, বিনবিন করছে কী যেন। জয়া ব্যাগ খুলে ক্রিমবিস্কুট দিল মেয়ের হাতে। অন্তু আর শুভ্র কথা বলছে নীচু স্বরে। মিত্রা কেমন একটু উদাসীন। দেখছে আকাশ, দেখছে চরাচর।
পৃথিবী এখন সত্যিই মায়াময়। এই মাত্র চাঁদ উঠল, পাতলা জ্যোৎস্না ছড়িয়ে গেল দশ দিকে। মিহি আলো মেখে সূর্যমন্দির চন্দ্রাহত যেন, ভাঙাচোরা প্রাচীন স্থাপত্যটাকে অলৌকিক মনে হচ্ছে। সকালের চেনা মন্দির এখন এক অচিন পুরী।
পুলু হঠাৎ বলে উঠল,—কী দারুণ একটা স্বপ্ন স্বপ্ন পরিবেশ তৈরি হয়ে গেল মাইরি!
অন্তু বলল,—আজ তাহলে এখানে থেকে গিয়ে ভালই হয়েছে বল্?
—ভাল কী রে, বল্ মোর দ্যান ভাল। গুড বেটার বেস্ট। নন্দন কাননে গিয়ে কী দেখতাম? সেই তো কটা বাঘ সিংহ বাঁদর হরিণ। ও তো ক্যালকাটা জু’তৈও গেলে দেখা যায়। পাল পাল।
শুভ্র বলল,—এখন বেশ জোর একটা ইতিহাসের স্মেল পাওয়া যাচ্ছে না? মিত্রা ঘুরে তাকাল,–স্মেল কী বলছেন শুভ্রদা, ইতিহাস তো এখন জ্যান্ত হয়ে উঠছে। ওই দেখুন, ওই যে নাটমন্দির, ওখানে এক্ষুনি নাচ শুরু করবে দেবদাসীরা। নূপুরের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছেন না? ওই তো কলিঙ্গরাজ এবার নাটমন্দিরে আসছেন…..
কথা ফুরোনোর আগেই চার দিক আরও নিঝুম হয়ে গেল। সত্যি সত্যি বুঝি নূপুর বেজে উঠল নাটমন্দিরে, মৃদঙ্গ বোল তুলল। ধিক্ তাং ধিক তাং ধিক তাং, রিনিঝিনি রিনিঝিনি রিনিঝিনি….। মিত্রা মন্ত্রমুগ্ধের মতো উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে চলেছে মন্দিরের কাছে। আমরা সবাই চুপ, মুখে কুলুপ আঁটা, দেখছি মিত্রাকে। এমনকি পুলুও নিথর।
আচমকাই ছিঁড়ে গেল দৃশ্যটা। কোথেকে একটা অশ্লীল সিটি বেজে উঠল। ঘোর ভেঙে চমকে তাকিয়েছি সকলে। দ্যাখ, না দ্যাখ্ গোটা পাঁচেক ছেলে এসে দাঁড়িয়েছে মিত্রার সামনে, এক সঙ্গে সাইকেলের বেল বাজাচ্ছে।
জয়া চিৎকার করে উঠল,—এই মিত্রা, চলে আয়।
বন্দনা গজগজ করে উঠল,—কোথাও একটু শান্তিতে বসার জো নেই ….. যান না পল্লবদা, দেখুন না।
মিত্রাই পিছিয়ে আসছিল, উড়ে আসা এক অশালীন শব্দ শুনে ঘুরে দাঁড়াল হঠাৎ। কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে দুমদাম এগিয়ে গেল কয়েক পা, —ব্যাপারটা কী, অ্যাঁ? ট্যুরিস্টদের সঙ্গে এমন বিহেভ করতে লজ্জা করে না? পুলিশে খবর দিলে সব কটাকে একেবারে চাবকে সিধে করে দেবে।
হ্যা হ্যা করে হেসে উঠল ছেলেগুলো। নিজেদের মধ্যে কী সব বলাবলি করল, আবার হাওয়ায় ভাসিয়ে দিচ্ছে চোখা চোখা মন্তব্য।
আর দেরি করা নয়, উঠেই প্রায় দৌড়েছি আমরা। মিত্রা বুঝি আমাদের দেখে জোর পেল অনেকটা, কড়া গলায় বলল, –ভাগ, ভাগ্ এখান থেকে। নইলে এমন ঝাড় খাবি….
সঙ্গে সঙ্গে ছেলেগুলোর মুখ চোখ বদলে গেছে। সাইকেল ফেলে এক সঙ্গে এগিয়ে এসেছে মিত্রার দিকে। একটা ষণ্ডা মতন ছেলে খপ্ করে মিত্রার হাত ধরে টানল। কোনওক্রমে নিজেকে সামলেছে মিত্রা, পাল্টা চড় কষিয়েছে ছেলেটাকে।
অন্তু হাঁ হাঁ করে মাঝখানে গিয়ে পড়ল,—হচ্ছেটা কী? যান না আপনারা। কেন ঝামেলা করছেন?
চড় খাওয়া ছেলেটা মুহূর্তের জন্য থমকেছিল, পরক্ষণেই খ্যাপা কুকুরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে অন্তুর ওপর। অন্য একজন হিড়হিড় করে টানল মিত্ৰাকে। এলোপাথাড়ি হাত চালাচ্ছে মিত্রা, নিজেকে ছাড়াতে পারছে না, ডুকরে কেঁদে উঠল হঠাৎ।
আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। এক লাফে ছেলেটার টুটি চেপে ধরেছি। শরীরের সব শক্তি জড়ো করে ঘুষি চালালাম ছেলেটার তলপেটে, অঁক করে ককিয়ে উঠল ছেলেটা, উবু হয়ে বসে পড়ল মাটিতে। পলকে আরেক জন কোমর থেকে ছুরি বার করেছে, আমার দিকে তেড়ে এল। চকচকে ছুরির ফলা বিদ্যুৎ বেগে এগিয়ে আসছে আমার পেটের দিকে, শরীর ছোঁয়ার আগেই ধরে ফেললাম হাতখানা। মুচড়োচ্ছি, মুচড়োচ্ছি…. স্প্রিং-টেপা ছুরি ঘষে যাচ্ছে কাঁধে….
পুলু নার্ভাস গলায় বলে উঠল,—মন্দিরের দিকে গার্ড আছে না? দৌড়ে গিয়ে ডেকে আনব?
অন্তু বলল,—দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা না
শুভ্র মিত্রাকে টেনে নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে গেছে। হাঁক ছাড়ল,— ছেড়ে দে মধু, সরে আয়।
কক্ষনো না, কেন সরবো? মোচড়ের সঙ্গে জোর ঝটকা মারলাম একটা, ছুরি ছিটকে গেল বালিতে। চুলের মুঠি ধরে সাপটে ধরলাম ছেলেটাকে, হাঁটু দিয়ে আঘাত করলাম পেটে। নুয়ে পড়ল ছেলেটা, সবেগে লাথি চালালাম। সাত হাত দূরে গিয়ে ছেলেটা গড়াচ্ছে এখন, কেঁউ কেঁউ করছে। কোনওক্রমে উঠে দাঁড়াল, তার পরই সাইকেল নিয়ে ভোঁ দৌড়। বাকিরাও সাইকেলে চেপে পালাচ্ছে।
মিনিটের মধ্যে পাঁচ মূর্তি উধাও!
উত্তেজনা কাটতেই নজরে পড়ল কাঁধ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে।
জয়া কাছে এসে শিউরে উঠল,ওমা, এ তো অনেকটা কেটে গেছে! ইশ, কী হবে এখন?
আলগা হাত বোলালাম কাটা জায়গাটায়। বললাম, না না, ও কিছু না। সামান্য একটু ঘষা লেগেছে।
—মোটেই সামান্য নয়। এত রক্ত পড়ছে….বলতে বলতে ব্যাগ খুলে রুমাল বার করল জয়া। ধবধবে ফর্সা রুমাল চেপে ধরেছে আমার কাঁধে, চলুন, এক্ষুনি গিয়ে ওষুধ লাগাতে হবে।
বন্দনা বলল, আমার কাছে ব্যান্ডেজ আছে। ভাল করে বেঁধে দিতে হবে জায়গাটা। ….উফ্, ধন্য সাহস বটে আপনার! ওই রকম একটা ছুরিঅলা রাফিয়ানের সঙ্গে লড়ে গেলেন!
আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। কী বা এমন বাহাদুরির কাজ করেছি আমি! আমাদেরই এক বন্ধুর বউ-এর সঙ্গে কটা ছেলে এসে ইতরামি করবে, আর আমি চুপচাপ হজম করব? এও কি হয়? যা করেছি তার থেকে কম কিছু করলে নিজের কাছে আমি মুখ দেখাতে পারতাম? ওই তো একটু কাটা, রাত পোহালে তার চিহ্নই থাকবে না….
এতক্ষণে ফিরেছে পুলু, সঙ্গে মন্দিরের এক প্রহরী। পরনে খাকি প্যান্টশার্ট, হাতে মোটা লাঠি, বয়স বোধহয় কুড়িও ছোঁয় নি। রক্ত টক্ত দেখে বেশ ঘাবড়ে গেল ছোকরা, ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখে তাকাচ্ছে এদিক ওদিক
শুভ্র ছেলেটাকে খেঁকিয়ে উঠল – আপনাদের এখানে ল অ্যান্ড অর্ডার বলে কি কিছু নেই? থানা কোথায় আপনাদের? চলুন আমার সঙ্গে। রিপোর্ট করব।
ঘাড় ঝুলে গেল ছেলেটার।
বেচারার মুখ দেখে আমার মায়া হল। বললাম, – ছেড়ে দে ওকে। যা হওয়ার হয়ে গেছে, আর কিছু করতে হবে না।
—কেন ছাড়ব? মামদোবাজি? ট্যুরিস্ট স্পটে এসব বাঁদরামো চলবে, তার একটা প্রোটেস্ট হবে না?
বন্দনা ঠোঁট বেঁকাল,—এখন খুব বুলি ফুটেছে দেখি! এদিকে গণ্ডগোলের সময়ে তো হাঁটু কাঁপছিল!
শুভ্রর মুখ নিমেষে কালো।
তড়িঘড়ি বললাম,—আহ্, চলো তো ফিরি।
ছাড়া পেয়ে প্রহরী ছেলেটাও বাঁচল যেন। ঊর্ধ্বশ্বাসে হাঁটা দিল মন্দিরের দিকে। প্রায় ওই গুণ্ডাগুলোর মতোই।
পান্থনিবাসের পথে পায়ে পায়ে চলেছি আমরা। অন্তর কোলে টুটুল। ভয় পেয়ে কাঁদছিল মেয়েটা, এখন ড্যাবড্যাব তাকাচ্ছে আমার দিকে। পুলু আমার হাত ধরল, চাপ দিচ্ছে মৃদু। এই প্রথম পুলু আমার কোনও কাজের জন্য আমাকে গাড়োল বলছে না।
রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে বসলাম বারান্দায়। সিগারেট ধরিয়েছি। কমই খাই সিগারেট, দিনে তিনটে কি চারটের বেশি কখনই না। আজ বেশ লাগছে সিগারেটের স্বাদ। মস্তিষ্কে কাজ করছে ধোঁয়া, মাথা এখন তুলোর মতো হাল্কা সন্ধের ঘটনাটা ফিরে ফিরে আসছে মনে। ইশ, ব্যাটা বদমাশগুলো বড় অল্পে ছাড়া পেয়ে গেল। গোটা দুয়েকের মুখ ফাটাতে পারলে বেশ হত। মেয়েদের সঙ্গে মাজাকি, অ্যাঁ? তাও আবার যে সে মেয়ে নয়,
—মধুদা, আপনি এখনও বাইরে?
শালা, টিমের মিত্রা!
জোর ঝাঁকুনি খেলাম। মিত্রা! এই মাত্র মিত্রার কথা ভাবছিলাম, ওমনি মিত্ৰা আবির্ভূত সামনে!
ধড়মড়িয়ে সোজা হলাম,–এই এমনিই।….তুমি এখনও শোও নি?
— শোব।
বলল বটে, কিন্তু মিত্রা ঘরের দিকে গেল না। টানা বারান্দায় সার সার বেতের চেয়ার, টেনে বসল মুখোমুখি। দেখছিলাম মিত্রাকে, কেমন যেন অন্য রকম লাগছে মুখখানা। শুকনো শুকনো, ভার ভার। এখনও সন্ধের ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতে পারে নি? আমার দৃষ্টির সামনে মিত্রা কেমন কুঁকড়ে যায়। হয়তো বা ঘৃণায়। হয়তো বা বিরক্তিতে। এখন কিন্তু তেমনটি হচ্ছে না! বরং চোখে চোখ পড়তেই নামিয়ে নিল মুখ, চুপ করে বসে আছে। কিছু বলবে কি? সন্ধের ঘটনাটার পর থেকে সকলেই কিছু না কিছু কথা বলেছে আমার সঙ্গে, একমাত্র মিত্রা ছাড়া।
ঝপ করে মিত্রা বলে উঠল,—আপনার ঋণ আমি কোনওদিন শোধ করতে পারব না মধুদা।
এমন কথার জন্য তৈরি ছিলাম না। বললাম, – কীসের ঋণ?
—জানেন না? মিত্রার গলা ধরা ধরা শোনাল,–আপনি না থাকলে আজ….আর কেউ তো….
—আরে দূর, ছাড়ো তো। হাল্কা ভাবে উড়িয়ে দিতে চাইলাম মিত্রাকে। লঘু সুরে বললাম,—তুমিও তো, ওই যে কী বলে, কম বীরপুরুষ নও। দিব্যি একা একাই লড়ে যাচ্ছিলে।
—যাহ্। মিত্রা হেসে ফেলল,—আমার এমন দুমদাম মাথা গরম হয়ে যায়, খেয়াল থাকে না কোথায় কারা সামনে আছে….
—আমারও তো তাই। রাগের মাথায় একটু বেশি জোশ দেখিয়ে ফেলেছি।
—উঁহু, রাগের মাথায় নয়।
—তবে? মুখটা হাঁ হয়ে গেল আমার।
—আপনি জানেন না, আপনি সবার থেকে আলাদা। কেউ যা পারে না, আপনি তা অনায়াসে পারেন। আপনি একা বুক চিতিয়ে লড়তে পারেন। কটা মানুষ পারে এরকম?
কী বলছে মিত্রা? বত্রিশ বছর বয়স হতে চলল, এমন কথা কোনও মেয়ে বলেছে আমাকে?
মিত্রা আবার ফিসফিস করে বলল, – আমার এতদিন ভুল ধারণা ছিল মধুদা। সরি, এক্সট্রিমলি সরি।
সুন্দর একটা বাতাস বইছে। মিত্রা চলে যাওয়ার পরও বসে আছি, বসেই আছি। বুকটা কেমন চিনচিন করছে। আনন্দে? পুলু অন্তু শুভ্র কেউ যা পারে না, আমি তা পারি? কান্না আসছে কেন হঠাৎ?
ঘরে যেতে আর ইচ্ছেই করছে না। নেমে এলাম লনে। গেট পেরিয়ে এলোমেলো পথে হাঁটছি। মাথার ওপর এক তারায় ছাওয়া আকাশ, এক কোণে ঝুলছে নৌকোর মতো চাঁদ, নিঝুম নিরালা রাতে হাওয়া বইছে শনশন …. আহ্, বেঁচে থাকাটা কী সুখের! গলা ছেড়ে গান গাইব? ধেই ধেই নাচব? পাঁই পাঁই ছুটব? বালিতে গড়াগড়ি দেব? থাক গে, এই গভীর রাতে কেউ দেখে ফেললে হয়তো আমাকে পাগলা গারদেই ঢুকিয়ে দেবে।
কতক্ষণ একলা হেঁটেছি হিসেবই নেই, পান্থনিবাসের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালাম। ও-পাশের ঝোপ ঝোপ জায়গাটায় অন্তু না? সঙ্গে কে? জয়া? না তো, জয়া তো নয়! বন্দনা! দুজনে হাত ধরে অন্ধকারে কোথায় যাচ্ছে? কী ঘনিষ্ঠ ভঙ্গি, ঠিক যেন কাল সমুদ্রতীরের মিত্রা আর পুলু!
দ্রুত সরে গেলাম। নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছি। অন্ধকারে ছায়ামূর্তি হয়ে মিলিয়ে গেল দুজনে। একটু পরেই ফিরল, ওই পথেই। ঝোপের কাছে এসে দাঁড়িয়ে রইল অন্তু, বেড়াল পায়ে বারান্দায় উঠে গেল বন্দনা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অন্তু সিগারেট খেল একটা, দু চার পা হাঁটল লনে, তারপর সেও ঘরমুখো।
ধপাস ধপাস লাফাচ্ছে আমার হৃৎপিণ্ড। হা ঈশ্বর, এ কী দেখলাম? কেন দেখলাম? হে ভগবান, আর কেউ দেখে নি তো? দেখলেই কেলেঙ্কারি, দেখলেই দুঃখ, দেখলেই প্রলয়। কেউ কারুর জন্য দুঃখ পাচ্ছে, একজনের জন্য অন্যের অশান্তি হচ্ছে, এই ভাবনাটাই যে কী কষ্টের!
সব ঘর বন্ধ। খোলা আকাশের নীচে বসে আছি আমি। জ্যোৎস্না মাখা আকাশে তারার ফুল ভারি নিষ্প্রভ এখন। রাতের বুক চিরে একটা পাখি ডেকে উঠল হঠাৎ, ডানা ঝাপটানোর আওয়াজও পেলাম যেন। নোনা একটা গন্ধ এসে লাগছে নাকে, দুঃখের গন্ধ।
কতক্ষণ আর এভাবে বসে থাকা যায়! উঠেছি এক সময়ে। বারান্দা ধরে এগোচ্ছি, ঘরের কাছে এসে পা আটকে গেল। দু হাঁটুর ভাঁজে মুখ রেখে চেয়ারে গুটিসুটি হয়ে বসে জয়া!
বুকে বিসর্জনের বাজনা বেজে উঠল। জয়ার সঙ্গে মায়ের বড় মিল!
—তুমি এভাবে বাইরে বসে আছ কেন?
মুখ তুলল জয়া, বড় একটা শ্বাস ফেলল। উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল,—আপনি এত রাতে কোথায় গিয়েছিলেন?
—ঘুম আসছিল না। ঘুরছিলাম একটু। তুমি এখানে কী করছ?
—আমারও ঘুম আসছে না।
অন্ধকারে জয়ার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। চোখ কি জ্বলছে জয়ার? জ্বলছে, না জল চিকচিক করছে?
হায় ভগবান, সবই কি দেখে ফেলেছে জয়া?
দায়িত্বশীল দাদার মতো গম্ভীর স্বরে বললাম,—একা একা বসে থাকতে হবে না। ভেতরে যাও। ঘুম না এলেও শুয়ে থাকো।…যাও।
আশ্চর্য, জয়া অবাধ্য হল না। গুটি গুটি পায়ে যাচ্ছে ঘরের দিকে। আমার গলায় কি ব্যক্তিত্ব এসেছে কোনও?
সন্ধের ঘটনাটা কি সত্যিই বদলে দিল আমাকে? অন্তত ওদের চোখে?
