একা একা শুভ্র
শালা, কিছুতেই আমি মাতাল হতে পারি না! যত ভাবি নেশায় চুরচুর হয়ে যাব, নেশা শালা তত আমাকে বুড়ো আঙুল দেখায়! লোকে বলে মদ খেয়ে নাকি দুঃখ যন্ত্রণা ভুলে থাকা যায়! বকোয়াস, বকোয়াস, অল বকোয়াস। দেওদাসটা শালা পুরো ঢপ কেস ছিল। এই তো আমিই তিন চার পেগ টানার পরেও দিব্যি সজ্ঞানে বসে আছি! কোথায় নেশা? কোথায় নেশা? অ্যাই নেশা, তুই কোথায় রে?
আমি রোজ রোজ মাল খাই না। রেস্ত কোথায় অত, তাহলে তো ব্যাঙ্কের ক্যাশটা ভাঙতে হয়। ভালও লাগে না তেমন। ওই বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায় পড়ে মাঝেমধ্যে খেলাম, ব্যস্। তবে হ্যাঁ, যখন খাই তখন চুটিয়ে খাই। যাকে বলে দিল খোলকে। ওই অন্তুটার মতো খুচখুচ একটু খেলাম, পৌনে এক পেগ, ওটা আমার ধাতে নেই। কিন্তু আমার ব্রেনের কেসটা বেশ গড়বড়ে আছে। খেয়ে কোথায় ঝিম মারব, টলমল করব, তা নয়, ব্রেনসেলগুলো যেন আরও টনকো হয়ে ওঠে। কত কিছু যে স্পষ্ট হয়ে যায় তখন! ঘূণাক্ষরেও যা স্মৃতিতে নেই, তাও। সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো উচিত?
বন্দনা মাল খাওয়া একদম পছন্দ করে না। ওর বাপটা, মানে আমার পূজ্যপাদ শ্বশুর টানুস টুনুস একটু বেশি করতেন বলেই বোধহয় ওই বস্তুটির ওপর ওর তীব্র অনীহা। খেয়ে শাশুড়িকে পেটাতেন কি? হতেও পারে। ওই বজ্জাত মেয়েছেলেটাকে দু’ চার ঘা দেওয়াই উচিত। সজ্ঞানে না হলেও, অজ্ঞানে। শালী আমার বিয়েটাই কাঁচিয়ে দিচ্ছিল!
ওই মায়েরই যে মেয়ে বন্দনা তা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। জিদ্দি, বেশি নীতিবাগীশ, দেমাকি….। কী সিটাই না করেছিল দার্জিলিঙে! অফিসের বন্ধুরা দশ পনেরো জন মিলে গেছি, এক দিনও কি আমোদ ফূর্তি করে বেচাল হতে নেই? জানুয়ারির ঠাণ্ডায় পাহাড়ে একটু উষ্ণ পানীয় লাগবে না? গোটা রাত বিছানাতেই এল না বন্দনা, ওই কনকনে শীতে ঠায় ব্যালকনিতে বসে রইল! কী, না আই হেট ড্রাঙ্কাৰ্ডস্! অন্তর ফার্স্ট ম্যারেজ অ্যানিভারসারিতে কী ইনসাল্টটাই না করল! ক’ পেগই বা খেয়েছি, বড় জোর দুই কি তিন, তাতেই নবাবনন্দিনীর কী মেজাজ! সকলের সামনে! গটগট করে অন্তুর বাড়ি থেকে স্ট্রেট বাপের বাড়ি চলে গেল। আজকাল চোদ্দ বছরের ছেলেরাও মাল খেয়ে উল্টে পড়ে থাকছে, আর আমি একজন ম্যারেড ম্যান উইথ অ্যাকটিভ হ্যাবিটস, আমি একটু সুরা পান করব না? বেশ করব খাব। বন্দনা যা যা ডিসলাইক করে সবগুলোই করব। বন্দনা করে না? কত বার বারণ করেছি, হুটহাট বাপের বাড়ি ছুটবে না, কথা শোনে বন্দনা? যে শ্বশুর শাশুড়ি দায়ে পড়ে ঢেঁকি গিলেছিল, যারা এখনও জামাইকে মন থেকে মেনে নিতে পারে নি, জামাই গেলে মৌনী বাবা মৌনী মা হয়ে যায়, কিম্বা ড্যাবড্যাব করে অনন্ত টিভি গিলতে থাকে, জামাইকে আদর করে দুটো কথা বলার ফুরসৎ পায় না, তাদের কাছে সপ্তাহে তিন বার করে ছোটা কি শুভ্র ব্যানার্জিকে ইনসাল্ট করা নয়? কী সব অজুহাত! বাবা একটু . কেশেছিল যে! মা হেঁচেছিল যে! নেকু। শুভ্র জ্বরে পড়ে ভুল বকলেও অফিস কামাই করে বন্দনা? কী এত মধু অফিসে, অ্যাঁ? চাকরি তো করিস গভর্নমেন্টে, একদিন না গেলে সরকার কি উল্টে যাবে?
কান্না পাচ্ছে হঠাৎ। বন্দনা এমন পাল্টে গেল কেন? বাচ্চা কাচ্চা না হওয়ার জন্য? ডাক্তার তো বাবা দুজনেই দেখিয়েছি! নিজের কানে শুনেছে ডাক্তার বলেছে আমার কোনও দোষ নেই! বরং যেটুকু প্রবলেম, বন্দনারই। ট্রিটমেন্ট করালে ঠিক হয়ে যাবে। তাহলে? দেয়ার মাস্ট বি সাম থার্ড ম্যান! ব্যাঙ্কের এক পেটি ক্যাশিয়ারে বন্দনা আর হ্যাপি নয়, ওর চোখ আরও উঁচুতে কোথাও।
হাহ্, এখন তো এসব ভাবনা আসতেই পারে বন্দনার। এই শুভ্র ব্যানার্জি কার জন্য নিজের কেরিয়ারকে দু’ হাতে পিষে ফেলেছিল, তা বন্দনার মনে রাখার কী দায়! হয়তো এখন হাওড়ার সেই কাপড়ের দোকানদারের ছেলেটার জন্য মনে মনে আপশোস করে। বন্দনার অত রূপ বোধহয় ওই বাতাসী মঞ্জিলেই মানাত।
থার্ড ম্যানটা আর কে হতে পারে? অন্তু? ওকে বন্দনা সিডিউস করার চেষ্টা করছে বটে, কিন্তু সুবিধে হবে না। অন্তু ইজ আ টাফ গাই। কী ন্যাকার ন্যাকাটাই না হয়েছে বন্দনা! জলকে আমার ভয় করে বলেই অন্তুকে জড়িয়ে নাচতে নাচতে সমুদ্রে নেমে গেল! মুখে তখন হাজার বাতির আলো। ইয়া এক ঢেউ এসে ভেঙে পড়ল অঙ্ক বন্দনার মাথায়, অন্তুকে জড়িয়ে ধরার জন্য বন্দনার তখন কী নির্লজ্জ আকুতি। হুঁ হুঁ বাবা, এই জন্য অন্তু বাড়িতে এলে মহারানি এত খুশি খুশি হয়ে ওঠেন! ওরে, অন্তু তোকে পাত্তা দেবে না। খুব শিক্ষা দিয়েছে আজ অন্তু, জলেই নামে নি। তাই কি মহারানি গুম আজ?
গেল কোথায় মেয়েরা? মার্কেটিং? আসে না কেন এখনও? মধুকে যখন সঙ্গে নিয়ে গেছে, তাইই হবে। প্যাকেট ট্যাকেট বয়ে আনার একটা লোক চাই তো।
—কী রে, গ্লাসটা শেষ কর। এমন ব্যোম মেরে গেলি কেন?
খিকখিক হাসলাম,—আমি এখন ব্যোমে আছি।
—শালা, তুই আউট হয়ে গেছিস।
—নট অ্যাট অল। ভাংরা নেচে দেখাব? কিম্বা বল ড্যান্স? স্টেডি পা পড়বে।
অন্তু বিছানায় হেলান দিয়ে বসেছে, হাতে সিগারেট। ঠাণ্ডা গলায় বলল,–থাক, কেরামতি দেখাতে হবে না। তাড়াতাড়ি গ্লাস শেষ কর, জয়ারা ফিরলে ডিনারে যাব।
—এত তাড়াতাড়ি তো শেষ হবে না চাঁদু। চোখ টিপলাম, বাকি বোতলটার তাহলে কী হবে, অ্যাঁ?
—আর বোতল কোথথেকে আসবে? অন্তুর চোখে অবিমিশ্র বিস্ময়।
—আছে আছে। বলতে বলতে উঠলাম আমি। হোটেলের বেঁটে দেরাজ থেকে ওল্ড মংকের বড় বোতলটা বার করে আনলাম। অন্তুর নাকের সামনে নাড়িয়ে বললাম, – দিস ইজ দা থিং।
পুলু প্রায় আঁতকে উঠেছে,–এই শুভ্র, এটা কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। হুইস্কির পর রাম!
—একটু রাম নাম ছাড়া জমে? খেতে খেতে কেত্তন গাইব….
অন্তু কড়া চোখে তাকাল,—কিনলি কখন রে ওটা? সারাক্ষণ তো তুই আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ছিলি!
— ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। বোতল টেবিলে রেখে সিগারেট ধরালাম,—হোটেলের বেয়ারাগুলো আছে কী করতে!
পুলু হেসে ফেলল,—পারিসও বটে।
গ্লাসের তলানিটুকু ঢেলে দিলাম গলায়। সোনালি পানীয় তরল আগুন হয়ে প্রবেশ করছে ভেতরে, স্নায়ু আরও টান টান হল। অন্তু কেন জলে নামল না, আজ? বন্দনাকে এড়াতে চাইছে? অন্তু যদি সে লোকটা না হয় তাহলে হু ইজ দা থার্ড ম্যান? দীপু খুব ঘন ঘন আসছে বাড়িতে, সে ব্যাটা নয় তো? সাত জন্মে কোনও সম্পর্ক ছিল না, শিলিগুড়ি থেকে বদলি হয়ে এসেই তোর মামাতো দাদার ওপর এত ভালবাসা উথলে উঠল? ব্যাটা চাকরিটাও করে জব্বর, হাজার বিশেক তো পায়ই। আমাদের ম্যারেজ অ্যানিভারসারিতে অবলীলায় একটা দামী কাঁথাস্টিচ প্রেজেন্ট করল বন্দনাকে। কী মুগ্ধ চোখে বন্দনার দিকে তাকিয়ে থাকে!
দরজায় শব্দ।
পুলু উঠে ছিটকিনি খুলে দিল। মিত্রা বন্দনা ঢুকেছে ঘরে, পিছনে মধু।
মিত্রা জোরে জোরে নাক টানল,—বাপস্ কী গন্ধ ঘরে! তোমরা শুরু করে দিয়েছ?
—শুরু কী গো! আমরা এখন মাঝদরিয়ায়।
—ওমা, কী মজা! মিত্রার চোখ পড়েছে সেন্টার টেবিলের বড় বোতলটায়,–এই শুভ্রদা, আমরাও একটু খাব।
বন্দনার কপালে বাষট্টিটা বিরক্তির ভাঁজ। গোমড়া গলায় বলল, — আমি ও সবের মধ্যে নেই।
ন্যাকামো। স্বামীর বন্ধুদের সামনে সতীপনার ভিডিও ক্যাসেট চালাচ্ছে আবার। কাল রাতে আরেকটু দাওয়াই দেওয়া উচিত ছিল।
বন্দনাকে তাতানোর জন্য হা-হা হাসলাম,—নিশ্চয়ই খাবে। তোমাদের জন্যই তো এখনও বোতলটা খুলি নি।
মধুময়ের হাতে যা ভেবেছিলাম তাই, ইয়া ইয়া দুটো প্লাস্টিক ব্যাগ। জানি ওটা উপুড় করলে কী কী বেরোবে। মোষের শিঙের শোপিস, হরিণের চামড়ার চটি, কটূকি শাড়ি, বাগায়রা বাগয়রা। আজ পর্যন্ত কোনও মেয়েকে আমি পুরী এসে এ সব না কিনে ফিরতে দেখিনি। আজই কি আর মার্কেটিং শেষ! কাল আছে, পরশু আছে….
অন্তু জিজ্ঞাসা করল, —জয়া কোথায়? রুমে গেল?
—না, ডাইনিং হলে। টুটুল ঢুলছিল খুব। ওকে খাইয়ে ঘুম পাড়াতে নিয়ে যাবে।
মিত্রা বোতলটা হাতে তুলে লেবেল দেখছে। ভুরু বেঁকিয়ে বলল, এটা কিন্তু খুব কড়া। আমি জানি।
বন্দনা বাঁকা সুরে বলল,—তুই তো অনেক কিছুই জানিস রে মিত্রা!
—না জানার কী আছে! আমি তো কত বার টেস্ট করেছি। জামাইবাবুরা খাইয়েছে, কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে খেয়েছি….
—ভাল লাগে ওসব?
—মন্দ কী! কী দারুণ একটা ঘোর আসে, আলোগুলো আবছা আবছা লাগে, পা যেখানে ফেলতে চাইছি সেখানে পড়ছে না…..কী মজা যে লাগে! তুই খাস নি কোনওদিন?
বন্দনার মুখ আরও থমথমে। উত্তর না দিয়ে ঝাঁঝাল গলায় বলল, এত সব কি আগে থেকেই কেনা ছিল?
মধু তড়িঘড়ি বলে উঠল,—আমি আনি নি। বিশ্বাস করো।
—কে বলেছে আপনি এনেছেন? বন্দনা খেঁকিয়ে উঠল,—সব দোষ নিজের ঘাড়ে নেন কেন?
মধু আরও সিঁটিয়ে গেল। বেচারা মেয়েদের ভীষণ ভয় পায়। জানে, ওর কপালে কোনও মেয়ে জুটবে না কোনওদিন। তার জন্য মধুর কি কষ্ট আছে? ওরে মধু, তুই আমাদের মধ্যে সব চেয়ে বেশি ভাগ্যবান। তুই ভাবতে পারিস কম, এ এক ঈশ্বরের আশীর্বাদ।
পুলু বলল,—তাহলে আর দেরি করে লাভ কি? বোতলটা খুলে ফেলি? ….নাকি জয়ার জন্য একটুখানি ওয়েট করব?
অন্তু বলল,—জয়া কি রাম খাবে? বিয়ার হলে একটু টেস্ট ফেস্ট করত।
—আপনি তো খাবেন, তাই না? বন্দনা ঝট করে অন্তুর দিকে তাকিয়েছে। গলায় শ্লেষ।
অন্তু মুখ ফিরিয়ে নিল,—খাই একটু। এক যাত্রায় পৃথক ফল হলে আড্ডার সুর কেটে যায়। ….তুমিও আজ একটু টেস্ট করে দ্যাখো না। বি স্পোর্টিং
আশ্চর্য, বন্দনা ফেটে পড়ল না, বরং জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো শান্ত হয়ে গেল সহসা। শুকনো হেসে বলল,—বেশ তো, খাব। মাতলামি করাকেই যদি আনন্দ বলা হয়, তবে নয় মাতালই হব।
রাগ দেখাচ্ছে বন্দনা? অভিমান? নাকি এ আমাকেই কটাক্ষ? কবে আমি মাতলামি করেছি, অ্যাঁ?
পুলু বোতল খুলে ফেলেছে। গ্লাসে গ্লাসে ঢালছে কালচে সুরা। মধুর হাতে জলের জগ, পর পর গ্লাসে জল মিশিয়ে দিল। কুণ্ঠিত মুখে।
বন্দনা জল টল মেশাল না। হাতের ইশারায় বারণ করল। সত্যি সত্যি নিট খাবে নাকি? সহ্য করতে পারবে না যে! বাধা দেব? তাহলে যদি উল্টো…?
দরজায় আবার গুমগুম শব্দ। জয়া এল কি? হ্যাঁ, জয়াই। সরল চোখে ফ্যালফ্যাল তাকাচ্ছে সবার দিকে।
আহা, মেয়েটা ঢুকতেই গোটা ঘর যেন বদলে গেল। কী টলটলে চোখ মেয়েটার! কী একটা গান আছে না, চোখই মনের আয়না, না কী যেন? গায়ের রঙ সামান্য চাপা বটে, তবু ওই শ্যামলা রঙেই ওকে মানায় বেশি। বন্দনার মতো উদ্ধত দুর্বিনীত রূপ নেই জয়ার। জয়া যেন স্নিগ্ধ চাঁদের মায়া।
একটা গ্লাস বাড়িয়ে দিলাম জয়ার দিকে,—চলবে?
জয়া ভীতু ভীতু লাজুক লাজুক চোখে অন্তুর দিকে তাকাল,—ভাত খেয়ে এসেছি, এখন এ সব ….?
—একটা সিপ দাওঁ।
অন্তু দায়িত্বশীল স্বামীর মতো বলল,—ওকে আলাদা দিতে হবে না। আমার থেকেই চুমুক দিয়ে নেবে।
বন্দনা টেরচা চোখে এক মুহূর্ত দেখল অন্তুকে। পরমুহূর্তে এক ঢোকে গ্লাস শেষ। মুখটা বিকৃত হয়ে গেছে ‘বন্দনার, জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে। আবার গ্লাস বাড়িয়ে দিল পুলুর দিকে, নেক্সট?
মুখ ফিরিয়ে নিলাম। মস্তিষ্ক এখন স্বচ্ছ রাখা দরকার। মিত্রার দিকে চোখ পড়ল। মিথ্যে চালবাজি মারে নি, ভালই অভ্যেস আছে মনে হয়। চুকচুক চুমুক দিচ্ছে, পাকা নেশাড়ুর মতো। পুলু ভালই কমপ্যানিয়ান পেয়েছে, দ্যাবা দেবি গলা জড়াজড়ি করে দিব্যি মাল টানতে পারবে।
মধুর গ্লাসও শেষ। একটু পেটে পড়লেই মধু জোর চাঙা হয়ে ওঠে। চিরকালই। একবার কালী পুজোর প্যান্ডেলের পিছনে আমরা ভাঁড়ে ঢেলে হুইস্কি খাচ্ছি, কোথেকে মধু এক কোয়ার্টার পাউন্ড পাঁউরুটি নিয়ে হাজির! ভাঁড়ে পাঁউরুটি ডুবোচ্ছে, কচকচ খাচ্ছে, আর হেঁড়ে গলায় শ্লোক আউড়ে চলেছে। সে যে কী উদ্ভট শ্লোক। না সংস্কৃত, না হিন্দি, না বাংলা, না ইংরিজি! হুইস্কি ভেজানো পাঁউরুটি শেষ করেই হুঙ্কার দিয়ে উঠল, মা মা, তারা কালী ব্রহ্মময়ী, বুকে পা দিয়ে চেপে ধর্, মা, বদরক্ত সব বেরিয়ে যাক! পাড়ার বাবা কাকারা উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছিল, শেষ পর্যন্ত মাথায় এক বালতি জল ঢেলে শান্ত করতে হল ব্যাটাকে।
মধুর গুনগুন গান স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ। উচ্চগ্রামে চড়ছে গলা। আপন মনে মাথা নাড়ছে মধু,—জুতায়ে করিব লম্বা, ঘুচে যাবে হম্বি তম্বা…. জুতায়েএ…এএএ….এএএ….
পুলু ফটাস একটা চাঁটি মারল,—অ্যাই, তোর গিটকিরি বন্ধ করবি?
জয়া মুখে আঁচল চেপে হাসছে, কাকে জুতিয়ে লম্বা করবেন, মধুদা?
মধুর ভ্রূক্ষেপ নেই, সে তার সুরে অটল। তার গলায় এখন ফৈয়াজ খাঁ থেকে ভীমসেন যোশী সবাই একের পর এক ভর করবেন। হোটেলের ম্যানেজার না আমাদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় বার করে দেয়!
জয়া ব্যালকনিতে চলে গেল।
বন্দনা আবার পাত্র ভরেছে। চোয়ালে চোয়াল ঘষে চুমুক দিল। উঠে দাঁড়াল টলতে টলতে। ধপাস করে এসে বসেছে বিছানায়, প্রায় অন্তুর গা ঘেঁষে।
অন্তু সরে যাচ্ছে না কেন? স্মার্ট হাতে সিগারেট ধরাল অন্তু। রিঙ করছে ধোঁয়ার। আলগা ঘুরছে ফ্যান, হাওয়ায় ভেঙে যাচ্ছে বৃত্ত। এত কায়দা মারছে কেন অন্তু? নিজে স্টেডি আছে দেখাতে চায়? সব সময়ে বন্ধুদের থেকে এক কাঠি ওপরে থাকার ইচ্ছে? শালা, হিসেব করা খচ্চর। হি ইজ দা থার্ড ম্যান, আই বেট।
বন্দনা প্রায় ঢলে পড়েছে অন্তুর গায়ে। ওরে তোরা দ্যাখ, তোরা দ্যাখ!
আমার নিঃশ্বাসে কি আগুন? আমি কি অন্তুর কলার চেপে ধরব?
অন্তু বোধহয় টেলিপ্যাথি জানে, ঝড়াসে উঠে দাঁড়িয়েছে। মেঝেয় থেবড়ে বসে পড়েছিল মধু, তাকে টেনে তুলল, –অ্যাই চল্, তোকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসি
মধু হাউমাউ করে কেঁদে উঠল,—আমায় তোরা মার্, খুব মার্ অন্তু।
—কেন রে? তোর আবার কী হল?
—আমি একটা মাথামোটা। আমি তোদের যোগ্য নই। আমাকে তোরা মেরে ভাগিয়ে দে। লাথি মার্, লাথি মার্….
পুলু বলল, –শালা, এই জন্য ব্যাটার হাতে গ্লাস দিতে নেই।
মিত্রার চোখ ঘোলাটে হয়ে গেছে। এক হাতে কাঁধ জড়িয়ে ধরেছে পুলুর। শাড়িটার বেশ আলুথালু দশা।
পুলু মিত্রার গালে গাল ঘষল,—কি হে, তুমিও কি মাতাল হয়ে গেছ?
মিত্রা হি হি হেসে উঠল। হাসতে হাসতে এলোমেলো করে দিল পুলুর চুল।
জয়া ফিরেছে ঘরে। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে সবাইকে। এতগুলো মাতালকে দেখে খুব মজা পাচ্ছে কি জয়া? ঘুরন্ত দৃষ্টি বন্দনায় এসে স্থির হল। মুচকি মুচকি হাসছে জয়া। মধুকে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল অন্তু, মধু এখন বিছানায়। যে মধুকে বন্দনা ঘোরতর অপছন্দ করে, সেই মধুর পাশে গড়াগড়ি খাচ্ছে বন্দনা!
পেট গুলিয়ে হাসি উঠে এল। এ যে পুরো মিড সামার নাইটস্ ড্রিম! গাধার মাথাঅলা বটম ছুতোরের পাশে অকাতরে শুয়ে আছে মহামান্য জিউসের পত্নী!
মিত্রার হাসি থামছেই না। হেসে কুটিপাটি খাচ্ছে।
জয়া মিত্রাকে ধরে নাড়া দিল,—এই মিত্রা, থাম্ থাম্। হচ্ছেটা কী? মিত্রা শিথিল হাত দোলাল, কাণ্ডটা দ্যাখ! নিজে আউট হয়ে আমায় জিজ্ঞেস করছে, হিহিহি…..
পুলুর ঘাড় ঝুলে গেছে। কোনওক্রমে মাথা তোলার চেষ্টা করল,—মাইরি বলছি মিত্রা, তুমি আউট।
—না, তুমি আউট।
—না, তুমি। ….একদম ঝাপসা হয়ে গেছ। ….এই জয়া, আলোটা কী ডিম রে!
জয়া ওদের দুজনের কাঁধে হাত রাখল,–এই, তোরা ঘরে যা।
পুলু আর মিত্রা আবার হেসে পরস্পরের গায়ে পড়ে গেল।
মিত্রা নাকী সুরে বলল,—এই, তোমার খোঁমাটা এমন বেঁকে গেছে কেন? সোজা করে দেব? নাও, একটু খেলেই সোজা হয়ে যাবে।
অন্তু গম্ভীর স্বরে বলল,—পুলু, খাবি চল্।
—খাচ্ছি তো। দে, আরেকটু দে।
—না। আর একটুও নয়। চল্ আমার সঙ্গে।
মিস্টার অ্যান্ড মিসেস অনুতোষ এখন মাতাল সামলানোর ব্রতয় নেমেছেন! উত্তম।
অন্তু কটমট চোখে আমার দিকে তাকাল,—অ্যাই তুই, তুই হচ্ছিস পালের গোদা। কী দরকার ছিল….? আমি মধু পুলুদের ঘরে পাঠাচ্ছি, তুই বন্দনাকে দ্যাখ্।
—তুই বন্দনাকে দেখতে পারছিস না? কে যেন আমার মুখ দিয়ে বলে ফেলল, —তোরই তো ওকে দেখা উচিত।
অন্তু কি চমকাল একটু? বোঝা গেল না। আমারও দৃষ্টি ক্রমে ঘোলাটে হয়ে আসছে। সব কিছু কেমন অস্পষ্ট, ধোঁয়া ধোঁয়া।
জয়া মিনতি করার ভঙ্গিতে বলল,–এই শুভ্রদা, প্লিজ। আপনি তো মোটামুটি ঠিক আছেন, এবার শেষ করুন না।
বোতলে সামান্য কালচে সুরা পড়ে আছে এখনও, বোতল থেকেই চলে গেল কণ্ঠনালীতে। দু হাত উল্টে দিয়ে বললাম,—ব্যস্, ফিনিশড্।
পুলু আর মিত্রা টালমাটাল পায়ে দরজার দিকে এগোচ্ছে। অন্তুর হাত মধুর কাঁধে, এক পা গিয়েই টলে গেল মধু, শক্ত হাতে অন্তু ধরে নিল তাকে। একা অন্তু সামলাতে পারছে না, হাত লাগিয়েছে জয়াও। মাথায় কিছু না থাকলেও ঘাড়ে গর্দানে মধু তো কম নয়।
অন্তুর বুক ফুলিয়ে প্রস্থান পছন্দ হচ্ছে না আমার। পিছন থেকেই তীর ছুঁড়লাম, –কিরে, কাটছিস যে? বন্দনাকে কে দেখবে?
অন্তু থামল, কিন্তু ঘাড় ঘোরাল না,—তুই দেখবি। ওঠ, বিছানায় চলে যা।
—নো। তুই বন্দনাকে নিয়ে যা। ও তোর। ইওরস্, অ্যান্ড ইওরস্, অ্যান্ড ইওরস্।
অন্তু জয়ার দিকে তাকাল,—দেখেছ তো, শুভ্র নাকি আউট হয় না!
অন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
হা ঈশ্বর, আবার জিতে গেল অনুতোষ! এই হট্টগোলের মধ্যেও ঠিক মাপ মতো পান করল, মাপ মতো কথা বলল, মাপ মতোই সামলাল সকলকে। আর শুভ্র ব্যানার্জি একটা বোকা সার্কাসের ক্লাউনের মতো উল্টোপাল্টা বকে বুরবক বনে গেল। শুভ্র, তুই আটার ফেলিওর।
শূন্য ঘর। নিষ্প্রভ আলো। স্তূপীকৃত গ্লাস বোতল। সোফায় প্লাস্টিক ব্যাগ কার্পেটে বালিস। জগ উল্টে গিয়ে জল গড়াচ্ছে।
গড়াক, সব গড়িয়ে যাক। সংসারই যেখানে গড়াচ্ছে….
একটা গন্ধ নাকে ঝাপটা মারল। এই ঘর থেকেই আসছে কি? কিসের গন্ধ? হুইস্কির? রামের? নাকি পেচ্ছাপের? বাথরুমের দরজা হাট হয়ে আছে, বন্ধ করতেও ইচ্ছে করছে না। হাঁটি হাঁটি পা পা করে বিছানায় এলাম। বসেছি। বিচিত্র ভঙ্গিতে শুয়ে আছে বন্দনা, উপুড় হয়ে, হাত ছড়িয়ে, ঘাড় হেলিয়ে। বিছানার একেবারে মধ্যিখানে।
গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম,—এই যে, ওঠো, ঠিক হয়ে শোও।
বন্দনার বোজা চোখ খুলল না। টেনে টেনে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, —উঠব না। তুমি পাশে এসো। এসো না, প্লিজ।
কাকে খোঁজে বন্দনা? আমাকে, নাকি থার্ড ম্যানকে? ঝুঁকলাম সামান্য। বন্দনার পিঠে ভর রেখে। ওই তো সেই মুখ, টোলপড়া গাল, ওই তো কমলালেবুর কোয়ার মতো ঠোঁট! সবই তো এক আছে বনো, তবে তুমি কেন বদলে গেলে? সন্দেহও তো ভালবাসাই, এটুকু বোঝ না?
কান্না পাচ্ছে আবার। মুচড়ে উঠল বুকটা। কোন্ এক অদৃশ্য বেহালাঅলা ছড় টানছে পাঁজরে। ওথেলোও তো কেঁদেছিল, না কি?
আরে যাহ্, আমি বোধহয় মাতালই হয়ে গেছি!
