মদিরার মন্দ ক্রিয়া

মদিরার মন্দ ক্রিয়া

মদিরার মন্দ ক্রিয়া’ এক ভারি সুরাসিক্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে জর্জ বলল, ‘বুঝে ওঠা কঠিন’।

‘না, যদি তুমি মাতাল না হয়ে থাক,’ আমি বলি।

তার হাল্কা নীল চোখে সে তীব্র ভর্ৎসনা অবজ্ঞা নিয়ে আমার দিকে তাকাল, ‘কখন আমি অন্য রকম ছিলাম?’

‘যখন তুমি জন্মেছিলে’ বলেই মনে হল, তার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে, তখনই শুধুরিয়ে নিয়ে বললাম, ‘যখন পর্যন্ত তুমি মায়ের দুধ খাচ্ছিলে।’

‘মানলাম’ জর্জ বলল ‘এটা তোমার ঠাট্টা তামাশার অব্যর্থ প্রচেষ্টা।’ আর সূক্ষ্ম অন্যমনস্কতা দেখিয়ে, সে আমার পানীয় ঠোঁটে তুলে নিয়ে চুমুক দিয়ে আবার রাখল, কিন্তু ধরে রইল চেপে।

আমি খেতে দিলাম। জর্জ এর কাছ থেকে পানীয় নিয়ে নেওয়া মানে, ক্ষুধার্ত বুলডগের কাছ থেকে হাড় ছিনিয়ে নেওয়া।

‘আমার মন্তব্যের কারণে রয়েছে এক যুবতী, যার প্রতি পিতৃত্বসুলভ স্নেহ দেখিয়েছিলাম। তার নাম ইস্তার মিস্তিক।’

‘এক অসাধারণ নাম’ আমি বলি।

‘কিন্তু যথার্থ। কারণ ইস্তার হল প্রেমের দেবী এবং সত্যিই যেন তাকে প্রেমের দেবী হিসেবে প্রতিপন্ন করা যেত। ইস্তার মিস্তিককে অন্তত তার নিহিত শক্তির খাতিরে।

.

‘ইস্তার মিস্তিক (জর্জ বলল) কারো যদি কমিয়ে বলার অভ্যাস থাকে, তবু বলতে হয়, রমণীয় সৌষ্ঠবে সুদৃঢ়। ক্লাসিক অর্থেই তার মুখটা সুন্দর, প্রতিটি গঠন সুঠাম, সোনালী চুলের ঘের এতই মসৃণ ও উজ্জ্বল, মনে হয় যেন এক জ্যোতির্বলয়। তার শরীর যেন গ্রীসের প্রেমের অধিষ্ঠাত্রী দেবী Aphrodita তুল্য। তার রূপ, তরঙ্গে হিল্লোলিত। দৃঢ়তা ও নিবেদনের যথাযথ চমৎকার সমন্বয়।

তোমার আশ্চর্য মনে হতেই পারে (তোমার বিকৃত অন্তরকে ধন্যবাদ)। আমি কেমন করে যেন ওর স্পর্শলব্ধ সৌন্দর্যের বর্ণনা দিচ্ছি। কিন্তু আমি তোমাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি, এর সবটাই দূর থেকে দেখা, মূল্যায়ন। এই সব ব্যাপারে, সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, বিশেষ এই ক্ষেত্রে কোনো প্রত্যক্ষ নিরীক্ষণ নেই। পত্রপত্রিকাতে কলামিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গীতে ফ্যাশন শোয়ের ডিসপ্লেতে যা দেখা যায়, সুসজ্জিত ইস্তার, অনেক বেশি আকর্ষণীয়া।

ক্ষীণ কটি এবং তার উপর ও নিচ একই সমতায় স্বাস্থ্যপুষ্ট। তুমি তাকে না দেখলে কল্পনাও করতে পারবে না। দীর্ঘ পদযুগল। মহিমময় বাহুদ্বয় এবং প্রতিটি চলন উচ্ছ্বলতায় সুললিত।

কেউ যদি কমিয়েও বলে এবং যতই স্থূলবুদ্ধি হোক, তবু এর চেয়ে বেশি নিখুঁত রূপলাবণ্য দাবি করতে পারবে না। তবু ইস্তারের ছিল এক ব্যগ্র নমনীয় মন। সে ডিস্টিংসন নিয়ে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছিল। যদিও কেউ ধরেই নেয়, গড়পড়তা অধ্যাপক ইস্তার মিস্কিকে সংশয়ের অবকাশে গ্রেড দিতে প্রণোদিত হয়েছিল। যেহেতু তুমি নিজেও অধ্যাপক, বন্ধু (এবং তোমার মনে কোনোরকম আঘাত না দিয়েই) সাধারণভাবে আমি জোরদার মত পোষণ করি না।

কেউ ভেবে বসতেই পারে, এত সব আছে বলে, ইস্তার সহজেই মনের মানুষ পছন্দ করতো এবং প্রত্যেক নতুন ব্যাচ থেকে নতুন কাউকে খুঁজে নিত প্রতিদিন। আসলে, আমারও মনে হয়েছে মাঝে মধ্যেই, যদি সে আমাকে বেছে নিত, আমি হয়তো তার ডাকে সাড়া দিতাম, রমণীর প্রতি আমার সৌজন্যবোধের জন্য, কিন্তু স্বীকার করতেই হয়, কথাটা তাকে বলতে আমি দ্বিধা করেছিলাম।

কারণ ইস্তারের যদি সামান্যতম ত্রুটি থাকতো, সে কিন্তু ভয়ঙ্কর প্রাণী হয়ে যেতে পারত। সে ছয় ফুটের এক ইঞ্চি বেশি লম্বা ছিল না। কণ্ঠস্বর এমন ছিল যে, রেগে গেলে ভেরীর মতন বাজত। একবার, এক বিশাল বপু রাজ গুণ্ডা তার কাছে অসতর্কতাবশত অন্যায় সুযোগ নিতে গেলে, ইস্তার গুণ্ডাকে তার বাঁজখাই আওয়াজে কাত করে, সপাটে তাকে তুলে নিয়ে চওড়া রাস্তা পার করে, অপর প্রান্তে ল্যাম্পপোস্টের ওপর ছুঁড়ে ফেলেছিল। তাকে ছয় মাস হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল।

পুরুষ জাতির পক্ষ থেকে তার দিকে এগোতে, একটা অনীহা ছিল, এমনকি শ্রেষ্ঠ সজ্জনদের মধ্যেও। এ ব্যাপারে অনস্বীকার্য আবেগ সংবরণ করা হত, দূরদর্শী বিবেচনায়, যদি পরিণামে শারীরিক নিরাপত্তার অভাব দেখা যায়, এমন আশঙ্কায়। এমন কী আমি নিজেও যে সিংহের ন্যায় সাহসী, হাড় ভাঙার সম্ভাবনার কথা চিন্তা করেছি। প্রবাদে বলতে গেলে বিবেক আমাদের কাপুরুষ করে ফেলেছিল।

ইস্তার পরিস্থিতি ভালই বুঝত এবং তিক্তভাবে আমার কাছে অনুযোগও জানিয়েছে। সে ঘটনাটা আমার পরিষ্কার মনে পড়ে। বসন্তের শেষে এক মনোরম উজ্জ্বল দিবস, আমরা সেন্ট্রাল পার্কের এক বেঞ্চে বসে রয়েছি। আমি মনে করতে পারি, তিনজন জগার যেই না ইস্তারকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছে, বাঁকের মুখে আর টাল সামলাতে পারল না, সোজা গাছে গিয়ে নাক ঘষে গেল।

‘আমার মনে হয় আমাকে সারা জীবন কুমারীই থাকতে হবে’ ইস্তার বলত, তার সুষ্ঠু বঙ্কিম অধর কাঁপিয়ে, ‘কারো আমার প্রতি আগ্রহ নেই। শিগগিরই আমার পঁচিশ হবে।’

‘তুমি বুঝে দেখ, সোনা, বুঝে দেখ।’ খুব সাবধানে তার দিকে একটু এগিয়ে তার হাতে চাপ দিয়ে বলি, ‘যুবকেরা তোমার নিখুঁত শরীর দেখে সন্ত্রস্ত হয়, নিজেদের তোমার উপযুক্ত বলে মনে করে না।’

‘এটা হাস্যকর।’ এত জোর দিয়ে বলে উঠল, যে আশপাশের লোকেরা চকিত হয়ে আমাদের দিকে ফিরে তাকাল, ‘যা তুমি বলতে চাইছ তা হল, এরা বোকার মতন ভীত। কিছু একটা রয়েছে এ ব্যাপারে। কারণ পরিচিত হলে, বোকারা এমন ভাবে আমার দিকে তাকায় আর করমর্দনের পর আঙুলের গাঁট ঘষতে থাকে, তখনই বুঝি, কিছু হবার নয়। শুকনো মুখে তারা বলে, ‘দেখা হয়ে বড় খুশি হলাম’ তারপর তাড়াতাড়ি কেটে পড়ে।

‘ইস্তার সোনা, তোমাকে তো তাদের সাহস যোগাতে হবে। তোমাকে পুরুষের দিকে তাকাতে হবে, যেন সে এক ভঙ্গুর পুষ্প। তোমার হাসির উষ্ণ সৌর কিরণ তার ওপর পড়লেই ফুলটি সম্পূর্ণ বিকশিত হবে। কোনোভাবে তাকে ইঙ্গিত দিতে হবে, সে অগ্রসর হলেই তুমি গ্রহীতা। তার জ্যাকেটের কলার ধরে, প্যান্ট টানা বা দেওয়ালে মাথা ঠুকে দেওয়া থেকে নিবৃত্ত হও।’

‘আমি কখনো এমন কাজ করিনি।’ সে ঘৃণা মিশ্রিত ক্রোধে বলল ‘ক্বচিৎ কখনো’ আর এ জগতে, তুমি কেমন করে প্রত্যাশা কর, নিজেকে আগ্রহী দেখাব?

আমি তো হাসি আর বলি, ‘কেমন আছ?’

‘বলি না কি?’

আমি সব সময় বলি, ‘কি সুন্দর দিন আজ। সুন্দর দিন না হলেও।’

‘সোনা, ঐটুকু যথেষ্ট নয়। তুমি পুরুষটির বাহু ধরে, আলতো করে তোমার দিকে টানবে। টুক করে গালে টোকা দিতে পার। চুল ঘেঁটে দিতে পার। সুন্দর করে আঙ্গুলের ডগায় ছোট্ট কামড় দিতে পার। ছোট ছোট জিনিস, যাতে খানিকটা আগ্রহ প্রকাশ পায়, কিছুটা ইচ্ছা তোমার তরফে, তাকে বন্ধুসুলভ আলিঙ্গন ও চুম্বনে উদ্দীপ্ত করা।

ইস্তারকে সাংঘাতিক ভীত মনে হল ‘বাপরে, আমি তা পারি না। কিছুতেই পারি না। আমি কঠোর সংস্কারে মানুষ হয়েছি। আমার পক্ষে সুসঙ্গত ব্যবহার ব্যতীত অন্য কিছু সম্ভব নয়। পুরুষকেই অগ্রণীর ভূমিকা নিতে হবে এবং তারপরও আমি যতটা পারব পিছু হটব। আমার মা আমাকে তেমনই শিখিয়েছেন।’

‘বেশ তো ইস্তার। তোমার মা যখন দেখতে পাচ্ছেন না, তখনই এসব করো।’

‘আমি পারবো না। আমার কাছে এসব নিষিদ্ধ। কেন একজন পুরুষ আমার দিকে এগোতে পারে না?’

এই কথার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো তার মাথায় কোনো চিন্তা ঝিলিক দিয়ে থাকবে, তার দীর্ঘ কিন্তু সুঠামবাহু দিয়ে নিজের বুক চেপে ধরল। আমি অলস চোখে দেখে আশ্বর্য হলাম, যদি সে নিজে জানতো ঐ মুহূর্তে তার হস্তদ্বয় কী সৌভাগ্য অর্জন করেছিল।

আমার মনে হয় ‘নিষিদ্ধ’ কথাটি আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আমি বললাম, ‘বাছা, ইস্তার, পেয়েছি। তোমাকে সুরাজাতীয় পানীয় বরদাস্ত করে নিতে হবে। অনেকই রয়েছে যেগুলি সুস্বাদু এবং স্বাস্থোদ্দীপক। তুমি যদি কোনো যুবককে নানান গ্রাসহপার, বা মার্গারিটাস অথবা ডজনখানেক পানীয়ের যে কোনো একটা গ্রহণে আমন্ত্রণ জানাও, তবে আমি বলতে পারি, তোমার এই নিষিদ্ধ দ্রব্যগুলো তাড়াতাড়ি সরে যাবে আর যাকে আমন্ত্রণ করবে, তারও। সেও তোমাকে কিছু প্রস্তাব রাখার সাহস পাবে। নয়তো কোনো ভদ্রলোক, কোনো ভদ্রমহিলাকে প্রস্তাব দেবে না। আর যদি সে তেমন সাহস করে এমন প্রস্তাব দেয় তোমার পছন্দ মতন কোনো হোটেলে যাওয়া যেতে পারে। যখন তোমার মা জানতে পারছে না, সে সময়ে তুমি হাসতে হাসতে সাহস করতে পারবে।’

ইস্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘কী চমৎকারই না হত, কিন্তু তাতো হবার নয়।’

‘নিশ্চয়ই হওয়ার। প্রায় সব লোকই তোমার সঙ্গে পানীয়গ্রহণে উৎসুক হবে। যদি সে ইতস্তত করে, তবে বলবে ওটা তোমার তরফে। কোনো পুরুষই এমন হতে পারে না, যে মহিলার দেয় পানীয় প্রত্যাখ্যান করবে!’

সে বাধা দিল, ‘তা নয়। সমস্যা আসলে আমার। আমার সয় না।’

‘আমি এমন কথা কখনো শুনিনি। মুখ খোলো আর ব্যস। সোনা—’

‘জানি তো। আমি পান করতে পারি, মানে আমি ওটা গিলে ফেলতে পারি। কিন্তু এতে আমার প্রতিক্রিয়া হয়। আমার টালমাটাল লাগে।’

‘কিন্তু তুমি তো সেভাবে পান কর না’

‘একটা খেলেই টলমল, তাছাড়া যখন আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি, আমি বমি করে ফেলি। আমি বহুবার চেষ্টা করেছি, কিছুতেই একটার বেশি খেতে পারিনা, আর যেই আমি খাব, আমার আর মেজাজ ঠিক থাকবে না। বুঝতেই পারেন। এটা আমার পাচন প্রক্রিয়ার ত্রুটিবিশেষ বলে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু মা বলেন, এটা আমার স্বর্গীয় দান বিশেষ। দুষ্টু লোকদের দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে নিজেকে পবিত্র রাখার পন্থা।

অবশ্যই স্বীকার করতে হয়, আমি প্রায় হতবাক্ হয়েছিলাম মুহূর্তের জন্য, এই চিন্তায় যে এমন একজন রয়েছে যে দ্রাক্ষারসের আনন্দে বঞ্চিত হওয়াটা গুণ বলে মনে করে। কিন্তু এই প্রত্যাখানের চিন্তা আমার সিদ্ধান্তকে দৃঢ় করে দিল এবং এই অনীহার অবস্থা থেকে বিপদের মুখে নিয়ে ইস্তারের বাহুতে চাপ দিলাম, ‘বাছা, আমার ওপর ছেড়ে দাও, আমি সব কিছু বন্দোবস্ত করব।’

.

আমি সঠিক জানতাম, কী করতে হবে। নিঃসন্দেহে আমি কখনো আমার বন্ধু আজাজেল্ সম্পর্কে তোমাকে কিছু বলিনি। কারণ এবার আমি পুরোপুরি সুবিবেচক। দেখতে পাচ্ছি, তুমি প্রায় এর প্রতিবাদ করতে চলেছ, আর, তোমার সত্য গোপন করার পূর্ব নজির (তোমাকে বিব্রত করার কোনো অভিসন্ধি না নিয়েই বলছি) থাকায়, আমি বিস্মিত নই মোটেই।

আজাজেল্ এক জিন, যে যাদুশক্তির অধিকারী। এক ছোট্ট জিন, সত্যি কথা বলতে কি, মাত্র দু সে.মি. লম্বা। যতই হোক্ মন্দের ভালো, তার কেরামতি আমাকে দেখাতে সে ব্যস্ত থাকে, কারণ আমাকে তার চেয়ে নিকৃষ্ট জীব মনে করে খুশি

থাকতে চায়।

সে সর্বদা আমার ডাকে সাড়া দেয়। তার উপস্থিতি পেতে আমি কি কি প্রক্রিয়া ব্যবহার করি, তোমার তা জানতে চাওয়ার প্রত্যাশা বৃথা। তোমার ছোট মস্তিষ্কের (অপরাধ নিও না) কম্ম নয় তাকে নিয়ন্ত্রণ করা।

আজাজেল্ যেন ঠাট্টাচ্ছলে উদয় হল। মনে হয় সে কোনো ক্রীড়া অনুষ্ঠান দেখছিল, যার জন্য প্রায় শত সহস্ৰ জাকিনিস্ বাজি ধরেছিল আর ফলাফল প্রত্যক্ষ করতে না পারায়, হয়তো খেলা থেকে বাদ যাচ্ছিল। আমি তাকে বুঝিয়ে দিলাম অর্থ হচ্ছে জঞ্জাল আর সে আমাদের পৃথিবীতে আসছে। প্রয়োজনে বুদ্ধিকে সাহায্য করতে তাকে শুধু শুধু ছাইভস্ম জাকিনিস সঞ্চয় না করতে। যদি সে এবারটায় জিতেও যায়, তবে ঐ পরিমাণ তো পরের খেলায় হেরে যেতেই পারে।

এইসব জবাব না দিতে পারার যুক্তি সমূহের উপস্থাপনা, শোচনীয় প্রাণীটিকে প্রথমে শান্ত করল না। তার কর্তৃত্ব করার স্বভাবে যাচ্ছেতাই স্বার্থপরতা প্রবণতা থাকে, তাই আমি তাকে কোয়ার্টার ডলার দিতে চাইলাম। আমি জানি, অ্যালুমিনিয়াম, আজাজেলের জগতে বিনিময় মাধ্যম। আর আমাকে সামান্য সাহায্য করার জন্য সে প্রতিদান চাক্‌, এ বিষয়ে তাকে উৎসাহিত করার বাসনা আমার ছিল না। আমি জেনেছিলাম, তার কাছে কোয়ার্টারটা এক শত সহস্র জাকিনিসের চেয়েও কিছু বেশি। ফলত সে খুশি হয়ে মেনে নিল যে, আমার প্রয়োজন, তার প্রয়োজনের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যেমন আমি সর্বদা বলে থাকি, যুক্তির শক্তি, ফলবতী হবেই হবে।

ইস্তারের সমস্যার কথা জানালে, আজাজেল্‌ বলল, ‘একবারই, তুমি আমাকে এক যুক্তিযুক্ত সমস্যা দিলে।’

‘অবশ্যই’ আমি বলি। যতই হোক, জানই তো আমি অবুঝ নই। আমার কেবল নিজের মতে সন্তুষ্টি চাই।

‘হ্যাঁ।’ আজাজেল্‌ জবাব দিল ‘তোমার শোচনীয় প্রজাতিটির সুরা হজম করার ক্ষমতা নেই। অর্থাৎ পাচন প্রক্রিয়ার মাঝে সেটা রক্ত প্রবাহে জমা হচ্ছে। এগুলো থেকে মাতলামির সাথে সাথে নানান বিরক্তিকর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তোমাদের অভিধান থেকে আমার যে জ্ঞান হয়েছে, গ্রীক শব্দ থেকে বলি, দেহের অভ্যন্তরেই বিষ।

আমি মুখ ভেঙালাম। আধুনিক গ্রীকরা, তুমি জান ওয়াইনের সঙ্গে রোজিন মেশায় আর প্রাচীন গ্রীকরা মেশায় জল। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তারা বলবে ভেতরেই বিষ,’ যখন তারা প্রথমেই পান করার পূর্বে ওয়াইনকে বিষবৎ করে তুলছে।

আজাজেল্‌ বলে চলল, ‘উৎসেচকগুলোকে ঠিক মতন বিন্যস্ত করা দরকার, যাতে মেয়েটি তাড়াতাড়ি ও নিশ্চিতভাবে সুরা হজম করতে পারে, দুটি কার্বন অণুর স্তর পর্যন্ত। সেটাই, চর্বি, শর্করা আর প্রোটিন পাচন ক্রিয়ার সীমারেখা। সেক্ষেত্রে বিষক্রিয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না। তখন সুরা হবে তার খাদ্যবিশেষ।

‘আমাদের খানিকটা মাতলামি চাই, আজাজেল্‌। মায়ের কোলে শেখা ফালতু কঠোর নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে স্বাস্থ্যকর পার্থক্য রাখতে যথেষ্ট হবার মতন।

‘সে বোধহয় তখনই আমার কথা বুঝল। ‘ওহ হ্যাঁ। আমি মায়েদের কথা জানি। মনে পড়ে আমার তৃতীয় মা বলতেন, ‘আজাজেল্ কখনো তরুণী মালোরির সামনে তোমার চোখ টেপা ঝিল্লী এক করে তালি দিও না, যখন, তাছাড়া কেমন করে তুমি- ‘

আমি আবার বাধা দিলাম, ‘তুমি কী এমন বন্দোবস্ত করতে পার, যাতে পাচন ক্রিয়া মধ্যপথে জমা হয়ে, একটুখানি উল্লাস সৃষ্টি করে দিতে পারে?’

‘খুব সহজে’ আজাজেলের জবাব এবং অশোভন লোভ দেখিয়ে সে আমার দেওয়া কোয়ার্টারে এক চাঁটি মারল, যার আকার তার চেয়ে লম্বা।

.

তারও সপ্তাহখানেক বাদে, আমার ইস্তারকে পরীক্ষা করার সুযোগ এল। শহরের মাঝে এক হোটেলের বার আলো করে সে বসেছিল। আর চারদিকে যেন রক্ষাকর্তারা কালো চশমা পরে তাকিয়ে আছে।

সে খিলখিল হাসল। ‘আমরা এখানে কি করছি! জানেন আমি সুরা পান করতে পারি না।’

‘আরে, এটা ঠিক সে অর্থে সুরা নয়। এটা একটা পিপারমিন্ট স্কোয়াস। দেখ, তোমার ভাল লাগবে।’ আমি আগেভাগে সব বন্দোবস্ত করে রেখেছিলাম। এবার ‘গ্রাসহপার’-এর ইশারা করলাম।

হাল্কাভাবে এক চুমুক নিয়ে সে বলল, ‘ওহ, বেশ ভালো।’ তারপর ঠেস দিয়ে, গলায় ঢালল, যেন হাল ছেড়ে দিয়ে। তার সুন্দর জিভ। একই রকম সুন্দর ওষ্ঠে স্পর্শ করিয়ে বলল, ‘আর একটা পেতে পারি নাকি!’

‘অবশ্যই।’ সৌজন্যসহকারে বললাম, ‘আরেকটা তো নিতেই পার, কিন্তু কথা হচ্ছে, আমি আজ বোকার মতন আমার ওয়ালেটটা ফেলে এসেছি।’

‘তাতে কি! আমি দাম দেব। আমার অনেক টাকা।’

এক সুন্দরী রমণী, সব সময় বলেছি এতটা লম্বা লাগে না, যখন সে দুপায়ের মাঝে রাখা পার্স থেকে ওয়ালেট বার করতে ঝোঁকে।

এমন পরিস্থিতিতে আমরা বিনদাস পান করতে থাকলাম। অন্ততপক্ষে সেতো বটেই। সে আরো একটা গ্রাসহপার নিল, তারপর ভদ্‌কা। তারপর ডবল হুইস্কি ও সোডা আরো টুকটাক্ কিছু। সব হয়ে যাওয়ার পরও এতটুকু নেশার লক্ষণ দেখা গেল না, যদিও সব কিছু ছাপিয়ে তার মোহময় হাসি নেশা ধরিয়ে দিচ্ছিল আমাকে। সে বলছিল, ‘এত স্নিগ্ধ আর আরাম লাগছে আর আমি মনে মনে প্রস্তুত। আপনি বুঝতে পারছেন তো, কি বলতে চাইছি!’

মনে হল, তক্ষুনি সায় দিই। কিন্তু কোনো উপসংহারে আসতে চাইলাম না, ‘আমার মনে হয় না, তোমার মা এটা পছন্দ করবেন (পরীক্ষা, পরীক্ষা)।

সে বলল, ‘এর সম্পর্কে মা কি জানবেন?’

‘কিছু না। আর তোমার সম্পর্কে তিনি কিইবা আর জানতে যাচ্ছেন? কিছু না। সে খুব নজর করে আমাকে দেখল, তারপর ঝুঁকে এল, আমার হাত তুলে নিয়ে তার নিখুঁত ওঠে ছোঁয়াল, ‘আমরা কোথায় যেতে পারি?’ সে বলল।

আচ্ছা বন্ধু। এসব বিষয়ে আমার অনুভূতি কেমন, তুমি জান। নম্র নিবেদনে যে রমণী আকুল, তাকে প্রত্যাখ্যান করা আমার স্বভাব নয়। আমি তো সুজন হিসেবেই প্রতিপালিত। কিন্তু এই ব্যাপারে নানান্ চিন্তা ঢুকে গেল মাথায়।

প্রথমত যদিই ক্বচিৎই বিশ্বাস করবে, আমি একজন ক্ষুদ্র ব্যক্তি, শুধু একটু স্পর্শ, আমার উৎকৃষ্ট দিনসমূহ তো বিগত। আর এই রমণী একে যুবতী তায় সুঠাম ও শক্তসমর্থ, তার পরিতুষ্টি হতে হয়তো সময় লাগবে, যদি তুমি আমাকে বোঝ।

আর তারপর কী ঘটেছিল মনে পড়ল, সে যদি বিরক্ত হয়ে ওঠে, আর মনে করে আমি সুযোগ নিয়েছি, তাহলে পরিণাম আরামদায়ক নাও হতে পারে। সে এক আবেশ তাড়িত রমণী, তাকে কিছু বুঝিয়ে বলার আগেই যদি আমার হাড়গোড় আলাদা হয়ে যায়।

তাই আমি তাকে আমার বাড়ি আসতে বললাম আর বাড়ি পৌঁছাতে ঘুর পথ করলাম। সন্ধ্যার মনোরম বাতাসে তার মাথা থেকে নম্র উষ্ণতা উবে গেল, আমি বেঁচে গেলাম।

কিন্তু অন্যরা নয়। অনেক যুবকই আমার কাছে ইস্তার সম্পর্কে মুখ খুলতে এল। কারণ, তুমি জান লোকের আস্থা অর্জন করতে আমার মধ্যে এক নির্দোষ মর্যাদাবোধ রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত এসব পানশালায় হয়নি। কারণ, ঐসব লোকেরা একবার অন্ত ত একবার পানশালা থেকে দূরে থেকেছে। তারা সচরাচর ইস্তারের সঙ্গে সুরা পানে তাল রাখতে চেয়েছিল একবারই, কিন্তু পরিণামে অসুখী।

বলেছিল, ‘আমি কিন্তু নিঃসন্দেহে, মুখের কোণায় ইস্তারের নিশ্চয় একটা গুপ্ত পাইপ রয়েছে, যার অপর প্রান্ত টেবিলের তলায় রাখা কোনো পিপে পর্যন্ত গিয়েছে। আমি সেটা খুঁজে পাইনি। কিন্তু আপনি যদি তেমনই কিছু আন্দাজ করে থাকেন, তবে তার পশ্চাতে একবার যাবেন সেখানে।’

অভিজ্ঞতার ভয়াবহতায় বেচারির মুখ শুকিয়ে এতটুকু। সে আমাকে বলবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু প্রায় অসংলগ্ন কথাবার্তা।

‘ওর চাহিদা’ বলেই চলল, বলেই চলল কিছুতেই মেটে না, কিছুতেই মেটে না।’

খুশি হলাম এই ভেবে যে, তেমন কিছু এড়িয়ে যাওয়ার জ্ঞান আমার ছিল, যা যুবকগণ কমই পারে।

আমি ইস্তারকে সে সময়ে আর বিশেষ দেখতাম না। বোঝই তো। সে বিষম ব্যস্ত থাকতো। দেখতাম বিবাহযোগ্য পুরুষদের সঙ্গে ভীতিকর হারে সম্পর্ক স্থাপন করছে। শীঘ্র বা পরে ওকে তার বিস্তৃতি বৃদ্ধি করতে হবে। শীঘ্রই তা ঘটে গেল।

এক সকালে সে আমার সঙ্গে দেখা করল, যখন সে বিমানবন্দরে রওনা হচ্ছে। আগের চেয়েও সে তখন স্ফীতকায়া, আরো স্থূল এবং শরীরের খাঁজে-ভাঁজে দৈর্ঘ্যে- প্রস্থে, উচ্চতায় চমকপ্রদ। তার ওপর দিয়ে কোনো ধকল গেছে বলে মনে হল না। বরং আরো আকর্ষণীয়া। পার্স থেকে একটা বোতল টেনে বার করল,

‘রাম,’ সে বলল, ‘ওরা সব Caribbean এ পান করবে, আর এটা খুবই হাল্কা, নরম সুরা।

‘বাছা, তুমি কি Caribbean খাচ্ছ?’

‘ও হ্যাঁ, আর কোথায় যাব? বাড়িতে পুরুষদের সহ্য শক্তি কম আর দুর্বল চরিত্র। আমি তাদের সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ। যদিও দারুণ উত্তেজনাময় কিছু মুহূর্ত ছিল। আমি আপনার কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, জর্জ। এটা সম্ভব করার জন্য। আমার মনে সেই প্রথম পিপারমিন্ট স্কোয়াস দিয়ে এর শুরু। এটা একটা লজ্জারই বিষয়, যে আমি আপনি একসঙ্গে হইনি – ‘

‘বাজে কথা ছাড় তো! তুমি জান, আমি মনুষ্যত্বের জন্য কাজ করি। আমি কখনো নিজের চিন্তা করি না।’

সে আমার গালে একটু চুমু খেল, যেন সালফিউরিক অ্যাসিডে পুড়িয়ে দিয়ে চলে গেল সে। নিশ্চিন্ত আরামে আমি ভ্রূ ওঠালাম, কিন্তু নিজেকে প্রশংসাও করলাম, আজাজেল্ এর কাছে আমার আর্জি তাহলে পরিণামে সুখের হয়েছে। কারণ ইস্তার উত্তরাধিকার সূত্রে স্বাধীনভাবে ধনী, একই সঙ্গে সুরাসক্তি ও পুরুষ উপভোগ উৎসাহের সঙ্গে চালিয়ে যেতে পারবে। কিংবা, আমি ভেবেছিলাম।

এক বছরের ওপর কেটে যেতে, আবার তার খবর পাওয়া গেল। সে শহরে ফিরে এসেছে, আমাকে ফোন করল। একটুক্ষণ লাগল আমার বুঝে উঠতে, যে সেইই ফোন করেছে। সে প্রায় উন্মাদগ্রস্ত।

‘আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে’ আমার ওপর চিৎকার করে উঠল সে, ‘আমার মা পর্যন্ত আমাকে আর ভালবাসে না।’

আমি বুঝতেই পারলাম না, কীভাবে এটা ঘটেছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত, যত দোষ আপনার। যদি আপনি আমাকে পিপারমিন্ট স্কোয়াসের সঙ্গে পরিচিত না করাতেন। এসব যে ঘটতে পারে, তা কিছুই তো আমি জানতেই পারতাম না।’

‘কিন্তু বাছা কি ঘটেছে?’ কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞাসা করি। যে ইস্তার আমার ওপর রেগে টং হয়ে রয়েছে, সেই ইস্তারের কাছে অগ্রসর হওয়া কি নিরাপদ হবে?

‘আপনি নিজে এসে দেখে যান।’

আমার কৌতূহল হয়তো আমার শেষ পরিণতি হবে কোনোদিন। সেই উপলক্ষ্য প্রায় এসেই গিয়েছিল। শহর থেকে দূরে তার বাড়ি যাওয়া থেকে নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারলাম না। বুদ্ধি করে, আমি আমার পেছনেই বাড়ির সামনের দরজাটা খোলা রেখেছিলাম। যখন সে মাংস কাটার ছুরি নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এল, আমি পিঠ ফিরিয়ে পালালাম এমনই দৌড় দিয়ে, যে ছোটবেলাকার কথা মনে করে গর্ব হল আমার। নিজের অবস্থা বুঝে, সৌভাগ্যবশত আমার পিছু নেবার উপায় তার ছিল না।

এর কিছু পরেই সে আবারও চলে গেছে, আর যতদূর জানি এখন পর্যন্ত ফেরেনি। ভয়ে ভয়ে থাকি আমি, যদি কখনো সে ফিরে আসে। এ জগতের ইস্তার মিস্তিকরা ভোলে না। মনে হল, জর্জ তার গল্পের শেষে এসে পৌঁছেছে।

‘কিন্তু কী ঘটেছিল?’ জিজ্ঞাসা করলাম।

‘তুমি দেখনি? তার শরীরে, রসায়ন সুরাকে উৎকৃষ্টভাবে দুই কার্বন অণুতে রূপান্তরিত করেছিল যা ছিল শর্করা, স্নেহ পদার্থ ও প্রোটিনের পাচন ক্রিয়ার সীমা।

সুরা তার কাছে হয়েছিল স্বাস্থ্যকর খাদ্য। আর ছয় ফুট স্পঞ্জের মতন সে পান করে গেছে, অবিশ্বাস্যভাবে। এবং সবটাই পাচন প্রক্রিয়ার শৃঙ্খলে দুই কার্বন অণুতে রূপান্তরিত হয়ে পরিণতি পেয়েছে চর্বিতে।

এক কথায় ইস্তার এখন স্থূলকায়া, দুই শব্দে, থলথলে মোটাসোটা। তার সে চমৎকার সৌন্দর্য এখন বিস্মৃত হয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে পরতে পরতে চর্বিতে।

মিশ্রিত ভয় ও অনুতাপে জর্জ মাথা নেড়ে বলল, ‘মন্দ মদিরা যে কী করতে পারে, বুঝে ওঠা কঠিন।’

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *