শারদীয়া
আশ্বিন মাস শুরু হইয়া গিয়াছে।
বৃষ্টি আছে, তবে সেই যে আকাশ ঘিরিয়া পাথরের মতো কালো মেঘ…চন্দ্র-সূর্যের দেখা নাই…আর ঝরঝর অবিরাম বারিপাত সে ভাবটা আর নাই। এখন নানা রকমের সাদা কালো মেঘের স্তূপ লঘু হাওয়ায় ভর দিয়া আকাশে চঞ্চলভাবে যাওয়া-আসা করিতেছে, মাঝে মাঝে এখানে ওখানে এক এক পশলা বৃষ্টি, তাহার পিছনেই আবার মেঘের পাশ দিয়া নির্গত দীপ্ত সূর্যের কিরণপাত; বেশ বোঝা যায় খুব ঘটা করিয়া কোন একটা খুব বড় কাজ হইবে, তাই পৃথিবীকে জল-আছড়া দিয়া ধুইয়া মুছিয়া তৈয়ার করিয়া ফেলিবার জন্য তাড়াহুড়া পড়িয়া গিয়াছে। শারদীয়া পূজার আর দেরি নাই। প্রতিমা প্ৰায় শেষ হইয়া আসিল। ছেলের দল মূর্তি ঘিরিয়া জটলা করে, কুমারকে রং রাংতা যোগাইয়া দেয়। মাঝে মাঝে গল্পও হয়, কুমার কাজে বিরতি দিয়া হুঁকা টানিতে থাকে, আকাশে বাঘ, সিংহ, ময়ূর প্রভৃতি নানা আকারের সঞ্চরমাণ মেঘে ছেলেদের সুপ্ত কল্পনাকে তোলে জাগাইয়া। বলে, “মনে হচ্ছে যেন সব চলল মাকে নিয়ে আসতে, না গা? ঐ দিকেই তো কৈলেসপুরী, না গা?”
কুমার বলে, “মনে হচ্ছে মানে? তোমরা কি ভেবেছ নাকি ওগুনো মেঘ? বেচারাদের দূর থেকে মেঘের মতো দেখাচ্ছে বলে?…”
শরতের মেঘ গুমগুম করিয়া ডাকিয়া উঠে। কুমার বলে, “ঐ শোন, তাহলে এটাকেও তোমরা মার সিংহীর ডাক বলতে চাইবে না নিশ্চয়? বলবে বাজ পড়ার শব্দ?”
মার সিংহেরই যে ডাক, তাহাতে আর কাহারও সন্দেহ থাকে না। মা আসিবেন—আশায়-কল্পনায় শিশু-চিত্ত বিকশিত হইয়া ওঠে।
শুধু কি শিশু-চিত্তই? ফোটার উৎসবে সমস্ত আকাশ-ধরাতল ওঠে মাতিয়া। কমল তুলিয়া ধরে শতদলের অঞ্জলি, শিউলি বিছায় সোনাচাঁদির আস্তরণ, স্থলপদ্ম আর রক্তকরবীর গাছে লাগে রাঙার সমারোহ। কাশের বনে ওদিকে কাহারা চামর গড়ায় মাতিয়া গেছে, হাজারে হাজারে, লাখে লাখে।
মা আসিবেন, আয়োজন প্রায় শেষ। পূর্ণতার প্রসন্ন হাসিমুখে ধরিত্রী প্রতীক্ষা করিয়া আছে।
আজ পঞ্চমী, কাল ষষ্ঠীর বোধন।
.
সনাতন রায় মোটর থেকে নামিয়া একটু ক্লান্তভাবে ভিতরের বারান্দায় গিয়া উঠিলেন। নিজের হাতেই ফ্যানটা খুলিয়া দিয়া একটা সোফায় গা ঢালিয়া দিয়া ডাকিলেন, “কই গো, আমার নতুন মা!”
ড্রাইভার গাড়ি থেকে বেশ একটা বড় মোট পাঁজায় করিয়া আনিয়া সামনে রাখিয়া দিল। পূজার বাড়ি; ছেলে-মেয়ে আত্মীয়-স্বজনে গমগম করিতেছে, দেখিতে দেখিতে মোটটার চারিদিকে সবাই ভিড় করিয়া দাঁড়াইল। সনাতন রায় বলিলেন, “না এখন খোলা হবে না, তোমরা ঠাণ্ডা হয়ে চারিদিকে দাঁড়াও, আমার মা এসে খুলে যার যেটা ভাগ করে দেবে।” একটি একটু বড়গোছের মেয়ে ছুটিয়া চলিয়া গেল, তার একটু পরেই একটি ব্রীড়ানত বালিকাকে সঙ্গে করিয়া হাজির হইয়া বলিল, “নিয়ে এসেছি তোমার মাকে বাবা, উনিই এবার পুজোর চার্জে নাকি?”
সনাতন রায় বলিলেন, “ওঁরই বাড়ির পুজো, উনি চার্জে থাকবেন না তো কে থাকবে? আমাদের দুজনের তো এবার ছুটি, গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়াব।” মেয়েটি অতিমাত্র লজ্জিত হইয়া পড়িতেছিল, বোধ হয় সে ভাবটি চাপা দেওয়ার জন্যই কোন রকমে মুখ তুলিয়া প্রশ্ন করিল, “কেন ডেকেছেন আমায় বাবা?” শ্বশুর বলিলেন, “ডেকেছি তোমার কাজ তোমায় বুঝিয়ে দেবার জন্যে। নাও তো মা, পোঁটলাটা খুলে ফেল…”
“আচ্ছা, এইবার এক কাজ কর। এর মধ্যে সবচেয়ে তোমার যেটি পছন্দ—কাপড় আর ব্লাউস্ পীস্—আগে আলাদা করে রাখ, তারপর…”
ছেলে-মেয়েরা কাঁইমাই করিয়া উঠিল, সেই প্রগল্ভা মেয়েটি বলিল, “তাহলে তোমার নতুন মা ছেড়ে আমাদের পুরনো মার হাতেই দাও বাবা, নিজের দিকে ঝোল টানবেন, তিনি নাকি আবার ভাগ করবেন!”
শ্বশুরের কথায় বধু সংকুচিত হইয়া গিয়াছিল, ননদের এই টিপ্পনিতে এবং সকলের হাসিতে আড়ষ্ট হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
কর্তা ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, “না, তোরা বড্ড জ্বালাতন লাগালি।…আচ্ছা, আমিই ঠিক করে দিচ্ছি মা।”
ঝুঁকিয়া গোটা তিন চার কাগজের বাক্সর ঢাকনা খুলিয়া দেখিলেন। শেষেরটাতে খুব প্রচুর সাঁচ্চার কাজ-করা একটা বেনারসী শাড়ি, আর ব্লাউস পীস্। সেইটে সরাইয়া লইয়া বলিলেন, “এটা তোমার পুজোর শাড়ি মা, এই পরে পুজোটা সামলাবে।…আর আটপৌরেটা কোথায় গেল?”
আরও দুই তিনখানা বাক্স সরাইয়া একটা টানিয়া লইলেন, ডালা খুলিতে একটা চাঁপার রঙের দামী জর্জেট শাড়ি বাহির হইল। বলিলেন, “এটা কাল ষষ্ঠীর দিন পরে ঠাকুর দেখতে যাবে, আর যখন পুজো ছাড়া অন্য কাজ সামলাবে-চারিদিক তো তোমাকেই সামলাতে হবে কিনা—তখন গিয়ে এইখানা পরে থাকবে। পুজোর কটা দিন যদি সাদা কাপড় পরতে দেখি তো মায়ে-বেটায় একচোট ভয়ানক ঝগড়া হবে…”
মেয়েটি বলিল, “আহা-হা, আমরা যেন ঝগড়া করতে জানি না।…কই বের কর এবার আমাদের ষষ্ঠীর শাড়ি, সপ্তমীর শাড়ি, অষ্টুমীর শাড়ি, নবুমীর শাড়ি…”
অন্য একটি মেয়ে বলিল, “বিজয়ার শাড়ি।”
অপর একজন বলিল, “না বের কর তো নাতনী-ঠাকুরদায় ভয়ানক ঝগড়া হয়ে যাবে।” খুব একটা হাসির কলরব পড়িয়া গেল!
.
মোটরে আসিতে আসিতে মেয়েটি বড় চোখে লাগিয়া গিয়াছিল। সনাতন রায় চর লাগাইয়া খোঁজ লইলেন। টের পাওয়া গেল খুব গরীব পিতামাতার মেয়ে। পিতা মাইনর স্কুলের পণ্ডিতি করেন, আর দু-পাঁচ ঘর যজমান আছে। কোন রকমে চলিয়া যায়। মেয়ে শহরে মামার বাড়িতে আসিয়াছে, বাড়ি পাড়াগাঁয়ে, হুগলীতে নামিয়া বেশ খানিকটা ভিতরের দিকে যাইতে হয়, গ্রামটার নাম রায়বেড়ে।
বিবাহের কথা পাড়া হইল, কিন্তু মেয়ের বাপের খুব একটা কৃতকৃতার্থ ভাব দেখা গেল না। ঘটক ঠাকুর, সরকার মহাশয় যাহারা গিয়াছিল তাহাদের বলিলেন, “মেয়ে আমার রাজরাণী হবে, এর চেয়ে আনন্দ আর বাপমায়ের কি হতে পারে? তবে আমার অবস্থার দিক দিয়ে দেখতে গেলে একেবারে আকাশ-পাতাল প্রভেদ, তাই…”
জমিদার বাড়ির সরকার, কথায় ধার থাকে, বলিলেন, “এটা যে অবস্থায় অবস্থায় বিয়ে হচ্ছে না সেটা তিনি খুবই জানেন ঠাকুরমশাই, মেয়ের সঙ্গে তাঁর আর কিছু ঘরে তোলবার অভিপ্রায় নেই।”
ঘটক এই ব্যাপারের ব্যাপারী, লোক চেনে; মেয়ের বাপের মুখে কি একটা লক্ষণ দেখিয়া তাড়াতাড়ি বলিল, “মানে, রায় মশাইয়ের লক্ষ্মীর ঘর, সেখানে মা তো আর কিছুর অপ্রতুল রাখেন নি, তবে মা স্বয়ং আপনার বাড়িতে এসেছেন দেখে তাঁকে নিয়ে যেতে চান আর কি। সরকার মশাই সেই কথাই বলছিলেন। কি সরকার মশাই, এই তো?”
যাহাতে কথা না বাড়ে তাহার জন্য একটু চোখের ইশারা করিয়া দিলেন।
মেয়ের ভবিষ্যতের চিন্তাটাই জয়ী হইল, এরূপ অসম কুটুম্বিতায় আসল বেদনাটা যে কোথায় সেটা প্রকাশ করিয়া বলায় কোন লাভ নাই জানিয়া মেয়ের বাপ আর কোন কথা উত্থাপন করিলেন না। বিবাহ হইয়া গেল।
কথাটা রায় মহাশয় বুঝিলেন। মনে মনে বোধ হয় একটু হাসিলেন। এক সময় বধূকে কাছে ডাকিয়া পিঠে গভীর স্নেহে হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিলেন, “মা, তোমার বাবার ভয় হয়েছে আমি বুঝি তোমায় তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিলাম।… চাল-কলা-খেকো ব্রাহ্মণ কিনা মার বাবা, তাই কলাভক্ত জীবটির মতো বুদ্ধি।… বাপের কাছ থেকে কেউ মেয়ে কেড়ে নিতে পারে কখনও? তোমার যবে যখন খুশি বলবে মা, সঙ্গে সঙ্গে যাবার ব্যবস্থা হবে।” বধূর আনমিত মুখটা নিজের দিকে ঘুরাইয়া লইয়া বলিলেন, “আর এই বুড়ো ছেলেটাকে ছেড়ে যতদিন ইচ্ছে থেক, পারবে তো অনেক দিন ছেড়ে থাকতে?”
বধূ ঈষৎ হাসিয়া মুখ ঘুরাইয়া মাথা নাড়িল, না, পারিবে না।
যে একটা সারা জমিদারি চালাইতেছে, একটি ছোট মেয়েকে বশে আনা তাহার পক্ষে ছেলেখেলা। ফাল্গুনে বিবাহ হইল, বৈশাখের শেষাশেষি বধূ ঘর করিতে আসিল। তাহার পর জ্যৈষ্ঠ থেকে আশ্বিনের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই সাড়ে চার মাসের মধ্যে জামাইষষ্ঠীর সময় দিন পাঁচেক গিয়াছিল, জামাই দুদিন আর বধূ নিজে আরও তিন দিন ফালতু। আর যাবার নামও করে নাই, পাঠানো হয় নাই।
না; নামও করে নাই যাওয়ার, আর শ্বশুর এতে আশ্চর্যও হন নাই; কেননা, দারিদ্র্য আর ঐশ্বর্যের দ্বন্দ্বে কে যে চিরকাল জয়ী তাহা তাঁহার বিলক্ষণ জানা আছে। বধূর মাথায় যে রায়বেড়ের চিন্তা প্রবেশ করিবে তাহার ফুরসত কোথায়? অর্থের প্রাচুর্যের মধ্যে একটা নূতন জগৎ দিন দিন চক্ষের সামনে দ্রুত প্রসারিত হইয়া উঠিতেছে। তাহার উল্লাস, তাহার বিস্ময়ের সামনে রায়বেড়ে দিন দিনই যেন আরও মলিন হইয়া যাইতেছে। কাছাকাছি তিনটে শহরের বায়স্কোপ, কি আশ্চর্য আশ্চর্য কাণ্ড সব! কখন শখের থিয়েটার, কখন সার্কাস। বায়স্কোপের সমস্ত বড় বড় নামগুলা তাহার মুখস্থ হইয়া গেছে; এবার বাপের বাড়ি গিয়া সবাইকে বলিল। তাহারা হাঁ করিয়া শুনিতেছে, শুধু সেই জানে বলিয়া এমন একটা আনন্দ হয়।…মোটরে করিয়া জজসাহেবের মেয়েরা বেড়াইতে আসে—শীলা, ওদের বউ। ওদের মোটরের শব্দ হইলেই ঠিক রং মিলাইয়া কাপড় জামা ছাড়িয়া আসিতে হয়; এত বোঝে, বিশেষ করিয়া শীলা।… আবার ননদের সঙ্গে মোটরে করিয়া বেড়াইতে যাওয়া আছে জজের বাড়ি, সরকারি উকিলের বাড়ি, ডেপুটিদের বাড়ি, আরও কত সবার বাড়ি। সবারই বাড়িতে মোটর গাড়ি।…কাহার কি গাড়ি সে জানে।…যেখানেই যায় প্রায় প্রথমেই তাহার রূপের প্রশংসা। এমন একটা সলজ্জ আনন্দ মেশান।… বড়রা রায়গিন্নীকে বলে, “এখনও বড় ছেলেমানুষটি তাইতেই এত রূপ, একটু বড় হলে বৌ তোমার যা হবে।…” শীলা বলে, “বৌ, তোকে দেখে আমার কি মনে হয় জানিস?” অনেকবার শোনা কথা। বধূ বলে, “জানি, তোমার আর বলতে হবে না।” দুজনের মধ্যে খুব চাপা হাসি চলে।
এসবের অতিরিক্ত আছে বাড়ির আদর। ননদ দুইটির আদর একটু মিঠে কড়া গোছের, বেশ লাগে। শ্বশুর বধূ-অন্ত প্রাণ, নিজেকে একেবারে বধূর হাতে ছাড়িয়া দিয়াছেন। বাড়িতে প্রবেশ করিয়াই প্রথম কথা—“কই গো নতুন মা আমার?” ঐশ্বর্যপূর্ণ গৃহস্থালির এদিককার প্রায় সব কাজই বধূর হাতে। সাজান-গোছান তো আছেই, দেওয়া-থোওয়া, আদর-অভ্যর্থনায়ও তাহার কাজ কম নয়, কিন্তু শ্বশুরের ডাক পড়িলেই সব ছাড়িয়া সদ্য সদ্য আসা চাই। নিজের অন্তরের তাগিদও আছে, অভিমানেরও ভয় আছে। অসহায় শিশুর মতোই যে একেবারে চরমভাবে নির্ভর করিয়া রহিয়াছে, তাহার অভিমান সত্যই প্রাণে বড় লাগে।
মাঝে শ্বশুর একবার বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা তুলিয়াছিলেন নিজে থেকেই। তবে জমিদারি পদ্ধতিতে। কয়েকদিন আগে কি করিয়া খোঁজ পাইয়াছিলেন শীলার হাতের একেবারে হালফ্যাশানের চুড়ি দেখিয়া বধূ প্রশংসা করিয়াছিল। সেই রকম চুড়ি যেদিন গড়া শেষ হইল, বধুকে ডাকিয়া পাশে দাঁড় করাইয়া বলিলেন, “ছেলের সাধ হয়েছে মা একটু…এইগুনো পরে ফেল দিকিন। কলকাতায় গিয়েছিলাম—রায়েদের দোকানে চুড়িগুনো দেখে বড় চোখে লাগল। এসে গণেশ স্যাকরাকে ফরমাশ দিয়ে দিয়েছিলাম, আজ দিলে।…তোমার ভালো লাগবে কিনা জানি না, কিন্তু তবুও পরো, ছেলেরও তো একটা সাধ আছে…
বধু চুড়ি পরিয়া আসিয়া প্রণাম করিতে মাথায় হাত দিয়া আশীর্বাদ করিয়া বুকের কাছে টানিয়া লইয়া বলিলেন, “হল পছন্দ আমার মার?”
সঙ্গে সঙ্গেই উত্তরের অপেক্ষা না করিয়া বলিলেন, “এই দেখ ভীমরতি! বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম, বেহাই লিখেছেন, ‘অনেকদিন আসেনি অনু, একবার যদি পাঠিয়ে দেন।’…কি লিখব? অবশ্য বুড়ো ছেলেটা তোমার কি করে থাকবে সেজন্য তোমার ভাবতে হবে না।…তাহলে লিখে দিই যে…”
বধূর বুকটা একটু কি রকম করিয়া ওঠে, বাবা নিজে লিখিয়াছেন…বাবা, মা, খোকা, বাড়ি সব বড় স্পষ্ট হইয়া ওঠে। নূতন চুড়ি ঘুরাইতে ঘুরাইতে একটু অন্যমনস্ক হইয়া যায়, তাহার পরে বলে, “লিখে দিন এ কটা দিন যাক, তারপর যাব বাবা…”
শ্বশুর হাসিয়া বলেন, “দেখ বোকা মেয়ের বুদ্ধি! আমি লিখলে বাবা কি ভাববেন?”
বধূ বলে, “আমি দোব’খন লিখে বাবা।”
একটু কুণ্ঠিত হইয়াই বলে, তাহার পর একটা ছুতার কথা মনে পড়িয়া যাওয়ায় কতকটা নিশ্চিত্ত হইয়া বলে, “লিখে দোব, ঠাকুরঝিকে দেখতে আসবে, সেটা হয়ে যাক, তারপর। অ্যাঁ বাবা?”
ঐশ্বর্য আর জমিদারি মগজের বিজয়ে সনাতন রায় হাসেন।
সত্যই বিজয়-পরাজয়ের কথা। মেয়ের হাতেই দুইখানি এই ধরনের পত্র পাইয়া বাবা আর পাঠানোর কথা লেখেন না। সে যে কি নিদারুণ, নবৈশ্বর্যশালিনী কন্যার কাছে সে সংবাদ কেহ পৌঁছাইয়া দেয় না। নিরীহ বালিকাও বোঝে না কিছু।
গরীবের মেয়ে রাজপ্রাসাদে গেলে তাহাকে যে তাহার পূর্ব-জীবন থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করিয়া লওয়া হয়, তাহার মধ্যে সব সময়েই যে দারিদ্র্যের প্রতি একটা ঘৃণা-অবহেলার ভাব থাকে তাহা নয়। অনেক সময় থাকে একটা ঈর্ষার ভাব; যাহাকে প্রাণ দিয়া ভালবাসা যায় তাহাকে একেবারে নিজের করিয়া, আলাদা করিয়া লইবার আকাঙ্ক্ষা। ব্যাপারটা সহজ নয়, কেননা, দারিদ্র্যেরও একটা আবেদন আছে, নিজের বুকের স্তন্য দিয়া যে-দারিদ্র্য এতদিন মানুষ করিল। সেইজন্য অর্থকে নিজের মায়া, নিজের মোহ পূর্ণতমভাবে নিয়োজিত করিতে হয়।
সনাতন রায় জানেন বিজয় তাঁহার প্রায় করায়ত্ত; দারিদ্র্যকে মাত্র আর একটি আঘাত দিলেই হয় এবার!
সামনে পূজা, এর আড়ম্বরটা এবার দ্বিগুণ করিয়া দিলেন।
.
প্রায় মাস খানেকেরও পূর্বে থেকে বাড়িটাতে সাড়া পড়িয়া গেল। এবারে একটা আরও সুযোগ যে চারদিন পূজা। বৃহৎ অট্টালিকা মেরামত করিয়া চুন-রঙ ধরানোর কাজ আরম্ভ হইয়া গেল। চণ্ডীমণ্ডপ আর বাড়ির মধ্যে যেটুকু খালি জায়গা ছিল সেখানে নূতন ভাঁড়ার তৈয়ার করিয়া মহাল থেকে দ্রব্যসম্ভার সংগ্রহ করা হইতে লাগিল। কলিকাতা থেকে থিয়েটার আসিয়া দুই দিন অভিনয় দিবে, একদিন এখানকার শখের পার্টি, একদিন কলিকাতার বায়স্কোপ। শহরের কাছাকাছি চারিটি পাড়া চার দিন খাওয়ান হইবে।…দিন পনেরো পূর্বেই বাড়ি কুটুম্ব-সাক্ষাতে ভরিয়া গেল। নূতন বধূর নিঃশ্বাস ফেলিবার সময় নাই। হয় শাশুড়ী, নয় শ্বশুরের সঙ্গে, নয় একলাই তদারক করিয়া ফিরিতেছে। কটা দিনেই দায়িত্বের চাপে যেন কত বয়স বাড়ি গিয়াছে।…নূতন জীবনের মধ্যেও এ একটা নূতনতর ব্যাপার। রায়বেড়ের কথা মনে পড়ে কি? কর্ম-উন্মাদনার ক্ষণিক অবসাদের মধ্যে পড়ে বোধ হয় কখনও কখনও…বাবা আসিয়া অর্ধ-মলিন জামাটা আলনায় টাঙাইয়া রাখিলেন। বলিতেছেন, “অনু, পিঠের কাছটা একটু সেলাই করে রাখিস তো।” মা রাঁধিতেছেন, অনু বসিয়া গল্প করিতেছে, খোকা আসিয়া বলিল, “বাগান থেকে দুটো বেগুন তুলে আনলাম মা, নতুন হয়েছে…দিদির জন্যে ভেজে দিও মা…তোর এখন কষ্ট হয় এখানে খেতে, না দিদি?” মা বলিলেন, “তাই কি হয় রে পাগল? বাপের বাড়ির ভাত শুধু নুন দিয়ে খেলেও তার স্বাদ আলাদা।…দেখিস না, কুবেরের ভাণ্ডার ছেড়ে মা-দুর্গাকে কেমন করে ছুটে আসতে হয় বছর বছর?”
কেমন সব আবছায়া ছবির মতো…বায়স্কোপের এক একটা খণ্ড ছবি যেমন অর্ধেক ফুটিয়াই মিলাইয়া যায়। নূতন কর্মের মাঝে সব আবার মুছিয়া মিলাইয়া যায়।
শরতের রূপ, হালকা মেঘ থেকে এক পশলা বৃষ্টি মাটিতে পৌঁছিবার আগেই মেঘ যায় মিলাইয়া, দীপ্ত সূর্যের উল্লসিত আলোকে আকাশ যায় ভরিয়া।
শ্বশুর আসিয়া বলেন, “বেহাই লিখেছেন, অনেক দিন চিঠি পান নি তোমার…”
স্বেদসিক্ত ললাট মুছিয়া বধূ বলে, “এই একটু ফুরসত হলেই লিখে দোব বাবা, খবর দিয়ে দিন বাবাকে।”
ঈর্ষা নিজের বিজয়ে গোপনে হাস্য করে। দারিদ্র্যের শেষতম বন্ধনটি ছিন্ন হইতে চলিল।
ঈর্ষা যে নিজেই একটা পরাজয় এ-তত্ত্ব তাঁহাকে কে বুঝাইবে?
ষষ্ঠীর দিনটা যে কেমন করিয়া কোথা দিয়া কাটিয়া গেল নববধূ বুঝিতেই পারিল না। আনন্দের ক্লান্তি আর অবসাদের মধ্যে যখন শয্যাগ্রহণ করিল তখন অনেক রাত হইয়া গিয়াছে। মনটা কেন, কি করিয়া যেন একটু বিষণ্ন, কিন্তু সে বিষাদকে ভাল করিয়া বুঝিবার, অনুভব করিবার পূর্বেই, বোধ হয় সপ্তমীর পূজার উগ্রতর আনন্দের কল্পনা করিতে করিতে ঘুমাইয়া পড়িল।
আনন্দের ঔৎসুক্যে রাত্রে বোধ হয় ভাল করিয়া ঘুমও হয় নাই, খুব ভোরে উঠিয়া নববধূ আবার আয়োজনে মাতিয়া গেল। বোধনের বাজনায়, কর্মের ক্রমবর্ধমান কোলাহলে, ছেলেদের উৎসব-কাকলিতে তাহাকে যেন গোড়া থেকেই অদ্ভুত উন্মাদনায় ঘিরিয়া ফেলিল। বোধ হয় শ্বশুরের অত্যধিক আদর আর নির্ভরতার জন্য তাহার মনে হইল সব ব্যাপারটা তাহাকে ঘিরিয়াই হইতেছে। চারিদিক থেকেই একটা আনন্দের ঢেউ একরকম দুর্বার উচ্ছ্বাসে তাহার মনের তটে ভাঙিয়া পড়িতে লাগিল।
শ্বশুর আসিয়া ঘরের সামনে দাঁড়াইয়া ডাকিলেন, “কইগো মা, ঠাকুর যে ওদিকে এসে গেলেন, তোমার জন্যে দাঁড়িয়ে আছেন…বরণ করে নেবে চল….
বধূ স্নান করিয়া নূতন বেনারসী শাড়িখানি পরিয়াছে, পিঠে কুঞ্চিত কেশরাশি এলানো, সিন্দূরবিন্দু দিবার জন্য আরশির সামনে দাঁড়াইয়া সোনায় হীরায় ঝলমল কোন্ এক দেবকন্যাকে দেখিয়াই যেন বিস্ময়ে নির্বাক হইয়া দাঁড়াইয়াছিল, শ্বশুরের ডাকে একটু ত্রস্ত হইয়া তাড়াতাড়ি ভ্রমধ্যে সিন্দূরবিন্দু বসাইয়া কতকটা জড়িত পদে সামনে আসিয়া দাঁড়াইল। বধূর অপূর্ব স্নিগ্ধ রূপে শ্বশুর মুহূর্ত মাত্র নির্বাক হইয়া রহিলেন, তাহার পর তাহার দক্ষিণ হস্তটি ধরিয়া বলিলেন, “দেখ তো! আমার এ মা গিয়ে বরণ করে না নিলে ও মা কি সিংহের পিঠ থেকে নামতে পারেন? চলো এবার।”
শ্বশুরের সঙ্গে চণ্ডীমণ্ডপে গিয়া উঠিতেই নববধূ বিস্ময়ে নিশ্চল হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। এরকম কিছু এর পূর্বে দেখে নাই…না এরকম প্রতিমা, না এরকম বেদীসজ্জা, না এরকম আলোক, না এরকম পূজাসম্ভার। এক কল্পনাতীত ব্যাপার।…এসব তাহার…তাহার সঙ্গে এসবের কোথায় একটা অচ্ছেদ্য যোগ রহিয়াছে…এ ঐশ্বর্য, এ পূজা…এমন কি অন্য সব দেবতার চেয়ে শতগুণে ঐশ্বর্যময়ী এই দেবতাও তাহারই।…তাহার আসাতে সকলে যেমন ক্ষণিকের জন্য নির্বাক, স্তম্ভিত হইয়া গিয়াছিল, সেও সেই রকমই এই ঐশ্বর্য-সমারোহের সামনে নির্বাক বিস্ময়ে দাঁড়াইয়া রহিল। তাহার ভিতর থেকে কি-যেন একটা ঠেলিয়া আসিতেছিল। আনন্দই, কিন্তু অশ্রুর সঙ্গেও সম্বন্ধ আছে।
শ্বশুর ঐশ্বর্যের বিজয়ে অন্তরে অন্তরে পুলকিত হইলেন; দূর পল্লীর কোনও এক দরিদ্র ব্রাহ্মণকে লক্ষ্য করিয়া মনের কোথায় একটি হাসি ফুটিল বোধ হয়। মনে মনে বধূকে বলিলেন, “এ গণ্ডির বাইরে তুমি আর কি করে যাবে মা?”
প্রকাশ্যে বলিলেন, “নাও, এবার তোমার পুজোর যোগাড়ে নেমে পড় মা। চন্দন ঘষবে? না নৈবিদ্যি সাজাবে? তুমি বরং গিয়ে ঐ সোনার পরাতটাতে নৈবিদ্যিই সাজাওগে।”
বধূ নৈবেদ্যের দিকে অগ্রসর হইয়া একটু দাঁড়াইয়া পড়িল। আবার শ্বশুরের কাছে ফিরিয়া আসিয়া মুখটি তাহার বুকে গুঁজিয়া ধীরে ধীরে বলিল, “বাবা, ফুল আছে আর বাগানে? আমি আরও তুলে নিয়ে আসব।”
বধূ চলিয়া গেলে পুরোহিত হাসিয়া বলিলেন, “তুমি চাও শিশুকে একদিনেই গিন্নী করে তুলতে সনাতন, তা কখনও হয়?”
সনাতন রায় বলিলেন, “মা আমার গিন্নীই হয়ে উঠেছেন, পুরুত মশাই। তবে আজকের কথা আলাদা, আজ জগতের সবচেয়ে পাকা গিন্নী মা অন্নপূর্ণাই যখন শিশু হয়ে বাপের বাড়ি ছুটে এসেছেন…”
কথাটা নিজের বুকেই ধক্ করিয়া একটা আঘাত দিল; আর শেষ করিতে পারিলেন না। অনেকে খোশামোদে, অনেকে সত্যই একটা উঁচু দরের কথা বলা হইয়াছে বলিয়া সাধুবাদ দিল। একটু আলোচনা চলিল কথাটা লইয়া। সনাতন রায় কেমন যেন অন্যমনস্কভাবে একটু এদিক ওদিক করিলেন, তাহার পর ধীরে ধীরে ভিতর-বাড়ির দিকে চলিয়া গেলেন।
.
খিড়কির সঙ্গে বেশ উঁচু দেয়াল দিয়া ঘেরা একটা মাঝারি গোছের বাগান। মাঝখানে একটা ঘাট-বাঁধান পুষ্করিণী, চারিদিকে ফল ফুলের গাছ…এটি বাড়ির মেয়েদের জন্য। বধূর সঙ্গে কতকগুলি ছোট ছোট মেয়ে আর ছেলে হুড়াহুড়ি করিতে করিতে ফুল তুলিবার জন্য আসিয়া চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল। দুই-একজন তাহার সঙ্গেই রহিল।
এদিকে কাজ-কর্মের ঝোঁকে প্রায় মাসখানেক বাগানে আসা হয় নাই। নিত্য পরিচয়ের মধ্যে এই ব্যবধানের জন্য গাছপালা, পুকুরের জল, এমন কি এখানের রোদটুকুকে পর্যন্ত যেন নূতন বলিয়া মনে হইল। প্রকৃতপক্ষে আসিয়াছেও নূতনত্ব কিছু কিছু। পুকুরের কুঞ্চিত, চিক্কণ বুকের উপর একদিকে কতকগুলো সাদা সাদা কহ্বার ফুটিয়াছে, মাঝখানে গোটাকতক পদ্ম, তাহাদের পাতার উপর হাওয়ার দোলে জলের গোটাকতক বড় বড় বিন্দু গড়াইয়া ফিরিতেছে, রায়বেড়ের চৌধুরীদের মজা পুকুরধার মনে করাইয়া দেয়। তফাত এই, সেটা একটা আদত পদ্মবন, এখানে গোটাকতক মাত্র ফুল-পুকুরকে সাজাইয়া রাখা।…ননদ বলিল, “বাবা কলকাতার নার্সারি থেকে এনেছিলেন…এই সবে ফুটতে আরম্ভ করেছে।” বধূ বলিল, “আমরা পুজোর সময় তুলতাম কোঁচড় ভরে। আমার ভাই খোকা খুব সাঁতার কাটতে জানে কিনা…”
ননদ আলাদা করিয়া নাম দিয়াছে, প্রশ্ন করিল, “আর বুনী বুঝি নিজে জানে না? নুকোন হচ্ছে!”
বধূ ঘাড় কাত করিয়া হাসিল, বলিল, “জানতুম, এখন ভুলে গেছি।”
একটি ছেলে বাহাদুরি দেখাইয়া সামনে আসিয়া বলিল, “আমিও জানি সাঁতার, নিয়ে আসব তুলে?”
ননদ বলিল, “আন না, ইচ্ছে হয়েছে বৌদির।”
বধু কি মনে ভাবিল। তাহার যেন মনে হইল চৌধুরীদের মজা পুকুরের পদ্ম-তোলা আর এখানকার পদ্ম তোলায় কোথায় একটা তফাত আছে। এ পুকুর তাহার নিজের কিন্তু আজ কেন যেন বোধ হইতেছে চৌধুরীদের পুকুরের চেয়ে আরও দূর আরও অনাত্মীয়। সাজি দুলাইয়া অগ্রসর হইয়া বলিল, “না থাক।”
খুব উৎসাহের সঙ্গে কিছু দোপাটি তুলিল, কিছু রজনীগন্ধা।…এ দুইটা ফুল তাদের বাড়িতে আছে। উঠানের দক্ষিণ কোণটাতে প্রত্যেক বৎসর কৃষ্ণকলি আর দোপাটি আপনি জন্মিয়া গায়ে গায়ে ঠাসাঠাসি হইয়া ফুটে। প্রত্যেক বৎসরই বাবা অনু আর খোকাকে দিয়ে চৌধুরীদের বাড়ির পূজাতে পাঠাইয়া দিতেন, বলিতেন, “আহা, দিয়ে আয়, যত্ন নেই আত্তি নেই, ওরা মায়ের পুজোর জন্যে প্রতি বচ্ছর আপন মনেই ফোটে…।” আর বৎসরও ঠিক এই আজকের দিনের এই সময়টা ফুল লইয়া গিয়াছিল…যেন দেখা যায়…শীতলার মার উঠানের উপর দিয়া যাইতেছে দুজনে খুব জোরে…খোকা তাহাকে হাঁটায় হারাইয়া দিবার জন্যে একেবারে ঝুঁকিয়া গিয়াছে সামনের দিকে…রেষারেষির ঝোঁকে দুজনেই এক একবার হাসিয়া উঠিতেছে…খোকার নূতন কাপড় কোমর বাঁধিয়া পরা…কোঁচড় ফুঁড়িয়া কৃষ্ণকলি আর দোপাটির আভা বাহির হইয়া আসিতেছে।…আজও খোকা সেইখান দিয়া যাইতেছে—যেন দেখা যায়। একটু যেন মনমরা…ভাবিতেছে, আর বছরে দিদি পাশটিতে ছিল।…
বাগানের শেষ দিকে একটা বাঁধান চত্বর, তাহার চারিদিকে শিউলি গাছ। ননদ ডাকিল, “বৌদি, দেখসে কি কাণ্ড! চাতালটা বোঝাই হয়ে রয়েছে ফুলে, এরা নিয়ে যায় নি নাকি কুড়িয়ে?”
বধূ একটু মন্থর গতিতে গিয়া চাতালের উপর থেকে কিছু শিউলি সঞ্চয় করিল, তাহার পর সাজিটি পাশে রাখিয়া বসিয়া পড়িল। ননদ বলিল, “দুটো দোপাটি তুলেই শখ মিটে গেল? বুনী আর কেন বলেছে?”
শিউলি শেষ করিয়া উহারা ফুলসঞ্চয়ে বাগানে ছড়াইয়া পড়িল। বধূ বলিল, “আমি একটু বসি।”
কি হইয়াছে…আজ এই আলোয় ছায়ায় ঝলমল দিনটাকে যেন বহু বৎসরের চেনা বলিয়া মনে হইতেছে। এতক্ষণ হয় নাই, তিন মহল বাড়ির বাহিরে যে এমন একটা সখীর মতো পরিচিত দিন অপেক্ষা করিয়া আছে, এটা ধারণার মধ্যেই আসে নাই। এই চেনা দিনের নানা ব্যাপারের মধ্যে এখানকার পূজা, এখানকার জীবনের কোন অংশই নাই। চৌধুরীদের বাড়ির পূজার কাঁসর ঘণ্টা… কোঁচড়ভরা কৃষ্ণকলি, দোপাটি…পূজামণ্ডপের সামনে ছেঁড়া চাঁদোয়ার তলায় যাত্রার আসর সাজানোর আয়োজন… দেবদারুর কোঁচকান পাতা…রঙীন কাগজের শিকলি, পতাকা…মা বাবার চণ্ডী পাঠের যোগাড় করিয়া দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করিতেছেন, “পেলে স্কুল থেকে কিছু আগাম? আজ বছরকার দিন ছেলে-মেয়েটাকে…চৌধুরীদের বাড়ির নেমন্তন্ন…সে তো পরশু…”
পূজার নহবৎ ভাসিয়া আসিতেছে…শ্বশুর কাশী থেকে আনাইয়াছেন। কত দূরের একটা অপরিচিত সংগীত কাদের বাড়ির…রূপকথায় শোনা কোন রাজপুরীর। পূজার বাজনা নয়, সাত মহালের মাঝে মণি-প্রবালের ঘরে বন্দিনী রাজকুমারীর কান্নার সুর…
বধূ একবার চারিদিকে চাহিয়া লইয়া সাঁচ্চার কাজ করা শাড়ির অঞ্চলটা দিয়া চক্ষু মুছিল।
.
সনাতন রায় নিজের ঘরে একটা হেলানো চেয়ারে শুইয়া ছিলেন।…নিজের সেই দুইটা কথার আঘাত নিজেকেই বড় বিষণ্ণ করিয়া দিয়াছে…কি করিয়া সব যেন বিস্বাদ ঠেকিতেছে…কেন, কে জানে….
দুয়ার ঠেলিয়া পুরোহিত মহাশয় প্রবেশ করিলেন, ভাবটা খুব উদ্বিগ্ন। বলিলেন, “সনাতন, তুমি এখানে এসে বসে আছ? খুঁজছিলাম তোমায়!”
সনাতন কতকটা নির্বিকারভাবে মুখের পানে চাহিয়া রহিলেন। পুরোহিত কতকটা শংকিত উদ্বেগের সঙ্গে বলিলেন, “মা আসেন নি, সনাতন! কোথায় কি হয়েছে খোঁজ নাও। ওরকম করে চেয়ে রইলে যে? বিশ্বাস হচ্ছে না? যদু সার্বভৌমের সন্তান…সাত পুরুষ ধরে মায়ের পায়ে মন্ত্র পড়ে ফুল দিয়ে আসছি, মায়ের পায়ে পড়ছে, কি খড়মাটির প্রতিমার পায়ে পড়ছে বুঝতে পারি। মা আসেন নি। অবশ্য পুজোর লগ্ন হয়েছে…খড়মাটিকে সাক্ষী করে মন্ত্র আওড়াতে হবেই… রামগতিকে তন্ত্রধারী করে বসিয়ে এসেছি, কিন্তু বুঝছি সব শুষ্ক, নিরর্থক। সনাতন, শুয়ে থাকলে চলবে না; ওঠ। তুমি বিশ্বাস করবে না বলে সব কথা বলতে সাহস পাচ্ছি না…কিন্তু সার্বভৌমের সন্তান পুজোর দিনে পুজো করাতে করাতে উঠে এসে মিছে কথা বলবে না; মায়ের পুজোর ফুলে আমি গন্ধ পর্যন্ত পাচ্ছি না…হতে পারে মনের ভ্রম…কিন্তু মা যে আসেন নি, প্রতিমার যে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয় নি এটা তোমাকে বিশ্বাস করতেই হবে…”
সনাতন রায় কতকটা নির্বিকার ভাবেই শুনিতেছিলেন, বলিলেন, “অবিশ্বাস করব কি করে? আমি নিজেই যে মায়ের বাপের বাড়ির পথ আটকে রেখেছি পুরুতমশাই। একটু দর্প হয়েছিল। মেয়েকে কেড়ে নিতে চেয়েছিলাম তার বাপের কাছ থেকে, তার মায়ের কাছ থেকে।… আমার নতুন মা কোথায়? রতি এসে বললে, বাগানে বসে আঁচলে চোখ মুছছেন।…ললিত নিজে গিয়ে তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে দিয়ে আসুক…বুঝতে পারি নি পুরুতমশাই, কোন্ মায়ের বুকের ব্যথা যে কোন মেয়ের বুকে বাজবে, অতটা আন্দাজ করতে পারি নি।… অপরাধ হয়ে গেছে।”
