সমুদ্র উত্তাল
সকালটা আজ বড় মলিন। কাল কোনার্ক থেকে ফেরার পরও আকাশ ভারি ঝকঝকে ছিল। কোথেকে এত কালো মেঘ এসে গেল কে জানে! ঝুঁকতে ঝুঁকতে মেঘ ছুঁয়ে ফেলেছে সমুদ্র, বাতাস থম মেরে গেছে। বৃষ্টি হবে কি? হলে বেশ হয়। অসময়ের বৃষ্টি বড় সুখের।
একটু আগে ওরা সবাই ব্রেকফাস্টে গেল। নীচের ডাইনিং হলে। জয়া যায় নি শুধু। টুটুলের নাকি শরীর খারাপ, গা ছ্যাঁকছ্যাক করছে, জয়া টুটুলের খাবার ঘরেই যাবে।
আমারও বিছানা ছেড়ে উঠতে একটুও ইচ্ছে করছে না। এ কি অবসাদ? আলস্য? জানি না। মাত্র কটা দিনে আমার সব কিছুই কেমন ওলট পালোট হয়ে গেল। অনুতোষ যেন মাতাল হাওয়ার মতো এসে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। মাতাল হাওয়া? না বসন্তের হাওয়া?
হ্যাঁ, বসন্তই। শুভ্রর সঙ্গে সম্পর্কটা তো এখন অনন্ত রুক্ষ শীত বই কিছু নয়।
আমি এখন কী করি? কী যে করি?
কী দেখে যে শুভ্রতে মজেছিলাম আমি? অনুতোষ তো পাশেই ছিল, কেন তাকে আগে চোখে পড়ে নি? অনুতোষ না, অন্তু অন্তু অন্তু….। ওই হল পুরুষ। পাহাড়ের মতো উদাস, শান্ত, গম্ভীর। জয়া সেদিন ভাবল আমি এমনি এমনি বলছি। ওরে বোকা মেয়ে, তুই সমুদ্রেই বিভোর থাক, পাহাড়ের মর্ম বোঝা তোর কম্মো নয়। মিত্রা ঠিকই বলেছে, শুভ্রর মতো ছ্যাবলার সঙ্গেই তোকে মানায় ভাল। জয়াকে অবশ্য আঘাত দিতে আমার খারাপ লাগছে। কী করি, পাহাড় যে নিজেই আমার কাছে চলে এল।
আকাশ পাতাল ভাবনা ঘুরছে মনে। ভাবনা, না সংশয়? অন্তুই কি আমার সত্যিকারের প্রেমিক? নাকি একটা প্যাশন? অথবা নিছকই মোহ? কিংবা বুকের শূন্যতাটুকু ভরানোর জন্য এক মুঠো কুড়িয়ে পাওয়া সুখ? বাঁচার জন্য আঁকড়ে ধরা খড়কুটো নয় তো? জয়াকে যতই উপহাস করি, অন্তু কি জয়াকে ছেড়ে আসবে কোনওদিন? কেন অন্তু বলল, আমার মন অত ছোট নয় বন্দনা, যে একজনকে ভালবেসেই ফুরিয়ে যাব? আমিই কি শুভ্রকে ছেড়ে যেতে পারব? সেই শুভ্র, যে আমার জন্য কেরিয়ার ভুলেছিল, জেদ ধরে আমার পড়াশুনো চালিয়েছে, রাতের পর রাত জেগে আমায় কম্পিটিটিভ পরীক্ষার জন্য তৈরি করেছে….! কাজটা কি নির্লজ্জ প্রতারণা হবে না? কোটা বেশি প্রতারণা? লুকিয়ে চুরিয়ে প্রেম? অথবা অতীতকে মুছে ফেলে নতুন একটা আশার পিছনে ছুটে যাওয়া? যার সঙ্গে বনে না, তার সঙ্গে বাস করাটাও তো তাকে ঠকানো।
আমার কী দোষ? আমি কি একাই বদলেছি, শুভ্র বদলায় নি? আমার পায়ে কাঁকড় ফুটবে বলে যে এক সময়ে মাটিতে নিজেকে বিছিয়ে দিত, সে এখন কোথায়? আস্ত একটা কমপ্লেক্সের ডিপো বনে গেছে। কথায় কথায় বলবে, আমার নাকি রূপের দেমাক! কী অহঙ্কারটা করি আমি? সুন্দর হয়ে জন্মানো কি অপরাধ? রাস্তাঘাটে লোকজন যদি আমায় চেয়ে দেখে, আমি কি তাদের চোখে খোঁচা দিয়ে অন্ধ করে দেব? সৌন্দর্যের স্তুতি কে না ভালবাসে? শুভ্রকে কোনও মেয়ে হ্যান্ডসাম বললে শুভ্র কি মুখ ফিরিয়ে নেবে?
আসল ব্যাপার হল, শুভ্রর মাথায় বদ্ধমূল ধারণা জন্মে গেছে সে আমার যোগ্য নয়। জন্মেছে, না ছিলই চিরকাল? আমি টের পাই নি? এক ছাদের নীচে, এক বিছানায় হাজার হাজার রাত কাটিয়েও নিকটতম মানুষের কত কিছু যে গোপন থেকে যায়! কী ছোট মন শুভ্রর! সেই বিয়ের আগে বাবা ওর সঙ্গে কী আচরণ করেছিল তা এখনও মনে পুষে রেখেছে! শুভ্রর বাবা মা আমার সঙ্গে কটা দিন ভাল মুখে কথা বলেছিল? কেন আমাদের আলাদা হয়ে যেতে হল? তার পরও তো শুভ্র ও বাড়ি যায়। যায় না? তাহলে?
একটা বাচ্চা হয়ে গেলে কি শুভ্র অনেক স্বাভাবিক থাকত? মনে হয় না। কত স্বামী স্ত্রীর তো সন্তান নেই, সেই সংসারের পুরুষরা কি শুভ্রর মতো খেঁকি কুকুর? ওইটুকু একটা ছেলে দীপু, নিজেরই পিসতুতো ভাই, তাকে নিয়ে পর্যন্ত….!
দড়াম করে দরজা খুলে গেল। শুভ্র।
টেরচা চোখে তাকাল বিছানার দিকে, এখনও শুয়ে আছ যে বড়?
উল্টো দিকে ফিরলাম। কথা বলার স্পৃহা নেই।
ঘুরে এসে সামনে বসল শুভ্র। সিগারেট ধরালো একটা, ইচ্ছে করে ধোঁয়া ছাড়ল মুখের ওপর। গন্ধটা আমার ভাল লাগে না জেনেও।
আবার উল্টো মুখে ঘুরতে যাচ্ছিলাম, শুভ্র কাঁধ চেপে ধরেছে,—হলটা কী? শরীর খারাপ?
—না।
—ব্রেকফাস্টে গেলে না কেন? পুলুরা অত করে ডেকে গেল!
—খাব না কিছু।
—কেন?
— ইচ্ছে।
—হুঁহু, তোমার তো সবই ইচ্ছে। শুভ্র দাঁত কিড়মিড় করে উঠল, — লীলা করবে, সেও ইচ্ছে। কেলি করবে, সেও ইচ্ছে….
কাঁধ থেকে ঠেলে সরিয়ে দিলাম শুভ্রর হাত। উঠে বসলাম। আজই একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক। সোজাসুজি চোখ রাখলাম শুভ্রর চোখে, কী বলতে চাও স্পষ্ট করে বলো।
—বলার বাকি কী আছে? চার দিকে তো ঢি ঢি ফেলে দিয়েছ।
—বেশ করেছি। তুমিই তো বউ বদলাবদলির খেলাটা খেলতে চেয়েছিলে? কেন চেয়েছিলে? সন্দেহটা যাচাই করতে? দ্যাখো এবার সন্দেহটা সত্যি হয়ে গেলে কেমন লাগে।
শুভ্র একটু যেন হকচকিয়ে গেল। সম্ভবত এমন পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। দু এক পল থমকে থেকে ফেটে পড়ল আবার, – বেহায়াপনার সাফাই গাইতে লজ্জা করে না তোমার?
—আমার কীসের লজ্জা? যার বউ বিয়ের ছ বছর পরেও অন্য পুরুষের সঙ্গে ভাবভালবাসা করে, লজ্জা তো পাবে সে।
—চোপ। চোপ। শুভ্ৰ আঙুল নাচাল,—একটা কথা নয়। জিভ ছিঁড়ে নেব। -হ্যাঁ, ওইটেই তো পারো। বন্ধুদের সামনে ভিজে বেড়ালটি হয়ে, ভালমানুষটি সেজে বসে থাকবে, আর বউকে ধরে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেবে, গায়ে হাত চালাবে, মুখ খারাপ করবে…। তুমি মানুষ?
—বটেই তো, বটেই তো। মানুষ তো এখন তোমার কাছে একজনই
—অবশ্যই। তুমি তার নখের যোগ্যও নও। রাগের মুহূর্তেই মাথাটা হঠাৎ অদ্ভুত রকম শান্ত হয়ে গেল আমার। হিম গলায় বললাম, ——বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায় বলছি শুনে নাও। হ্যাঁ, আমি এখন অন্তুকেই ভালবাসি, তোমাকে নয়। আমার চোখে এখন একমাত্র অন্তই মানুষ। তুমি শুধু একটা মৃত প্রেমিক। আমি আর তোমাকে একটুও ভয় পাই না। তুমি আমার জীবন থেকে মুছে গেলে আমি শান্তি পাব।
শুভ্র স্থির মুখে কথাগুলো শুনল। পলকের জন্য দপ করে জ্বলে উঠল চোখ, পলকে মণি নিবে গেল। আধপোড়া সিগারেট গুঁজে দিল ছাইদানে, চেপে চেপে ঘষল। ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে আমার দিকে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুরিয়ে নিচ্ছে মুখ। উঠে ব্যালকনিতে গিয়ে বসল, আবার একটা সিগারেট ধরিয়েছে, আবার একটা….। নিঃশব্দে ঢুকে গেল বাথরুমে, মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সমুদ্রস্নানের পোশাক পরে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে
আহ্, মুক্তি। বুকটা অনেক হাল্কা লাগছে এখন, মাথার ঝিমঝিম ভাবও যেন চলে গেছে সহসা। গোটা ট্যুরে এক সেকেন্ডের জন্যও শরীর এমন ঝরঝরে লাগে নি। মনের আগল খুলতে পারলে এত আরাম হয়!
বিছানা ছেড়ে আয়নার সামনে এলাম। চোখের নীচে এখনও ঘন কালি। সব মালিন্য মুছে ফেলতে হবে, সব। পুরীতে অদ্যই শেষ রজনী, তারে-না-না করে কাটিয়ে দিতে হবে দিনটা। কলকাতা ফিরেই চরম সিদ্ধান্তটা নিয়ে নেব। বাপের বাড়ি যাওয়ার আর মুখ নেই, অন্তুর সঙ্গে সম্পর্কটাও ওরা খোলা মনে মানবে না। যা মাইনে পাই তাতে একটা ঘর টর জুটবে না? নিদেনপক্ষে কোনও মেয়েদের হোস্টেল ফোস্টেল?
জিভটা কটে মেরে আছে। সকাল থেকে মুখ পর্যন্ত ধোওয়া হয়নি। ব্রাশে পেস্ট লাগাচ্ছি, মিত্রা এল ঘরে।
—কী রে, আবার শরীর আপসেট্?
—না না। ঠিক আছি তো।
—শুভ্রদা যে বলল তোর পেট কন্ করছে? কী ওষুধ খাওয়ানো যায় অন্তুদাকে জিজ্ঞেস করছিল…..
ঢঙ্। শুভ্রকে অ্যাক্টিং-এ একশোয় একশো দেওয়া উচিত। পারলে অন্তুকে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলে, এদিকে সামনাসামনি গলাগলি বন্ধুত্বের ভাণ! ভণ্ড একটা, আদ্যন্ত মুখোশ পরা মানুষ।
বিরক্তি চেপে আলগা হাসলাম,—তেমন কিছু নয়। স্টমাকটাকে সকালে একটু রেস্ট দিলাম।
—ও। সমুদ্রে যাবি না?
—সবাই চলে গেছে?
—যাচ্ছে। মোটামুটি রেডি। জয়াটা যেতে চাইছিল না, টুটুল এমন বায়না ধরল….
—টুটুলের জ্বর এসেছে না?
—জ্বর নেই। ওই একটু সর্দি, নাক ফোঁচফোঁচ….জয়া মেয়ে নিয়ে সমুদ্রের ধারে বসে থাকবে। ….নে নে, ঝটপট তৈরি হয়ে নে।
—এক সেকেন্ড।
দ্রুত শাড়ি ছেড়ে সালোয়ার কামিজে মুড়ে নিলাম নিজেকে। ইচ্ছে নেই, তবু যদি নামি সমুদ্রে! অন্তু ডাকলে কি না বলতে পারব?
সবাই সমুদ্রে চলে গেছে। কথা বলতে বলতে এগোচ্ছি আমি আর মিত্রা। টুকটাক কথা। মিত্রাই বলছে বেশি, আমি শুধু হুঁ হাঁ করছি। মিত্রার একটা সম্বলপুরী শাড়ি কেনার শখ, এখানে কি তেমন সস্তা হবে? কোথায় একটা হাতির দাঁতের বাক্স দেখেছে, চোখ ফেরানো যায় না, আজ সেটা বগলদাবা করবেই। পল্লব একটু হাঁ হাঁ করবে, তা করুক, মিত্রা আমল দেবে না। পোড়োপিঠেও নেবে মিত্রা, শ্বশুরের জন্য। শ্বশুর নাকি খুব মিষ্টি ভালবাসে। শাশুড়ির জন্য কটূকি চাদর কি খারাপ হবে?
কথার মাঝেই সমুদ্রে চোখ পড়ল। কী বড় বড় ঢেউ রে বাবা আজ! পূর্ণিমা অমাবস্যা কিছুই তো নয় এখন, শুধু মেঘ দেখেই এমন ফুঁসছে সমুদ্র? আকাশের রঙ সত্যিই এখন ঘন কালো, ঝড় বৃষ্টি একটা নামতেই পারে।
পল্লবদা মিত্রাকে নিয়ে জলে নেমে গেল। দু হাতে ঢেউকে আদর করতে করতে ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে। শুভ্র অন্তু কিছুটা দূরে, লড়াই করছে সমুদ্রের সঙ্গে। মধুদা টুটুলকে কোলে নিয়ে পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করল।
জয়ার পাশে গিয়ে বসলাম, আজ সমুদ্র কী ভয়ঙ্কর হয়ে আছে দেখেছিস?
জয়া ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখল আমাকে। মুখে আকাশের ছায়া। কিছু না বলে ম্লান হাসল একটু, চোখ নামিয়ে নিল।
কাল সকাল থেকেই জয়া বড় চুপচাপ। ফেরার পথে বাসে মেয়েকে আঁকড়ে চোখ বুজে বসে রইল, বিকেলে কোথাও বেরোল না, এমনকি মার্কেটিং-এর প্রলোভনেও না। শুধুই মেয়ের শরীর নিয়ে উদ্বেগ? নাকি আঁচ করেছে কিছু? কোনার্কে কিছু দেখে নি নিশ্চয়ই। অন্তু তো বলল জয়া ঘুমোনোর পরই সে এসেছে রুম ছেড়ে। জানলে জানবে। একদিন তো সব মেনে নিতেই হবে, এখন থেকে মনকে প্রস্তুত রাখা ভাল।
পা ছড়িয়ে আধশোওয়া হলাম,—এরকম রাফ চেহারা দেখেও তোর সমুদ্রকে ভাল লাগে জয়া?
—লাগে। জয়া বিচিত্র চোখে তাকাল, —পাহাড়কেও দূর থেকে যত শান্ত দেখায়, কাছে গেলে পাহাড় তত শান্ত নয়। সেখানেও বরফের ঝড় ওঠে, বীভৎস ধস নামে।
জয়া কি ইঙ্গিত করল কিছু? চটজলদি জবাব এল না মুখে।
আবার কী একটা বলার জন্য মুখ ঘোরাল জয়া, তার আগেই পল্লবদা মিত্ৰা হাঁই হাঁই করতে জল থেকে উঠে এসেছে।
পল্লবদা ধপাস করে বসে পড়ল। দম নিচ্ছে, কাশছে খকখক। থু থু করল বালিতে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,—আইব্বাস্, কী ধাক্কা রে! কোমর একেবারে বেঁকে গেল।
মিত্রার কোমরে হাত। হাসছে,—কিচ্ছু হয় নি। ঠিক ঢেউ ভাঙার সময়ে ডুব না দিলে ওরকমই হয়। চলো চলো, আবার চলো।
—অসম্ভব। আমি আর নামছি না।
—ভীতুর ডিম কোথাকার। ….অ্যাই বন্দনা, তুই যাবি?
—হ্যাহ্, বন্দনা যাবে! সমুদ্রে গর্জন তেল ফেলে দিলেও বন্দনা নামবে না, আই বেট।
—জয়া, তুই?
—না রে, আমাকে বাদ দে।
—তাহলে তুমি আমাকে একটা নুলিয়া ফিট করে দাও।
—নুলিয়া? খবরদার। পল্লবদার মুখে ছদ্ম ত্রাস, ঠিক আছে, আমিই নয় একটু পরে নামব। খানিকটা রেস্ট নিয়ে নিই।
মিত্রা ঝুপ করে পাশে বসে চিমটি কাটল পল্লবদাকে,—অ্যাই মশাই, নুলিয়াতে তোমার এত আপত্তি কেন? একদম এম সি পি-পনা করবে না।
পল্লব দু হাতে কান ধরল,– আমি এম সি পি নই ম্যাডাম। বড় জোর আমাকে ডব্লিউ ও এল বলতে পারো।
—সেটা কী?
—ওয়াই ওবিডিয়েন্ট ল্যাম্ব। যাকে বলে বউ-এর মেড়া।
খিলখিলিয়ে হেসে উঠলাম। জয়ার ঠোঁটও ফাঁক হয়েছে সামান্য। মিত্ৰা কিন্তু গলল না। বলল,—অ্যাই, কথা ঘোরাবে না, কথা ঘোরাবে না।
—আরে বাবা, তোমার ভালর জন্যই তো বলছি। তোমার ওই সোনার বরণ নুলিয়ার ছোঁয়ায় যদি কালো মেরে যায়, আমি সইতে পারব না।
—নেকু। মিত্রাও এবার হেসে কুটিপাটি,—দেখেছিস তোরা, কী জালি লোক? টুপি দিয়ে কেস লাইট করছে।
ভাষা বটে! বিয়ের আগে কি রকে বসত মিত্ৰা?
অন্তুও জল ছেড়ে উঠে এসেছে। থেবড়ে বসে পড়ল জয়ার পাশে, কী এত হাসি চলছে তোমাদের?
—তোকে শুনতে হবে না। গ্যাঙ লিডার হয়েছিস, একটু রিফ্রেশমেন্টের আয়োজন কর। ডাব কোথায়, অ্যাঁ?
অন্তু বুঝদারের মতো ঘাড় নাড়ল, —হ্যাঁ ডাব তো চাই। নইলে এই ছোটলোকের মতো সমুদ্রটার সঙ্গে যোঝা যাবে না। ….মধুউ, অ্যাই মধুউ….
মধুদা অনেকটা দূরে। বালি দিয়ে কী একটা বানাচ্ছে, প্রাসাদ টাসাদ বোধ হয়। টুটুল মুগ্ধ চোখে দেখছে সেই বোকামি, অদক্ষ রাজমিস্ত্রির মতো হাতও লাগাচ্ছে মাঝে মাঝে।
হাঁকাহাঁকিতে দুজনেই ছুটে এল। ডাবের নাম শুনেই টুটুলের চোখ বড় বড়, ভেতরের শাঁস খেতে সে বেজায় ভালবাসে, প্রায় আইসক্রিমের মতোই পাকলে পাকলে খায়।
মধুদার ডাকে ডাবঅলা হাজির। ছুলে ছুলে এগিয়ে দিচ্ছে ডাব, স্ট্র সমেত। নোতা মিষ্টি জল বেশ লাগছে খালি পেটে। সামনেই স্নানার্থীদের ভিড়, তাদের টপকে হঠাৎ চোখ গেল দূরে। একটা মানুষ অনেকটা ভেতরে চলে গেছে, বিশাল বিশাল ঢেউগুলোর ওপারে। সাঁতারু? না তো, লোকটা কেমন ডুবছে আর ভাসছে! একটা হাত জলের ওপর একবার ভেসে উঠল! আর তো দেখা যাচ্ছে না!
বুকটা কেন যেন ধক করে উঠল। পাগলের মতো চোখ ঘোরাচ্ছি, শুভ্রকে তো দেখা যাচ্ছে না কোথাও!
আরেক বার উঠল হাতটা! শুধু হাত!
চিৎকার করে উঠলাম,—অন্তুদা, পুলুদা, শুভ্র কোথায়?
—এই তো ওদিকটায় ছিল।
—না, নেই। ও ডুবে যাচ্ছে। ওই যে, ওখানে, ওখানে…..
কে যেন আমায় ধাক্কা দিয়ে ঠেলে তুলল। জ্ঞানহারার মতো ছুটেছি সমুদ্রের দিকে। জল ভুলে, ঢেউ ভুলে, সব ভুলে। লোকজনরাও চমকে গেছে খুব। চেঁচামেচি করে ডাকছে নুলিয়াদের।
মধুদা আমায় এসে টেনে ধরল। অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে সব কিছু, অন্ধকার….
.
হাসপাতালে করিডোরে বসে আছি নিথর। বুক ভেঙে কান্না আসছে, অথচ চোখে আর এক ফোঁটা জলও নেই। এ কী হয়ে গেল? এই রকমই কি আমি চেয়েছিলাম? কক্ষনো না, কক্ষনো না।
ওদিকের বেঞ্চে শুকনো মুখে মধুদা। অনুতোষদা আর পল্লবদা পায়চারি করছে পর্দা টাঙানো কেবিনটার সামনে। সবুজ পর্দা লাল সংকেত হয়ে দুলছে। জল তো সমুদ্রের পাড়েই বার করে দিয়েছে নুলিয়ারা, এখনও জ্ঞান ফিরছে না কেন শুভ্রর?
শুভ্র কি মরে যাবে? আমার জন্য? মাগোঃ।
চিন্তাটা অসাড় করে দিচ্ছে আমাকে, ছেড়ে যাচ্ছে হাত পা। শুকনো টাগরায় জিভ বোলাচ্ছি, জিভও এখন ব্লটিং পেপার, আরও শুকিয়ে যাচ্ছে মুখ। অনুতোষদা এসে কী যেন বলল মধুদাকে, জোরে জোরে দু দিকে মাথা নাড়ছে মধুদা। থম মেরে একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল অনুতোষদা, এবার পায়ে পায়ে আমার দিকে।
সামনে এসে মৃদু স্বরে বলল, —কতক্ষণ এভাবে ঠায় বসে থাকবে? …..দুপুরে তো খাওয়া দাওয়াও হল না, একটু চা টা দেখব নাকি?
— না।
—একদম খালি পেটে থাকলে তুমিও যে অসুস্থ হয়ে পড়বে।
—আমি পারব না অনুতোষদা। এখন আমার গলা দিয়ে কিছু নামবে না। —নাথিং টু ওরি। শ্বাসনালিতে জল চলে গেছে, তাই একটু কম্প্লিকেশান….ঠিক হয়ে যাবে।
—সান্ত্বনা দিচ্ছেন? আমি জানি, ও আর ফিরবে না।
—আহ্, অশুভ কথা বলতে নেই।
—শুভ্র আমায় শাস্তি দিল অনুতোষদা। ….শুভ্র বড় অভিমান নিয়ে….. —আহ্, থামবে তুমি? কী তখন থেকে বার বার এক কথা বলছ? ওকে না নিয়ে আমি কি কলকাতায় ফিরতে পারব?
অনুতোষদার স্বরে যন্ত্রণা। মাথা নীচু করে চলে গেল। পল্লবদার পাশে বসেছে।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা। দমকা বাতাস উড়ে এল একটা। ঠাণ্ডা বাতাস, হাড় কেঁপে গেল। চোখ বুজে ফেললাম। ধেয়ে আসছে একের পর এক দৃশ্য। কলেজ গ্রাউন্ডে ক্রিকেট ম্যাচ চলছে, বাউন্ডারি মেরে পঞ্চাশে পৌঁছল শুভ্র। ব্যাট তুলেছে, আমারই দিকে। বিয়ের আসরে মন্ত্র পড়তে পড়তে পা দিয়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। কানের কাছে ফিসফিস করল, আর তোমার বাতাসী বিবি হওয়া হল না। রানীক্ষেতে গিয়ে পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে গলার শির ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছে, বন্দনা… বন্দনা… বন্দনা…। আহ্, অত চিল্লাচ্ছ কেন? …চেঁচাব, চেঁচাব, বাতাসের প্রতিটি তরঙ্গে তোমার নাম আমি মিশিয়ে দেব…..
সম্পর্ক যদি গড়েই ওঠে, তবে কেন তা ভেঙে যায়? কোন্ ছিদ্র দিয়ে ঢোকে বিষকীট? কোটা সত্যি? তিলতিল করে গড়ে ওঠা, না মুহূর্তে ভেঙে যাওয়া?
এই সময়ে সুখের স্মৃতিই শুধু মনে পড়ে কেন? কষ্টকে কেন আরও বাড়িয়ে দেয়?
—বন্দনা, এই বন্দনা?
—উঁ? চমকে তাকালাম।
—ওঠো। এসো।
—কেন? গলা দিয়ে আর্তনাদ ঠিকরে এল।
—আরে না, নার্ভাস হোয়ো না। পল্লবদা হাসল, –ক্রাইসিস কেটে গেছে। এই মাত্র ডাক্তার এসেছিল। শুভ্রর পালস্ রেট অনেক ইমপ্রুভ করেছে। লাঙস্ টাঙও ক্লিয়ার।
সমস্ত রক্তকণিকা চঞ্চল হয়ে ছুটতে শুরু করল। তড়াং করে লাফিয়ে উঠলাম,—আমি শুভ্রর কাছে যাব। এক্ষুনি।
—যাও।….তবে বেশি কথা বোলো না। খুব উইক আছে। আমরা তো দাঁড়িয়েই চলে এলাম।
আর্ত হরিণীর মতো ঢুকেছি কেবিনে। বিছানার পাশে এসে পা থেমে গেল। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় কী চেহারা হয়েছে শুভ্রর! নির্জীব চোখ, রক্তহীন মুখ, কেমন নেতিয়ে পড়ে আছে অসহায়।
আমাকে দেখেও চোখ উজ্জ্বল হল না। ক্ষীণ স্বর শুধু বলল,—বিশ্বাস করো, আমি বাঁচতে চাই নি।
আর থাকতে পারলাম না। বাঁধ ভাঙা বন্যার মতো আছড়ে পড়েছি বুকে। একই কথা বিড়বিড় করে চলেছি,– আমায় তুমি মারো মারো মারো, মেরে ফ্যালো।
শুভ্রর চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল। হাত রেখেছে আমার পিঠে। এতক্ষণে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল।
