ঢেউ আসে, ঢেউ যায়

ঢেউ আসে, ঢেউ যায়

ট্রেন যথারীতি লেট। ঢুকেছে প্রায় অফিস টাইমে, হাওড়া স্টেশনে এখন পা রাখা যায়। তারই মধ্যে দিয়ে কুলির পিছন পিছন ছুটছে মধুময়। ট্যাক্সির দীর্ঘ লাইনের পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। মাল নামাচ্ছে গুনে গুনে, এটাই তার কাজ।

বাকিরাও এসে গেল হুড়মুড়িয়ে। কুলিদের ভাড়া মিটিয়েই অনুতোষ সাঁ করে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। জয়ার হাত ধরে টুটুল। মিত্রা ড্রেনের কাছে গিয়ে একটা একটা করে ওয়াটার বটল খালি করছে। টুক করে একটা খবরের কাগজ কিনে হেড লাইনে পাখির চোখ বোলাতে শুরু করল পল্লব। শুভ্র এখনও দুর্বল, রেলিঙের ধারের ধাপিতে বসে পড়ল। পাশ থেকে বন্দনা গলা বাড়িয়ে বাড়িয়ে দেখছে, লাইন কেন এগোচ্ছে না।

মধুময় গজগজ করে উঠল,–কোনও মানে হয়? ভেবেছিলাম সকালে ফিরে ডিউটিতে যাব….

—অ্যাই, ডিউটি দেখাস্ না তো। পল্লব আলগা খিঁচিয়ে উঠল,—আমার শালা একদিন নো পে হয়ে গেল….

—মাইনে কেটে নেবে? তুই অফিসারের চাকরি করিস্ না?

—হ্যাঁ রে গাড়োল। উইদাউট নোটিসে কামাই করলে আমাদের কোম্পানির চেয়ারম্যানেরও মাইনে কাটা যায়।

শুভ্র বলে উঠল,—তুই এখান থেকে সোজা অফিস চলে যা না। তোর লাগেজ আমরা বাড়িতে ঢুকিয়ে দেব। তোর মিত্রাকেও।

জয়া মুখ টিপে হাসল, অ্যাই মিত্রা, দ্যাখ, শুভ্রদা আবার আমাদের লাগেজ বলছে।

অনুতোষের ডাক শোনা গেল,—অ্যাই জয়া, অ্যাই টুটুল, পুলু শুভ্র এদিকে আয়। তাড়াতাড়ি….

—কোথায় যাব লাইন ছেড়ে?

—আরে আয় না, একটা প্রাইভেট কার ম্যানেজ করেছি। হানড্রেড। আয় জলদি, তাগাদা লাগাচ্ছে।

হাতের সামনের বোঁচকা কুঁচকি তুলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল সবাই। মিত্রা কয়েক পা এগিয়েও ঘুরে দাঁড়াল,—ওকি মধুদা, দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? স্যুটকেস দুটো তুলে নিন। উফ্, ঝোলা ব্যাগগুলো পড়ে রইল যে, ওগুলো আগে ওঠান।

মধুময় দু গাল ছড়িয়ে হাসল। সব থেকে ভারী জিনিসগুলো তার জন্যই পড়ে থাকে, সে জানে।

ডিকিতে মাল তোলা হচ্ছে। পল্লব একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছে, জোরে জোরে কটা টান দিয়ে বড়সড় হাই তুলল, যাক গে, আজ নয় অফিসটা গেল। শুভ্র, তুই এই উইকটা ডুব মেরে দে। একদম ফিট হয়ে জয়েন করবি।

—আমি ফিট। শুভ্র হাসল।

—মোটেই না। তুমি আজই একবার ডাক্তারের কাছে যাবে। বন্দনা মাথা নাড়িয়ে তড়িঘড়ি বলে উঠল,—এখন তোমার টোটাল বিশ্রাম।

শুভ্র দু হাত ছড়িয়ে সামনে ঝুঁকল,—যো হুকুম…..অন্তুটারই ইল্ লাক, ফিরেই ব্যাটাকে কলেজ দৌড়তে হবে। তোর আজ দেরিতে ক্লাস না অন্তু?

—হ্যাঁ, দুটো পনেরোয়। অনুতোষ ভারিক্কি মুখে ঘড়ি দেখল।

জয়া খুকখুক হাসল, –কায়দা করছ কেন? তুমি যাবে আজ কলেজ? এক্ষুনি তো গিয়ে ভোঁস ভোঁস নাক ডাকাবে।

মেয়েরা পিছনের সিটে বসে পড়ছে। পল্লবও ঠেসে ঠুসে মিত্রার পাশে জায়গা করে নিল। অনুতোষ আর শুভ্র সামনে, অনুতোষের কোলে টুটুল। আর ঠাঁই নেই।

মধুময় জানলা দিয়ে মুখ গলালো,—আমার কী হবে?

পল্লব হ্যা হ্যা হাসল,তোর লাগেজটা আমরা নিয়ে যাচ্ছি। তুই বাসে চলে আয়।

গরগর আওয়াজ তুলল অ্যাম্বাসাডার, যান্ত্রিক সরীসৃপের সারিতে মিশে গেল।

একটুক্ষণ বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল মধুময়। লক্ষ মানুষের ভিড়েও সম্পূর্ণ একা হয়ে, যেমন সে থাকে সব সময়। তারপর আপন মনে হাসল একটু, যেমনটি সে হাসে।

সে এখন মোটেই বাসে উঠবে না। লঞ্চে গঙ্গা পেরিয়ে চলে যাবে বাবুঘাট, তারপর হাঁটবে….হাঁটবে….হাঁটবে। সবুজ মাড়িয়ে।

তার মধ্যেই শুধু এক ফালি সমুদ্র রয়ে গেছে এখনও।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *