আ-শরীরী – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

আ-শরীরী

আর সকলের বিবৃতি শেষ হইলে শৈলেনের উপর তাগাদা হইল, “এবার এ-বিষয়ে তোমার কি অভিজ্ঞতা আছে বল।”

শৈলেন বলিল, “আমায় বরং ছেড়ে দাও।”

সুধেন প্রশ্ন করিল, “তার কারণ?”

শৈলেন বলিল, “আমি যদি কিছু বলতে যাই, তোমরা তার মধ্যে নিশ্চয় কোন গল্পের প্লট আছে মনে করে বসো। ফলে এমন সন্দেহের সঙ্গে প্রত্যেক কথাটি শোন তোমরা যে, আমি বলে কোন আরামই পাই না। কোথায় ভরা বিশ্বাসে মন দিয়ে শুনবে, না কেবলই আমার প্লটের ফাঁকি ধরে ফেলবার চেষ্টা। যখন সত্যিই কোন গল্প হাঁকড়াই, তখন এটা সহ্য করা যায়; কিন্তু যখন নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা করছি, তখনও যদি—”  

তারাপদ বলিল, “এতে অভিমানের কিছু নেই, এ তোমাদের প্রায়শ্চিত্ত। তোমরা লেখকেরা সামান্য অভিজ্ঞতাকেও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সচেতন, অচেতন, অবচেতন নানা রকম জিনিসের দোহাই দিয়ে এমন একটা জিনিসে দাঁড় করাও যে, তোমরা যে কখনও সত্যের যথাযথ রূপ বজায় রাখবে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে।”

সুধেন বলিল, “ও বেচারাদের মুশকিল আছে, সত্যের যথাযথ রূপ বজায় রাখলে ওদের পেট চলে না। তোমরা চাও রস, সত্য কথায় তা মোটেই নেই। যুধিষ্ঠিরের সমস্ত জীবন আগাগোড়া দেখে গেলে মাত্র একটিবার রস বা রসিকতার সন্ধান মিলবে—যখন তিনি ‘ইতি গজ’ বলেছিলেন। অবশ্য কখনও রসের অপব্যয় করেন নি বলে রসিকতাটা একটু মারাত্মক রকম হয়ে জমে উঠেছিল—নাও শৈলেন, এই চমৎকার রাত্রের উপযোগী একটা গল্প ফাঁদ—ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয় ভালই, গাল-গল্প হয় আরও ভাল, এই ভূতূড়ে রাত্রির রুদ্ররসে আমরা একটু ডুবে থাকতে চাই।”

সুধেন র‍্যাপারটা ভাল করিয়া গায়ে জড়াইয়া গুটাইয়া-সুটাইয়া বসিল।

শৈলেন বলিল, “নাঃ, মিথ্যেবাদী বলে ক্রমেই যে রকম বদনাম হয়ে যাচ্ছে, সত্যিকার অভিজ্ঞতাই একটা বলি।”

সুধেন বলিল, “আমার গা শিউরনো চাই কিন্তু। সেইজন্যে আমি গা আর মন দুটোকেই মুড়ি দিয়ে তোয়ের হয়ে বসেছি।”

শৈলেন বলিল, “যাতে আমার সমস্ত শরীর অসাড় করে সংজ্ঞালোপ করে দিয়েছিল, তাতে তোমার গায়ে একটু কাঁটাও জাগাতে পারবে না, এত বড় বীর তোমায় আমি মনে করি না।”

একটু চুপচাপ গেল; অলৌকিক গল্পের উপক্রমণিকা হইতেছে মৌনতা। গল্প বলিবার বা শুনিবার আগে লোকে যেন অনুভব করে, সে একটা নিষিদ্ধ জগতে প্রবেশ করিতেছে, চকিত হইয়া একটু থমকাইয়া দাঁড়ায়।

.

শৈলেন দূর ভবিষ্যতে কোথায় যেন একটু চাহিয়া রহিল, তাহার পর ধীরে ধীরে আরম্ভ করিল—

“ব্যাপারটা ঘটে ছোটনাগপুর সাইডে একটা জায়গায়—একটা ডাক-বাংলোয়। জায়গাটার নাম আর খুলে বললাম না। রাঁচী থেকে বেরিয়ে অনেকগুলো রাস্তা অনেক দিকে চলে গেছে, তারই একটার একটা ডাক-বাংলোর কথা বলছি। আমার তখন তিন বছরের জন্যে বনবাস, ফরেস্ট রেঞ্জার্সের চাকরি নিয়েছি, একটা জঙ্গলের চার্জ নিতে হবে।

“মোটর বাসে চলেছি। শীতের সময়, বেলা প্রায় চারটের সময়ই দিন মলিন হয়ে এল। দূরে আকাশের কোলে এমুড়ো-ওমুড়ো একটা লম্বা পাহাড়ের রেখা আমাদের মোটর এগুবার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল; যেন বিরাটকায় কি-একটা এতক্ষণ শুয়ে ছিল, আমাদের এগুতে দেখে গা-ঝাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠছে। ঐ পাহাড়টা ডিঙিয়ে যেতে হবে আমাদের। ভয়, আগ্রহ, বিস্ময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশ একটা কৌতুক বোধ করছিলাম। প্রায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমরা পাহাড়ের নিচে পৌঁছে আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে উঠতে আরম্ভ করলাম। যখন প্রায় শিখরদেশে পৌঁছেছি, মোটর গেল বিগড়ে। সারতে দেরি হবে, রাত্রি হয়ে যাবে। সান্ধ্য পাহাড়ের শোভা দেখবার জন্যে আমি মোটর থেকে নেমে খানিকটা তফাতে একটা পাথরের চাঁইয়ের ওপর গিয়ে দাঁড়ালাম। পেছনে রয়েছে একটা খাড়া শিখর, সামনে গভীর খাত,—খুব গাঢ় জঙ্গলে ঢাকা বলে আরও গভীর মনে হচ্ছে। প্রথমটা বেশ লাগছিল, কিন্তু সন্ধ্যার ছায়া যত গাঢ় হয়ে আসতে লাগল, একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি মনটার ওপর জেঁকে বসতে লাগল। চারিদিকে পাহাড়ের ঢেউ, নিস্পন্দ, নিস্তব্ধ, রহস্যময়। অত বড় একটা বিরাট ব্যাপারের মধ্যে নিজেকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র আর অসহায় বলে মনে হতে লাগল। কি যে একটা সন্ত্রস্ত ভাব,—যদি পাহাড়ের ওপর কোন সন্ধ্যা বা রাত্রি না কাটিয়ে থাক তো বুঝতে পারবে না। অন্ধকার ঘন হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মনে হতে লাগল যে, যে বিরাটকায় জীবটা খানিকটা আগে আমাদের দেখে জেগে উঠেছিল, তারই গর্ভে আস্তে আস্তে জীর্ণ হয়ে চলেছি। এই আতঙ্কের মধ্যে যখন মগ্ন হয়ে রয়েছি, হঠাৎ ডান দিকে আগুনের ভাঁটার মত প্রকাণ্ড দুটো চোখ জ্বলে উঠল আর সঙ্গে সঙ্গে রক্তলুব্ধ জন্তুর গর্জনের মত এমন একটা উৎকট আওয়াজ চারিদিক কাঁপিয়ে উঠল যে, আমার পায়ের নখ থেকে মাথা পর্যন্ত যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। আমি সেই পাথরের ওপর থেকে দিগিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে–”

সুধেন একটু উৎসুকভাবে প্রশ্ন করিল, “ভাঁটার মত চোখ নিয়ে চিৎকার করে উঠল? তোমার কল্পনার অজগর বাস্তব হয়ে পড়ল নাকি?”

শৈলেন একটু হাসিয়া বলিল, “তখুনি নিজের কাছেই লজ্জিত হয়ে পড়লাম। ব্যাপারটা আসলে এই যে—মোটর তোয়ের হয়েছে, ইলেকট্রিক হর্ন দিয়ে হেডলাইট জ্বেলেছে, সামনের একটা পাথরের গায়ে তার আলো ঠিকরে পড়েছে।

“হাসি পেল—ভয়ে এমন তন্ময় করে সব ভুলিয়ে দেয়!—এক্ষুনি যে কোন্ অতলে তলিয়ে যেতাম! “মোটরে এসে উঠলাম। পাহাড়ে পথ দুই চক্ষু দিয়ে খুঁজতে খুঁজতে ঘুরে ফিরে মোটর নামতে লাগল।

“কেন জানি না, ঐ যে সন্ধ্যায় কেমন একটা অহেতুক ভয়ের ছাপ মনের ওপর পড়ল—কোনমতেই যেন তা কাটতে চায় না। আমায় যে আজকের রাত্রিটা একলা একটা ডাক বাংলোয় কাটাতে হবে এই চিন্তাটা আমায় পীড়া দিতে লাগল। বরাবরই কেমন যেন অন্যমনস্ক আর মনমরা হয়ে রইলাম। বিপদের ওপর বিপদ, মোটর আর একবার বাগড়া দিলে, আরও প্রায় কোয়ার্টার তিনেক গেল। পাহাড় থেকে যখন নামলাম, তখন দিব্যি রাত হয়ে গেছে। যখন ডাক-বাংলোর সামনে পৌঁছলাম, কব্জি উলটে হাত-ঘড়িতে দেখি, সাড়ে নটা। শীতের সাড়ে নটাকে গভীর রাত্রিই বলতে হয়, সে নিষুতি আবেষ্টনীর মধ্যে প্রায় দুপুর রাতের সামিল।

“ড্রাইভার কয়েকবার ঘন ঘন হর্ন দিলে। কোন সাড়া নেই। ড্রাইভার বললে, ‘মোটর প্রায় ঘণ্টা চারেক লেট হয়ে গেল, কীপার গ্রামে চলে গেছে নিশ্চয়, অবশ্য যাওয়া বেটার উচিত হয় নি। ওর ডিউটি হচ্ছে মোটর দেখে নিয়ে তারপর বাড়ি যাওয়া, কোন লোক না নামলে—’

“খাতির করে আমার বাক্স, বিছানার গাঁটরি আর সুটকেসটা ডাক-বাংলোর বারান্দায় এনে রেখে দিলে। বললে, ‘আপনার টর্চ রয়েছেই, একটু দূরেই গ্রাম, সেখানে গেলেই তারা কীপারকে ডেকে দেবে। কিন্তু বাবু…” কি একটা বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল।

“প্রশ্ন করলাম, ‘কি?’

“এই সময় মোটর থেকে তাগাদার হর্ন বেজে উঠল।

“না, কিছু নয়। মানে, এখানকার যে কীপার…’

“আবার তাগাদা হওয়ায় তাড়াতাড়ি চলে যেতে যেতে বললে, ‘একলা মানুষ তা ভয় পাবার কিছু নেই এমন।’…কিছু বলতেও পারলাম না; প্রায় ঘণ্টা তিন চার লেট যাচ্ছে তায় নিজে হতেই একটু খাতির করলে। আর বলবার ছিলই বা কি? মোটরটা চলে গেল। যতক্ষণ তার একটুও আওয়াজ শোনা গেল, কান পেতে রইলাম, একবার একটি শেষ হর্নের পর একেবারে নিঃশব্দ হয়ে গেল,—যেমন দপ্ করে একবার জ্বলে উঠে প্রদীপ নেবে, আওয়াজটাও সেই রকম একটা আর্তনাদ করে যেন নিবে গেল। নির্জন বাড়িটার বারান্দায় আমি নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। জায়গাটা চারিদিকে পরিষ্কার, বেশ খানিকটা পর্যন্ত দেখা যায়। দৃষ্টির সীমার বাইরেই নিবিড় অন্ধকার, ডান দিকটায় অন্ধকার যেন আরও এক পৌঁছ ঘন, যেটা পেরিয়ে এলাম, সেই পাহাড়টা আর কি।

“বেশ গুছিয়ে ভাবতে পারছি না। টর্চটা জ্বেলে গ্রামের দিকেই যাব? কিন্তু কোন্ দিকে গ্রাম? যদি আন্দাজে ঠিক যাই তো হয়তো পাশেই পাব, যদি ভুল দিকে পা বাড়াই তো বোধ হয় এমন দু-চার মাইল গিয়েও মানুষের চিহ্ন পাব না, দেখে তো আসছি সমস্ত দিন, নিতান্ত বিরল-বসতি দেশ।

“রক্ষকটা সম্বন্ধে ড্রাইভার কি বলতে চাইছিল?—থেমেই বা গেল কেন?…

“কি করব না করব, কিছুই ঠিক করতে না পেরে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, তারপর কি মনে করে পা বাড়াব, পায়ের পিছনের দিকটায় একটা লম্বা ভিজে টানে আচমকা শিউরে উঠলাম। ফিরে দেখি, একটা খুব বড় কালো কুকুর। তাড়াতে গিয়ে আরও শিউরে উঠলাম হঠাৎ মানুষের আওয়াজ শুনে, কাছেই, বারান্দায় কোণের কাছটায়। কুকুরের খটকাটা সামলাতে না সামলাতেই হঠাৎ এটা কানে যাওয়ায় একটু অভিভূত হয়ে উঠেছি, এমন সময় কুকুরকে শাসাতে শাসাতেই একটা লোক অন্ধকারের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল, সামনে এসে সেলাম করে বললে-ও কিছু বলবে না হুজুর!…মোটর আজ আপনাদের খুব দেরি হয়ে গেল, কিছু দুর্ঘটনা হয়েছিল নাকি?’

“লোকটার খুব বয়েস হয়েছে বলে মনে হল, আর আশ্চর্য রকম রোগা। এত রোগা যে চলছে তা মাটিতে পায়ের আওয়াজটুকুও হচ্ছে না যেন। গায়ে প্রায় আপাদমস্তক মুড়ি দেওয়া একটা সাদা কম্বল। আঙুলগুলো এত শীর্ণ আর অস্থিসার যে, মনে হচ্ছে, যেন অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেছে। মোটর ছাড়ার পর থেকে যে একটা কেমন ছমছমে ভাব মনে লেগে ছিল, মানুষ দেখে সেটা যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, যাওয়া তো দূরের কথা, বরং বেশ একটু বেড়ে গেল। আমি সঙ্গে সঙ্গে তার কথার উত্তর দিতে পারলাম না; উত্তর দেওয়াই হল না বলা ঠিক। তাকে আড়চোখে একটু ভাল করে দেখবার চেষ্টা করে বললাম, ‘চাবি খোল।’

“’এই যে খুলি।’ বলে আমার আর দোরের মাঝখানটায় আমার দিকে পেছন করে দাঁড়াল আর একটু ঝুঁকে যেন কোমরের চাবিটা তালায় লাগিয়ে দিয়ে তালাটা খুলে ফেললে। দরজা দুটো ভেতরের দিকে ঠেলে দিয়ে বললে, ‘যান। আমি বাক্স-বিছানা নিয়ে আসছি ভেতরে।’

“তালা খুলল বটে, কিন্তু আমার যেন মনে হল, কোন শব্দ হল না। যা হোক, অতটা গ্রাহ্য না করে আমি বললাম, ‘তবেই হয়েছে, তোমায় যেমন সবল দেখছি…”

“লোকটা হি-হি-হি করে হেসে উঠল।

“আমায় কথাটা বলেই বারান্দায় মোটগুলোর দিকে চলে গিয়েছিল বলে ওর মুখটা দেখতে পেলাম না বটে, তবে হাসির আওয়াজটা কানে একটু নতুন ধরনের ঠেকল। যেন মুক্ত মাঠের ওপর দিয়ে যে একটা কনকনে হাওয়া হু-হু করে বয়ে যাচ্ছে, তারই একটা ঝলক ঘরের মধ্যে ঢুকে তরঙ্গিত হয়ে আবার কোন্ পথে বেরিয়ে গেল। হাসি, কিন্তু ঐ হাওয়ার মতই সুরহীন আর কনকনে, আমার হাড় পর্যন্ত যেন হিম হয়ে গেল।

“ভয়ের এত সামনাসামনি কখনও হই নি, কিন্তু নিরুপায়; আর নিরুপায় বলে জবরদস্তি একটা ধারণা মনের মধ্যে বদ্ধমূল করবার চেষ্টা করলাম—না, নিশ্চয় মানুষ। নিজের মনকে ধিক্কার দেওয়ারও চেষ্টা করলাম—দেখ তো, কথা কইলে একঝুড়ি, মোট আনতে গেল, মানুষ নয়?

“টর্চটা জ্বেলে ঘরে ঢুকে একবার দেখে নিলাম। বেশ বড় ঘরটা, টর্চ ফেলতে আলোটা সামনে একটা খোলা দরজার মধ্যে দিয়ে ভেতরদিকে আর একটা দেয়ালের ওপর গিয়ে পড়ল, অর্থাৎ এই ঘরের লাগোয়া আর একটা ঘর আছে, ছোটই বলে মনে হল। বাক্স -বিছানা আনার কোন শব্দ না পেয়ে ফিরে টর্চ ফেলে দেখতে যাব, দেখি সবগুলি ঠিক পেছনে জড়ো করা হয়েছে।…সুধেন, কি রকম লাগছে?”

ডাক শুনিয়া সুধেন একটু চমকিয়া উঠিল, একেবারে আবিষ্ট হইয়া গিয়াছিল আর কি। সামলাইয়া লইয়া বলিল, “বেশ, এত হাতের কাছে যে ভূতকে পাব, কল্পনাও করতে পারি নি! আর এত স্পষ্ট ভূত যে বেশ বুঝতে পারা যাচ্ছে, কোন সাহিত্যিক গল্পের অবতারণা কর নি…”

তারাপদ তাহার মুখের কথা কাড়িয়া লইয়া বলিল, “হদ্দ একটা গাঁজাখুরি আরম্ভ করেছ। তা সে বরং ভাল! তুমি দুঃখ করছিলে বটে, কিন্তু তোমাদের সাহিত্যিক গল্পে সর্বদাই একটা যেন ধুকপুকুনি লেগে থাকে। হয়তো যা ভাবছি তা নয়, হয়তো যা হবে মনে করছি ঠিক তার উল্টোটি হয়ে বসবে, হয়তো ঠিক করে রেখেছি এইবার বিয়ে হবে, দুজনের একেবারে মুখ দেখাদেখি বন্ধ।…নাও, বেশ বিষ্টিটা জমে এসেছে! সেই অত্যন্ত রোগা বুড়োটি নিঃশব্দে অবলীলাক্রমে সেই অত্যন্ত ভারী মোটঘাটগুলো এনে তোমার পেছনে জড়ো করলে, তারপর?”

শৈলেন বলিল, “জিনিসটা বোধ হয় গাঁজাখুরির মত শোনাচ্ছে, কিন্তু আমায় বিশ্বাস কর, যা প্রত্যক্ষ দেখেছিলাম আর নিজের কানে শুনেছিলাম, মাত্র তাই তোমাদের কাছে বলে যাচ্ছি। একটা কথা আমি গোড়াতেই বলে রেখেছি, লুকোই নি, অর্থাৎ সেদিন সন্ধ্যে থেকেই কেমন একটা থমথমে ভাব আমার মনে আধিপত্য বিস্তার করেছিল—পাহাড়ের ওপরের সেই গম্ভীর স্তম্ভিত ভাব, তারপর সেই জনহীন বাংলোতে সেইভাবে একলা পরিত্যক্ত হওয়া, সেই কালো কুকুরটার নিঃশব্দে এসে পা চেটে দেওয়া, তারপরে আচমকা সেই শীর্ণ লোকটার অন্ধকারের মধ্যে থেকে আবির্ভাব—সব মিলিয়ে ধারাবাহিকভাবে আমার আতঙ্কটা পুষ্ট করে যাচ্ছিল। ওরই মধ্যে আবার লোকটাকে পেয়ে এক-আধ বার একটু সাহসের মত হয়েছিল বোধ হয়, কিন্তু সে ভাবটা স্থায়ী হতে পেল না। হয়তো জিনিসগুলো আনতে, রাখতে শব্দ হয়েছিল। প্রেত ইথারজাতীয় বটে; কিন্তু সে যা স্পর্শ করবে তাও যে লঘু হয়ে যাবে, এমন কথা আমি কোথাও পাই নি। কিন্তু অন্যমনস্ক থাকার দরুনই হোক বা যে জন্যেই হোক, ঘুরে জিনিসগুলোর ওপর নজর পড়তেই মনে হল, কই, শব্দ শুনলাম না তো!

“একটা কথা বলি নি, লোকটা—আমি ‘লোকটা’ বলেই চালাই—কোনও আলো সঙ্গে আনে নি।

“তিন চারটে জিনিস এল—দিব্যি ওজনদুরস্ত, অথচ একটু শব্দ কানে এল না, আর এসে পড়লও যেন ফিরে না দেখতেই, একটা বিশ্রী খটকা লাগল। কি বলতে চেয়েছিল লোকটার সম্বন্ধে?—এই নয় তো যে সে নিজে দূরে থাকার দরুন সব সময় আসতে পারে না, আর…

“সেই ফাঁকতালে চিন্তার মাঝখানেই সমস্ত শরীরটা আমার শিউরে উঠল। আবার তখনই সে ভাবটা কেটে গেল, কেননা কড়া টর্চের আলোয় স্পষ্ট দেখছি একটা মানুষ ঘরের মধ্যে চলাফেরা করছে; এই শুনলাম কথা কইলে, স্বরটা হয়তো একটু চাপা, কিন্তু নাকী নয়; এ অবস্থায় সন্দেহও আবার বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। মনটাকে আবার ধাতস্থ করে নিলাম। বললাম, ‘বিছানাটা পেতে ফেল দিকিন।…আচ্ছা, আগে আলোটা জ্বেলে ফেল। কোথায় আলোটা? টর্চ আর কতক্ষণ জ্বেলে রাখব? জ্বেলে রাখা মানেই তো পয়সা পোড়ানো।’ আলাপটা সহজ করে ফেলবার জন্যে একটু রসিকতাও করেছিলাম। লোকটা সেই রকম হি-হি করে হেসে উঠল, বললে, ‘না, টর্চ আর আপনাকে বেশিক্ষণ জ্বেলে রাখতে হবে না বাবু—হি-হি-হি-হি…”

“প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা মজা হল, টর্চের চাবিটা টিপে ধরে টর্চটা জ্বেলে রেখেছিলাম, আঙুলটা একটু আলগা হয়ে গিয়ে টর্চটা নিবে গেল। আলগাভাবে ধরে রাখলে স্প্রিং-ওলা টর্চগুলো হয়ই এ রকম, কিন্তু এ ক্ষেত্রে আর জ্বলল না, ফিউজ হয়ে গেল।

বললাম, ‘টর্চটা যে খারাপ হয়ে গেল।’

“অত কড়া একটা আলো নেবায় আরও অন্ধকার হয়ে গেছে, কাউকে দেখতেও পেলাম না, কোন উত্তরও পেলাম না।

“টচটা হঠাৎ ফিউজ হয়ে যাওয়াটা খেয়ালের মধ্যে আনি নি, ওরকম কয়েকবার হয়েছে, কিন্তু উত্তর না পেয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। হাত দুয়েকের মধ্যে এই লোকটা ছিল, অথচ উত্তর নেই কেন? একবার মনে হল হাতটা চালিয়ে দেখি—ঠেকে কিনা কারুর গায়ে; কিন্তু কেন বলতে পারি না, সাহস হল না পরীক্ষা করতে। নিজের গলার আওয়াজে নিজের ভয়টা ভাঙবার জন্যে একটু জোর আওয়াজে প্রশ্ন করলাম, ‘কোথায় গেলে?’

“উত্তর নেই। শুধু হাওয়ার শব্দটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

“বুঝতে পারছি, শরীরটা ঝিমঝিম করে আসছে। মরিয়া হয়ে আরও জোরে বললাম, ‘গেলে কোথায়? তোমায় যে আলো আনতে বললাম! শুনছ, গেলে…”

“হঠাৎ থেমে যেতে হল, আমার নিজের কথার প্রতিধ্বনিতে ঘরটা এমন বোঝাই হয়ে গেল যে, মনে হল, অন্ধকার ঘরটায় কাদের মেলা বসে গেছে। আমার ভয়ে-অতি-সজাগ কানে শোনাল যেন ঘরের চারিদিকে শতকণ্ঠে কারা আমারই কথার ব্যঙ্গ প্রতিধ্বনি করে বলছে, ‘গেলে কোথায়?… তোমায় যে আলো আনতে বললাম!…শুনছ?’

“অনুভব করছি, মাথার চুলগুলো যেন কদমফুলের মত খাড়া হয়ে উঠেছে। কি যে করব, বুঝতে না পেরে অসাড় হয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর পাশে নজর পড়তে মনে পড়ল, দরজাটা খোলা আছে। একটা চিৎকার করে ছুটে বেরুতে যাব, দেখি সামনের দেয়ালে একটা অস্পষ্ট আলো পড়ল; প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লণ্ঠন হাতে পাশের ঘর থেকে লোকটা বেরিয়ে এল। পাশে জমাট বাঁধা এক খাবলা অন্ধকারের মত সেই কুকুরটা। ময়লা চিমনি, তেলটা খারাপ নিশ্চয়, খানিকটা ধোঁয়ার নিচে একটা মিটমিটে শিখা জ্বলছে। গাছের শেকড় যেমন মাটি আঁকড়ে থাকে, সেই রকম ভাবে লিকলিকে কালো কালো আঙুল দিয়ে লোকটা লণ্ঠনের হাতলটা লেপটে ধরেছে। অস্পষ্ট আলো তার কোটরগত চোখে, উঁচু চোয়ালের হাড়ের ওপর পড়ে উৎকট দেখাচ্ছে।…কিন্তু তা দেখাক্, রোগা মানুষ, উপায় কি? যা হোক ভূত তো নয়, ভূতে তো আর আলো জ্বেলে আনবে না। একটু অপ্রতিভ হয়ে বললাম, “তাই বলি, তুমি বুঝি আলো জ্বালতে গিয়েছিলে?’

“হ্যাঁ, আলোটা জ্বেলে নিয়ে এলাম। এবার আপনার বিছানাটা করে দিই। খাবেন কি?”

“বললাম, ‘সেজন্যে ভাবনা নেই। টিফিন-কেরিয়ারে আমার খাবার আছে, তুমি শুধু বিছানাটা করে দাও।’

‘কই, আপনার টিফিন-কেরিয়ার তো দেখলাম না!’

“সে কি!—বলে ফিরে মোটগুলো দেখতেই চক্ষুস্থির। টিফিন-কেরিয়ারটা সত্যিই নেই! বিমূঢ়ভাবে একটু তার মুখের দিকে চেয়ে থাকলাম। সরালে নাকি খাবারসুদ্ধ কেরিয়ারটা?

“বললাম, ‘বারান্দা থেকে আন নি বোধ হয়। দাঁড়াও তো দেখি।’

“আলোটা নিয়ে বারান্দায় এলাম, সেখানেও নেই কেরিয়ারটা। লোকটা মোটগুলো ভেতরে নিয়ে আসবার সময় লুকিয়ে ফেলে নি তো? কিন্তু তা প্রায় অসম্ভব। আমি যতদূর বুঝলাম, ও বাইরে থেকে যেটুকু সময়ের মধ্যে জিনিস তিনটে এনেছে, তাতে একটা জিনিসই আনা চলে না, এর মধ্যে আর লুকোবার সময় পাবে কোথা থেকে? তবুও কেমন একটা জিদ ধরে গেল, সেই কালি-পড়া আলো নিয়ে সমস্ত বারান্দাটা এমুড়ো-ওমুড়ো একবার দেখে নিলাম। না পাওয়াতে আরও রোখ চেপে গেল—নিশ্চয় কোথাও রেখেছে। বারান্দা থেকে নেমে বাড়িটার পেছনে গেলাম। একহারা বাংলো, মাঝখানে একটা বড় ঘর, দুদিকে দুটো ছোট ছোট ঘর; সামনের দিকে বারান্দা আছে, পেছন দিকে তাও নেই। বাড়িটার পরেই পরিষ্কার জমি। কোথায় লুকোবে? অথচ টিফিন-কেরিয়ার আমি এনেছি। বাসে একবার পড়ে গিয়ে বাটিগুলো আলগা হয়ে গিয়েছিল, গুছিয়ে ভাল করে বসিয়ে দিলাম। তবে? চিন্তার মধ্যেই হঠাৎ

দূরে নজর পড়ায় মনে হল, খানিকটা দূরে—কম্পাউন্ডের শেষে একটা ঘরের মত আছে। চোর যেন ধরে ফেলেছি এই রকম উৎসাহ নিয়ে এগুলাম। একটা ছোট্ট ঘরই, শেকল দেওয়া। ঢুকে ভেতরে গিয়ে দেখি, একটা কেরোসিন তেলের আধভরা টিন, গোটা দুই আলো, গোটা দুই বালতি; টিফিন-কেরিয়ার নেই। রাগ, কি জিদ, কি নিরাশা, কি ঘরে ফিরে আবার সেই লোকটাকে দেখতে পাওয়ার ভয়—ঠিক বলতে পারি না, তবে এটা বেশ মনে আছে যে, নিশিতে পাওয়ার মত আমি ক্রমাগতই সেই মিটমিটে লণ্ঠনটা হাতে করে বাড়িটার চারিদিকে চক্কর দিয়ে চলেছি দুবার, চারবার, পাঁচবার, তারপর আর হিসেব নেই; ঘুরেই চলেছি, মনে শুধু একটিমাত্র প্রশ্ন—আমার খাবার কোথায় গেল? কেরিয়ারের মধ্যে করে আনা আমার খাবার? কোথায় গেল আমার খাবার? ভেতরে ভেতরে কার সঙ্গে যেন একটা তুমুল তর্ক বেধে গেছে—বাঃ, গেলেই হল খাবার?—অত কষ্ট করে সঙ্গে করে নিয়ে এলাম!

“মাটির দিকে চেয়ে খুব একমনে খুঁজছিলাম। হঠাৎ একবার চোখ তুলতে প্রায় এক রকম আঁতকে উঠলাম, পাহাড়টা যেন ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। প্রথম তাড়সটা কেটে গেলে বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা কি, পাহাড়ের ঠিক মাথায় সবে এক ফালি চাঁদ উঠেছে, তারই আলোয় পাহাড়ের ওপরের রেখাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠায় মনে হচ্ছে, পাহাড়টা যেন খুব কাছে। কিন্তু অন্যমনস্ক হওয়ায় একটা ফল হল নিজে যে কোথায় রয়েছি জ্ঞান হল। দেখি আলোটাতে আর কিছু নেই, গাঢ় কালির মধ্য দিয়ে একটা ক্ষীণ রাঙা-টকটকে শিখা কোন রকমে দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ গাটা শিউরে উঠল, হাতে হাত দিয়ে দেখি একেবারে হিম হয়ে গেছে। চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় ঘড়িটাতে দেখি প্রায় একটা, অন্তত ঘণ্টা তিনেক ঘুরেছি এই ছটাকখানেক বাড়িটার চারিদিকে। ঘুরে ঘুরে আবার খুঁজেছি!”

শৈলেন একটু চুপ করিয়া সিগারেটে একটা দীর্ঘ টান দিয়া ধীরে ধীরে ধোঁয়া ছাড়িতে লাগিল।

তারাপদ বলিল, “বৃষ্টি দেখছি আজ আর থামবে না।”

সুধেন কহিল, “তোমায় বাহাদুরি দোব, জ্ঞানটা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে পড়লে না! প্রায় সেই রকমই হয়, লোকে ভয়ের মধ্যে অনেক সময় ঠিক থাকে, কিন্তু ভয়ের ঝোঁকটা কেটে গেলে যখন দেখে কি অবস্থার মধ্যে ছিল, তখন অনেক সময় আর টাল রাখতে পারে না। অনেক সময় মারা পর্যন্ত যায়।”

শৈলেন ধীরে ধীরে যেন আবিষ্টভাবে বলিল, “অজ্ঞান তখনও হই নি, তবে কেন যে হই নি, আমার এখনও আশ্চর্য বোধ হয়। ফিরে এসে দেখি, লোকটা বারান্দায় একটা যেন কালো ছায়ার মত দাঁড়িয়ে আছে। ভয় হল, কিন্তু তার চেয়ে বেশি হল রাগ, বললাম, ‘আমি ঘণ্টা তিনেক।’ কি ভেবে কথাটা আর শেষ করলাম না, লোকটা দু’হাতে চোখ রগড়ে, ঘড়ঘড়ে, অথচ অত্যন্ত চাপা স্বরে বললে, ‘ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বাবু, ঘুমকাতুরে মানুষ—পেলেন না?’

“বললাম, ‘না।’

“ ‘বাসে এনেছিলেন ঠিক মনে আছে?’

“আমার রাগটা আরও বেড়ে গেল; হাত ধরে একটা ঝাঁকানি দিতে যাব, তখুনি সম্বিৎ হল—যদি হাত ধরতে গিয়ে শূন্যে মুঠো বাঁধি! কিংবা যদি দেখি, শুধু একটা মড়ার হাড় মুঠিয়ে ধরেছি! এখন তবুও তো মাঝখানে একটা সন্দেহের ব্যবধান আছে, তখন? নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, ‘নিশ্চয় এনেছিলাম।’

“বললে, ‘আচ্ছা, আপনি ভেতরে যান, নিশ্চয় খুব শীত করছে আপনার।’

“আমার ভুল বোধ হয়, কিন্তু মনে হল যেন ঘরে ঢুকে কপাট দুটো ভেজিয়ে সেই অন্ধকারে আলোর শিষটা উসকে দিয়েছি, এইটুকুর মধ্যেই লোকটা দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল। টিফিন-কেরিয়ারটি সামনে রেখে দিয়ে বললে, ‘এই নিন, হি-হি-হি-হি… ‘

“সেদিন আমি মনের একটা অদ্ভুত অনুভূতির পরিচয় পাই, ভয়ের চরম অবস্থায় আর ভয় থাকে না। মনস্তাত্ত্বিকেরা বলেন, এটা বড় ভীষণ অবস্থা, এর একচুল পরেই উন্মাদ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা; এটা ঠিক বর্ডারল্যান্ড। আর সন্দেহ নেই; বেশ বুঝতে পারছি, হাতখানেক দূরেই প্রেতাত্মা; তারই সঙ্গে কথা কইছি, বেশ স্পষ্ট দৃঢ়স্বরে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কোথায় পেলে?’

“হি-হি-হি করে হাসির সঙ্গে উত্তর হল, ‘আপনি যেখানে রেখেছিলেন।’

প্রতি মুহূর্তেই উৎকট ভয়ের এক একটা ঢেউ যেন সমস্ত শরীর তোলপাড় করে ভেঙে পড়ছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। ক্রমেই মরিয়া হয়ে রুক্ষ হয়ে উঠেছি; কেমন যেন একটা নেশা চেপে গেছে—যা স্পষ্ট নগ্ন সত্য, তার সম্মুখীন হতে হবে। একটু রূঢ় স্বরেই বললাম, ‘রেখেছিলাম মোটর বাসে, সেটা এখন কিছু নয়তো পঁচিশ-ত্রিশ মাইল দূরে। সেখান থেকে আনতে হলে…”

“শেষ করতে পারলাম না; নিজের কথাতেই যেন একটা অদ্ভুত ভয়ে শরীরটা ভেতর থেকে শিউরে শিউরে উঠতে লাগল, পঁচিশ-ত্রিশ মাইল দূরে!! পঁচিশ-ত্রিশ মাইল!!!….

“এর পর এইটুকু মনে পড়ে যে, হি-হি-হি-হি করে একটা হাসি ক্ষীণ হতে হতে একেবারে কতদূর পর্যন্ত গিয়ে যেন মিলিয়ে গেল। আর অল্প একটু মনে পড়ে, বরফের মত একটা ঠাণ্ডা কঠিন স্পর্শের অনুভূতি।”

শৈলেন চুপ করিল, মনে হইল, কাহিনীটা বলিতে সে যেন একটু শান্ত হইয়া পড়িয়াছে। ক্রমে তাহার সহজ ভাবটা ফিরিয়া আসিল। এবার বেশ ঘরোয়া কথাবার্তার মত বলিতে লাগিল, “মাঝে অল্প জ্ঞান হয়েছিল কিনা মনে নেই; তবে একটু ভাল করে যখন জ্ঞান হল, তখন সকাল হয়েছে, দেখি আমার চারিদিকে বেশ একটি ভিড় জমেছে, আমি একটা বড় ঘরে একটা খাটের ওপর শুয়ে আছি। একজন লোক মাথায়, একজন পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

“পায়ের কাছের লোকটির ওপর চোখ পড়তেই চোখ আর ফেরাতে পারি না। লোকটি হি-হি-হি করে হেসে বললে, “কিছু ভয় নেই বাবু, রাতে অত ভয় পেয়ে গেলেন কেন? আমি না ধরে ফেললে তো পড়েই যেতেন মুখ থুবড়ে।’

“ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম অনেকক্ষণ, তারপর হুঁশ হল, সত্যিই তো, না হয় বেয়াড়া রকম রোগাই, কিন্তু এ মানুষকে অত ভয় পাবার—“

তারাপদ ও সুধেন বিস্ময় আর নিরাশায় এক রকম চিৎকার করিয়াই উঠিল, “মানুষ!”

শৈলেনও ইজি-চেয়ারে হেলিয়া পড়িয়া কপট বিস্ময়ে প্রশ্ন করিল, “তবে তোমরা কি ভেবেছ? রোগা আর খাপছাড়া মানুষ মানুষই নয়?”

দুজনেই কতকটা অপ্রস্তুতভাবে ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া শৈলেনের দিকে চাহিয়া রহিল। সুধেন বলিল, “আবার ঠকালে, সেই অভিজ্ঞতার ওপর রং ফলিয়ে গল্প!”

শৈলেন বলিল, “তোমরা যে রস চেয়েছিলে সেটা পেয়েছ তো? ডাক-বাংলোর কীপারেই যদি তা পরিবেশন করতে সক্ষম তো আপত্তি কিসের?”

তারাপদ বলিল, “বেশ, গল্পই যদি, সমালোচনার ধাক্কা সামলাও—মানুষ পঁচিশ মাইল দূরে বাসের ভেতর থেকে টিফিন-কেরিয়ার নিয়ে এল কি করে? আর সবই নয় বাদ দিলাম—তোমার মনটা সেদিন ভয়ে খুব high-strung ছিল, সবই তার বিকার।”

শৈলেন ক্রমেই বেশি আশ্চর্য হইয়া বলিল, “আনেনি তো অত দূর থেকে!”

“তবে?”

শৈলেন উত্তর করিল, “সে কথা তো ও লোকটা নিজেই বলে দিলে, আমি যেখানে রেখে দিয়ে এসেছিলাম, সেখান থেকে নিয়ে এসেছে।”

“কোথায় রেখেছিলে?”

“মোটর থেকে নামিয়ে রাস্তায়।”

তারাপদ, সুধেন শৈলেনের মুখ থেকে দৃষ্টি নামাইয়া চুপ করিয়া রহিল। শৈলেনের মত অবস্থায় না পড়িয়াও যে তাহার মত ধাঁধায় পড়িয়া গিয়াছিল, তাহার জন্য বোধ হয় লজ্জিত হইল একটু।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *