আচারের অনাচার
বাড়িতে প্রত্যহ চুরি হইতেছে।
চুরির বিশেষত্ব আছে; সোনা নয়, চাঁদি নয়, কাপড় নয়, বাসন-পত্র নয়; চুরি হইতেছে আচার আর তেঁতুল।
কিন্তু তাহাও তো চুরি। ধর, যদি ঝিয়ের কাজ হয় তো সেও কি কম ভাবনার কথা? আজ আচারে হাত পাকাইতেছে, কাল পোক্ত হইয়া পেনিটা, আংটিটা, কানের দুলটা সরাইবে, পরশু দেখিবে গলার হার অদৃশ্য হইয়াছে। গৃহস্থ সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিয়াছে, বিশেষ করিয়া বধূ
কিন্তু সত্যই কি ঝিয়ের দোষ? সে বেচারির তো ভয়ে গলা কাঠ হইয়া গিয়াছে, দেখিলে মনে হয় না মাসখানেকের মধ্যে সে কোন অম্বল জিনিস স্পর্শ করিয়াছে। তবে ননদ—সুধা?মেয়েটার বয়স হলেও টক-ঝালের উপর একটু লোভপরায়ণ বটে; কিন্তু তাহার শপথ খাওয়ার বহর দেখিলে আর মনে হয় না, সে ভিতরে ভিতরে এই কাণ্ড করিতেছে।
দেওর করিবে না,—টক দেখিলেই তাহার গায়ে জ্বর আসে; চোখ বুজিয়া, নাক কুঁচকাইয়া দশ হাত দূরে পালায়। বৌদিদের ওটা একটা অস্ত্র। যখন দেওর ফাইফরমাশে ডাকে অথচ সে নিজে এড়াইতে চাহে, বলে, “বোসো আসছি, হাতে তেঁতুল-গোলা, ধুয়ে নি আগে হাতটা।”
দেওর উত্তর দেয়, “তুমি তেঁতুলপোকা হয়ে মর, আর আসতে হবে না।”
সে আচারের কাছে ঘেঁষিবে না।
স্বামী হাসিয়া বলে, “টক যদি চুরি যায় তো ধরে নিতে হবে এ মেয়েদের কাজ। নতুন মা হয়েছে এমন মেয়ে-ছেলে যদি ঘরে থাকে তো চোর ধরবার জন্যে বেশি খোঁজাখুঁজির আর দরকার থাকে না…”
বধূ কৃত্রিম রাগের সহিত বলে, “থাম, নতুন বাপেরা বড় সাধু, একেবারে লোভ নেই!”
স্বামী অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে মুখের পানে চাহিয়া বলে, “আছে; তবে টকে নয়, মিষ্টিতে। মিষ্টি যদি কিছু চুরি যায় তো আমার হাতে হাতকড়ি দিও।”
উভয়েই হাসে।
এসব কিন্তু ঠাট্টার কথা। এর পর হাসিঠাট্টা থামিয়া গেলে চিন্তা আসে, রাগ হয়। সারা বৎসর ধরিয়া কোথায় দুটো আম-রে, কোথায় কুল-রে, কোথায় তেঁতুল-রে-প্রাণান্ত-পরিচ্ছেদ হইয়া সব যোগাড় করা; মসলা ভাজা; দুপুরে ঘুমের কথা ভুলিয়া মাখা আচার পাহারা দিয়া রৌদ্রে শুকান। এত কষ্ট করিয়া বাঁদর, হনুমান, কাঠবিড়ালের হাত হইতে উদ্ধার করিয়া জিনিস যদি ঘরে উঠিল তো অমনি অদৃশ্য হইতে লাগিল। শুধু মেহনতেরই কথা নয়। শেষপাতে একটু আচার না হইলে শ্বশুর-শাশুড়ীর খাওয়া হয় না। চিরকালটা রাজপুতানায় কাটাইয়া ও-অভ্যাসটা জন্মের সাথী হইয়া গিয়াছে। বলেন, “বৌমা, তোমাদের দেশে সে জলও পাব না, সে হাওয়াও পাব না, সে তো আর তোমার হাতে নেই, কি করবে? আমাদের অদেষ্ট; তুমি বাছা আচারটুকু থেকে বঞ্চিত করো না।”
তাই এত ঝক্কি লইয়া করা। কর্তা-গৃহিণী পশ্চিমা চাকর লাটুকে লইয়া তীর্থভ্রমণে গিয়াছেন, জনকপুর-পশুপতিনাথ সারিয়া কামখ্যায় যাইবেন; সেখান হইতে জ্বালামুখী। ফিরিতে মাসখানেক লাগিবে। এই কয়দিন হইতে যে রেটে চুরি হইতেছে তাহাতে তাঁহারা ফিরিয়া যে আর আচারের মুখ দেখিতে পাইবেন এমন তো ভরসা হয় না। আর এটা না আমের সময়, না কুলের সময়, না তেঁতুলের সময়। আর সময় হইলেও ও-জিনিস তো একদিনে হইবার নয়।
মহা দুশ্চিন্তার বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
আর এই এক তীর্থের ঝোঁক হইয়াছে ঠাকুর-ঠাকরুনের! ওঁদের সংসার কে সামলায় এদিকে তাহার ঠিক নাই। সব ছাড়িয়া যদি ছেলেটির আর মেয়েটির কথা ধরা যায় তো তাহাদের সামলাইতেই ঠিক দুইটি লোকের দরকার। ছিলও সে ব্যবস্থা, নাতিটি বেশির ভাগ থাকিত তাহার ঠাকুরমার কাছে, নাতনিটি দখল করিয়াছিল ঠাকুরদাদাকে—বধূ সারা সংসারটা একাই সামলাইত—একটু গায়ে লাগিত না। এখন পিসিমা আছে অবশ্য—কিন্তু তাহার ভাইপো-ভাইঝিদের দেখা এখন নেহাত শখের দেখা। নূতন বিবাহ—নিজেকে দেখিতেই তাহার বেশি সময় কাটে—তাহা ভিন্ন চিঠি লেখা আছে, সমবয়স্থাদের সঙ্গ আছে। ভাইপো-ভাইঝিদের নিতান্ত যে না দেখে এমন নয়, তবে কাজে সাহায্য হিসাবে নয়; শখ হইল—যেটাকে হাতের কাছে পাইল লইয়া খানিকটা হুড়াহুড়ি ঘাঁটাঘাঁটি করিল, কিংবা নিজের বাক্স থেকে ক্রীম, পাউডার, রুজ বাহির করিয়া খুব একচোট সাজাইল; এই।
দেওরের ভালবাসা আবার অন্য রকমের দাপাদাপি করিয়া চটকাইয়া কাঁদাইয়া সরিয়া পড়িবে। তুমি সামলাইয়া মর।
ইহার উপর কুটুম্বিতা আছে। ননদাইয়ের কলেজ বন্ধ হইয়াছে, সে আজকাল শনিবার-শনিবার আসিতেছে। এই একঘেয়েমির উপর দুইটা দিন কাটে ভাল; কিন্তু তবুও সামলান সোজা নয় তো?
ওঁরা দুজনে দিব্য নিশ্চিন্ত হয়ে তীর্থ করুন।
হাঙ্গামের উপর হাঙ্গামা হইয়াছে দিদি-শাশুড়ীকে লইয়া। শাশুড়ী যাওয়ার ঠিক দুইটি দিন বাদ দিয়া সেই যে বিছানা লইয়াছেন, আজ পর্যন্ত উঠিতে পারিলেন না।
.
দিদি-শাশুড়ী অর্থাৎ শ্বশুরের শাশুড়ী; সরল কথায় শাশুড়ীর মা। আইনত তিনিই এই বাড়ির মালিক। শ্বশুর যিনি তিনি আসলে ঘরজামাই। উত্তর জীবনের অধিকাংশ ভাগই রাজপুতানায় কাটানোর সঙ্গে এই ব্যাপারটুকুর একটু সম্বন্ধ আছে, কিন্তু তাহার সহিত এই কাহিনীর কোন সম্বন্ধ না থাকায় সে-সব পুরানো কাসুন্দি ঘাঁটিবার দরকার নাই।
দিদি-শাশুড়ীর মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর তাঁহার বয়স। সেটা যে ঠিক কত, গ্রামের মধ্যে কাহারও তাহা জানা নেই। ছেলে-বুড়ো সকলে তাঁহাকে একভাবে দেখিতেছে, ছেলেরা বুড়ো হইয়াও একভাবে দেখিতেছে বলিলেও মারাত্মক রকম অত্যুক্তি হয় না। তিনি নিজে কিছুই বলিতে পারেন না। কুড়ির হিসাবে চার কুড়ি বৎসর পর্যন্ত বাঁচিয়া হিসাবের হাঙ্গামা ছাড়িয়া দিয়াছেন। জিজ্ঞাসা করিলে বলেন,–”হারানের মা যেবারে সাবিত্রীর বেরতো উজ্জাপন করলে সেইবারে চারকুড়ি পুরো হল। তোর দাদা-শ্বশুর বললে না?–বলে–ঐ বেরতো-পার্বণ করেই তো শেষ কর তোমরা আমাদের। নিজের চার কুড়ি হল, আমার হল চার কুড়ি দশ, এখনও যাবার নাম নেই…”
প্রমাণের মধ্যে এইটুকু; কিন্তু হারানের বাপ-মা সাবিত্রী-সত্যবানের দীর্ঘায়ু উপভোগ করিয়া বহু পূর্বেই ইহলোক ত্যাগ করায় হিসাব নিষ্পত্তির আর কোন সুযোগই নাই।
সে-যুগের লোক, ওরা বাঁচিত বলিয়া হিসাব রাখিত না, আমরা মরি—এবং পদে পদেই মরি বলিয়া হিসাবের গাঁট গুনিয়া গুনিয়া চলি।
এই বুড়ীকে ফেলিয়া যে উহারা তীর্থ করিতে গিয়াছেন তাহার একটা কারণ আছে, স্থবির হইলেও দিদি-শাশুড়ী বেশ ডাঁটো। ফলে ওঁর মৃত্যুর কথা এখনও কেহ ভাবিতে আরম্ভ করে নাই, অন্তত মাসখানেক কি মাস দুয়েকের মধ্যে যে ভালমন্দ কিছু একটা হইবে এমন আশংকা কাহারও মনে উদয় হয় নই।
বাহ্যত অবশ্য শরীরটি ধনুকাকৃতি হইয়া গিয়াছে এবং গলার স্বর হইয়া গিয়াছে টানা এবং তরঙ্গায়িত। কিন্তু এই স্বর এবং শরীর লইয়া এখনও মস্ত বাড়িটিতে খুটখুট করিয়া বেড়ান। সংসার অনভিজ্ঞতার জন্য কন্যাকে সাক্ষাৎভাবে এবং জামাতাকে পরোক্ষভাবে তিরস্কার করেন, নাতি-নাতবৌয়ের সঙ্গে বিদ্রূপ করেন, নববিবাহিতা নাতনিকে নিজেদের জীবনের উদাহরণ দিয়া দাম্পত্যশাস্ত্রে তালিম দেন। শরীর ভেদ করিয়া বয়স যে মনের কোনখানটা স্পর্শ করিয়াছে তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় না।
ভালবাসার ক্ষমতাও বেশ অটুট আছে, এখন সবচেয়ে বেশি স্নেহ নাতির ছেলেটির উপর। বড়মা দাঁড়াইলে তাঁহার মাথা উপরদিক হইতে ঝুঁকিয়া প্রপৌত্রর মাথার উপরটিতে আসিয়া পড়ে, মনে হয় জীবনের দুই দিক মিলিয়া একটি পূর্ণ বৃত্ত সৃষ্টি হইল।
এই দিদি-শাশুড়ী এখন শয্যাধরা। হারাধন ডাক্তার বলিতেছে কোন উপসর্গ নাই তেমন, তবে বয়স হইয়াছে, যে কোন মুহূর্তেই একটা উপসর্গ দাঁড়াইয়া যাইতে পারে, তখন আর সামলান যাইবে না। খুব সাবধান থাকাই ভাল, বিশেষ করিয়া খাওয়া-দাওয়া সম্বন্ধে।
খাওয়া-দাওয়া সম্বন্ধে অবশ্য কোন ভয় নেই। শেষ বয়সে এটা ওটা সেটা খাইবার জন্য একটু লালসা হয় বটে, কিন্তু দিদি-শাশুড়ীর ওসব বিষয়ে রসনা খুব সংযত। যাহা সামনে ধরিয়া দেওয়া হয় শান্তশিষ্ট ছোট মেয়েটির মত নির্বিচারে নিঃশেষ করিয়া একঘটি জল পান করিয়া উঠিয়া পড়েন। আহার সম্বন্ধে কখনও একটা সাধ-আহ্লাদ কেহ দেখে নাই। যে মন লইয়া নিমন্ত্রণে বসিয়াছেন, ঠিক সেই মন লইয়া তুলিয়া ধরিয়াছেন সাগু-বার্লির বাটি। চিরকালই এইভাবে কাটিল।
বরং নাতবৌয়ের সাধ হইয়াছে, মেয়ের সাধ হইয়াছে, “আজ তোমায় এটা করে দিই দিদিমা…মা, তুমি কখনও মুখ ফুটে বললে না তো এটা করে দে, কি সেটা করে দে; আমাদেরও তো একটা সাধ-আহ্লাদ আছে বাছা?”
বৃদ্ধা বলেন, “শোন কথা!—আমার সাধ-আহ্লাদের কসুর কি বাছা? আমার কি একটা মুখ? এতগুলি মুখে আমি কত রকম কি খাচ্ছি—রোজই, নিতুই…আমার এই খাওয়াই বজায় রাখুন ঠাকুর….এই বুড়ো বয়সে নিজের নোলা নিয়ে থাকব গা?—কি ঘেন্নার কথা।…”
সেই লোক বেশ একটু কাবু হইয়া পড়িয়াছেন। আহারে রুচি নাই। অমন মেজাজ, অত হাসিখুশি—সব গিয়াছে যেন। বেশ একটু খিটখিটে হইয়া পড়িয়াছেন। বধু যতটা পারে পরিচর্যা করে, কিন্তু একাদিক্রমে বরাবর তো বসিয়া থাকিতে পারে না। বধূ বড় একটা ঘেঁষে না, কখন আসিয়া একটু পা দুটা টিপিয়া দিল, কি গায়ে হাত বুলাইয়া দিল, তাহার পর একটা ছুতানাতা করিয়া সরিয়া পড়িল।—সে এখন একটু ঠাট্টা-বিদ্রূপ কুড়াইয়া বেড়াইতে চায়, একটু সরস আলোচনা চায়। কি করিবে? ভালই বল, চাই মন্দই বল—বয়সের ধর্মই এই।
কাছে কাছে থাকে নাতির ছেলেটি। আর সে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ বুড়ীর কোন গোল থাকে না। সে না থাকিলেই ক্রমাগত গজ গজ চলিতে থাকে—অনুযোগটা চলে মেয়ে-জামাই লইয়া—আজ এ যদি মেয়ে না হইয়া ছেলে হইত তো কি এভাবে ফেলিয়া তীর্থ করিতে যাইতে পারিত? হাজার কর মেয়ে মেয়েই, জামাই জামাই-ই কথায় বলে—জন, জামাই, ভাগনা তিন নয় আপনা…হ্যাঁ, নিজের পেটের মেয়েই পর হল, নাতি-নাতবৌদের ভরসা!—স্বর্গে বাতি দেবে।…
বধূ বোঝে—ছেলে কাছে নাই; এত কথার মূলে ঐটুকু, কেন না ছেলে জামাই, নাতি, নাতবৌ, নাতনি—সব ঐ নাতির ছেলেটিতে জমা হইয়াছে। খুঁজিয়া পাতিয়া ছেলেটিকে বসাইয়া আসে। বলে, “আমি এই এলাম বলে দিদিমা—ঠাকুরপোর ভাতটা বেড়ে দিয়ে” কিংবা “তোমার নাতির জামাটায় বোতাম ক’টা বসিয়ে এক্ষুণি এসে বসছি…”
হয়তো আসিতে পারে না। ঐ বোতাম সেলাই-ই একটি কাজ হয় তবে তো? আবার কাজের চেয়ে অকাজের হিড়িক আরও বেশি। খুকির পা হওয়া পর্যন্ত মাকে হেঁসেল থেকে পুজোর ঘর পর্যন্ত সর্বত্রই সাহায্য করিতে সদা ব্যস্ত—কোথায় কোন্ ঘটনা ঘটাইয়া বসিয়া আছে কে জানে? নাতবৌ-এর অনুপস্থিতিতে কিন্তু ক্ষতি হয় না। খোকা আসিলেই সব ঠিক হইয়া যায়। কথার অফুরন্ত প্রবাহ আরম্ভ হইয়া যায়। সে-সব কথার অবশ্য মাথামুণ্ডু কিছুই থাকে না—এমন কোন কথাই থাকে না—সংসারের অভিধানে যাহার কোন অর্থ খুঁজিয়া পাওয়া যায়। তাহা না থাক; কিন্তু অনর্থ থেকে বাঁচায় এই সব কথা-বধূ নিশ্চিন্ত থাকে।
সংসারের প্রয়োজনের মূল্য বেশি, না অপ্রয়োজনের?—মনে হয় দুই-ই তুল্য মূল্য। প্রয়োজনের সংসার সে তো অপূর্ণ, তাহাকে পূর্ণতা দিয়াছে অপ্রয়োজনের বিলাস। জীবনকে ঘিরিয়া আছে শৈশব আর জরা,—যেমন দিনকে ঘিরিয়া আছে ঊষা আর সন্ধ্যার স্বর্ণরাগ। দুই-ই অপ্রয়োজন কিন্তু এই দুই-ই দিয়াছে পূর্ণতা।
.
হারাধন ডাক্তার আবার আসিয়াছিল, উপসর্গ এখনও কিছু পায় নাই; তবে অরুচির কথা শুনিয়া বলিল, ওটা ভাল লক্ষণ নয়। আহারে শক্তি হ্রাস হইতে হইতে শেষে রোগিণী বে-এক্তিয়ার হইয়া যাইবে। বলিয়াছে গুরুপাক না হয় এবং অধিক আহার না করিয়া ফেলেন সেই দিকে লক্ষ্য রাখিয়া মুখরোচক পথ্য তৈয়ারী করিয়া দিতে। ডাক্তারেরা সব বয়সের রোগীকে এক নজরে দেখে না। সোজা না বলিলেও পাকে-প্রকারে বুঝাইয়া দিল—মুখরোচক করিতে গিয়া যদি একটু হয়ই গুরুপাক তো বিশেষ আপত্তি নাই তাহার। আর চাপ হওয়ার ভয়ে নিক্তির ওজনে খাওয়ানরও দরকার নাই। মোট কথা, পথ্য সম্বন্ধে আর কোন বাধা বিঘ্নই রহিল না। নাতবৌ ময়ান না দিয়া লঘুপাক করিয়া খানকতক লুচি প্রস্তুত করিল, অল্প ঘৃত দিয়া একটু হালুয়া তৈয়ার করিল। দিদি-শাশুড়ীর সামনে ধরিয়া বলিল, “নাও, দু’খানা মুখে দাও দিকিন দিদিমা। আজ আর সাবু আনিনি…নাও, ওঠ একটু।”
ঠিক দেড়খানি লুচি, আর আধ ছটাক হালুয়া কোন মতে গলাধঃকরণ করিয়া বৃদ্ধা মুখ ঘুরাইয়া বসিলেন। নাতবৌ ক্ষুণ্ণ হইয়া বলিল, “ওকি হল! এরকম করে খেলে আর ক’দিন ঢেঁকবে?—বিছানার সঙ্গে যে মিশে গেছ দিদিমা!”
বৃদ্ধা হাত নাড়িয়া বলিলেন, “আর ঢেঁকা, একেবারে ভাল লাগছে না বৌ এসব।”
“কি ইচ্ছে করে খেতে তাই না হয় করে দিই দিদিমা, ডাক্তারে তো সবই খেতে বলেছে—বেশি মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করে?”
“না বাছা, মিষ্টির নামে গা ঘিন ঘিন করছে।”
“তেতো?—তেতোটা ভালও তোমার পক্ষে। বল তো উচ্ছে দিয়ে ভাল করে শুক্ত করে দিই না হয়?”
“মুখ যেন আপনিই তেতো হয়ে রয়েছে…”
“নোন্তা?…খানকতক সিঙাড়া দোব করে দিদিমা? দিই না?”
“রক্ষে কর বাছা—নুনের দিকে যেন চাইতে ইচ্ছে করছে না।”
“তবে কি করব? টক, ঝাল তো দেবে না ডাক্তার—আমি তিন রকমই করে রাখব দিদিমা, যেটা ভাল লাগে মুখে দিতে হবে। না দিলে চলবে কেন গা? গায়ে একটু বল পাওয়া চাই তো। এই ওষুধ গেলার মতন করে একটু দুধ খাও, ওতে আর কি হবে বল?”
“ওতেই ঢের হবে। আমার মেয়ে-জামাই যেমন ছেড়েছে, যমেও তেমনি ছেড়েছে বৌ; তোদের ভয় নেই…খোকাটা গেল কোথায়?—ডাক দিকিন। খুকুর হাতে দিয়েছিস একখানা লুচি?”
খোকাকে ডাকিতে হইল না। আহার্য সম্বন্ধে তাহার একটি অতীন্দ্রিয় অনুভূতি আছে, তিন ক্রোশের বাহির হইতেও টের পায়। আসিয়া উপস্থিত হইল, মা বলিল, ‘জুটেছ গন্ধ পেয়ে? বসতে পার না বড়মার কাছে একটু? পিসিমা কোথায়—খুকুটাকে নিয়ে পাড়া বেড়াতে গেছে বুঝি?—একটু আক্কেল থাকতে হয় তো মানুষের? যেমন পিসি তেমনি ভাইপো!”
দিদি-শাশুড়ী একটু খিঁচাইয়া বলিল, “তুই আগে দে তো ওর হাতে দু’খানা। এসে বেচারি যেন ভয়ে জবুথবু হয়ে দাঁড়াল। পরের আক্কেল দেখতেই ব্যস্ত!”
খোকা আগাইয়া আসিতেই একটা উগ্র গন্ধ নাকে আসিল যেন; হাতটা তুলিতে গন্ধটা আরও তীব্র এবং স্পষ্ট হইয়া উঠিল। মা বিস্মিতভাবে ভ্রূ-কুঞ্চিত করিয়া প্রশ্ন করিল, “আচারের গন্ধ যে গায়ে হাতে রে খোকা!”
খোকার বছর চারেক বয়স হইয়াছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত গোটাকতক ব্যঞ্জনবর্ণ আয়ত্ত করিতে পারে নাই; সেইজন্য তাহাকে বয়সের অপেক্ষাও শিশু এবং অত্যন্ত নিরীহ মনে হয়। ভীতভাবে চাহিয়া বলিল, “ডাঃ, আমি টো ঠাই নি।”
“না, ঠাও নি! তবে গন্ধ ভুরভুর কচ্ছে কিসের? হাঁ কর তো দেখি।”
খোকা কাঁদ-কাঁদ হইয়া বড়মার দিকে চাহিল। তিনি একেবারে ঝাঁঝিয়া উঠিলেন, “একখানা লুচি হাতে দিবি কি না দিবি,—তা ডেকে ছেলেমানুষকে অত শাসন করবার কি দরকার র্যা? আ গেল যা! যা খোকা খেলগে যা—আর হাঁ করে বেয়াকুব হতে হবে না…
আচার আচার একটা যেন রব উঠেছে—ঝি আচার চুরি করছে, মেয়ে আচার চুরি করছে, ঐ দুধের ছেলে আচার চুরি করছে—কোন দিন বলবি আমিও মরবার সময় তোদের আচার চুরি করে যমের বাড়ি যাবার ব্যবস্থা করছি!”
বধূ বলিল, “তুমি রাগ করছ দিদিমা, কিন্তু সত্যিই ভ্যাক্ করে আচারের গন্ধ বেরল ও আসতেই, তাই বললাম। আচারগুলো খেটেখুটে করলাম অথচ যেন উবে যাচ্ছে। কে যে সরাচ্ছে, কোন মতেই ধরতে পারছি না। কাঁচা-মিঠে আমের সেই মিষ্টি আচারের শিশিটাই পাওয়া যাচ্ছে না। ও-আম পাওয়াই যায় না, অনেক কষ্টে গুটি-কতক যোগাড় করেছিলাম। ছেলেমানুষ দেখতেই দিদিমা, কোন গুণে ঘাট নেই। আমি নিশ্চিন্দি থাকি তোমার এখানে রয়েছে, আর…”
বুড়ী একেবারে সপ্তমে চড়িয়া গেল। অর্ধ-শয়ান হইয়া উঠিয়া বলিল, “তোর যদি এই সন্দেহ হয়ে থাকে বউ যে আমি তোর ছেলেকে চুরি বিদ্যা শেখাচ্ছি তো নিয়ে যা এখান থেকে। দিস নি থাকতে আমার কাছে। অপরাধের মধ্যে বলেছি ওই দুগ্ধপুষ্যি শিশু ও চুরির কি জানে? তা তুই কত কথাই না শোনালি আমায়! ছেলেটা যে আসে কাছে সেটা তোদের পছন্দ নয়। আমাকে কছে এসে বিগড়োয়, নিয়ে যা সরিয়ে। আমি জানি শিশুর মন দেবতার মন, ওদের মনে পাপ ঢোকে নি; তোর যদি সন্দেহ মিছে কথা বলছি, তোর যদি বিশ্বাস ও করেছে চুরি, নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলগে, তবে আমার চোখের সামনে আর শাসন করিস নি। যা নিয়ে যা, যা খোকা, আর আমার কাছে আসিস নি; বলে নিজের মেয়েই যার ভুললে, তার আবার নাতি-নাতকুড়ের ভরসা!”
দিদিমাকে এতটা চটিতে কখনও দেখা যায় নাই। প্রবল উত্তেজনায় বালিশে বুক চাপিয়া হাঁপাইতে লাগিলেন। নাতবৌ কিন্তু বিস্মিত হইল না, আসিয়া পাশে বসিয়া পিঠে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল। বলিল, “আমারই ভুল হয়েছে দিদিমা, তুমি চুপ কর; কাহিল হয়ে পড়বে। সত্যিই তো, কচি ছেলে ও চুরির কি জানে গা!”
.
চোর তাহা হইলে ধরা পড়িয়াছে। বড়মাকে ঠকাক্, কিন্তু মা ঠকিবার বান্দা নয়, এখন ভাল করিয়া সব কথা বাহির করা দরকার। এত আচার যায় কোথায়? সরায়ই বা কখন? বড়মার ঘরের পাশের ঘরটিতে আচার থাকে একটি কুলুংগিতে; তেপাই কি জলচৌকির সাহায্য না লইয়া খোকার কর্ম নয় হাত দেওয়া। বড়মার প্রায় চোখের সামনেই খোকা এতটা করিতে পারিবে না। তাহা হইলে এর মধ্যে অন্য লোক আছে, আর খোকা আছে সহযোগিতায়। বড়মার তন্দ্রা নিদ্রা বা অন্যবিধ সুযোগে সে খবর পৌঁছায়, মূল তস্কর আসিয়া চুপিসাড়ে কার্য সিদ্ধ করিয়া সরিয়া পড়ে। এই মহামতিটি কে? এ-বাড়ির ঝি? ও-বাড়ির নন্দলাল? ছেলেটি আসিয়া খোকা আর খুকীকে লইয়া প্রায় ঘাঁটাঘাঁটি করে। তাহা ভিন্ন আচার সম্বন্ধে একটু দুর্বলতাও আছে, বধূ যখন আচার তৈয়ারী করিতে বসে, টের পাইলে খানিকটা আদায় করা চাই। ও-বাড়ির ঝি-মাগিটাও হইতে পারে; কিংবা এও হইতে পারে দু-বাড়ির দুই ঝি আর নন্দলাল সবাই এর মধ্যে আছে, সুযোগ অন্বেষণের জন্য খোকাকে ঘাঁটিতে বসাইয়া রাখিয়াছে, মাঝে মাঝে ঘুষটা-আসটা দেয়। না, সন্ধান লইতে হয়, কিন্তু দিদি-শাশুড়ীর সমক্ষে সে হওয়া অসম্ভব,—মেজাজ অসম্ভব রকম খিখিটে হইয়া গিয়াছে।
সন্ধ্যার অব্যবহিত পরেই খোকাকে আহার করাইয়া দেওয়া হয়। ননদ ওঘরে দিদি-শাশুড়ীর কাছে আছে। শিশুকন্যাটিকে কোলে লইয়া বধূ খোকাকে খাওয়াইয়া দিতেছিল। সকলেই জানেন ব্যাপারটি বেশ আয়াসসাধ্য। মায়ের বাকচাতুরীর যত শক্তি এ অবস্থায় কাজে লাগাইতে হয়। মা অন্নের গ্রাস পাকাইয়া রাখিল বলিতেছিল, “নাও। আমি এই ভাগ করে দিচ্ছি—এই এটা আম, এটা জাম, এটা সন্দেশ, এটা হল চন্দ্রপুলি, এটা…এটা…” ছেলে মুখ তুলিয়া প্রশ্ন করিল, “শাশুড়ীর মাটা মা?”
ওটা ছেলের দৈনিক আহার্য, মারই সন্ধান দেওয়া, তবে আজ মনে পড়ে নাই; বলিল, “হ্যাঁ, শাশুড়ীর মাথা। খেয়ে নাও দিকিন শীগগির করে। তবে তো জোর হবে, তবে তো ঘোড়ায় চড়ে খুকুকে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে দেবে। খেয়ে নাও…কী লক্ষ্মীই হল খোকা আমাদের গা…”
খোকা একটি গ্রাসের অর্ধেক শেষ করিয়া গভীরভাবে একটু টানা সুরে আত্মপ্রশংসা করিল, “কেমন আটার টুরি করে না!…”
মা হাতে একটা গ্রাস তুলিতেছিল, ছেলের দিকে চাহিয়া হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। কেমন যো বুঝিয়া নিজের দোষ স্খালন করিয়া লইতেছে ধূর্ত! সঙ্গে সঙ্গে তাহার মাথায় একটা বুদ্ধি আসিল, এই ছেলেরই মা তো? গ্রাসটা রাখিয়া দিয়া পিঠে বামহস্ত বুলাইতে বুলাইতে বলিল, “হ্যাঁ, কেমন আচার চুরি করে না! খোকা কি আমাদের চোর? চুরি করে তো ঝি, নন্দ, না খোকামণি? ঝিয়ের নোলা খস্তি দিয়ে পুড়িয়ে দোব’খন, ছ্যাঁক করে উঠবে, কি বল খোকা?…নাও।”
খোকা গ্রাসটা মুখে লইয়া মাথা নাড়িয়া ছ্যাঁকা দেওয়ার দণ্ডটা অনুমোদন করিল।
মা বলিল, “খোকা আমার লক্ষ্মী আর যত চোরেরা খোকাকে দুষ্টু করতে চাইছে, না খোকা?”
খোকা বড় ভাল ছেলে হইয়া পড়িয়াছে; খুব জোরে মাথা নাড়িল, অর্থাৎ হ্যাঁ সে লক্ষ্মী এবং চারিদিক থেকে ক্রমাগত তাহাকে দুষ্ট করিবার ষড়যন্ত্রই চলিতেছে বটে।
কি যেন একটু ভাবিল এবং তাহার পর বড় বড় চোখ দুইটা মায়ের মুখের উপর রাখিয়া বলিল, “বড়মা টো টোর নয় মা!”
মা হাসিয়া বলিল, “না, বড়মা চোর হতে যাবে কেন? বড়মা খুব লক্ষ্মী, আমার যাদুকে কত আদর করে।”
খোকা নিজের বেলার মত আবার সুর করিয়া বলল, “কেমন আটার ঠায় না…”
মা একটা গ্রাসের দলা পাকাইতেছিল, থামিয়া গিয়া একবার স্থিরদৃষ্টিতে পুত্রের মুখের পানে চাহিল। খানিকক্ষণ মনে মনে কি যেন মিলাইয়া মিলাইয়া দেখিল, রহস্যটা কি পরিষ্কার হইয়া আসিতেছে? আবার গ্রাসটা তুলিয়া দিতে দিতে বলিল, “না, খোকা না দিলে বড়মা আচার তো খায় না। ভাগ্যিস খোকা এনে দেয়…”
খোকা একবার সংশয়িত দৃষ্টিতে মায়ের পানে চাহিল। তাহার পর একটু স্খলিতকণ্ঠে বলিল, “না, এনে ডিনা টো।”
মায়ে বেটায় বুদ্ধির লড়াই চলিয়াছে।
মা মনে মনে হাসিল। বলিল, “আহা, দেবে না এনে খোকা? বড়মা কত বুড়ো হয়েছে, কত ভালবাসে—”
পুত্র এবার হারিল; তবে একেবারে নয়; বলিল, “হ্যাঁ ডোব।”
“নে খা; কি করে দিবি খোকা? কুলুংগিতে তো তোর হাত যায় না।”
খোকা একটু পৌরুষের স্বরে বলিল, “ঘোঁড়ায় টড়ে।”
মায়ের মনে পড়িল দিদি-শাশুড়ীর ঘরে একটি তেপাই আছে, সেটি খোকার কল্পলোকের অভিযানে পক্ষিরাজের কাজ করে। সব বোঝা গেল। দ্বিপ্রহরে যখন সে দিদি-শাশুড়ীর ভরসায় কাজকর্ম সারিয়া একটু বিশ্রাম লয়, ঠিক সেই সময় দিদি-শাশুড়ীরই প্ররোচনায় খোকা তাহার ঘোড়ায় চড়িয়া আচার সংগ্রহ করে। সে আচার যে কি হয় তাহাতেও সন্দেহ রহিল না। যতদিন সামর্থ্য ছিল, নিজেই সংগ্রহ করিয়াছেন, অসুখটা তাহারই পরিণাম। নিজে শয্যাধরা হইয়া প্রপৌত্রকে দলে টানিয়াছেন, তাই অসুখেরও বিরতি নাই।—নির্লোভ মানুষ, সত্যই সুসংযত, নির্লোভ, তাহারই মধ্যে এই একটি দুর্বলতা। এ কি বার্ধক্যের শেষ স্পৃহা? না, সারা জীবনের সুকঠোর নিস্পৃহতার অন্তরালে এ দুর্বলতাটুকু চিরকালই ছিল? না, জরায় যে আবার করিয়া শৈশবকে ফিরাইয়া আনে এ তাহারই নবপরিচয়?—বোধ হয় তাহাই—সেইজন্য আর সবাইকেই ছাড়িয়া দিদি-শাশুড়ী খোকাকেই আশ্রয় করিয়াছেন। কেননা জরার সাথী শৈশবই, জীবন যেখান হইতে যাত্রা করে আবার সেইখানেই ফিরিয়া নিজের বৃত্ত পূর্ণ করে।
পরের দিন সতর্কভাবে দিদিমার বিছানা ঝাড়িতে ঝাড়িতে গদির নিচে হইতে একটা বড় কৌটা আর একটি মাঝারি গোছের শিশি বাহির হইল, কৌটাটিতে দু’তিন রকমের আচার, শিশিটিতে সেই হারানো কাঁচা-মিঠা আমের মোরব্বা। বধূ যেন হঠাৎ আবিষ্কার করিয়া ফেলিয়াছে, এইভাবে বলিল, “দেখছ খোকার কাণ্ড দিদিমা! তোমার চোখে ধুলো দিয়ে—এই দেখ—তাই তো বলি?—”
দিদিমা দেখিলেন, অবশ্য একটু বক্র-দৃষ্টিতে! আশ্চর্য হইয়া বলিলেন, “আর এই আমারই বিছানার তলায়!”
“তাইতো দেখছি! বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা! দুষ্টুর আস্পদ্দা কম নয় তো!”
দিদিমা নরমস্বরেই বলিলেন, “তা কিছু বলিসনি যেন বউ, মাথা খাস আমার।—কই, কিসের আচার করেছিস দেখি?—কাঁচা-মিঠে ঐটে? আজকাল তোর আচারে হাত কেমন হয়েছে কে জানে”
“তোমার যে অত্যাচার হবে, নইলে দিতাম একটু করে।”
দিদি-শাশুড়ী খুব আগ্রহ দেখাইলেন না। সেই জন্যই বোধ হয় মনে হইল যেন কণ্ঠস্বরে বড় একটা নিরাশা রহিয়াছে। বলিলেন, “পোড়াকপাল, আমাদের আবার অত্যাচার বৌ—থাক কাজ নেই—”
বৌ অন্যমনস্ক হইয়া একটু ভাবিল। অত্যাচার!—খোকাখুকি যখন তাহার মধ্যে সম্ভাবনার আকারে, তখন সে নিজে কোন্ এ কথা ভাবিয়াছিল? থেঁতো করা আম, কুলে-ঝালে সেও তো অত্যাচার। টক আর ঝাল, মেয়েছেলের চিরদুর্বলতা। এইখানে সব মেয়েদেরই রসনায় রসনায় একটা গূঢ় সখিত্ব আছে, বয়সের প্রভেদ নাই! বধূ ভাবিল তা ভিন্ন অভ্যাসটা একেবারে ছাড়ান ভাল নয়। বলিল, “তোমার মুখের যে রকম অরুচি হয়েছে দিদিমা, বল তো একটু করে দিনের বেলায় পথ্যির সঙ্গে না হয় দিই,…কিন্তু খোকাটাকে দেখ বাপু…আমি তেপাইটাই ঘর থেকে নিয়ে যাই, কি বল?”
