জামাইষষ্ঠী – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

জামাইষষ্ঠী

হঠাৎ বিজলিবাতি নিভিয়া গিয়া গাড়িটা অন্ধকার হইয়া গেল।

এ লাইনে এরকম হইয়াই থাকে। গুছাইয়া-সুছাইয়া বসিয়া, বইখানি খুলিয়া নিশ্চিত্তমনে পড়িতে বসিলে—দপ করিয়া আলোটা নিভিয়া গেল। ‘দুত্তোর’ বলিয়া হাত-পা ছড়াইয়া শুইয়া পড়িলে, তেমনি হঠাৎ আলোটা জ্বলিয়া উঠিয়া চোখের উপর ঠিকরাইয়া পড়িতে লাগিল! এ একরকম ফ্যাসাদ আর কি! রেলবিভাগের অনেককে জিজ্ঞাসা করিয়াছি; বেহারী হইলে হাতটা চিতাইয়া নির্লিপ্তভাবে বলে, “জানে হমানজি;” বাঙালী হইলে উল্টাইয়া প্রশ্ন করে, “এ লাইনের কোন্ জিনিসটা ঠিক চালে চলতে দেখেছেন মশায়?”

কোনটাই ঠিক ভাবে চলিতে দেখিয়াছি বলিয়া মনে হয় না, কাজেই চুপ করিয়া থাকিতে হয়। প্যাসেঞ্জাররা নির্বিকার, নির্বিকল্প। থার্ডক্লাসে বসিলে প্রায় শোনা যায়, কঙ্কর সাজিতে সাজিতে কিংবা খৈনিতে তালি দিতে দিতে এখানকার অননুকরণীয় গ্রাম্য হিন্দীতে কেহ বলিতেছে, “আসমানকে বিজলি বানু?”…ইত্যাদি, অর্থাৎ আকাশের বিদ্যুৎ—ও তো এমনি দপ্ করিয়া নিভিবেই, দপ করিয়া জ্বলিবেই,—এ আর কি নতুনটা দেখিলে সবাই!

তড়িৎ-বিজ্ঞানের এমন বিশদ ব্যাখ্যা শুনিয়া শ্রোতার দল তুষ্ট হইয়া বলে, “ওয়াজিব—ওয়াজিব” অর্থাৎ—হ্যাঁ, ঠিকই তো…।

দুই বন্ধুতে অনেক দিন পরে দেখা। নৃপেন বলিতেছিল, “সো গ্ল্যাড! তারপর, খবর কি? শুনেছিলাম কার মুখে যেন যে এই কলেজেই ভর্তি হয়েছিস! কাছেই থাকি, কিন্তু একবার এসে যে—”

এই সময় আলোটা হঠাৎ নিভিয়া গেল। ওদিকে গাড়ি ছাড়িবার ঘণ্টা পড়িল; লাঠি পাগড়ি সমেত এক দল এদেশী লোক সাঙ্গোপাঙ্গদের হাঁক দিতে দিতে, এবং তারই মধ্যে দু-একজন তারস্বরে মকাইয়ের বাজারদর আলোচনা করিতে করিতে গাড়ির মধ্যে ঢুকিয়া পড়িয়াছিল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই—”ই ডেওঢ়া বা হো!” বলিয়া জটলা বাঁধিয়া নামিয়া গেল। খানায় আটকান বন্যার জলের মত মাত্র দুটি লোক অবশিষ্ট রহিয়া গেল।

নৃপেন বলিল, “বিলকুল রেহাই দিলে না, গেল দুটোকে ছেড়ে!”

ইন্টার ক্লাসের গাড়িটা যেখানে দাঁড়াইয়া ছিল, তাহার কাছাকাছি প্ল্যাটফর্মে আলো নাই, তায় আকাশে মেঘ, তবু আন্দাজে একটু লক্ষ্য করিয়া দেবেশ বলিল, “না, এরা ভদ্রলোক বলে বোধ হচ্ছে, ভেড়ার দল সবই নেমে গেছে।”

কামরায় তিনটি বেঞ্চ। একটিতে গদি নাই, একটিতে একখানি বিশাল বপু কপট নিদ্রায় সতর্কভাবে নাক ডাকাইতেছে। আগন্তুক দুটি অন্ধকারে একটু এদিক-ওদিক করিয়া দেবেশের বেঞ্চির এক কোণেই বসিয়া পড়িল।

নৃপেন বলিল, “সে যাই হোক্, যখন হাতের মধ্যে পেয়েছি, ছাড়ছি নে। আমার বাড়ি তিনটি স্টেশন পরেই, নেমে অন্তত একটা দিন কাটিতে যেতেই হবে। ভালো কথা, যাওয়াটা হচ্ছে কোথায় তাও তো জিগ্যেস করি নি। পেটে এত কথা হুড়োহুড়ি করছে যে, কোনটে রেখে কোটে যে জিগ্যেস করব…”

দেবেশ বলিল, “ভাই, যেখানে যাচ্ছি তা যদি তোমায় জানাই তো ভয় হয় নেমন্তন্ন কেটে উলটে সঙ্গ না নিয়ে বস।”

“কি রকম, কি রকম?”

“যাচ্ছি শ্বশুরবাড়ি, পুশারোড স্টেশনে; তোমার আগেই নেমে যাব। আশা আছে নিজে অনভিজ্ঞ হলেও…”

“শ্বশুরবাড়ি!”—বলিয়া নৃপেন বিস্ময়ে একরকম চিৎকার করিয়াই উঠিল। “বিয়ে করলে কবে? কই, ঘুণাক্ষরেও তো জানাও নি!”

“ঠাকুরমার অসুখের কল্যাণে ব্যাপারটা একেবারে হঠাৎ হয়ে গেল। তবু অপরাধ স্বীকার করছি; দণ্ডাদেশ কর।”

গাড়ি ছাড়িয়া দিয়াছিল। পাশে দুইটি ভদ্রলোক আছে বটে, তবে তাঁহারা নিশ্চয় বেহারী, তাহার উপর অন্ধকারে তাঁহাদের মুখ দেখা না যাওয়ায় চক্ষুলজ্জার বালাই নাই। বিশ্রম্ভালাপ খুব জমিয়া উঠিল। বাধামুক্ত গলা গাড়ির আওয়াজেরও দুই পর্দা উপর দিয়া চলিল—শ্বশুরবাড়ির কথায় হৃদয়ের দুয়ার একেবারে হাট আদুড় করিয়া দেয় কিনা!

নৃপেন হাসিয়া বলিল, “কি সাজা দোব? তোমার কাছে এখন রাজার রাজ্যও তো অকিঞ্চিৎকর।” একটু ভাবিয়া বলিল, “বেশ, দিচ্ছি দণ্ড—এক একটি মুহূর্ত এখন তোমার কাছে অমূল্য, তাই থেকেই তোমায় মোটা রকম কিছু বঞ্চিত করলাম,—অর্থাৎ আমার ওখানেই তোমায় আপাতত যেতে হচ্ছে”–বলিয়া আরও জোরে হাসিয়া উঠিল।

দেবেশ জানালার পাতলা আলোর সামনে হাতজোড় করিয়া বলিল, “এই তো হল দণ্ড? এখন আমার স্বপক্ষে একটু আপিল করতে চাই, ভরসা আছে মাননীয় বিচারপতি মহাশয় নিজে মর্মজ্ঞ না হলেও যুক্তির সারবত্তা দেখে তাঁর কঠিন মন টলবে। তাহলে ধর্মাবতার, প্রণিধান করিতে আজ্ঞা হোক। –এই সামান্য দোষে এক মুহূর্তের জন্যও শ্বশুরবাড়ি থেকে বঞ্চিত করা লঘু পাপে গুরু দণ্ড হয়ে পড়ে, কেননা, ধরার তাপদগ্ধ মানবের একমাত্র চরম সান্ত্বনা এই শ্বশুরবাড়ি। সাহিত্য-সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র বলে গেছেন—ভ্রমর জগতে অতুল, চিন্তায় সুখ, সুখে অতৃপ্তি, দুঃখে অমৃত। সব গোবিন্দলালের আপন আপন ভ্রমণ সম্বন্ধে এ কথাটা সমান ভাবে খাটলেও, তাঁদের নিজের নিজের পিতৃগৃহে সব ভ্রমরই আর অনেকানেকের তুলনায় অতি অকিঞ্চিৎকর, নিতান্ত খেলো, কেননা তাঁদের চেয়েও এমন সব মধুরতম মধুরতম জীব সেখানে বিহার করেন যাঁদের মহিমা বর্ণনায় ভাষাও মৌন হয়ে পড়ে। সেখানে থাকেন শালী—তিনি ধরায় স্বর্গ, স্বর্গে অপ্সরা, অপ্সরায় ঊর্বশী; সেখানে থাকেন শালাজ—তিনি আবার শালীর চেয়েও শক্তিশালী। ধরার আদেখলো জীব আমরা, হদ্দ স্বর্গ আর ঊর্বশী পর্যন্ত কায়ক্লেশে ধারণা করতে পারি, সুতরাং এঁদের বর্ণনার চেষ্টা করে কল্পনাশক্তিকে আর অপদস্থ করব না।

“শ্বশুরবাড়ির মর্ম যে শুধু আমরাই বুঝেছি তা নয়; দেবতারাও বাদ যান না। আমাদের তেত্রিশ কোটি দেবতাদের জ্বাল দিয়ে ক্ষীর করলে তিনটি বড় বড়তে এসে ঠেকেন—ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। ব্রহ্মা আগে কি রকম ছিলেন বলা যায় না, তবে বার্ধক্যে এসে পিতামহ হওয়া পর্যন্ত চরাচরে শ্বশুরবাড়ি সৃষ্টি করা নিয়ে মেতে আছেন। বাকি রইলেন বিষ্ণু আর মহেশ্বর; এঁদের শ্বশুরবাড়ি-প্রীতি ব্যাখ্যান করে কবি কি মন্তব্য দিচ্ছেন ধর্মাবতরের শুনতে আজ্ঞা হোক—

হিমালয়ে হরঃ শেতে হরি শেতে পয়োনিধৌ
অসারে খলু সংসারে সারং শ্বশুর-মন্দিরম।

“হর, অর্থাৎ মহেশ্বরের শ্বশুরবাড়ি হল হিমালয়ে, তিনি সারা জীবনটা সেইখানেই কাটিয়ে দিলেন। হরির, কিনা বিষ্ণুর শ্বশুরবাড়ি হল পয়োনিধি অর্থাৎ সমুদ্র, কেন না বিষ্ণুজায়া লক্ষ্মীর উদ্ভব সেইখানেই, তাই তিনি সেইখানেই শয়ন করে কাটালেন। এই সব দেখে শুনে কবি বলছেন, এই অসার সংসারে ‘শ্বশুর-মন্দিরম্’ই হচ্ছে সার বস্তু। সুতরাং ধর্মাবতার, যদি অধমকে এ-হেন শ্বশুর-মন্দির থেকে বঞ্চিত করেন তো…”

পাশের ভদ্রলোকটি বেশ একটু জোরে গলা-খাঁখারি দিয়া নড়িয়া চড়িয়া বসিল। দেবেশ নৃপেনের গা-টা টিপিয়া গলা নামাইয়া বলিল, “বোধ হয় বাংলা বোঝে রে।”

কথাগুলো নৃপেনের লাগিতেছিল ভাল এবং ক্রমে খোদ বন্ধুপত্নীর সরসতর প্রসঙ্গে আনিয়া ফেলিবার বাগ খুঁজিতেছিল। আস্তে বলিল, “বোঝে তো মাথা কেটে নেবে, হ্যাঃ।” তাহার পর জোরেই বলিল, “এ যুক্তির ওপর তোমায় মার্জনা করা যায় না; বৈষ্ণবিক ভাষায় বলতে গেলে এহ বাহ্য, আরও কিছু থাকে তো বল।”

পাশের সহযাত্রীটির গলার আওয়াজে যে একটু কুণ্ঠা আসিয়া পড়িতেছিল তাহা আর জমিতে পারিল না। তা ভিন্ন শ্রোতার শুনিবার ইচ্ছার চেয়ে বক্তার বলিবার ইচ্ছা কম বলবতী ছিল না। দেবেশ বলিয়া চলিল, “একে তো এ-হেন শ্বশুরবাড়ি যাত্রা, তাতে আবার যাত্রার উপলক্ষটা গুরুতর—কাল জামাইষষ্ঠী। এই দিনটার দিকে সাধারণ জামাতা-সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমিও সারাটি বছর সতৃষ্ণ নয়নে চেয়ে আছি, যদি বঞ্চিত হই তো আয়ুক্ষয় হবে, আবার একটা বছর বেঁচে থাকবার উৎসাহ হারাব। তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যে ভগবান প্রজাপতি এই দিনটি লাল পেন্সিলে দাগ দিয়ে আমাদের জন্য আলাদা করে দিয়েছেন। এদেশটা নীরস! এই গাড়ি যদি বাঙলাদেশের গাড়ি হত তো আদমসুমারী করলে দেখা যেত, এর শতকরা নব্বই জন জামাই। হরেক রকমের জামাই—সিদে জামাই, কুঁজো জামাই, ঢেঙা জামাই, বেঁটে জামাই, মাকুন্দো আর গুঁপো জামাই, আনকোরা, দোজবরে জামাই—মোটকথা যতরকমের জামাই আজ পর্যন্ত বেরিয়েছে। বাকি দশজন হচ্ছেন শ্বশুর কিংবা সম্বন্ধী জাতীয়—শহর থেকে জামাইষষ্ঠীর বাজার করে ফিরছেন! আহা চিন্তায়ও সুখ,—বাড়িতে কিংবা হস্টেলে যাকে দিনাত্তেও কেউ একবারও ফিরেও দেখে না, আছি কি গেছি—সেই নগণ্য দ্যাবার জন্যে শাশুড়ী এতক্ষণ বোধ হয় চর্বচোষ্যলেহ্যপেয় তোয়ের করতে ঘর্মাক্ত; শালীমহল সুমিষ্ট প্রবঞ্চনার নতুন নতুন উপায় আবিষ্কারে ব্যস্ত। ছোট শহর, সেখানে সব জিনিস পাওয়া যায় না, শ্বশুরমশাই আজ সারাটা দিন বোধ হয় রোদবৃষ্টি মাথায় করে আমারই রসনাতৃপ্তির জন্যে সারা মজঃফরপুর ঘেঁটে বেরিয়েছেন—কে জানে বোধ হয় এই গাড়িতেই কোথাও বসে হৃষ্টচিত্তে ভাবছেন—যাক্, দিব্যি আমগুলো পাওয়া গেছে, দেবেশ আমার ল্যাংড়া যেমন ভালবাসে। সে বেচারির এইতেই ফূর্তি; দেবেশ ভালবাসে এইতেই তিনি কৃতার্থ—হাত্তোর বোকারাম রে!

“এই জন্যেই তো গিন্নীকে শাসিয়ে রেখেছি—দেখ, যদি মেয়ে হয় তো তোমায় ডাইভোর্স করব কিন্তু। আমি করব উপার্জন, তার ওপর আবার বাজার করতে পায়ে ঘাঁটি পড়াব, আর সে ব্যাটা জামাই—–লবাব খাঞ্জা খাঁ আমার, দিব্যি পায়ের ওপর পা দিয়ে…”

শেষ হইবার পূর্বেই দুজনে হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিল, এবং পাশের লোক দুটিও অর্ধস্ফুট হাসিতে কাঁপিতে লাগিল। মুখ দেখা না গেলেও দেবেশ তাহাদের দিকে চাহিয়া কহিল, “আপলোক বাঙলা সমঝতেহেঁ মালুম পড়তা; ঠিক হ্যায় কি নেহি কহিয়ে না—হাম মরে কামা করকে, আওর…মেরা দামাদ…”

নৃপেন হাসিতে হাসিতে জিজ্ঞাসা করিল, “আর যদি জামাই হয়ই তোমার দুর্ভাগ্যবশত?”

দেবেশ বলিল, “তাহলে আমার চেয়ে তাঁরই দুর্ভাগ্য বেশি! বাবাজী যেমনি পাঞ্জাবি দুলিয়ে, কোঁচা লুটুতে লুটুতে জামাইমার্কা মৃদু হাস্য করতে করতে লটবর চালে গাড়ি থেকে নেমে এসে প্রণাম করবেন, অমনি গলাটি টিপে ধরে রাস্তার দিকে মুখটি ফিরিয়ে দিয়ে বলব, যাও, সিদে উলটোমুখে; মেয়ে দিয়েছি, হয়ে গেছে, আবার এখানে কি মনে করে সোনার চাঁদ…?”

হাসি চলিতে লাগিল। পাশে দুইটি অপরিচিত লোক—এই চিন্তায় যা বা একটু সংকোচ ছিল সেটা ক্রমে ক্রমে একেবারেই কাটিয়া গেল। ক্রমশ এ-দুজনের চক্ষে তাহারা রসিক ও সমঝদার হিসাবে যেন দলভুক্তই হইয়া পড়িল। অন্ধকারে বয়সও ভাল বোঝা যায় না, এবং সেইজন্যই সমবয়সী বা কাছাকাছি ঐরকম বলিয়া ধরিয়া লইতেও আটকাইল না। দেবেশ মাঝে মাঝে তাহাদের সাক্ষী মানিতে লাগিল, “ঠিক হ্যায় কি নেহি, সাহেব, কহিয়ে”

অন্ধকার ভেদ করিয়া এবং নিবিড়তর অন্ধকার গর্ভে পুঞ্জীভূত করিয়া গাড়ি ঠায় চলিয়াছে। এই রহস্যময় আবেষ্টনীকে নব্য জামাতার কৌতুকময় শ্বশুরালয়-রহস্য বেশ একটি অদ্ভুত রসে আর্দ্র করিয়া তুলিল।

নৃপেন বলিল, “আপিলের যুক্তি খুব সারবান বটে! এইরকম একজন ভাবী শ্বশুরকে তার নিজের শ্বশুর-মন্দিরে যেতে দেওয়া তবেই চলে, যদি তার নিজের শ্বশুর সমুচিত অভ্যর্থনার জন্য লগুড়হস্তে দ্বারদেশে দাঁড়িয়ে থাকতে রাজী হন। তা তোমার শ্বশুরের মতামত যখন এখানে পাচ্ছি না…”

কণ্ঠস্বরে ভয়ের অভিনয় করিয়া দেবেশ তাড়াতাড়ি বলিল, “না, ধর্মাবতার, মাফ করা হোক, ওটা সাক্ষীর temporary insanity, সাময়িক মস্তিষ্ক বিকার—আপনার মূল দণ্ডের আদেশ শুনে অবধি তার মাথার ঠিক নেই কিনা…আর একটা কথা তোমায় আগে বলতে ভুলে গিয়েছি ভাই,—প্রফেসার গুপ্টার কল্যাণে তোমার দণ্ড আমি আগে থাকতেই ভোগ করে বসে আছি, আর বল কেন; না হলে বেলা দেড়টার গাড়িতে কোথায় আলোয় আলোয় আলো করে যাব, না। অন্ধকার রাত্রে এই যমালয়যাত্রার দুর্ভোগ! লোকটা দিলে না ছুটি কোন মতে হে!”

নৃপেন একটু বিরক্তভাবে বলিল, “ওটার কথা আর বল না; একটা বেরসিক ভূত…শ্বশুরবাড়ির নামে অত খেপচুরিয়াস্ কেন রে বাপু। নিজে বিয়ে করলিনি করলিনি, কপালে নেই; তা বলে… “

বাধা দিয়া দেবেশ বলিল, “বিয়ে করলে না! তুমি তাহলে লেটেস্ট দাম্পত্য-বুলেটিন অবগত নও দেখছি;–আরে গুপ্টা সাহেব যে মুড়িয়েছেন মাথা শেষ পর্যন্ত; তুমি আছ কোথায়? আর দুর্ভাগ্যক্রমে পুশাই হয়েছে তার প্রয়াগ-ক্ষেত্র, তাই তো নেহাত শিষ্য-সমভিব্যাহারে যেতে হবে বলে…”

“থ্রি চিয়ার্স ফর প্রফেসর গুপ্টা—হুররে!” অন্ধকারেই হস্তটা তুলিয়া নৃপেন চিৎকার করিয়া উঠিল।

ও বেঞ্চের স্থূলকায় লোকটি সশব্দ কপট-নিদ্রার মধ্য দিয়া কখন অনাড়ম্বর অকপট নিদ্রায় অভিভূত হইয়া পড়িয়াছিল, হুড়মুড়িয়া উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কে জিত্তেও?” সঙ্গে সঙ্গে ভুলটা বুঝিতে পারিয়া আবার শুইয়া পড়িয়া নাক ডাকাইতে আরম্ভ করিয়া দিল।

দেবেশ হাসিয়া বলিল, “নিশ্চয়ই মাড়োয়ারী, আজ কলেজ-টাউন ক্লাবে ম্যাচে কিছু টাকা ধরে থাকবে…নাও, আর থি চিয়ার্সে কাজ নেই, বেজায় চটেছি লোকটার ওপর। ওর সাবজেক্টে পার্সেন্টেজটা কম আছে, ভাবলাম, কাজ কি—হাজরিটা একটু দিয়েই সোজা ওই দিক দিয়েই চলে যাব। কমন রুমে গিয়ে ব্রজেশের কাছে সিল্কের পাঞ্জাবি আর চাদরটা রেখে তার কোটটা খুলে গায়ে দিলাম; প্রফেসার্স রুম থেকে গুপ্টা সাহেব বেরুচ্ছে—যথাসম্ভব বিষণ্ণ হয়ে, মাথা নিচু করে বললাম, ‘স্যার, বাবা খবর পাঠিয়েছেন—পিসিমা খুব অসুস্থ—যদি এটেন্ডেন্স নিয়ে ছুটি দেন তো দেড়টার গাড়িতে…অবস্থা নাকি বড়ই সঙ্কটাপন্ন—ডিলিরিয়ামে খালি আমার নাম করে…

“টপ করে কি বললে জানো?—বললে ‘তাই তাড়াতাড়ি এসেন্সে বোঝাই হয়ে চলেছ বুঝি ছুটে?’ “কমন রুমে পাঞ্জাবিটা খোলবার সময় বুক পকেট থেকে রুমালটা পড়ে গেল, তুলে কোটের পকেটে তাড়াতাড়ি গুঁজে নি—অত কি মনে থাকে?…সব তো বুঝিস্ বাপুকে সঙ্কটাপন্ন—কার ডিলিরিয়াম বকবার অবস্থা—তায় নতুন বিয়ে করেছিস, ভালো করেই বুঝিস, দিলেই পারতিস একটু ছুটি, কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত?…সেখানে সে বেচারি হা-পিত্যেশ করে বসে আছে…”

নৃপেন দুঃখের ভান করিয়া বন্ধুর মুখের দিকে হাতটা বাড়াইয়া বলিল, “আর বল না, আমি হঠাৎ কবি-বাল্মীকি হয়ে বুঝি শাপ দিয়ে বসি—মা গুল্টা প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমা…ওঃ, লোকটা কি নৃশংস হে! তোমায় এই রকম উৎকট আঘাত দিয়ে কোন্ মুখে আবার নিজে শ্বশুরবাড়ি যাবে?”

দেড়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত এই যে বিরহ, তাহার আলোচনায় দেবেশের মনটা তাহার অজ্ঞাতসারেই একটু ভারী হইয়া পড়িল, ওদিককার বিরহবিধুর মুখখানি বোধ হয় বড় স্পষ্ট হইয়া উঠিল; বলিল, “চুলোয় যাক, তুমিও যেমন….. পকেটে দেশলাই রাখ? একটু ধোঁয়া খেতে হবে, দেশলাইটা আনা হয়নি।”

নৃপেন বলিল, “না, আমার ও হাঙ্গামা নেই, তুমিই বা ধরলে কবে থেকে?—আগে তো খেতে না।”

সিগারেটের বাক্সটা বাহির করিতে করিতে দেবেশ পাশের লোক দুটির দিকে চাহিয়া বলিল, “আপলোগ দিয়াশলাই রাখতে হ্যায়?”

একজন খুক্ খুক্‌ করিয়া একটু কাসিল মাত্র, অপর লোকটি কোন কথা না বলিয়া হঠাৎ উঠিয়া দাঁড়াইল এবং ওদিককার গদিবিহীন বেঞ্চের উপর গিয়া বাহিরের দিকে মুখটা বাড়াইয়া বসিয়া রহিল।

তাহার গতিবিধিটা এতই আকস্মিক এবং অসংগত যে দুই বন্ধুতেই যথাসম্ভব চাপা গলায় হাসিয়া উঠিল। দেবেশ হাসিতে হাসিতেই বলিল, “একেবারে স্থানত্যাগেন দুর্জনঃ! তা যাক্, বাঁচা গেছে।” একটু চাপা গলায় বলিল, “এখন ইনি গেলে আরও একটু প্রাণ খুলে কথা কই।…হ্যাঁ, সিগারেট ধরাবার কথা জিগ্যেস করছিলে? ভাই, শ্বশুরমশাই দেখেশুনে অনেক খোঁজখবর নিয়ে দিব্যি একটি অতীব শান্তশিষ্ট, সচ্চরিত্র ছেলের সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দিলেন, পানটি পর্যন্ত খায় না, মাটি থেকে চোখ তুলে কথাটি কয় না, নিরীহ, গোবেচারি, এক কথায় বলতে গেলে ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না। তাঁর মেয়ে কিন্তু এ হেন জামাতা রত্নটিকে একেবারে বিগড়ে দিলে চারিদিক দিয়ে . মস্তকটি চর্বণ করে দিলে আর কি, অবশ্য ক্রমশ…

“একদিন, কি যে বলে বেশ, একটা ইয়ের জন্যে খোশামোদ করছি—গিন্নী হঠাৎ বেঁকে বসলেন—‘অত লক্ষ্মী, ভালো মানুষ, তোমার আবার এসব শখ কেন? এদিকে তো চুলটি পর্যন্ত আঁচড়াতে জানো না, পানটি খেতে জানো না।’

“সদ্য সদ্য প্রাণের দায়ে শ্রীহস্তের একটি পান খেয়ে সে-ঝোঁকটা সামলান গেল।—অধোগতির প্রথম ধাপ।

“পরের বারে শ্বশুরবাড়ি যাবার আগে, সেলুনে ঢুকে দিব্যি দশ আনা ছ’আনা করে চুল ছাঁটিয়ে নিলাম। মাথায় প্রথম টেড়ি উঠল।

“দেবী প্রথম দিকটা বেশ প্রসন্নই রইলেন। উৎসাহ পেয়ে যখন আবদার খুব বাড়িয়ে দিয়েছি, হঠাৎ পরিবর্তন!

অপরাধ?

‘ছোট পিসেমশাই যখন আসেন, সিগারেটের গন্ধে বেশ মনে হয়—হ্যাঁ, বাড়িতে জামাই এসেছে বটে। আমার সে সাধ মেটাবার নয়, আমিও কারুর এ-সব বিদঘুটে সাধ মেটাতে চাই না…”

“কি করব বল?—ধরলাম।—পিশ্বশুরের টিন থেকে চুরি-করা চারটে গোল্ড ফ্লেক আমার ব্রতভঙ্গের জন্য অপেক্ষা করছিল, শ্বশুরের কন্যা সংগ্রহ করে রেখেছিলেন।…তারপরে গোঁফজোড়াটির উপর শুভদৃষ্টি পড়ল। তোমার গা ছুঁয়ে বলছি নৃপেন, আমার অমন যত্ন করে পোষা নিরীহ গোঁফ-জোড়াটির ল্যাজ কেটে তাকে এরকম উগ্র আর তেজী করে তোলবার আমার কখনই ইচ্ছে ছিল না; কিন্তু কি রকম বেকায়দায় আমায় ফেলে যে…তা যদি শোন…

“নিশ্চয় শুনব” বলিয়া নৃপেন বন্ধুর দিকে আর একটু ঘেঁষিয়া বসিল; তাহার পর যেন বড়ই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এইভাবে বলিল, “কিন্তু তুমি যে ভয় পাইয়ে দিলে হে—ওঁদের মন পাওয়া তো নেহাত চাড্ডিখানি কথা নয় দেখছি। বছর ঘুরতে না ঘুরতে শ্রীপাদপদ্মে ভালো ছেলে বলে যে এতদিনকার সুনাম তা জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে, ঘাড়ের চুল, গোঁফের মূল বলিদান দিতে হয়েছে—অথচ এখনও আইবুড়োর গন্ধ ভাল করে যায় নি।…আচ্ছা, প্রফেসর গুপ্টা তাহলে কি দিয়ে দেবী-মর্যাদা রক্ষা করলেন? সে-বেচারির তো গোঁফ-সম্পদও ছিল না, আর সিগারেটে তো তাঁর একটা অঙ্গবিশেষই ছিল বললেই চলে….

দেবেশ বন্ধুর কাঁধে ভর দিয়া হাসিতে হাসিতে বলিল, “তুমি বুঝি গুপ্টা সাহেবকে দেখ নি এদিকে?—তাঁকে বাবরী রাখতে হয়েছে, চাপদাড়ি আর গোঁফ কালচার করতে হয়েছে—যেন মাঝবয়সের রবিবারটি; সিগারেটের পাটই উঠিয়ে দিতে হয়েছে, তার জায়গা নিয়েছে শুদ্ধ, সনাতন পান আর দোক্তা—ভিন্নরুচিইি স্ত্রীলোকঃ… এখন যদি সামনে গুণ্টা সাহেবকে দেখ তো আর চিনতে পারবে না—সে স্মার্টনেস্ কোথায় গেছে—এখন দেখবে দিব্যি নাদুসনুদুস গেরস্ত—“

“বটে!”

“তবে আর বলছি কি?—তুমি এস না একবার কলেজে, একবার নব কলেবরটি দেখে যাও, চলে এস একবার…”

.

অতদিন অপেক্ষা করিতে হইল না।–

এই সময় গাড়িটি পুশা রোড স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করিয়া গতিবেগ কমাইল এবং সঙ্গে সঙ্গে, কি নিগূঢ় কারণে তা হনুমানজিই জানেন, বিজলি বাতি দুটি সমস্ত কামরাটি অত্যুজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত করিয়া হঠাৎ জ্বলিয়া উঠিল—সুপ্তোত্থিতের মত যেন একেবারে তাজা হইয়া!

দুই বন্ধুতেই দেখিল—পাশেই, দাড়িগোঁফে আবৃত মুখ, বাবরীর মাঝখানে সিঁথে কাটা, নাদুসনুদুস গেরস্ত গোছের একটি বাঙালী ভদ্রলোক বসিয়া আছে; মুখের পান চিবান হঠাৎ বন্ধ করায় গালদুটি ঈষৎ ফোলা, গায়ে শ্বশুরবাড়ির উপযুক্তই বেশভূষা…

চিনিতে আর কাহারও বাকি রহিল না।

পানটা চিবাইতে আরম্ভ করিয়া জড়িত রসনায় কহিলেন, “এই যে দেবেশ দেখছি…ইয়ে, তোমার পিসিমা…মানে, এই গাড়িতেই যাচ্ছ বুঝি?…”

উত্তর দরকার হয় না,—এই গাড়িতেই তো যাইতেছেই, একসঙ্গে আসিতে হইল এতটা; তবুও সম্মোহিতের মতো দেবেশ মাথা নিচু করিয়া বলিল, “আজ্ঞে হ্যাঁ,—মাসিমার ভারি…ইয়ে, পিসিমার বড্ড…আপনি বুঝি এই গাড়িতেই?…”

ঘুরিয়া তাড়াতাড়ি দরজার দিকে পা বাড়াইল।

গদিহীন বেঞ্চ হইতে অপর ভদ্রলোকটি ততক্ষণ উঠিয়া ঘাড় গুঁজিয়া দরজামুখো হইয়াছেন।—সামনে কুলির মাথায় একটা বড় চ্যাঙারি, ওপরে বাছা বাছা কটা ল্যাংড়া আম দেখা যায়। দেবেশ ঘুরিতেই চোখাচোখি হইয়া গেল!—

“এই যে বাবাজি…এই গাড়িতেই বুঝি আসা হল?…আমি ভাবছিলাম বুঝি…থাক্ থাক্, দীর্ঘজীবী হও…প্রণাম হয়েছে—ওঠ…”

ভক্তিমান জামাইয়ের তখন মাটি ছাড়িয়া ওঠা যে কি ঘোর সমস্যা শ্বশুর বোধ হয় তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *