অভিভাবক
ব্যারিস্টার এস্. কে. ড্যাট্ ক্লাব হইতে একটু রাত করিয়াই ফিরিলেন। মোটর হইতে নামিয়া বেয়ারাকে প্রশ্ন করিলেন, “সে সম্বন্ধী এসেছিল আজও,—সেই ইনসিওরেন্স কোম্পানির এজেন্টটা?”
ক্লাবের ফেরত স্বরটা একটু জড়িত এবং মেজাজটা একটু চড়া পর্দায় বাঁধা থাকে; আর ঠিক যে ‘সম্বন্ধী’ কথাটাই ব্যবহার করিলেন তাহা নয়। যেটা ব্যবহার করিলেন সামাজিক ভাষায় তাহার মানে হয়, সম্বন্ধী। আমরাও এই কথাটাই চালাইবা
বেয়ারা বলিল, “আজ্ঞে না, সে আজ আর আসে নি।”
সিধা হইয়া সামান্য দুলিতে দুলিতে বলিলেন, “সো মাচ্ দি বেটার্ ফর্ হিম্। এবার এলে জিজ্ঞেস করবি তার নিজের লাইফ ইনসিওর করা আছে কিনা।”…
“যে আজ্ঞে হুজুর।”
“কেন? হোয়াই?”
বেয়ারা উত্তর দিতে না পারিয়া বিমূঢ়ভাবে চাহিয়া রহিল। ড্যাট্ সাহেব তাহার বুকের কাছে তর্জনীটা লইয়া গিয়া ধীরে ধীরে সঞ্চালিত করিয়া বলিলেন, “যেহেতু তাহার অভ্যর্থনার জন্য কল্য হইতে আমার ব্লাডহাউন্ড লীয়কে খুলিয়া রাখা হইবে।…বলে দিবি।” বলিয়া উপরে উঠিয়া গেলেন।
বারান্দার একপাশে মক্কেলদের বসিবার ঘর। পর্দা সরাইয়া ভিতরে উঁকি মারিয়া বেয়ারা বলিল, “ও হবে না বাবু, শুনলেন তো? ক্রমে বেশি রকম খাপ্পা হয়ে উঠছেন, কোনদিন খেয়ালের মাথায় কি একটা করে বসবেন…এমনি তো সাহেব খুব ভাল, তবে…”
“তাই দেখছি” বলিয়া একটি ছোকরা বিষণ্ণভাবে উঠিয়া দাঁড়াইল। পর্দার ফাঁকে বাহিরের দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিল, “চলে গেছেন ওপরে, না?”
বারান্দায় আসিয়া পকেট হইতে একটি সিকি বাহির করিয়া বেয়ারার হাতে দিয়া নামিয়া গেল। বেয়ারা সিকিটা বিদ্যুতের আলোয় ভাল করিয়া দেখিয়া লইয়া তাড়াতাড়ি ছোকরাটির কাছে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কালও আসবেন নাকি বাবু? আরে খাপ্পা হয়ে তো আর খুন জখম করবে না…অত ভয় করলে কি কাজ চলে?”
ছোকরা একটু দাঁড়াইয়া ঘুরিয়া বলিল—“ঠিক বলতে পারছি না বাপু, তবে সম্ভবত নয়। যদি আসিই তো তুমি তোমার চার-আনি থেকে বঞ্চিত হবে না।” বলিয়া একটু হাসিল। .
প্রুডেনশ্যাল ফ্যামিলি ইনসিওরেন্স কোম্পানির এজেন্ট। আজ চার দিন হইতে যাওয়া-আসা করিতেছে, কিন্তু সুবিধা হয় নাই। প্রথম দিন সামান্য মিনিট দশেক ধরিয়া একটু কথা কহিবার সুযোগ হইয়াছিল, তাহাতে নিজের প্রস্পেক্টাস্টা বুঝাইতে কুলায় নাই। ইহার পর আদৌ বীমা করিবার যৌক্তিকতা দেখান আছে, তাহার পর অন্যান্য দেশী-বিদেশী তাবৎ বীমা কোম্পানির প্রবঞ্চনা এবং অন্তঃসারশূন্যতার প্রমাণ উপস্থিত করা আছে; তাহার পর যদি মন ভেজে।
অবশ্য দেশী এবং বিদেশী কোম্পানিগুলো যে প্রবঞ্চক এবং অন্তঃসারশূন্য এটা বুঝাইতে বেগ পাইতে হইবে না। যতদূর খবর পাওয়া গেছে এবং পরিচয়েও যেটুকু বোঝা গেছে এ-সম্বন্ধে ড্যাট্ সাহেবের তাহার সঙ্গে মতান্তর নাই। কিন্তু ও-সবের মধ্যে প্রুডেনশ্যাল ফ্যামিলি যে একমাত্র ব্যতিক্রম, এ ধারণাটা অমন সুরক্ষিত মনোদুর্গে কোনও ফাটল-টাটল দিয়া সাঁদ করাইয়া দেওয়া চলিবে কিনা, সেই হইয়াছে সমস্যা।
কোন আশা নাই; বড় বড় জাঁদরেল রকম এজেন্টরা ব্যর্থ হইয়া ফিরিয়া গিয়াছে। সেখানে কি এই আই.এ. ফেল কোঁচা-লটকানো ছোকরা-এজেন্ট অনাথ সরকারের কাজ?
তবে লোভ ছাড়া দুষ্কর। লোকটা শ্বশুরের একমাত্র কন্যার সঙ্গে অগাধ টাকা ঘরে তুলিয়াছে। আর ইনসিওরেন্সের ভাষায় যাকে বলে একেবারে ‘ভার্জিন সয়েল’—না রেস, না শেয়ার মার্কেট, না ইনসিওরেন্স—কোনটাই ফালের একটু আঁচড় পর্যন্ত দিতে পারে নাই।
তাই এক কঠোর তপস্যা চলিতেছে; ধ্রুব কিংবা প্রহ্লাদের তপস্যার চেয়ে কোন অংশে খাটো নয়…তবে কোন আশা নাই।
আর আজকের ব্যাপারে উৎসাহও ভাঙিয়া গেছে। অন্তরালে রাজা-বাদশাকেও সবার ‘সম্বন্ধী’ হইতে হয়। এ একেবারে গালাগালটা স্বকর্ণে শুনিতে হইল! এর পরে আর এ বাড়িতে পা দেওয়া চলে না।
মনটা সত্যই ক্ষুণ্ণ হইয়া পড়িয়াছে, আত্মধিক্কারে। সমস্ত দিন নানান জায়গায় হাজির দিয়া দিয়া পায়ের সুতা ছিঁড়িয়া যাইতেছে; আসল কাজের জমার ঘরে একেবারে শূন্য। চাকরির সমস্ত দ্বার বন্ধ, ওদিকে বাড়িতে বৃদ্ধ পিতা হইতে আরম্ভ করিয়া সবাই তাহার দিকে চাহিয়া আছেন। ভরসা এই দালালিটুকু, এইটুকুকে সারাদিন নিংড়াইয়া নিংড়াইয়া যদি দুফোঁটা রস গড়াইয়া আসে হাতে।… চোখে জল আসিয়া পড়ে। অবশেষে গালাগালটা পর্যন্ত অদৃষ্টে ছিল!
গলাটা শুকাইয়া আসিতেছে—গলার রসই যেন চোখে ঠেলিয়া উঠিয়াছে। সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত দশটা—তিনটি ঘণ্টা আজ একাসনে গিয়াছে। অনাথ সরকার গিয়া একটা পানের দোকানের সামনে দাঁড়াইল। বলিল, “দু-পয়সার দুটি ডবল খিলি বেশ ভাল করে সেজে দে দিকিন।”
.
পানওয়ালার অবস্থা ভাল, দুইটি সহকারী। নিজে অন্য একটি ছোকরার সহিত কি লইয়া হাসি-ঠাট্টা করিতেছিল, হুকুম করিল, “খুব ঠিকসে বনা দে বাবুকো।”
তাহার পর হাসিয়া অনাথ সরকারের দিকে চাহিয়া বলিল, “বাবু, একে জিজ্ঞেস করেন তো আমার কে হোয়।” অনাথ বোধ হয় প্রশ্নেরই উদ্দেশ্যে ছেলেটির দিকে চাহিয়া একটু হাসিল।
ছেলেটি একটু লজ্জিতভাবে ছদ্ম-ক্রোধের সহিত তাহার দিকে চাহিয়া বলিল, “ও পাগলা আছে বাবু, শুনবেন না ওর কথা।”
“আচ্ছা, শপথ করকে বোলো।”
যে ছোকরা পান সাজিতেছিল, মুখ তুলিয়া হাসিয়া বলিল, “ওর বহিনকে সোমবারী রাউত সাদী করেছে বাবু।”
ছেলেটা তাহার দিকে চাহিয়া বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাইয়া বলিল, “হামারা বহিন হি নেহি হ্যায়, হোগাভি নেহি, বাপ-মা দুনো চৌপট!” বলিয়া ওদিক দিয়া নিজের নিশ্চিত্ততায় হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। তাহার পর অনাথকে সাক্ষী মানিয়া বলিল, “আপনিই বিচার করেন বাবু, গাঁয়ের লেড়কী সাদী করলেই যদি সব হোত তো সোমবারী ভাইয়ার গাঁয়ে যারা সাদী করেছে সবই তো সম্বন্ধে ওর…
সোমবারী হাসিয়া তাহার মুখটা চাপিয়া ধরিল এবং উহারই মধ্যে খানিকটা বলপ্রয়োগ করিয়া বলিল, “মানো গে কি নেহি?”
ছেলেটা বেকায়দায় পড়িয়া একটু ছটফট করিল, ছাড়াইতে না পারিয়া আবদ্ধ স্বরে কহিল, “আচ্ছা, আচ্ছা, মান লিয়া।”
সোমবারী ও তাহার দুই সহকারী হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। ছেলেটা একটু অপ্রতিভভাবে চুপ করিয়া রহিল, তাহার পর হঠাৎ ডান হাতটা বাড়াইয়া দিয়া বলিল, “আচ্ছা বেশ, তবে খাতির করো…”
সোমবারী কৃত্রিম আগ্রহের সহিত বলিল, “হাঁ হাঁ জরুর…খাতির করব না বাবু? বোড়ো কুটুম আছে!”
ছেলেটা ডান হাতটা বাড়াইয়া দিয়া বলিল, “লে আও এক প্যাকেট গোল্ড ফেলেক…
ঠিক কিনা বাবু? বড় কুটুমের বড় খাতির হোবে না?”
সোমবারী নিজের পরাজয়ে হঠাৎ একটু নিষ্প্রভ হইয়া গেল। কিন্তু অনাথ দাঁড়াইয়া থাকিবার জন্যই হোক বা যে জন্যই হোক, সেটা সামলাইয়া লইয়া বলিল, “হাঁ, হাঁ, আলবৎ, আরে সোমবারী রাউত ফকির নেহি হ্যায়, তুম মান তো লিয়া আখির? (তুই শেষ পর্যন্ত মেনে ত নিলি)?”
একটা গোল্ড ফ্লেক্ সিগারেটের বাক্স বাড়াইয়া ধরিল। ‘বড় কুটুম’ সেটা বাঁ হাতে লইয়া ফরমাশ করিল, “দো খিল্লি বনারসী পান—বাদলরামকা জরদা ডাল দেনা,—এক বোতল আইস্-নিম্লেট্—বড়া বোতল…”
ছেলেটার পান সাজা হইয়াছিল, অনাথের দিকে বাড়াইয়া বলিল, “লেন বাবু।”
অনাথ সোমবারী রাউতের শখের বড় কুটুমের দিকে অন্যমনস্কভাবে চাহিয়া কি একটা গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিল, শুনিতে পাইল না। ছেলেটা আবার বলিতে মুখ ফিরাইয়া বলিল, “হো গিয়া?”
তাহার পর খিলি দুইটা লইয়া দাম চুকাইয়া আবার কি চিন্তা করিতে করিতে মন্থর গতিতে বাসার দিকে অগ্রসর হইল।
.
তাহার পরদিন অনাথ আবার ড্যাট্ সাহেবের বাড়ি হাজির হইল। মালী মরশুমী ফুলের গাছ নিড়াইতেছিল, উঠিয়া আসিয়া একটা সেলাম করিয়া বলিল,—“সাহেব তো কোর্টে গেছেন।” সেটা জানিয়াই আসা, তবুও অনাথ একটু নৈরাশ্যের ভান করিয়া বলিল, “সত্যি! তবে তো কাজ হল না।…আচ্ছা মেমসাহেব আছেন?”
জানা গেল তিনি আছেন। তাহার পর বাগানের প্রশংসা করিতেই আরও জানা গেল একটু আরাম করিয়া শীঘ্রই নামিবেন। বাগানের ভারি শখ, সমস্ত দুপুরটা তাঁহার এইখানেই কাটে।
অনাথ বলিল, “হ্যাঁ, শুনেছি বটে, বাগান আর কুকুরের বড় শখ, সমস্ত দুপুর লীয়নটাকে সঙ্গে করে বাগানে ঘুরে ঘুরে বেড়ান।”
টের পাওয়া গেল, না, কুকুরের শখ তো দূরের কথা, একেবারে দু-চক্ষে দেখিতে পারেন না। আর সাহেবের অবর্তমানে লীয়নকে কি খুলিবার যো আছে? তাহা হইলে তো একটা মহামারী কাণ্ড হইয়া পড়িবে। লীয়ন বাড়ির পেছনে কেনেলে বাঁধা আছে।
তাহা হইলে লীয়নকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য নিয়োজিত করা হয় নাই। অনাথ নিশ্চিন্ত হইয়া বারান্দায় গিয়া বসিল। ছোট বারান্দার মাঝখানে একটি গোল টেবিলের চারিধারে কৌচ। সিঁড়ি, বারান্দার কিনারা নানারকম গাছের টবে ভর্তি। উপর হইতে তারের ছোট ছোট ঝুড়িতে কয়েক রকম অর্কিড টাঙান। বারান্দাটি দক্ষিণমুখো, একদিক দিয়া গাছের জাফরি ভেদ করিয়া নূতন শীতের সূর্যের কয়েকটি রশ্মি আসিয়া শরীরের খানিকটা উত্তপ্ত করিতেছে। লাগিতেছে বেশ মিষ্টি।
অনাথ দাঁতে আঙুল খুঁটিতে খুঁটিতে চিন্তা করিতেছিল। আজ একটা নূতন পথে পা বাড়াইতে হইবে। সাফল্যের সংশয়ে বুকের মধ্যে টিপটিপানিটা এক একবার বড় স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছিল। তবুও একবার চেষ্টা করিতে হইবে। একটু সাহস। সে সাহসে কি আনিয়া দেয় বলা শক্ত। যদি আনেই অবজ্ঞা, যদি আনেই অপমান তো তাহাই অদৃষ্টের দান বলিয়া মানিয়া লইতে হইবে। জীবনটা তো এই পদে পদে অদৃষ্টকে যাচাই করিয়া চলে, দেখা যাক, তাহার অদৃশ্য করে বরাভয়, কি অভিশাপ…
হঠাৎ সিঁড়ির মাথায় হালকা চপ্পলের ঘা পড়িল যেন। অনাথ উৎকর্ণ হইয়া উঠিল, বুকের স্পন্দন অসম্ভব রকম বাড়িয়া গেল।…শব্দটি দ্বিতীয় ধাপে নামিল, অলস, মন্থর পাদুকার আর একটি কোমল আঘাত নয়, স্পর্শ-ই বলা ঠিক। তাহার পর পদক্ষেপ একটু দ্রুত হইয়া উঠিল। অনাথ কৌচটা ঠেলিয়া সিধা হইয়া দাঁড়াইল এবং সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ির বাঁকে একটি নারীমূর্তির আবির্ভাব হইল।
“কি দরকার আপনার?…মিস্টার দত্ত তো এখন…”
অনাথের অবস্থাটা বর্ণনাতীত। একটু দুর্বলতা, এক লহমার একটু দ্বিধা। সঙ্গে সঙ্গেই সেটা কাটাইয়া দুই পা অগ্রসর হইয়া গেল এবং মুখটা যতটা সম্ভব সিধা করিয়া তুলিয়া বলিল, “আজ্ঞে না, দত্তজা মশাইয়ের সঙ্গে আমার দরকার নেই তো, আমি এসেছিলাম…”
বরাভয় কি অভিশাপ বোঝা যায় না। চোখে শুধু একটা উগ্র বিস্ময় লাগিয়া আছে।
“কিছু চাই কি আপনার? চাঁদা চাঁদা…?”
“আজ্ঞে না, আপনার কাছে অত হালকা প্রার্থনা নিয়ে আসব কেন?”
সেই রকমের স্ত্রীলোক, যাঁদের এ ধরনের কথা অনায়াসেই বলা চলে। দীর্ঘাঙ্গী, তন্বী, সমস্ত অবয়বে একটি শান্তশ্রী, একটি প্রসন্নতা পরিব্যাপ্ত। মুখে এখন কৌতূহলের সঙ্গে একটা সংশয়ের ছায়া পড়িয়াছে বটে, কিন্তু সেটি অন্তরের সহজ আনন্দ-রূপটি ঢাকিতে পারে নাই। অনাথের চোখে এটা ধরা পড়িতে বিলম্ব হইল না, কেন না এ ব্যবসায়ে নবাগত হইলেও দৃষ্টিতে কোথায় অনুরাগ, কোথায় বিরাগ লুকানো আছে, সেটা আবিষ্কার করিয়া ফেলায় সে দক্ষ হইয়া উঠিতেছে।
মহিলাটির বয়স চব্বিশ-পঁচিশ বৎসর হইবে, অর্থাৎ সেই বয়স যে সময় সংসারের খানিকটা অভিজ্ঞতা লাভ করায় স্বভাবের মধ্যে বেশ একটু গাম্ভীর্য আসিয়া পড়ে, অথচ এমন একটা পরিপক্বতা আসিয়া পড়ে না, যাহাতে কেহ দুইটা মিষ্ট কথা বলিলে, কি একটু তোষামোদ করিলেই কূট উদ্দেশ্যের সংশয়ে সতর্ক হইয়া পড়ে।
ধীরে ধীরে নামিয়া আসিয়া একটু হাসিয়া বলিলেন,—”গুরুতর প্রার্থনা পূরণ করবার আমার সাধ্যি কী আছে? তবু বলুন, শোনবারও তো একটা কৌতূহল হয়।”
সবচেয়ে তফাতের কৌচটিতে বসিলেন।
অনাথও একটু হাসিল, বলিল,—“আমি যা প্রার্থনা করতে এসেছি তা আগেই অপর হাত থেকে পেয়ে গেছি অযাচিত ভাবে। কিন্তু সে-পাওয়ার মধ্যে একটু খুঁত থেকে গেছে। দানপত্র হাতে এসেছে দাতার স্বাক্ষর সমেত, কিন্তু তাঁর একলার স্বাক্ষরে দাবী-দাওয়া সাব্যস্ত হবে না, আপনারও দস্তখত চাই; তাই আপনার কাছে আসা।”
রমণী কতকটা বিমূঢ়ভাবে রহিলেন। একটু যেন অপ্রতিভভাবে বলিলেন—“বুঝতে পারছি না আপনার কথা ঠিকমতো, কে দানপত্র দিয়েছে? দানপত্র…আপনি একটু স্পষ্ট করে বলুন।”
অনাথ মনে মনে বক্তব্যটা যেন একটু গুছাইয়া লইল, তাহার পর বলিতে লাগিল, “আমি হচ্ছি প্রুডেনশ্যাল ফ্যামিলি ইনসিওরেন্সের এজেন্ট।…চোদ্দ বছরে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করি, এখন সতেরো। বুঝতে পারছেন, অদৃষ্টের বিশেষ তাগাদা না থাকলে সতেরোটা ক্যানভাসিং করবার বয়স নয়। তবু বছর দেড়েক কোন রকমে ঠেকিয়ে রেখেছিলাম তাগাদা। আই.এ.-টা আরম্ভ করলাম, গেলামও এগিয়ে অনেকটা, কিন্তু ঠিক যে সময় পরীক্ষা দেওয়ার যোগাড়যন্ত্র করছি, সেই সময় তাগাদা এত জরুরী হয়ে উঠল যে আর ঠেকানো গেল না। চাকরির বাজার ঘুরলাম, জোড়া দু’এক জুতো নিঃশেষের পর আর উৎসাহ রইল না; আগে গেলেই ভাল হত, কিন্তু লোকসানের কপাল কিনা, মাস চারেক চোরা উৎসাহটা রইল সঙ্গে। তারপর এই অধম-তারণ ইনসিওরেন্স।
“ওদিককার ইতিহাস এই। আপাতত এই অবলম্বন করে মাস তিনেক এই শহরে কাটল। দেখছি আরও দুর্গম পথ। জনসাধারণের কল্যাণের জন্য এত কোম্পানি গড়ে উঠেছে, আর তাদের চরেরা গেরস্তদের আনাচ-কানাচ পর্যন্ত এমন ভর্তি করে ফেলেছে যে, লোকেরা কি করে সে কল্যাণ থেকে পরিত্রাণ পেয়ে কোন রকমে জীবনটাকে কাটিয়ে দেবে সেই ভেবে ক্ষেপে উঠেছে।…আপনি হাসছেন? কিন্তু ব্যাপারটা এই-ই, একটুও অতিরঞ্জিত নয়। বুঝিও সব, কিন্তু পেট বোঝে না একটুও।… অবশ্য ফল বিশেষ কিছু হচ্ছে না—সেখানে গীতার বাণী সান্ত্বনা দিচ্ছেন—”মা ফলেষু কদাচন…
“কাহিনীটা বেড়ে যাচ্ছে, আপনি বোধ হয় বিরক্ত হচ্ছেন?
“…হচ্ছেন না? সে আপনার দয়া!… যা হোক, যে ফল আকাঙ্ক্ষা করে এত কাণ্ড, তা না পেলেও ভগবান আমায় অন্য দিক দিয়ে এক অপূর্ব পুরস্কার দিয়েছেন। সেই সম্পর্কেই আমার আসা।
“আমি এ বাড়িতেও বার-চারেক এসেছি, বোধ হয় আপনার নজরেও পড়ে থাকব। ফলে দত্ত সাহেবকে এতটা সন্তুষ্ট করে ফেলেছি যে কাল ঘরের ভেতর পর্দার আড়াল থেকে শুনলাম, তিনি নিজের মুখে আমার সঙ্গে পৃথিবীর মধ্যে মধুরতম সম্বন্ধ পাতিয়ে প্রীতি-সম্ভাষণ করে ফেললেন।”
রমণী কৌতূহলে, বিস্ময়ে, আশঙ্কায় মুখের দিকে চাহিয়া রইলেন। অনাথ একরকম করুণ অথচ হালকা রহস্যের হাসি হাসিয়া বলিল, “আজ্ঞে হ্যাঁ, বেয়ারাকে জিজ্ঞেস করলেন, “সে সম্বন্ধী আজও খোঁজ করতে এসেছিল নাকি?’—ঠিক সম্বন্ধী বলেন নি, কথাটার মানে হয় সম্বন্ধী…”
রমণী ঘৃণায় লজ্জায় আরক্তিম হইয়া বলিয়া উঠিলেন—”ছি ছি, এই কথা বললেন উনি আপনাকে কি করে পারলেন বলতে!…আমি ওঁর হয়ে…
অনাথ হাসিয়া বলিল, “কিন্তু এতে ছি-ছি’রই বা কি আছে বলুন না।”
“সে কি! উনি এমন একটা গালাগাল দিলেন, আর…”
“দেখুন, আমায় কথাটা প্রথমে ঐ ভাবেই আঘাত করেছিল বটে, কিন্তু পরে একটু অদ্ভুত ভাবেই এর আর একটা দিকে আমার নজর পড়ে। সেটা…থাক, সে আর আপনাকে বলব না…
“মোটকথা আমি আমার পারিবারিক সম্বন্ধের রাজপথ আর অলিগলি সর্বত্র মনে মনে খুঁজে দেখলাম, কিন্তু কোনখানেই একটিও ভগ্নীর সন্ধান পেলাম না। তখন নিশ্চিন্ত হলাম, যাক, ভগবান আমায় বঞ্চিত করে গালাগাল থেকে বাঁচিয়েছেন।”
অনাথ হাসিয়া একটু থামিল। তাহার অনিচ্ছাসত্ত্বে দীর্ঘনিশ্বাস পড়িল। তাহাতেই আবার সচকিত হইয়া সে একটু ম্রিয়মাণ হইয়া বলিল, “কিন্তু মনের গতি বড় কুটিল তা জানেনই, যে অভাব আমায় নিশ্চিন্ত করলে সেই অভাবই একটু পরে আমার মনটা বড় বিষণ্ণ করে তুলল, অর্থাৎ যে-বোন থাকলে আজ পরোক্ষভাবে অপমানিত হত তার জন্যে মনটা বড় ব্যাকুল হয়ে উঠল। আমরা চারটি ভাই, একটি বোনের অভাব সকলেই বড় অনুভব করি। বাবা মা বলেন ভগবানের দয়া, না হলে এর উপর আবার তার বিয়ের দুর্ভাবনা ছিল, কিন্তু এ দয়ার বেদনা যে তাঁদের কত গভীর তা আর আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না। যদি বলি কাল সমস্ত রাত এই না-থাকা বোনের চিন্তায় কেটেছে আপনি নিশ্চয় বিশ্বাস করবেন না।”
মিসেস দত্ত হঠাৎ বিষণ্ণ আর অন্যমনস্ক হইয়া গিয়াছিলেন, অনাথ চুপ করিতে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন, “করব বিশ্বাস। দেখুন আমারও ভাই নেই…আর সব চেয়ে কষ্ট হয়, লোকে যখন কানাঘুষা করে, ভাই থাকলে আর বাপের এতবড় সম্পত্তিটা আমি পেতাম না…মানুষ মানুষের বেদনা কত কম বোঝে দেখুন।”
অশ্রু ঠেলিয়া আসিবার ভয়ে মুখটা ঘুরাইয়া লইলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ গেল, তাহার পর হঠাৎ যেন মন হইতে এই আতুর ভাবটা ঝাড়িয়া ফেলিয়া অনাথ বলিয়া উঠিল, “কিন্তু বিধাতার বঞ্চনা নিয়ে দুঃখ করেই বা কি হবে? আমার মাথায় একটা মতলব এল, দুষ্টুবুদ্ধিও বলতে পারেন, ভাবলাম, চাই কি, এ থেকে একটা মহালাভও হয়ে যেতে পারে।”
মিসেস দত্ত একটু বিস্মিত হইয়া অনাথের মুখের দিকে চাহিলেন, তাহার পর একটি ক্ষীণ স্মিত হাস্যের সহিত প্রশ্ন করিলেন, “লাভ!—গালাগাল থেকে কি লাভ হবে?”
“দিদি লাভ।”
মিসেস দত্ত আরও একটু ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া চাহিয়া রহিলেন, তাহার পর হঠাৎ আঁচলটা মুখে দিয়া খিল-খিল করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। কৌতুকদীপ্ত চক্ষে অনাথের পানে চাহিয়া বলিলেন, -“কিন্তু তাতে যে গালাগালটা আরও পাকা করে নেওয়া হল!”
অনাথ হাসিয়া বলিল, “আপনি ভুল বলছেন দিদি, গালাগালটি যে আর একেবারে রইলই না। মা কখন কখন আমায় বাদশার জামাই বলে গালাগাল দেন, কিন্তু সত্যিই যদি বাদশার মেয়ে ঘরে আনতে পারা যেত…”
মিসেস দত্ত আবার হাসিয়া বলিলেন, “আপনিও ভুল করছেন, ও গালাগালটা দেন আসলে আমার ভাজকে…কিন্তু আপনি বসুন, তখন থেকে দাঁড়িয়েই রয়েছেন যে…”
অনাথ বসিতে বসিতে বলিল, “আমি এই আদেশটুকুর জন্যেই বোধ হয় অপেক্ষা করছিলাম, কেন না এর মানে হয়—দিদি আমায় ভাই বলে তুলে নিলেন।…আমায় কিন্তু ‘আপনি’ বলে আর লজ্জা দেবেন না।”
.
দিন কয়েক পরের কথা। তিথিটা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া।
এর মধ্যে অনাথ কয়েকবার আসিয়াছে এবং অকৃত্রিম প্রীতি আর শ্রদ্ধার বিনিময়ে একটি স্নেহাতুর চিত্তের নিবিড়তর পরিচয় লইয়া গিয়াছে। অনাথ বলে, “দিদি, শাপে বর সত্যিই হয়। জামাইবাবুকে ধন্যবাদ না দিতে পারা পর্যন্ত মনটা হালকা হবে না।”
অবশ্য, জামাইবাবুর সঙ্গে এখনও দেখা হয় নাই। কারণ অনাথ আসে দুপুরটিতে, তাঁহার অবর্তমানে—ইচ্ছা করিয়াই।
ভাই-বোনের মধ্যে স্থির হইয়াছে, দেখাটা করিতে হইবে একেবারে অকস্মাৎ, আর নিতান্তই এক অপ্রত্যাশিত, অচিন্তনীয় অবস্থার মধ্যে।…হাওয়া যদি অনুকূল বোধ হয় তো অনাথ আর একবার অদৃষ্ট পরীক্ষাও করিবে বলিয়া মনে মনে আঁচিয়া আছে।
ভ্রাতৃদ্বিতীয়া। ড্যাট্ সাহেব আশ্চর্য হইতেছেন—বাড়িতে আজ যেন কিছু বাড়তি আয়োজন হইতেছে। এই দিনটির সম্বন্ধে সাধারণত মিসেস ড্যাটের একটি নিগূঢ় বেদনা আছে। এবার ভাবটা বেশ প্রসন্ন, রহস্য-মুখর। ড্যাট্ সাহেব তাই আশ্চর্য হইয়াছেন; দু’একবার প্রশ্ন করিয়া কিন্তু সন্তোষজনক উত্তর পান নাই।
দুইজনে বারান্দায় বসিয়া আছেন, এমন সময় একটি সতেরো আঠারো বৎসরের প্রিয়দর্শন যুবক ফটক খুলিয়া কম্পাউন্ডে প্রবেশ করিল; একটু অনিশ্চিত চিত্তে থমকাইয়া দাঁড়াইল, তাহার পর দৃষ্টি নত করিয়া অবিচলিত পদে বাগান পার হইয়া বারান্দায় উঠিয়া ড্যাট্ সাহেব এবং পরে মিসেস ড্যাটের পা স্পর্শ করিয়া প্রণাম করিয়া দাঁড়াইল। মিসেস ড্যাট্ মাথায় হাত দিয়া আশিস-অভ্যর্থনা করিলেন,—“এস ভাই, দীর্ঘজীবী হও।”
তাহার পর মিস্টার ড্যাটের বিস্ময়-বিমূঢ় ভাব দেখিয়া হাসি চাপিতে না পারিয়া মুখ ফিরাইয়া লইলেন।
ড্যাট্ সাহেব ছেলেটিকে দেখিয়াছেন কবার এর আগে—খুব স্নেহের চোখেও নয়। ভ্রূ-কুঞ্চিত করিয়া প্রশ্ন করিলেন—”ভাই! এ ছোকরা…মানে, ইনি ভাই হলেন কবে তোমার?…কই, তোমার যে ভাই আছে…কি রকম ভাই হন ইনি? কই, আমি তো আজ পর্যন্ত কিছু জানি না…বসুন, দাঁড়িয়ে রইলেন যে?”
মিসেস দত্তের চাপা হাসিতে মুখ রাঙা হইয়া উঠিয়াছিল। ফিরিতে পারিলেন না; আঁচলে মুখ চাপিয়া, কষ্টে হাসি রোধ করিয়া বলিলেন,—“না, কিছু জানতে না! না জানতে তো সেদিন ঠাট্টা করে ওকে—মানে অনাথকে, ওই কথা বলে ডাকলে কি করে?” আবার হাসি উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল।
“কি কথা!”
“কেন?—‘সম্বন্ধী’—যে কথাটার মানে হয় সম্বন্ধী।”
ড্যাট সাহেব প্রথমটা আরও বিমূঢ় হইয়া গেলেন। তাহার পর স্ত্রীর হাসিতে, অনাথের সলজ্জ এবং বোধ হয় একটু চটুল হাসির ভাবে তাঁহার কাছে ব্যাপারটা যেন কিছু কিছু পরিষ্কার হইয়া আসিতে লাগিল।
“ও!—বোধ হয় বুঝেছি”—বলিয়া আরম্ভ করিতে যাইতেছিলেন। অনাথ বাধা দিয়া বলিল—“দিদির ভাই-ফোঁটা নেওয়ার আগে আমার একটা কাজ সেরে নিতে হবে জামাইবাবু -আগে সেবা তারপরে আশীর্বাদ কিনা—দীর্ঘজীবন পাকা করে আপনাদের দু’জনের অমূল্য জীবন দুটি বীমা করে রাখতে চাই…আশ্চর্য হবার কিছু নেই এতে…আর, হলামই বা ছোট ভাই—দিদির বাপের বাড়ির দিক থেকে আমিই এখন একমাত্র অভিভাবক—সে হিসেবে দিদির আর সেই সঙ্গে আপনার জীবন সম্বন্ধে আমার একটা কঠিন দায়িত্ব আছে তো?…”
