ঘরজামাই
বৈকাল বেলা গণশার মামা গোলোক চাটুজ্যে বৈঠকখানায় চৌকির উপর আসনপিঁড়ি হইয়া বসিয়া একটা ‘আনন্দবাজার’ পড়িতেছেন; বাঁ হাতে চায়ের কাপ, ডান হাতে দাড়ি, মাঝে মাঝে চুমুক এবং তা দিতেছেন। গোরাচাঁদ বাহির হইতে একবার উঁকি মারিয়া দেখিয়াই আবার দেয়ালের আড়াল হইয়া গেল। ঘাড় গুঁজিয়া দাঁত খুঁটিতে খুঁটিতে যেন মাথার সমস্ত শক্তি দিয়া কি খানিকক্ষণ ভাবিল, তাহার পর দুই তিনবার পা’টা বাড়াইয়া এবং টানিয়া লইয়া শেষে খুব সন্তর্পণে প্রবেশ করিয়া চৌকির এক পাশটায় বসিল। গোলোক চাটুজ্যে একবার আড়চোখে দেখিয়া লইয়া আবার খবরের কাগজে মনোনিবেশ করিলেন।
বেশ খানিকক্ষণ গেল। গোরাচাঁদ একবার গলাটা পরিষ্কার করিয়া লইল। গোলোক চাটুজ্যে আর একবার ঘাড়টা সামান্য একটু ফিরাইয়া প্রশ্ন করিলেন, “কি খবর?”
গোরাচাঁদ স্খলিতকণ্ঠে উত্তর করিল, “না, তেমন কিছু না…এই…”
আরও খানিকক্ষণ গেল। তাহার পর দেয়ালের একটা ছবির উপর দৃষ্টিনিবদ্ধ করিয়া গোরাচাঁদ প্রশ্ন করিল, “শুনছিলাম—গণেশের নাকি বিয়ের কথা হচ্ছে?”
গোলোক চাটুজ্যে এবার ঘাড়ও ফিরাইলেন না; কাগজের উপর দৃষ্টি রাখিয়াই বলিলেন, “কোথায় শুনলে?”
কোন উত্তর নাই। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমিয়া গিয়াছে; কোঁচার খুঁটে মুছিয়া গোরাচাঁদ নিঃশব্দে বসিয়া দাঁতে নখ খুঁটিতে লাগিল। বেচারা এ উত্তর মোটেই আশা করে নাই। আরও খানিকক্ষণ যাওয়ার পর একটু উসখুস করিয়া বলিল, “গণশা বলছে ও বিয়ে করবে না…মানে….”
সেইরকম ধীর নিরুদ্বেগ কণ্ঠে প্রশ্ন হইল, “কে ওকে বলছে করতে?”
আবার চুপচাপ। গোরাচাঁদ দাঁতখোঁটা ভুলিয়া কিছুক্ষণ কড়ে আঙুলটা চিবাইল, তাহার পর যেখানে যেটুকু সাহস অবশিষ্ট ছিল জড়ো করিয়া বলিল, “তাহলে আসি আমি।”
.
শিবপুরের স্টীমার ঘাটে ঘোৎনা, রাজেন, ত্রিলোচন এবং কে গুপ্ত উৎকণ্ঠিতভাবে অপেক্ষা করিতেছিল, গোরাচাঁদ ভগ্নদূতের মত নিতান্ত মনমরা হইয়া আসিয়া উপস্থিত হইল। ঘোৎনা, রাজেন একসঙ্গে প্রশ্ন করিল, “কি হল?”
গোরাচাঁদ রেলিঙে ঠেস দিয়া দাঁড়াইয়া ছিল, মুখটা গঙ্গার দিকে ফিরাইয়া লইল। বুকটা চাপা রাগে ওঠানামা করিতেছে।
ত্রিলোচন প্রশ্ন করিল, “হল না রাজী?…গেল একটু ঘাবড়ে-টাবড়ে?”
গোরাচাঁদ মুখ ফিরাইয়া ঝাঁঝিয়া উঠিল, “বকিস্ নি তিলে, আমার মেজাজ ভাল নেই। রাজি করা অত সহজ তো তুই নিজে গেলি নি কেন? যা না, এখনও দাড়ি মুঠিয়ে বসে আছে।”
ঘোৎনা বলিল, “চটে উঠছিস কেন? একটা কাজ নিজে ঘাড় পেতে নিলি তাই জিজ্ঞেস করছে লোকে…”
গোরাচাঁদ রাগিয়াই বলিল, “ঘাড় পেতে যেমন নিয়েছিলাম, চেষ্টা করতে কসুর করি নি। গোরাচাঁদ ভীতু নয়, অমন ঢের দাড়িওয়ালা মামা দেখেছে….থাক দিকিন ঝাড়া একঘণ্টা জেলখানার মত একটা ঘরে বসে—কথা নেই বার্তা নেই, খালি মাঝে মাঝে চায়ে একটা চুমুক দেওয়া আর দাড়ি আঁচড়ান… না পারি উঠতে, না পারি…”
রাজেন একটু আগাইয়া আসিয়া বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করিল, “চুপ করে বসে ছিলি?-তোকে যেমন যেমন বলে দেওয়া হয়েছিল বলিস নি?”
গোরাচাঁদ তেমনিভাবেই কহিল, “বলিস্ নি! ওর যেমন যেমন উত্তর দেওয়ার কথা তা দিয়েছে? দুটো কথাতেই এমন বলবার পথ আটকে দিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে রইল।…ঘাগী লোক, ওকে ভাঁওতা দিয়ে বিয়েতে রাজী করবেন-ছেলের হাতের মোয়া পেয়েছেন!…এমন অবস্থা দাঁড় করালে, মনে হয় ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচিনাক-কান মলছি, আর ঘটকালিতে কাজ নেই….”
নিরাশ হইয়া রাজেন, ত্রিলোচন প্রভৃতিও রাগিয়া উঠিতেছিল, রাজেন বলিল, “তোকে পাঠানই বোকামি হয়েছিল, নেহাত ওপরপড়া হয়ে যেতে চাইলি…আমি হলে….”
গোরাচাঁদ বলিল, “লবাবি রাখ্ রাজেন…আচ্ছা বেশ, তোকে বেশি কিছু করতে হবে না; তুই শুধু দুটি কথার উত্তর দে–‘কোথায় শুনলে?’…‘কে করতে বলেছে?’ দে উত্তর দেখি কত বড় মুরোদ।” যেন একটা হেঁয়ালি শুনিতেছে এইভাবে হাঁ করিয়া গোরাচাঁদের মুখের পানে চাহিয়া রহিল। ত্রিলোচন বলিল, “সবটা ভেঙে বল্; না মাঝখান থেকে…”
ঘোৎনা কতকটা আন্দাজ করিয়াছিল, বলিল, “বুঝেছি—ও যেই বলেছে—শুনলাম নাকি গণশার বিয়ে হচ্ছে’—–ওর মামা আমরা যা ভেবেছিলাম তা না বলে জিগ্যেস করেছে—’কোথায় শুনলে’।…তা তুই কেন একটা মনগড়া উত্তর দিয়ে দিলি না তাড়াতাড়ি? যেমন ধর, ‘রাজেন বলেছে।”
রাজেন তাড়াতাড়ি ভীতভাবে বলিল, “আমার নাম করা কেন মাইরি?—গোরা ন্যায়রত্ন মশাইয়ের নাম করলেই পারত; কালা মানুষ, তার কাছে কেউ ভজাতে যেত না।”
সত্যই এই সামান্য বুদ্ধিটুকু যে কেন মাথায় আসে নাই ভাবিয়া গোরাচাঁদ ঘোৎনার মুখের পানে একটু অপ্রতিভভাবে চাহিল। ত্রিলোচন বলিল, “আর দোষ দেওয়াও যায় না গোরার। বেজায় ধড়িবাজ আর রাশভারী লোক; দেখছিস না অত চালাক গণশাসেও এখনও মুখ দিয়ে একবার ‘হ্যাঁ’ বলাতে পারলে না। সেই যে কোট করে বসে আছে—আগে চাকরি না হলে দেবে না গণশার বিয়ে…”
এমন সময় কে গুপ্ত বলিয়া উঠিল, “ঐ গণেশবাবু আসছেন।”
.
স্টীমার এইমাত্র আসিয়া ঘাটে লাগিয়াছে। গণেশ নামিয়া কতকটা বিমর্ষভাবে পন্টুন বাহিয়া উঠিয়া আসিল।
রাজেন প্রশ্ন করিল, “কোথায় ছিলি চোপোর দিন? কতবার খোঁজ করলাম…”
গণশা উত্তর করিল, “মামা চাকরি খুঁজতে পাট্টেছেলো।”
ঘোৎনা প্রশ্ন করিল, “কি হল?”
গণশা বলিল, “ত্রি-টু-ওয়ান।”
সকলে বিস্মিতভাবে তাহার মুখের পানে চাহিল। চাকরির পেছনে ঘুরিয়া ঘুরিয়া গণশার মাথা খারাপ হইয়া গেল নাকি!
গণেশ গোরাচাঁদের হাত হইতে বিড়িটা লইয়া একটা টান দিয়া বলিল, “গ-গণশার তো খেয়েদেয়ে কাজ নেই, চাকরি খুঁজুক! ইডেন গার্ডেনে বার্মিজ প্যাগোডার নিচে নি-ন্নিদ্রা দিয়ে ম্যাচ দেখে আসছি—ইস্টবেঙ্গল ক্যামারুস্…ত্রি-টু-ওয়ানে….”
কে গুপ্ত প্রশ্ন করিল “ইস্টবেঙ্গল দিলে না খেলে?”
“দিলে মশাই।—প-পদ্মাপারের গোঁ!”
গোরা প্রশ্ন করিল “খেললে কেমন?”
গণশা বলিল, “দু-দুটো এসা পেনালটি মিস করলে—ইচ্ছে হল নেমে গিয়ে দিই বাঙালকে চড়িয়ে…”
রাজেন বলিল, “কাজটা কি ভাল করলি গণশা?—তোর মামাকে কি বলবি যখন জিগ্যেস করবে কি হল চাকরির…”
“বলব কা-ক্কাল ডেকেছে।”
“তারপর?”
“কাল ডেকেছে।”
“তারপর?”
গণশা বলিল, “আবার কা-ক্কাল ডেকেছে। ফুটবল সিজিনটা এই করে মাম্মামার ট্যাক হালকা করতে হবে,—আট গণ্ডা করে পয়সা দিচ্ছে ট্রাম-বাসের জন্য।..মা-ম্মামীকে বলছিল—‘এতদিনে সুমতি হয়েছে গণশার, তবু বেরুচ্ছে চাকরির জন্যে।’ মামীও সুমতি দেখে কালীঘাটের মানৎ করে পাঁচটা টাকা তুলে রেখেছে,—ফা-ফাইনালের দিন সেটা হাতাতে হবে; তোরাও সব যাবি দেখতে…”
রাজেন ফুটবলের তত ভক্ত নয়, একটু অধৈর্য হইয়া বলিল, “কাজের কথায় আয়। আজ এক মতলব এঁটেছিলাম গণশা, গোরেটা কাঁচিয়ে দিলে। সবাই ঠিক করলাম—তোর মামার কাছে এবার উলটো চাল দিতে হবে—তুই বিয়ে করতে চাইছিস না বলে দিই ভড়কে বাপধনকে, তাহলেই তাড়াতাড়ি খোঁজাখুঁজি করতে পথ পাবে না…”
গণশা ঊর্ধ্বদিকে মুখ তুলিয়া ধুঁয়া ছাড়িতে ছাড়িতে অনাসক্তভাবে প্রশ্ন করিল, “তা কি বললে?”
গোরাচাঁদ তাড়াতাড়ি বলিল, “বললে—’কে করতে বলছে?’…ঐ কথার ঐ উত্তুর হল, তুই-ই বল্ না গণশা। হোক তোর মামা গুরুজন, কিন্তু…”
গণশার বোজা মুখের মধ্যে দাঁতে দাঁতে ঘষার একটা চাপা শব্দ হইল, বোধ হয় গুরুজনকে চিবাইয়া ফেলিবার ইচ্ছায়।
রাজেন বলিল, “তাই বলছিলাম—পয়সাগুলো বাজে খরচ না করে দেখই না একটা চাকরির চেষ্টা।”
কে গুপ্ত বলিল, “গণেশবাবু যে রাজী হবেন না, নইলে সেজকাকার মুখে শুনছিলাম তাঁদের অফিসে একটা কাজ খালি আছে।”
সকলে বিস্মিত হইয়া কে গুপ্তের পানে চাহিল, ঘোৎনা প্রশ্ন করিল, “রাজী হবে না মানে? অ্যাদ্দিন ধরে দেখছেন ওকে, কবে গাজীর ভাবটা দেখলেন শুনি?”
ত্রিলোচন প্রশ্ন করিল, “কাদের বাড়ি কাজ করেন আপনার সেজকাকা?”
রাজেন প্রশ্ন করিল, “কি চাকরি? কতদিন হল শুনেছেন মশাই? বলতে হয় এতদিন,—দেখছেন…”
চারিদিকের প্রশ্নে থতমত খাইয়া গিয়া কে গুপ্ত বলিল, “শুনেছি অনেকদিন হল, ঘরজামাইয়ের চাকরি…”
সকলে আরও বিস্মিত হইয়া চাহিল, কে গুপ্ত যতটা সম্ভব গুছাইয়া লইয়া বলিল, “বলছিলাম চাকরি ভাল—সেজকাকার ছোট সাহেবের পারসনাল ক্লার্ক না কি…তবে ঘরজামাই হয়ে থাকতে হবে…”
গণশা এতক্ষণ দেশলাইয়ের কাঠি দিয়া দাঁত খুঁটিতেছিল, প্রশ্ন করিল, “ছো-চ্ছোট সায়েবের নাকি মশাই?”
কে গুপ্ত অপ্রতিভ হইয়া বলিল, “না, বড়বাবুর; তারই হাতে চাকরি কিনা।…বলিনি আপনি রাজী হবেন কিনা…”
রাজেন বলিল, “রাজী হতে কি হয়েছে? যার অমন মামা তার গৃহ আর অরণ্যে তফাতটা কি?…কতদিন হল বলেছিল সেজকাকা? আপনি একটা আস্ত…”
ঘোৎনা বলিল, “ওকে বকচিস কেন? আগে গণশা বলুক ও রাজী কিনা। সামান্য একটা চাকরির লোভে ঘরজামাই হয়ে থাকা…”
ত্রিলোচন বলিল, “শুধু তো চাকরি নয়, ওটা তো উপরি পাওনা; চাকরির সঙ্গে একটা কি যে বলে, বৌও পেয়ে যাচ্ছে তো? আর শ্বশুরের মেয়েকে একবার দুটো মন্ত্র আউড়ে দখলে এনে ফেলতে পারলে শ্বশুরকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে নিজের বাড়ি টেনে তুলতে কতক্ষণ? আইন তখন তোমার দিকে।”
রাজেন একটু উচ্ছ্বাসের সহিতই বলিল, “আদালতের আইনের ওপরেও একটা আইন আছে, তার খবর তোমরা কেউ জান না বলেই বলছ—সে হচ্ছে…
গোরাচাঁদ প্রশ্ন করিল, “প্রিভি কাউন্সিল?”
রাজেন বোধ হয়, হৃদয়, কি প্রেম, কি ভালবাসা—এইরকম গোছের কিছু একটা বলিতে যাইতেছিল, রসভঙ্গে হঠাৎ বিরক্তির সহিত উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, “তোর দুবচ্ছর বিয়ে হল গোরে, কিন্তু যে-কে সেই রয়ে গেলি। খালি শ্বশুরবাড়ির খ্যাটটা চিনেছিস!”
ত্রিলোচন বলিল, “ঘরজামাই হওয়া এত খারাপ কিসে আমার বুদ্ধিতে তো আসছে না। মামার বাড়িতে ‘গণশা’, সেখানে ‘জামাইবাবু’; মামার বাড়িতে কথায় কথায় ‘চাকরি করগে যা’; সেখানে শ্বশুর বড়বাবু, সারাটি মাস গা এলিয়ে পড়ে থাক, মাস পোহালে পয়লা তারিখে হক্কের মাইনে এসে হাজির,মামার বাড়িতে…”
রাজেন বলিল, “ঠিকই বলছে তিলে। বৌয়ের দিক থেকেও দেখ,—এখানে বাড়ির বৌ—খেটে খেটে হয়রান—সমস্ত দিনে দেখাটি হবার যো নেই; সেখানে বাড়ির আদুরে মেয়ে—কাজ নেই কর্ম নেই, সমস্তদিন মুখোমুখি হয়ে গল্প চালাও…”
গল্প করিতে করিতে সকলে জেটি ছাড়িয়া শহরের দিকে অগ্রসর হইল। কে গুপ্তকে বলা হইল, সে কাজটা সম্বন্ধে যতটা পারে খবর সংগ্রহ করিয়া আনিবে।
.
শিবপুরের ট্রাম ডিপোর কাছে নীলুর দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চি দুইটাতে রাজেন, কে গুপ্ত, ঘোৎনা এবং গোরাচাঁদ বসিয়া আছে। ফুটবল, বায়স্কোপ প্রভৃতি লইয়া এলোমেলো গল্প হইতেছে, দোকানের ভিতর নীলু আসনপিঁড়ি হইয়া বসিয়া প্রচলিত পদ্ধতিতে ধীরে ধীরে ডাইনে বাঁয়ে দুলিতে দুলিতে বিড়ি পাকাইতেছে এবং মাঝে মাঝে এক আধটা মন্তব্য করিতেছে।
ত্রিলোচন ট্রাম হইতে নামিয়া মন্থর গতিতে আসিয়া উপস্থিত হইল। সকলে উৎসুকভাবে তাহার পানে চাহিয়া ছিল—–ঘোৎনা, রাজেন প্রশ্ন করিল, “একলা যে?”
ত্রিলোচন বলিল, “দোকলা এক ব্যাটা পশ্চিমাকে ফোকলা করে পিটটান দিয়েছে… স্টীমারে আসিবে।… নীলে, একটা পান ছাড় দিকিন তাড়াতাড়ি, একটা বিড়িও; বেদম করে দিয়েছে।… তাড়াতাড়ি স্টীমারঘাটে চল সব।”
ঘোৎনা ধমক দিয়া বলিল, “ব্যাপার কি তাই খুলে বল্, তা নয়…
নীলু পান আর বিড়ি দিয়া বলিল, “মনে হল যেন তোমার শ্বশুরবাড়ি থেকে কেউ এসেছে তিলুদা, ট্রাম থেকে নেমে জিগ্যেস করলে নিবারণ মাইতির বাড়ি কোথায়। জিগ্যেস করতে বললে কালসিটে থেকে আসছে।”
ত্রিলোচন একটু বিরক্তভাবে বলিল, “খেলে কচুপোড়া! আর আসবার দিন পেলে না?… তোরা এগো ঘোৎনা, আমি এলাম বলে।…
বিড়িটা রেখে দে নীলে, মুখে গন্ধ পাবে; বউ আবার রটিয়েছে, আমি বিড়ি-সিগারেটের ওপর ভয়ানক চটা।…একরকম জ্বালা!”
এরা ঘাটের কাছে পঁহুছিয়াছে, দেখা গেল ত্রিলোচনও হনহন করিয়া পেছনে চলিয়া আসিতেছে। আসিয়া বলিল, “খুড়শ্বশুর এসেছে—সেই জগুদা!”
জগুদার উপর কাহারও বিশেষ ভক্তি না থাকায় কেন আসিয়াছে, কি বৃত্তান্ত কেহ জিজ্ঞাসা করিল না। সকলে আসিয়া জেটিতে উপস্থিত হইল।
স্টীমার আগেই আসিয়া গিয়াছিল; গণশা নামিয়া পন্টুনের রেলিঙে দাঁড়াইয়া সিগারেট টানিতেছিল, ইহারা গিয়া কেহ এ-রেলিঙে, কেহ ও-রেলিঙে ঠেস দিয়া দাঁড়াইল।
ঘোৎনা বলিল, “তিলে বলছিল কার সঙ্গে মারামারি করেছিস নাকি?”
গণশা কি একটা কথা ভাবিতেছে, খুব বেশি অন্যমনস্ক।
ত্রিলোচনই বলিল, “বাধ্য হয়ে করতে হল। ট্রামে পাশের সীটটাতে বসে ছিল, কোনমতেই একটু নড়ে বসবে না। তবু গণেশ বেচারি ভালভাবেই কথা কয়ে যাচ্ছিল, একটা মস্ত বড় অশান্তি লেগে আছে—ঝগড়ার দিকে মন নেই। শেষে সে বেটা একেবারে তেরিয়ান হয়ে বললে তার ভাগনে পুলিসে কাজ করে। বেটা একজনের মামা হয় দেখে গণেশ আর রাগ চাপতে পারলে না…নিজের মামাকে তো আর কিছু বলতে পারে না, একটি রদ্দাতে দুটি দাঁত খসিয়ে চলন্ত ট্রাম থেকে নেমে…”
গণশা বিড়ির ধুঁয়াটা উপরের দিকে ছাড়িতে ছাড়িতে বলিল,—“মা-ম্মামাগিরি ফলাতে এসেছিল…”
গোরাচাঁদ বলিল, “সত্যি, মামার ওপর ভক্তিতে ও বেচারা যেন গলে যাচ্ছে!…কালকে যখন বললাম বিয়ে করতে চাইছে না গণশা, একবারটি শিউরে পর্যন্ত উঠল না রে, সেই একভাবে কাগজ পড়ে যেতে লাগল।…উনি পুলিসের মামা হন, তাই বলতে এসেছেন, গণশার কাছে!”
রাজেন বলিল, “দোষ দেওয়া যায় না গণেশের। এই রকমই হয় কিনা; কারুর মাসী-পিসীকে দেখ, মনে দিব্যি একটা ভক্তির ভাব আসবে; কিন্তু কারুর শালী নজরে পড়ুক দিকিন—সেই বয়েসেরই—মনে হবে একটু ঠাট্টা করে নিতে পারলে মন্দ হত না।…সে যাক্, বেটার মামা হবার সাধ মিটেছে;…আসল কাজের কি হল তাই বল্।”
ত্রিলোচন বলিল, “সে হল না। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে যদি বা বড়বাবুর অফিস পর্যন্ত পৌঁছন গেল, টের পাওয়া গেল সে ছুটিতে, এক আধ দিনের জন্যে নয়, লম্বা এক হপ্তার ছুটি।… গণশাকে বলছি একটা পলার আংটি পর, তোকে গেরোয় ঘোরাচ্ছে, তা…”
গঙ্গায় ভাটার টান চলিয়াছে। একটি মোটাগোছের শৌখীন ভদ্রলোক নৌকা হইতে এক হাতে পাম্পসু অপর হাতে কোঁচা ধরিয়া খুব সাবধানে কাদার উপর দিয়া আসিতেছিল, হঠাৎ কি করিয়া পিছলাইয়া গিয়া দুই তিন পাক খাইয়া ঘুরিয়া পড়িল। মোটা মানুষের পড়া চিরকালই একটা দ্রষ্টব্য ব্যাপার, কাদায় পড়িলে তো সোনায় সোহাগা; সকলে—এমন কি গণশা পর্যন্ত হাসিয়া উঠিল। ঘোৎনা বলিল, “এত সাবধানে যাচ্ছিল লোকটা; অথচ…”
লোকটা উঠিতে যাইয়া আবার বে-সামাল হইয়া যাইতেছে। গণশা বলিল, “আঙুলে বোধ হয় প-পলার আংটি নেই, দেখ তো গিয়ে তিলে।”
গুমট ভাবটা কাটিয়া গিয়া একটু প্রফুল্ল হইয়াছে গণেশ; বলিল, “নীলের দোকানের বিড়ি থাকে তো একটা দে তো ঘোৎনা।…না, এ চাকরিটা হাতছাড়া হতে দোব না। স্টীমারে আসতে আসতে একটা মতলব বের করেছি।”
সকলে কৌতূহলী হইয়া মুখের পানে চাহিল। বিড়িটা ধরাইয়া গণশা বলিল, “ব-বড়বাবুর আস্তানা পর্যন্ত ধাওয়া করব ভাবছি। খোঁজ নিয়েছি, বা-ব্বাড়ি মার্টিনের লাইনে।”
ঘোৎনা প্রশ্ন করিল, “স্টেশন?”
“কি যে দিব্যি নামটা। একটু বে-বেয়াড়া গোছের, ঠিক মনে পড়ছে না। দাঁড়া,—সেখানকার কদমা আর নারকল-নাড়ু খুব দামী…”
কে গুপ্ত এদের পাল্লায় পড়িয়া অনেক ভোগান ভুগিয়াছে, একটু সন্দিগ্ধকণ্ঠে প্রশ্ন করিল, “সেটা না জেনে যাওয়া…
গোরাচাঁদ কদমা-নারকলনাড়ুর আঁচ পাইয়াছে, একটু বিরক্তির সহিত বলিল, “হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে তো আপনি যাবেন না মশাই, শিবপুরের ছেলে ঠিক বের করে নেবে।…হাওড়া স্টেশনে গিয়ে যেখানকার সীতাভোগ নামী সেখানকার টিকিট চান তো—শেওড়াফুলির দেয় কি বর্ধমানের দেয় দেখি।”
রাজেন বলিল, “হাওড়া স্টেশনে গিয়ে অত হাঙ্গামা করতে হবে না। ময়দান স্টেশনে গণশা টাইম টেবিলটার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে গেলেই মনে পড়ে যাবে নামটা।”
ঘোৎনা বলিল, “তাহলে যাচ্ছে কে কে? সবাই?”
গণশা সংক্ষেপে বলিল, “স-স-সবাই ক্যান্ডিডেট। একসঙ্গে গাড়ি থেকে নেবেছি। কারুর নিজেদের মধ্যে জা-জানা-শোনা নেই।
ত্রিলোচন বলিল, “ধর যদি তোকে না বাছাই করে ঘোৎনাকে করে?”
গণশা বলিল, “নেবে না। বাড়ি এসে লিখে দেবে।”
রাজেন বলিল, “ঠিক তো, কেনই বা নেবে?—ওর তো হচ্ছেই বিয়ে।”
গোরাচাঁদ বলিল, “মনে কর যদি কে গুপ্তকে পছন্দ করে বসল—তাহলে?”
গণশা বলিল, “ও তো অমন এক মাম্মার পাল্লায় পড়েনি।”
রাজেন বলিল, “মন্দ মতলব বের করে নি গণশা—যাকেই পছন্দ কর, সরে দাঁড়াবে। বাকি থাকবে শুধু ও-ই।”
বিলম্ব আর একেবারে করা সমীচীন নয়, পরদিন সকালের গাড়িতেই যাওয়া ঠিক হইল।
.
সকালে চৌধুরীপাড়ার শিবমন্দিরে এরা সব একত্র হইল। গোরাচাঁদের বিলম্ব হইতেছিল। তাহাকে দূরে আসিতে দেখিয়া সবাই মন্দিরের রক থেকে নামিয়া অগ্রসর হইবে, ত্রিলোচন বলিল, “শিবঠাকুরকে একটা প্রণাম ঠুকে দিলে হত না গণশা? চাকরির সঙ্গে বিয়েরও একটা চান্স রয়েছে…”
রাজেন বলিল, “যা ভয় করছিলাম; দিলি তো পেছনে ডেকে?
গণশা একটু মুখটা কুঁচকাইয়া বলিল, “আর যার নি-নিজের বিয়ে হতেই জটা দাড়ি পেকে গেছল।… ‘ অগ্রসর হইতে হইতে খানিকটা গিয়া ঘোৎনা চিন্তিতভাবে বলিল, “নেহাত ঠাকুর-দেবতার কথা তুলে বসল তিলে—তা ঘুরে একটু অন্নদা চাটুজ্জের রাধারমণের মন্দিরের সামনে হয়ে গেলে হত। ওই বরং এক দেবতা যে বিয়ে-থা এই সব বিষয়ে…”
গোরাচাঁদ বলিল, “ঘাগী আছে।”
ঘোৎনা বলিল, “আমি বলছিলাম—বোঝে-সোঝে ভাল আর কি…”
.
প্রথম ট্রেনটা ফেল করিয়াছিল। এরা একসঙ্গে হইলে ট্রেন লইয়া কোন-না-কোন একটা গোলমাল করিয়া বসেই।
অদৃষ্টও বেচারাদের বিরুদ্ধে চিরকাল চক্রান্তই করিয়া আসিয়াছ। যে-ট্রেনটা ধরিল প্রায় মাঝামাঝি গিয়া একটা জলার ধারে তাহার ইঞ্জিনটা বাগড়া দিল। গার্ড, প্যাসেঞ্জার, ড্রাইভার সবাই আলোচনা করিয়া রোগটা ধরিতে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক লাগিল, সারিতেও লাগিল ঘণ্টাখানেক। ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় সবাই ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছে। এগারটা প্রায় বাজিয়া গিয়াছে, ভাঙা ইঞ্জিনের উপর নির্ভর, কখন দয়া করিয়া পৌঁছাইয়া দিবে কিছুই বলা যায় না, এমন কি পৌঁছাইয়া দিবে কিনা, তাহারও কোন স্থিরতা নাই। অত্যন্ত গরম, ক্ষুধা,—আহারের ব্যবস্থা সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা এই ছিল যে, স্টেশনের কাছাকাছি হোটেলে কিংবা দোকানে গিয়া কাজ সারা হইবে; কিন্তু স্টেশনগুলির স্বরূপের সঙ্গে যতই পরিচয় হইতেছে ততই বুকটা দমিয়া যাইতেছে।
তাহার উপর একঠায় বসিবার যো নাই, অসম্ভব রকম ছারপোকা, দাঁড়াইবার যো নাই, অসম্ভব রকম ঝাঁকানি, খালি পেটে খিল ধরিয়া যায়।
অথচ বসিতেও হইতেছে, দাঁড়াইতেও হইতেছে। এমন কি গরম, ক্ষুধা, নিরাশা, ঝাঁকানি, ছারপোকা—সব একজোট হইয়া সবার চোখের পাতা ভারী করিয়া দিতেছে। গোরাচাঁদের চোখের পাতা একটু যেন ভিজা-ভিজাও মনে হইতেছে।
গোরাচাঁদ, কে গুপ্ত, রাজেন আর ত্রিলোচন ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। ঘোৎনা ঢুলিতেছে, গণশা পর্যন্ত সংযম হারাইতেছে—এমন সময় স্বপ্নের মতো একটা আওয়াজ কানে আসিল, “এ গাড়িতে শিবপুর থেকে কারাও এসেছেন কি?—শিবপুর থেকে?—শিবপুর?”
সকলে প্রায় একসঙ্গে ধড়মড়িয়া উঠিয়া পড়িল। স্টেশন আসিয়া পড়িয়াছে। কয়েকজন ছোকরা এমুড়ো-ওমুড়ো ছুটাছুটি করিয়া চেঁচাইতেছে—“কেউ শিবপুর থেকে এসেছেন কি?—শিবপুর শিবপুর থেকে?”
সকলে বিমূঢ়ভাবে পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিল; ঘোৎনা প্রশ্ন করিল, “কিছু বুঝঝিস গণশা?”
গণশা ছোকরাদের গতিবিধি লক্ষ্য করিতে করিতে কি যেন ভাবিতেছিল, বলিল, “হ্যাঁ।”
রাজেন, ঘোৎনা একসঙ্গে প্রশ্ন করিল, “কি বুঝেছিস?”
কে গুপ্ত প্রশ্ন করিল, “কি করে টের পেলে যে আমরা শিবপুর থেকে…”
গণশা ঘোৎনার কথার উত্তর দিল, “বুঝেছি, যাদের আসবার কথা ছিল, তারা আসে নি।”
সকলেই প্রশ্ন করিল, “কারা?”
গণশা সেই রকম ভাবেই বলিল, “কি জানি?” তারপর হঠাৎ সজাগ হইয়া বলিল, “দু-দুগ্গা বলে ঝুলে পড়তে হবে, নেমে পড়।”
প্লাটফর্মে নামিয়া হাঁকিল, “এই যে আমরা এখানে; আ-আপনারা ওদিকে ডাকাডাকি করছেন কেন?”
সমস্ত দলটি হুড়মুড় করিতে করিতে ছুটিয়া আসিয়া এদের ঘিরিয়া ফেলিল। নানাবিধ প্রশ্ন “এতক্ষণ উত্তর দেন নি… আপনারা এখানে, আর আমরা ওদিকে…”
গোরাচাঁদের একটু ভয় ভয় করিতেছিল, না বুঝিয়া-সুঝিয়া কোন্ ফ্যাসাদের মধ্যে পা বাড়াইয়া দিতেছে…বলিল, “উত্তর দিইনি, মানে আপনারা শিবপুরের কাদের খুঁজছেন—”
একটি রোগা, কুঁজো এবং মুরুব্বিগোছের ছোকরা দুইটা হাত তুলিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, “আরে মশাই, নিবারণ মিত্তিরের বাড়ি এসেছেন তো?”
সকলে যেন একটু থ হইয়া গেল, আড়ে একটু মুখ চাওয়া-চাওয়িও করিয়া লইল—নিবারণ মিত্তির উহাদেরই উদ্দিষ্ট বড়বাবুর নাম।
ঘোৎনা আর গণশা বলিল, “আজ্ঞে হ্যাঁ, তাঁর বাড়িতেই…
সেইভাবেই প্রশ্ন হইল, “শিবপুর থেকে এসেছেন তো?”
সকলেই বিমূঢ়ভাবে বলিল, “আজ্ঞে হ্যাঁ।”
ছোকরা দু’টি হাত স্টেশনের বাহিরের দিকে বাড়াইয়া বলিল, “তাহলে দয়া করে চলুন। মার্টিনের পোষা ছারপোকায় সব গোলমাল করে দেয়, জানি আমরা।”
ছোকরা গ্রামের ছেলেদের রসিক সর্দার গোছের, ডাকনাম নোনু-দা। সকলে তাহার কথায় হাসিয়া উঠিল।
স্টেশন থেকে বাহির হইয়া সকলে গাঁয়ের কাঁচা পথ ধরিয়া চলিল।
কে গুপ্তের হাতে একটা সুটকেস ছিল, একটা গামছা, একজোড়া তাস আর সবার একখানা করিয়া কাপড় আছে—সুবিধামত স্নানটা সারিয়া লইবে। ‘আপনি কষ্ট করবেন কেন?—আমায় দিন’ বলিয়া একটি ছোকরা সেটি চাহিয়া লইল। রাজেন গণেশের গা ঘেঁষিয়া চলিতেছিল, তাহার ঊরুতে একটা চিমটি কাটিল, অর্থাৎ—ব্যাপারখানা কি? গণশা চিমটি কাটিয়াই উত্তর দিল। তাহার পর গলাটা একবার পরিষ্কার করিয়া লইয়া ঘনিষ্ঠতা করিয়া প্রশ্ন করিল, “নি-নিবারণবাবু আছেন কেমন?”
নোনু-দা বলিল, “আধ-মরা হয়ে।”
সকলে আবার হাসিয়া উঠিল। নোনু-দা গণশার দিকে চাহিয়া হাতজোড় করিয়া বলিল, “মাফ করবেন, আমার কথাগুলো একটু বাঁকা বাঁকা—নিবারণ-কাকা আধমরা হয়ে ছিলেন, এইবার আপনাদের আসবার খবর পেয়ে আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবেন।”
সকলে আবার উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিল। গেঁয়ো কাঠরসিকতায় ইহাদের সকলের পিত্ত জ্বলিয়া যাইতেছিল। গণশা বক্তার ন্যুব্জ দেহের উপর একবার দৃষ্টি বুলাইয়া লইয়া বলিল, “ক-কথাগুনো বেঁকা হবে তা আর আশ্চয্যি কি বলুন? ভ-ভ্যয়ানক বেঁকা রাস্তা হয়ে বেরুচ্ছে কি না।”
সকলে হো-হো করিয়া উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিল। পাশে একজন সঙ্গীকে ফিসফিস করিয়া বলিল, শিবপুরের দল, চালাকি করতে গেছেন নোনু-দা!
কথাবার্তার মধ্যে ইহারা একটি গলি ঘুরিয়া একটি বাড়ির সামনে আসিয়া পড়িল। পাশাপাশি চারিটা ঘর, সামনে একটা বারান্দা। বারান্দার একপাশে ইঁটের উনানে দুইজন পাচক ব্রাহ্মণ রান্না করিতেছে। কাছেই দুইজন মুরুব্বিগোছের লোক বসিয়া গল্প করিতেছে, একজনের হাতে হুঁকা।
দলটি আসিতেই হুঁকা হাতে লোকটি ফিরিয়া দেখিয়া বলিল, “এই যে, এসে গেছেন এঁরা, শিবপুর থেকে তো? ওই পাশের ঘরটায় নিয়ে যাও। দক্ষিণে কোথায় গেল? জল দিক, চান-টান করে নিন।…উঃ, দুপুর গড়িয়ে গেল। কি করে হল এত দেরি?”
রাজেন আগাইয়া একটা নমস্কার করিল, বলিল, “ইঞ্জিন বিগড়ে এই নিগ্রহ।”
গণশা, ঘোৎনা প্রভৃতি সকলে আসিয়া একে একে নমস্কার করিল। ভদ্রলোক একবার সকলের উপর দৃষ্টি বুলাইয়া প্রশ্ন করিলেন, “সবাই এসে গেছেন আপনাদের? চলুন, ওপরে আসুন। নোনুকে পাঠিয়েছিলাম স্টেশনে, সে কোথায় গেল?”
নোনু গণশার এক ঠাট্টাতেই পৃষ্ঠভঙ্গ দিয়াছে। একজন ছোকরা বলিল, “তিনি বলিলেন—তোরা বৃন্দাবন সামলা, আমি মথুরা সামলাতে চল্লাম”—নিজেও হাসিয়া উঠিল এবং আর সকলেও যোগ দিল। ভদ্রলোক একটু হাসিয়া বলিলেন, “বড্ড ফোচকে হয়েছে ওটা। নে, তোরাই তাহলে এঁদের দেখশোন একটু, যেন কোন কষ্ট না হয়। নিবারণদা বিশেষ করে বলে দিয়েছেন।…নিন, আপনারা চান-টান সেরে একমুঠো খেয়ে নিন। ঠাকুর, তোমার মাংসের যদি দেরি থাকে তো সাদামাটা যা হয় একটু ব্যবস্থা করে দাও। এমনিই খুব দেরি হয়ে গেছে।”
মাংসে মসলা দিয়া নাড়িতেছে। গোরাচাঁদ হ্রস্ব নিঃশ্বাসের সঙ্গে আঘ্রাণ লইতেছিল, সাদামাটা ব্যবস্থার নামে শংকিত হইয়া একটু হাসিয়া বলিল, “করুক ধীরে সুস্থে, খাওয়াটাই আসল নয়।”
.
মাংসটা খুব ভাল রান্না হইয়াছিল, তায় মাথার উপর একটা অনিশ্চিত বিপদ ঝুলিতেছে, ইহারা মরিয়া হইয়া ফাঁসির খাওয়া খাইয়া লইল। গুরুভোজন, গাড়ির কষ্ট, শতরঞ্জির উপর বিছান সাদা ধপধপে ফরাস, চাপা গলায় নানারকম আন্দাজ আলোচনা করিতে করিতে ইহারা একে একে ঘুমাইয়া পড়িল।
সন্ধ্যা প্রায় হয় হয়। ত্রিলোচন, গণশা আর রাজেনের ঘুম ভাঙিয়া গিয়াছে। ইহারা দুইজনে মুখোমুখি হইয়া শুইয়া আছে, ত্রিলোচন উঠিয়া বসিয়া একটা বিড়ি টানিতেছে। রাজেন বলিল, “আমার আন্দাজ যদি মিথ্যে হয় গণশা তো কি বলেছি-এর মধ্যে ঠিক দৈব কোন ব্যাপার আছে, শুনলি তো? নিবারণবাবু বিশেষ করে বলে দিয়েছেন।”
ত্রিলোচন বলিল, “সব বিয়েই তো আগাগোড়া দৈব।…বেলা পাঁচটার সময় আমার ফেলের খবর শুনে বাবা বললে, “ওকে ত্যাজ্যপুত্র করলাম।’ রাত নটার সময় বাবাতে আর পরে যিনি শ্বশুর হলেন তাতে শংকর চাটুজ্যের ওখান থেকে খাওয়া-দাওয়া করে এলেন—দুজনেরই একটু একটু গোলাপী গোছের নেশা ধরে এসেছে। বাবা বললে, ‘সে ব্যাটাকে ত্যাজ্য পুত্তুর করেছিলাম—বেরিয়ে যায় নি তো?” মা বললে, “বালাই, তার শত্তুর বেরিয়ে যাক্, সে ওপরে ক্যারম খেলচে।’
“তখুনি ন্যায়রত্নমশাইকে ডাকা হল, শ্বশুর নিজের হাতের আংটিটা খুলে আশীর্বাদ করে গেল।
“বিয়ে বাপের হাতেও নয়, জেলার জজের হাতেও নয়” বলিয়া ত্রিলোচন বিড়ি টানিতে লাগিল।
রাজেন বলিল, “আর কারুর মামা যদি ভাবে তার হাতে, তো তাও নয়!”
সকলে চুপ করিয়া রহিল একটু। শ্রুতিরোচক মন্তব্য শুনিয়া গণশার মনটা চাঙ্গা হইয়া উঠায় গুন্ গুন্ করিয়া একটা গান ধরিল। গানটা যখন বেশ একটু জোর হইয়া জমিয়া উঠিয়াছে, ত্রিলোচনও সুটকেসটা টানিয়া তবলা শুরু করিয়া দিয়াছে, ঘোৎনা আসিয়া চৌকাঠের নিচে দাঁড়াইল—একবার পিছনে আশেপাশে দেখিয়া লইল, একটু চাপা গলায় গণশার টোন নকল করিয়া বলিল, “শুধু গানে হবে না, ঘুঙুর পর, না-ন্নাচও দেখাতে হবে।”
গণশা বোধ হয় ‘তাও পারি’ বলিয়া রসিকতা করিতে যাইতেছিল, ঘোৎনা গম্ভীরভাবে আসিয়া পাশে বসিল, বলিল, “তোমাদের বিয়ে-বরযাত্রীর স্বপ্ন দেখবার জন্যে ঘুম আসছে, শম্মার তা আসেনি। নেমে পর্যন্ত গা-ছমছম করছিল আমার।…কেন বাবা, গরীবের ছেলে চাকুরি খুঁজতে এসেছি, এত চব্যচুষ্যের ব্যবস্থা কিসের! গতিক ভাল নয় তো; ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছবি তো পৌঁছো একেবারে খাস জায়গায়—বড়বাবুর বাড়িতে….”
রাজেন প্রশ্ন করিল, “দেখা হল?”
ঘোৎনা ঝাঁঝিয়া বলিল, “চুপ কর রাজেন, তার মরবার ফুরসত নেই, একদিকে ভিয়েন, একদিকে থিয়েটারের স্টেজ, একদিকে বরযাত্রীদের হাঙ্গামা…”
তিনজনেই একসঙ্গে প্রশ্ন করিয়া উঠিল, “বরযাত্রী!”
ঘোৎনা বলিল, “তার মেয়ের বিয়ে হলে বর যাত্রী আসবে না তো একপাল পেটে-অন্ন-নেই চাকরির উমেদার আসবে?… ওত্তোর পাড়া থেকে বরযাত্রী এসেছে; জনাই থেকে সখের থিয়েটার পার্টি-এল বলে, এইখানেই উঠবে, মোটরে আসছে, কলকাতা থেকে খেমটা, আর শিবপুর থেকে ওরিয়েন্টাল ড্যান্স পাৰ্টি…
ত্রিলোচন উৎকণ্ঠিতভাবে প্রশ্ন করিল, “এসেছে?”
ঘোৎনা বলিল, “হ্যাঁ, এই যে গল্পগুজব করছে।”
সকলে মিনিট দুই স্তম্ভিত হইয়া বসিয়া রহিল।
বড়বাবু দলের মধ্যে যে কোনটিকে বাছিয়া লইতে পারেন, কে গুপ্ত ঘুমের ঘোরে বোধ হয় কনে এবং চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়া বিড় বিড় করিয়া বকিতেছিল। ত্রিলোচন ঠেলা দিয়া বলিল, “কি পাস করেছি—পাস করেছি করছেন মশাই, উঠুন, যা চাকরি পেয়েছেন এখন সামলান।”
গোরাচাঁদকেও তোলা হল। সব শুনিয়া দুজনে বাদ্ধ হইয়া ফ্যাল ফ্যাল করিয়া চাহিয়া রহিল। ঘুমের ঘোর কাটিয়া কথাটা যখন মাথায় ঢুকিল, গোরাচাঁদ হতাশ হইয়া বলিল, “আমায় ফেলে যাসনি, বড্ড খেয়েছি…”
ঘোৎনা বলিতে লাগিল, “এতক্ষণ দফা নিকেশ হয়েছিল। একপাল ছেলেছোকরা তোমাদের কাছে দু-একটা পা শিখে নেওয়ার জন্যে ঝুঁকেছিল, রাজেনের উদয়শংকরী ঝুঁটি আবার সর্বনাশ করেছে কি কিনা—কর্তাদের বলে কয়ে এদিকে কাউকে ঘেঁষতে দিই নি এতক্ষণ। বললাম, ‘গত চার রাত্রি থেকে সেরামপুর, দমদমা, রাণাঘাট আর মজিলপুরে বায়না খেটে সবাই আধমরা হয়ে রয়েছে, পা আর উঠছে না, একটু ঘুমুতে দিতে হবে; তাই এদিকে ভিড় নেই, নইলে…”
গণশা বিরক্তি এবং সন্দেহের সহিত বলিল, “বা-বাজে বকিসনি ঘোৎনা, কি শুনতে কি শুনে এসে…একটা দলকে বায়না করে এসেছে, কেউ চিনলে না যে, আমরা তারা নয়?…গাঁ-গাঁজাখুরি ঝাড়তে এসেছিস…
ঘোৎনা বলিল, “তাহলে তুমি বড়বাবুর হাতে দরখাস্ত দেওয়ার জন্যে থাক, আমাদের যেতে দাও—আর যাবেই বা কোথায়? ফেরবার গাড়ি নাস্তি।… যা বলছি শোন, ঘোৎনা অত কাঁচা ছেলে নয়, সে খোঁজও নিয়েছি। বায়না যে করে এসেছিল—সেই ব্যাটা নোনুর দাদা—এদের পানু-দা, সে এখনও ফেরেনি, চিনবে কে?—সে শিবপুরের দলকে রওয়ানা করে দিয়ে ওদিক থেকে জনাইয়ের দলকে মোটরে করে নিয়ে পৌঁছুবে—পৌঁছল বলে।”
কে গুপ্ত প্রশ্ন করিল, “তাহলে শিবপুরের দল—মানে ড্যান্সিং পার্টি এল না কেন?”
গোরাচাঁদের মুখ শুকিয়া আর্মসি হইয়া গেছে। খিঁচাইয়া বলিল, “থামুন মশাই, আপনি আর বোকার মত যা-তা জিগ্যেস করবেন না ওরকম করে; আসেনি আমাদের কপাল ভেঙেছে বলে…তোরা তো পালাবি, আমার পেট ফুলচে…”
সন্ধ্যা হইয়া গেছে। এদিকটা খালি ছিল; চায়ের কেটলি, পেয়ালা পরাতে করিয়া জলখাবার প্রভৃতি লইয়া কতকগুলি লোক উপস্থিত হইল। জনাই থেকে যাহারা আসিতেছে তাহাদের ব্যবস্থা। এদের সঙ্গে নোনুদাকে কেন্দ্র করিয়া আবার ছেলেদের দলও আসিয়া জুটিল একটা। জায়গাটা সরগরম হইয়া উঠিল। নোনু বুকের উপর হাত দিয়া বলিল, “আবার আপনাদের বেঁকা-নোনু হাজির হয়েছে, চা’টার—চা এবং টার ব্যবস্থা করি একটু?”
ছেলেরা উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিল। মেজাজটা আরও খারাপ, গণশা একরকম রাগিয়াই কি একটা বলিতে যাইতেছিল, এমন সময় গোটাতিনেক মোটর হর্ন দিয়া সামনের রাস্তায় আসিয়া দাঁড়াইল। নোনু ঘুরিয়া দেখিয়া বলিল, “জনাই এসে গেছে!” সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত দলটা উচ্চহাস্য ও কলরবের সঙ্গে ‘জনাই এসে গেছে, জনাই এসে গেছে’, করিয়া হুড়মুড় করিয়া নামিয়া সেই দিকে ছুটিল।
রাজেন বলিল, “পানুদা এসে গেল, উপায় এখন? দাঁড়িয়ে চোরের মার খেতে হবে গণশা; কি করতে আসা, কি হতে চলল!” গোরাচাঁদের সবচেয়ে আশঙ্কা, তাহাকে ফেলিয়া সকলে পলাইবে; দাঁড়াইয়া মার খাওয়ার নামে কতকটা আশ্বস্ত হইয়া বলিল, “ক’ ঘা করে দেবে বলে তোর আন্দাজ হয় রাজেন?”
বেহালা, ক্লারিয়নেট, কর্নেট প্রভৃতির বাক্স হাতে করিয়া জনাইয়ের দল নামিয়া আসিল। প্রায় জন ষোল সতেরো। মোটরের শব্দ শুনিয়া কাজের বাড়ি থেকেও লোক আসিয়া জুটিয়াছে। আদর অভ্যর্থনার মধ্যে প্রশ্ন হইল, “আমাদের পানু কোথায়?… পানুকে দেখি না যে?…”
পাশের ঘর, বারান্দা সব ভরিয়া গেল—উঠোন পর্যন্ত। “জল গরম কর….চাচা… হাত-পা ধোবার জল দিক…”
রীতিমত একটা সোরগোল পড়িয়া গেল। রাজেন চাপা গলায় বলিল, “এই বেলা গণশা, এই ভিড়ের মধ্যে…”
সকলে উঠিয়া দাঁড়াইল। গোরাচাঁদ বলিল, “দৌড়ুতে পাবি না বলছি…তাহলে ফাঁস করে দোব..দেখ আমার পেটে টোকা মেরে, না বিশ্বাস হয়…”
কে উত্তর করিল, “পানুবাবু শিবপুরের ওরিয়েন্টাল ড্যান্স পার্টিদের নিয়ে পেছনে আসছেন ট্যাকসি তক্ষুনি পাওয়া গেল না বলে একটু আটকে গেলেন। বললেন… ‘
কয়েকটা কণ্ঠে অতিমাত্র বিস্মিত প্রশ্ন হইল, “শিবপুর! শিবপুরের তাঁরা তো…” কোণের ঘরের দিকে অগ্রসর হইল।
সবাই কাঠ হইয়া গিয়াছে; এক গণশা ছাড়া। সে বেশ সহজভাবে বাহির হইয়া চৌকাঠের কাছে দাঁড়াইল বলিল, “পা-পানুদা কতক্ষণে পৌঁছবে তাদের নিয়ে?”
কয়েকজন বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করিল, “তাহলে…আপনারা?”
গণশা অবিচলিতকণ্ঠে বলিল, “ক-কজন মাত্র এসেছি আমরা, ফার্স্ট ব্যাচে। রাজেনবাবু, ঐ বাবরি—স্নেক ড্যান্স দেবেন; আমি ক্লারিয়নেট, ত্রিলোচন তবলা…”
একটু গা-ঢাকা অন্ধকার হইয়াছে, তাহা না হইলেই সকলে দেখিত রাজেনের মুখটা একেবারে ছাইপানা হইয়া গেছে। তাড়াতাড়ি গণশার কানের কাছে মুখটা লইয়া গিয়া ফিফিস করিয়া বলিল, “আমি এবার চেঁচাব গণশা, আমায় ফাঁসিয়ে দিলি,—ড্যানসিঙের ‘ড’ও জানি না…
রাজেনের সঙ্গে সঙ্গে খাতির দাঁড়াইয়া গিয়াছে, কয়েকজন উৎসুকভাবে প্রশ্ন করিল, “উনি বলেন কি?”
গণশা রাজেনকে একটা চুপ করিবার জন্য চিমটি কাটিয়া বলিল, “উনি বলছেন, নী-নীলগিরি স্নেক্ ড্যান্সটা দেখাবেন আজ—ওইটেই ওঁর স-সবচেয়ে ভাল কিনা—মা-স্মাস্টারপীস্।”
গোরাচাঁদ নিজের অনুকূলেও সবার একটা সহনাভূতি গড়িয়া লইবার জন্য আগাইয়া আসিয়া বলিল, “আমি একটি মণিপুরী ড্যান্স দোব।”
ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বলিল, “আপনার যেরকম কাঠামো মশাই, তাতে ভোজপুরী ড্যান্সেরই বেশি খোলতাই হত।”
একজন বয়স্থগোছের বলিল, “ও! আপনারা তাহলে সবাই আসেন নি?”
গণশা বলিল, “আজ্ঞে না, কয়েকজন ছুটি পেলে না; চাকরি আছে কিনা।”
“তা এ ব্যবস্থা মন্দ হয় নি, পানু ওদের নিয়ে ঠিক সময়ে না আসতে পারলেও আপনারা চালিয়ে নিতে পারবেন।” ঘোৎনা আগাইয়া আসিয়া বলিল, “বিলক্ষণ!…কত আসর মেরে এলাম, আর এ তো…একা রাজেনই…”
বাবরীওয়ালা নীলগিরি স্নেক্ ড্যান্স দিবার লোকটির পায়ের দিকে কয়েকজনের নজর গেল, থর থর করিয়া এত কাঁপিতেছে—প্রায় হাঁটুতে হাঁটুতে ঠোকাঠুকি হইয়া যাইতেছে। সকলে ভাবিল—সাধা পা, নাচের জন্য চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে।
.
প্রায় মিনিট পনেরো-কুড়ি পরের কথা।
মোটর তিনখানা ভিড় থেকে সরিয়া গিয়া খানিকটা দূরে সারি সারি দাঁড়াইয়া ছিল। ঘোৎনা, রাজেন প্রভৃতি ঘুরিতে ঘুরিতে আসিয়া একে একে জড়ো হইল, সবশেষে গণশা একটু হন্তদন্ত হইয়া আসিয়া প্রশ্ন করিল, “তোমাদের মধ্যে মাখন ড্রাইভার কার নাম?”
মাঝের গাড়িটার ড্রাইভার সীটে হেলান দিয়া শুইয়া ছিল, উঠিয়া বসিয়া বলিল “আমি মাখন।”
গণশা গাড়ির দুয়ারটা খুলিয়া প্রবেশ করিতে করিতে বলিল, “শীগগির স্টার্ট দাও, জ-জ্জনাইয়ে ফিরে যেতে হবে। আসল জিনিসই সব ভুলে এসেছে।”
ঘোৎনা প্রভৃতির পানে চাহিয়া বলিল, “উঠে এস তোমরা, দে-দ্দেরি কোর না আর, সব হাতে হাতে সংগ্রহ করে নিতে হবে।…কি যে ফ্যাসাদ করে বসল!”
গোরাচাঁদ বলিল, “ব্যাগটা রয়ে গেল…”
গণশার আপাদমস্তক জুলিয়া গেল। গোরাচাঁদের উপর একটা উগ্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া সহজ কণ্ঠেই বলিল, “ও, তাও তো বটে; তা আপনি ওটা একটু দয়া করে আগলানগে, এক্ষুনি তো আসছিই ফিরে….কই দিলে স্টার্ট?”
স্টার্ট দেওয়া হইয়াছে, গোরাচাঁদ তাড়াতাড়ি ফুট-স্টেপের উপর লাফাইয়া বলিয়া উঠিল, “না, না, সুটকেস আর যাবে কোথায়? সব চেনাশোনা নিজের লোক…”
ওদিকে কে হাঁকাহাঁকি করিতেছে—”কই, শিবপুরের এঁরা সবাই গেলেন কোথায়?—মণিপুরী ড্যান্সের সেই ভদ্রলোক যে চা-জলখাবার নিয়ে আসতে বললেন?…”
দ্রুত অপস্রিয়মাণ মোটরের মধ্যে গোরাচাঁদের দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে কয়েকজনের দাঁত কড়মড়ানির শব্দ হইল।
