চল্লিশ বৎসরের দুই প্রান্তে – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

চল্লিশ বৎসরের দুই প্রান্তে

কিঞ্চিদধিক চল্লিশ বৎসর পূর্বেই এই বাড়ির কর্তা ছিলেন বাচস্পতি মহাশয়,—গঙ্গাধর বাচস্পতি। অদ্বিতীয় বৈয়াকরণ, এদিকে স্মৃতি আর ন্যায়েও অসাধারণ অধিকার। সভাপণ্ডিতির জন্য একদিকে বর্ধমান, অপরদিকে কৃষ্ণনগর থেকে টানাটানির আর অন্ত ছিল না। যান নাই। বলিতেন, “বোনের দাবী করে রাখবার জন্যে কি মা-সরস্বতীকে তপস্যা করে ঘরে আনলাম?”

একটি চতুষ্পাঠী ছিল—নবদ্বীপ, মিথিলা এমন কি বারাণসী থেকেও ছাত্রসমাগম ছিল তাতে।

লোকে বলে, “দাম্ভিক ছিলেন। কত কি করে যেতে পারতেন, কিন্তু নিজের কোট ছেড়ে এক পা নড়লেন না কখন…”

ছিলেন নিশ্চয় অটল, দাম্ভিক।… সমুদ্র তো আর নিম্নগা নদীর প্রকৃতি অবলম্বন করিতে পারে না। যাহারা দেখিয়াছে তাহাদের এখনও বাচস্পতি মহাশয়ের প্রশংসা উঠিলে মনে পড়ে একটি দীপ্ত সৌম্য পুরুষসিংহকে উন্নত ললাট, দীর্ঘ নাসা, প্রশস্ত বক্ষে সংযত জ্যোতিচ্ছটার মত শুভ্র যজ্ঞোপবীত, প্রোজ্জ্বল অগ্নি-শিখার মতো রক্তাভ, সুগৌর, ঋজু, দীর্ঘ কলেবর। তখন ফুট-ইঞ্চি দিয়া দৈর্ঘ্য মাপিবার রেওয়াজ হয় নাই। দেশে সংস্কৃত-চর্চা ছিল,—‘রঘুবংশের’র দিলীপের তুলনা দিয়া লোকে বলিত—’শালপ্রাংশু’।

তিনি ছিলেন এক নাম, এক রূপ আর এক প্রতিজ্ঞায় চিরপ্রতিষ্ঠিত।

কিঞ্চিদূর্ধ্ব চল্লিশ বৎসর পরে, এখন এ বাড়ির কর্তা রমণীমোহন—বাবু রমণীমোহন ভট্টাচার্য, বাচস্পতি মহাশয়ের পৌত্র। চার ফুট নয় ইঞ্চির মানুষটি, গড়ন পাতলা-পাতলা, শৌখীন গোছের। বয়স বত্রিশ-তেত্রিশ বৎসর। রমণীমোহন—এই ফিনফিনে নামের জন্যও, এবং অনেকটা স্বল্প, সুকুমার দেহের জন্যও স্কুলে তাহার নাম হইয়াছিল ‘লেডি’। অন্তরঙ্গ বন্ধুমহলে সেটা এখনও জারি আছে।

ঠাকুরদাদা দৃঢ় প্রতিজ্ঞার লোক ছিলেন, রমণীমোহনের চরিত্রে তাহার অঙ্কুর ছেলেবেলা হইতেই দেখা গেল,—যেটা ভালো লাগিবে না সেটাতে কোন মতেই লাগিয়া থাকিবে না। কিছু সংস্কৃত পড়িল, ভালো লাগিল না, ছাড়িয়া দিল। গ্রামের স্কুলে সেকেন্ড ক্লাস পর্যন্ত পড়িল, তাহার পর আর ভালো লাগিল না। কলিকাতায় গিয়া মেসে থাকিয়া ম্যাট্রিক দিল, আই.এস.সি.-টাও পাস করিল; কিন্তু আর ওসব ভালো লাগিল না। বন্ধু-বান্ধবেরা বিস্তর বোঝাইল, অভিভাবকেরা বোঝাইল, চোখ রাঙাইল; মেয়েরাও কাঁদিয়া চোখ রাঙা করিল, কিন্তু রমণীমোহন অটল, ছেলেবেলায় যা মাত্র জিদ ছিল তা এখন স্ট্রং প্রিন্‌সিলে দাঁড়াইয়া গিয়াছে। শুধু একটি কথা যেন নখে দত্তে আঁকড়াইয়া বসিয়া রহিল, “আর ভালো লাগছে না।” কলিকাতা ছাড়িয়া বাড়ি আসিয়া বসিল।

মাঝের কয়েক বৎসরের ইতিহাস আরও দ্রুত ভালো লাগা না-লাগার কাহিনী। তাহার মধ্যে হাঁটু পর্যন্ত কাপড় পরিয়া চরকা-তলি কাটা হইতে আরম্ভ করিয়া চৌমাথায় দাঁড়াইয়া গান্ধীর চৌদ্দপুরুষান্ত করা—সবই আছে। এমন কি প্রায় সব ছাড়িয়া যে ছাগলিটির দুধের উপরই দিনকতক জীবনতরী বাহিয়া রাখিয়াছিল গান্ধীর উপর আক্রোশে সেটির বাচ্চার উপর দিয়াই এক সময় উগ্ররকম আমিষভোজী হইয়া উঠিল। কিন্তু উদরের ভালো না-লাগা বলিয়াও একটা ব্যাপার আছে; ছাগলির-দুধ-খাওয়া দুর্বল নাড়িতে তাহার ছানাদের হাড়-মাংস-চর্বি বরদাস্ত হইল না। খুব এক চোট পেটের ব্যারামে ভুগিয়া পছন্দসই নূতন পথ খুঁজিবে এমন সময় তাহার পিতার মৃত্যু ঘটিল।

দেবোত্তর ব্রহ্মোত্তর মিলাইয়া জমিজমা নিতাক্ত নিন্দার যোগ্য নয়; কিন্তু রমণীমোহনের জীবনের চরকার যুগ অনেকদিন অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে। এখন প্রিসিল্‌ বদলাইয়াছে, শুধু মাটি কামড়াইয়া পড়িয়া থাকা ভাল লাগিল না। কেমন যেন মনে হইতে লাগিল, একটা বাড়ির কর্তা, অথচ চাকরি করে না, এটা যেন কি রকম একটা খাপছাড়া ব্যাপার হইয়া পড়ে—কেমন যেন নেড়া নেড়া ভাব একটা—ঠিক কারণ দেওয়া যায় না, ঠিক বর্ণনা করাও যায় না…তবে শরীরের উপরে মাথাটিতে চুল না থাকার সঙ্গে বাড়ির কর্তার চাকরি না-থাকার নিশ্চয়ই কোন দিক দিয়া যেন একটা সাদৃশ্য আছে।

হাওয়ায় পরিবর্তন ঘটে; তাই এই বাড়ির এক কর্তা এক সময় রাজসভায় হাজরি দেওয়ায় অসম্মান জ্ঞান করিত, আর অন্য সময় অন্য এক কর্তা প্রবল উৎসাহে সবুট চরণ সকাশে ভিক্ষাপাত্র নিবেদন করিতেছে—আই হ্যাভ দি অনার্ টু বি ইত্যাদি, অর্থাৎ হে দাতা, তোমার নিতান্ত অনুগত দাসের বৃত্তিই আমার পরম সম্মান।

চাকরি হইয়াছে। রমণীমোহন এখন ডেলি প্যাসেঞ্জার। আশ্চর্যের বিষয়, ভালো না-লাগার অমন যে একটা উগ্র বৃত্তি ছিল রমণীর মনে এতদিন, সেটা প্রায় বিশ-পঁচিশ বৎসর তাহার সমস্ত জীবনের উপর দিয়া বিজয়-অভিযান করিয়া এইবার যেন শান্ত, সংযত হইয়া আসিয়াছে। এতদিন পরে এই একটা অবস্থা আসিয়াছে যাহা বেশ দিব্য ভালো লাগিতেছে—এইটা দাসত্বের অবস্থা।

বাচস্পতি মহাশয় এক নামেই দেশবিশ্রুত ছিলেন, পৌত্র এরই মধ্যে তিনটি নামে খ্যাত হইয়া পড়িয়াছে—রমণীমোহন, লেডি আর ছোটবাবু। শেষের নামটা এখনও আপিসেই আবদ্ধ আছে, পুষ্ট হইয়া একদিন ‘বড়বাবু’তে দাঁড়াইবে, ক্রমে গ্রামে আসিয়াও চারাইয়া পড়িবে।—রমণীমোহনের এখন সবচেয়ে উচ্চ আশা এই।…এ ভিন্ন লোকাল ট্রেনের দৈনিক রাজনীতি-বৈঠকে স্বরের উচ্চতা এবং আলোচনার উগ্রতার জন্য রমণীমোহনের বিশেষ নাম আছে, তবে সেটা গাড়িতেই নিবদ্ধ—সঙ্গে করিয়া নামিতে হয় না।

শুধু বহু নামই নয়, কর্মের দিক দিয়াও বাচস্পতি-পৌত্রের পিতামহ হইতে বিশিষ্টতা আছে। তাহার মূলেও প্রিন্‌সি, থিয়োরি প্রভৃতি কতকগুলি জটিল ব্যাপার আছে যাহা এ-যুগের মানুষের জীবন আরও সমস্যাঘন করিয়া তুলিয়াছে এবং যাহা দ্বারা সে নিজেকে ভালো মত ঠাহর করিতে পারিতেছে না, নিজের একটি নিজস্ব রূপ দাঁড় করাইতে পারিতেছে না।—অত্যুগ্র নাগরিক জীবন আছে আবার ব্যাক-টু-ভিলেজ অর্থাৎ গ্রামের সঙ্গে নাড়ির যোগের কথাও আছে; দেবদেবী আছেন, কুলধর্ম আছে, আবার এদিকে উদার বিশ্বমানবতাও আছে, সাহেব না হইলেও এক পা চলা দায়, আবার এদিকে স্বরাজ আছে, বিপ্লবের জয়গানও চাই—ইনক্লাব জিন্দাবাদ। সবেরই মর্যাদা রক্ষা করিতে হয় একটু-আধটু করিয়া। সারা যুগটাতেই থিয়োরি আর প্রিন্‌সিলের জট পাকাইয়া গিয়াছে। গঙ্গাধর বাচস্পতির যুগটা ছিল ‘না’ অথবা ‘হ্যাঁ’-এর আপোসের সব কিছুর সঙ্গে মানাইয়া বেশ মানানসই হইয়া চলিবার যুগ। যুগের দুইটার মধ্যে আপোসের অবসর ছিল না—রমণীমোহনের যুগটা ‘না’ এবং ‘হ্যাঁ’-এর এই মূল তত্ত্বটাই তাহার জীবনের প্রতি দিনটিতে মূর্ত হইয়া উঠে।…যে কোন একটা দিনের ইতিহাস পর্যালোচনা করা যাক্।

.

রমণীমোহন ভোরে উঠিল, অবশ্য সে-যুগের ব্রাহ্ম মুহূর্তে নয়, কেননা এ-যুগের হাইজীন্ অর্থাৎ স্বাস্থ্যতত্ত্ব বলিতেছে তাহাতে এক্সপোজারের ভয় আছে।… প্রাতঃকৃত্য সারিয়া একটা খাটো ময়লা কাপড়ের উপর গামছাটা জড়াইয়া হাতে একটা দা লইয়া খিড়কির বাগানের দিকে চলিয়া গেল। এ ব্যাপারটা বঝ্যাক্‌-টু-ভিলেজ, গ্রামের সঙ্গে, মাটির সঙ্গে মিতালি। আজ কিন্তু বেশি সময় দিতে পারিবে না রমণী; ষষ্ঠীপূজা আছে; আটটি যজমানের বাড়ি হাজিরা দিতে হইবে। হাতে একটি রিস্ট-ওয়াচ বাঁধা, ঘুরিয়া ফিরিয়া এ-গাছটার মাথায় কোপ, ও-লতাটার গোড়ায় কোপ বসাইয়া ঠিক পনেরো মিনিট ব্যাপী যেন একটি ল্যাবরেটরি-গ্রাম্য জীবন অতিবাহিত করিয়া ফিরিয়া আসিল। ক্লান্তি অপনোদনের জন্য একটি বিড়ি ধরাইল, সেটা ভস্মীভূত করিয়া তেল মাখিয়া তালপুকুরে স্নান করিতে চলিয়া গেল।

স্নানের পরের রমণীমোহন একেবারে অন্য লোক। পরিধানে পট্টবস্ত্র, গলায় সাবান দিয়া কাচা ঝকঝকে পৈতা, গায়ে নামাবলী, কপালে, কর্ণমূলে চন্দনের রেখা, টেড়ির ও-প্রান্তে টিকিটি বড় বড় হালফ্যাশানী চুলের মধ্যে থেকে স্বতন্ত্র করা, একটি বিশ্বপত্র বাঁধা; ডান হাতের অনামিকাতে একটি কুশাঙ্গুরীয় পরানো। রমণীমোহন বাড়িতে রান্নার তাগাদা দিয়া ষষ্ঠীপূজা অভিযানে হনহন করিয়া বাহির হইয়া গেল। মনটা আরও আগাইয়া গিয়া স্টেশনে ন’টা ছত্রিশের গাড়ির অপেক্ষা করিতে লাগিল।

আটটা বাড়িতে পূজা সারিতে আটটা পঁয়তাল্লিশ হইয়া গেল। অবশ্য পূজা যা হইল তাহাতে যজমানের রাতারাতি বংশলোপ হইবার কথা, নেহাত বাঙালী পরিবার বলিয়াই রমণীর পূজার উজান ঠেলিয়াও বৎসর বৎসর বংশবৃদ্ধিই হইতেছে।

হাতে ঠিক একান্নটি মিনিট। ইহার মধ্যে কাপড়-চোপড় বদলান, খাওয়া, একটু বিশ্রাম, গাড়ি ধরা। তবে বেশ কেমন করিয়া যন্ত্রের মত হইয়াও তো যাইতেছে মন্দ নয় এই বছর দুই ধরিয়া। ভাত বাড়িবার তাগাদা দিতে দিতে বাড়ি ঢুকিয়া রমণী প্রথমেই মণিবন্ধে ঘড়িটা বাঁধিয়া লইল। কাঁটার দিকে চাহিয়া কপাল কুঁচকাইয়া বলিল, “বাবাঃ-আজ আবার পুজোতে পাঁচ মিনিট দেরি করিয়ে দিলে—ঐ নটবর-কাকার বাড়িতে—নিশ্চয় গিন্নী নেই, ওসব হালফ্যাশানের বউদের কি পুজোর যোগাড় করা পোষায়…কই গো দিলে ভাত?… নাঃ…”

আহারটি হাইজীন-সঙ্গত—দ্রব্য হিসাবেও, রন্ধনের প্রক্রিয়া হিসাবেও, আবার আহারের পদ্ধতির দিক দিয়াও। দ্রব্যের দিক দিয়া বলা যায়—রমণী ঠাকুরদাদার যুগকেও অনেক পিছনে ফেলিয়া গিয়াছে—অল্পস্বল্প নয়—প্রায় হাজার-আড়াইয়েক বছর, যখন তেল-মসলা এমন কি বোধ হয় কুলো-বঁটিরও ব্যবহার ভালো করিয়া জানা ছিল না। কুটনা কোটায় কিংবা রন্ধন-প্রক্রিয়ায় কোন জিনিসেরই ভাইটামিনের উপর হাত পড়িয়াছে কিনা ভালো করিয়া একবার দেখিয়া লইয়া, হাত উলটাইয়া ঘড়িটা কসষ্ট করিয়া রমণী খুব সংযত ভাবে আসন গ্রহণ করিল। তাহার পর বাঁ হাতের কনুইটা খুব অনুভব করিয়া করিয়া বাঁ দিকের পাঁজরার নিচে খানিকটা প্রবেশ করাইয়া ঝুঁকিয়া আহারে প্রবৃত্ত হইল। (আপনারা জানেন না তাই হাসিতেছেন)—ইহাতে লিভার হইতে হজমের রস অবাধে নিষ্ক্রমণ হয়, হজমের সহায়তা করে। আহার্যগুলা দাঁতে পিষিয়া পিষিয়া স্যালিভার সঙ্গে একেবারে মিশাইয়া আহার সমাপন করিতে করিতে ঠিক পঁচিশটি মিনিট লাগে। এতে দাঁতও অবিকৃত থাকে, পরিপাকও নির্দোষ রকম হয়। দাঁত এবং পরিপাকশক্তি দুইটাই খুব খারাপ বলিয়া রমণী ইহার এক মিনিট এদিক-ওদিক হইতে দেয় না।

“লেডির হল?”-জয়হরি ডাকিয়া গেল, ন’টা বাইশ লোক্যাল ট্রেনের জয়হরি। রমণী তখন সংযতভাবে শ্বাস ঊর্ধ্বে টানিয়া দুধের বাটিতে চুমুক দিতেছে, উত্তর দিল না। বাটিটা রাখিয়া তাহাতে খানিকটা জল ঢালিয়া সেটুকুও দুধের প্রথাতেই চুমুক দিয়া বাটিটা নামাইয়া রাখিল, মুখটা অত্যন্ত বিকৃত করিয়া নাকিসুরে বলিল, “আচ্ছা, কেন খাবার সময় ডিস্টার্ব করা বল তো?—ঐটুকু ডেকে আপ্যায়িত না করলেই হত না?—হল তো একটা বিঘ্নি খাবার সময়?—এখন সামলাই সমস্ত দিন ধরে—”

ঢেকুর তুলিতে তুলিতে এবং পেটে টোকা মারিতে মারিতে উঠিয়া পড়িল।

মা বসিয়া ছিলেন, দীর্ঘনিশ্বাস মোচন করিয়া বলিলেন, “কি ঢেকুরের ঘটা বাবা বুড়োর মত। শ্বশুরঠাকুরের অত বয়সেও কেউ এ-সব উপদ্রব দেখে নি।”

রমণী আবার নাকমুখ কুঞ্চিত করিয়া বিরক্তভাবে বলিল, “আরে রোজ দেখছ এই রকম একটা না একটা বিঘ্ন হচ্ছে! ঠিক খাবারটি সময়-নয় জয়হরে, নয় পেনো, নয় যতে…যত ওদের বারণ করি…হঠাৎ টুকে দিলে হজমের নাড়িতে শক্ লাগবে, তা শুনবে কেউ?”

আসন ছাড়িয়া আবার মূর্তি বদলাইয়া গেল। পূজাতে পাঁচ মিনিট সময় গিয়াছে—জয়হরেও মিনিট-খানেকের ধাক্কা দিয়া গেল। ঠিক সাত মিনিট আর সময় আছে, বাহির হইতেই হইবে। বিদ্যুৎ-চালিতের মত আঁচাইয়া, জুতা-জামা পরিয়া লইল, আজ আবার একটি ফালতু হাঙ্গামা আছে—পুজোর হাঙ্গামে টিকিটি পৃথক করা আছে—আঁচাইয়া বড় চুলের সঙ্গে সেটাকে আবার একাকার করিয়া দিতে হইবে, কপালের, কানের ফোঁটা-চন্দন মুছিয়া ফেলিতে হইবে–সাহেব চটা বেজায় এসবে।

দেবতার পরে সাহেবের মন রাখিবার জন্য তাড়াতাড়ি এই সব ত্রুটি সারিয়া রমণী শুইবার ঘরে গিয়া একটু হাঁপাইতে হাঁপাইতে একটা ডেক-চেয়ারে হেলিয়া পড়িল। স্ত্রী মনোরমা পানের ডিবা এবং একটা বিস্কুটের বাক্স হাতে করিয়া প্রবেশ করিল।

ডেক-চেয়ারের আরামটি বাঁধা পাঁচ মিনিটের, এই সময় স্ত্রীর সহিতও রুটিন-বাঁধা একটু একথা-সেকথা, একটু ফষ্টিনষ্টি হয়।…ডাক্তারি বিজ্ঞান বলিতেছে—আহারের পরেই শরীর এলাইয়া একটু রিল্যাক্সেশ্যন, আর হালকা গোছের একটু কথাবার্তা হজম এবং পরমায়ুর পক্ষে খুব উপকারী। তাহার মানে এই পাঁচ মিনিট মনোরমা একটা জারক ঔষধের শিশি। একটু কথা কওয়া, একটু হাসি, একটু ঠাট্টা-প্রশংসা—সে-সব সেবনের পূর্বে শিশিটাকে একটু নাড়িয়া লওয়া…ডাক্তারি বিজ্ঞানেরই একটা নির্দেশ-শেক্‌ দি ফায়েল বিফোর ইউজ…

“আজ ছোটবাবুর বড্ড দেরি হয়ে গেল, হাঁ করুন, পানটা আমিই না-হয় মুখে দিয়ে দিই, সময়ের সুসার হবে এখন।

হাসিয়া মনোরমা ডিবা হইতে দুইটা পান বাহির করিয়া স্বামীর মুখে পুরিয়া দিতে যাইতেছিল, রমণী হাত উলটাইয়া একবার চকিতে ঘড়িটা দেখিয়া লইল, “ওঃ, বড্ড দেরি হয়ে গেল, আজ আর তিন মিনিটের বেশি রেস্ট-এর জন্যে দেওয়া যাবে না”—বলিয়া প্রায় লাফাইয়া স্ত্রীর হাত হইতে পান দুইটা লইয়া তাড়াতাড়ি মুখে পুরিয়া দিল; মুখটা যে সে বেচারির কেমন-ধারা হইয়া গেল সেটা লক্ষ্য করিবারও ফুরসত নাই। ডিবাটা পকেটে পুরিল, বিস্কুটের টিফিনবাক্সটা বাঁ হাতে লইল, তাহার পর পটের কালীর দিকে যুক্তকরে দাঁড়াইয়াই হঠাৎ ঘুরিয়া বলিল, “খুব মনে পড়ে গেল প্রণাম করতে গিয়ে,—আজ আমার আসতে দেরি হবে, লাস্ট ট্রেনে আসব।”

আবার ঘুরিয়া যুক্তকর তুলিতে যাইবে, মনোরমা প্রশ্ন করিল, “কেন?”

আধ-ফেরা হইয়া রমণী বিরক্তভাবে বলিল, “সব কথায় টোকা কেন যাত্রার সময়?…আজ গোলদীঘিতে মহাবোধি হলে বিখ্যাত ফ্রেঞ্চ পণ্ডিত ফাদার লা মোসা—’সত্যধর্ম ও ধর্মে অসত্য’-নিয়ে এক বক্তৃতা দেবেন… পারলে বুঝতে কথাটা? কেমন একটা ওব্যেস, টুকতেই হবে, হাজার তাড়াতাড়ি থাকুক লোকের!”

পুরা প্রণাম আর করা হইল না; তাড়াতাড়ি আর একবার পটের দিকে চাহিয়া, কপালে হাত ঠেকাইয়া হনহন করিয়া বাহির হইয়া গেল।

সেই পটের দিকেই চাহিয়া চাহিয়া মনোরমার একটা দীর্ঘনিশ্বাস পড়িল। তবে ব্যাপারটা কিছু নূতন নয়, মন হইতে ঝাড়িয়া ফেলিয়া কাজে বাহির হইয়া গেল।

.

কিঞ্চিদধিক চল্লিশ বৎসর পূর্বে এই বাড়ির, সম্ভবত এই ঘরেরই একটি দৃশ্য উদ্ঘাটিত করিলে চলে।

সময়টাও এই, অর্থাৎ দিবার প্রথম প্রহর মাত্র শেষ হইয়াছে, সূর্য দেখিয়া অনুমান হয়; তখন সূর্যের সঙ্গে সব দিক দিয়াই যোগটা নিবিড়তম ছিল।

গঙ্গাধর বাচস্পতি প্রাতঃকালীন পূজা-আদি সমাপন করিয়া এই ঘরের সামনে আসিয়া দাঁড়াইলেন; সদ্যসঞ্চিত পুণ্যে সমস্ত শরীর ভাস্বর, যেন সূর্যদেহচ্যুত একটি জ্যোতিঃ-শিখা। গৃহিণী একটি বঁটিতে ঊরু চাপিয়া একটি বড় থালায় নানাবিধ ফল কাটিয়া সাজাইয়া রাখিতেছিলেন, মুখ ফিরাইয়া চাহিয়া, কাপড়ের চওড়া টক্‌টকে লাল পাড় কপালের উপর একটু টানিয়া দিয়া বলিলেন, “হল পুজো?… দেখো…”

শেষের এই কথাটুকু একটা সতর্কতার বাণী। বাচস্পতি মহাশয়ের মাথাটা চৌকাঠের উপর যায়, তাই সাবধান করিয়া দেওয়া।

মাথাটা নিচু করিয়া প্রবেশ করিতে করিতে বাচস্পতি মহাশয় হাসিয়া বলিলেন, “ও বলতে হবে না, স্বয়ং তুমি যখন ভেতরে রয়েছ, মাথা আপনিই নুয়ে আসবে।”

গালে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়া উঠায় গৃহিণীর নথটা একটু চঞ্চল হইয়া উঠিল, বলিলেন, “আর রঙ্গ করতে হবে না, বস এসে। বড্ড বেলা হয়ে যাচ্ছে আজকাল পুজোতে।”

“আর এদিক থেকে সময় ওদিকে যতটা যায় ততই ভালো; এদিককার বেলাও তো পড়ে আসছে?”

আসন পাতা ছিল, বাচস্পতি মহাশয় গিয়া তাহার উপর বসিলেন। গৃহিণী মিছরির পানা আর ফল, ভিজান মুগের ডাল ও ছানার থালাটা সামনে আগাইয়া দিয়া বলিলেন, “তা পড়ে আসছে বই কি।”

একটু লজ্জিত অথচ প্রসন্ন হাসি হাসিয়া স্বামীর মুখের পানে চাহিলেন। যাহাদের দিনমান কাটিয়াছে ভালো, বেলা যখন পড়ন্ত সে-সময় ব্যর্থতার অনুতাপে যাহাদের অতীতের দিকে চাহিতে হয় না, এ তাহাদের মুখের হাসি।

“মুগের ডাল আজ বেশি ভিজিয়েছ।”

“বৌমা ভিজিয়েছিলেন।…তা হোক, খেয়ে নাও, আবার সেই দুপুর গড়িয়ে গেলে ভাতে বসবে তো?”

বধূমাতা একটি কালো পাথরের রেকাবি হাতে করিয়া প্রবেশ করিল। শাশুড়ী তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিলেন, “দেখেছ মরণ? আর মনেও থাকে না কিছু।…রেখে দাও ওঁর সামনে মা।…বউমার নিজের হাতের গড়া সন্দেশ, এবার বাপের বাড়ি থেকে শিখে এসেছেন। কেমন হল দেখ।…আজকালকার মেয়েরা যে শিখছে এই সব নানান রকম।”

অবগুণ্ঠনবতী পুত্রবধূ রেকাবি শ্বশুরের সামনে রাখিয়া একটু কুণ্ঠিতভাবে সরিয়া দাঁড়াইল। অভিমতের অপেক্ষা করিতেছে।

শ্বশুর ফলমূল থেকে হাত সরাইয়া ধীর আগ্রহে একটা সন্দেশ তুলিয়া মুখে দিলেন, বিচক্ষণতার সহিত আহার করিয়া বলিলেন, “বাঃ, চমৎকার! তুমি বলে না দিলে মনে করতাম আমাদের তারু ময়রার মেয়ে গড়েছে বুঝি।…অতি মধুর!”

দুইজনেই হাসিয়া উঠিলেন। বধূর শরীরটিও অবগুণ্ঠনের অন্তরালে দুলিয়া উঠিল। গৃহিণী হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “উনি অত মেহনত করে গড়ে খাওয়ালেন, পুরস্কার হল, বেহানের গালাগাল খাওয়া—এমনই যুগই পড়েছে বটে!”

আর একটা তুলিয়া লইয়া বাচস্পতি মহাশয় বলিলেন, “না, সত্যিই বড় উপাদেয় হয়েছে মা। রোজ আমার বরাদ্দ রইল, তবে এতগুলো করে নয়—ছেলে তো তোমার বুড়ো হতে চলল কিনা…”

আহারান্তে ধীরে-সুস্থে চতুষ্পাঠীর দিকে অগ্রসর হইলেন।

.

প্রচুর স্বাস্থ্যে, প্রচুর অবসরে, প্রচুর মুক্তিতে, সমস্ত সম্বন্ধ পূর্ণভাবে উপভোগ করা, সমস্ত রস নিংড়াইয়া পান করা, ওদিকে এক আত্মসমাহিত জীবন;—জীর্ণ, অকালবৃদ্ধ, অনবসর, শৃঙ্খলিত, স্বজনবিচ্ছিন্ন, চিরবুভুক্ষু, এদিকে এক শতবিক্ষিপ্ত জীবন।

মাঝে মাত্র চল্লিশটি বৎসরের ব্যবধান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *