মিত্রার মন
বিছানায় রোদ পড়তেই ঘুমটা ছিঁড়ে গেল। চোখ খুলতে পারছি না, কে যেন ভারী পাথর বসিয়ে দিয়েছে পাতায়। মাথাটার কী হাল রে বাবা, এ যেন একেবারে দশ-মণি বোঝা! আমি কোথায়?
পিটপিট করে তাকালাম। আলো সওয়াচ্ছি চোখে। হ্যাঁ, এ তো আমাদেরই ঘর, ব্লু লেগুনের দুশো তিন। পাশে পল্লব, হাত পা ছড়িয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। মুখটা কী বিশ্রী হাঁ হয়ে আছে পল্লবের। কটা বাজে এখন? সাতটা? আটটা? ঠেলে তুলে দেব পল্লবকে?
চোখ রগড়ে উঠে বসতেই মাথা ঝিমঝিম। কে যেন ডাঙশ মারছে মাথায়। বাথরুম আর ক’ পা, এটুকু যেতেই কষ্ট হচ্ছে বেশ। শরীরের গাঁটে গাঁটে কী ভীষণ যন্ত্রণা! কাল কি খুব বেশি খেয়ে ফেলেছিলাম? ছিলাম তো বন্দনাদের ঘরে, ফিরলাম কখন? ছি ছি, নির্ঘাৎ টোটাল আউট হয়ে গিয়েছিলাম! কী কী কাণ্ড করেছি কে জানে! অন্যয়া কী অবস্থায় ছিল? পল্লব খুব হাসছিল, মধুদাও কী সব চেঁচাচ্ছিল, আর… আর…? দূর ছাই, কিচ্ছু মনে পড়ছে না।
বেড-টি কেন দিয়ে যায় নি আজ? নাকি এসেছিল, দরজায় ধাক্কা মেরে ফিরে গেছে? বাথরুম ঘুরে এসে বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে চা দিতে বললাম। ডাকব পল্লবকে, যদি না ওঠে দু’ কাপই মেরে দেব। তাতে যদি মাথাটা ছাড়ে!
ইস্, কী চেহারা হয়েছে মুখের! চোখ দুটো ফোলা ফোলা, কাজল ধেড়ে আছে, সিঁদুর কপালে মাখামাখি, চুলের কথা তো অকহতব্য। কী জট রে বাবা, চিরুনি চালাতে মাথা টনটন করে উঠছে! নাহ্, কাল একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলেছি। কেন যে অমন ফাঁট মারতে গেলাম? সত্যি সত্যি জীবনে কটা দিনই বা ড্রিঙ্ক করেছি আমি? বড় জামাইবাবুর বাড়িতে বার দুয়েক বিয়ার, মেরে কেটে এক গ্লাস করে, আর মেজ জামাইবাবুর গ্লাস থেকে একদিনই মাত্র হুইস্কিতে চুমুক, ব্যস্। না না, আরেক দিন সেই কলেজের পিকনিকে। সৌম্য অনীশ মালবিকা তনুশ্রী সবাই খাচ্ছিল, সেদিন বড় জোর এক পেগ। রাম আমি জন্মে ছুঁই নি। কী কড়া রে বাবা, একেবারে আছড়ে ফেলে দিয়েছে! খেতে কিন্তু তখন বেশ লাগছিল। মাথাটা হাল্কা হাল্কা, হাত পা ল্যাল ল্যাল করছে, মনে হচ্ছে যেন শূন্যে হাঁটছি আর গোঁত খাচ্ছি….। পল্লরকে আরেক দিন উসকোতে হবে, ফেরার আগের দিন। রাম না খাই, হুইস্কিই খাব, তাতে নিশ্চয়ই এত হ্যাঙওভার হবে না। হিহি, হ্যাঙওভার! আমার হ্যাঙওভার! শ্বশুর শাশুড়ি শুনলে মূর্ছা যাবেন। ….বন্দনাটা না আবার ব্যাগড়া দেয়।
দাম্ভিক মেয়েটাকে বোঝা দায়। খাস না খাব না করেও চোঁ চোঁ অনেকটাই তো টানল! পেটে ক্ষিধে মুখে লাজ, ও আমি অনেক দেখেছি!
ওফ্, পল্লবের কী নাক ডাকছে! এখনও। এমন তো ডাকে না সচরাচর, এও কি মদ্যপানের পার্শ্বক্রিয়া? পল্লবও বেশ জমিয়ে টানতে পারে। মিছিমিছি সেদিন দিদির ওখানে ঢঙ্ করে বলল, আমার ও সব অভ্যেস নেই!
শ্বশুরবাড়িতে এক অদ্ভুত মুখ করে থাকে পল্লব। যেন ভীষণ ভালমানুষ, ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। অ্যাক্টিং!
খাটে এসে আলগা ধাক্কা দিলাম পল্লবকে, –অ্যাই ওঠো, বেলা হয়ে গেছে।
পল্লবের নাক থামল। পাশ ফিরে শুয়েছে। একবার তাকিয়েই চোখ বুজে ফেলল,—ক’টা বাজে?
—সাড়ে ন’টা।
—সে কী, ডাকো নি কেন? পল্লব ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। জলহস্তীর মতো হাই তুলল কয়েকটা। সুখী বেড়ালের মতো আড়মোড়া ভাঙছে। আমাকে জড়িয়ে চকাস করে চুমু খেল,ওরা উঠেছে?
—কী জানি! মনে হয় আমরাই ফার্স্ট।
পল্লব চোখ টিপল,—খুব হুল্লোড় হল কাল, কী বলো?
—সেই মস্তির ঠেলাই তো সব সামলাচ্ছে এখনও। কলেজের ভাষা বেরিয়ে গেল আবার। পল্লবের কাঁধে মাথা রাখলাম, — মাথা যা ধরে আছে না!
পল্লব শশব্যস্ত,—ওষুধ খাও নি কেন? ব্যাগে তো স্যারিডন ম্যারিডন আছে।
—আমার ওষুধ খেতে ভাল লাগে না।
পল্লবের চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে গেল,—মাথা টিপে দেব?
—থাক। তুমি কি আর মাথা টিপেই ধমবে? ….কাজের কাজ করো, মুখ টুখ ধুয়ে নাও, রেডি হয়ে সমুদ্রে যাই চলো।
—যদি আজ স্নানে না যাই?
—তাহলে আমি একাই যাব। সমুদ্রে না নামলে শরীর ঠিক হবে না!
—তুমি বড্ড বেরসিক। বেজার মুখে উঠে পড়ল পল্লব। অলস পায়ে বাথরুমে ঢুকেছে।
বেয়ারা চা দিয়ে গেল। কাপে চুমুক দিতে দিতে ব্যালকনিতে গিয়ে বসলাম। সমুদ্রতীরে যথারীতি স্নানার্থীদের ভিড়। দুটো একদম গেঁড়ি গেঁড়ি বাচ্চা বালিতে ছুটছে উদ্দাম, ধপাস করে পড়ে গেল, কাঁদল না, আবার উঠে ছুটছে। চড়া রোদ পড়ে সমুদ্র এখন নীল নয়, প্রায় বর্ণহীন। বহু বহু দূরে একটা কালো বিন্দু, ও কি কোনও জাহাজের মাস্তুল?
কে যেন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। দরজা খুলেই দু পা পিছিয়ে এলাম। মধুদা। পরনে সেই কিম্ভূতকিমাকার হাফপ্যান্ট, খালি গা, দু’ হাতে দুটো ব্রেকফাস্টের প্লেট। এই পোশাকেই গোটা হোটেল ঘুরে বেড়াচ্ছে? লজ্জাশরমও নেই?
দাঁত বার করে হাসল মধুদা, কী ঘুম ঘুমোচ্ছিলে গো? তোমাদের ব্রেকফাস্ট সেই কখন থেকে আমরা ঘরে রেখে দিয়েছি!
কিছু একটা বলতেই হয়। বললাম, – থ্যাংক ইউ।
—চা কিন্তু পাবে না। দু’ বার চা এসে ফিরে গেছে।
চা পান যে হয়ে গেছে বলার প্রয়োজন বোধ করলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম,—জয়ারা কোথায়?
—ঘরে। সকালে উঠে আমি জয়া টুটুল আর অন্তু বেড়াতে বেরিয়েছিলাম। অনেক দূর। যা ঝিনুক কুড়িয়েছি না, পুরো একটা দোকান হয়ে যাবে। বলতে বলতে হেঁ হেঁ হাসছে।
পলকের জন্য মনে পড়ে গেল রাতের দৃশ্যটা। উৎকট চেঁচাচ্ছিল মধুদা! মুখ দিয়ে তখন লালা ঝরছিল!
গা ঘিনঘিন করে উঠল। বললাম, – ঠিক আছে, আপনি ওগুলো রেখে চলে যান, আমরা আসছি।
মধুদা বিছানায় গিয়ে বসল। আচ্ছা বেহায়া তো, যেতে বললেও যায় না? ইতিউতি তাকাচ্ছে। পল্লবের চা রাখা আছে টেবিলে, দেখলও সেটা। তার পরও প্রশ্ন,—পুলু নেই? বেরিয়েছে বুঝি?
আমি নয়, পল্লবই বাথরুম থেকে উত্তর দিল,—হ্যাঁ রে, আমি একটু মন্দিরে গেছি।
—ও, তুই পায়খানায়?
অসহ্য। একে কি গলাধাক্কা দিয়ে বার করতে হবে? সেই বিশ্ৰী চাহনি, যেন চাটছে আমায়! লজ্জাও নেই, কাল অত বকুনি খেল…..!
কটমট করে তাকালাম। পাত্তা না দিয়ে কামড় বসালাম টোস্টে। চিবোতে চিবোতে বিছানা টান করছি। তবু নড়ল না লোকটা, যেখানটা বসে আছে সেখানটা একটু ঝেড়ে পা গুটিয়ে বসল। এক গাল হেসে বলল, – তোমরা দুজনেই কালকে একদম আউট হয়ে গেছিলে।
—তো?
—না, মানে শুধু তোমরা নও, জানো তো, বন্দনা পুরোপুরি ডাউন। সারারাত বমি টমি করে….এখন একেবারে নেতিয়ে পড়ে আছে।
—সে কী? কথা বলতে না চেয়েও বলে ফেললাম।
—হ্যাঁ গো, জীবনে তো কখনও খায় নি, একবারে ওভারভোজ হয়ে গেছে।
আমারও কেমন যেন মন বলছিল, কিছু একটা হবেই। বড় জামাইবাবু সব সময়ে বলে, মাল সইয়ে সইয়ে খেতে হয়। কাল যা ঢকঢক করে গিলছিল বন্দনা! নভিশদের বোধহয় এমনটাই হয়।
এক সঙ্গে এসেছি, চিন্তিত হওয়াটাই শোভন। গলা উঠিয়ে বললাম, এই, তুমি তাড়াতাড়ি বেরোও। বন্দনার শরীর ভাল না, কী সব বমি টমি করেছে।
পল্লব তোয়ালে পরে বেরিয়ে এসেছে। গালভর্তি সাদা সাবান, হাতে রেজার। ট্যুরে এসেও পল্লব টিপটপ থাকে। অভ্যেস।
পল্লব কিছু প্রশ্ন করার আগেই চোখের ইশারায় বললাম, লোকটাকে তাড়াও। ঠিক বুঝে গেছে পল্লব। এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে স্থির করে নিল ইতিকর্তব্য। নীচু হয়ে চায়ের কাপে আঙুল ছোঁয়াল। নিপুণ অভিনেতার মতো বলে উঠল,—অ্যাহ্, এ তো একদম ঠাণ্ডা জল হয়ে গেছে রে।
মধুদা নির্বোধ চোখে তাকাল,—–ও, তোরা চা পেয়েছিস?
—নয়তো এটা কী? ঘোলের শরবৎ? যা, এক কাপ আরও নিয়ে আয়। একদম গরম গরম, ধোঁয়া ওঠা।
গলায় আহ্লাদী ভাব ফোটালাম,—আমার জন্যও এক কাপ আনবেন মধুদা, প্লিজ।
লোকটা গলে গদগদ হয়ে চলে গেল। প্রায় লাফাতে লাফাতে।
পল্লব খ্যাকখ্যাক হাসল,—দেখলে তো, পাঁঠাটা সঙ্গে থাকলে কী লাভ? কত কাজে লাগে….! বাই দা বাই, তোমার কী পাকা ধানে মই দিচ্ছিল ব্যাটা?
—যা ঝাড়ি মারছিল! ওর সামনে থাকা যায় না।
—আরে বাবা, কত বার বলব, ওটা ঝাড়ি নয়। অ্যাবনরমাল। অ্যাবনরমাল লোকেদের দৃষ্টি কখনও নরমাল হয়?
—কীসের অ্যাবনরমাল বুঝি না বাপু। খাচ্ছে দাচ্ছে, বগল বাজাচ্ছে….
—সত্যিই ও সুন্দর বগল বাজায়। পল্লব মুখের কথা কেড়ে নিল,—যা, ফাইন একটা আওয়াজ করে না…..
—তুমি থামবে?
পল্লব রণে ভঙ্গ দেওয়ার ভঙ্গিতে দু’ হাত তুলে বাথরুমে চলে গেল। দরজা খোলা, দাড়ি কামাচ্ছে আয়নায়।
ওখান থেকেই বলল,—বন্দনার ব্যাপারটা কিছু বুঝলে?
—বোঝার কী আছে! অনভ্যাসের নেশা….
—অত সোজা কেস নয় ম্যাডাম। ….বন্দনা শুভ্রকে টাইট দিচ্ছে।
—বমি করে?
—ও সব পারে। লক্ষ্য করছ না, এখানে এসে অন্তুর সঙ্গে বেশি মাখামাখি করছে? ওটাও ইচ্ছে করে। শুভ্রটা একটু কমপ্লেক্সে ভোগে তো….
কীসের কমপ্লেক্স? শুভ্রদারও যথেষ্ট হ্যাণ্ডসাম চেহারা।
—রাখো তোমার হ্যাণ্ডসাম। বন্দনার কাছে শুভ্র? মুখে আফটারশেভ লোশান থুপতে থুপতে ঘরে এল পল্লব। আয়নায় দাঁড়িয়ে দু’চার বার হাত বোলাল গালে। কপাত করে একটা ডিমসেদ্ধ তুলে মুখে পুরল। খেতে খেতে বলল,—বন্দনার কথা ছাড়ো। এক বেলা রেস্ট নিয়ে নিলে ঠিক হয়ে যাবে।
—তা হয়তো হবে। ….কাল না খেলেই পারত।
—হুঁ। পল্লব হঠাৎ চোখ টেরচা করল,–এই, তুমি আমায় একটা সত্যি কথা বলবে?
—কী?
—গুল মারবে না কিন্তু। ….তোমার কি বিয়ের আগে মাল খাওয়ার হ্যাবিট ছিল?
—এমা, না। মাইরি না। তোমায় ছুঁয়ে বলছি। কালই প্রথম….
কেন অনর্থক মিথ্যে বললাম? মিথ্যেই বা কোথায়, আধা সত্যি। এক দু’বার ছোঁয়াকে না ছোঁয়াই বলে।
হাল্কা মনে বললাম,—গাটা কিন্তু এখনও ম্যাজ ম্যাজ করছে। কী করে হ্যাঙওভার কাটানো যায় বলো তো?
—দুটো উপায় আছে। পল্লব মুখ টিপে হাসল,—এক, আরেকটু নতুন করে খেয়ে নেওয়া। আর দ্বিতীয়টা একেবার মহৌষধ। সেটা অবশ্য মুখে বলার থেকে করে দেখানোই সোজা। পল্লব চোখ মারল, – দেখাব?
—কানকি মেরো না। এত ক্ষিধে কেন, অ্যাঁ? কলা খাচ্ছ, তাই খাও না।
পল্লব বোধহয় আরও কিছু আদিরসাত্মক কথা বলতে যাচ্ছিল, ভেজানো দরজা ঠেলে আবার বোকা লোকটা ঘরে ঢুকেছে। সঙ্গে অন্তুদা, জয়া। টুটুল আছে, পরনে মিষ্টি একটা লাল সুইমিং কসটিউম।
অন্তুদা গমগম করে হাসল,—কী, খোঁয়াড়ি কাটল?
হায় রে, সারাদিন এরা আমার পেছনে লাগবে? ঠোঁট উল্টে বললাম, – ইশ, নিজেরা একটুও না খেয়ে আমাদের খাইয়ে মজা দেখলেন, এখন আওয়াজ মারা হচ্ছে?
জয়া চোখ মুখ কুঁচকোল, – বাবাহ্, কী বিচ্ছিরি খেতে! এক চুমুক খেয়েই আমার অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসছিল।
—ওইটুকু খেলে অমনই লাগে। তুই তো আসল মজাটাই পেলি না। শরীর থেকে মনটা একদম আলাদা হয়ে যায়। মনে হয় আমি বুঝি আর আমাতে নেই।
—সেটা কী গো কাকিমা? টুটুল পুট করে বলে উঠল,—আমিও মজার জিনিস খাব।
—হ্যাঁ, ওটাই তোমার খাওয়া বাকি আছে তো! জয়ার লঘু ধমক
অন্তুদা গম্ভীর মুখে বলল, এবার টপিক পাল্টাও। ….চটপট তৈরি হয়ে নাও তো দেখি। এর পর জলে নামলে কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারবে না।
পল্লব জিজ্ঞাসা করল,—শুভ্রদের কী হবে?
—ও হ্যাঁ, তাও তো বটে। বন্দনা তো নিশ্চয়ই বেরোবে না। অন্তুদা জয়াকে বলল,—যাও তো, ওদের আরেক বার দেখে এসো।
জয়া টানল আমাকে, চল্ তো!
শুভ্রদা দরজা খুলেছে। মুখ চোখ শুকনো, চোখের নীচে কালি।
হাসল, কিন্তু কষ্ট করে, কী গো, সুন্দরী মেয়েরা? কী বা বারতা? কহো।
—বন্দনা এখন কেমন?
পর্দা সরিয়ে বন্দনাকে দেখিয়ে দিল শুভ্রদা। দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে বন্দনা, গায়ে একটা পাতলা চাদর।
জয়া জিজ্ঞাসা করল, এখনও ঘুমোচ্ছে?
শুভ্ৰদা মাথা দোলাল,—ঘুমোচ্ছে, জাগছে, এখন বোধহয়….
—বমি হয়েছে আর?
—নাহ্। ওই সারা রাতই যা….
জয়া মুখ ঘুরিয়ে একবার আমায় দেখে নিল। তারপর চাপা স্বরে প্রশ্ন করল, —আপনি সমুদ্রে যাবেন?
—গেলে মন্দ হয় না, শরীরটা একটু ছাড়ত। শুভ্রদা ঘাড়ে হাত বোলাল,—সেই কোন্ রাত থেকে জাগা….
—তো একটু ঘুমিয়ে নিন না। বন্দনার কাছেও থাকা হবে….আমার তো মনে হয় বন্দনাকে একা ছেড়ে যাওয়া উচিত নয়।
কী মেয়ে রে বাবা! বন্দনা অন্তুদা এখানে এসে যা করছে, যে কেউ দেখে বলবে ওদের মধ্যে একটা কিছু আছে! সেদিন জগন্নাথ মন্দিরে যাওয়ার জন্য জয়া অত করে সাধল অন্তুদাকে, সবাই গেল, অন্তুদা কিছুতেই নড়ল না, আর বন্দনা তো আগে থেকেই…. জয়ার মনে কি একটুও খটকা লাগে নি? কেমন উদার বড়দি বড়দি ভাব করে কথা বলছে দ্যাখো! আমি হলে তো বাবা বন্দনার খবরই নিতাম না। জয়াটা বোকা বোকা বোকা, রামবোকা। মধুময় নন্দীর পরিশীলিত সংস্করণ।
মনে মনে স্থির করে ফেললাম, জয়াকে একটু জ্ঞান দিতে হবে। ওর একটু চোখ ফোটা দরকার।
জয়া ঘরে ঢুকতে সামান্য ইতস্তত করছে। শুভ্রদা বলল,—যাও না। ডেকে দ্যাখো ওঠে কিনা….পুলু অন্তুরা কোথায়?
—আমার ঘরে। আমিই উত্তর দিলাম এবার।
চোখ কুঁচকে এক সেকেণ্ড আমায় দেখল শুভ্রদা। অন্যমনস্ক মুখে ঘরে ফিরল একবার, সিগারেট দেশলাই নিয়ে আমাদের ঘরে চলে গেল।
কী ভীষণ বিচলিত দেখাচ্ছে শুভ্রদাকে। আহা রে, ওরকম একটা বউএর পাল্লায় পড়ে বেচারার জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেল!
জয়া বন্দনার বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আমিও গেলাম।
বন্দনা যেন টের পেল আমাদের উপস্থিতি, সহসা চোখ মেলেছে। ফ্যাকাশে হাসল, —ও, তোরা?
জয়া বসল খাটে। বন্দনার চুলে হাত বুলিয়ে দিল, –কি রে, কী কষ্ট হচ্ছে এখন?
বন্দনার হাসি আরও ম্লান, —এখন বেটার।
জয়া কোমল স্বরে বলল, – কেন জেদ করে কাল অতটা খেতে গেলি? সকলের কি সব সহ্য হয়? দেখলি না, আমি মুখে একটু ছুঁইয়েই রেখে দিলাম?
বন্দনা নিশ্চুপ। দু’ ফোঁটা জল জমেছে চোখের কোলে।
জয়ার স্নেহমাখা স্বরে যেন জাদু আছে। কোত্থেকে যেন একটু একটু মায়া আমার বুকেও সংক্রামিত হচ্ছিল। ইশ, কী চোখমুখ বসে গেছে মেয়েটার! ফিকে গোলাপি রঙ ফ্যাটফ্যাট করছে, অ্যানিমিক রুগীর মতো।
মৃদু গলায় বললাম,—ওষুধ টষুধ খেয়েছিস কিছু? বমির জন্য?
—না।
—মধুদাকে দিয়ে আনাব?
—লাগবে না রে। আর একটু রেস্ট নিলেই ফিট হয়ে যাব।
—খাস নি তো কিছু নিশ্চয়ই? একটু শরবৎ টরবৎ করে দিতে বলব হোটেলে?
—না রে।
—কোল্ড ড্রিঙ্কস্ আনাব, খাবি?
—না রে। বন্দনা নাক কুঁচকোল,—ভাল্লাগছে না। —কিছু না খেলে আরও কাহিল হয়ে পড়বি কিন্তু।
—বললাম না, ভাল্লাগছে না!
জয়া চোখ পাকিয়ে তাকাল,—অ্যাই মেয়ে, কী তখন থেকে ভাল্লাগে না ভাল্লাগে না করছিস? ….মিত্রা যা. তো, অন্তুকে একবার ডেকে আন তো। ও না ধমকালে এ বেটি সিধে হবে না।
প্রায় স্তম্ভিত হয়েই ঘরে চলে এলাম আমি। মুখের কথা খসাতেই অন্তুদা আর পল্লব হন্তদন্ত হয়ে ও ঘরে গেল। শুভ্রদা শুয়ে আছে আমাদের বিছানায়, চোখ বুজে। নড়ল না। কেমন যেন অস্বস্তি লাগল আমার। গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম,
—টুটুল মধুদা গেল কোথায়?
শুভ্রদা তাকাল,—মধু টুটুলকে নিয়ে জলে নেমে গেছে। টুটুলের আর তর সইছিল না।
—এমা, একা মধুদার সঙ্গে ছেড়ে দিলেন?
—তো কী আছে? মধু খুব ভাল সাঁতার জানে।
—সমুদ্রে সাঁতার জানা তেমন কাজে লাগে না। টুটুল কোথায় কোন দিকে ছুটবে, মধুদা ভুসো মক্কার মতো তাকিয়ে থাকবে…..
—সে চান্স নেই। মধুকে ডিউটি অ্যালট করলে কদাচ ফাঁকি মারে না। টুটুলের হাত মধু ছাড়বেই না।
তবু আমার ভাল লাগল না। আর একজন কারুর অবশ্যই সঙ্গে যাওয়া উচিত ছিল। ব্যালকনিতে গিয়ে চোখ রাখলাম পাড়ে। ভিড় এখন বেড়ে গেছে খুব। এক জায়গায় অনেকটা নেমে গেছে বালিয়াড়ি, ওখানে কেউ থাকলে এখান থেকে দেখতে পাওয়া মুশকিল। যাক গে যাক, অন্তুদার মেয়ে, অন্তুদারই যখন মাথাব্যথা নেই….
শুভ্রদা কী যেন বলছে ঘর থেকে।
ফিরলাম ঘরে,—ডাকছেন, শুভ্রদা?
—ভাবছি আর স্নানে যাব না। তোমরাই চলে যাও। আমার এখন শুয়ে থাকতেই ভাল লাগছে!
—বেশ তো, থাকুন না। ভাল করে ঘুমিয়ে নিন, বিকেলে একদম ঝরঝরে হয়ে বেরোবেন।
ঘুম আর আসবে না। শুয়ে থাকাটুকুনই আরাম। বিশেষ করে তোমাদের এই বিছানাটায়।
—ওমা, সে কী কথা! কেন? কী এমন মহৎ গুণ আছে এই খাটের?
—আছে একটা গুণ। সুন্দর সুখী কালের গন্ধ লেগে আছে।
—যাহ্, কী যে বলেন না! হঠাৎ বুকে রক্ত চলকে উঠল আমার। অস্ফুটে বললাম, -পৃথিবীতে সব কাপল্ই সুখী, সব কাপল্ই অসুখী। সুখ অসুখ খুব রিলেটিভ ব্যাপার শুভ্রদা। আপনি যদি আপনাকে দুঃখী ভাবতে চান, তাহলে আপনি দুঃখী। আবার সুখী ভাবতে চাইলে সুখী।
—কী বলে রে মেয়েটা? পুলু যদি একটা অন্য মেয়ের সঙ্গে ভেগে যায়, তাহলেও তুমি একই কথা বলবে?
বাস্তবে কী ঘটলে কী করব বলা কঠিন। তবু সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বললাম, -পল্লবের যদি আমাকে পছন্দ না হয়, যদি না বনে, অন্য কোথাও যেতেই পারে। তা বলে আমি হাপুস নয়নে কাঁদতে বসব কেন? আমি যেমন আছি তেমনই থাকব। মনে করব যা ঘটার ছিল, তাই ঘটেছে।
—তুমি যে স্টোয়িক ফিলজফি আওড়াচ্ছ হে? বি এ-তে ফিলজফি কম্বিনেশান ছিল বুঝি?
হাসলাম,—বই পড়ে দর্শন আসে না শুভ্রদা। জীবন থেকেই আসে।
—হবে হয়তো। তবে দর্শনের কচকচিতে না গিয়ে বলতে পারি তোমাদের বিছানায় শুয়ে মনে হচ্ছে, এখানে হয়তো বহুদিন পর নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারব। অফকোর্স তোমার যদি আপত্তি না থাকে!
—ছি ছি, এ কী কথা। থাকুন না শুয়ে, আমি তো এখন সমুদ্রেই চলে যাব।
কথাটা বললাম বটে, তবু বুকটা কেমন যেন ঢিপঢিপ করে উঠল। কেন উঠল কে জানে! মায়া? করুণা? অন্য আর কী হবে?
সালোয়ার কামিজ নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। কাল রাতের শাড়িটাই পড়ে আছি এখনও, একেবারে ক্রাশড্ হয়ে গেছে। ড্রিঙ্কস্ ট্রিঙ্কসও পড়েছে, সাবানে ভিজিয়ে দেব? থাক গে, কলকাতায় গিয়ে লন্ড্রীতেই দিয়ে দেওয়া যাবে। স্নান সেরে ফিরে এ শাড়ি থোপাথুপির জোস থাকবে না। পল্লবকেও হুকুম করাটা ইনহিউম্যান হবে।
পোশাক বদলে তোয়ালে কাঁধে বোরয়েহ দেখি সত্যি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে শুভ্রদা। নিখাদ ঘুম। সমলয়ে নিশ্বাস পড়ছে।
বন্দনাকে দেখার অনেক লোক আছে, কিন্তু এই মানুষটাকে কে দেখে? একটু হাত বুলিয়ে দেব শুভ্রদার মাথায়?
চিন্তাটায় কি পাপ আছে কোনও? নাহলে কেন এগোতে পারছি না?
