নাম-মাহাত্ম্য – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

নাম-মাহাত্ম্য

সারাটা বছর স্রেফ আড্ডা দিয়ে যখন কুড়িটি দিন বাকি, নেড়ামন্দিরের বুড়ো শিবের শরণাপন্ন হইলাম। পয়সা নয়, সিকি নয়, বাতাসা নয়, রোজ একটি ঝুড়ি করিয়া বিল্বপত্র, আর পাশ থেকেই এক ঘটি করিয়া গঙ্গাজল।… পাশ করিয়া গেলাম। নিতান্ত মন্দও হইল না–সেকেন্ড ডিভিশ্যন। বেশ বোঝা গেল আরও দশটা দিন আগে যদি বাবাকে মনে পড়িত, ফার্স্ট ডিভিশ্যনটা বাঁধা ছিল। যাক ধর্মপথে পা দিয়া বেশি লোভটাও আবার কিছু নয়।

পিতা জিজ্ঞাসা করিলেন, “আর পড়বি শৈলেন?”

আমাদের বাড়ির সামনেই ধর্মদাসের বেলগাছটা। সবুজের একটি চিহ্নমাত্র কোথাও রাখি নাই। ধর্মদাসরা নেহাত এখানে নাই তাই সম্ভব হইয়াছে। এমন করিয়া গাছ মুড়াইবার সুযোগ তো বারে বারেই পাওয়া যাইবে না?

গাছটার ওপর থেকে দৃষ্টি সরাইয়া বলিলাম, “না বাবা, পড়ে যে এমন কি হবে তা তো বুঝতে পারছি না।”

“তবে? করবি কি?”

“একটা ব্যবসা-ট্যাবসা আরম্ভ করে দিলে মন্দ হত না বোধ হয়।”

“কিসের ব্যবসা করবি ভাবছিস?”

“কোনটার করিব তাহাও ভাবি নাই, কোটার যে না-করিব তাহাও ভাবি নাই। বলিলাম, “কিছু স্টেশনারি থাক্, বলেন তো কিছু কাপড়-চোপড় রাখি, একপাশে চাল-ডাল, বেনে-মসলা এসবও থাক্—যেটার কাটতি দেখব সেটাকে রেখে বাকি দুটো সরিয়ে দিলেই হবে। আপনি কি বলেন?”

নূতন উৎসাহের মুখে বাবা আর বাধা দিলেন না, নির্বিকারভাবে বলিলেন, “দেখ তবে।”

রাত্রে মা বলিলেন, “বলছিলেন—একসঙ্গে অতগুলো জিনিস সামলাতে পারবি?”

বলিলাম, “বুড়ো শিবের যদি দয়া থাকে তো চলে যাবে মা!”

নবজাগ্রত ভক্তি আর বিশ্বাসের মুখে মাও আর নিরুৎসাহ করিলেন না। বলিলেন, “সে তো ঠিকই, বাবা চাইলে কি না হতে পারে। বেশ দেখ চেষ্টা করে তাহলে।”

এটা গেল ভক্তি আর বিশ্বাস উদ্গমের ইতিহাস। এতদিনে দুইটাই বোধ হয় যাইতে বসিয়াছে; এইবার তাহার ইতিহাস শুরু করি।

.

ঠিক ভক্তি আর বিশ্বাস যাইতে বসিয়াছে বলাটাও আমার ভুল হয়। যাইতে বসে নাই, আসলে আধার পরিবর্তন করিয়াছে। আগে ছিল দেবদেবীদের উপর, এখন আশ্রয় করিয়াছে…এঁদের কি বলিব? অভিধা লইয়া একটু মুশকিলে পড়া গিয়াছে! মনুষ্যলোক ছাড়িয়া এঁরা জ্যোতির্লোকে উত্তীর্ণ হইয়া গেছেন, আরও কি কি লোক আছে এবং কোন্ লোকে যে শেষ পর্যন্ত এঁদের অধিষ্ঠান, কি করিয়া বলিব? সুতরাং ঐটুকু খালি রাখিয়া আপাতত কাহিনীটাই বিবৃত করিয়া যাই।—

খুব সদর জায়গা দেখিয়া একটা ঘর ভাড়া করিলাম। চারিটা বড় বড় সড়কের উপর চৌমাথা। ওদিক থেকে হাওড়ার বাস আসিয়া দাঁড়াইতেছে, এদিক থেকে চন্দননগর ভদ্রেশ্বরের। সব রকম লোকের গতায়াতে গুলজার জায়গা। আর কাজের জায়গা—যাকে বলা চলে গঞ্জ। শতকরা পাঁচটা লোককে ভ্যাগাবন্ডের দলে ফেলিলেও বাকি পঁচানব্বই একটা না-একটা কিছু কিনিবেই, চাল, ডাল, নুন, তেল, মসলা, কাপড়, গেঞ্জি, লুঙ্গি, নস্য, চিমনি, হরলিক্স, বারসোপ, ডিম—কোন জিনিসটার জন্যই অন্য দোকান মাড়াইতে দিব না।… পাঁচু ঠাকুরের দোর ধরিয়া আমার জন্ম, সমস্ত ছেলেবেলাটা মা-শীতলার চরণাশ্রিত ছিলাম, জীবনের প্রথম তোরণ উত্তীর্ণ হইলাম বুড়ো শিবের কৃপাদৃষ্টির জোরে—ওঁদের দয়াই আমার মূলধন;—সব শুভার্থীদের পরমর্শানুসারে এবং নিজের অন্তরের আশা এবং বিশ্বাস লইয়া দোকানের নাম রাখিলাম “অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার”। কলিকাতা থেকে প্রকাণ্ড ঝকঝকে সাইনবোর্ড আনিলাম। বাঁ-দিকে একটা বড় বৃত্তের মধ্যে একটা চিত্র—কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি শিব অঞ্জলিবদ্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া আছেন, দেবী প্রসন্ন আননে একটা সোনার হাতায় করিয়া অন্ন পরিবেশন করিতেছেন।…ভক্তির দৃষ্টিতে দেখুন চক্ষু ফিরাইতে পারিবেন না; নিতান্ত আধুনিক ইকনমিক্সের দৃষ্টিতে দেখুন—ডিম্যান্ড আর সাপ্লাইয়ের অর্থাৎ প্রয়োজন আর আয়োজনের এমন উচ্চ অঙ্গের প্রতীক খুঁজিয়া পাওয়া দুরূহ।

কথায় বলে দেব-দ্বিজে ভক্তি। পাঁজি দেখিয়া খুব একটা ভাল দিন বাছিয়া পাড়ার বাছা বাছা গুটি বারো পরম নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণকে আহারে দক্ষিণায় পরিতুষ্ট করিয়া দোকান খুলিলাম। অবিলম্বেই মাথায় আর একটা বুদ্ধি আসিল। ঘরটা বড়ই পাইয়াছিলাম, হাত-তিনেক চওড়া আর হাত-ছয়েক লম্বা একটা জায়গা বাহির করিয়া লইয়া আমকাঠের তক্তা দিয়া আলাদা করিয়া লইলাম। মাঝখানে একটা অয়েলক্লথ-মোড়া লম্বা টেবিল, একপাশে খান ছয়েক টিনের চেয়ার। শেষের দিকে একটু খুবরিগোছের ঘিরিয়া লইয়া চা, ডিম, চপ, আর ঢাকাই পরোটার আয়োজন করিলাম। এটুকুর আলাদা করিয়া নাম দিলাম “অন্নপূর্ণা কেবিন”। বাবা বোধ হয় একটু ক্ষুণ্ণ হইলেন, চক্রবর্তীমহাশয় বুঝাইলেন, “তা হোক, মা’র নাম করে করেছে, সব শুদ্ধ হয়ে যাবে।”

“শৈল দোকান করেছে—শৈল দোকান করেছে’ বলিয়া অল্প দিনের মধ্যেই একটা রব উঠিয়া গেল! দোকান দেখিতে দেখিতে জমিয়া উঠিল। সামনেই রাস্তার ধারে একটা ছোট বকুলতলায় এক ফালি ঘাসে-ঢাকা জায়গা। বিকালে রোদ পড়িয়া আসিলেই কতকগুলি টিনের চেয়ার পাতিয়া দেওয়া হয়। এ-পাড়া ও-পাড়া মিলাইয়া যত শুভার্থীরা আসিয়া এই সময় উপস্থিত হন। চক্রবতী-মশাই, ঘোষাল-মশাই, বৈকুণ্ঠ-কাকা, নটবর-কাকা, সনাতন চৌধুরী, ও-পাড়ার অবিনাশ-ঠাকুর্দা, গোঁসাই ঠাকুর—এঁরা প্রায় নিয়মিতই পায়ের ধূলা দেন, এর ওপর যাওয়া-আসা, কর্তাদের সঙ্গে দু’-একটা আলাপ-আলোচনা করা, প্রসাদী তামাকে দু-একটা টান দিয়া যাওয়ার লোক তো লাগিয়াই রহিয়াছে।

অন্নপূর্ণা কেবিনের “বয়” হারানের তো তামাক সাজিয়া দম ফেলিবার ফুরসত থাকে না। ভালমন্দ নানা রকম আলোচনায়, হাসিঠাট্টায়, তামাকের সুবাসে আমার দোকান যেন গমগম করিতে থাকে। হয়ত চক্রবর্তী-খুড়ো তামাক টানিতে টানিতে সাবাসি দিবার ভঙ্গিতে আমার দিকে বাঁ-হাতের তর্জনীটা উঁচাইয়া বলিলেন, “না, বুকের পাটা আছে শৈলর : কি বয়েস বল? নয় পাশই করেছে, কিন্তু আমাদের কাছে তো সেই বালকটিই? তা কি রকম ফলাও করে দোকানটি ফেঁদেছে দেখ!…ঠিক চলে যাবে, এই আমি প্রাতবাক্যে বলছি।”

এতগুলো কথার উপর খাতির দেখাইয়া বলিতেই হয়, “অনেক ছাতু গুলেছি চক্রবর্তী-কাকা, সামলাতে পারব তো? ভাবনা হয় এক-একবার…

চক্রবর্তী একটু ধমকের সুরে বলেন, “আস্পদ্দা কম নয় তো! তুই সামলাবি? তবে সাইনবোর্ডের ওপর সোনার হাতা ধরিয়ে ও বেটীকে বসিয়ে রেখেছিস কি করতে?—যার ভাববার সে ভাবছে বাবা, তুই বসে বসে তামাসা দেখ।—বলে সামলাব কি করে—উনি সামলাবার মালিক যেন!—কথা শুনছ নটু?”

নটবর-কাকা হুঁকার জন্য হাতটা বাড়াইয়া বলিলেন, “একটা কথা দাদা লক্ষ্য করেছ কি না বলতে পারি নে; জায়গাটার যেন চেহারাই বদলে গেছে।—না; বড় দোকান তো এখানে আগেও ছিল গো,—এই ঘরেই, কিন্তু এমন জলুসটি কখনও দেখেছ? মা যেন আলো করে বসেছেন।”

ঘোষাল-মশাইয়ের সঙ্গে তাঁর ছোট নাতিটি থাকে, তাহার কাজ ঠাকুরদাদার হাঁটু জড়াইয়া ক্ৰমাগতই একটা-না-একটা বায়না ধরিয়া থাকা। তাহাকে ধমক দিয়া ঘোষাল-মশাই বলেন “চপ্ ল্যাবাঞ্ছস্ কি আমি হাতে করে বসে আছি?…যা না তোর শৈলকাকাকে বল গে যা না, তাতে ছেলের লজ্জা!-দেখ হে শৈলেন, তোমার ভাইপো কি বলে। মায়ের কথা উঠল বলেই বলছি—কেন, এইখানে তো হারাধন কুণ্ডুর ছেলে মতি দোকান ফেঁদেছিল, তারপর সেই মেড়োর কাপড়ের দোকান, তারপর আমাদের মোল্লা-পাড়ার এছানুদ্দিনের ছোটভাই জুতোর দোকান খুললে—দোকান ছিল না কি করে বলব? একজন-না-একজন তো রয়েছেই একটা কিছু নিয়ে—কিন্তু কখন এসে বসতে দেখেছ? না, তোমাদেরই কাউকে কখনও দেখেছি দোকান মাড়াতে? আর এখন যেন টানে এই বকুলতলাটি। তার হেতু আর কিছু নয়—ঐ নাম আর সাইনবোর্ড। ওর পেছনে কত বড় একটা হিদুয়ানি রয়েছে, কত বড় একটা নিষ্ঠা। এলেই যেন মনে একটা…” বোধ হয় নাতিটি ততক্ষণে ফিরিল। ঘোষাল-মশাই হাত দুইটা ত্রস্তভাবে উঁচাইয়া বলিলেন, “হাঁ হাঁ এদিকে নয়; তুমি ওসব চপ-টপ খেয়ে হাত ধুয়ে তবে এস বাপু। চা খেয়েছিস?—না, আবার চায়ের জন্যে আবদার ধরবি?—মার্বেল?—সে এখন নয়, যাবার সময়; সর্বদাই ভ্যান ভ্যান করিস্ নি বাপু, মনে করি শৈলর দোকানে পাঁচটা ভাল লোক এসে বসে, দুটো ভাল কথা হয়, বসি একটু গিয়ে; তা যা ল্যাংবোট জুটেছিস—”

খদ্দের জুটিলেও সকলে আমার যথাসাধ্য সাহায্য করেন—সৎ-পরামর্শ দিয়া, দর-দস্তুরিতে সহযোগিতা করিয়া। কখনও কখনও রাস্তা থেকেও খদ্দের ডাকিয়া তোলেন। যে কয়জন আসিয়া বসেন, লোক চিনিতে প্রত্যেকেই ঝানু।

“কি চাই রে তোর বাপু?—শাড়ি—এই দোকান—দাও হে শৈল, সর্দারকে ভাল একটা শাড়ি দাও দিকিন—হিন্দুস্থানীদের বারোহাতি শাড়ি—আর দেখ–”

আমি ফিরিয়া চাহিতে খদ্দেরকে লুকাইয়া হাতে কষিয়া একটা মোচড়ের ভঙ্গি করিলেন। অর্থ সুস্পষ্ট।

“তুই না দীনুর বাড়ির চাকর? সওদা করতে এসেছিস? তা যা, ভেতরে যা, সব জিনিস এখানেই পাবি। ঐ ওপরে চেয়ে দেখ, পড়তে না পারিস ছবি চিনিস তো দেবদেবীর? -যা ভেতরে।…দেখ হে শৈল, কি কি চায়, দীনেকে বলে দিয়েছিলাম, চাকর পাঠিয়েছে।”

দীনুর চাকরকে ফিরিতে হইল। ধারে দিব না ঠিক করিয়াছি। চক্রবর্তী-মশাইয়ের নিকট গিয়া দাঁড়াইতে তিনি আবার সঙ্গে করিয়া নিজেই উঠিয়া আসিলেন। এক গাল হাসিয়া বলিলেন, “ও-সর আবার কি ছেলেমানুষি করছিস্ শৈল। একে কি ধার বলে? ধার—যেখানে পয়সা ডোববার ভয় রয়েছে। দীনের বাড়ি, কি ঘোষালের বাড়ি, কি অবিনেশদার বাড়ি—ও কি ধার নাকি? শৈলর ছেলেমানুষি দেখ অবিনেশদা’।–নে, কি কি নিবি লিখিয়ে দে শৈলকে। আর হ্যাঁ দেখ্‌, কোন্ দিক দিয়ে ফিরবি?—তা একটু উদ্‌গার কর দিকিন—শৈল সেরখানেক ঘি, সের দুয়েক আটা আর আধসেরটাক চিনি দিচ্ছে, আমার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যাস্ দিকিন—লিখে রাখ শৈল।”

ঠিক করিয়া দিয়া ফিরিয়া যাইতে পিছন ফিরিয়া অভয় দিয়া বলিলেন, “কিছু ভাবনা নেই, দীনের ওখানে টাকা তোর ডুববে না—ডুবতে পারে না। আমি রয়েছি কি করতে?”

গোঁসাই ঠাকুর হাতে নস্য ঢালিতে ঢালিতে বলিলেন, “দীনে কেন, এ-দোকানের টাকা যেখানেই পড়ে থাক, বেঙ্গল ব্যাঙ্কে আছে বুঝতে হবে। এ কি শৈলর দোকান? মা’র নিজের দোকান—কুবের বেটা যার কেশিয়ার।—আমার সেই মাদ্রাজী নস্যিটা আনালি শৈল? মাগ্যি বলে কোন দোকানেই রাখতে চায় না এখানে।—এই দেখ; ভুলেই গেছলাম! নস্যির কথায় মনে পড়ে গেল—যাবার সময় দুটো হ্যারিকেনের চিমনি দিস্ তো শৈল। মনে করে দিয়ে দিস্ বাবা, আমি বোধ হয় ভুলেই যাব, আজ ভুললে তোর জেঠাইমা আর কিছু বাকি রাখবে না।”

বৈকুণ্ঠ-কাকা একসময়ে দোকান করিয়াছিলেন, তাঁহার উপদেশের দাম অনেক। বলেন, “দোকান চালানো এমন কিছু মহামারী কাণ্ড নয়, শৈল; কিছু বাঁধা খদ্দের করে ফেল, ব্যস; আর ঐ যে উটকো খদ্দের দেখছ—আজ এ-দোকান, কাল ও-দোকান, ওদের ভরসায় ব্যবসা চলে না। হাতে কলমে করা কাজ, বোঝা আছে কিনা। তোমায় কিছু ভাবতে হবে না। সাত্ত্বিক ভাব নিয়ে দোকান করেছ, মা-ই সব যোগাড়যন্ত্র করে দেবেন, আর আমরাই কি বসে আছি ভেবেছ বাবাজী? বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিচ্ছি আর ভাবছি কি করে একটা ঘর বেঁধে ফেলতে পারি—”

মায়ের কৃপায় এবং শুভার্থীদের চেষ্টায় কাছাকাছি কয়েকটা পাড়ায় অনেকগুলি ঘরই বাঁধা খদ্দের হইয়া গেল। উটকো খদ্দের গোড়ায় কিছু জমিয়াছিল, ক্রমে দেখিলাম বোধ হয় রাস্তা থেকে খদ্দের টানিয়া তুলিবার জন্য, মোচড়ের ইসারা দেওয়ার জন্য খদ্দের অখদ্দের নির্বিচারে সকলেই রাস্তার এদিকটাই এড়াইয়া চলিতেছে। বন্ধুবান্ধব পরিচিত প্রভৃতি সকলের নিকটেও কথাটা পাড়িলাম। বলিলাম, “তোদের ভরসাতেই দোকান করলাম, তোরা ওদিকই মাড়াস না।”

উত্তর করিল, “একে তো এসা সাইনবোর্ড হাঁকড়েছ, ঢুকতেই ভয় হয়—মনে হয় জগন্নাথের মন্দিরেই ঢুকছি, কি কালীঘাটেই এসেছি—গা ছমছম করে—দোকানে এলাম দুটো ফষ্টিনষ্টি হল-মন খোলা করে পাঁচটা ভাল মন্দ জিনিস দেখলাম, তা নয়—ভেবে দেখ না, তোমার ঐ অন্নপূর্ণা কেবিনে ঢুকেই ডিম ওড়াতে সাহস হয়?—তাহলেও সেদিনে যাচ্ছিলাম ওদিকেই—বউয়ের কাপড়চোপড় আর নিজেরও গোটাকতক এদিক-ওদিক জিনিস দরকার ছিল, ভাবলাম নগদ পঁচিশ-ত্রিশ টাকার কেনা-কাটা, লাভাংশটা শৈলর হাতেই যাক না। গলি থেকে বেরতেই শুনি গীতায় শ্রীকৃষ্ণ কবে কি বলেছেন না-বলেছেন তাই নিয়ে মাথা ফাটাফাটি হবার উপক্রম হচ্ছে—চক্রবর্তী, গোঁসাই, নটবর, দীনু রক্ষিত আরও একপাল সব—ভাল করে দেখতেও সাহস হল না—ল্যাজ মুখে করে তাড়াতাড়ি পেছিয়ে এসে সিদু-মাস্টারের দোকানে ঢুকলাম—রক্ষে কর ভাই—”

.

সবিস্তারে না বলিয়া মোটামুটি ধরনটা জানাইয়া দিলাম। আমার ব্যবসায়ে ভক্তিপর্বের এই ইতিহাস—অর্থাৎ দেবদ্বিজে ভক্তিপর্বের। চার মাসের পর নূতন খাতার হিসাব নিকাশের সময় দেখা গেল চক্রবর্তী-মশাইয়ের নিকট ২১৫ টাকা দশ আনা, বৈকুণ্ঠকাকার নিকট ১০০, নটবরকাকার নিকট ১৭০ টাকা বারো আনা—এইভাবে চারিদিক একুনে হাজার দেড়েকের কাছাকাছি কর্জ পড়িয়া গেছে। মাথায় হাত দিয়া বসিলাম। বাবা দেশে নাই; কিন্তু আসিলে কি যে অবস্থা হইবে ভাবিয়া যেন কূলকিনারা পাইলাম না। তবুও শেষ দিন পর্যন্ত একটা আশা লাগিয়া রহিল—হালখাতায় কিছু মোটা রকম জমা হইবে, নিজের নিজের ঘাড়ের ঋণ তো সবার, সাধ্যমত হালকা করিবেই। প্রথম হালখাতার উৎসব, বেশ ঘটা করিয়াই করিলাম। চক্রবর্তী-প্রমুখ কয়েকজন সমস্ত দিন থাকিয়া সাহায্য করিলেন। কিছুতেই কার্পণ্য করিলাম না—প্রায় ১২৫টি টাকা খরচ হইল। চৌমাথাটা গুলজার হইয়া উঠিল সে রাত্রে। নটবরকাকা ছোট ছেলে দুইটিকে সঙ্গে লইয়া নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে আসিলেন। বকুলতলায় আসিয়া দুই পা পিছনে হটিয়া সাইনবোর্ডের চিত্রের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া বলিলেন, “আহা, মা যে হাসছেন।”

জমার অঙ্কে পড়িল নগদ সাতাশটি মুদ্রা, তেরটি অচল।

বাবা লিখিয়াছিলেন মাসখানেকের ছুটি লইয়া তিনি শীঘ্রই একবার আসিতেছেন। অত্যন্ত অশান্তিতে কাটিতেছে। নববর্ষের উৎসবের পর বাঁধা খদ্দের আরও জুটিয়াছে—শুভার্থীদের সুপারিশ ঠেলিতেও পারি না। চক্রবর্তী-মশাই বলেন, “তুমি বসে শুধু তামাসা দেখ, একটু যারা সাত্ত্বিক প্রকৃতির মানুষ সব একে একে এসে জুটবে।—কি রকম একটা নাম বেরিয়ে গেছে! যেখানেই পাঁচটা ভাল লোক—অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের কথা—”

সন্ধ্যার জমায়েত আরও বিপুলতর হইয়া উঠিতেছে। টিনের চেয়ারে বেশিক্ষণ বসিয়া থাকাও অসুবিধা, সবচেয়ে বেশি অসুবিধা চা খাওয়া। বৈকুণ্ঠ-কাকা বলিলেন, “গরম কাপ আর ডিশ হাতে করে এক মহা ফ্যাসাদ শৈল, বসবে কি লোকে, যেন পাঠশালার নাড়ুগাপালটি হয়ে বসে থাকতে হয়।—একটা চৌকি-টৌকি পেতে দে বকুলতলাটায়।”

সে-রাত্রে একে একে সবাই উঠিয়া গেলে চক্রবর্তী-মশাই একটা ছুতা করিয়া বসিয়া তামাক টানিতে লাগিলেন। একটু পরে বলিলেন, “হুঃ, একে আবদার বলে না?”

আমি বিমূঢ়ভাবে মুখের পানে চাহিতে বলিলেন, “চৌকি কেনো, চা খাওয়ার অসুবিধে হচ্ছে—হুকুম হয়ে গেল! পয়সা লাগে না নতুন চৌকি কিনতে? খবরদার তুই নতুন চৌকি কিনবিনি শৈল। আমার একটা পুরনো আছে—কাল পাঠিয়ে দেব, এক-আধ জায়গায় মেরামত করে তাতেই কাজ চালাবি। তারপর দেখা যাবে দামের কথা,—না হয় আমার নামে ঐ বাবদে দশটা টাকা জমা করে রাখিস—”

সেইদিন দোকানে তালা দিয়া বাহির হইবার সময় একবার আপনিই যেন চক্ষু দুইটা সাইনবোর্ডের মূর্তির উপর গিয়া পড়িল, একটি দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে আপনি আপনিই মুখ দিয়া বাহির হইয়া পড়িল, “মা ডুবলাম এবার।”

.

মায়ের দয়া কি না বলিতে পারি না, তবে নিষ্কৃতি আসিল অদ্ভুত ভাবে।—

পরের দিন চৌকির প্রসাদে সুখাসীন হইয়া বসিবার সুবিধা হওয়ায় বৈঠক আরও জমিয়া উঠিল। আমি ভেতরেই আছি। হিসাব খতাইতে গিয়া খতিয়ানের উপর দৃষ্টি আটকাইয়া গিয়াছে, সতের টাকার বিক্রয়, তিন টাকার নগদ, বাকি ধার। চক্রবর্তী-মশাইয়ের বাড়িতেই প্রায় এগার টাকার জিনিস গিয়াছে—লক্ষ্মীপূজা ছিল। চক্রবর্তী-মশাই গঙ্গাস্নানের পথে আমায় বলিয়া গেলেন, “বাড়িতে শাসিয়ে এসেছি, পুজোর একটাও জিনিস যদি অন্য দোকান থেকে নেওয়া হয়েছে শুনি তো কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে দোব।—এক্ষুনি ফিরিস্তাটা নিয়ে আসছে ঝি, দিয়ে দিস।—না, পুজোর জিনিস ওসব ‘এন্ড কোম্পানি’ কি ‘লিমিটেড’ ফিমিটেডের দোকান থেকে আসবে না, আমি বেঁচে থাকতে নয়—নামেই যেন একটা ম্লেচ্ছ-ম্লেচ্ছ ভাব!”

বিমূঢ়ভাবে খতিয়ানের দিকে নিবদ্ধদৃষ্টি হইয়া বসিয়া আছি, ওদিকে চা আর গীতায় বকুলতলা উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছে।

এমন সময় নটবর-কাকা একটি সন্ন্যাসীকে লইয়া উপস্থিত হইলেন। পায়ে খড়ম, পরনে গেরুয়া, কপালে ত্রিপুণ্ড্রক, মস্তক মুণ্ডিত। রাস্তা থেকেই বলিতে বলিতে আসিলেন, “নিয়ে এলাম বৈকুণ্ঠদাদা, আপনাকে আজ বলছিলাম না তখন?—এই এঁরই কথা। আসতে কি চান? না যো আছে আসবার?—কিছু নয় তো পঞ্চাশ জন লোকে ঘিরে আছে। আমারও জিদ ধরে গেল, বাবার পায়ের ধুলো একবার দেওয়াবই শৈলর দোকানে। কাল থেকে দরবার করে করে শেষকালে

‘আসুন আসুন’ করিয়া সকলে দাঁড়াইয়া উঠিয়া চৌকির মাঝখানে খানিকটা জায়গা করিয়া দিল। প্রসন্ন হাস্যে বাবাজী গিয়া উঠিয়া বসিলেন।

চারিদিক থেকে ব্যস্ত প্রশ্ন বর্ষিত হইতে লাগিল, “কোথা থেকে আসা হচ্ছে বাবাজীর? কতদিন থাকা হবে? কি সম্প্রদায়ভুক্ত? কতদিন আসা হয়েছে এখানে?—”

।নটবর-খুড়ো হাসিয়া বলিলেন, “ঐখানেই মুশকিল—বাঙালী নয়।”

সকলে চক্ষু কপালে তুলিয়া পরম সমীহের সঙ্গে বলিয়া উঠিল, “তবে?”

নটবর-কাকা সমীহ আরও উদ্রিক্ত করিয়া বলিলেন, “মদ্রদেশীয়। বোঝেন বাংলা, তবে বলতে পারেন না।”

চক্রবর্তী-মশাই বলিলেন, “এক কথায় শংকরাচার্য, ত্রৈলঙ্গ স্বামীর দেশের লোক বল না!”

সন্ন্যাসী সস্মিত আননে মাদ্রাজী প্রথায় ডাইনে বাঁয়ে মাথা নাড়িয়া কথাটা অনুমোদন করিলেন। তাহার পর হাত নাড়িয়া চোখ নামাইয়া, মাথা দুলাইয়া বলিলেন, “উঁ উঁ গীতা গীতা, সম্প্ৰতি গীতা আলোচনাং ভবতু।”

নটবর-কাকা বলিলেন, “বলছেন—গীতার আলোচনা হোক।—তা বাবা, আপনার সামনে আমরা অর্বাচীনেরা যে গীতা মুখে আনতে সাহস পাচ্ছি না—”

সন্ন্যাসী সেইরূপ স্মিত হাস্যের সহিতই অঙ্গুলি সঞ্চালন করিয়া ইশারা করিলেন, চলুক-মুখে বলিলেন, “ভক্তিম্ ভক্তিম্।”

চক্রবর্তী-মশাই বলিলেন, “সে কথা তো খুবই ঠিক, ভক্তিই তো সব জিনিসের সার; কিন্তু তাই কি আমাদের আছে, বাবা?—ওরে শৈল, তোর হিসেব রেখে একবার আয় তো, বাবার পায়ের ধুলো নে-এত বড় একটা মহাপুরুষ এসেছেন—কত ভাগ্যে দেখা হয় এঁদের। এ কি আর আমাদের বাঙলা দেশের হেঁজিপেঁজি গেরুয়াধারী?”

অগত্যা আসিয়া পায়ের ধূলা লইলাম। চক্রবর্তী-মশাই আমার পিঠে হাত দিয়া সন্ন্যাসীর পানে চাহিয়া বলিলেন, “ভক্তি বলেন তো এই এর আছে; দোকান করেছে, তাতেও ঠাকুর-দেবতাদের ভুলতে পারে নি। ঐ দেখুন না”–বলিয়াই সাইনবোর্ডের চিত্রের দিকে বাবাজীর দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন।

বাবাজী অর্ধেক বোঝা, অর্ধেক না-বোঝা গোছের করিয়া একটু হাসিয়া আমার মাথায় হাত দিয়া বলিলেন, “উন্নতিম্ উন্নতিম্‌—”

ক্রমে ক্রমে অল্প অল্প করিয়া সবাই গীতার এবং সাধারণভাবে ধর্মের আলোচনা আরম্ভ করিয়া দিল এবং যখন দেখা গেল সন্ন্যাসী চক্ষু বুজিয়া ঘাড় নাড়া ভিন্ন বিশেষ কিছু করিতেছেন না, তখন আলোচনা বেশ জোর হইয়া উঠিল। কি জানি কেমন করিয়া লোকটার প্রতি আমারও ভক্তি জমিয়া উঠিতেছিল অল্প অল্প করিয়া। হইতে পারে স্বজাতি নয় বলিয়া, হইতে পারে কথা প্রায় কয় না বলিয়া, হইতে পারে মাথায় হাত দিয়া “উন্নতিম্ উন্নতিম্” বলিয়া আশীর্বাদ করিল বলিয়া, কিংবা আরও কোন নিগূঢ় অজ্ঞাত কারণেও হইতে পারে, যাহার জন্য আমাদের শিরদাঁড়াটা সন্ন্যাসী দেখিলে আপনিই ঝুঁকিয়া আসে। একবার উঠিয়া কেবিনে গিয়া হারানকে বেশ ভাল করিয়া চা করিতে বলিয়া আসিলাম।

চায়ের পর বিদায় লইবার পূর্বে ফল এবং মিষ্টান্নে বাবাজীকে প্রীত করিয়া করজোড়ে বলিলাম—পরের দিন যেন সন্ধ্যার সময়ই তিনি দয়া করিয়া পায়ের ধূলা দেন। ভক্তি দেখিয়া শুভার্থী-মহলে ধন্য ধন্য পড়িয়া গেল। নটবর-কাকা বলিলেন, “আমি কি না বুঝেই ডেকে এনেছিলাম বাবাকে?”

চারদিন পরে মনের কথাটা বলিবার সুযোগ পাইলাম। দ্বিজ লাহিড়ীর মেয়ের বিবাহের নিমন্ত্রণ ছিল, কেহ দোকানে আসে নাই। সন্ধ্যার খানিকক্ষণ পরে আমিও দোকান বন্ধ করিয়া যাইব, এমন সময় বাবাজী আসিয়া উপস্থিত হইলেন, রোজই নটবর-কাকার সঙ্গে আসেন, আজ একা। আমি অভ্যর্থনা করিয়া বসাইয়া হারানকে ভাল করিয়া চা করিতে বলিয়া দিলাম।

বাবাজী আসন গ্রহণ করিয়া ইশারায় প্রশ্ন করিলেন,–”এরা কোথায়?” শুনিয়া চক্ষু নাচাইয়া হাসিয়া বলিলেন, “হুঁ, ব্রাহ্মণা মধুরপ্রিয়ঃ।”

তাহার পর একটু থামিয়া নিজের বুকের দিকে অঙুলি নির্দেশ করিয়া হাতটা ঘুরাইয়া লইলেন। প্রথমটা মনে হইল বুঝি দেহরক্ষা করিবেন বলিতেছেন, কিন্তু পরে বারানসী, মথুরা এই দুইটি শব্দ উচ্চারণ করায় বুঝিলাম এবার এই স্থান ত্যাগ করিয়া তীর্থ-পর্যটনে যাইতেছেন। জিজ্ঞাসা করিলাম, “কবে যাওয়া হবে বাবা?”

প্রথমে বাংলাটা বুঝিতে পারিলেন না, তাহার পর একটু যেন ভাবিয়া মানেটা ধরিয়া লইয়া বলিয়া উঠিলেন, “কল্যমেব—স্বপ্নাদেশং।”

স্বপ্নাদেশ হইয়াছে, কালই যাইবেন। ষোল আনা খাঁটি সন্ন্যাসী, একরত্তি ভেজাল নাই…আমি একেবারে মনস্থির করিয়া ফেলিলাম। বাবাজীকে সনির্বন্ধ করজোড়ে একবার “বস্যতাম্” বলিয়া হারানের কাছে গিয়া বলিলাম, “যা চট করে যা, ততক্ষণ উনুন ধরছে—এই টাকাটা নিয়ে ছিদামের ওখানে সব্বার চেয়ে যা ভাল খাবার আছে—আর বাদবাকির ভাল ফল—কালু শেখের দোকান থেকে—যা—আবার বেটা হাঁ করে চেয়ে রইল…”

তাহার পর ফিরিয়া গিয়া কতকটা বাংলায়, কতকটা হিন্দীতে, কতকটা হাত-পা নাড়িয়া এবং কতকটা ম্যাট্রিকুলেশ্যন পর্যন্ত আয়ত্ত করা ঐ “বস্যতাম্”-এর মত অপসংস্কৃততে আগাগোড়া দুঃখের কথা বলিয়া গেলাম—এমন কি লক্ষ্মীপূজার কথা, চৌকি ঘাড়ে চাপানোর কথা পর্যন্ত। আবার পাছে ভক্তদের নিন্দা করিতেছি মনে করিয়া চটিয়া যান মনে মনে, সেই জন্য বলিলাম, “ওরা সবাই আমায় খুবই স্নেহ করেন বাবা, তবে দৈব আমার প্রতিকূল; এখন সেই প্রতিকূল বিরূপ দৈব যাতে অনুকূল হয়ে ওঠেন তার জন্যে একটা কিছু ব্যবস্থা করে দিন—জলপড়া, ধুলোপড়া, বিভূতি—যা হয় একটা কিছু, নইলে আমি পা জড়িয়ে পড়ে থাকব, কোন মতেই যেতে দেবো না, বাবা।”

বাবাজী ধীরভাবে সমস্ত শুনিয়া মাথা নাড়িয়া মৃদু হাস্যের সহিত বলিলেন, “গ্রহশান্তিম্ কবচম্—কবচম্।”

আমি বলিলাম, “কবচ হলে তো কথাই নেই। কত খরচ পড়বে বলুন—কিম্ খরচম্?—সবই যখন যেতে বসেছে—”

বাবাজী অমায়িক হাস্যের সহিত হাত নাড়িয়া জানাইলেন—খরচ কিছুই পড়িবে না, শুধু কালি, কলম, আর খানিকটা কাগজ দরকার। সংগ্রহ করিয়া দিলে, আমায় সরিয়া যাইতে ইশারা করিয়া দোকানের কড়া আলোকে কবচ-রচনায় বসিয়া গেলেন। আমি সেবার আয়োজনে কেবিনে প্রবেশ করিলাম।

বেশ পরিতোষ সহকারে আহার করিয়া বাবাজীর পায়ের কাছে একটি দশ টাকার নোট রাখিয়া বলিলাম, “এই সামান্য পাথেয়, বাবা, ভক্তের নিবেদন…”

বাবাজী খানিকটা ইতস্তত করিয়া নোটটা তুলিয়া লইয়া একটা খাম এবং আরও একটা কিসের ইঙ্গিত করিলেন। আমি শেষেরটা বুঝিতে না পারায় বলিলেন, “গন্দম্—গন্দম্।”

খাম এবং গঁদ আনিয়া দিলে আমায় আর একবার একটু সরিয়া যাইতে বলিলেন। তাহার পর, আবার মিনিট দু-এক পরে ডাকিয়া গঁদ দিয়া সাঁটা খামটা হাতে দিয়া বলিলেন, “কল্য মধ্যাহ্নে একাকী—নতুবা–”

বাকিটা ইশারায় জানাইয়া দিলেন যে এর ব্যতিক্রম হইলে কবচ একেবারেই নিষ্ফল হইবে, তখন আর কোন উপায়ই থাকিবে না।

.

পরদিন ঠিক দুপুরে বাড়ির চিলের ছাদে গিয়া খামটা সন্তর্পণে খুলিলাম—কবচ নয়, একখানি চিঠি। সংস্কৃতও নয়, তামিলও নয়, তেলেগুও নয়, খাঁটি বাংলা। লেখা আছে—

“বাপু হে, এ কি ব্যবসা হচ্ছে, না ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ান? তিনদিন বসে বসে স্বচক্ষে দেখলাম, কিছু বাইরে থেকেও খোঁজ নিয়েছিলাম, বাকি সব তোমার মুখেই শুনলাম। ব্যবসা করবে তো কায়মনোবাক্যে ব্যবসা কর; যেমন এই আমি করছি, এখন বুঝছ তো? ব্যবসায় গোড়ার কথা হচ্ছে—মানুষের আছে কতকগুলি প্রয়োজন আর কতকগুলি দুর্বলতা; এই দুই রাস্তা দিয়ে খুব সন্তর্পণে তার টাকার সিন্দুকের মধ্যে ঢুকে সিন্দুক সাবাড় করতে হবে। এই ব্যবস্থার শাস্ত্র, এই ব্যবসার স্বধর্ম।—করেছ কি? একেবারে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার! পারবে সামলাতে?—ছিলেন অন্নপূর্ণা, আর ওদিকে ঐ একা শিব। তুমি গেরস্ত বাঙালীর ছেলে, পুঁটি মাছের প্রাণ—ঐ একপাল বুভুক্ষু শিবের ম্যাও সামলাতে পারবে? হাড়মাস কালি করে কপ্‌নি সার করে ছেড়ে দেবে একেবারে

“তোমায় পাঁচ ভূতের পাল্লায় পড়ে নাজেহাল হতে দেখে মনে বড় কষ্ট হওয়ায় একটু আত্মপ্রকাশ করলাম নয়তো ব্যবসায় আত্মপ্রকাশ করা অধর্ম। কাল আর আমি এখানে নেই, এ ব্যবসার এই নিয়ম। তুমি সমপেশা অর্থাৎ ব্যবসাদার লোক, উচিত না হলেও বলি—তের দিনে নেহাত মন্দ হল না—এগার জোড়া বস্ত্র, তার মধ্যে একটি গরদের জোড়, টাকা, পয়সা, সিকি, দোয়ানি মিলিয়ে তিপ্পান্নটি টাকা, আরও এটা ওটা সেটা। মূলধন তো ধুনির ছাই, মিছে কথা, মৌন ভাব আর জবাই করা সংস্কৃত, সে-হিসাবে মন্দ কি? ভগবানও কেমন সহায় দেখ, ভেবেছিলাম যখন ‘গন্দম্’ বললাম, ধরে ফেলবে।

“যাক্, কবচের ভূমিকা বেশি হয়ে যাচ্ছে, কাজের কথায় আসা যাক্, অর্থাৎ আসল মন্ত্রে বা মন্ত্রণায়—”

এর পর এক দুই করিয়া সাতটি উপদেশ আছে। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসরণ করিতে হইবে। পরিশেষে . লেখা আছে, “নোটটি আর নিতে পারলাম না বাপু। ব্যবসার দিক দিয়ে একটু অধর্ম হল, কিন্তু এটুকু দুর্বলতা আর কাটিয়ে উঠতে পারলাম না। ফেরত দিয়ে যাচ্ছি।”

.

এই গেল ওদিককার ইতিহাস।

আজ মাস দু-এক হইল বাবাজীর (আমি বাবাজীই বলিব) দুই নম্বর উপদেশ অনুযায়ী সদর চৌমাথার দোকান তুলিয়া দিয়া ভিতরের দিকে একটি অপেক্ষাকৃত নির্জন রাস্তার উপর নূতন দোকান খুলিয়াছি। পাঁচ নম্বর উপদেশ অনুযায়ী চাল-ডালের অংশটা তুলিয়া দিয়াছি। বাবাজী (আরও গৌরবপূর্ণ আখ্যা দিতে ইচ্ছা করিতেছে) লিখিয়াছেন—ওগুলা নিছক প্রয়োজনের দ্রব্য, রাখিলেই আবার চক্রবর্তীর দল জুটিবে। কাপড়ের বিভাগটা টেলারিঙে পরিণত করিয়াছি। স্টেশনারি আছে—কাটছাঁট করিয়া কেবিনটির উন্নতি হইয়াছে। অর্থাৎ এখন রহিল—টেলারিং, স্টেশনারি আর রেস্তরাঁ, মানে মানুষের সিন্দুকে পৌঁছবার সবচেয়ে প্রশস্ত রাস্তা—তাহার দুর্বলতার দিক।

সবচেয়ে বড়-আগাগোড়া আন্ডারলাইন করা এক নম্বরের উপদেশটা, অর্থাৎ নামকরণ।

আমার নূতন দোকানের নাম হইয়াছে—“বনলতা ভেরাইটি স্টোরস্ এন্ড রেস্তরাঁ।” বাবাজী নিজেই দিয়া গিয়াছেন।—প্ৰভু হে কোথায় গেলে ছলনা করিয়া।

সাইনবোর্ডের যেখানটা একটি বৃত্তের মধ্যে সোনার হাতা হাতে অন্নপূর্ণা ছিলেন সেখানে একটি বিরাট তারকার অভ্যন্তরে ফুলের তোড়া হাতে এ-যুগের শ্রেষ্ঠ সিনেমা-জ্যোতিষ্ক মিস্ বনলতা। তাহার পরেই জ্বলজ্বলে অক্ষরে ঐ নাম—”বনলতা ভেরাইটি স্টোরস্ এন্ড রেস্তরাঁ।”

বিক্রয়?—নিজের মুখে বলিতে নাই, আলাদীনের প্রদীপও হার মানিয়াছে। এই দুই মাসে প্রায় হাজারখানেক টাকা তুলিয়া লইয়াছি, প্রত্যেক আধলাটি নগদ। চক্রবর্তী-মশাইয়ের বড় নাতি রামদুলাল একাই দিয়াছে দেড়শতটি মুদ্রা, টেলারিঙে দুইটি সুট পাঞ্জাবি আর কামিজে ৬৩ টাকা, রেস্তরাঁ মারফতে দুই মাসে ৫২ টাকা দশ আনা দশ পয়সা, আর স্টেশনারি-বিভাগে এসেন্স, সাবান, রুমাল, তেল ইত্যাদি ইত্যাদিতে প্রায় ৩৩ টাকা। ছোকরা শৌখীন আর চক্রবর্তী-মশাইয়ের একমাত্র নাতি, তায় নূতন বিবাহ হইয়াছে। এদিকে মনটা দরাজ, রেস্তরাঁতে কখনও একলা প্রবেশ করে না। বলে, “শৈলদা কি ফ্যাসাদেই ফেলেছিলে। কতবার ওদিক দিয়ে গেছি, নাকে মোগলাই খানার গন্ধ যাচ্ছে, মনে হয় একবার ঢুকি, বাব্বাঃ, যা গীতার ধাক্কা!—আর একবারও একটুখানির জন্যে কি খালি করবে জায়গাটা?”

রামদুলাল ছাড়া আরও সব ছোকরার দল; যাঁহারা ওখানে আসিয়া পায়ের ধূলা দিতেন তাঁদেরই বাড়ির ছেলেরা—সবারই অবস্থা যে ভাল তাহা নয়, কিন্তু সবাই সাধ্যমত পয়সা দেয়, কোথা থেকে পায় তাহারাই জানে, কিন্তু পায়। চমৎকার খদ্দের সব, ওদিকে চুরির ভয় না রাখুক এদিকে দেনার ভয় বা লজ্জাটি আছে। বলি—”ভাই তোমাদের ভরসাতেই তো এই দোকানটুকু ফাঁদা, আর তোমরা সব নিজের লোক, জানই তো কি লোকসানটা দিয়ে এসেছি ওদিকে।”—খোশামোদ করি—সুখ আছে খোশামোদ করিয়া; নিজেরা প্রাণ খুলিয়া নগদ মূল্যে খায়, মাখে, পরে; আরও পাঁচটাকে জুটাইয়া আনে। ওদিককার খবরও আনিয়া হাজির করে।—”শুনছ শৈলদা? আসছি, শুনি চক্রবর্তী গোঁসাইকে বলছে—আরে রামঃ, আবার ওদিকে?—ছেলেটা শেষে এমন অধঃপাতে গেল!”—

এখন সন্ধ্যার সময় সিনেমা-জ্যোতিষ্কের প্রসন্ন দৃষ্টির নিচে আমার দোকানের পানে চাহিলে চোখ জুড়াইয়া যায়। তিনটে বিভাগই গমগম করিতেছে; বসিয়া বসিয়া অলস তামাকের সঙ্গে গীতার কর্মযোগের আলোচনা নয়,—যাওয়া আসা, ফরমাশ, পছন্দ, নগদ মূল্যের ঝনঝনানি! একটা লোকে পারে না, প্রত্যেক বিভাগে একাধিক করিয়া লোক, তবু এক এক সময়ে খদ্দের সামলাইতে হিমশিম খাইয়া যায়। আলাপ-আলোচনাও হয় বইকি, এ-বছরের শ্রেষ্ঠ চিত্রাভিনয়-এ সপ্তাহের সবচেয়ে বড় রিলিজ, বম্বের রেণুকা দেবী বড় কি কলকাতার এরা—বনলতাকে নাকি হলিডউ টানিতেছে?—সর্বনাশ! তাহা হইলেই তো বাংলা অন্ধকার।—কেবিনে দলের মাঝে বসিয়া রামদুলাল বলে, “বনলতার যে ছবিটা এঁকেছে তোমার সাইনবোর্ডে শৈলদা হুবহু তার মতন—মার্ভেলাস্! আর ঐ ফেভারিট পোজ্—

একটু ব্যঙ্গের স্বরে উত্তর হয়, “কথা বলছিস যেন তোর চাক্ষুষ জানাশোনা!”

রামদুলাল উষ্ম হইয়া ওঠে, টেবিলে ঘুষি মারিয়া বলে, “আলবত চাক্ষুষ জানাশোনা, তোদের মত হ্যান্ডবিলের ছবি দেখে রামদুলাল চক্রবর্তী কখনও একটা ওপিনিয়ন দেয় না। এই রকম একসঙ্গে বসে চা খেয়েছি—বনলতা ওদিকে আমি এদিকে। চায়ে চিনি কম হয়েছে, চামচে করে কাপে চিনি তুলে দিয়েছি—আর কি চাস্?”

একটু চুপচাপ থাকে,অতি বিস্ময়ের নিস্তব্ধতা; তাহার পর ঈর্ষান্বিত কৌতূহলের প্রশ্ন হয়, “কোন্খানে রামদুলুদা?”

“ওদের স্টুডিওতে, আর কোনখানে?”

আর একজন একটু সমীহর সহিত বলে, ‘স্টুডিও ছাড়া বাইরে ওঁদের কারুর সঙ্গে মেলামেশা করবার হুকুম নেই—–বড্ড কড়া পাহারা; ঠিক নয় কি রামদুলুদা?”

রামদুলাল বিদ্রূপ-মিশ্রিত হাস্যের সহিত বলে, “হ্যাঁ, মোগল হারেমের বেগম সব!—তবে হ্যাঁ, এ-কথা বলতে পার যে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা না হলে ওরা নিজেই বাইরে বেশি মেশে না কারুর সঙ্গে।—তা ভাই মিছে গুমর করব না, তত বেশি দহরম-মহরম নেই আমার সঙ্গে, অন্তত এখনও হয় নি—“ জমিয়া ওঠে। টেলারিং, স্টেশনারি ডিপার্টমেন্টের খদ্দেররা ভিড় করিয়া কেবিনে জড় হয়। অনুযোগ হয়, “না, তোমার কেবিন বাড়াও শৈলদা, আরও টেবিল দাও, চেয়ার আন,—কি এক হাত × দেড় হাতের কেবিন করেছ মাইরি!”

চা, চপ্, কাটলেট, ডিম পরোটার টান পড়ে, হারানকে আরও দুইজন অ্যাসিস্ট্যান্ট দিয়াছি, তাহারা থই পায় না, দর্জি-বিভাগ থেকে ছোকরা টানিতে হয়।

বনলতার চিত্রাঙ্কিত হাজার-দেড়েক দেয়াল-পঞ্জিকা ছাপাইয়া লইয়াছি, বিলি করি। রামদুলাল ক্যালেন্ডারটা খুলিয়া ঘাড় বাঁকাইয়া দেখিয়া বলিয়া ওঠে, “হুবহু!—ওর বিষাদের পোজ।” তাহার পর বলিয়া ওঠে, “বাই দি বাই, তোমরা সবাই এখন এখানে রয়েছ—আসছে মাসে ওর জন্মদিন, বাইশ বছরে পড়বে। ঠিক করেছি বনলতা-জয়ন্তী করব—ওকে টেনে নিয়ে আসব, আর সঙ্গে সঙ্গে ওদের স্টুডিওর কয়েকজন মাতব্বরকেও। দেখ, রাজী সবাই? একদিনে আমাদের জায়গাটার নাম বেরিয়ে যাবে—চাঁদা দিতে হবে কিন্তু মোটা রকম—”

একটা উল্লসিত অনুমোদন ওঠে। থামিলে রামদুলাল আমার দিকে চাহিয়া বলে, “তোমায় কিন্তু সমস্ত হ্যাঁপাটি সামলাতে হবে শৈলদা—অতগুলি লোকের খাওয়ান-দাওয়ান-আর সে তোমার গরান্ কাঠের চা আর ইঁদুরের চপে চলবে না বলে দিচ্ছি—আর এক কথা, চাঁদা দিতে হবে, ভাবছ যে লাভের দিকটাই থাকবে, চাঁদার বেলা অষ্টরম্ভা দেখাবে, সেটি হচ্ছে না। ভেবে দেখতে হবে কার নাম ভাঙিয়ে খাচ্ছ শৈলদা; অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারও তো দেখা আছে আমাদের—”

তা আর অস্বীকার করিতে পারি কি? কৃতজ্ঞচিত্তে বলি, “নিশ্চয় দোব ভাই, তোমরা যা ধার্য করে দেবে। নাম ভাঙিয়ে খাওয়া-না-খাওয়ার কথা নয়! তোমরা অত বড় একটা ইয়ের জয়ন্তী করছ—আমার দোকানেই—কত বড় একটা সৌভাগ্য এটা আমার!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *